ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • কোথায় তোমার দেশ গো বন্ধু? পর্ব ১০

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ | ৫৬৫ বার পঠিত


  • পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ

    একটা নদীর পাড়। খেয়াঘাট। এই কি বাহাদুরাবাদের ঘাট? এর গল্পই কি ছোটবেলা থেকে বাবা মার মুখে বহুবার শুনেছি। দেশভাগের সময় এখানে নদী পেরিয়ে ফের শেয়ালদা যাবার ট্রেন ধরে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে দর্শনা স্টেশন ছাড়িয়ে গেলে তবে শান্তি, তবে স্বস্তি।

    কাকা বিনয়কৃষ্ণের মুখেও শুনেছি এখানে স্টিমারঘাটায় সারারাত্তির আলো জ্বলে, যাত্রীদের যাতায়াত লেগে থাকে। দুই পাড়ের পাইস হোটেলে দোকানদার খদ্দেরদের ডাকতে থাকে—আসেন! আসেন!

    নদী থেকে হু হু করে ধেয়ে আসা হাওয়ায় শীত শীত করে। এইসময় মাছভাত গায়ে বল দেয়, শীত কেটে যায়। সাধারণ কেরাসিন কাঠের টেবিল ও বেঞ্চি পাতা। সেদ্ধচালের গরম ভাত আর মাছের ঝোল—ভাঙনা ও পাঙাস। সেই যে কথা আছেঃ ‘ভাঙনা মাছের ঘাড়ে ত্যাল, রান্ধনী পলাইয়া গ্যাল’। কিন্তু এখানে আলো নেই কেন? আর বোঁচকাবুঁচকি নিয়ে এত লোক! একটা অস্পষ্ট হো হো শব্দ। সমানে লোক আসছে, অন্ধকারের মধ্যে নাম ধরে ডাকছে, খুঁজে বেড়াচ্ছে সঙ্গীকে। ঘাটে স্টিমার নেই; আগেরটি ছেড়ে গেছে অনেক আগে। কখন ফিরবে কেউ জানে না। সবাই অপেক্ষায়, সবার চোখে উদ্বেগ।

    আকাশে একটা অদ্ভূত লালচে আলো। বিদ্যুৎ যেন ডাইনির নখে আকাশকে ফালাফালা করে দিচ্ছে। আমি এখানে কী করছি? আমিও তো খুঁজে বেড়াচ্ছি শিপ্রাকে। শিপ্রা? হ্যাঁ, আমার কেজি ক্লাসের সাথী। ক্লাস টিচার প্রতিভা ম্যামের মেয়ে। ও যখন স্কুলের রবীন্দ্রজয়ন্তীর রিহার্সালের সময় নাচছিল –আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা রে ভাই--, তখন থেকেই জানি ও আমার বাকি জীবনের খেলার সাথী হবে; শুধু আমার, আর কারও না। ওর ঠোঁটে খেলা করত একটা লাজুক হাসি আর ওপরের ঠোঁটের ঠিক মাঝখানে একটু ফোলা ফোলা ভাব, যেন পিঁপড়ে কামড়েছে। ওই জায়গাটা দেখলেই আমার মাথার মধ্যে একটা কিছু মোচড় দিয়ে পাকিয়ে উঠত।

    কিন্তু শিপ্রা কোথায়? কতবার বলেছিলাম হাত ধরে থাক শক্ত করে, ছাড়িস না। লোকজনের যা ভীড়! স্টিমার এলে হুড়মুড়িয়ে উঠতে হবে, লোয়ার ডেকে জায়গা পেলেই হবে। কিন্তু ধাক্কাধাকির ফাঁকে কখন যে হাত ছূটে গেছে!

    আমি জানি এখন কী করতে হবে। আমিও অন্যদের মত চিৎকার করি—শিপ্রা! শিপ্রা! দৌড়ে যাই, টর্চের আলোয় সবার মুখ দেখি। হঠাৎ ওপাশের বড় বটগাছটার দিক থেকে একটা আর্তনাদ—বাঁচাও! বাঁচাও! ওরা আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

    আরে! এ তো শিপ্রার গলার স্বর! প্রাণপণে দৌড়ে যাই আওয়াজ লক্ষ্য করে। আমার সংগে দৌড়য় আরও লোক। গাছের তলায় বদমাসের দল পালিয়ে যায়। আমি হাঁফাতে থাকি, যাক ফাঁড়া কেটেছে। উদ্ধার পাওয়া মেয়েটি দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে, আমার বুকে মুখ রেখে ফোঁপাতে থাকে। আমি বিড়বিড় করি—শিপ্রা! আমার শিপ্রা! আর কখনো এভাবে ছেড়ে যাস না।

    মেয়েটি আরও জোরে জড়িয়ে ধরে। আকাশ চিরে ইন্দ্রের বজ্র নামে, কাশীরাম দাসের মহাভারতে আঁকা ছবির মতন। সেই অস্ফুট আলোয় দেখতে পাই মেয়েটির মুখ আর চমকে উঠি—এ কে? এতো শিপ্রা নয়!

    মেয়েটি ফোঁপানি থামিয়ে হেসে ফেলে। কী যা তা বলছেন? আমিই তো শিপ্রা।

    -- তোমার নাম শিপ্রা?

    -- হ্যাঁ, অন্য কোন নাম কেন হবে?

    কিন্তু আমি যে অন্য শিপ্রাকে খুঁজছিলাম, আরেকজন।

    মেয়েটি আমার হতাশা টের পেয়ে যায়। ভয় পায়, আমি ওকে ছেড়ে এগিয়ে যাব। ও আমার হাতের আঙুলে নিজের আঙুল ফাঁসিয়ে কিছু বলে। আমি ওর কথা শুনতে পাই না।

    - ব্যস্‌ আজ এই পর্যন্ত। এবার খেতে যাব, ক্লান্ত লাগছে।

    নিজেকে বলা এই কথাগুলো ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়ংবদা শুনছে। ওর কপালে তিনটে আলো নড়াচড়া করে। ব্রঙ্কাইটিসের মত একটা ঘড়ঘড়ানি শুরু হয়। সেটা থেমে গেলে যান্ত্রিক আওয়াজে প্রিয়ংবদা বলে — মাত্র সাত ইউনিট কাজ হয়েছে। দশ ইউনিট করতে হবে। খেয়ে এসে ফের শুরু কর।

    আমি প্রিয়ংবদার দিকে তাকিয়ে প্রায় হাতজোড় করি। আজ আমায় মাপ করে দাও। আমি পারব না। এই স্বপ্ন আমায় ছোটবেলা থেকে হন্ট করছে, কতবার দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। এটা যেদিন আমার মাথায় ভর করে, সেদিন আমার স্নায়ু ঝনঝনিয়ে ওঠে- কোন কাজ করার শক্তি পাইনে। কাল নাহয় আজকের বকায়া তিন ইউনিট পুরো করে দেব, তের ইউনিট কাজ তুলে দেব।

    প্রিয়ংবদা কিছু বলে না। ওর হাত নব্বই ডিগ্রি কোণে ভাঁজ হয়, ওর হাত থেকে একট অ্যাম্বার রঙের আলো গিয়ে ডিজিটাল প্রিন্টারের গায়ে পরে । সেন্সর কাজ করে আর ঘড়ঘড় শব্দে আজ যা লিখেছি সেই সাত ইউনিট ছেপে বেরিয়ে এসে পাশের ট্রে’তে চালান হয়ে যায়। আমি মেশিন ঘরের আলো নিভিয়ে খাবার জন্য রওনা হই।

    এভাবেই কেটে যাচ্ছে মাসের পর মাস। আমাকে লিপিবদ্ধ করতে হবে আমার স্মৃতি, আমার মনের পর্দায় শরতের মেঘের মত ভেসে বেড়ানো সব ইমেজ, যা কিছু চিন্তা সব। কিন্তু এসবের মানেটা বুঝতে হলে আমাকে বলতে হবে ডিটেনশন সেন্টার 1276/WB থেকে এখানে কেন এলাম, কীভাবে এলাম—সব। তখনও আমার স্থান-কাল বোধ এমনভাবে ঘুলিয়ে যায়নি।

    ১৪ ডিসেম্বর, ২০৩০ শনিবার

    ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল এক সপ্তাহ আগের শৌর্য দিবসে। আমি তো আগের দিন ফর্ম ভরে জমা করে দিয়েছিলাম। নারায়ণ বিশ্বাস নামের পাগলটার আমার মুখের সামনে নেচে নেচে হাত নেড়ে ‘তোমার যা মনের কথা সে তো আমি জানি’ বলায় ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। খানিকটা তাল কেটে গিয়েছিল বটে, কিন্তু হালদারবাবু চেক করে বলেছিলেন—ঠিকই আছে। এক সপ্তাহের মধ্যে আপনি ইন্টারভিউ কল পেয়ে যাবেন।

    শৌর্য দিবসের প্রোগ্রামে যোশীজি ছাড়া আরও দু’জন অতিথি এসেছিলেন। তাঁদের একজন আমাদের বললেন –‘ জয়লাভ হোল আসল কথা। হেরোদের কেউ মনে রাখেনা। বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে। এক অর্থে ইতিহাস হোল সভ্যতার চারণদের গান। কাজেই আমাদের জয় চাই—যে কোন মূল্যে। ৬ই ডিসেম্বর হোল আমাদের হিন্দুদের পরাক্রম বা শৌর্য দিবস। আমাদের দেশ গৌতম বুদ্ধের রামকৃষ্ণের দেশ বটে, কিন্তু পরাজিতের ক্ষমা দুর্বলতার নামান্তর। “নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ”।

    ‘আমাদের প্রতিবেশি এবং শত্রুদের থেকেও শেখার আছে। কম্যুনিস্ট চিনকে দেখ। ওরাও ভগবান বুদ্ধকে মানে; হয়ত আমাদের চেয়ে বেশিই মানে। ওদের জাতির জনক মাও জে দং শিখিয়েছিলেন—বন্দুকের নল হোল ক্ষমতার উৎস। এমন সত্যি কথা বিনা নখরা করে সোজাসুজি বলতে পেরেছিলেন তাই চিন আজ দুনিয়ায় একনম্বর, খোদ আমেরিকাকে টক্কর দিচ্ছে।

    ‘গান্ধীজি আমাদের জাতির জনক, তাঁকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তাঁর অহিংসার পথ এই শতাব্দীতে বার বার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কাজেই প্রশ্নটা হিংসা বনাম অহিংসা নয়, বরং ঠিক বনাম ভুলের। হিন্দু সংস্কৃতি বনাম যবন সংস্কৃতির। চিনকে দেখ, দুনিয়ার চেঁচামেচিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উইঘুর মুসলিমদের ঠেঙিয়ে লাট করে দিয়েছে। ঠিক করেছে।

    ‘আরও দুই বৌদ্ধ প্রতিবেশি দেশের দিকে তাকাও-- ময়ানমার এবং শ্রীলংকা। জেহাদ বা যেকোন টেররিজমকে গোড়াতেই দমন করতে হয়, নইলে বিপদ। আমরাও সঠিক পথে চলে এখন বিশ্বে তিন নম্বর। রামকৃষ্ণদেব বলেছেন—লজ্জা, ঘৃণা,  ভয়, তিন থাকতে নয়।

    কিন্তু এটা উনি কি বললেন? শ্রীলংকার মুসলিম ও ক্রিশ্চানদের উগ্রবাদী ঝোঁককে শায়েস্তা করে নিয়ন্ত্রণে রাখা তো এই শতাব্দীর ঘটনা। তার আগে গত শতাব্দীতে তালিম ইলমের স্বপ্ন দেখানো লিট্টে ও অন্যান্য হিন্দু গ্রুপকে যে নির্মম নরসংহারের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হোল?

    ‘আমার প্রশ্ন আমার উত্তেজনা বোধহয় চেহারায় ফুটে উঠেছিল। উনি সোজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকালেন। একটু হাসলেন। তারপর এক ঢোঁক জল খেয়ে বললেন—মাস্টারমশায়, আপনার প্রশ্নটি স্বাভাবিক। যে কোন চিন্তাশীল মানুষের মনে এই প্রসঙ্গটি উঠবে।

    ‘দেখুন, জো জিতা ওহী সিকন্দর। যদি লিট্টে বিজয়ী হত, তাহলে প্রভাকরণ শ্রীলংকার কিষেনজী না হয়ে স্বাধীন তামিল ইলমের প্রেসিডেন্ট হত। হেরে গেছে, তাই ও আর এক জন কিষেনজী মাত্র। নেপালকে দেখুন; ওখানের মাওবাদীরা ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করল আর আমেরিকাও কেমন ব্ল্যাক লিস্ট থেকে ওদের নাম কেটে দিল। দুনিয়া এভাবেই চলছে।

    ‘আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে কাবুলে তালিবান ক্ষমতায় আসতেই তার জেহাদী বদনাম ঘুচে গেল। মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনি টেররিস্ট, আর চেয়ারে বসলে দেশপ্রেমিক বা বিপ্লবী। তাই বলছি — হিন্দুদের বিজয় চাই, যে কোন মূল্যে!

    তারপর সেদিন সন্ধ্যেবেলা।

    খাওয়ার ঘন্টা বাজেনি, অল্প দেরি হবে। এমন সময় ভবানীদা এল। আমার দিকে না তাকিয়ে ভাবলেশহীন মুখে বলল-মাস্টারমশাইকে অফিসে ডাকছে।

    আমি সোয়েটারের উপর একটা আলোয়ান জড়িয়ে নিলাম। আমার বুকের ধুকপুকি কি বাইরে শোনা যাচ্ছে? নইলে গুরুপদ আর মিচকে রহমান আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেন? যাহোক, আমি ওদের চাউনি অগ্রাহ্য করে অফিসের দিকে রওনা দিলাম। অফিসে ঢুকতেই হালদারবাবু দরজাটা ভেজিয়ে দিতে দিতে ভবানীদাকে বললেন – বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াও, দেখ-- এদিকে যেন কেউ না আসে, জরুরী মিটিং চলছে।

    আমার ধুকপুকি বেড়ে গেল। ছোটবেলার আকাশবাণীর অনুরোধের আসরে শোনা তালাত মামুদের একটা গানের কলি মাথায় ঘুরছে—এল কি নতুন কোন গোধূলি বেলা!

    টেবিলের উপর সাদা চাদর। ওপাশে সকালের যোশীজি ও বাকি দু’জন ভদ্রলোক। হালদারবাবু টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে, হাত কচলাচ্ছেন। আমাকে চোখের ইশারায় উৎসাহ দিলেও ওনার নার্ভাসনেস ঢাকা পড়ছে না। যোশীজি নিতান্ত অভ্যাসবশে বললেন—বৈঠিয়ে মাস্টার’সাব।

    কিন্তু এ’পাশে কোন চেয়ার রাখা নেই। আমি নমস্কার করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

    প্রায় একমিনিট নীরবতা। তারপর সকালে যিনি চুপচাপ ছিলেন তিনি মুখ খুললেন। ভাঙা ভাঙা বাংলা ও হিন্দি মিশিয়ে যা বললেন তার মমার্থঃ

    আমার উন্নতি দেখে ওঁরা বেজায় খুশি। আমি যেভাবে সাভারকরের হিন্দুত্ব, এন আর সি ও সি এ এ ব্যাখ্যা করেছি অমন যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ওঁদের শিবিরে অংশগ্রহণ করা লোকজনেরাও পারে না। ওঁরা আমাকে প্রচারকের দায়িত্ব দিতে যান, অবশ্য আমি যদি রাজি থাকি। কোন জোরাজুরি নেই।

    রাজি হলে আমাকে আগামী কাল এই ডিটেনশন সেন্টার 1276/WB থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু একবছর প্রোবেশনে থাকতে হবে, বাড়ির সংগে যোগাযোগ রাখা যাবে না। ততদিন আমার বৌয়ের খাইখরচ বাবদ একটা মাসোহারা নিয়মিত ওর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে ভাল চিকিৎসা হবে। একবছর পর সন্তোষজনক কাজ দেখাতে পারলে আমি নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অপারেট করতে পারব। পেনশন শুরু হবে, এরিয়ার সমেত। আমি যদি রাজি থাকি তাহলে একটি প্রতিজ্ঞাপত্র ও চুক্তিপত্রে সই করতে হবে।

    ওঁরা দুটো কাগজ এগিয়ে দিলেন আর হালদারবাবুর বুকপকেট থেকে বেরিয়ে এল একটা কলম--কালি ভরা ফাউন্টেন পেন।। আমি আর ভাবতে পারছি না। যন্ত্রচালিতের মত কলমের ক্যাপ খুলে পেন্সিল দিয়ে দাগ দেওয়া জায়গাগুলোতে সই মেরে দিয়ে হাঁফাতে লাগলাম।

    খিদে মরে গেছল। না খেয়ে চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। মিচকে ও গুরুপদ’র বেয়াড়া প্রশ্নের সোজাসুজি উত্তর না দিয়ে বললেম—শরীরটা ভাল লাগছে না।

    রাত বোধহয় একটা, দরজায় খট খট শব্দ, কোন মৃদু টোকা নয় বরং খানিকটা অধৈর্য ভাব। দরজা খুলতে গেল রহমান। ওকে ঠেলে ঘরে ঢুকল এই সেন্টারের ড্রাইভার আর ভবানীদা। ওরা দ্রুত হাতে বিছানার কাছে এগিয়ে এসে দড়িতে টাঙানো আমার গামছা আর গেঞ্জি এয়ারব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়ে ইশারা করল জামাপ্যান্ট ও সোয়েটার পরে নিতে। ড্রাইভার তুলে নিল আমার স্যুটকেস আর ভবানীদা এয়ারব্যাগ। আমি ওদের পেছন পেছন বেরিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু রহমান রাস্তা আটকে দাঁড়াল —মাস্টারমশায় , এরা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আপনি কিছু বলছেন না কেন? আরে গুরুপদবাবু, শিগগির উঠুন, দেখুন মাঝরাত্তিরে এসব কী হচ্ছে?

    ওকে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় ড্রাইভার মিলন। আমি কোনদিকে না তাকিয়ে ড্রাইভারের পেছন পেছন গিয়ে বাইরে অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে উঠে পড়ি।

    পরে জেনেছি যে ৩১শে ডিসেম্বর, ২০৩০ তারিখে 1276/WB নম্বর ডিটেনশন সেন্টারে একজন নামজাদা উকিল এসেছিলেন। ওকে নিযুক্ত করেছে আমার স্ত্রী ও মেয়েতে মিলে। বয়েস ও স্বাস্থ্যের কারণে এবং গুড কন্ডাক্ট রেকর্ডের ভিত্তিতে যদি আমাকে আমার স্ত্রী ও মেয়ের সংগে থাকতে দেওয়া হয়! এই গ্রাউন্ডে উনি একটা পিটিশন বানিয়ে এনেছিলেন আমাকে সই করাতে।

    কিন্তু অফিসে হালদারবাবু ওনাকে খাতির করে বসিয়ে চা’ খাওয়ালেন। তারপর আমার ফাইল খুলে আমার সই করা দুটো ডিক্লারেশন দেখিয়ে বললেন—চাইলে জেরক্স কপি দিতে পারি।

    সেই দুটো কাগজে লেখা রয়েছে যে আমি আর ডেটিনিউ নই; স্বেচ্ছায় নিজেকে রাষ্ট্রের সেবায় উৎসর্গ করেছি। এটাই আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত। কাজেই কোন উকিলের দরকার নেই। বছরখানেকের মাথায় আমি নিজেই গিয়ে মা-মেয়ের সংসারে হাজির হব।

    খুঁতখুঁতে উকিল ভদ্রলোকটি মন দিয়ে আমার দস্তখত আমার অন্য কাগজের সংগে মিলিয়ে দেখলেন। হ্যাঁ, সইগুলো জেনুইন মনে হচ্ছে।

    দুপুরবেলা সিরাজুল এসেছে আড্ডা দিতে।

    মাইরি, আপনি যদি রোজ এতক্ষণ প্রিয়ংবদার সংগে কাটান তাহলে আমার কী হবে? ও কি আর আমার দিকে ফিরে তাকাবে?

    বাজে কথা বোল না। আমাকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে –রোজ কিছু পাতা স্মৃতি থেকে লিখতে হবে। নইলে কি দায় পড়েছে যে ওই শাকচুন্নির সংগে সময় কাটাই! একটু পরেই মনে হয় কম্পিউটার রুমের ঘরটা যেন ভুশুণ্ডির মাঠ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আজ দুপুরে ঘুমুতে দিবি না। বেশ, তাহলে দাঁড়া, একটু চায়ের জোগাড় দেখি।

    চা খাবার সময় খেয়াল করলাম সিরাজুল এক হাতে কাঁচের গেলাসটা ধরে রাখতে পারছে না। প্রথম ভেবেছিলাম ওর হাতে বোধহয় ছ্যাঁকা লাগছে। আমি দেখিয়ে দিলাম—এই যে, এইভাবে; বুড়ো আঙুল আর তর্জনির ব্যবহার করে, যতক্ষণ গরম না কমে।

    ও হাসল, তারপর আমার ডেমো দেখে চেষ্টা করল। ওর হাত থর থর করে কাঁপছে। খানিকটা চা চলকে মেজেয় পড়েছে। বিরক্ত লাগল। আমাকেই এটা মুছতে হবে। এখানে সবাইকে স্বাবলম্বী হতে হয়। নিজের ছোট্ট ঘর, এঁটো বাসন আর জামাকাপড় নিজেকেই পরিষ্কার করতে হয়।

    ও হাসল, তারপর ছোট টেবিলের উপর গেলাসটা নামিয়ে রাখল। তারপর দুটো হাত টেবিলে বিছিয়ে দিল। এবার চোখে পড়ল—ডানহাতটার তর্জনিটা থ্যাঁতলানো।

    আমার চাউনি অনুসরণ করে সিরাজুল হেসে ফেলল।

    -- আরে মাস্টারমশাই, আমারই দোষ। মুখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। বেফাঁস কথা বলে ফেলি। ওই যে বলে না—মুখ দোষে মার গলে!

    - হেঁয়ালি ছেড়ে ঠিক করে বল, কী হয়েছিল?

    -- প্রথমবার ধরেছিল শিলচরে। ভাষাদিবস পালনের সময়। কবিতা লিখতাম তো, সেদিন যে কবিতাটা পড়েছিলাম সেটা মাননীয় কর্তৃপক্ষের মনে হোল ‘বংগালীপনা’ আর ‘মিঞা কবিতা’। আমি অস্বীকার করি নি। আমি বাঙালী এবং মিঞা, তো আমার কবিতায় ‘বংগালীপনা’ আর ‘মিঞা কবিতা’ দুটোর প্রভাব থাকবে এতে আশ্চর্যের কী আছে? লুকোব কেন?

    - এর জন্য আঙুল ছেঁচে দিল? নিশ্চয়ই কোন কলিতা, বড়গোহাঞি বা গোস্বামী হবে?

    -- আরে না না; যে ছেঁচে দিয়েছিল সে থানার সেকেন্ড অফিসার কার্তিক রায়, বাঙালী। আরে এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? খেয়াল করেছেন যে ব্রিটিশ জমানায় আমাদের উপর বেশি অত্যাচার করত ভারতীয় পুলিশ, কোন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে স্পেশ্যাল টিম নয়। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে হাতে গোণা ইংরেজ, বেশিরভাগ ভারতীয়।

    আমি অস্বস্তি বোধ করি। এসব কথা কেন? আমার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে, কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজের কম্যান্ডার ও সৈন্যদের ফোর্ট উইলিয়মে বিচারের সময়  উকিল লাগানো এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের জন্য চাঁদা তুলেছিলেন।

    কথা ঘোরাতে চেষ্টা করি।

    - ফালতু কথা ছেড়ে লাইনে আয়। কেন ছেঁচে দিল?

    -- বললাম না? আমার এই ছ্যাবলা জিভের জন্য। হয়েছিল কি ওই ব্যাটা কার্তিক রায়, দেখতে গণেশের মত, মিঞা কবিতা নিয়ে যা তা বলছিল। মাকড়াটা কবিতার কিছুই বোঝে না, পড়েই নি। আমি প্রতিবাদ করলাম। বললাম—আপনি একটাও মিঞা কবিতা না পড়ে এরকম বলতে পারেন না। শুনে ওর নিচের গোঁফ জ্বলে গেল। আমাকে বলল –কার কবিতা পড়ব?

    কেন, আমারটা।

    -- তুই কবি নাকি? বেশ, এখানে আমার টেবিলে বসে দু’লাইন পদ্য লিখে দে। পড়ে আমার জনম সার্থক করি।

    আমার ফাজলেমির স্বভাব। তা লিখে দিলাম চৌপদী, একেবারে পয়ার ছন্দে। সেই হোল কাল। শুনবেন? তাহলে শুনুন।

    কবিতার নাম - ‘বোকা-দা’।

    ‘ডাঙায় ফেলিলে তাহা বৃথা নষ্ট হয়,
    পুকুরে ফেলিলে তাহা পুঁটিমাছে খায়।
    সেই মাছ খেয়ে নারী গর্ভবতী হয়,
    তাহারে লাগাইলে তারে বোকা-দা কয়’।

    এই হোল বেত্তান্ত, তারপর টেবিলে হাত চেপে ধরে রুলের বাড়ি মেরে মেরে, এই আর কি! ওদের দোষ দিই না।

    -- তুমিই বা অমন নাম দিয়ে কবিতা কেন লিখতে গেলে? আর কিছু পেলে না?

    -- স্যার, আসাম বা ঝাড়খণ্ড, যেখান থেকেই কোলকাতা আসি দুটো গালি শুনলে বুঝি ট্রেন বাঙলার সীমানা পেরিয়ে ভেতরে এসেছে। দুটো বিশেষ গালি—যা শুধু বঙালিরা কথায় কথায় বলে। বলুন আপনি, অন্ততঃ একটা গালি।

    -- শুয়োরের বাচ্চা! আরে তোকে বলছি না—ওই কমন বাঙালি গালি।

    - সে বুঝেছি, এবার দ্বিতীয় গালি?

    খানিক্ষণ ভাবি। বাঞ্চৎ?

    -- হল না, বোনের সংগে সম্পর্কজোড়া খালিস হিন্দি গালিটাকে বাঙালি উচ্চারণ বদলে শালা-বাঞ্চৎ করে মিষ্টিমত বানিয়ে দিয়েছে। ওর ঝাঁঝটাই চলে গেছে। আপনি ডাহা ফেল।

    দ্বিতীয় গালিটা হোল ওই ‘বোকা-দা’। সারাভারতে কোন রাজ্যে কোন নগরে এই গালিটা শুনতে পাবেন না। সেবার ছত্তিশগড়ের জেল থেকে খালাস পেয়ে কোলকাতা হয়ে শিলচর ফিরে যাচ্ছি, রেলগাড়ি ঝমাঝম ছুটছে। যেই ধলভূমগড় পেরোলাম আর ট্রেনের কামরায় ডাবওলা ও চপমুড়ি উঠল শুনতে পেলাম ওই দুটো গালি। ব্যস, শরীর ও মন তরতাজা।

    এ’ছেলের উপর রাগ করা যায়? তবু জানতে চাই কেন অমন ফুটপাথের ইতরশব্দ নিয়ে কবিতা লিখল।

    -- স্যার, আমাদের ওখানে থাকলে বুঝতেন। রোজ রোজ যে অপমান, যে ব্যঙ্গ শুনতে হয়। সময় বদলে গেছল স্যার। কেন আমি কি অপরাধ করেছি? এক হাজার সাল আগে কোন আক্রমণকারী, কোন ঘোরী কোন বাবর কী কী করেছিল  আজ তার জবাবদিহি আমাকে করতে হবে? এটা কি আমার দেশ নয়? আমার আব্বা আমার নানা — কেউ তো পূর্ব পাকিস্তানে যায় নি? আমরা তো একাত্তরের গৃহযুদ্ধের সময় তাড়া খেয়ে আসামে ঢুকিনি। তাহলে কেন মিঞা বলে দেগে দেওয়া হবে? 

    তাই গাল দিয়ে একটুকুন ফেরত দিলাম আর কি! শাইলকের সেই লম্বা আর্গুমেন্ট মনে আছে নিশ্চয়ই?

    “Hath not the Jews eyes and ears?"

    এখানে ইহুদীর জায়গায় মুসলমান বসিয়ে নিন।

    কিন্তু সিরাজুলকে বলা যাবে না এখানে আসার সাতদিন পরে ঠিক কী হয়েছিল। ও শুধু জানে আমার মত বুড়ো হাবড়া মাস্টারকে দিয়ে ওরা স্বাধীনতার পরে জন্মানো প্রজন্মের বামপন্থা ও লিবেরাল ঝোঁকের উৎস খুঁজে বের করাতে চায়। উদ্দেশ্য ওদের জন্যে একটা রিফ্রেশার কোর্সের কারিকুলাম ও টেক্সট ডিজাইন করা। পুরোদস্তুর পেডাগগি। তাতে ইতিহাসের অনেক এড়িয়ে যাওয়া প্রসংগ, ধামাচাপা দেওয়া বা অপ্রিয় কাহিনী সামনে আসবে। এই শতাব্দীতে ফেলে আসা সময়ের নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার।

    আজ এতদিন পরে আপনাদের কাছে খুলে বলছি।

    ১৫ই ডিসেম্বর, ২০৩০ রবিবার

    এই অজানা নতুন শিবিরে আসার পর গতকাল আমার এক সপ্তাহ পুরো হল। এ’কদিন আমায় বিশেষ কিছু করতে হয়নি। শুধু এখানকার রুটিন এবং কী কী করা যাবে এবং করা ঠিক হবেনা তার সঙ্গে পরিচিত হতেই লেগে গেল। অনেকগুলো কাজ নিজের হাতে করতে হয় যার ফিরিস্তি আগে দিয়েছি। তবে যা যা করতে মানা সেগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, বিনা অনুমতি এই চৌহদ্দির বাইরে বেরোনো যাবে না। মোবাইল এবং ল্যান্ডফোন কোনটাই ব্যবহার করা যাবে না। কাউকে চিঠি লেখা নিষিদ্ধ। এখানকার ঠিকানা বা লোকেশনের হদিশ বাইরের অথবা বাড়ির লোকজন জানবে না। শরীর খারাপ হলে সঙ্গে সঙ্গে ইনচার্জ আলোক ভাইয়াকে বলতে হবে। তিনি এখানে ডাক্তার আনার বন্দোবস্ত করবেন। কোন হাসপাতালে চেক আপ করানোর প্রশ্নই ওঠে না।

    আমি কম্পিউটারে বিশেষ সড়গড় ছিলেম না। দরকার পড়েনি। স্মার্ট ফোনও ব্যবহার করিনি। এই ক’দিনে আমাকে ওয়ার্ড ফাইল, টাইপ করা , ডকুমেন্ট সেভ করা এসব শেখানো হোল। কিন্তু শেষে সেই ঢাকের তিনপাত। গতকাল সকালের পরীক্ষায় আমি ডাহা ফেল। শেষে ঠিক হোল যে আমি লিখবো কাগজ-কলমে, কিন্তু একটা ওয়ার্ড ফাইল খুলে দেওয়া হয়েছে। তাতে রোজ যা হাতে লিখছি তার মূল পয়েন্টগুলো বুলেট পয়েন্ট দিয়ে কম্পিউটারে পোস্ট করতে হবে।

    প্রিয়ংবদা আমার লেখার তদারকি করবে এবং রোজকার হাতে লেখার ফটোকপি এবং ওয়ার্ড ফাইলের প্রিন্ট আউট বের করে দেবে। আমার বাড়তি কাজ হোল হার্ডকপির একটা স্পাইর‍্যাল বাইন্ডিং করে রাখা। তাতে সাহায্য করার লোক রয়েছে। কিন্তু এতসব কর্মকান্ড কেন? এই বয়সে কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড কোনটাই ভাল লাগে না, গায়ে জ্বর আসে। সেসব জানতে পারলাম গতকাল শনিবার ১৪ই ডিসেম্বর তারিখে—এই তারিখটা চেষ্টা করেও ভুলতে পারি না যে!

    বিকেলে চা খেয়ে একটা স্ক্র্যাপবুক নিয়ে পেন দিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করছিলাম—সবিতার মুখ, টুকটুকির চেহারা। আমি কোন শিল্পী নই, কিন্তু প্রথম জীবনে পার্টির পোস্টার, এগজিবিশনে হো চি-মিনের মুখ , কাস্তে হাতে টোকা মাথায় চাষি ও পেশীবহুল হাতে বজ্রমুঠিতে ধরা হাতুড়ি—এসব আঁকতে পারতাম। গাছকোমর করে শাড়ি পরা মুষ্টিবদ্ধ হাত তোলা মেয়ে কমরেডদেরও কত এঁকেছি। কিন্তু অনভ্যাসের ফোঁটায় কপাল চড়চড় করে যে!

    সবিতার মুখ আঁকতে গিয়ে খানিকটা বোরোলীনের বিজ্ঞাপনের মেয়েটির মুখের আদল এসে গেল। আর টুকটুকির চেহারা? সেটা আমার ছেলেবেলার জবাকুসুম তেলের বিজ্ঞাপনের মডেলের সঙ্গে মিলে গেল।

    এমন কেন হোল? আমি কি ওদের চেহারা ভুলে যাচ্ছি? নিজের বৌ ও মেয়ের চেহারা? এখনই যদি এই হাল হয় তাহলে একবছর পরে কী হবে? ওদের চেহারা আমার মনে থাকবে তো? নাঃ ; সে জন্যেই তো এইসব অপটু কাঁপা কাঁপা হাতে ছবি আঁকার প্রচেষ্টা।

    এমন সময় একটা গাড়ির ইঞ্জিনের চাপা আওয়াজ কানে এল। ওটা থেমেছে সেই দীঘির পাড়ে, বাড়ি বা ব্যারাকটার পেছনের গেটের দিকে। একটু পরে কিছু লোকের পায়ে চলার আওয়াজ, এখানকার স্টাফের ব্যস্তসমস্ত ভাব –সবই খেয়াল করলাম। তখনও সিরাজুল আসেনি। এখানে বাসিন্দে বলতে আমি একা; না; আগেই বলেছি। আরেকজন আছেন, যাঁর ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ থাকে, খাবার যায় ঘরের মধ্যে। গত সাতদিনে তাঁর অস্তিত্ব কদাচিৎ টের পেয়েছি। এক দীর্ঘদেহী কৃশ ছায়াশরীর যেন।

    ডাক পড়েছিল কম্পিউটার ঘরে। তিনজনের মধ্যে দু’জনকে আমি চিনি, নাম জানিনা। এঁদের সেই 1276/WB নম্বর ডিটেনশন সেন্টারে শৌর্য দিবসে দেখেছিলাম। তৃতীয়জন নতুন, যোশীজির বদলে এসেছেন হয়ত। উঁহু, উনি অনেক সিনিয়র। বাকি দুজনের হাবভাবে সেটা প্রকট। কথা যা বলার উনিই বলছেন।

    -- ‘শুনুন মাস্টারমশাই। আপনি সামান্য জীবনে ফিরে যেতে চান অথচ আমাদের হয়ে প্রচারের কাজ করতে রাজি হয়েছেন। সেটা কোন ব্যাপার নয়। ইন ফ্যাক্ট, নিজের বৌ-মেয়ের কাছে ফিরে গিয়েও লেখালেখির কাজ, প্রচারের কাজ করা যায়। বীর সাভারকরজি তাই করেছিলেন।

    ‘উনি আন্দামান থেকে ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের রাজবন্দী হিসেবে। তারপর রত্নগিরি জেলায় নিজের বাড়িতে নজরবন্দী হয়ে থাকতে হয়েছিল প্রায় এক দশক। তবে ছিলেন নিজের স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের সঙ্গে । কিন্তু তাঁর সমস্ত তাত্ত্বিক লেখালিখি, যেমন ‘হিন্দুত্ব’র রূপরেখা নিয়ে বই বের করা, ভবিষ্যতের স্বাধীন ভারতের স্বরূপ নিয়ে গান্ধীজির সঙ্গে বিতর্ক, সেলুলার জেলের স্মৃতি—সব এই সময়ের রচনা। আপনিও পারবেন। এই বয়সে এ’ভাবেই আপনি রাষ্ট্রের সেবা ভালভাবে করতে পারবেন।

    কিন্তু একটা সমস্যা রয়েছে যে’!

    উনি চুপ করলেন। সবাই তাঁর দিকে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। এবার উনি চশমা খুলে কাঁচ মুছে আবার নাকের ডগায় লাগিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর তীব্র দৃষ্টি আমাকে ঝলসে দিচ্ছে।

    -- আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়েছি যে রাষ্ট্রবিরোধী অশুভ শক্তি এই এলাকায় একটি স্লীপার সেল গড়ে তুলেছে। তার দু’জন সদস্য । একজন ধরা পড়েছে; বাকি নাটের গুরু বয়স্ক লিওতার্ডকে চিহ্নিত করা যায়নি। কিন্তু আমরা হাল ছাড়িনি। ইন ফ্যাক্ট, লোকটাকে ধরা আমাদের টপ প্রায়োরিটি। যতদূর বুঝতে পেরেছি সে রয়েছে আমাদের আশে পাশে। সে কে, সে কি আপনি?

    ঘরের মধ্যে একটা বোলতা ঢুকে ঘুর ঘুর করছে। একবার আমার নাকের ডগায় এল, কিন্তু আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় এখন একাগ্র হয়ে অন্য কিছু ভাবছে।

    ভয় পায়, এরাও তাহলে ভয় পায়।

    -- না, আমি ওসব নই। কিন্তু যে ধরা পড়েছে তার মুখ থেকেই তো জানতে পারেন --ওই কী বললেন-নাটের গুরুর হদিশ।

    -- আনফরচুনেটলি, গতকাল সে মারা গেছে। হার্টফেল। ধকল সামলাতে পারেনি। ইনফ্যাক্ট, তার হার্ট মাত্র তিরিশ পার্সেন্ট কাজ করছিল। হয়ত সে নিজেও জানত না। সে একটি মেয়ে, বেশ ডাকাবুকো। নাম দীপা সরকার। কী, কিছু মনে পড়ছে?

    -- হ্যাঁ, ওর দাদা আমার স্কুলের বন্ধু। বহুদিন যোগাযোগ নেই। বোলপুরের কাছে সুরুল বলে একটা গ্রামে ওর বিয়ে হয়েছিল।

    -- ওর কিন্তু আপনাকে ভালই মনে আছে, এমনকি আপনার ডিটেনশন সেন্টারে থাকার কথাটাও। প্রেম-ট্রেম ছিল নাকি, কী বলেন মাস্টারমশাই?

    (চলবে)
  • | বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ | ৫৬৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • জয় | 82.1.126.236 | ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ ১৩:৩৭502377
  • @ রঞ্জনদা
    এপিক হচ্ছে। খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ছি।
    "ভয় পায়, এরাও তাহলে ভয় পায়?"- সাহস জোগায় বুক বাঁধতে। দূরন্ত।
  • Ranjan Roy | ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩:৫০502395
  • চতুর্ভূজ,
       শুধরে নিলাম। আরও কিছু টাইপো এবং  বাক্যগঠনে  সিনট্যাক্সের ভুল ছিল।
    অনেক ধন্যবাদ।
     জয়,
      উৎসাহ দেবার জন্যে ধন্যবাদ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন