ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  সমাজ  শনিবারবেলা

  • ইহুদি রসিকতা ১৮: ধর্মে ধর্মান্তরে

    হীরেন সিংহরায়
    ধারাবাহিক | সমাজ | ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৮৬১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • ছবি - র২হ


    ধর্মে ধর্মান্তরে

    সঞ্জয়ের প্রাত্যহিক প্রভাতি সংবাদ পরিক্রমায় দুঃসংবাদের ঘনঘটা। মহারাজ উদ্বিগ্ন। অথচ অন্তঃপুরে ধর্ম মতি রানি বলছেন এ অন্যায় যুদ্ধ। শতপুত্রে সমর্পিত প্রাণ রাজা ধৃতরাষ্ট্র উত্যক্ত হয়ে বললেন "কী দিবে তোমারে ধর্ম?"

    মহারানি গান্ধারী বলেছিলেন, "দুঃখ নব নব"।

    ধর্ম তাই যাকে ধারণ করা যায়।

    যে ধর্মটি ধারণ করে ইহুদিরা ইউরোপে উপনীত হলেন, তা নিয়ে মহাদেশের বেশির ভাগ মানুষের কোন মাথা ব্যথা ছিল না। ঈশ্বর প্রতিশ্রুত দেশ থেকে বহিষ্কারের পরে ভূমধ্যসাগরের তীর ধরে মিশর মরক্কো হয়ে বহু ইহুদি যখন দ্বিতীয় শতাব্দীতে আইবেরিয়া (স্পেন ও পর্তুগাল) পৌঁছুলেন এবং আরও কয়েক দল গ্রিস পেরিয়ে মধ্য ইউরোপে হাজির হলেন, ইউরোপ তখন নানান পাথর ও পুতুলের বন্দনা করে। ঈশ্বর পুত্রের নাম বা তাঁর হত্যাকারীদের নাম পাতা কিছুই জানে না। রবিবারে গিরজেয় হাঁটু গেড়ে ভজনা করা তো অনেক দূরের কথা। সুদূর আরমেনিয়ার (বিশ্বের প্রথম খ্রিস্টান দেশ) পরে রোম তৃতীয় এবং আয়ারল্যান্ড চতুর্থ শতাব্দীতে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। আজকের কট্টর ক্যাথলিক পোল্যান্ডে পোপ সম্মানিত হবেন হাজার সাল নাগাদ। শেষ ইউরোপিয়ান দেশ হিসেবে লিথুয়ানিয়া খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করবে ১৩শ শতাব্দীতে। তার অনেক আগেই ইউরোপীয় ইহুদিদের স্বর্ণযুগ দেখা গেছে স্পেনে। মুসলিম রাজাদের দরবারে ইহুদিরা পেয়েছিলেন উচ্চাসন। দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্পে ইহুদিদের অবদান অসামান্য। হিব্রুর পাশা পাশি আরবি ও ল্যাটিন শিখেছিলেন। ভারত থেকে যে জ্ঞান আরব দুনিয়া সঞ্চয় করেছিল তার সঙ্গে ইহুদিরা ইউরোপের পরিচয় করালেন ল্যাটিনের মাধ্যমে। পোপের বারণ ছিল বলে খ্রিস্টানরা আরবি শেখেন নি।

    খ্রিস্ট ধর্মের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ইহুদিদের দুর্দিন শুরু হল। গ্রামের চাষা ভুষো একদিন রবিবারে গিরজে থেকে বেরিয়ে পাড়ার ইহুদিদের শাসাল – আমরা সবে জানলাম তোমরা আমাদের প্রভুকে মেরেছো। এবার আমার একদিন কি তোমার একদিন। ইহুদি বৃদ্ধ বোঝাতে চাইলেন আমরা সবাই একটি গাঁয়েই থাকি, এই আমাদের একটি মাত্র সুখ! একসঙ্গে বড়ো হয়েছি। কবে কোন দূর দেশে কি ঘটেছে তাতে আমার বা আমার পরিবারের কোন হাত ছিল না। আজ আবার এ নিয়ে লড়াই ঝগড়া কেন? সে কেস তো এতদিনে তামাদি হয়ে গেছে!

    পরবর্তী হাজার বছর ধরে ইহুদি পেটানো, পোড়ানো এবং খ্যাদানো এক জনপ্রিয় ক্রীড়ায় পরিণত হয়েছে। যিশু খ্রিস্টকে ক্রুসে চড়ানোর অপরাধের কলঙ্ক ইহুদিদের মাথায় লাগানো রইল। তার ওপরে ইউরোপের গ্রামে গঞ্জে পাড়ায় পাড়ায় কেউ রটিয়ে দিলো ইহুদিরা খ্রিস্টান শিশুর রক্ত দিয়ে তাদের পুজো আচ্চা করছে (ব্লাড লাইবেল) অথবা তারাই ভয়ঙ্কর প্লেগের (ব্ল্যাক ডেথ) কারণ। আম জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে লাঠি সোঁটা নিয়ে ইহুদি হত্যায় লেগে গেলো।

    খুন কা বদলা খুন।

    নাৎসিরা কোনমতেই এই খেলাটির পেটেন্ট দাবি করতে পারে না।

    বরং ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার মত আরেকটি নতুন ক্রীড়া উদ্ভাবনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ইংল্যান্ডের প্রাপ্য। জাতি ধর্ম দিয়ে চিহ্নিত করে কি ভাবে একটা গোটা টিমকে রেড কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করা যায় সে খেলা দেখাল ইংরেজ। সিনাগগ বন্ধ হয়েছে, আত্ম পরিচিতির জন্য ইহুদিদের বিশেষ ব্যাজ পরা আবশ্যক (সাড়ে ছশো বছর বাদে নাৎসিরা এঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করবে)। লন্ডন উইনচেষ্টার ব্রিসটলের হাটে মাঠে অনেক ইহুদি নিধন কাণ্ডের পরে একদিন, ১২৯০ সালে, রাজা এডওয়ার্ড আদেশ দিলেন সব জমি জমা সম্পত্তি ফেলে রেখে ইংল্যান্ডের ইহুদি যেন ক্যালের নৌকো বা ডিঙ্গি ধরেন। দুষ্ট লোকে বলে রাজার কোষাগারে টাকা কম পড়েছিল, তাই তিনি ইহুদিদের ধন বাজেয়াপ্ত করেন। ইহুদি প্রাণে বাঁচলেন বটে তবে ইংল্যান্ড ইহুদি মুক্ত হল (জার্মানে ইয়ুডেনরাইন বা ইহুদি শূন্য – নাৎসিরা অবিশ্যি তাদের শুধু ইউরোপ নয়, গ্যাস চেম্বারের সহায়তা নিয়ে আরও দূরে পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন)।

    তার দেড় হাজার বছর আগে ইহুদিরা ব্যাবিলনে নির্বাসিত হন। প্রথম শতাব্দীতে রোমানরা তাদের তাড়ায় ইজরায়েল থেকে। সভ্য ইউরোপে এ হেন গন বিতাড়নের ট্র্যাডিশন সৃষ্টি করলো ইংরেজ।

    প্রসঙ্গত, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প একটি ইংরেজ আবিষ্কার। ১৮৯৯ সালে দ্বিতীয় বুওর যুদ্ধের সময় দক্ষিণ আফ্রিকার এগারোটি শহরে সে ক্যাম্প তৈরি করে ইংরেজরা। জার্মানরা পরে এই ব্লু প্রিন্টটির ওপরে খোদকারি করে তাঁদের সহজাত বুদ্ধিমত্তা সহকারে আরও উন্নত মডেল বানান।

    আকাশচুম্বী পারানির কড়ি দিয়ে তিন হাজার ইহুদি একবস্ত্রে চ্যানেল পেরুলেন। লন্ডন নগরীর জন সংখ্যা তখন মেরে কেটে চল্লিশ হাজার।

    সাড়ে তিনশ বছর বাদে অলিভার ক্রমওয়েল আবার ইহুদিদের আমন্ত্রণ জানাবেন। এসো আমার দেশে এসো। তাঁদের উত্তরসূরিদের দেখেছি আমার পাড়ায়, গোলডারস গ্রিনে, ব্যবসায়িক সাথী হিসেবে লন্ডন সিটিতে।

    চ্যানেলের ওপারে সে সময় প্রায় লাখ খানেক ইহুদি বাস করেন, বেশির ভাগ পূবে, আলসাস লরেনে। নবাগত ইহুদিদের কেউ এক গ্লাস জল বা বিয়ার (চা বা কফি ইউরোপে আসতে চারশ বছর দেরি আছে) এগিয়ে দিয়ে " সোআইয়ে বিয়াঁভেনু " বলে আপ্যায়িত করেন নি। ফরাসি রাজা ফিলিপ মোটেও ইহুদি দরদী ছিলেন না। ইহুদিদের মহাজনী ব্যবসায়ের এলেমটা কাজে লাগাতেন। ইতিমধ্যে খোদ প্যারিস শহরে কুড়িটা ঘোড়ার গাড়ি ভর্তি ইহুদিদের পবিত্র ধর্ম পুস্তক তোরা পোড়ানো হয়েছে। অনেক বছর পরে জার্মানরা সেই পদ চিহ্ন ধরে বই পোড়াবেন বার্লিন হুমবোল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের চত্বরে। তবে ততদিনে ইহুদিরা নিজেরাই অনেক লিখে ফেলেছেন। ফলে আরও বেশি বই পোড়াতে হয়।

    ফ্লেমিশ যুদ্ধে বহু অর্থব্যয় করে ফিলিপ প্রায় দেউলে হয়েছেন। টাকার চিন্তা মাথায় ঘুরছে। এমন সময়ে জাত শত্রু ইংরেজের ইহুদি সম্পত্তি আত্মসাৎ করে ভাগিয়ে দিয়ে তাদের ধন দৌলৎ সম্পত্তিকে একটি এ টি এম হিসেবে ব্যবহার করার টেকনিকটি আগ্রহ সহকারে লক্ষ করছিলেন ফরাসি রাজা ফিলিপ।

    ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন না হোক ফুটবল খেলাটা ফরাসিরা ইংরেজের কাছ থেকে নিয়েছে। ফেসবুকের সাহায্য ছাড়াই ফরাসি গোয়েন্দাদের অদ্ভুত কৃতিত্ব বলে দেশের এক লক্ষ ইহুদিকে একই দিনে গ্রেপ্তার করে ফুটবলের মত কিক মেরে আপন দেশের সীমা থেকে বহিষ্কৃত করলেন। তার আগে অবিশ্যি বলের হাওয়া মানে ইহুদিদের যাবতীয় অর্থ সম্পদ রাজকোষে ভরলেন। ইউরোপের ইতিহাসে কোন জাতির দ্বিতীয় সামগ্রিক বহিষ্কার। ইংল্যান্ড কাল যা ভেবেছে ফ্রান্স ভাবল বিশ বছর বাদে।

    রাইন পেরিয়ে ইহুদিরা হাঁটলেন পুব দিকে।

    প্রায় পাঁচশ বছর বাদে, ফরাসি বিপ্লবের দু বছর বাদে ফ্রান্স ইহুদিদের প্রথম পূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করবে। ইজরায়েল এবং আমেরিকার পরেই আজ সবচেয়ে বেশি ইহুদির বাস ফ্রান্সে।

    গ্রামে গঞ্জের মানুষ ইহুদি মেরেছে ধর্মের নামে। আপন ধর্মে যোগদানের আহ্বান জানায় নি। রাজারা ইহুদি পোষণ এবং বিতাড়ন করেছেন অর্থের কারণে। ধর্মের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিল না। ওয়াল স্ট্রিট ছবিতে গরডন গেকো রূপী মাইকেল ডগলাসের সেই অমর সংলাপ মনে করুন –, অর্থটাই সার, বৎস। বাকিটা বাগাড়ম্বর (ইট ইজ দি বাক কিড। রেস্ট ইজ কনভারসেশান)।

    পুরো আখ্যানটা বদলে গেল পঞ্চদশ শতাব্দীতে। এবার এক রাজা ও রানি নামলেন ধর্মান্তকরনের, ধর্ম শোধনের মহান উদ্দেশ্যে।

    স্পেন তখন দুটি রাজ্যে বিভক্ত- কাস্তিল (মাদ্রিদ সহ বিশাল মধ্যাঞ্চল) এবং আরাগন (বার্সেলোনা সহ আজকের কাতালুনিয়া)। সতেরো বছর বয়েসি কাস্তিলের রাজা ফারদিনান্দের সঙ্গে আরাগনের আঠারো বছরের ভাবী রানি ইসাবেলার বিবাহে স্পেন ইতিহাসে প্রথম একত্র হল।মুসলিম শাসন অবসানের কাজ সম্পূর্ণ হলে এঁরা ব্রতী হলেন আর এক মহান কাজে- স্পেনকে যথার্থ ক্যাথলিক হতে হবে। পোপ ফরমান দিলেন- এগিয়ে যাও, চরৈবেতি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নাও। জনগণ ক্যাথলিকের রীতি রেওয়াজ মেনে চলছে কিনা তার খবরদারি করো। চল্লিশ দিন যাবত চলবে সে পর্যবেক্ষণ ও সাক্ষ্য গ্রহণ। রীতি অমান্য করলে শাস্তি দাও।

    কিছু সাময়িক বিবাদ সত্ত্বেও মুসলিম শাসনে আইবেরিয়া ছিল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতীক। খ্রিস্টান মুসলমান ইহুদি পাশা পাশি বাস করেছেন কয়েকশ বছর। চিত্র কলা বিজ্ঞান দর্শনে অভাবনীয় প্রগতি দেখা গেছে। মুসলিম রাজাদের বিতাড়নের পরে ফারদিনান্দ ইসাবেলা শুধু স্পেনকে একত্র করলেন না, ধর্মের বিশুদ্ধতার জন্য শুরু করলেন এক মহাযজ্ঞ - তার নাম স্প্যানিশ ইনকুইজিশন বা জেরা/ তদন্ত। সেটি চলবে সাড়ে তিনশ বছর ধরে। ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সন্ত্রাসের চলচ্চিত্র। মানুষের প্রতি মানুষের নির্মম অত্যাচার, বিনা বিচারে জেলে পোরা, মানুষকে টঙে বেঁধে আগুন লাগানো, পড়শির সঙ্গে পড়শির শত্রুতা, শহরে শহরে স্টেজ বেঁধে মানুষ পোড়ানো।

    এই সাড়ে তিনশ বছরে পৃথিবী পেয়েছে শেক্সপীয়ার, নিউটন, কোপারনিকাসকে, গুটেনবেরগের ছাপাখানা। দেখেছে প্রথম শিল্প বিল্পব। খোদ ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন মারটিন লুথার। অবাক বিস্ময়ে মানুষ দেখেছে মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল, বত্তিচেলিকে।

    স্পেন লেগে রইল ক্যাথলিক ধর্ম পরিশোধনে।

    ফরাসি বিপ্লবের সন্ত্রাস রাজ (রেইন অফ টেরর) এক বছর চলে, নাৎসিদের তাণ্ডব বারো বছরের।

    বাকি ইউরোপে সমানে চলেছে ইহুদি বয়কট, বিদ্বেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ নিষেধ। সরকারি চাকরি মেলে না। অবস্থা যথা পূর্বং। কিন্তু স্পেনে তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট হল রাত্রি দিনের সরকারি সন্ত্রাস যা নাৎসিরা আরও দক্ষ হাতে প্রয়োগ করবে একদিন (নাখট উনড নেবেল)।

    তথ্যের খাতিরে বলা আবশ্যক স্প্যানিশ ইনকুইজিশন কাউকে রেয়াত করে নি। ক্যাথলিক বলেই ছাড়ান নেই - কতটা ক্যাথলিক তার পরীক্ষা দেওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। সবচেয়ে বেশি কোপে পড়লেন মুসলিম এবং ইহুদি। স্পেন থেকে ইসলামিক শাসন নির্মূল হবার পরে দেশের মুসলিম জনগণকে বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হল - তাদের নাম মরিসকো। যারা ক্যাথলিক হতে অরাজি ছিলেন তাঁদের পিটিয়ে উত্তর আফ্রিকায় পাঠানো শুরু হল। স্পেনের দক্ষিণে জিব্রালটার থেকে মরক্কোর তট দেখা যায়! তাই সেই ক্ষীণ জলরাশি টুকু পার হতে সংশয় থাকার কথা নয় মুসলিমদের! অবশ্যই তাদের ফেলে যেতে হল ঘর সম্পত্তি। এ সবই ঈশ্বর পুত্রের নামে – যে বা যারা তাঁর অপার করুণা গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক তাদের শাস্তি নির্বাসন বা মৃত্যু।

    স্পেনের সেভিল (ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো এবং সুন্দর স্কোয়ার দেখেবন সেখানে) বা করডোবা বেড়াতে গেলে সেখানকার বিশাল ক্যাথিড্রাল দুটো খুঁটিয়ে দেখুন- এক সময় মসজিদ ছিল, এখন ফরম্যাট বদলে গিরজে।এককালের কনস্টানটিনোপল আজকের ইস্তানবুলে পাবেন বিশ্বের বৃহত্তম গিরজে, হায়া সোফিয়া আজ মসজিদ।

    ১৪৯২ সালের ৩১শে মার্চে প্রকাশিত আল হামবরা ঘোষণায় হাজার বছর যারা স্পেনে বাস করেছেন সেই ইহুদিদের দেওয়া হল দুটি বিকল্প, চার মাসের মধ্যে বেছে নিন - ধর্ম না দেশত্যাগ করবেন। এক লক্ষ ধর্ম আঁকড়ে দেশত্যাগ করলেন। কিছু গেলেন উত্তর আফ্রিকায় (প্রসঙ্গত, তিউনিসিয়ার বর্তমান ট্যুরিজম মন্ত্রী একজন ইহুদি - রেনে ত্রাবেলসি)। প্রাণ হারালেন অনেকে। কিন্তু সন্দেহ দেখা দিল দু লক্ষ ধর্মান্তরিত ইহুদিকে নিয়ে, যাঁদের বলা হতো কনভেরসো (প্রায় এই নামের একটা জুতো বিক্রি হয় আজকাল)। ঘরে ঘরে গিয়ে তদন্ত শুরু হল। এই ধর্মান্তরিত ইহুদিরা কি শুক্রবার রান্না করে রেখে শনিবারে সেটা খান? শনিবারে সাবাথ মানেন? শুয়োর খান? না খেলে ক্যাথলিক হবেন কি করে? লিস্টি লম্বা।

    আল হামবরা ঘোষণার ঠিক চার মাস বাদে ৭ই আগস্ট স্পেনের পালোস ডে লা ফ্রন্টেরা থেকে নিনিয়া, পিনটা ও সান্টা মারিয়া নামের তিনটি জাহাজ ছাড়ল ভারতের সন্ধানে, পশ্চিম দিগন্ত অভিমুখে। সেই অভিযানের নেতা জেনোয়া বন্দরের একজন ধর্মান্তরিত ইতালিয়ান ইহুদি।

    ক্রিসটোফো কলম্বো। তাঁকে আমরা ক্রিসটোফার কলাম্বাস নামে চিনি।

    তরকেমাদা নিযুক্ত হলেন ইনকুইজিশনের অধ্যক্ষ হিসেবে। দু পুরুষ আগে তাঁরা ধর্মান্তরিত হয়েছেন।রাজা রানির আদেশে তিনি এই যজ্ঞের মহা পুরোহিতের স্থান নিলেন। ইনকুইজিশন চলল শুধু স্পেনে নয়, পরবর্তী কালে নেদারল্যান্ড সহ দক্ষিণ আমেরিকার সমস্ত স্প্যানিশ কলোনিতে। এই ভয়ানক ধর্ম সংস্থাপনা ও সংশোধন কাণ্ড যিনি শেষ অবধি থামালেন তিনিও ক্যাথলিক। নাপোলেওঁ বোনাপার্ট। স্পেনের দখল নিয়ে রুখলেন এই বর্বরতা। নাপোলেওঁ ভেঙ্গে দেন মিলান সহ ইউরোপের অনেক ইহুদি ঘেটোর দেওয়াল – তাঁদের আড়াল বা আলাদা করে রাখার তত্ত্বে হানলেন আঘাত। এক সশক্ত রাজ প্রতিবাদ। একছত্র সম্রাট ছিলেন তবে নানা বিষয়ে তাঁর সদিচ্ছার অভাব ছিল না। ওয়াটারলু যুদ্ধে তাঁর পরাজয়ের পরে ইউরোপ ফিরে গেল আগের শতাব্দীতে। ইনকুইজিশন আবার শুরু হল। সে স্প্যানিশ জলতরঙ্গ রুধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ?

    ১৯৬৮ সালে সদাশয় স্প্যানিশ একনায়ক জেনেরালিসিমো ফ্রাংকো নিতান্ত করুণা পরবশ হয়ে ইনকুইজিশনের ফরমানটি সরকারি ভাবে প্রত্যাহার করেছেন। পাঁচশ বছরের সন্ত্রাস শেষ হল। সম্প্রতি জানা গেছে স্পেনের ঠিক কোথায় বাড়িঘর ছিল প্রমাণ করতে পারলে সেই ভাগিয়ে দেওয়া ইহুদিদের স্প্যানিশ পাসপোর্ট দেওয়া যেতে পারে। জায়গা জমি ফেরানোর প্রশ্ন তাঁরা যেন না তোলেন।

    বাকি ইউরোপে এসেছে নতুন ভোরের আলো - রেনেসাঁ, রিফরমেশন। উপনিবেশের লুণ্ঠিত ধনের ব্যবহারে তৎপর ইউরোপের শ্রীবৃদ্ধি। কিন্তু সে জগত খ্রিস্টানের। মহাজনী, পুরনো কাপড়ের ব্যবসায়ী ইহুদির পক্ষে বিজ্ঞান দর্শনের পাঠশালায় বা সরকারের উচ্চপদে আসীন হবার সুযোগ নিতান্ত সীমিত অথবা একেবারে নিষিদ্ধ।

    একটি মাত্র পথ খোলা – ধর্মান্তকরন। জাদু মন্ত্র বলে চিচিং ফাঁকের মতো দরোজা খুলে যেতে পারে যদি ইহুদি তার আপন ধর্ম ত্যাগ করে প্রভু যিশুর শরণাপন্ন হন।

    হাইনরিখ হাইনে বলেছিলেন " ইউরোপের সভ্য সমাজে প্রবেশ পেতে গেলে ইহুদির যে পাসপোর্ট প্রয়োজন তার নাম ধর্মান্তকরন।"

    এক সময়ে ধর্মান্তকরন হয়েছিল রাজাদেশে, অস্ত্রবলে। এবার স্বেচ্ছায়। আপন ভবিষ্যতের ভাবনায়।

    ইহুদি খুঁজে পেলো আরেক কৌতুকের মাল মশলা।

    পুঃ-
    কার্ল মার্ক্সের জন্মের আগেই তাঁর পিতা ট্রিয়ার শহরের আইনজীবী ও কয়েকটি আঙ্গুর ক্ষেতের মালিক হ্যারশেল মার্ক্স ইহুদি ধর্ম ত্যাগ করে প্রাশিয়ান ইভাঞ্জেলিকাল বা প্রটেস্টাণ্ট ধর্ম ও হাইনরিখ নাম গ্রহণ করেন। কার্ল মার্ক্স প্রটেস্টাণ্ট পরিবারে জন্মেছিলেন। খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন ছ বছর বয়েসে।



    **********


    চার জন ধর্মান্তরিত ইহুদির বাক্যালাপ।

    আভ্রাম : আরিয়েল, তুমি খ্রিস্ট ধর্ম নিলে কেন?
    আরিয়েল : আভ্রাম, স্কুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ছাত্র ছিলাম। সোনার মেডেল পেয়েছি। তাতে কি? বুঝলাম ভালো চাকরি পেতে গেলে ধর্ম বিসর্জন দিতে হবে।
    আভ্রাম : অবশ্যই। ইলান, তোমার কারণটা কি?
    ইলান : কি আর বলব? সেন্ট পিটারসবুরগের এক রাশিয়ান সুন্দরীর প্রেমে পড়ে গেলাম। তার পরিবার অর্থোডক্স খ্রিস্টান। ইহুদি ছেলের সঙ্গে তার পরিবার কখনোই বিয়ে দেবে না। অগত্যা।
    আভ্রাম : হৃদয়ের কারনে! আচ্ছা ময়শে তুমি কেন কেরেস্তান হলে?
    ময়সে : আভ্রাম, আমি যিশু খ্রিস্টের প্রতি গভীর বিশ্বাসে ইহুদি ধর্ম ত্যাগ করেছি।

    বাকি তিনজন সমস্বরে :
    দোহাই, ময়সে, আমাদের কাছে অন্তত বাজে কথা বোলো না। এই গল্পটা গোইমদের শুনিও (ইহুদিরা খ্রিস্তনাকে বলেন গোয়, বহুবচনে খ্রিস্টানকে গোইম)।

    পু: কি ভাগ্যে আমার স্ত্রীর অর্থোডক্স খ্রিস্টান পরিবার এহেন দাবি করেন নি। আমরা আপন ধর্ম নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিরাজমান।

    **********


    প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ। রাশিয়ান ফ্রন্ট।

    চুরুট মুখে বারুদের স্তূপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে হুগো। অস্ট্রিয়ান কমান্ডার ধমক দিলেন।
    - এখানে সিগারেট চুরুট খাওয়া মানা। এখুনি নেভাও!
    হুগো : কেন, আজ শনিবার, সাবাথ বলে? এই সব কুসংস্কার আমি ইহুদি ধর্মের সঙ্গেই পরিত্যাগ করেছি।

    **********


    বেশির ভাগ খদ্দের খ্রিস্টান। ইহুদি দরজি বুঝলেন ব্যবসা বাড়াতে গেলে তাদের ধর্মটাই নেওয়া দরকার। তিনি গেলেন স্থানীয় ক্যাথলিক পাদরির কাছে। আনন্দ সহকারে খ্রিস্ট ধর্মের রীতি রেওয়াজ বোঝালেন পাদরি এবং সবশেষে জানতে চাইলেন ধর্ম পরিবর্তনের পরে তিনি কি নামে পরিচিত হতে চান।

    দরজি : আমার নাম দিন স্টেফান বাতোরি। পাদরি : আর কোন নাম পেলেন না? স্টেফান বাতোরি ছিলেন এক সম্মানিত পোলিশ রাজা, ট্রানসিলভানিয়ার রাজকুমার, লিথুয়ানিয়ার গ্র্যান্ড ডিউক! খ্রিস্ট ধর্ম না হয় নিলেন কিন্তু এতো বড়ো মানুষের নাম নেওয়াটা কি ঠিক হবে?
    দরজি : শুনুন ফাদার। আমার এখনকার নাম সলি ব্রনস্টাইন। ধর্ম বদলাচ্ছি। তাই বলে আমার শার্টের, টাইয়ের আর রুমালের মনোগ্রাম বদলাতে চাই না।

    **********


    খাইম তার হাতঘড়ি বন্ধক রেখেছে গ্রামের ধর্মান্তরিত ইহুদি শ্নাইডারের কাছে। খাইম ঘড়িটা উদ্ধার করার রাস্তা খুঁজে বের করল। মধ্যরাতে শ্নাইডারের বাড়ির দরোজায় তুমুল করাঘাত।

    শ্নাইডার : কি ব্যাপার? এতো রাতে?
    খাইম : আমার হাতঘড়িটা আপনার কাছে বাঁধা আছে। এখন কটা বাজে জানতে চাই। ঘড়িটা দিন।
    শ্নাইডার : সময় জানবার জন্যে এতো রাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলেছো? তোমার বাড়ির সামনে আমাদের প্রভু যিশু খ্রিস্টের ভজনা মন্দির দেখতে পাও না? তার চুড়োয় যে পেল্লায় ঘড়ি আছে সেটা সময় জানিয়ে প্রতি ঘণ্টায় বাজে।
    খাইম : আমি ইহুদি। আপনার নতুন প্রভুর সময় জ্ঞানে আমার বিশ্বাস নেই।

    **********


    ব্লাউ এবং গ্রুনের সময়টা ভালো যাচ্ছে না। দু জনে মিলে ভেবে চিন্তে ঠিক করল খ্রিস্ট ধর্ম নেওয়াটা ব্যবসার কারণে যুক্তিযুক্ত হবে। তারা খুঁজতে বেরিয়েছে কোন গিরজেতে কম খরচায় তাড়াতাড়ি ধর্মান্তরিত হওয়া যায়। ব্লাউ তখনো একটু ইতস্তত করছে কিন্তু গ্রুন একটি গিরজেতে বেশি চাঁদা দিয়ে আধ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাপটাইজড হয়ে বেরিয়ে এলো। ব্লাউ গিরজের বাইরে দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে।

    ব্লাউ : কি দিয়ে ব্যাপ্টিজম হলো? মাথায় জর্ডান নদীর নামে কলের না রাইনের জল ছুঁড়ে দিয়ে?
    গ্রুন : তুমি চুপ করো, অবিশ্বাসী ইহুদি!

    **********


    গোল্ডস্টাইন খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
    রাস্তায় রাব্বির সঙ্গে দেখা। খানিকটা অপরাধবোধ জেগে উঠল মনে।

    গোল্ডস্টাইন: বিশ্বাস করুন রাব্বি, অন্তরে আমি এখনো ইহুদি!
    রাব্বি : আর বাইরে?

    পুঃ প্রখ্যাত পোলিশ- আমেরিকান ইহুদি লেখক ইতঝাক বাশেভিস সিঙ্গার বলেছেন- ইহুদি চেহারা এমনি মার্কা মারা যে তা থেকে পলায়নের পথ নেই! ধম্ম যাই নাও না কেন তোমার লম্বা নাক জানিয়ে দেবে তুমি ইহুদি।

    **********


    জার্মানিতে বাইরয়েথ সঙ্গীত উৎসবের সঙ্গে রিচারড ভাগনারের নাম অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িত। একদিকে তিনি নাৎসি সমর্থক এবং কট্টর ইহুদি বিদ্বেষী। অন্যদিকে বহু ইহুদি বাদক এবং কন্ডাক্টরকে এনেছেন এই উৎসবের কেন্দ্রে। একজন ধর্মান্তরিত ইহুদি এই দুই সার্কেলেই ঘোরাঘুরি করেছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় আপাত পরস্পর বিরোধী এই দুই দলের মানুষজন তাঁকে কি ভাবে দেখে।

    তাঁর উত্তর : খ্রিস্টানদের কাছে আমি একমাত্র ইহুদি আর ইহুদিদের মধ্যে একমাত্র গোয় বলে বিবেচিত হই!

    **********


    আদালতে

    বিচারক : ধর্ম?
    ইলান : প্রটেস্টান্ট।
    বিচারক : তার আগে?
    ইলান : ক্যাথলিক।
    বিচারক: তার আগে?
    ইলান : সঠিক ধর্ম।

    **********


    শোনা গেলো ফ্রাঙ্কফুরটার খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করবেন। কেউ তা নিয়ে প্রশ্ন বা নিন্দা করার আগেই আপন পক্ষ সমর্থনে তিনি জানান দিলেন-
    - কি আর করতে পারি? আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফিঙ্কেলস্টাইন খ্রিস্টান হয়েই জানিয়ে দিয়েছে সে আর ইহুদিদের সঙ্গে কোন ব্যবসা করবে না।

    **********


    ডক্টর নাথানসন ব্যাপ্টিজমের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর অফিসের খ্রিস্টান কর্মীদের কাছে জানছেন বিধি বিধান। একদিন তিনি তাঁর ম্যানেজার উলফকে ধরলেন।

    নাথানসন : আচ্ছা এই ব্যাপ্টিজমের সময়ে কি ড্রেস পরতে হয় উলফ?
    উলফ : আমি কি করে জানব? আমাদের সময় ন্যাপি পরানো হতো।

    **********


    বিচারক : নাম?
    বাদী : ফাইনস্টাইন।
    বিচারক : ধর্ম?
    বাদী : প্রটেস্টাণ্ট।
    বিচারক: পেশা?
    বাদী : ইহুদি বস্ত্র ব্যবসায়ী।

    **********


    এক সম্মেলনে নানান ধর্মের প্রতিনিধিরা একাসনে বসে তাঁদের আপন রীতি রেওয়াজ জানাচ্ছেন। শ্রোতাদের মধ্যে থেকে একজন জানতে চাইলেন শনি বা রবিবারে চার্চে, সিনাগগে যে চাঁদা জমা হয় সেটির বিতরনের প্রক্রিয়াটি কি। কতটা যায় ঈশ্বরের বা জনগণের সেবায় আর কতটা যায় ধর্ম প্রতিষ্ঠানের পকেটে।

    প্রটেস্টান্ট যাজক : আমি গিরজের মেঝেতে খড়ি দিয়ে একটা লাইন টানি। তারপর সংগ্রহের সব অর্থ ছুঁড়ে দিই সেদিকে।যা সেই চকের দাগের বাঁ দিকে পড়ে সেটা ঈশ্বরের পাওনা, ডান দিকে যা পড়ে সেটা আমার।
    ক্যাথলিক ফাদার: আমি চক দিয়ে একটি বৃত্ত আঁকি মেঝেতে। তারপরে সব টাকা ওপরে ছুঁড়ে দিই। বৃত্তের ভেতরে যা পড়ে তা ঈশ্বরের। বাইরে যা পড়ে সেটা আমার।
    ইহুদি রাব্বি : আমরা এটির সহজ সমাধান করেছি। সংগ্রহের সব টাকা পয়সা গয়না জহরত ছুঁড়ে দিই আকাশের দিকে। ঈশ্বর যেগুলি ধরে ফেলেন সেটি তাঁর প্রাপ্য। বাকিটা আমার।

    **********


    ভিয়েনার বিখ্যাত উকিল ফেনিগস্টাইন ধর্মান্তরিত হবেন। বাজারে হই চই পড়ে গেল এই নিয়ে যে তিনি ক্যাথলিক নয় প্রটেস্টান্ট ধর্ম গ্রহণ করবেন। অস্ট্রিয়াতে ক্যাথলিক সংখ্যা গরিষ্ঠ, সম্রাট ক্যাথলিক। তাহলে ফেনিগস্টাইন প্রটেস্টাণ্ট হবেন কেন?

    তাঁর উত্তর –
    - ভিয়েনার ক্যাথলিকদের মধ্যে বড্ড বেশি ইহুদি ঢুকে পড়েছে!

    **********


    নাথান সদ্য ধর্মান্তরিত হয়েছে।
    এক মাসের মধ্যেই সে ক্যাথলিক ফাদারের কাছে স্বীকারোক্তি দেবার জন্য হাজির – দশ আদেশের ষষ্ঠ আদেশ (ব্যভিচার কোরো না) লঙ্ঘন করেছে।

    ফাদার : কতবার?
    নাথান : আমার শিকারের সংখ্যা জেনে আপনার বা ঈশ্বরের কি লাভ? ফাদার, আমি এসেছি হাঁটু গেড়ে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাইতে। কাসানোভা সেজে নাম কামাতে নয়!

    **********


    ওয়ারশ থেকে লুবলিনের ট্রেনে একজন ক্যাথলিক ফাদার ও একজন রাব্বি গল্পে মেতে উঠেছেন। একসময়ে ফাদার তাঁর টিফিন বাকসো খুলে খাবার বের করলেন। রাব্বিকে অফার করলেন হ্যাম স্যানডউইচ।

    রাব্বি : ধন্যবাদ ফাদার। কিন্তু মার্জনা চাই। ওটা খাওয়া যাবে না। ধর্মের বারণ।
    ফাদার: আপনারা ইহুদিরা এই সব অন্ধ সংস্কার কবে ত্যাগ করবেন বলুন তো?
    রাব্বি : আপনার বিবাহ উৎসবের দিনে, ফাদার!

    **********


    ওয়াইনস্টাইন সপরিবারে ধর্মান্তরিত হয়েছেন।
    তা জেনেও ইহুদি শ্মুল আইগেলব তাঁর কন্যা রিফকাকে বিয়ে করতে চায়। এতে ওয়াইনস্টাইনের সম্মতি নেই।
    শ্মুলকে ডাকলেন।

    - শ্মুল, আমি এ প্রস্তাবে রাজি নই, রাজি হতে পারি না। এর কারণ দুটো। প্রথমত তুমি ইহুদি এবং আমরা ক্যাথলিক।দ্বিতীয়ত আমি জানি তোমার টাকা পয়সা নেই, তুমি একটি শ্নরার। লোকের কাছে চেয়ে চিন্তে দিন কাটাও। মনে রেখো, ভাবী জামাইয়ের আর্থিক অবস্থার বিবেচনা আমাদের, ইহুদিদের কাছে সবচেয়ে জরুরি।

    **********


    বার্লিন বিশ্ব বিদ্যালয়ের দর্শনের প্রখ্যাত অধ্যাপক আরন লাজারুসসন খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হলেন ১৮৫৩ সালে। নতুন নাম বেছে নিলেন – আডলফ লাসন।
    ছাত্র মহলে বলাবলি হল –লাজারুসসনকে কেটে লাসন বানালেন! সুন্নত করার অভ্যেসটি বজায় রইল!

    পুঃ অধ্যাপক লাসন হেগেলের দর্শন ও ধর্ম সংক্রান্ত চিন্তা ধারার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। উনবিংশ শতাব্দীর মুক্ত চিন্তার পুরোধা লাসন বলেন ধর্ম এবং দর্শনের মাধ্যমে আমরা অসীম অখণ্ডকে ধরতে পারি। তাঁর সুযোগ্য পুত্র গিওরগ লাসন হেগেলের লেখার সম্পাদিত সংস্করণ প্রকাশ করেন।

    **********


    নতুন গিরজে বানানো হবে। কন্ট্রাক্ট পেয়েছেন যে কোম্পানি তার মালিক এক প্রখ্যাত ইহুদি আর্কিটেক্ট। চার্চ কর্তৃপক্ষ ধর্ম সঙ্কটে পড়লেন।

    ফাদার : আপনি আমাদের গিরজে বানাবেন? আপনি যে অন্য বিশ্বাসের মানুষ!
    ইহুদি আর্কিটেক্ট : সেটা খানিকটা সত্যি, তবে পুরোটা নয়। যিশু ধর্ম প্রচার করেছেন, রুগীকে রোগমুক্ত করেছেন এতে আমি বিশ্বাস করি। তিনি মৃত মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এ কথায় আমার খ্রিস্টান ড্রাফটসম্যান বিশ্বাস করে। যিশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন তাতে আমি বিশ্বাস করি। আমার অন্য খ্রিস্টান কর্মীরা বিশ্বাস করে যিশু আবার বেঁচে ওঠেন। আমি বিশ্বাস করি যিশুর মায়ের নাম মেরি। তিনি কুমারী অবস্থায় যিশুর জন্ম দিয়েছেন সেটা আমার ড্রাফটসম্যান বিশ্বাস করে না। কিন্তু এই কন্ট্রাক্টের মূল্য বুঝে আমার আর্কিটেক্ট ফার্ম তাতে বিশ্বাস করে।

    **********


    আজ সেন্ট পিটার বেজায় ব্যস্ত।

    প্রটেস্টান্ট যাজক এসেছেন। পিটার বললেন "তুমি বাছা সৎ ভাবে জীবন যাপন করেছ মানুষের মঙ্গল করেছো। এই নাও ফোলকসভাগেন গাড়ির চাবি "।

    এবার ক্যাথলিক ফাদার পেলেন ক্রোমিয়াম প্লেট লাগানো ফোরড গাড়ি। প্রটেস্টান্ট যাজক বললেন, "এঁর খাতির বেশি কেন, সেন্ট পিটার?"
    পিটার বললেন, "ইনি চিরকুমার থেকেছেন। কোন প্রলোভনে বিভ্রান্ত হন নি। সে ত্যাগের পুরষ্কার এই গাড়ি। "

    রাব্বি লেভি হাজির হলেন নিজের রোলস রয়েস গাড়ি চালিয়ে।
    প্রটেস্টান্ট যাজক ও ক্যাথলিক ফাদার দুজনেই ক্ষুদ্ধ – "সেন্ট পিটার, ইনি তো চির কুমার থাকেন নি। কোন মহান কাজের জন্য তিনি এই রোলস রয়েসের অধিকারী হলেন? তার চেয়েও বড় কথা উনি এখানে কি করছেন? "
    সেন্ট পিটার ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে বললেন, "কিছু বলা যাবে না। এঁরা আমাদের প্রভুর আত্মীয়”।

    **********


    পোল্যান্ড

    বিয়ালিস্টকের ট্রেন

    কম্পারটমেনট খালি দেখে ইলান তার লম্বা কালো কোট খুলে রেখে সামনের সিটে পা তুলে বসেছে আরাম করে। পরের স্টেশনে একজন মানুষ উঠলেন। দেখে ইহুদি মনে হয় কিন্তু দারুণ স্যুট পরেছেন, রিমলেস চশমা, বুক পকেটে ঘড়ি, রুমাল। ইনি নির্ঘাত ধর্মান্তরিত ইহুদি!
    সন্ত্রস্ত ইলান সিট থেকে পা নামিয়ে বসল।
    খানিক পরে সেই ভদ্রলোক ইলানের পাশে খুলে রাখা কালো কোটের দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, " এবারে ইওম কিপ্পুর (ইহুদি পঞ্জিকায় সবচেয়ে পুণ্য দিন) কবে পড়েছে জানেন? ”
    নিশ্চিন্তে সামনের সিটে আবার পা দুটো তুলে দিয়ে ইলান বললে, "সামনের বুধবার "।

    **********


    হামবুর্গের এক ইহুদি ব্যাঙ্কার খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা নিলেন রবিবারে। গিরজে থেকে বেরিয়ে অবধি তিনি ভাবছিলেন এই খবরটা তাঁর অফিসের কর্মচারীদের কাছে কি ভাবে ভাঙ্গবেন। সোমবার সকাল সকাল বালিনডামের ব্যাঙ্কে গেছেন। হঠাৎ একটা আইডিয়া মাথায় এলো। অফিসের দরোজা খুলে সমবেত কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বললেন :

    - সুপ্রভাত, ইহুদিরা! (গুটেন মরগেন, ইহর ইয়ুডে!)।

    **********


    খ্রিস্টান রলফ এবং ইহুদি নাথানের বাক্যালাপ

    রলফ : আমার ছেলে ধার্মিক জিমনাসিয়ামে (ইহুদি মিদ্রাশ বা ইসলামিক মাদ্রাসার সমতুল্য) ভর্তির পরীক্ষা পাস করেছে।
    নাথান : তা সেখান থেকে পাস করে সে কি হতে পারে?
    রলফ : আমার ছেলে যাজক হতে পারে এমনকি কার্ডিনালও হতে পারে।
    নাথান : সে আর এমনকি!
    রলফ (রেগে) : কি মনে করো? ফেলনা নাকি? পোপও হতে পারে! তা তুমি কি চাও সে ঈশ্বর হবে?
    নাথান : কেন, আমাদের একজন তো তাই হয়েছিলেন!

    **********


    লটারির টিকিট পকেটে নিয়ে ইলান সিনাগগে মাথা ঠুকে যাচ্ছে।
    এই লটারির নম্বর লাগলে অর্ধেক টাকা দরিদ্র ইহুদি সাহায্য ফান্ডে দেব।

    নম্বর লাগল না। এবার ইলান গেছে গিরজেয়। সেখানে দুটো মোমবাতি কিনে সেই একই প্রার্থনা। জেতা টিকিটের অর্ধেক ভালো কাজে দান করবে। টিকিট লেগে গেলো।

    গল্পটা বন্ধু আরিয়েলকে শুনিয়ে ইলান বলল :
    দ্যাখ, খ্রিস্টানদের ভগবান ভালো। কেমন নম্বর মিলিয়ে দিলো! তবে কি জানিস, আমাদের ভগবান খুব চালাক। তিনি জানেন আমি এক পয়সা ঠেকানোর বান্দা নই!




  • | রেটিং ৫ (৩ জন) | বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৮৬১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • হীরেন সিংহরায় | ০৬ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩:১৪501809
  • সর্বশ্রী চতুর্ভুজ এবং অরণ্য 
     
    আপনারা দু জনেই সঠিক। দর্শন বেত্তা বন্ধু জানিয়েছেন - ধর্ম  যা আমাদের ধরে রাখে। মুদ্রকের হাতে যাবার আগে এই সংশোধন করে নেওয়া যাবে। 
     
    আপনারা সময় করে দেখেলেন এবং জানালেন বলে অসংখ্য ধন্যবাদ আবারো । 
  • Ranjan Roy | ০৭ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:২৭501821
  • হীরেনবাবু
       আপনি পুরোপুরি ভুল নন। আপনি ধাতু+ প্রত্যয় দিয়ে ধর্মের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন--যা ধারণ করে (অবশ্যই যাকে ধারণ করে নয়)।
       আর 'যাহা ধারণ করে তাহাই ধর্ম' --এটা হোল সমাসের ব্যাসবাক্য। যোগরূঢ় অর্থে সমাজের আচরণ বিধি, নিয়ম বা কোড অফ কন্ডাক্ট।  সেই জন্য মনুস্মৃতি থেকে পরাশর আদি সমস্ত স্মৃতিকে বলা হয় ধর্মশাস্ত্র। একাধারে আচরণবিধি , পাপ-পুণ্য এবং সিভিল ও ক্রিমিনাল কোড। তাই কোশার এবং খাবার দাবারের এর নিয়মকানুন ধর্মের এই ব্যবহারিক ও সামাজিক দিকের প্রতিফলন। ধর্মের দার্শনিক দিকটা  আলাদা, সেই মেটাফিজিক্স নিয়ে জনসাধারণের বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
    তাই চতুর্ভজের সংজ্ঞা এখানে টু দ্য পয়েন্ট।
    অর্থাৎ, ধর্মের দুটো সংজ্ঞা হতে পারে দুটো ব্যবহারিক ও দার্শনিক পক্ষ ভেদে।
    আমারও ভুল হতে পারে, এখুনি যা মনে এল উগরে দিলাম আর কি!
  • পাতা :
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন