• বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  ইদের কড়চা  ইদের কড়চা

  • প্রেম এবং বিভিন্ন ধারাবাহিক দৃশ্য সম্পর্কে

    সায়ন্তন চৌধুরী
    ইস্পেশাল | ইদের কড়চা | ২১ মে ২০২১ | ১৬৫৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • যেদিন পামেলা স্টুয়ার্ট আত্মহত্যা করে, তার প্রায় বছরখানেক আগে আমি তাকে প্রথম দেখি মন্ট্রিয়েল থেকে টরন্টো ফেরার ট্রেনে, যখন সে কামরার আপৎকালীন সুরক্ষাব্যবস্থাগুলো দ্বিতীয়বার ব্যাখ্যা করার জন্যে অন-ট্রেন সার্ভিস অ্যাটেনডেন্টকে অনুরোধ করছিল। অত্যন্ত নীচু গলায় পামেলা স্টুয়ার্ট জানতে চেয়েছিল কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে একজন সাধারণ যাত্রীর যে কর্তব্যগুলো করণীয়, এইমাত্র রেলের কর্মচারীটি যাত্রীদের সামনে যা তুলে ধরেছেন তাঁর নিখুঁত উপস্থাপনার মাধ্যমে, সেটা তিনি পামেলা স্টুয়ার্টের জন্যে আরেকবার ব্যাখ্যা করতে পারেন কিনা। যেহেতু আমার সিটের পাশে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছিল, আমি সবটাই স্পষ্টভাবে শুনতে পেলাম, আর তাই চট করে পামেলা স্টুয়ার্টের দিকে না তাকিয়ে পারলাম না, কেননা যাত্রী নিরাপত্তা সম্পর্কিত ঐ একঘেয়ে উপস্থাপনা কেউ যেচে দুবার শুনতে চাইবে এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। আমার অবাকভাবটা একলাফে তিনগুণ হয়ে গেল এই দেখে যে পামেলা স্টুয়ার্ট কোনো মৃত্যু ভয়ে ভীত বৃদ্ধা নয়, বরং উজ্জ্বল হলুদ স্কার্টপরা বছর সাতাশের এক সম্ভাবনাপূর্ণ যুবতী, যার নাম আমি তখনও জানিনা, জানব আরো কয়েকমাস পরে যখন দ্বিতীয়বার তার সঙ্গে দেখা হবে ডান্ডাস ও ইয়ঙ স্ট্রিটের ক্রসিংয়ে সিনেমাহলের বাইরে এবং তার বান্ধবী তাকে দূর থেকে তিনবার ডেকে সাড়া না পেয়ে পুরো নাম ধরে চিৎকার করবে: পামেলা স্টুয়ার্ট! এইভাবে কখনো ট্রেনে, কখনো সিনেমাহলের বাইরে, কখনো আর্ট গ্যালারিতে পামেলা স্টুয়ার্টের সঙ্গে আমার দেখা হবে কিন্তু কোনোবারই আমরা একটি অক্ষরও বিনিময় করব না, এবং বস্তুতপক্ষে কেবলমাত্র তার আত্মহত্যার খবর পাওয়ার পর আমি মনে মনে গুনে দেখব প্রথমবার ট্রেনে ও তারপর টরন্টো শহরের বিভিন্ন জায়গায় মোট সাতবার আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। জ্বোরো তুষারের আলোয় ঢেকে গিয়েছিল সেদিনের সকালটা, যখন পামেলা স্টুয়ার্টের ঠান্ডা নিথর শরীর, যা আমি কেবল কল্পনা করতে পারি, আবিষ্কৃত হয়েছিল ২৬৯ রিচমন্ড স্ট্রিটে তার দশতলার অ্যাপার্টমেন্টে; এই দৃশ্য আমি দেখিনি, যদিও দু’মাস পরে মার্চের এক বিকেলে যখন আমি হাঁটতে হাঁটতে পার্ক থেকে বাড়ি ফিরে আসছিলাম আর নীল কুকুরগুলো আমার পিছু নিয়েছিল নিঃশব্দে, সেইসময় প্রথমবার আমার চোখের সামনে স্পষ্ট ফুটে উঠল পামেলা স্টুয়ার্টের এলানো দেহটা তার বিছানায় লেপ্টে রয়েছে ছোটো ছোটো ম্যাপল লিফ প্রিন্টেড সাদা চাদরটার ওপর। এটা একটা বিভ্রম, আমি বুঝতে পেরেছিলাম সঙ্গে সঙ্গেই, কারণ জানলাটা খোলা ছিল। অথবা বিভ্রম নয়, কেননা আমি সঠিকভাবে এসে পৌঁছেছিলাম আমার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এবং দেখেছিলাম ভীত সন্ত্রস্ত মানুষেরা মুখে মাস্ক বেঁধে গ্রসারি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দূরত্ব বজায় রেখে দ্রুত হেঁটে ঘরে ফিরছে ছড়িয়ে-পড়া অতিমারীর আতঙ্কের ভেতর। সেইরাতে আমি পামেলা স্টুয়ার্টকে স্বপ্ন দেখি। তার রিচমন্ড স্ট্রিটের নির্জন অ্যাপার্টমেন্টে পামেলা জানলার ধারে বসে নগ্ন ও মসৃণ পা দুটোকে কুঁজো করে সিগারেট টানছিল। রাস্তার ওপারে আকাশচুম্বী বাড়িগুলোর মাথায় একটা অতিকায় গোল সূর্য বেলুনের মতো ভাসছে, আমি লক্ষ্য করেছিলাম। নীচে রিচমন্ড স্ট্রিটের ক্রোমিয়াম আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। সূর্যাস্তের কমলা রঙ পামেলার চুলে ও ঘাড়ে লেগে তার সিল্যুয়েটটাকে ফুটিয়ে তুলেছে। তার অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। তার ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা ঝিমঝিমে ইন্ডি রক প্লে-লিস্ট থেকে অশরীরী মূর্চ্ছনা ছড়িয়ে পড়ছিল চার দেয়ালের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে, যেটা আসলে বাজছিল আমার ল্যাপটপে, ঘুম ভেঙে যাবার পর আমি টের পেয়েছিলাম।

    তিনবছর হলো আমি টরন্টো এসেছি, তেহরান থেকে। ছোটবেলায় আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শেষপর্যন্ত যখন তেহরান ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বেরোলাম, তখন দেখলাম আমি হয়ে গেছি একজন প্রযুক্তিবিদ। লেখকরা হচ্ছে একধরনের দুর্বৃত্ত আর অলস শ্রেণির লোক, বাবা আমাকে প্রথমেই নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। তাঁর একটা অ্যান্টিক ঘড়ির দোকান ছিল, মাঝেমাঝে আমি তাঁকে তেহরানের একজন সময়রক্ষক হিসেবে কল্পনা করতে ভালোবাসি। আমরা অনেককিছুর সাক্ষী থেকেছি, বলে তিনি আমাকে হোস্টেজ ক্রাইসিসের গল্প শোনাতেন। আমার বাবা-মা দুজনেই ইসলামের প্রতি বরাবর অনুগত; এমনকি আমার দাদাও। কিন্তু আমি হয়েছি অন্যরকম, বিশ্বাস রাখতে পারিনি আল্লাহর করুণায়। স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করতে আমি টরন্টো এসেছি। এদেশের শীতল ও তুষারাচ্ছন্ন আবহাওয়া আমার ভালো লাগে। বিশেষত সেজন্যেই আমি বছরদুয়েক আগে ট্রেনে চেপে মন্ট্রিয়েল বেড়াতে গেছিলাম এক বন্ধুর সঙ্গে ক্রিসমাসটা কাটাতে। ট্রেনটা একেবারে অন্টারিও হ্রদের ধার ঘেঁষে চলে; ফেরার পথে যখন ট্রেনটা সবে সেন্ট্রাল স্টেশন ছেড়ে রওনা দিয়েছে, তখনই পামেলা স্টুয়ার্টের কথাগুলো আমার কানে এসেছিল। ব্যাপারটা অদ্ভুত বলেই আমি মনে রেখেছিলাম আর কয়েকমাস পরে অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম দেখতে গিয়ে আমার সাথে ফের পামেলার মোলাকাত হয়। সিনেপ্লেক্সের বাইরে বাসের জন্যে অপেক্ষা করছি, একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, রাস্তাজুড়ে কাঁচভাঙা লালচে ও পার্পল আলোর প্রতিফলন, এমনসময় নজরে পড়ল উল্টোদিকের ফুটপাতে হ্যান্ডমাইক নিয়ে একটা লোক যিশুখ্রিস্ট সম্পর্কে প্রচার করছে; পামেলার বান্ধবী ঠিক আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল, আর পামেলা বাসস্টপ থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আনমনে যিশু কিভাবে অমুক-তমুক লিভার সিরোসিস আর ক্যানসার রোগীদের সান্ত্বনা জুগিয়েছেন শুনছিল। শুনতে শুনতে সে যেন কীরকম ঘোরের ভেতরে চলে গিয়েছিল। এদিকে বাস এসে পড়েছে দেখে ওর বান্ধবী ওকে তিনবার ডাকল, তারপর জোরে নাম ধরে ডাকতেই পামেলা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল; আমি দেখলাম তার কুঁচো চুলগুলো কপালের ওপর এসে পড়েছে আর তার সারল্যমাখা বিভ্রান্ত মুখটা দেখাচ্ছে সাতাশ বছরের যুবতী নয়, বরং কোনো খুকির মতন। সেদিন বাড়ি ফিরে আমি রাতের খাবার বানানোর সময় পামেলার কথা ভাবছিলাম; ভেবে আমার একটু হাসি পেয়েছিল। খেতে খেতে আমি ইন্টারনেটে খবর দেখছিলাম, সপ্তাহখানেক আগেই ট্রাম্প ইরান মিলিটারির একটা অংশকে উগ্রপন্থী ঘোষণা করেছে। সত্যি বলতে দাদার জন্যে আমার খানিকটা চিন্তা হচ্ছিল। ছোটবেলা থেকে সে-ই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়; সাহসী এবং পরিশ্রমী। আমি ছিলাম ভীতু আর কুঁড়ে। সে আমাকে ঠাট্টা করে বলত মিলিটারি ট্রেনিং পেলেই আমার আলসেমি স্বভাব ঘুচে যাবে। আমি মিলিটারিতে যাবো না, আমি তাকে বলতাম, আমি লেখক হব। — লেখক?! — সে মুখ কুঁচকে বলত। লেখক প্রজাতি সম্পর্কে তার ধারণা বাবার থেকে আলাদা কিছু ছিল না। আমি একটু আহত মুখে আমার পড়ার টেবিল থেকে নীলচে কভারের ‘কালেক্টেড ফিকশনস’ বইটা এনে ওর সামনে ফেলতাম; সেটাই তখন আমার সংগ্রহের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন। আমি বোর্হেসের মতো লেখক হব, আমি ঘোষণা করতাম। — বোর্হেস কে? — সে অবাক হয়ে জানতে চাইত। বিশ শতকের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠতম লেখক, আমি কায়দা করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলতাম, প্রথমজন অবশ্যই ফ্রাঞ্জ কাফকা। বোর্হেস সম্পর্কে আমার মুগ্ধতা, বলা বাহুল্য, শুধু সাহিত্যগত কারণে ছিল না। বোর্হেস যে মায়ের পরিবারের রীতি অনুযায়ী সৈনিক হতে না চেয়ে বাবার বিশাল লাইব্রেরির ভেতর আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিলেন, এইটা আমাকে দারুনভাবে টানত। তেহরানের দিনগুলোয় যেসব উদ্ভট নিষেধাজ্ঞা আমাদের সহ্য করতে হতো, ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বাসিজের খপ্পরে পড়তে পড়তে কয়েকবার আমি ও আমার বন্ধুরা বেঁচে যাই, এসবকিছুর মধ্যে বোর্হেসের আয়না ও গোলকধাঁধার জগতে ঘুরে বেড়ানো ছিল আমার জন্যে সব থেকে আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা।

    মাঝে মাঝে আমি টমাস মানকে স্বপ্ন দেখি লস এঞ্জেলসের রাস্তাগুলো ধরে হেঁটে বেড়াতে। আমি এমে সেজেয়ারকে স্বপ্ন দেখি প্যারিস মেট্রো থেকে নেমে বৃষ্টি থামার জন্যে চুপ করে অপেক্ষা করতে। ক্ল্যারিস লিসপেক্টরকে দেখি ফাঁকা ঘরে বসে টেবিলের ওপর রাখা একটা আপেলকে পর্যবেক্ষণ করতে, যেটা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র সময়ের অভিঘাতে। ফিলিপ ডিককে দেখি তৃতীয় স্ত্রীকে গাড়িসুদ্ধু খাদে ফেলা দেওয়ার চেষ্টা করতে। স্তালিন জমানার সোভিয়েত লেখকদের দেখি অসম্ভবের বিরুদ্ধে এবং পক্ষে একইসঙ্গে লড়াই করতে। মাঝে মাঝে আমি কল্পনা করি যেন আমি নরকের ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমেস্টার কাটাতে গিয়েছি; সেখানে বোর্হেসকে দেখি সপ্তাহে একবার ক্যাম্পাসে আসতে। নরকের ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিটা ভালো; এরোটিকাগুলো সব এদিকেই রাখা থাকে। অবিশ্বাস্য ঠান্ডা আর অনুজ্জ্বল বিকেলগুলোয় যখন রাস্তার দুধারে আলোকস্তম্ভের সারি জ্বলে উঠেছে, কবলস্টোনের ওপর দিয়ে খটখট শব্দে একটি ঘোড়ার গাড়ি এসে দাঁড়ায় ক্যাম্পাসের কফির দোকানের সামনে। সিলভিনা ওকাম্পোর সাহায্যে বোর্হেস ঘোড়ার গাড়ির পাদানি থেকে বরফের ওপর পা ফেলেন। তিনি কাফকার একটা অপ্রকাশিত উপন্যাস খুঁজে চলেছেন বহুদিন ধরে, যেটার হদিশ শুধুমাত্র তাঁর মাথার ভেতরেই রয়েছে। কফির দোকানে ঢুকে কোণের একটা টেবিলে বোর্হেস ও সিলভিনা ওকাম্পো বসেন; দোকানের মালিক যখন ফায়ারপ্লেসের আগুনটাকে একটা শিকের সাহায্যে খুঁচিয়ে তুলছে, অতিরিক্ত তীক্ষ্ণ চোখের অধিকারী একজন কৃশকায় যুবক ইতস্তত করে বোর্হেসের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং তাঁকে মৃদুস্বরে অনুযোগ জানায় কল্পনার সেই আশ্চর্য জন্তুটির ব্যাপারে, যাকে সে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখতে বাধ্য হয়। এইভাবে নরকের ইউনিভার্সিটিতে আমি ফ্রাঞ্জ কাফকাকে আবিষ্কার করি। কোনো-কোনোসময় আমি ভাবি লেখকেরা যেন একটা অন্ধকার হাইওয়ে ধরে হেঁটে চলেছে আর দূরে বিন্দু বিন্দু শহরের আলো; তারা মৌনভাবে হাঁটছে। তারা পেরিয়ে যাচ্ছে দেশ ও মহাদেশের সীমানা। ঘটনাহীন বিকেলে কোনো অচেনা শহরে তারা মরে যাবে একা একা। কেউ তাদের লেখা পড়বেনা এবং তাদের নাম জানবেনা। এই পরিণতি সমস্ত লেখকের জন্যে নির্দিষ্ট, এমনকি শেক্সপিয়ারও চাপা পড়ে যাবেন অন্তিম হিমবাহের নীচে। একদিন প্রকাণ্ড যুদ্ধ বা মহামারীতে গ্রন্থাগারগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে; একধরনের মৃত্যু, বা মৃত্যুর মতো স্বতঃপ্রণোদিত ঈশ্বর এসে আমাদের মাথায় হাত রাখবেন, পোড়াচুলে। হয়তো ভবিষ্যতের কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ মরুভূমির বালির নীচে থেকে খুঁড়ে বের করবে কিছু কিছু ভগ্ন ও বিস্মৃত অক্ষরচিহ্ন; সেসবের অর্থ ও প্রণালী ক্রমে ক্রমে পরিস্ফূট হবে, কিংবা হবেনা। তাহলে কি লেখালিখি শেষপর্যন্ত অগ্নিবলয়ের মধ্যে দিয়ে একজন তুষারমানবের হেঁটে যাওয়া নয়? অথবা স্রেফ আত্মহত্যা? হঠাৎ সাদেক হেদায়েতের কথা আমার মনে পড়ে, যিনি তেহরান থেকে প্যারিসে গিয়ে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন এবং কিছুদিন পরে আত্মহত্যা করেন। কখনও কখনও আমি দেখি বিশ শতকের হারিয়ে-যাওয়া লেখকেরা সাদেক হেদায়েতের মতো তুলো গুঁজে রাখছে তাদের বন্ধ জানলা ও দরজার ফাঁকে এবং তারপর গ্যাসবার্নার অন করে অপেক্ষা করছে ইঁদুরের মতো দমবন্ধ মৃত্যুর। আত্মহত্যার কথা ভাবতে গিয়ে পামেলা স্টুয়ার্টের মুখটা আমার মনে ভেসে ওঠে, পয়লা জুলাই অর্থাৎ কানাডা ডে-তে তাকে আমি দেখি হারবারফ্রন্টে; ওইদিন জায়গাটায় যেন মেলা বসে যায়। মেক্সিকান খাবারের দোকানগুলোর সামনে পামেলা একটা ছেলের কাঁধে চাপড় মারতে মারতে হাসিতে ফেটে পড়ছিল; ওইদিনই তাকে আমি সবচেয়ে খুশি দেখেছিলাম। ওরা আইসক্রিম খাচ্ছিল। নীল আকাশ আর হ্রদের জলে ভেসে থাকা সাদা প্রমোদতরীগুলির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল পামেলা স্টুয়ার্ট। তার ব্যাকগ্রাউন্ডে মেটাল ব্যান্ডের চিৎকার। তখনও সব স্বাভাবিক ছিল ওপর-ওপর — যেন আমাদের জীবনের বেসমেন্টে শয়তান পায়চারি করে; কোনো কোনো মাঝরাতে আমরা যখন পা টিপে টিপে বেসমেন্টে নেমে আসি, আমরা দেখি বালবের আলোর নীচে সে থুতনিতে হাত রেখে অপেক্ষা করছে, মেঝেতে কোনো ছায়া পড়েনি তার।

    ইদানিং ভোরের আলো ফুটলেই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে; অতিমারীর দরুন ঘরে বন্দি থাকতে থাকতে ক্রমশ ডিপ্রেশনে ভুগছি। ভাঁজ খাওয়া বিছানায় জেগে উঠে কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো বসে থাকি। আলোআঁধারির ভেতর হাতড়ে হাতড়ে বিছানা থেকে নামি; নেমে জানলার সামনে দাঁড়ানো আমার বহুদিনের অভ্যেস। দেখি ভোর পাঁচটার ওল্টানো কালাশনিকভ মেঘ এসে সিএন টাওয়ারের শরীরের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। নীল কুকুরগুলোকে দেখি দেয়ালের গায়ে বসে থাকতে; একজন কান খাড়া করে উঠে দাঁড়াল, লক্ষ্য করি, বাকিরা ঝিমিয়ে রয়েছে। ভুল মৃত্যুগুলোকে এড়াতে এড়াতে চলেছি সঠিক মৃত্যুর দিকে, আপাতত। মাসদুয়েক হলো দাদার খবর পাওয়া যাচ্ছেনা; তেহরানের দপ্তরগুলোতে ঘুরে ঘুরে বাবা কোনো হদিশ জোগাড় করতে পারেননি। ইরানের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি খুব সুবিধের নয়; আন্তর্জাতিক মিডিয়া জানাচ্ছে, সোলায়মানি হত্যা আর ফ্লাইট ৭৫২ ধ্বংসের পর থেকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার দ্বন্দ্ব ক্রমশ বাড়ছে। মাঝে মাঝে আমি দাদাকে স্বপ্ন দেখি ইরানের কোনো সীমান্তবর্তী শহরের বাইরে একটা মিলিটারি কমপ্লেক্সে দাঁড়িয়ে থাকতে। চারপাশে কোনো গাছ নেই; অদ্ভুত রুক্ষ ভূপ্রকৃতি, কনকনে ঠান্ডা মাটি। তার কাঁধে একটা একে-৪৭। সে বন্দুকটা নামায় কাঁধ থেকে, ম্যাগাজিন খুলে রাখে, তারপর দেখি সে ব্যারেলটা পরিষ্কার করছে। তার শরীরে হালকা খয়েরি রঙের সৈনিকের পোশাক, পায়ে কমব্যাট বুট। মনে হয় যেন সে হারিয়ে গিয়েছে, অথবা অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা তার নখদর্পণে। তার সামনে কংক্রিটের রঙহীন বিল্ডিংগুলো আশ্চর্য দেখায়। তাকে দেখে কীরকম একটা অপরাধবোধ আমায় গ্রাস করে। আমি শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে কিচেনে এসে দাঁড়াই। বোতল থেকে জল খাই। তারপর বাথরুমে যাই। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে পামেলা স্টুয়ার্টের কথা মনে পড়ে। আগের বছর ফল সেমেস্টারে একটা স্ট্যাট কোর্স নিয়েছিলাম। ক্লাস করতে যেতে হতো স্ট্যাট ডিপার্টমেন্টে, কুইনস পার্ক পেরিয়ে। কুইনস পার্কে আমি পামেলাকে একদিন দেখি। পার্কের একটা বেঞ্চে বসে সে একা একা কাঁদছিল। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছু পর্ণমোচী গাছ, যাদের পাতাগুলো লালচে হয়ে এসেছে। দূরে দুপুরবেলার শহর, উজ্জ্বল পিচরাস্তা, গাড়িগুলো নিঃশব্দে চলে যাচ্ছে অবিশ্বাস্য বেগে: যেন পার্কের কিনারায় মেট্রোপলিসের হলোগ্রাফিক প্রোজেকশন। আমি শ্লথ গতিতে পামেলা স্টুয়ার্টের দিকে এগোচ্ছি; যত তার কাছাকাছি যাচ্ছি, তত গতি কমিয়ে দিচ্ছি যাতে তাকে আরো কিছুক্ষণ ধরে আমি লক্ষ করতে পারি। অথবা যদি সে আমার দিকে তাকায়, এই প্রত্যাশায়। তার হাতদুটো দিয়ে সে মাঝে মাঝে মুখটা ঢেকে নিচ্ছে, তার মাথাটা নড়ছে, সে চোখের জল মুছে নিচ্ছে, তবুও তার কান্না থামছেনা। তার কাছে পৌঁছে আমার তীব্র ইচ্ছে হলো তার পাশে বসতে এবং জানতে চাইতে কেন সে কাঁদছে। কিন্তু পরক্ষণেই আমি বুঝতে পারলাম আমি সম্পূর্ণ অচেনা একজন লোক। এতখানি ব্যাক্তিগত মুহূর্তে এমন কোনো বাক্য নেই, যা আমি পরিচিত মানুষের মতো ব্যবহার করতে পারি। তবু আমি লজ্জাহীনভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে আমার দিকে তাকাল না; একসময় আমি তাকে পেরিয়ে গেলাম। ক্রমশ তার অবয়ব ছোট আর অস্পষ্ট হতে লাগল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ কয়েকবার দেখলাম। একসময় পার্কের সীমানায় পৌঁছে আমি পেডেস্ট্রিয়ান সিগন্যালের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। হয়তো সেদিনই আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম — বিকেলে ইউনিভার্সিটি থেকে হেঁটে হেঁটে যখন বাড়ি ফিরছিলাম, তখন। সূর্যাস্তের পরে ওইসময় আকাশ আশ্চর্য নীল হয়ে থাকে ওজোনস্তরে শোষণের দরুন, যাকে বলে ব্ল্যু আওয়ার। কিন্তু সে যাইহোক, একমাত্র পামেলা স্টুয়ার্টের মৃত্যুর পরেই আমি বুঝতে পেরেছি আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম। একবারও আমি তার সঙ্গে কথা বলিনি, যদিও আমাদের দেখা হয়েছিল মোট সাতবার। এখন, এই অতিমারীর ধূসর দিনগুলোতে, আমার আফশোস হল ভেবে কেন আমি তার সঙ্গে কথা বলিনি।

    দৈত্যাকার সাদা আলো নেমে আসে ঘুমের শহরে, দৈত্যাকার ঘূর্ণিঝড়গুলো: একটা টর্নেডোর কথা লিখেছিল পামেলা স্টুয়ার্ট তার সুইসাইড নোটে। তার ছোটবেলাটা কেটেছিল মিড-ওয়েস্টে, তার দাদু-ঠাকুমার সঙ্গে। সেখানে একটা টর্নেডোর স্মৃতি তার আজীবনের সঙ্গী হয়ে যায়। বিপর্যয়ের স্মৃতি নয়, দিগন্তবিস্তৃত খোলা প্রান্তরে কুন্ডলী পাকিয়ে ওঠা বিশাল টর্নেডোর ছবি, যা ক্রমশ এগিয়ে আসছে তার দিকে — আমি জানিনা, সম্ভবত আত্মহত্যার আগে সে এই দৃশ্যই কল্পনা করেছিল। আর তারপর বৃষ্টি; উথালপাথাল হাওয়া এবং দানবিক বৃষ্টি। শীতের শুরুতে আমি তাকে বে স্ট্রিটে একটা টিম হর্টনে দেখি, তার বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে। তারা কফি আর বেগেল খেতে খেতে রীতিমত হইচই করছিল। আমি তাদের কাছাকাছি একটা টেবিলে বসেছিলাম। আমার মনখারাপ ছিল। সেদিনই আমার ইউএস ভিসা রিজেক্ট হয়েছিল। ইন্টারভিউতে টাই-পরা কনসুলার অফিসার আমাকে মুখের ওপর বলেছিল, এই পরিস্থিতিতে তুমি ভিসা পাবে না আর এব্যাপারে তোমার কিছু করার নেই। আমি বুঝেছিলাম আমি আসলে একটা দেশ হারিয়ে ফেলেছি এবং আরেকটা দেশ এখনও জিতে নিতে পারিনি, যেটা হয়তো পশ্চিমে সব ইরানীয়দের জন্যেই প্রযোজ্য। হয়তো ধর্মের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এরকম; আমার অনেক বন্ধুই নাস্তিক হিসেবে পরিচয় দেয়, কিন্তু আমি জানি তারা ইসলামবিশ্বাসী। একুশ শতকে পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ। দিনের আলো ম্লান হয়ে রাস্তায় ঝুপঝুপ করে বরফ পড়ছিল, আর ৭৭৭ বে স্ট্রীটের সামনে থেকে পায়রাগুলো উড়ে উড়ে একটা অবিস্মরণীয় দৃশ্যের জন্ম দিচ্ছিল। পামেলা আর তার বন্ধুরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল এই দৃশ্য। তুষারপাত শুরু হলে আচমকা যেন সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ঠিক তখনই পামেলা স্টুয়ার্ট স্পষ্টভাবে প্রশ্ন তুলেছিল, এসবের মানে কি? আমি সঙ্গেসঙ্গেই বুঝতে পেরেছিলাম এটা সেই কুখ্যাত দার্শনিক জিজ্ঞাসা। তার বন্ধুরা প্রথমে একটু মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিল, তারপর যখন আস্তে আস্তে তারা বুঝতে পারল প্রশ্নটা গভীর, তখন তারা হ্যাহ্যা করে হাসিতে ফেটে পড়েছিল। প্রথমে তারা ঠাট্টা করল পামেলাকে, তারপর একসময় তারা সিরিয়াসমুখে পামেলাকে বিভিন্ন দর্শনের কথা বলল। কেউ অস্তিত্ববাদের দিকে এগিয়ে গেল, কেউ নিতান্ত বাস্তবমুখী ব্যাখ্যা দিল, এমনকি কেউ বৌদ্ধ দর্শনের কথা তুলল। সেদিন পামেলা জীবনের সমস্ত সত্য ও সারাৎসার নেড়েচেড়ে দেখতে চেয়েছিল, যেন সে একজন বৈজ্ঞানিক আর লেন্সের তলায় রেখে সে পরীক্ষা করছে একটা জটিল ধাঁধাকে। সেদিন পামেলা স্টুয়ার্টকে দারুণ সুন্দর দেখাচ্ছিল। কফি খেতে খেতে আমি লক্ষ্য করেছিলাম পামেলার মুখে দীর্ঘ বিষাদের ছায়া তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। দিনকয়েক পরে আমি একটা সালসা ক্লাসে যোগ দিলাম। মিসেস পেরেজ আমাদের নাচ শেখাতেন; তিনি একজন জাঁদরেল মহিলা। দ্বিতীয়দিন আমি পামেলাকে দেখলাম আর আমার একটা হার্টবিট মিস হলো। আমরা বেসিক স্টেপগুলো শিখলাম। তারপর দুজনের গ্রুপ বানিয়ে আমরা প্র্যাক্টিস করতাম। কয়েক সপ্তাহ পরে আমি পামেলার পার্টনার হওয়ার সুযোগ পেলাম। আমি তার সামনে হাত বাড়িয়ে দিলাম এবং সে আমার হাতে হাত রাখল। আমরা কোনো কথা না বলে নাচের ছন্দে পা মেলালাম। সেটা ছিল টরন্টো শহরে একটা অবিশ্বাস্য শীতল দিন। বরফে বরফে সাদা হয়ে গেছিল রাস্তাঘাট। ঠান্ডা রাতগুলোয় আমি যখন সেদিনের পামেলা স্টুয়ার্টকে কল্পনা করি, যেন আমি তাকে কাছে পেতে চাই, এইভাবে আমি তার ঠোঁটে চুমু খাই। তার মাশরুম ব্লন্ড চুলে আমি আঙুল বোলাই; তার অফ শোল্ডার ক্রপ টপের খোলা কাঁধে আমি মুখ রাখি, আস্তে আস্তে সে তার পোশাক নামিয়ে দেয়। আমি তার নগ্ন শরীরটাকে ছুঁয়ে দেখি, যা কিছু নশ্বর ও যা কিছু পার্থিব, তার উষ্ণ বুক আর পেটে চুমু খেতে খেতে আমি নীচে নেমে যাই। সে গা মোচড়াতে থাকে, তার থাইয়ের ভেতরদিকে আমি চুমু খাই, সুখের চরমে পৌঁছে সে শীৎকার করতে থাকে যখন আমি তার কালো লেস প্যান্টিটা নামিয়ে দিই। জিভ দিয়ে তার ক্লিটোরিস ছুঁলে বৈদ্যুতিক ঝাপটায় তার শরীর মুচড়ে মুচড়ে ওঠে একটা প্যাঁচ-দেওয়া স্ক্রুয়ের মতো। এইভাবে আমি কাঁপতে কাঁপতে মাস্টারবেট করে নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দিই।

    শেষবার পামেলা স্টুয়ার্টকে আমি দেখেছিলাম অন্টারিও আর্ট গ্যালারির দোতলায়; হেনরি মুরের অতিকায় ভাস্কর্যগুলোর মাঝখানে সে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ। অদ্ভুত নরম আলোকসজ্জার নীচে তাকে আমি দেখেছিলাম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমি তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনি এবং ধীরে ধীরে আমি ডান্ডাস স্ট্রীটের ব্যালকনিটার দিকে সরে যাই, যেখানে পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়েছে আর পাশের আফ্রিকান প্রদর্শনীতে যাবার রাস্তাটা ওদিক দিয়ে। একটা মাঝপথে থেমে যাওয়া চলচ্চিত্রের মতো পামেলা স্টুয়ার্ট হারিয়ে গ্যাছে আমার জীবন থেকে; মাঝে মাঝে আমি শীতের রাতে গরম জলে চান করি, উষ্ণ বাস্পের ভেতর ডুবে যেতে যেতে আমি ভাবতে চেষ্টা করি শেষপর্যন্ত পামেলা স্টুয়ার্ট কেন আত্মহত্যা করল। হঠাৎ যেন আমি একটা ফোন বাজার আওয়াজ শুনতে পাই; আমি শাওয়ার কার্টেনটা সরিয়ে নগ্নদেহে বেরিয়ে এসে তোয়ালে জড়াই, তারপর বাথরুমের বাইরে এসে হাত মুছে ফোনটা ধরি। দেখি, কেউ ফোন করেনি। আমার মনের ভুল। তারপর আমি আবার বাথরুমে ফিরে যাই। দাদার জন্যেই আমি এখানে পড়তে আসতে পেরেছি, কয়েকদিন আগে মা আমাকে বলেছিল, দাদা বাধ্যতামূলক মিলিটারি সার্ভিসে না গেলে আমি ছাড় পেতাম না। একটা স্পষ্ট অভিযোগ জানিয়ে মা ফোনটা নামিয়ে রেখেছিল, যেটা সত্যি। এটা মেনে নিতে আমার কোনো আপত্তি নেই। মাঝে মাঝে আমি নিজেকে একজন পলাতক আসামি হিসেবে কল্পনা করি। নীল কুকুরগুলো দেখি অপেক্ষা করছে আমার জন্যে; অতিমারীর দিনগুলো আমার একাকিত্ব আর ডিপ্রেশনকে বাড়িয়ে তুলেছে। শেষঅব্দি পামেলা স্টুয়ার্ট আর আমার সমস্যাটা একইরকম, যদিও আমাদের মধ্যে কোনওদিনই কথোপকথন সম্ভব ছিলনা। হয়তো লেখালিখি সম্ভব; একমাত্র লেখালিখিই যোগাযোগ-সম্ভবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু কী ধরনের লেখালিখি? কোনো মহৎ লেখা নয়, এমনকি কোনো তুখোড় লেখাও নয়। লেখালিখি লিরিক-প্রস্রাবকারীদের সরাইখানা নয়। লেখালিখি, যা একধরনের অপরাধ, এবং লেখক, যিনি একজন অপরাধী — শুধু তাই আমাদের প্রয়োজন। কোনো টেকনিক নেই, নিখুঁত বাক্যকে ঘৃণা করি, প্লট সম্পর্কে ভাবতে চাই না। আমরা যারা একুশ শতকে বড় হচ্ছি, আমরা জানি আমাদের বাসভূমি চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছে। আমাদের বিপন্নতাবোধ খুনি ও জোচ্চোর, নিখোঁজ গোয়েন্দা, বেশ্যা আর বেশ্যার দালাল, এবং নির্বাসিত লেখকের মতো। সব কিছুকেই সন্দেহ করি; কেন্দ্রীয় গল্পটা আমরা আর কোনোদিনই জানতে পারবনা, আমরা শুধু পরিধির বিচ্ছিন্নতাটুকু ধরতে পারি। আর কিছু সম্ভব নয় একুশ শতকে। একজন ফেরারী আসামীর মতো লেখক। একজন অপরাধী লেখক। অথবা একজন দূরের দেশের গোয়েন্দা, স্ট্যাম্পহীন খামে পাওয়া নির্দেশ অনুযায়ী যে এসে পৌঁছেছে এই ঠান্ডা ও অচেনা শহরে। সে অন্ধকার অ্যালিতে ওল্টানো ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে লক্ষ্য করে বড়োরাস্তার উল্টোদিকে রেস্তোরাঁয় যে লোকটা এইমাত্র ঢুকল, তাকে; শহরের বাইরে নিঃসঙ্গ গ্যারাজে তদন্ত চালিয়ে সে বের করে আনে গুম হওয়া লাশ। সে জানে তার ঘাড়ে আততায়ী নিঃশ্বাস ফেলছে; দূরে সে তাকিয়ে দ্যাখে শহরের ঝলমলে স্কাইলাইন, ওখানে একটা আলোর পৃথিবী আছে, যার খবর সংবাদমাধ্যমে পৌঁছায়। অথচ ওখানেই পামেলা স্টুয়ার্ট মরে শুয়ে থাকে তার দশতলার অ্যাপার্টমেন্টে। আমাদের বারবার বলা হবে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা এড়িয়ে যাওয়া যায়। আমাদের বারবার শেখানো হবে নিয়ন্ত্রিত মনোযোগ। আসলে প্রত্যেকটা ঘটনাই গুরুত্বপূর্ণ; প্রত্যেকটা খুন, আত্মহত্যা কিংবা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। একমাত্র অপরাধীর চোখেই এই অকিঞ্চিৎকর ঘটনাগুলো ধরা পড়বে। আমি বুঝতে পারি, আমার সময় হয়ে আসছে। আমার জন্যে কোনো সান্ত্বনা নেই। আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে পোশাক পরে নিই। তারপর ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে মাইক্রোওয়েভে ঢোকাই গরম করতে।





    অলংকরণ- মনোনীতা কাঁড়ার

     

  • বিভাগ : ইস্পেশাল | ২১ মে ২০২১ | ১৬৫৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ভাষা ভাষা | ২২ মে ২০২১ ১০:০৬106272
  • বাঃ! খুবই ভালো লাগল লেখাটা। উপভোগ্যও। পড়তে এবং ভাবতেও। অবশ্য লেখা যত ভালো, অপরাধও  তত বড় কেননা 'লেখালিখি, যা একধরনের অপরাধ, এবং লেখক, যিনি একজন অপরাধী'।  একটা ভালো লাগা লেখার লেখক সম্ভবতঃ আরো বড় অপরাধী। অপরাধটা মাথায় বয়ে নিয়ে বেড়াতে বেড়াতে একদিন মাথার ভেতর চেপে বসা ভাবনাটাকে নামিয়ে ফেলা। আর অপরাধ তো শুধু বয়ে বেড়ানোয় নয়, নামিয়ে রাখার ভয়ঙ্কর এক শূন্যতাতেও!


    আর মানুষের ইতিহাসই তো নিজের জন্মভূমি -- নিরন্তর বাসভূমি হারিয়ে ফেলার ইতিহাস ।  গড়ে তোলারও। নিজের মনোভূমি।


    কেন্দ্রীয় গল্পে প্রবেশে যেমন একটা আটপৌর সরলতা তেমনই পরিধির বিচ্ছিন্নতায় যে বিষণ্ণতা তাও তো আমাদের গড়ে-ভাঙে-আবার গড়ে। আবার...!  নিরবধি।


    শেষে আবারও বলি খুবই ভালো লেগেছে  লেখাটা ।

  • সিএস | 49.37.35.202 | ২২ মে ২০২১ ১২:৫৬106277
  • সায়ন্তনের লেখা আমি পছন্দ করি, গল্প - কবিতা পেলেই পড়ে ফেলি। পড়লে মনে হয়, নিছক বাস্তবের বর্ণনা দেওয়া - যে বর্ণনা বা চরিত্রদের সহজেই একজন পাঠকের কাছে চেনা বা জানা মনে হবে - সেরকম গল্প লেখা সায়ন্তনের উদ্দেশ্য না। গল্প লেখার স্টেকটা উনি একটু উঁচুতে রাখতে চাইছেন, নিতান্ত বাস্তবের অনুসারী না হয়ে ইমেজ তৈরী করতে চাইছেন। সিম্বলিজম নয়, ইমেজ। আর এই লেখায় টুঁটি চেপে ধরে বার করে এনেছেন একজন কেন লিখবে বা লেখক কে, সেই বক্তব্যটি।  বিপন্ন হওয়ার বোধ না থাকলে, এইসব কিছু কেন এরকম প্রশ্ন না থাকলে লেখক হওয়া যায় না, সেই কথাটি।


    (সাদেক হেদায়েত - ও যে দরজা - জানালায় তুলো গুঁজে রাখতেন সেটা জানা ছিল না , বা ভুলে গেছি। এ ব্যাপারে প্রুস্তের কথাই মনে আছে। )

  • Ranjan Roy | ২২ মে ২০২১ ১৮:৫৫106299
  • সায়ন্তন চৌধুরির লেখার  'সি এস' কৃত পাঠ-প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ছত্রে ছত্রে সহমত। এজন্যে প্রতিটি লেখাই পড়ি, জাত আলাদা।

  • Prativa Sarker | ২৯ মে ২০২১ ২০:২০106590
  • গল্পটা যেভাবে বলা হয়েছে কেন্দ্রহীন পরিধির বিচ্ছিন্নতাসহ সেটা খুব টানলো। এই অস্থির সময়ের মতোই অস্থির গল্প এক, পাঠককেও টালমাটাল করে তোলে।

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন