• হরিদাস পাল  গপ্পো

  • লরা

    সায়ন্তন চৌধুরী লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ০১ মে ২০২১ | ১২১২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • লরার সাথে আমার আলাপ হয়েছিল নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে এক শীতকালীন সেমেস্টারে; আমরা দুজনেই কনভেক্স অপ্টিমাইজেশনের একটা কোর্স নিয়েছিলাম আর কোর্স প্রজেক্টে আমি ছিলাম ওর পার্টনার। লরা এসেছিল এল.এ. থেকে। নিউইয়র্কের শীত আমি পছন্দ করিনা, সে প্রায়ই বলত। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসটা ওয়াশিংটন স্কোয়ার পার্কের চারদিকে ছড়ানো। মরশুমের সবচেয়ে ঠান্ডা দিনগুলোতে যখন পার্কটা বরফে বরফে শাদা হয়ে থাকত, তখন এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিংয়ে ক্লাস করতে যেতে হতো আমাদের, আর যাওয়ার পথে লরা অত্যন্ত সতর্কচোখে লক্ষ্য করত পার্কে বরফের বল বানিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করতে থাকা ছেলেমেয়েদের। মাঝে মাঝে আমার মনে হত, লরা নিউইয়র্ক শহরটাকে একটা অতিকায় ভাল্লুক হিসেবে কল্পনা করে, যেটা শুয়ে আছে ইস্ট কোস্টের গা বরাবর। কিংবা হয়তো এটা আমার নিজস্ব ভিত্তিহীন ধারণা মাত্র। সম্ভবত ইভ ব্যাবিৎসের কোনো লেখায় নিউইয়র্ক সম্পর্কে এরকম একটা কথা আমি পড়েছিলাম আর সেটাই আমার স্মৃতি চাপিয়ে দিয়েছে লরার ওপর। সে যাইহোক, লরার একেবারে উল্টোদিকে আমি, কেননা নিউইয়র্কের প্রতি আমার আকর্ষণ অপরিসীম। যখন নিউইয়র্কে আসিনি আমি, তখনও এই শহরটা আমার কৌতুহল জাগাতো। কখনও কখনও আমি নিজেকে জাহান্নামে যাওয়া একজন গোয়েন্দা হিসেবে কল্পনা করতাম, যে লোয়ার ম্যানহ্যাটানের কোনো নোংরা ও পুরোনো বইয়ের দোকানের মাথায় ঘুপচি ঘর ভাড়া নিয়ে বাস করে, আর ঘুমের ভেতর বীভৎস খুনের দৃশ্য দেখে গভীররাতে জেগে উঠতাম বারবার। নিউইয়র্ক সম্বন্ধে আমার কোনো রঙিন ধারণা ছিল না। নোংরা রাস্তা, দুর্গন্ধে ভর্তি সাবওয়ে এবং নাকউঁচু লোকজন সমেত এই বিচিত্র শহরটার কুখ্যাতি আমি জানতাম। কোনো এক বুড়ো ট্রাক ড্রাইভার আমাকে একবার বলেছিল যে, নিউইয়র্ক হচ্ছে একটা আস্তাকুঁড় আর শহরটা স্রেফ কমিউনিস্ট, ইহুদী ও সমকামীদের আড্ডা। আসলে জানুয়ারীর শ্লেটরঙা দিনগুলো এমনিতেই আমার সবচেয়ে প্রিয় আর নীল ঝকঝকে গ্রীষ্মের আবহাওয়া জঘন্য লাগে। ফলে সারিসারি ধূসর স্কাইস্ক্র্যাপারে সাজানো তুষারাচ্ছন্ন নিউইয়র্কের শীতল বিষাদগ্রস্ত দিনগুলো, আমার মনে হত, লেখাপড়ার কাজে খরচ করার জন্যে সবথেকে উপযুক্ত। এরকম দিনে আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টের কাছে ছোট্টো কফিশপটায় চলে যেতাম বিকেলের দিকে। জানলার ধারে একটা মনোমত জায়গা বেছে ল্যাপটপটা খুলে গুছিয়ে বসতাম। কাজ করতে করতে মাঝেমাঝে কফিতে চুমুক দিতাম আর চোখ তুলে লক্ষ্য করতাম ফুটপাত বেয়ে হেঁটে যাওয়া উচ্ছ্বল মেয়েদের — তাদের হাতে শপার্স ব্যাগ, তাদের ঠোঁটে অর্থহীন গল্প, তাদের স্বতঃস্ফূর্ত হাসি, যার শব্দহীন দৃশ্যটুকু শুধু অলসভাবে ক্যাফের কাঁচের জানলা ভেদ করে এপারে এসে পৌঁছত। তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে হয়তো রাস্তার উল্টোদিকে হলদে ক্যাব এসে থামত আর স্যুটপরা লোকেরা নেমে ব্যস্তভাবে ঘূর্ণায়মান দরজা ঠেলে ঢুকে যেত হোটেলে বা অন্যান্য বিল্ডিংয়ে। কখনও কখনও আমি ব্লগ লিখতাম আর এইসব টুকরো টুকরো ছবি ঢুকে পড়ত আমার লেখার ভেতরে। লরা অবাক হয়েছিল এজন্যে যে, একজন ভারতীয় হয়েও নিউইয়র্কের নিষ্ঠুর শীত আমি কী করে উপভোগ করি। তাকে আমি বলেছিলাম নিউইয়র্কের অবিশ্বাস্য সূর্যাস্তগুলোও আমার ভালো লাগে। লস এঞ্জেলসের পরাবাস্তব সূর্যাস্তগুলোর সঙ্গে কোনো তুলনাই হয়না, সে উত্তর দিয়েছিল অন্যমনস্কভাবে।

     

    এটা সত্যি যে, কোনো এক আপাতদৃষ্টিতে তাৎপর্যহীন সময়ে আমি লরার প্রেমে পড়েছিলাম, যদিও আমার আন্দাজ প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে লুকিয়ে রাখতে আমি সক্ষম হয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম, যদিও আমার হাতে কোনো প্রমাণ ছিল না, তবু লরার প্রেমে পড়া যেন একটা প্লেনক্র্যাশ বা ভূমিকম্পের মতো বিধ্বংসী ঘটনা। ফাঁকা বিকেলগুলোয় আমি ঘুরে বেড়াতাম ম্যানহ্যাটানের রাস্তাগুলো ধরে। হয়তো নতুন খোলা একটা পিৎজার দোকানে ঢুঁ মারতাম। হয়তো একটা জ্যাকেট কিনতে ঢুকতাম জামাকাপড়ের দোকানগুলোয়; ভুলভাল দোকানে ঢুকে পড়লে প্রাইসট্যাগ দেখে বেরিয়ে আসতাম, অথবা কর্মচারী মেয়েটি মিষ্টি হেসে বুঝিয়ে দিত ওখানে জ্যাকেট কেনা কলেজপড়ুয়াদের সাধ্যের বাইরে। যখন আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসতাম, ততক্ষণে শহরের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। গুঁড়ি-গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আমি বিল্ডিঙয়ে ঢুকে লিফটে চড়ে আমার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতাম, তারপর পকেট হাতড়ে চাবি বের করে দরজাটা খুলতাম। কখনো কখনো দেখতাম লরা হয়তো টেক্সট করেছে, আমি তাকে জবাব দিতাম। ইউনিভার্সিটি সংক্রান্ত কিছু। বা হয়তো কোর্স/টিএ ওয়ার্ক সম্পর্কে কিছু। কোনো-কোনোদিন আমরা গান শোনা নিয়ে বকবক করতাম। লরার পছন্দ ছিল নানারকম ইন্ডি রক। এল.এ.র ছোটো ছোটো স্থানীয় ব্যান্ডের খোঁজ সে আমাকে দিয়েছিল। আমার ভালো লাগত স্লো জ্যাজ। লরা রেডিয়োও শুনত। আমি তাকে জিগ্যেস করেছিলাম যে, তার কোনো প্রিয় স্টেশন আছে কিনা। এক্স রেডিও, সে বলেছিল, এল.এ. থেকে ব্রডকাস্ট হয়। লরার কিছু বন্ধুবান্ধব নাকি চালায় স্টেশনটা। সম্ভবত এ ব্যাপারে তার নস্ট্যালজিয়া কাজ করে, আমি মনে মনে ভেবেছিলাম। ক্রমে ক্রমে আমাদের বন্ধুত্বটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। এল.এ. সম্পর্কে আমার জ্ঞান জাহির করবার জন্যে আমি ওকে বিভিন্ন এল.এ. লেখকদের কথা বলতাম, যাদের আমি পড়েছি। মিস লোনলিহার্টসের প্রসঙ্গ প্রায়ই উঠত। ইভ ব্যাবিৎস নাথানেল ওয়েস্টকে একেবারেই পছন্দ করেননা — আমি মন্তব্য করতাম। ইভ ব্যাবিৎস পড়তে আমারও ভালো লাগে, লরা বলত। তারপরে আমরা হলিউড সম্বন্ধে গল্প করতাম, দুশ্যাঁর সাথে ব্যাবিৎসের ষাটের দশকের বিখ্যাত ফটোগ্রাফটার কথাও উঠত, যেখানে নগ্ন ইভ দাবা খেলছিলেন দুশ্যাঁর সঙ্গে; আমি ব্যাবিৎসের ‘মাই লাইফ ইন আ ৩৬ডিডি ব্রা’ লেখাটার উল্লেখ করলে লরা হ্যাহ্যা করে হাসত। আমি জানতে পেরেছিলাম লরার ঘুমের ভেতর মাঝেমাঝে হাঁটার অভ্যাস আছে। ইতিমধ্যে আমরা ইউনিভার্সিটি থেকে আর্ট গ্যালারি দেখতে গেছিলাম একবার; যদিও প্রেম সম্পর্কে যাবতীয় ধারণাকে আমি আবছা রাখাই নিরাপদ মনে করেছিলাম। নিউইয়র্কের সাথেও আমার আত্মীয়তা গাঢ় হচ্ছিল; অলস বৃষ্টিভেজা বিকেলগুলোয় কেন যেন আমার মনে পড়ত জানলার পাশে অপেক্ষমান একটা নিঃসঙ্গ টাইপরাইটারের দৃশ্য। বড়ো শহরের তলায় তলায় যে অন্ধকার বিষাদের চোরাটান থাকে, আমার মনে হয়, আমি সেটাই টের পাচ্ছিলাম। জীবনে ইউনিভার্সিটির বছরগুলো ভাগ হয়ে যায় মিডটার্ম ও সেমেস্টারে, আর ফল সেমেস্টারে শীতঋতুটা কোথা থেকে যেন এসে যেত আকস্মিকভাবেই। আঃ, এবারে আর তত বরফ পড়বেনা, কেউ হয়তো আবহাওয়াবিদ সাজার চেষ্টা করত এবং দেখা যেত সেবারই বরফে বরফে ঢেকে গেছে ম্যানহ্যাটানের রাস্তাগুলো। লরা বলত, এল.এ.র ক্রিসমাস অন্যরকম। বরফ ছাড়া, আমি যোগ করতাম। অন্যরকম, সে বলত। একদিন বিকেলে লরা আমাকে ফোন করল। সেদিন বেশ ঝোড়ো হাওয়া বইছিল আর বরফ পড়ছিল সারাবেলা। আমি পুরু বুটজুতোটা গলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম লরার অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে। লরাকে সেদিন একটু রোগা-রোগা দেখাচ্ছিল। আমি ভাবলাম হয়তো তার মনখারাপ। আমরা কফি বানিয়ে খেলাম। ঘরে বসে গল্প করলাম কিছুক্ষণ। চুমু খেলাম ওর ঠোঁটে। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা, লরা মুখ তুলে বলেছিল। জানি, ওর লিনেনের টপটা খুলতে খুলতে আমি বললাম। তারপর দুজন দুজনকে আদর করলাম খানিকক্ষণ। তারপর আমরা পোশাক পড়ে নিলাম। সেদিন বিকেলে আমরা পাশাপাশি বসে নিউইয়র্ক শহরকে বরফ আর একাকিত্বে ঢেকে যেতে দেখছিলাম। সেটা কথা বলবার জন্যে ততটা উপযুক্ত সময় ছিলনা।

     

    কোনো কোনো দুঃসহ রাতে, যখন আলোগুলো নিভে গেছে সব আর আমার স্নায়ুর প্রান্ত ঘুমে অবশ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে, পুরো ব্যাপারটাই আমি টের পাচ্ছি এবং মেনে নিচ্ছি, তখন একটা বিস্ময়ের ভাব ভেসে ওঠে আমার মস্তিষ্কজুড়ে — আমরা কি আদৌ প্রেমে পড়েছিলাম? যেন একটা পুরোনো বিভ্রমের স্মৃতি, এভাবে লরার অবয়ব খুব আবছা আমার মনে পড়ে। অথবা খুব স্পষ্ট। যথেষ্ট দ্রুততার সঙ্গে একটা টানেলের ভেতর দিয়ে আমার স্মৃতি আমাকে ঠেলে দেয় সেই দিনটার দিকে, যখন লরা আমাকে জানিয়েছিল পল নামে একটা ছেলের সঙ্গে সে ডেট করছে। পলকে আমি চিনতাম, ফরাসী ছেলে; আগে থেকে চিনতাম কিনা ঠিক মনে নেই। সেটা ছিল এপ্রিলের একটা সন্ধ্যে। আমরা কথা বলেছিলাম ফোনে। তারপর লরা লাইনটা কেটে দিয়েছিল ওপ্রান্তে। এটা তত গুরুত্বপূর্ণ নয়, ঠিক এভাবেই আমি ঘটনাটাকে ঝেড়ে ফেলেছিলাম মাথা থেকে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল; তবু আমি ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম রাস্তায়। ম্যানহ্যাটানের সেই সাইবারপাঙ্ক সন্ধ্যেটায় অজস্র বৃষ্টির ফোঁটা, স্ট্রীটলাইটের প্রতিফলন আর সুদৃশ্য দোকানের নিয়ন আলোগুলোর বিচ্ছুরণ ভেঙে ভেঙে মিশে যাচ্ছিল একসাথে। একটা ঘোরের ভেতর ভেজা ফুটপাতে ছোপ ছোপ লালচে জলরঙা আলো মাড়িয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম সাদাকালো জেব্রা ক্রসিংয়ের দিকে। সমান ও বিপরীত গতিতে নিউইয়র্ক শহর স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছিল আমার ভেতর দিয়ে। চারপাশের টুকরো-টুকরো শব্দ, মানুষের কথোপকথন, জলের অন্তহীন আওয়াজ সত্ত্বেও আর.এল. স্টিভেনসনের গল্পের কোনো প্রেতের মতো প্রবল একাকিত্ব আমাকে ছেয়ে ফেলেছিল সেইরাতে। অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আমি অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। ইউনিভার্সিটিতে আমাদের সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছিল। কেবল একবার লরাকে আমি দেখেছিলাম ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে। সে আমাকে লক্ষ্য করেনি; সূর্যাস্তের সময় সে বসেছিল পার্কের বেঞ্চে। সবুজ ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে কেউ একটা জিভঝোলা কুকুরের জন্যে ফ্রিসবি ছুঁড়ে দিচ্ছিল হাওয়ায় এবং বাদামী কুকুরটা বিকেলের কমলা পিক্সেলগুলো কুড়োতে কুড়োতে তীরবেগে ছুটে যাচ্ছিল সেদিকে। চারপাশে লোকজন হাঁটছিল। আর এইসব দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ডে হাঁটতে হাঁটতে আমি লরাকে দেখতে পেয়েছিলাম স্থির হয়ে বসে থাকতে। তারপর লরার অপসৃয়মান অবয়ব, তাকে আমি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতে দিয়েছিলাম। কোনো কারণে আমার ধারণা হয়েছিল লরা আর পল ফ্লোরিডাতে গিয়ে বাস করবে। তারা কখনই এল.এ. ফিরবেনা, আমি মনে করেছিলাম। কিন্তু আমি ভুল ভেবেছিলাম। শুরুতে ফ্লোরিডা গেলেও বিয়ের পর তারা প্যারিস চলে গেছিল। তাদের সাথে আমার আর যোগাযোগ ছিলনা। আমি নিউইয়র্কে আমার দৈনন্দিন জীবনের ভেতর লরাকে প্রায় ভুলেই গেছিলাম। আমার কাছে শুধু একটা জিনিসই পড়েছিল, যেটা লরার: বয়েডের কনভেক্স অপ্টিমাইজেশনের বইটা। বইটার প্রথম পাতার মাঝখানে লরার নাম লেখা সবুজ হাইলাইটারে, তার নীচে নীল ডটপেনে ডাউনটাউন এল.এ.র একটা ঠিকানা; সম্ভবত ওর বাড়ীর ঠিকানা, আমি অনুমান করেছিলাম। বছরদুয়েক ইস্টকোস্টে এখানে-সেখানে কাজ করার পরে আমি মাসতিনেকের জন্যে একটা ইন্টার্নশিপের অফার পেলাম, ইউসিএলএতে। সত্যি বলতে এল.এ. যাবার কথা ভাবতেই লরার স্মৃতি আমার কাছে ফিরে আসছিল একটু একটু করে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই যে, স্মৃতিগুলো আর যন্ত্রণার ছিলোনা, বরং আনন্দদায়ক; স্পষ্টতই লরার স্মৃতি আমি উপভোগ করছিলাম। একদিন আমি চেপে বসলাম এল.এ.র ফ্লাইটে আর সাড়ে ছ'ঘন্টা জার্নির পরে এসে পৌঁছলাম লস এঞ্জেলসে।

     

  • আরও পড়ুন
    রণছোড় - Chayan Samaddar
  • এল.এ.তে আমার দিনগুলো কাটছিল কোনোরকম উদ্বেগ ছাড়াই। আমি একটা তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ প্রজেক্টে কাজ করছিলাম, যেটার জন্যে সপ্তাহে একবার আমাকে ডাউনটাউনে ওদের অফিসে যেতে হতো মিটিং করতে। একদিন কাজ মিটে যাবার পর আমি ঠিক করলাম লরার ঠিকানাটা খুঁজে বের করব। জানিনা কেন, অথবা আমি ঠিক কী প্রত্যাশা করছিলাম, তবু আমার মনে হল এটা একটা জরুরী কাজ। বাস থেকে নেমে আমি জিপিএস দেখে হাঁটতে লাগলাম। একটা মধ্যবিত্ত নেবারহুড। নির্জন দুপুরে রাস্তার দুপাশে পার্ক-করা গাড়িগুলো। ফ্যাকাশে নীল আকাশ। একটা কুকুর ডাকছিল কোথাও। একজন সাইকেলে চেপে আমাকে পেরিয়ে চলে গেল। বাড়িটা খুঁজে পেলাম আমি। অফহোয়াইট রঙের; সামনে কালো গেট, গেটের পাশে ডাস্টবিনগুলো রাখা। কোথাও কেউ নেই। দেখে মনে হচ্ছিল কেউ থাকেনা। নিস্তব্ধ গরম হাওয়া বয়ে গেল একঝলক। কুকুরটার ডাক থেমে গেছে হঠাৎ, টের পেলাম। ইতস্তত করছি, এমনসময় পাশের বাড়িটা থেকে কাউকে বেরোতে দেখলাম। একজন মধ্যবয়েসী মহিলা; আমি তাঁর কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম বাড়িটায় কেউ থাকে কিনা। তিনি সন্দেহের চোখে আমাকে জরীপ করলেন, তারপর সংক্ষেপে জানালেন কেউ থাকেনা। আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিলাম। ভাবলেশহীন মুখে তিনি তাকিয়ে রইলেন। আমি ফিরে আসছি, এমনসময় আচমকা বললেন, ওরা চলে গেছে বছরখানেক আগে। আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম কোথায়। তিনি আর কিছু বললেন না। অগত্যা আমি সেদিন ডাউনটাউন থেকে ইউনিভার্সিটি ফেরার বাস ধরলাম। সানসেট বুলেভার্ড ধরে বাসটা চলছিল আর আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে লরার প্যারিসে চলে যাওয়া এবং লরার পরিবারের এল.এ. ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে কিনা। হঠাৎ আমি বুঝতে পারলাম আমাকে এর উত্তর খুঁজতে যেতে হবে এক্স রেডিওর অফিসে। আমি ভেবেছিলাম ওদের স্টেশনটা ডাউনটাউনেই হবে, কিন্তু গুগল করে বের করলাম সান্টা মনিকার একটা ঠিকানা। পরের সপ্তাহে আমি সান্টা মনিকা যাবার পরিকল্পনা করলাম। কিন্তু তার আগে আমি একটা ফোন করলাম এক্স রেডিওর অফিসে। ওপাশ থেকে একটি মহিলাকন্ঠে জবাব এলো — হ্যালো। আমি সরাসরি জানতে চাইলাম সান্টা মনিকার অফিসটা উইকেন্ডে খোলা থাকে কিনা। উত্তরে কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মহিলা আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি একটু ইতস্তত করে বললাম আমি লরার একজন বন্ধু, তার ব্যাপারে জানতে চাই। একটা দীর্ঘ নৈঃশব্দ্য। দু-একটা অস্পষ্ট পুরুষকন্ঠে ফিসফাস। তারপর মহিলা আমাকে জানালেন এক্স রেডিও মাসছয়েক আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমার আশঙ্কা হলো উনি এবার ফোনটা রেখে দেবেন, কিন্তু সামান্য বিরতি দিয়ে উনি আমাকে সান্টা মনিকা পিয়েরের কাছে একটা বারে একজনের সঙ্গে দেখা করতে বললেন, শুক্রবার রাতে। এল.এ.র রাতগুলো মাঝে মাঝে আমার লম্বা এবং অসহ্য লাগত। আমি উঠে জল খেতাম, জানলার সামনে দাঁড়াতাম, বাথরুম যেতাম, তারপর ফিরে এসে আবার ঘুমোনোর উপক্রম করতাম। ঘুম ভেঙে গেলে আমার ঘুম আসেনা। ঘুমের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে আমি ভাবতাম এক্স রেডিওর কথা। কৌতুহলবশত আমি ইন্টারনেট সার্চ করে এক্স রেডিও সম্পর্কে তথ্য বের করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু খুব কমই জানতে পেরেছি, তবু দুএকটা অদ্ভুত জিনিস যে আমার চোখে পড়েনি তা নয়। আমি অপেক্ষা করছিলাম শুক্রবার রাতটার জন্যে। কথামতোই আমি সান্টা মনিকার ছোট্টো বারটায় গিয়ে পৌঁছলাম। স্বাভাবিকভাবেই বেশ ভিড়, ভিড় ঠেলে আমি বারটেন্ডারের কাছে অতিকষ্টে পৌঁছে জানতে চাইলাম এনরিকে মার্টিন এখানে কাজ করে কিনা। সে একহাতে পানীয় ঢালতে ঢালতে অন্যহাতে ইশারা করল কোণের টেবিলে সার্ভ করতে থাকা একজন ওয়েটারের দিকে। সেদিকে এগিয়ে আমি ‘এনরিকে’ বলে ডাকতেই টেবিলে বসা যুবকটি বলল, আমিই। সামান্য হকচকিয়ে গেলাম, কেননা আমার ধারণা হয়েছিল এনরিকে বারটিতে কাজ করে। আমি বসলাম তার সামনে। সে আমাকে সরুচোখে নিরীক্ষণ করতে করতে আচমকা জিগ্যেস করল লরার সাথে আমার কী সম্পর্ক। বারের মিউজিকটা ঢিমে হয়ে এসেছে। নিউইয়র্কে পড়তাম আমরা, আমি বললাম, বন্ধু। হাত বাড়িয়ে সে পানীয়ের গ্লাসটা টেনে নেওয়ার সময় আমার চোখে পড়ল তার কবজিতে ট্যাটুর দাগ। ডিড ইউ ডেট হার? — সে জানতে চাইল। কিছুদিনের জন্যে, আমি উত্তর দিলাম। এবং আমি বুঝতে পারলাম প্রশ্ন করার ভারটা আমাকে নিতে হবে, নইলে এক্ষুণি লরা সম্পর্কে একগাদা জবাব আমাকে দিতে হবে। কিন্তু এনরিকে আনমনে তার কানের দুলে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, আমিও। তৎক্ষণাৎ আমি বুঝতে পারলাম এনরিকে লরার প্রথম বয়ফ্রেন্ড।

     

    বারটা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ালাম। সাইকেল চালানোর সরু রাস্তার পাশে জায়গাটা নির্জন এবং ঢেউয়ের আওয়াজ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। বেশ কিছুক্ষণ আগে সমুদ্রের ওপর সূর্য অস্ত গ্যাছে; দূরে দিগন্তের কাছে গোলাপি-ধূসর আলো ম্লান দেখাচ্ছে সান্টা মনিকা পিয়েরের উজ্জ্বল নাগরদোলার ব্যাকগ্রাউন্ডে। লরা মরুভূমির সঙ্গে কথা বলত, এনরিকে মুখ খুলল। আমি তার দিকে তাকালাম। মরুভূমিতে অনেক আজব জিনিস ঘটে, সে বলল, এক্স রেডিওয় আমরা ইউএফও নিয়ে একটা সিরিজ করেছিলাম। আমরা মরুভূমির বিভিন্ন জায়গায় যেতাম, যেখানে ইউএফও দেখা গ্যাছে। মরুভূমিতে গেলে লরা পাল্টে যেত; যেন সে চেনা জায়গায় এসেছে। অন্ধকার সমুদ্রটা এমন দেখাচ্ছিল, যেন সেখান থেকে এক্ষুনি লাভক্রাফটের কল্পনার দানব উঠে আসবে। আমি বুঝতে পারছিলাম আমি একজন অন্য লরাকে আবিষ্কার করছি — একজন সুখী লরা বা একজন বিধ্বস্ত লরা, আমি ঠিক জানিনা। সেইরাতে এনরিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি ইউনিভার্সিটি ফিরে এসেছিলাম। সেরাতে ঘুমের ভেতর আমি লরাকে স্বপ্ন দেখলাম; তাকে খুশি দেখাচ্ছিল, তার চুলগুলো হাওয়ায় অল্প অল্প উড়ছিল আর সূর্যাস্তের আলো গড়িয়ে পড়ছিল তার চিবুক বেয়ে। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না জায়গাটা এল.এ., ফ্লোরিডা নাকি প্যারিস, কিন্তু অবশ্যই নিউইয়র্ক নয়। তিনমাস পরে আমি নিউইয়র্কে ফিরে এসেছিলাম। লরা আবার আমার দৈনন্দিন স্মৃতি থেকে মুছে যাচ্ছিল। শহরের ডিপ্রেসিভ রাতগুলোয় ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ত, দূর থেকে পুলিশের সাইরেন ভেসে আসত এবং আমি হয়তো কিছুক্ষণ কোনো লেট নাইট শো দেখতাম। তারপর ইউটিউবে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। একদিন রাতে লরাকে আমি আরেকবার আচমকা স্বপ্ন দেখলাম। ধূসর মরুভূমির মাঝখানে একটা ভূতুড়ে জনহীন শহর। কাঁটাঝোপে ভর্তি একটা খয়েরি ঢিবির নীচে একটা কালো গাড়ি। গাড়িটার পাশে সে দাঁড়িয়েছিল আর তার সামনে অন্ধকার আকাশজোড়া বিশাল ছায়াপথ। অগুনতি মরা নক্ষত্রের আলো তার অবয়বটুকুকে ফুটিয়ে তুলেছে। আমি তাকে পিছন থেকে দেখেই চিনতে পারলাম। এর কয়েকমাস পরে হঠাৎ প্যারিস থেকে লরার একটা ফোন পেলাম আমি। শুরুতে আমরা আমাদের বদলে যাওয়া জীবন নিয়ে বকবক করলাম। এল.এ.র কথা আমি তাকে জানালাম না। তারপর একসময় আমি বুঝতে পারলাম লরার জীবনে কতকগুলো সমস্যা তৈরি হয়েছে। পলের সাথে তার বিভিন্ন কারণে ঝগড়া হয়েছে, তাদের বিয়েটা হয়তো ভেঙে যাবে। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না তারা বিচ্ছেদের আবেদন জানিয়েছে কিনা। আমি নিউইয়র্ক আসছি, সে বলল। তার কথা শেষ হয়ে গেছে নাকি সে আরও কিছু বলবে বুঝতে না পেরে আমি চুপ করে রইলাম। ফ্লাইটের ধকল সামলানোর জন্যে, লরা আমাকে জিগ্যেস করল, সে আমার এখানে একটা রাত কাটিয়ে তার কোনো আত্মীয়ের কাছে চলে যেতে পারে কিনা। নিশ্চয়ই; পাছে সে কোনো হোটেলে ওঠার কথা চিন্তা করে, এই ভেবে তাকে আমি দ্রুত জানালাম আমি তাকে এয়ারপোর্টে আনতে যাব। হাসল সে। তারপর আমরা নানারকম কথা বলে রেখে দিলাম। লরার ফ্লাইট নামার নির্ধারিত সময় ভোরবেলা আর সেটা ছিল একটা বিশ্রী বাদলার দিন। ইন্টারস্টেট ২৭৮ ধরে আমি লাগার্ডিয়া পৌঁছলাম। অ্যারাইভ্যালের সামনে একনজরেই আমি লরাকে খুঁজে পেলাম। বেল্ট থেকে তার লাগেজ সংগ্রহ করে সে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ। তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। প্রথমেই চোখে পড়ল লরা গর্ভবতী। সে আমাকে দেখে হাসল। আমরা দুএকটা কথা বলে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। গাড়িতে তার ব্যাগটা তুলে আমরা ড্রাইভ করে বেরিয়ে এলাম পার্কিং লট ছেড়ে। লরা আমার পাশে বসেছিল সিটবেল্ট বেঁধে। লাগার্ডিয়া থেকে বেরোনোর সময় মারাত্মক জ্যামে পড়লাম আমরা। ট্রাফিক এগোচ্ছিল শম্বুক গতিতে। জলে ভেজা রাস্তা আর মেঘ-থমথমে সমস্ত আকাশ অন্ধকার, এই পরিস্থিতিতে গাড়িগুলো ব্যাকলাইট জ্বেলে এক পা এগিয়েই শ্লথ হয়ে পড়ছিল। উইন্ডস্ক্রিন থেকে ওয়াইপার ঝাপসা স্ট্রীটলাইট-মাখা জলের দানাগুলো ক্রমাগত ঝেড়ে ফেলছিল। আমার হঠাৎ মনে হলো এই জঘন্য আবহাওয়া-সমেত নিউইয়র্ক শহর লরার কাছে একটা দুঃস্বপ্ন। উল্টোদিক থেকে আসা অন্য লেনের গাড়িগুলোর আলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমাদের আর একটার পর একটা ফ্লাইওভার পেরিয়ে আমরা গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছিলাম। অবশেষে যখন আমরা ম্যানহ্যাটানে এসে ঢুকলাম, তখন আকাশ অনেকটা ফর্সা হয়ে গেছে, কিন্তু সকাল আটটার আকাশ তখনও দেখাচ্ছিল ভোর চারটের মতন।

     

    লরা সেদিনটা বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটিয়েছিল। আমি তাকে একবার ডাকতে গিয়ে দেখলাম সে বাচ্চা মেয়ের মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে। আমি রুমহিটারটা একটু বাড়িয়ে দিলাম। সন্ধ্যেবেলা আমরা বসে বসে গল্প করছিলাম। সামনে টেলিভিশন চলছিল। বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। আমি তাকে তার বইটা দেখিয়েছিলাম। সে শুধু মিটিমিটি হেসেছিল। রাতে খাওয়ার পর হঠাৎ লরা আমাকে বলল প্যারিসে থাকার সময় সে আমার ব্লগ পড়ত এবং তার ভালো লাগত। শুনে আমি সেই মুহূর্তেই স্থির এবং নিশ্চল হয়ে গেলাম। যদিও লরা নির্দিষ্ট কোনো পোস্টের কথা উল্লেখ করেনি, তবু আমি জানি ও ঠিক কিসের কথা বলছিল। একটা পুরোনো লেখা, যেটা আমি লিখেছিলাম লরার সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার কিছুদিন পরে। একটা মেয়ের গল্প (এবং কেউ যদি লরাকে চেনে, তার বুঝতে অসুবিধে হবেনা মেয়েটা লরা)। মেয়েটা নিউইয়র্ক শহরকে অপছন্দ করত আর তুষারাচ্ছন্ন আবহাওয়া তাকে অসম্ভব কষ্ট দিত, কাহিনীর টানে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে তাকে আমি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম কানাডার উত্তরে ইয়েলোনাইফ শহরে, একা। তার জীবন ঢেকে গিয়েছিল অদ্ভুত শূন্যতায়। ইয়েলোনাইফের দীর্ঘ ও ক্রূর শীতকাল তাকে আটকে ফেলেছিল একটা শক্তপোক্ত কারাগারে। মেরুজ্যোতি-উজ্জ্বল আকাশের নীচে আশ্চর্য বিষাদে সে আক্রান্ত হয় এবং একদিন সে নিখোঁজ হয়ে যায় ইয়েলোনাইফ থেকে। আমি কোনো ব্যাখ্যা দেবনা কেন আমি এরকম একটা গল্প লিখেছিলাম। হয়তো আমি লরাকে কল্পনা করতে চেয়েছিলাম একাকিত্বের ভেতর হারিয়ে যাওয়া অবস্থায়। অথবা অন্য কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণও থাকতে পারে, আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু লরা লেখাটা পড়েছে, এটা বোঝামাত্র একধরনের অপরাধবোধে আমার মন ছেয়ে গেল। আমি কিছুই বলতে পারলাম না তাকে। ঠোঁটের কোণে একটা আলগা হাসি নিয়ে সে শুতে চলে গেল। আমি কিছুক্ষণ বসে রইলাম মাথা নীচু করে। তারপর আলোটা নিভিয়ে কাউচে এসে আধশোয়া হলাম। বারবার গর্ভবতী লরার ছবি আমার চোখের পর্দায় ভেসে উঠছিল। লরার কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার মনে পড়ল সন্ধ্যেবেলা সে গল্প করতে করতে আমাকে কয়েকটা আশ্চর্য কথা বলছিল। তখন আমার কথাগুলো অতটা অদ্ভুতগোছের লাগেনি, মনে হয়েছিল লরা কোনো সাইফাই সিনেমার গল্প বলছে, কিন্তু এখন টের পেলাম কথাগুলো কীরকম আজব। লরা বলেছিল, প্যারিসে কোনো-কোনোদিন তার মন ভীষণ খারাপ থাকত এবং সে রাত্রিবেলা অনিদ্রায় ভুগত। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে টের পেত তার জীবনটা আসলে একটা আয়নায় দেখা প্রতিবিম্ব। প্রকৃতপক্ষে, সে লরা নয়; লরা নামে একজন নিঃসঙ্গ বায়োলজিস্ট কোনো ভিনগ্রহী ল্যাবরেটরিতে কাজ করে। সেই গ্রহের আকাশ অদ্ভুত সবুজাভ আলোয় ভরে থাকে সারাক্ষণ আর নানারকম আলোজ্বলা উদ্ভিদে সেখানকার রুক্ষ ভূপ্রকৃতির একটা অংশ পরিপূর্ণ। সেই ল্যাবরেটরিতে থাকতে থাকতে মানসিক অবসাদ গ্রাস করে লরাকে এবং সেটা কাটানোর জন্যে লরা কম্পিউটারের সাহায্যে পৃথিবীর কতকগুলো শহরের বাস্তবতা তৈরি করে। দূরের গ্রহে লরা যখন ঘুমিয়ে পড়ত, সে ঘুমের ভেতর হেঁটে বেড়াত পৃথিবীর সেইসব শহরে। সেখানে মায়াবাস্তবতার ভেতরে সে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী এবং এখন সে প্যারিসে থাকে। লরার কথাগুলো চিন্তা করে আমার আশঙ্কা হলো সে গভীর ডিপ্রেশনে ভুগছে। সেইরাতে আমি কাউচে শুয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম যদি লরা ঘুমের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে, কিন্তু সেরাতে আর কিছুই ঘটেনি। পরদিন বেলার দিকে লরাকে আমি গ্রেহাউন্ড বাসস্টেশনে পৌঁছে দিতে গেলাম। বাস ছাড়বার সময় পর্যন্ত আমি লরাকে সঙ্গ দিলাম। আজকে রোদ উঠেছে। লরা চোখে একটা রোদচশমা চাপিয়েছিল। বাসের এঞ্জিন চালু হতে সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, জানলা থেকে হাত নাড়ল এবং আস্তে আস্তে বাসটা বেরিয়ে গেল স্টেশন ছেড়ে।

     

    কেন যেন আমার মনে হয়েছিল এবং সত্যিই লরার সঙ্গে সেটাই ছিল আমার শেষবার দেখা। যে অতিকায় গোলকধাঁধার ভেতর আমাদের জীবনগুলো অপচয় হয়, তার বেশিরভাগটাই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায় শেষপর্যন্ত। ফোনে লরার সাথে কয়েকবার কথা হয়েছিল আমার। সে প্যারিস ফিরে গেছিল। শুনেছিলাম পলের সাথে তার বিয়েটা টিকে যাবে। ওরা ওদের ঝামেলা মিটিয়ে নিতে পেরেছে। আমি তাকে জানিয়েছিলাম নিউইয়র্কে আমার জীবন কেটে যাচ্ছে ভালোই। ক্রমশ আমাদের যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসে। হয়তো আমিই ক্রমশ লরার থেকে দূরে সরে যাই; আমাদের যৌথ স্মৃতি, হারানো দেশ, নিখোঁজ মানুষ বা জাহাজডুবির স্মৃতি, যেভাবে ফ্যাকাশে হয়ে যায়, সেরকমভাবেই। চব্বিশ ঘন্টা সাতদিনের ব্যস্ত জীবনে আমার অবসর বিশেষ ছিলনা। সপ্তাহের সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে শুক্রবারের রাতটা আমি কাটাতাম নাইটক্লাবে কিংবা বারে। এবং নিউইয়র্ক ছিল আমার সঙ্গী। এই শহর ছেড়ে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করতনা আমার। সেটা ছিল শীতের শুরু। জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছে সেদিন। আমি বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে দেখছি কিভাবে বাইরের রাস্তাটা ঢেকে যাচ্ছে গুঁড়ো-গুঁড়ো বরফে, এমনসময় মুখ ঘুরিয়ে বারের ভেতরে সাজানো অনুজ্জ্বল আলোগুলোয় আমার চোখে পড়ল উল্টোদিকের টেবিলে বসা লোকটা। একটুক্ষণ লক্ষ্য করে আমি উঠে এগিয়ে গেলাম লোকটার দিকে — পল? সে মুখ তুলে তাকাল এবং চমকে উঠল আমাকে দেখে। তার দুঃখভারাক্রান্ত মুখটা আমার ভেতরে একটা শিহরণের অনুভূতি জাগালো। কোনো দুঃসংবাদ, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন সাড়া দিল। দুএকটা কথার পরেই আমি লরার খবর জিগ্যেস করলাম। প্রথমে সে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ, বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল আনমনে। ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে আমি জানতে পারলাম লরার কথা। তাদের ছেলে জন্মানোর পর থেকেই লরা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল। আর মাসছয়েক আগে লরা পলকে ছেড়ে চলে গেছে। পলের কাছে তাদের সন্তান রয়ে গেছে। একটা আমূল পরিবর্তন ঘটেছে লরার, পল বলছিল, রাতের পর রাত তাকে দেখতাম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে; আমি তাকে বুঝতে পারতামনা। একদিন সে আমাকে বলেছিল প্যারিসে থাকা আর নিরাপদ নয়। আমি অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম কেন? কেউ আমাদের ওপর নজর রাখছে, সে বলেছিল। এর কিছুদিন পরে গ্রীষ্মের এক রাতে প্যারিসের একটা রেস্তোরাঁয় লরার সঙ্গে আলাপ হয় জঁ-জাক মার্টিনের। নামটা আমার চেনা-চেনা লাগল; তারপরই একটা হিম স্রোত আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। বেশ কয়েকবছর আগে ল্য মঁদে কাগজে জঁ-জাক মার্টিনের সম্পাদকীয় চিঠি বেরোনো নিয়ে প্যারিসের দৈনিকগুলোয় খুব হইচই হয়েছিল। জঁ-জাক মার্টিন হলোকস্টের ঘটনাকে অস্বীকার করেছিলেন এবং আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি সম্পর্কেও সন্দেহ প্রকাশ করেন। তারপর তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয় এবং একসময় ফ্রান্স ছেড়ে তিনি নরওয়ে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। ল্য পেনের উত্থানের পর ফ্রান্সে অতি দক্ষিণপন্থীদের জমায়েত বেড়েছে, পল পানীয়ের গ্লাসটা নামিয়ে রেখে তিক্তস্বরে বলল, লোকটা নির্ঘাত সেরকম কোনো সংগঠনের আমন্ত্রণে প্যারিসে এসেছিল। বারের ভেতরটা অনেক ফাঁকা আজ; লরা ঐ লোকটার সাথে চলে গেছে? — আমি প্রায় ফিসফিসস্বরে লরার প্রাক্তন স্বামীর কাছে জানতে চাইলাম। তারপর অনেকক্ষণ আমরা কথা বললাম না। টেলিফোন কল আর বিষাদের ছায়া, আমি কল্পনা করলাম লরা ও পলের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব। পুরোনো শতকের উদ্ভট জাতিবিদ্বেষী তত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল লরা, যেখানে বলা হয়েছে উষ্ণ আর ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুতে নিকৃষ্ট জাতিগুলির বাস এবং শীতল অক্ষাংশে জাতিগত উৎকর্ষতা লক্ষ্য করা যায়। প্যারিসের রোদ ছেড়ে চলে গেছে লরা জঁ-জাক মার্টিনের সাথে। সেইরাতে পলকে বিদায় জানিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল এত ঠান্ডা আর মরুভূমির মতো প্রকাণ্ড শূন্যতা নিউইয়র্ক শহরে আগে কখনো অনুভব করিনি। বছরখানেক পরে একটি কনফারেন্স উপলক্ষ্যে আমাকে প্যারিস যেতে হয়েছিল। সন্ধ্যেয় ডিনার সেরে হোটেলের লবিতে এক বন্ধুর সাথে গল্প করছি, এমনসময় একজন দীর্ঘকায় প্রৌঢ় লোক সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে ধীরে ধীরে এলিভেটরের দিকে চলে গেল। ঘটনাটা এত আকস্মিকভাবে ঘটে গেল যে আমি অসাড় হয়ে গেছিলাম; তারপরেই আমি লাফিয়ে উঠে এলিভেটরের দিকে দ্রুত পায়ে এগোলাম। এলিভেটরের সামনে তিনজন লোক; সবচেয়ে বাঁদিকে জঁ-জাক মার্টিন। আমার সাথে তার চোখাচুখি হলো। টিং করে ঘন্টি বাজল আর আলো জ্বলে উঠল; এলিভেটরটা এসে দাঁড়ালো, দরজা খুলে গেল ঘড়ঘড় শব্দে। ধাতবকক্ষের ভেতর ফ্লুরোসেন্ট আলো। দুজন লোক বেরিয়ে এল; চারজন লোক ঢুকল। আমি একেবারে পিছনের দিকে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম। জঁ-জাক মার্টিন সামনে। একে একে সবাই বোতাম টিপল। সতর্কচোখে লক্ষ্য করলাম জঁ-জাক মার্টিন টিপলেন পাঁচনম্বর বোতাম। এবার আমার পালা। পাঁচ টিপব? লোকটা সন্দেহ করবে? কিসের জন্যে? আমি নিজেই জানিনা আমি লোকটার পিছু নিয়েছি কেন। দোনামোনা করে হাত বাড়িয়ে সাত টিপে দিলাম। চারতলায় বাকী দুজন নেমে গেল। এলিভেটরে সামনের বাঁ কোণে জঁ-জাক মার্টিন। পিছনে ডান কোণে আমি। কয়েক সেকেন্ড লাগে এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে উঠতে। এবং সেটা কী দীর্ঘ সময়! টিং! এলিভেটরটা থামল। দরজাটা দুদিকে সরে যেতেই জঁ-জাক মার্টিন বেরিয়ে গেলেন। একমুহূর্ত অপেক্ষা করেই পা-টা গলিয়ে দিলাম বন্ধ হয়ে আসা দরজার ফাঁকে। পায়ে আটকে যেতেই দরজাটা আবার খুলে গেল। নরম কার্পেট বিছানো হোটেলের করিডর। ঘোলাটে ছায়াহীন আলোকসজ্জা। মসৃণ দেয়ালে ঝোলানো অয়েলপেন্টিং। মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন জঁ-জাক মার্টিন। হাতদুটো শরীরের দুদিকে ঝোলানো; মাথাটা সামান্য ঝুঁকে আছে। আমি তাঁকে নিঃশব্দে অনুসরণ করছি। নিজের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যখন ইয়েল লকটা খোলার উপক্রম করছেন, আমি তাঁর থেকে হাতপাঁচেক দূরে স্থির হলাম। দরজাটা খুলে গেল, কিন্তু আমার উপস্থিতি টের পেয়ে জঁ-জাক মার্টিন দাঁড়িয়ে রইলেন। তাকালেন আমার দিকে। আমি লরার বন্ধু, আমি বললাম। লোকটার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। লরা এখানে নেই, কেজোগলায় বলল, লরা মারা গিয়েছে। গাড়ি দুর্ঘটনায়। অসলোর উত্তরে পাহাড়ী রাস্তায় একা ড্রাইভ করছিল। বরফে চাকা পিছলে খাদে তিনশো মিটার নীচে। তারপর তিনি ঘরে ঢুকে উদ্ধতভাবে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন আমার মুখের ওপর। সেইরাতে আমি আমার ঘরে ফিরে অনেকক্ষণ বাথরুমের আয়নার সামনে কাটিয়েছিলাম। রাত দেড়টার সময় আমি এককাপ কফি বানিয়ে খাই। রাত দুটোর সময় জানলার কাছে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করি একটা কালো এসইউভি এসে দাঁড়ালো হোটেলের পর্চে। দূরে প্যারিসের মধ্যরাতের স্কাইলাইন। রাত তিনটের সময় আমি কফির দ্বিতীয় পাউচটা খরচ করি। খুব কমই ঘুমিয়েছিলাম সেরাতে।

  • বিভাগ : গপ্পো | ০১ মে ২০২১ | ১২১২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ০১ মে ২০২১ ০৭:১৬105320
  • ছবি। টুকরো টুকরো ছবি। মাথার মধ্যে কোলাজ। 

  • Debayan Chatterjee | ০৪ মে ২০২১ ১৭:৪৮105458
  • যতবার আপনার লেখা পড়ি, মনে মনে আপনার বয়েসটা আন্দাজ করার চেষ্টা করি। কোনবারই পারিনা অবশ্য। আপনার লেখার টাইমলেস্ কোয়ালিটি-ই এর জন্যে দায়ী।


    আপনার কলম আরো দৃঢ় হোক, এই কামনা করি।

  • সায়ন্তন চৌধুরী | ০৫ মে ২০২১ ০৩:০৩105475
  • দেবায়ন, আপনার লেখার দিকে আমি লক্ষ্য রাখি; হোঁচট-পাথর ও বোম্বে সংক্রান্ত লেখাদুটো পড়েছি। কাহিনী নরমমতো লাগলেও আপনার লেখার স্টাইল আমার ভালো লেগেছে। বিশেষত আপনার লেখায় অভিবাসনের প্রভাব আমার নজরে পড়েছে, আমার এব্যাপারে আগ্রহ আছে বলে কয়েকটা কথা লিখছি। অভিবাসন অর্থে কেবল একদেশ থেকে অন্যদেশ বলছিনা, এক শহর থেকে অন্য শহরে স্থানান্তরকেও ধরছি; তো, আমার ধারণা একুশ শতকের লেখালিখিতে অভিবাসন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে এবং বাংলা লেখালিখিতেও এই প্রভাবটা আসা দরকার। আপনি অ্যাডাম কার্শের একটা শখানেক পাতার বই 'The Global Novel: Writing the World in the 21st Century' পড়ে দেখতে পারেন, যেখানে আটটি উপন্যাসকে ধরে উনি দেখাচ্ছেন কিভাবে ভাষাসাহিত্যগুলির ভৌগোলিক সীমানা ভেঙে যাচ্ছে। আপনি আগ্রহ পেলে লেখার ক্রাফট নিয়ে আরো আলোচনা করা যাবে। লিখতে থাকুন।

  • Ranjan Roy | ০৫ মে ২০২১ ০৯:৩০105479
  • সায়ন্তন


    লেখার ক্রাফট নিয়ে আপনাদের আলোচনা শুনতে আগ্রহী। সময় পেলে এ নিয়েও টই  খুলতে পারেন। 

  • Debayan Chatterjee | ০৫ মে ২০২১ ১৫:০০105504
  • সায়ন্তনবাবু,


    হনেস্টলি স্পিকিং - আমার লেখায় অভিবাসনের প্রভাব পড়েছে, একথা আমি নিজে থেকে কখনো ভেবে দেখিনি। আপনি না বললে কখনো ভাবতামও না হয়তো। বইটা অবশ্যই নেড়েচেড়ে দেখবো, তবে এই আলোচনাটাও চলুক - এটাও খুব জরুরি।


    রঞ্জনবাবু,


    একটা নতুন টই খুলবার সাজেশন দিয়েছেন - বেশ ভাল আইডিয়া। আপনাকেও সেখানে পেতে চাই।

  • ভাষা ভাষা | ১০ জুলাই ২০২১ ২০:৪৫495712
  • এ এক অদ্ভুত ধাঁধা,নির্জন একাকিত্বে,অচেনা গোপনে প্রেমকে যেন আরও গভীরভাবে অনুভব করা যায়! শুধু হারিয়ে যাওয়া প্রেমের ক্ষেত্রেই নয় বর্তমান প্রসঙ্গেও সত্যি। যে একাকিত্বে কোনও আয়না নেই আর থাকলেও যা এককে ভেঙে  দুই করতে পারে না সেই একাকিত্বের ভেতর হারিয়ে যাওয়া অবস্থায় পড়ে ফেললাম লেখাটা।


    আর আপনার লেখা! ওফ! তার এমনই টান -- একটা জায়গায় যাওয়ার ছিল। শুরু থেকে শেয একটানা না পড়ে উঠতে পারলাম না! এবার বেরোতেই হবে। ভালো থাকবেন। আরও আরও লিখুন।

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন