• বুলবুলভাজা  আলোচনা  অর্থনীতি

  • শেষে কি নিজেকে খাবে?

    অমিতাভ গুপ্ত
    আলোচনা | অর্থনীতি | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২৫২ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • যদি দশটা বছর আগে এই কোভিড অতিমারি এসে হাজির হত? ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ নাগাদ? জানি না, এখনও স্কুলের ছেলেমেয়েদের ‘বিজ্ঞান: আশীর্বাদ না অভিশাপ’ শীর্ষক নিবন্ধ লিখতে হয় কি না। যদি হয়, তা হলে এই প্রশ্নটা তাদের যুক্তি নম্বর এক হতে পারে। ২০১০ সালে কোভিড এলে গোটা দুনিয়ার অর্থব্যবস্থা সম্ভবত আরও মুথ থুবড়ে পড়ত একটামাত্র কারণে— মাত্র দশ বছর আগেও দুনিয়ার পক্ষে এ ভাবে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করা সম্ভব হত না। ঘরে ঘরে হাই-স্পিড ইন্টারনেট, ইচ্ছেমতো ভিডিয়ো কল করার স্বাধীনতা, একই সঙ্গে অনেক জায়গায় ছড়িয়ে থাকা কম্পিউটারকে জুড়ে রাখা এক নেটওয়ার্কের সুতোয়— কোনওটাই হত না দশ বছর আগে। ফলে, হয় মানুষকে রাস্তায় নামতেই হত— তাতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ত বহু গুণ— আর নয়তো আরও অনেক বেশি অর্থনৈতিক কাজকর্ম বন্ধ রাখতে হত। দুটোতেই ধাক্কা লাগত অর্থব্যবস্থার গায়ে।

    ২০২০ সালে ওয়ার্ক ফ্রম হোম গোটা দুনিয়ার অর্থব্যবস্থাকে এই ধাক্কা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু, দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অন্য বিপদের সামনে। দুনিয়া জুড়েই বহু সংস্থা জানাচ্ছে, অতিমারির পালা চুকলেও ওয়ার্ক ফ্রম হোম বন্ধ হবে না— অন্তত পুরোপুরি না। কর্মীদের একটা বড় অংশ কাজ করবেন দূর থেকেই— যাকে বলে টু ওয়ার্ক রিমোটলি— অফিসের সঙ্গে তাঁদের জুড়ে রাখবে তথ্যপ্রযুক্তির সুতো। এটাকে বিপদ বলছি কেন? তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বেশ আলোচনা হয়ে গিয়েছে। বিশেষত, সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা না হওয়ার, অফিসে না যেতে পারার মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে। এক অনিবার্য বিচ্ছিন্নতা। অফিসের পরিসরটাই যদি হাওয়ায় মিলিয়ে যায় বিলকুল, তা হলে আর কোথায় গিয়ে দেখা হবে সহকর্মীদের সঙ্গে? আমার কথাই বলি— গত দেড় দশকেরও বেশি চাকরি করছি একই অফিসের একই ঘরে, একই লোকদের সঙ্গে। সপ্তাহে ছ’দিন, দিনের অন্তত আটটা ঘণ্টা, তাঁদের সঙ্গে কাটে। কাজের ফাঁকে আড্ডা, এ-ওর বাড়ির খবর নেওয়া, খাওয়া, মনখারাপের কথা বলা, আনন্দে লাফালাফি করা— ওই ঘরে বসা লোকগুলোর সঙ্গে তো শুধু কাজের সম্পর্ক নয়। ভেবে দেখলে, পরিবারের সঙ্গে যত সময় কাটিয়েছি গত পনেরো বছরে, অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে কাটিয়েছি তার চেয়ে বেশি। জীবনের সেই দিকটা যদি ভোজের বাজি ভেল্কি ফাঁকির মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, ধাক্কা তো লাগবেই।

    কিন্তু, তার চেয়ে অনেক বড় বিপদ আছে। দুনিয়ায় এখন আর্থিক অসাম্য যতখানি, টমাস পিকেটি সাক্ষী, শিল্প বিপ্লবের পর আর কখনও অসাম্য এতখানি বাড়েনি। অসাম্য জিনিসটা তার নিজের কারণেই খারাপ— জিনিসটা অন্যায়, অনৈতিক। কিন্তু, পুঁজিবাদের একটা কু-অভ্যাস, তা নৈতিকতার যুক্তিকে স্বীকার করতে চায় না। কাজেই, চাহিদা-জোগানের দিক থেকেও যে অসাম্য জিনিসটা খারাপ, সেটা মনে করিয়ে দেওয়া ভাল।ধরুন, মোট ১০০ টাকা আছে, সেটাকে দু’রকম ভাবে ভাগ করা যায়— দশ জনের মধ্যে দশ টাকা করে; আর, এক জন ৯১ টাকা, বাকি ন’জন এক টাকা করে। দ্বিতীয় বিকল্পে শেষ ন’জনের ক্রয়ক্ষমতা বলে কার্যত কিছু নেই, ফলে তাঁদের চাহিদাও নেই। প্রথম জনের হাতে অনেক টাকা, কিন্তু ভোগব্যয়ে খরচ করার প্রথমত একটা সীমা আছে; আর দ্বিতীয়ত, প্রাথমিকপ্রয়োজন মেটানোর পর যে ভোগব্যয়, তাতে খরচ হওয়া টাকার বণ্টনও এই দ্বিতীয় বিকল্পের মতোই অসম। মোটমাট, সবাই হাতে দশ টাকা করে পেলে বাজারে মোট চাহিদা যতখানি বাড়ত, এক জনের হাতে ৯১ টাকা গেলে শেষ অবধি চাহিদা বাড়বে তার চেয়ে ঢের কম। এবং, আজকে দায়ে পড়ে নরেন্দ্র মোদী বা ডোনাল্ড ট্রাম্পরা যে কথাটা শিখছেন, জন মেনার্ড কেইনস নামক ব্রিটিশ ভদ্রলোক ৯০ বছর আগে সেই কথাটা বলে গিয়েছিলেন— বাজারে চাহিদা না থাকলে অর্থনীতির সর্বনাশ। আর্থিক অসাম্য যে সেই সর্বনাশটার দিকেই ঠেলছে দুনিয়াকে, গত কয়েক মাসে একেবারে হাতেকলমে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে।

    কিন্তু, ধান ভানতে এই শিবের গীত কেন? হচ্ছিল ওয়ার্ক ফ্রম হোমের কথা, সেখানে আর্থিক অসাম্য এল কোথা থেকে? এল ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ নামক অধুনা-পরিচিত শব্দবন্ধের হাত ধরে। ওয়ার্ক ফ্রম হোম বস্তুটার পূর্বশর্ত হল, সেটা কাজ করে শুধু নলেজ ইকনমিতে। অর্থাৎ, যেখানে হাতেকলমে উৎপাদনের প্রশ্ন নেই। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এ কাজ করতে পারে; গরিব ছেলেমেয়েদের ছেঁটে দিলে শিক্ষাব্যবস্থাও চলতে পারে বাড়িতে বসেই; খবরের কাগজ চলতে পারে, সফটওয়্যারের দুনিয়া চলতে পারে। কিন্তু, যাঁরা ব্লু-কলার জব করেন, বাড়িতে বসে কাজ করার উপায় তাঁদের নেই। খেয়াল করে দেখলে, যাঁরা হাতেকলমে কাজ করেন, পুঁজিবাদের চৌহদ্দিতে তাঁরা অনেক আগে থেকেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাঁদের গায়ে ঘামের গন্ধ বেশি, তাঁদের মাইনে কম, ছুটিছাঁটা কম, সুযোগসুবিধা কম, নিরাপত্তা কম। ভারতের মতো দেশে তো আরও চমৎকার— এই মানুষদের একটা বড় অংশ সংগঠিত ক্ষেত্রের অসংগঠিত শ্রমিক। চির-প্রান্তিক। এই অসাম্যকেই আরও বাড়িয়ে দেবে ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এর নতুন বাস্তব।

    স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ নিকোলাস ব্লুমকে নিয়ে ইদানীং আন্তর্জাতিক মিডিয়া বেশ টানাটানি করছে— কারণ, ব্লুম ২০১৪ সালে একটা বড় মাপের গবেষণা করেছিলেন ওয়ার্ক ফ্রম হোমের অর্থনৈতিক দিক নিয়ে। তিনি বলছেন, অসাম্যের ঢেউ আছড়ে পড়তে চলেছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ৩৫ শতাংশ মানুষের কাছে ভাল স্পিডের ইন্টারনেট কানেকশন নেই, বসে কাজ করার মতো জায়গা নেই। যাঁদের সেই সুবিধা আছে, তাঁদের থেকে স্বভাবতই পিছিয়ে পড়তে থাকবেন এই ৩৫ শতাংশ। যাঁদের বাড়িতে জায়গা আছে, ভাল ইন্টারনেট নেওয়ার নেওয়ার সামর্থ্য আছে, ওয়ার্ক ফ্রম হোম তাঁদের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে— দুনিয়া জুড়েই সেই সাক্ষ্য মিলছে। আর, যাঁদের এই সুবিধাগুলো নেই, কমছে তাঁদের উৎপাদনশীলতা। কাল বাদে পরশু উৎপাদনশীলতার মাপকাঠিতে ছাঁটাই হলে কারা বাদ পড়বেন, অনুমান করার জন্য কোনও নম্বর নেই।

    আরও একটা বিপদ আছে। এই ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এর সংস্কৃতির একেবারে গোড়ার কথাটাই হল, কর্মীদের উপস্থিতি ছাড়াই কাজ চলবে। প্রযুক্তি যে পথে এগোচ্ছে, তাতে অনুমান করা যায়, বাহ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এর প্রচলন বাড়বে। অর্থাৎ, বাড়িতে বসে কম্পিউটারের মাধ্যমে নির্দেশ দেবেন এক জন, আর সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে রোবট। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। ইতিমধ্যেই দুনিয়া সে পথে হাঁটতে আরম্ভ করেছে। তাতে অনেক সুবিধা। রোবটের ছুটি লাগে না, রোবটের পেটখারাপও হয় না। রোবট অবাধ্য হয় না, আড্ডা মেরে সময় নষ্ট করে না। পুঁজিবাদের কাছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আকর্ষণ অমোঘ। এই অতিমারি সে গন্তব্যে যাত্রার বেগ বাড়িয়ে দিল, এই যা। এই ব্যবস্থায় আর্থিক অসাম্য বাড়বে স্বাভাবিক ভাবেই, কারণ রোবটকে তো আর মাইনে দিতে হয় না। যাদের দিতে হত, তাদের পাকাপাকি বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

    তবে, একটা কথা মনে রাখা ভাল— রোবট কিন্তু খরচও করতে পারে না। কারখানার শ্রমিকরা মাইনে পেলেই দৌড়োন দোকানে— রাজগারের একটা বড় অংশ দিয়ে কেনেন সেই সব জিনিস, পুঁজিবাদ যা উৎপাদন করে চলেছে। মানুষগুলো চাকরি হারালে এই চাহিদার একটা বড় অংশ উবে যাবে। তখন?

    সুধীন দত্ত হয়তো বলতেন, পুঁজিবাদই হল সেই উটপাখি, যে অখিল ক্ষুধায় শেষে নিজেকে খাবে।

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২৫২ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আরও পড়ুন
কাঠাম - Rumela Saha
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অনিন্দিতা | 103.87.57.133 | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৯:৪৩96981
  • অর্থনৈতিক প্রগতির লক্ষণকে এখন বলা হচ্ছে K-shaped অর্থাৎ একটা দাঁড়ি উঠতে থাকবে আর অন্যটি পড়তে থাকবে। জনসংখ্যার কোন অংশ কোনদিকে তা সহজেই অনুমেয়। 

  • রঞ্জন | 122.162.112.84 | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২০:২০96983
  • আমার ব্যক্তিগত মত (মানে যতটুকু তাড়াহুড়োয় বুঝেছি আর কি) এই  k শেপ বা     অন্য গ্রুপটি  v, w  L, -- দুটোর প্রেক্ষিত আলাদা। গোটা ইকনমির রিকভারি হবে ওই v, বা w  বা L গতিপথে। কিন্তু  দেশের সম্পত্তি বা জিডিপিতে কবজা হবে k শেপ এ।

    অর্থাৎ গোটা ইকনমি চুলোয় গেলেওঃ ধরুন   w    বা     L  আদানি/আম্বানিদের বৃদ্ধি হতেই থাকবে। ভারতের এভিয়েশনের হাঁড়ির হাল আর একটি পরিবারের একের পর এক এয়ারপোর্ট ম্যানেজমেন্ট অধিগ্রহণএর খেলটা দেখুন।

    তবে আসল কথাটা অমিতাভ বলেছেন শেষ প্যারায়।

    সমস্ত কুলীনদের লেখাপত্তরে টিভি টক এ এখন  'এ আই ' এর কথা। ওতেই নাকি দেশের ভবিষ্যৎ!

  • | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২১:০৩96986
  • ইসে, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের ফ্লিপ সাইড নিয়ে ওয়াল্ল স্ট্রীট জার্নাল লিখেছে আরো কেউ কেউ লিখেছে বটে। আমি নিজেও অফিস মিস করছি তাও বটে। কিন্তু এটা কিছু মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়েও আসতে পারে। আইটিতে অনেক মেয়ে বিয়ের পর বা সন্তানজন্মের আগেপরে চাকরি ছেড়ে দেয় বা সবদিক সামলাতে গিয়ে দিতে বাধ্য হয়। এদের অনেকেই চালিয়ে যেতে পারবে পাকাপাকি ও ফ্রহো হলে। আবার কলকাতায় আইটির একটাই হাব সেক্টর ৫ আর নিউটাউন মিলিয়ে। সেখানে চাকরি করতে যারা কোন্নগর বদ্যিবাটি ভদ্রেশ্বর শ্যামনগর ব্যারাকপুর থেকে আসে তাদের আড়াই থেকে ৪ ঘন্টা পর্যন্ত লাগে। ওফ্রহো পাকা হলে এদের দিনে ৫ থেকে ৮ ঘন্টা অবধি রাস্তায় কাটাতে হবে না। এছাড়াও এর জন্য কলকাতায় বাড়ি নিয়ে থাকতে হবে না বলে রোজগারের টাকার অংশ স্থানীয়ভাবে খরচ হবে। ফলে সেখানকার অর্থনীতি কিছুটা হলেও জোর পাবে।
  • Prativa Sarker | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২১:০৪96987
  • তখন ?  নিজের হাত পা কামড়ে খাবে আর কী ! 

    যেন একটা অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং অন্তহীন যাত্রা। খাবলা অন্ধকার তুলে নিলে অন্ধকারই থাকবে।    

  • | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২১:০৫96988
  • *তাদের এক একপিঠেই আড়াই থেকে চারঘন্টা লাগে
  • শ্রীরূপা বন্দ্যোপাধ্যায় | 2409:4060:210c:e2f3::263:28a1 | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২১:২৫96989
  • দুর্দান্ত লেখা ! নিজেকে খাওয়া ছাড়া পুঁজিবাদের আর রাস্তা কোথায়? তাই তো খেয়ে চলেছে সে তার বিকাশ বন্ধ হওয়া ইস্তক। তা না হলে কেনই বা বৈষম্যের এই চেহারা, আর কেনই বা এমন বাজার সংকট !

  • Arijit | 106.51.243.19 | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:১৮96993
  • এরকম অযৌক্তিক বোকা বোকা লেখা খুব কম পড়েছি জীবনে।

  • শঙ্খ | 103.217.235.171 | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:৫২96994
  • অনেকগুলো জিনিস একসঙ্গে মেলাতে গিয়ে একটু তালগোল পাকিয়ে গেছে।

    প্রথমতঃ ওয়ার্ক ফ্রম হোম বা টেলিকমিউট আগেও ছিল, বেশ ভালো মাত্রাতেই ছিল তবে জায়গা বিশেষে। দুহাজার নয়ের কথাই বলতে পারি, আমাদের প্রজেক্ট আটলান্টায় চলছে, ওদিকে প্রোডাক্ট ওনার থাকেন ভার্জিনিয়ার হার্নডনে। মাসে একদুবার আসেন খুব দরকার থাকলে, নইলে কাজ চলে গোটুমিটিং বা স্কাইপ কলে। আমি নিজেই বাড়ির সঙ্গে কথা বলতাম স্কাইপে।

    দুহাজার বারোতে সপ্তাহে একদিন করে ওফ্রোহো ছিল একদম নিয়ম করে। ফোর-টেন মডেল, যেখানে সপ্তাহে চারদিন দশ ঘন্টা করে কাজ আর তিনদিন উইকেন্ড তখনই বেশ পপুলার মডেল। আমার এক রুমি ছিল, চারদিন নিউ ইয়র্কে কাজ, বেস্পতিবারে বিকেলে চলে যেত নিজের বাড়ি উইলমিংটনে, ডেলাওয়ারে। আবার সোমবার সকালে সিধে অফিসে। অনেকেই এই মোডে কাজ করত।

    তারপর এলো হারিকেন স্যান্ডি, ডাউনটাউনের আর আমাদের হাতে হ্যারিকেন ধরিয়ে গেলো। বেশ কয়েকমাস কমপ্লিট ওফ্রোহো। তারপর মিড্টাউনের অফিসে কয়েকমাস কাজ করতে হয়, তার একটা রোস্টার ছিল, সপ্তাহে এক দু দিন অফিস, কে কবে যাবে। একটাও ডেলিভারি মিস হয়নি।

    এখনও যে ওফ্রোহো হচ্ছে, তাতে উল্টে দেখা গেছে লোকের প্রোডাকটিভিটি বেড়ে গেছে। অবশ্যই বার্ন আউট আছে, থাকাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সত্যের খাতিরে বলতে হবে, অপশান দিলে লোকে ওফ্রোহোটাই নেবে। আমাদের যেমন ক্লায়েন্ট ক্লজে আটকে গিয়ে অফিসে গিয়ে সিকিওর ওডিসি থেকেই কেবলমাত্র কাজ করতে হচ্ছে, বাকি প্রজেক্টে ওফ্রোহো অ্যালাউড, তাতে অনেকে আমাদের প্রজেক্ট ছেড়ে ঐসব প্রজেক্টে যেতে চাইছে। উপায় থাকলে আমিও তাই করতুম। এই চাহিদা বহুদিন ধরে ইন্ডিয়ার আইটি কোম্পানিতে ছিল, আছে, কাজেই এটাকে কোম্পানির চাপিয়ে দেওয়া বললে সত্যের অপলাপ অইব, কিন্তু কোন প্রোজেক্টই এই পিওসি টি করতে রাজি ছিলেন না, এখন ঠ্যাকারে পড়ে করতে বাধ্য হয়েছেন, এবং দেখেছেন এতে লাভ অনেক বেশি এবং ফিজিবলও, কাজেই দিস উইল বি নিউ নর্ম। ব্যস এটুকুই।

    হ্যাঁ আরেকটা জিনিস হয়েছে, আইটি বাদেও অন্য কর্মক্ষেত্রে হয়ত ওফ্রোহো নিয়ে কর্তৃপক্ষ একদমই ভাবতেন না, কিন্তু এখন আর পরের মুখে ঝাল খেতে হচ্ছে না, কোলাবরেশান টুল এখন ঘর ঘর কি কাহানিয়া। য়ামার, টিমস, শেয়ার পয়েন্ট, স্ল্যাক, ওয়ানড্রাইভ এখন আর শুধু আইটির ভাইটির কাপ অফ টী না, বহু জায়গাতেই এসব চলছে।

    এবং এর সঙ্গে হাতে কলমে কাজের কোন বিরোধ বা সদ্ভাব আগেও ছিলো না, এখনো নেই। ইন্টার বা ইন্ট্রা হোয়াইট আর ব্লু কালার জবে অসাম্য আগেও ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও থাকারই কথা, কিন্তু ওফ্রোহো তাতে আলাদা করে কোন মাত্রা যোগ করে না। এটি একান্ত ভাবেই হোয়াইট কালারের শ্রমিকদের কাজের একটি পদ্ধতিমাত্র। ঠিক যেমন হোয়াইট কালার জবের লোকেরা আগে বেশির ভাগ ডেস্কটপে কাজ করতেন, এখন ল্যাপটপে করেন, এবারে অসাম্য বাড়াতে ঐ ল্যাপটপের যা ভূমিকা, ওফ্রোহো এরও তাই।

    একইভাবে ওফ্রোহো র মোদ্দা কথাটা "কর্মীদের উপস্থিতি ছাড়াই কাজ চলবে" একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা। ওফ্রোহো তে কর্মীদের উপস্থিতি ভীষণ ভাবে দরকার। সেসব মনিটরিং করার, বোঝার অনেক উপায় আছে। প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্টের ধারণা এখন অনেক পাল্টেছে, আইটিতে বেশির ভাগ প্রোজেক্ট এখন ক্লায়েন্ট নিজেই ম্যানেজ করে, হ্যাঁ সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পাড়ে বসেই। কিন্তু সে সব লিখতে গেলে অনেক হ্যাজ। আর এই একই ক্থা প্রযোজ্য এআই বা আরপিএ নিয়েও। এসবের ফলে কর্মী সংকোচন হবে কি হবে না, সেসব পরের কথা, অন্য অলোচনার বিষয়বস্তু, এসবের সঙ্গে ওফ্রোহো গোলালে চলবে না।
  • দূর্বা | 142.120.57.188 | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২২:৫৬97026
  • WFH এর ভালমন্দ দুদিকই আছে। আপাতত মহামারীর মধ্যে অফিস যেতে না হওয়ায় চাকরি আর প্রাণ দুটোই খানিক রক্ষা পেয়েছে অস্বীকার করার উপায় নেই।
    একটা পরিবারে স্বামী স্ত্রী দুজনেই বাড়ি থেকে কাজ করলে আর তাদের বাচ্চকেও বাড়ি থেকেই স্কুল করতে হলে সবার আলাদা কমপিউটার লাগে। আলাদা ঘর, আলাদা বসার জন্য চেয়ার টেবিল সব লাগে। সবাই এক সঙ্গে video conferencing করলে internet bandwidth কমে যায়। দিনভোর বাড়ি থেকে কাজ করলে বাড়ির বিদ্যুতের খরচা বাড়ে। এখন অবধি এই পুরো ব্যবস্থার জন্য বাড়তি খরচ নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে।
    সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার এখন আর কেউ বাড়ি যেতে হবে বলে কাজ গোটাতে হবে এটা ভাবা বন্ধ করে দিয়েছে। সবসময়ই বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে তাই কাজও এসে যাচ্ছে। আর মানুষের সঙ্গ, স্পর্শ ইত্যাদির অভাব যে মনের ওপর কী চাপ তৈরি করে, সেতো আরও এক বড় প্রসঙ্গ।

    মোট কথা অফিসে গিয়ে সময়মত কাজ সেরে ফিরে আসতে পারাটা অনেক ভাল ছিল।
  • r2h | 73.106.235.66 | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:১১97027
  • ১৯৬০-এ লুরুতে ২৮০টা মত জলাভূমি ছিল, এখন ৮০-টার কমে দাঁড়িয়েছে, নদীগুলো নর্দমা, পাহাড় টাহাড় কেটে সমান করে দিয়েছে। সব চকচকে শহরেরই তো হরেদরে এক দশা।

    এইবার পরিযায়ী কর্মীরা যদি লকডাউনের বাজারে বাড়ি ফেরে (ভাড়া বাড়ি ছাড়া, মুভিং লজিস্টিকসের পরামর্শ চেয়ে অনেক পোস্ট দেখি ফেবু গ্রুপগুলিতে), তাহলে কী হতে পারে সেটা ইন্টারেস্টিং।

    এবং গ্রাম, ছোট শহরের লোকজন সেসব জায়গায় যায়, ফেরে, থাকে, এবং বড় শহরের হুড়যুদ্ধের থেকে সরে সেসব জায়গার সমস্যা ও সুবিধে, সুখ দুঃখ এইসবের একটু কাছাকাছি আসে, তাহলে কী হবে সেটাও ইন্টারেস্টিং। নিজের বাড়ি বসে কাজ করার সুযোগ পেলে সেসব হতে পারে। এমনিতেও সারাক্ষন আপিসের লোকের সঙ্গে না থেকে এমনি বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে থাকা ভালো, তবে আমাদের যেহেতু আপিসেই সব সময় চলে যায় তাই ঐসবের জন্যে সময় থাকে না।

    সব কিছুরই ভালো মন্দ আছে। দেখা যাক কী হয়।

    বাজার নিয়ে হাহাকারটা কমতে দেখলে ভালো লাগতো। বাজার এবং টাকা - এই দুই ছাড়া মানবজাতির হাতে হারিকেন, এইটা পরিতাপের বিষয়।
  • মৌলিক | 2409:4066:21b:4173::1942:78ac | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২২:৪৪97071
  • সুন্দর আলোচনা

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত