• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • ভারতীয় ফুটবলের ত্রিদেব

    কল্লোল লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৩ জুন ২০২০ | ১২৭১ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • চুনী-পিকে-বলরাম এই তিনটি নাম তাদের সময়ের তো বটেই আজকের ফুটবলপ্রেমী প্রজন্মের কাছেও ভারতীয় ফুটবলের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। ১৯৫১ ও ১৯৬২-র এশিয়াড জয়ের কীর্তি সরিয়ে রাখলেও, ১৯৫৬-এ মেলবোর্ন অলিম্পিকে ৪র্থ হওয়া, ১৯৬০-এ রোম অলিম্পিকে প্রথম রাউন্ড, মারডেকা টুর্নামেন্ট ১৯৫৯ আর ১৯৬৪-এ রানার্স, আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থতা। কিন্তু পরবর্তী ভারতীয় ফুটবল এই ব্যর্থতার ধারে কাছেও পৌঁছাতে পারেনি, ব্যতিক্রম ২০০৩-এ ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের এশিয়ান ক্লাব কাপ চাম্পিয়ান। কিন্তু সে তো ক্লাব ফুটবল।

    সেই ১৯৫১ থেকে ১৯৬৪-র দলে যারা ছিলেন—
    • ১৯৫১—বরদারাজ, অ্যান্টনি, সম্মুগম, ভার্গিস, মান্না, চন্দন সিং, লতিফ, নূর, ভেঙ্কটেশ, রুনু গুহঠাকুরতা, মেওয়ালাল, আমেদ, সালে, সন্তোষ নন্দী প্রভৃতি।
    • ১৯৫৬—থঙ্গরাজ, নারায়ন, আজিজ, লতিফ, রহমান, কেম্পিয়া, নূর, নিখিল নন্দী, সালাম, কানাইয়ান, নেভিল ডিসুজা, বলরাম, পিকে, কিট্টু, জুলফিকার প্রভৃতি।
    • ১৯৬০—থঙ্গরাজ, নারায়ন, লতিফ, অরুণ ঘোষ, জার্নেল, ফ্র্যাঙ্কো, কেম্পিয়া, বাহাদুর ছেত্রী, মলয় লাহিড়ী, বলরাম, পিকে, চুনী, হাকিম, হামিদ, কান্নান, ইউসুফ খান, সুন্দররাজ প্রভৃতি।
    • ১৯৬২—থঙ্গরাজ, পি বর্মন, জার্নেল, ত্রিলোক, অরুণ ঘোষ, আফজল, ফ্র্যাঙ্কো, রামবাহাদুর, পি সিনহা, পিকে, চুনী, বলরাম, এথিরাজ, ইউসুফ খান, অরুময় প্রভৃতি।
    • ১৯৬৪—মুস্তাফা, সালিমুদ্দিন, নঈম, জার্নেল, সুশীল সিনহা, মাধবন, ফ্র্যাঙ্কো, পি সিনহা, ডন্ডপথি, পিকে, চুনী, ইউসুফ খান, অসীম মৌলিক, ইন্দর সিং, ডেরেক ডিসুজা, কাজল মুখার্জি প্রভৃতি। 



    একটু খেয়াল করুন, ১৯৫১-র মেওয়ালাল, আমেদ, সালের জায়গায় চলে আসছেন পিকে, বলরাম ও চুনী ১৯৬০-র মধ্যে। গোলে চলে আসছেন থঙ্গরাজ। ডিফেন্সে মান্না, লতিফের জায়গায়  অরুণ ঘোষ, জার্নেল। হাফ থেকে উইং থেকে ইনসাইডে খেলতে পারদর্শী ইউসুফ খান। একটা প্রজন্ম সরে যাচ্ছে, নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে।

    আমাদের প্রজন্ম যারা এখন ৬০ থেকে ৬৫-র মধ্যে আমরাও এঁদের খেলা দেখিনি। তখন আমাদের বয়স ৫ থেকে ৯। ফলে মাঠে গিয়ে খেলা দেখার প্রশ্ন নেই। রেডিয়োতে রিলে হত, সে শুনে খেলা বোঝার মতো বয়স হয়নি আমাদের। সবচেয়ে দুঃখ আর আপশোশ এদের খেলার কোনো ফিল্মও পাবলিক ডোমেনে কোথাও পাই না। অথচ ১৯৬২-র এশিয়ান গেমসের ফাইনালের ফিল্ম তোলা হয়নি, এটা হতে পারে না। আর কিছু না হোক ভারতীয় ফিল্ম ডিভিশনের যেসব সংবাদমূলক তথ্যচিত্র তখন প্রতিটি সিনেমা হলে মূল সিনেমা দেখানোর আগে পরিবেশিত হত, তাতে ফুটবল ও হকির ক্লিপিংস থাকতই। সেসবও তো সরকারি মহাফেজখানায় থাকার কথা।  

    ফলে আমার কাছে সে সময়ের খেলার সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের, যাঁরা নিজেরা এই ত্রয়ীর সঙ্গে বা বিপক্ষে খেলেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। আমার খোঁজ ছিল চুনী, পিকে বলরামের খেলার বৈশিষ্ট্য, পার্থক্য নিয়ে। কথা বলেছি, চন্দন পাল চৌধুরী (৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত খেলেছেন—এভিনিউ সম্মিলনী, স্পোর্টিং ইউনিয়ান, জর্জ টেলিগ্রাফ, ভ্রাতৃ সংঘের মতো ক্লাবে। মূলত মাঝমাঠের খেলোয়াড়, প্রয়োজনে ইনসাইডেও খেলেছেন), কানাই সরকার (৬০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে ৭০ দশকের প্রথম দিকে খেলেছেন, এরিয়ান্স ও তিন প্রধানেই। ভারতীয় দলেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। গোলকিপার), অরুময় নৈগম (৬০-এর দশকে মোহনবাগান ও ভারতীয় দলে নিয়মিত খেলেছেন। উইঙ্গার) সুকুমার সমাজপতি (মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও ভারতীয় দলের নিয়মিত সদস্য, পরে ধারাভাষ্যকার হিসেবেও খুব জনপ্রিয় ছিলেন। উইঙ্গার)—এঁদের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। এ ছাড়া সুনীল ভট্টাচার্য (৬০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ৭০-এর দশকে ইস্টবেঙ্গল ও ভারতীয় দলে নিয়মিত খেলেছেন। ডিফেন্ডার) ও নভি কাপাডিয়া-র (ক্রীড়া সাংবাদিক) স্মৃতিচারণ থেকে সমৃদ্ধ হয়েছি।

    চন্দন পাল চৌধুরী - তখন সিটি মাঠে ভারতীয় দলের প্র্যাকটিস হত। আমরা দল বেঁধে দেখতে যেতাম। চুনী ছিলো ক্রাউডপুলার। ওর চেহারার কমনীয়তা যেন খেলাতেও ছড়িয়ে যেত। যদি তুলনা করি চুনী আর বলরামের মধ্যে, দুজনেই অসম্ভব ভালো ড্রিবলার, রিসিভিং ছিল নিখুঁত, গোল চিনতে দুজনেই ওস্তাদ। পার্থক্য বলতে বলরাম একটু নীচে থেকে খেলত। তখন তো দুই ব্যাক, তিন হাফ আর পাঁচ ফরোয়ার্ডের ফর্মেশন। হাফেরা তখন বেশিটাই ডিফেন্ডার। মাঝ মাঠ থেকে ইনসাইড বা উইঙ্গে বল জোগান দিয়ে খালাস। বলরাম নীচে নেমে বল নিত হাফেদের থেকে। ওখান থেকে খেলাটা বিল্ড আপ করার চেষ্টা করত। খুব ভালো ডিস্ট্রিবিউশন ছিল। কিন্তু ঠিক সময়ে গোলের সামনে পৌঁছে যেত নিঃশব্দে। চুনী বরং বরাবরই একটু উপরে উঠে খেলত। হাফ থেকে বাড়ানো বল নিয়ে ড্রিবল করতে করতে পেনাল্টি বক্সের আশপাশ থেকে খেলাটা ছড়াত উইঙ্গে বা অন্যদিকের ইনসাইডে। তবে এই যে বলছি, এমন নয় যে প্রত্যকবার এমনটাই হত। কখনও পেনাল্টি বক্সের মাথা থেকে নিজেই কাছাকাছি কারুর সঙ্গে ওয়ান-টু খেলেই ড্রিবল করে গোল—এমনটাও হত। তবে চুনী যাই করত, সে ড্রিবল হোক বা রিসিভিং কি পাসিং, এত স্মার্টনেস থাকত তাতে, চোখ জুড়িয়ে যেত। ওই যে বললাম ক্রাউডপুলার। কী বৈচিত্র ছিল রিসিভিং-এ! কখনও থাই, কখনও হিল, কখনও কাফ মাসল দিয়ে এমনভাবে রিসিভ করত, তাতেই দুটো প্লেয়ার কেটে যেত। শুটিং ভালোই ছিল, হেড তেমন করতে দেখিনি। সেই দিক থেকে বলরামও রিসিভিংএ অসাধারণ। কোনোদিন পা থেকে বল বেরিয়ে যেতে দেখিনি। চুনীর মতো না হলেও রিসিভিং-এ বৈচিত্র ছিল। বুকে রিসিভ করে পড়তি বলে থাই বা হিল দিয়ে টোকায় ডিফেন্ডার কেটে যেত। কিন্তু পাসিং আর শুটিং-এ বলরামের পায়ের জাদু ছিল খুব সাটল। কিছু বোঝার আগেই পায়ের পাতার যে-কোনো অংশ দিয়ে নিখুঁত পাস বাড়াতে পারত। বলরামকেই আমি সুইং করাতে দেখেছি। দূরপাল্লার শটে বহু গোল আছে বলরামের—বাঁক খেয়ে ঢুকত। চুনীর বরং গোলকিপারকে বোকা বানিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত প্লেসিং-এ প্রচুর গোল আছে। বলরামের হেডটাও ছিল খুব ভালো। দুজনেই অসামান্য ফুটবলার। দুজনেই ক্লাব আর দেশের হয়ে বহু স্মরণীয় মুহুর্ত উপহার দিয়েছে। বলরামের দুর্ভাগ্য শুধুমাত্র পয়সার অভাবে রেলে চাকরি নেয় ও ইস্টবেঙ্গল ছাড়তে হয়। সে সময় প্লুরিসিতেও আক্রান্ত হয় সে। ফলে পিকে বা চুনীর চাইতে অনেক আগেই খেলা থেকে সরে যেতে হয়।

    অরুময় নৈগম - চুনীর পাশে খেলা, সে ক্লাব বা দেশ যেখানেই হোক, সব সময়েই আনন্দের। আপনারা রেডিয়োতে তো শুনেইছেন—অরুময়ের পায়ে বল। টাচ লাইন ধরে দ্রুতগতিতে বল নিয়ে ছুটছেন। প্রায় কর্নার ফ্ল্যাগের কাছ থেকে সেন্টার—পেনাল্টি বক্সের মধ্যে সোজা চুনীর পায়ে—কী করবেন চুনী—গোওওওল... সামনে দু-দুটি ব্যাককে ধোঁকা দিয়ে জালে বল জড়িয়ে গেল। এই তো ছিল তখনকার খেলা। আমাদের বোঝাপড়া ছিল খুব ভালো। আমি জানতাম চুনী কোথায় থাকবে, চুনী জানত আমি কোথায় বল বাড়াব। এখনও কানে ভেসে আসে চুনীর ডাক—অরু অরু বল দে... আমি তো বেশি সময় বলের এগেন্সটেই খেলেছি। খুব এফেক্টিভ প্লেয়ার ছিল। ওর জন্য চুনীকেও নিজের জায়গা লেফট ইন ছেড়ে রাইট ইনে খেলতে হত ইন্ডিয়া টিমে। দুজনেই ট্রিমেন্ডাস ড্রিবলার। এদের পায়ে বল দিলে নিশ্চিন্ত, বল অপোনেন্ট কাড়তে পারবে না। পিকেও খুব ভালো ড্রিবলার। ও তো আমার মতোই উইঙ্গে খেলত, কিন্তু কাট করে ভিতরে ঢুকে একজন-দুজনকে ড্রিবল করে গোল করে যেত। তবে পিকের শুটিং ছিল খুব পাওয়ারফুল। এদের মধ্যে পিকে ছিল থিংকিং প্লেয়ার। খেলা নিয়ে খুব ভাবত। গেম রিডিং খুব ভালো ছিল। তাই রহিম সাহেব খুব পছন্দ করতেন। তাই তো এত ভালো কোচ হতে পারল। ৬২-র এশিয়াড ফাইনালে জার্নেলকে সেন্টার ফরোয়ার্ডে খেলানোর পিছনে পিকেরও হাত ছিল।



    নভি কাপাডিয়া - ১৯৬০-এর রোম অলিম্পিয়ান এস এস হাকিম একবার সন্তোষ ট্রফিতে সার্ভিসেস বনাম বাংলা ম্যাচের কথা বলেছিলেন। কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে চুনীকে বল নিয়ে cul de sac*-এ আটকে ফেলেছেন। মানে যাকে বলা যায় দক্ষ ডিফেন্ডার বিপক্ষের ফরোয়ার্ডকে কানাগলিতে ঠেলে দিয়ে, বল বের করার সমস্ত রাস্তা আটকে দিয়েছেন। হাকিম ভেবেছিলেন একটা স্লাইডিং ট্যাকেল করে ভারতের সেরা ফরোয়ার্ডের পা থেকে বল কেড়ে নেবেন। কিন্তু চুনী দুরন্ত একটা শরীরী মোচড়ে বল নিয়ে বেরিয়ে যায়। অসম্ভব ছোটো জায়গা দিয়ে বল বের করে নিয়ে যাওয়ার দক্ষতা আমেদ খানেরও ছিল। সেই সময় ফুটবল আজকের মতো সহজ ছিল না। লাল-হলুদ কার্ডের নিয়ম তখনও চালু হয়নি। রেফারিও খেলোয়াড়দের বিপক্ষের কড়া ট্যাকেল থেকে পাওয়া চোট-আঘাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেন না। আঘাত পাওয়াটাই তখন ভারতীয় ফুটবলে স্বাভাবিক। বিপক্ষের ট্যাকেল, আঘাতের সম্ভাবনা এড়িয়ে নির্দ্বিধায় বল নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছি চুনী এবং আমেদকে।

    চুনীর পছন্দের খেলোয়াড়, আইডল ছিলেন আমেদ খান, যিনি ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৯ অবধি ইস্টবেঙ্গলে খেলেছিলেন। আমেদ ২০১৭-র আগস্টে বেঙ্গালুরুতে মারা যান। তিনিও অত্যন্ত দক্ষ খেলোয়াড় ছিলেন। চুনী এবং আমেদ ভারতীয় ফুটবলের সবথেকে ক্রিয়েটিভ এবং স্কিলড ফুটবলার ছিলেন। চুনী গোস্বামী নিজে স্বীকার করতেন যে, আমেদের খেলা দেখে অনেক কিছু শিখেছিলেন। বিশেষ করে শক্ত ডিফেন্সকে কাটিয়ে, ফাঁক গলে বল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কৌশল।


    নভি কপাডিয়া—মাই স্পিক ডট কম ০১.০৫.২০২০  https://www.mysepik.com/archives/25651

    *cul de sac(French) Originally an anatomical term meaning ‘vessel or tube with only one opening’. It literally means ‘bottom of a sack’, from the Latin culus, ‘bottom’.

    একটি ইউটিউব সাক্ষাৎকারে নভি কাপাডিয়া বিনা দ্বিধায় বলেন চুনীর ড্রিবলিং রোনাল্ডিনিহো বা রবিনহোর চেয়ে কিছু কম ছিল না। বলরাম তার সোনালি সময়ে থিয়রি আঁরির তুল্যমূল্য ছিলেন। উৎসাহীদের জন্য ইউটিউবের লিংকটি দেওয়া থাকল।


    এই একই কথা বলেছেন সুনীল ভট্টাচার্য - ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে যিনি চুনীর বিরুদ্ধে তিন বছর খেলেছেন। “বল পায়ে তো গতি নিয়ে অনেকেই ড্রিবল করে। কিন্তু ডেড বল পায়ে নিয়ে সামনে থাকা ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দেওয়া, ওটা চুনীদার পক্ষেই সম্ভব ছিল।” - আনন্দবাজার ২ মে, ২০২০

    কানাই সরকার - আমি যখন এরিয়ান্সে তখন ইস্টার্ন রেলের সঙ্গে খেলায় একটা গোল খেয়েছিলাম ফার্স্ট বার টু ফার্স্ট বার। খেলার পরে আমাদের এক কর্তা আমায় ধরেন, “কী রে কানাই, একেবারে ফার্স্ট বার দিয়ে গোল খেলি!” আমি বলেছিলাম, “ওটা কি শট নাকি কামানের গোলা!” এই ছিল পিকে। চেহারাটা ছিল খুব ভালো, চুনী বা বলরামের ওই চেহারা ছিল না। ফলে কী গোলার মতো শট! চুনী আর বলরামের সঙ্গে একই ক্লাবে আবার বিপক্ষ ক্লাবেও খেলেছি। আজকের ফুটবল পরিভাষায়, বলরাম গেম মেকার-স্ট্রাইকার, চুনী স্ট্রাইকার-গেম মেকার—যদি এভাবে তুলনা করা যায়। চুনীর খেলায় বিদ্যুতের ঝলক ছিল। ওর একটা কোমরের ঝটকা ছিল, যেটাকে সেসময় লোকে বলত ঝুক্কি বা চুক্কি। সেন্টার সার্কেলে বল ধরে তিন ঝুক্কিতে পেনাল্টি বক্সে—এই ছিল চুনী। আর বলরাম ড্রিবল করতে করতে পাস খেলতে খেলতে কখন স্ট্রাইক করে দেবে, তুমি বুঝতে বুঝতে গোল। এদের তিনজনের মধ্যে পিকের নানান ভাবনাচিন্তা ছিল ফুটবলকে ঘিরে। ধরো, মাঠে নামা। ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগান কি মহামেডান, বা সেই ভাবে দেখলে কোনো ক্লাবের কেউই, কীভাবে মাঠে নামব তাই নিয়ে মাথা ঘামাত না। বড়ো ক্লাবের মাথা ঘামানোর দরকারও ছিল না। তাদের সমর্থকেরা এমনিই গ্যালারি উত্তাল করে রাখত। কিন্তু পিকে এসব নিয়ে ভাবত। ইস্টার্ন রেল মাঠে নামত, এটা আমি ১৯৬৪-৬৫ কি ৬৬-র কথা বলছি, সেন্টার লাইন ধরে সেন্টার সার্কেলে পৌঁছে দর্শকদের দিকে মুখ করে গোল হয়ে দাঁড়াত সেন্টার সার্কেলের গোল দাগটি বরাবর। তারপর দর্শকের দিকে ‘বাও’ করত। ওদের তো এত সমর্থক ছিল না, তাই হয়তো লোকের মন কাড়ার জন্য এই চেষ্টা। সুন্দর দেখতে লাগত। পিকে এসব নিয়েও ভাবত। আজকে যাকে সাইকোলজিক্যাল গেম বলা হয় তেমন আর কী।

    সুকুমার সমাজপতি - চুনীদা আর বলরামের বৈশিষ্ট্য বলতে গেলে বলতে হয়, দুজনেই অসম্ভব ভালো ড্রিবলার। চুনীদার বাঁ-পা ডান পায়ের মতো এত কার্যকরী ছিল না, কিন্তু তাতে খুব কিছু এসে যেত না। মারাদোনাও তো এক পায়ের খেলোয়াড়। বলরামের দুই পা-ই সমান চলত, তবে বাঁ পা ব্যবহার করত বেশি। চুনীদা ছিল প্যাশনেট ড্রিবলার। ড্রিবল করত হৃদয় দিয়ে। ফলে কখনও পায়ে বল বেশি রাখত, কিন্তু আবারও বলছি তাতে কিছু এসে যেত না। কারণ বহুবার দেখেছি একদম কোণঠাসা অবস্থা থেকেও চকিতে ড্রিবল করে বেরিয়ে আসতে পারত। বলরামের এটা দরকারই পড়ত না। ও সময় মতো বল ছাড়ত আর ফাঁকা জায়গা নিতে পারত। ফলে ওকে খুব বেশি কোণঠাসা অবস্থায় পড়তে দেখিনি। বরং ওর এই জায়গা নেওয়ার প্রবণতায় দলের আক্রমণভাগের অন্য খেলোয়াড়দের সুবিধা হয়ে যেত। চুনীদা গোল করতে ভালোবাসত। যারা চুনীদার সঙ্গে খেলেছে, তারা জানত, বিশেষ করে উইং এবং হাফেরা, চুনীদার চিৎকার—বলে দে, বল দে। চুনীদার খেলায় একটা ছটফটানি ছিল, যেটা বলরামের একেবারেই ছিল না। ও যেন জানত গোল হবেই। ওর বহু গোল অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত। বাঁদিকে খেলত। তাই বক্সের মধ্যে একটা আউটসাইড করে যখন মনে হত এবার বাঁ-পায়ে দিয়ে ফাইনাল অ্যাসল্ট করবে, গোলকিপার তার ফার্স্ট বারের অ্যাঙ্গেল ছোটো করে ফেলেছে, ঠিক তখনই একটা ছোট্ট ইনসাইড করে ডান পায়ে সেকেন্ড বারের দুরূহতম কোণে বলটা প্লেস করত। আবার অনেক সময় আউটসাইড করেই বাঁ-পায়ে সুইং করাত। বল গোলকিপারকে এড়িয়ে সেকেন্ড বার দিয়ে বাঁক খেয়ে ঢুকত। চুনীদাকে বেশি হেড করতে দেখিনি, বলরামের হেডে বহু গোল আছে। তবে এদের দুজনের বোঝাপড়া ছিল সাংঘাতিক। দুজনেরই ফুটবল বোধ ছিল তুখড়। আমি যেবার প্রথম মারডেকা খেলতে যাই ১৯৬১ সালে, সেবার চুনীদা লেফট ইন আর বলরাম লেফট আউটে খেলেছিল। এদের যুগলবন্দী আমি সাইড লাইনে বসেই দেখেছি। কী অসম্ভব সব পাস খেলা! যেন আগে থেকে রিহার্সাল করা মনে হত।  

    প্রদীপদাও খুব বুদ্ধি করে খেলত। চুনীদা বা বলরামের পর্যায়ের ড্রিবলার ছিল না হয়তো, কিন্তু ড্রিবলটা ভালোই করত। ওর একটা ড্রিবল অরুণ ঘোষের মতো ডিফেন্ডারকেও বোকা বানিয়ে দিয়েছিল। রেল আর বাংলার সন্তোষ ট্রফির একটা খেলায়, বারবার যেন বলটা প্রচণ্ড জোরে শট নেবে এমন ভঙ্গি করে ডান পায়ে আউটসাইড করে বেরিয়ে গেছে। পায়ে শট ছিল গোলার মতো। নানান দূরত্ব থেকে, নানান কোণ থেকে আচমকা শটে বহু গোল আছে প্রদীপদার। উইং-এর খেলোয়াড় হিসেবে প্রদীপদার এই গোল করার অভ্যাস ছিল অসামান্য। কখন কাট করে ভিতরে ঢুকতে হবে আর কখন উইং থেকে সেন্টার করতে হবে এসব যন্ত্রের মতো নিখুঁত ভাবে জানত। আর ছিল শটের নিশানা। একশো শতাংশ শট তিনকাঠির ভিতরে থাকত। এর জন্য অবশ্য বলতে হবে প্রদীপদার অনুশীলন। এ রকম অমানুষিক পরিশ্রম আমাদের সমসাময়িক কাউকে করতে দেখিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লেম ব্রাউন ইন্সটিটিউটের মাঠে একই জিনিস করে যাচ্ছে। ভলি তো ভলি, দূর পাল্লার শট চলছে তো চলছেই, ক্লান্তিহীন। স্পট জাম্প খুব ভালো ছিল, কিন্তু আশ্চর্য, হেডে তেমন জোর ছিল না। চুনীদা বা বলরামকে ক্লোজ মার্কিং করে লাভ হত না। কিন্তু প্রদীপদা ক্লোজ মার্কিং-এ অস্বস্তিতে থাকত। রামবাহাদুরের মতো নাছোড়বান্দা মার্কার হলে প্রদীপদা মুশকিলে পড়ত। অবশ্য একটা কথাও ঠিক যে চুনীদা বা বলরাম পাশে যে মানের খেলোয়াড়দের পেয়েছে, প্রদীপদা তা পায়নি। ফলে ক্লোজ মার্কিং-এ একা হয়ে যেত।

    এঁরা তিনজনেই অসাধারণ ফুটবলার, যাঁদের একসাথে খেলতে দেখাটাই আমার মতো ফুটবল ছাত্রের কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদ।

    এই হল ভারতীয় ফুটবলের চিরকালীন ত্রিদেব।  

  • বিভাগ : আলোচনা | ২৩ জুন ২০২০ | ১২৭১ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কুশান | 103.87.141.7 | ২৩ জুন ২০২০ ২১:১৫94556
  • লেখাটা ভালো লাগলো। কিন্তু, আরেকটু বড় ও বিশদে লেখেন না কেন? অন্তরে অতৃপ্তি রইয়া যায়।

    পিকে চুনী বলরামের খেলা দেখার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না। কারণ আমার সাতের দশকে জন্ম। তবে আনন্দমেলায় চুনীর 'খেলতে খেলতে' ও পিকের ' উইং থেকে গোল' দুটোই ছোটবেলায় উপভোগ করতাম।থঙ্গরাজ, বলরাম, জার্নাল সিং, বাঘা সোম, নাটকি(বাঘার পুত্র), আমেদ খান থেকে শুরু করে বহু প্লেয়ারের মারডেকার, এশিয়াডের, সন্তোষ ট্রফির গল্প। মাঠের ময়দানের গন্ধ পাওয়া যেত এই লেখাদুটিতে।

    পিকের ক্ষেত্রে আমার সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা বেশি কেননা পিকে কোনোদিন তিনটে বড় ক্লাবের একটিতেও খেলেন নি।

    এঁদের ব্যক্তিগত জীবন ও স্ট্রাগলের গল্প এত স্পর্শ করত সেই সময় যে বলার নয়। পিকে তাঁর লেখায় মাঝে মধ্যেই ' ছোট্ট বন্ধুরা' বলতেন, সেই কন্ঠস্বর যেন শুনতে পেতাম।
  • Nirmalya Bachhar | ২৩ জুন ২০২০ ২২:০০94558
  • খুব ভালো লাগল। এদের খেলা না দেখার অপূর্ণতাটা খানিকটা পূরণ করি এইসব খেলার গল্প দিয়ে। আরো এরকম লেখা পড়ার আগ্রহ রইল।

  • শিবাংশু | ২৩ জুন ২০২০ ২২:০৩94559
  • আমিও এঁদের খেলা নিজের চোখে দেখিনি। রেডিওতে আর বাবা-কাকাদের মুখে শুনে গিয়েছি চিরকাল। নস্টোলজি বড্ডো সংক্রামক ...
  • সম্বিৎ | ২৪ জুন ২০২০ ০১:৩৯94570
  • আরও হোক।

  • রাজর্ষি বসু। | 103.42.174.101 | ২৪ জুন ২০২০ ১৩:০৮94589
  • ২০০৩ এ এশিয়ান ক্লাব কাপ চ্যাম্পিয়ন? ওটা Asean বা আশিয়ান।  একদুবার হয়ে টূর্ণামেন্ট উঠে যায়। এশিয়ান ক্লাব কাপ হচ্ছে বর্তমানের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নসলীগ। সুতরাং ইসটবেংগল কখনো এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়নি।      

  • Dipanjan | ২৪ জুন ২০২০ ১৪:০৩94591
  • "সবচেয়ে দুঃখ আর আপশোশ এদের খেলার কোনো ফিল্মও পাবলিক ডোমেনে কোথাও পাই না। "

    1953 ইস্টবেঙ্গল এর রুশ সফর |

  • কল্লোল | 223.191.4.247 | ২৪ জুন ২০২০ ১৪:১১94592
  • এটিতে অমেদো খান আছেন। ৫৫ সেকেন্ডে অমল দত্ত অছেন বিমানে বোসে। তবে খুব মূল্যবান ক্লিপ। ধোন্য্বদ।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত