• বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়।
    বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে।
  • সুশীলবাবুর মানেবই (দ্বিতীয় ভাগ)

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় ফলো করুন
    খবর : মায়া মিডিয়া | ১৪ জুন ২০০৯ | ৬৫ বার পঠিত

  • লেখকের নিবেদন : পরীক্ষা শেষ বলে পড়াশুনোতে ঢিলে দিলে চলবেনা। পুরোনো পড়া ঝালিয়ে নিতে, প্রকাশিত হল, আমাদের এই মানেবইয়ের দ্বিতীয় ভাগ। মূল বই পড়ার সময় ও সুযোগ অনেকের হয়না। এই বইটি সেই ছাত্রছাত্রীদের কাজে লাগলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
    শিল্পায়ন কয়প্রকার ও কী কী?

    পন্ডিতরা শিল্পায়নের দুই ধরণের সংজ্ঞা দিয়ে থাকেন। একটি বাংলায় অন্যটি ইংরিজিতে। একটি পিপলস ডেমোক্রেসিতে অন্যটি আনন্দবাজারে। ইংরিজি তাত্ত্বিক শ্রী প্রকাশ কারাত,পিপলস ডেমোক্রেসিতে এ বিষয়ে লিখেছেন, "কলকাতার পার্শ্ববর্তী পাঁচটি জেলায় করা একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, যে, বন্ধ কল-কারখানা আর রুগ্ন শিল্পগুলিতে ৪১০০০ একর এমন জমি পড়ে আছে, যা কোনো শিল্প সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছেনা। এই সমস্ত জমি পুনরুদ্ধার করলে, তা, অনেকগুলি উদ্দেশ্যকে সিদ্ধ করতে পারে। এই সমস্ত জমিগুলিকে বিক্রি করে সেই অর্থে রুগ্ন শিল্পগুলির পুনরুজ্জীবন ঘটানো যেতে পারে, বা কর্মচারীদের বকেয়া বেতন মেটানো যেতে পারে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্প, বা অন্যান্য শিল্পসংস্থাকে বাকি জমি দেওয়া যেতে পারে। এইরকম জমিগুলি দশকের পর দশক ধরে আইনী জটিলতায় অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে।"

    তিনি আরও লেখেন, "পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং আরও অন্যান্য সেক্টরের বর্ধিত চাহিদার কারণে জমি চিহ্নিতকরণ এবং অধিগ্রহণ করতে হবে। পতিত এবং অকৃষিযোগ্য জমিই নি:সন্দেহে এ ধরণের ব্যবহারের মূল উৎস হবে। কোনো কোনো বড়ো প্রজেক্টে, যেখানে একটানা জমি নেওয়া দরকার, সেখানে কিছু পরিমাণ কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা এড়ানো যাবেনা। এই সমস্ত ক্ষেত্রে বহুফসলী কৃষি জমির জায়গায় একফসলী কৃষি জমি দেওয়া হবে।" ( পিপলস ডেমোক্রেসি, ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০০৫)

    এটি হল শিল্পায়নের ইংরিজি সংজ্ঞা। বাংলা সংজ্ঞাটি আমরা পাই আনন্দবাজার থেকে। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম হবার ঢের আগেই এ ব্যপারে তাঁদের মত আমরা জানতে পারি। বিরোধীদের ২৩৫ গোল দিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জেতার ঠিক পরদিন, বঙ্গজীবনের অপরিহার্য অঙ্গ আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় ঘোষণা করা হয় "এত দিন প্রকাশ কারাট-সহ সিপিএমের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে শুধু এক জনেরই মোকাবিলা করতে হত। তার নাম মনমোহন সিংহ, যাকে 'বিকল্প অর্থনীতি' নামক দুর্বোধ্য কোনও পথ অনুসরণ করতে বলেন কারাটরা। আর এ বার যখন তারা কেন্দ্রে আরও 'বেশি হস্তক্ষেপের' কথা ভাবছেন, তখন কিন্তু তাদের মোকাবিলা করতে হবে দু'জনের। মনমোহন সিংহ তো বটেই, তার সঙ্গে বুদ্ধদেব ভট্টচার্যেরও। কলকাতা বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণই হোক, অথবা ধর্মঘট বন্ধ করা, কোনও কিছুতেই দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে যে মুখ্যমন্ত্রী আর মাথা নোয়াবেন না, তা কারাটদের আগাম বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।
    ......
    অর্থাৎ উদারনীতির পথে এগিয়ে চলাটা হবে সাবলীল। লগ্নির আবাহনে তিন দফা শর্ত চাপানো, কৃষি জমি নেওয়ার প্রেশ্ন জটিলতা তৈরি করা বা কলকাতা বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ বেসরকারি হাতে যেতে না দেওয়ার গোঁয়ার্তুমির উপর বুলডোজার চলবে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রের বক্তব্য, এ বার গোড়াতেই বুদ্ধদেব জানিয়ে দেবেন, সারা দেশে সিপিএম যা খুশি নীতি নিক, ফরমান জারি করে পশ্চিমবঙ্গে সরকারের হাত-পা বেধে দেওয়া চলবে না।" (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ইমে ২০০৬ )

    এই দুটি সংজ্ঞা থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি, যে, শিল্পায়ন আসলে দুই প্রকার। এক, যা স্রেফ শিল্পকলা, যা, পিপলস ডেমোক্রেসিতে কেত করে ইংরিজিতে লেখা হয়। পড়ে বিশ্বব্যাপী জনতা আহা উহু করে। একে ইংরিজিতে আর্ট ফর আর্টস সেক বলা হয। এই শিল্পকে বক্তৃতার ময়দানে নিয়ে গেলে, তাকে পারফর্মিং আর্ট বলা হয় । দুই, ইন্ডাস্ট্রি, যা আনন্দবাজারে ছাপা হয় এবং করে দেখানো হয়। বন্ধ কারখানার জমি প্রোমোটারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, বিনিয়োগকে জামাই-আদর করা হয়। কৃষিজমি নেওয়ার প্রশ্নে জটিলতা তৈরি করার গোঁয়ার্তুমির উপর চালিয়ে দেওয়া হয় বুলডোজার।

    এই দুটি পরস্পর বিরোধী সংজ্ঞার মধ্যে কোনটি আসল? মূর্খের মতো প্রশ্ন করবেন না। এই উত্তরাধ্‌ুনিক যুগে আসল-নকল বলে কিছু হয়না। যে যা চায়, সে তার মতো সংজ্ঞা পায়। আর্ট ফর আর্টস সেকে আঁতেলরা আনন্দ পায়। ময়দানে সার্কাস দেখে শিশুরা হাততালি দেয়। বিপ্লবীরা পিপলস ডেমোক্রেসি পড়ে। আর একবিংশ শতাব্দীর কাজের লোকেরা, যাঁরা কথা কম কাজ বেশি তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তাঁরা আনন্দবাজারে আস্থা রাখেন। শিল্পায়নকে যাঁরা একটি "কাজ" বলে মনে করেন, যাঁরা ব্র্যান্ড বুদ্ধে বিশ্বাস রাখেন, তাঁরা আনন্দবাজার পড়েন, পড়ান। কিছু করে দেখান।

    শিল্পায়নের পথ কী?

    আনন্দবাজারের পথই অগ্রগতির পথ। বিরোধিতাকে উপেক্ষাই শিল্পায়নের পথ।

    ব্যাপারটা বুঝতে গেলে আমাদের সিঙ্গুরের দিকে তাকাতে হবে। ফুকো বলেছেন, সিস্টেমকে বুঝতে হলে, তার উৎপত্তির বিন্দুতে যাও। কবিগুরু বলেছেন, শিখার রুমালনাড়া শেষ হলে, ছাই তুলে দেখে নিও, পাইলে পাইতে পারো অমূল্য রতন। রতন টাটাকে বুঝতে হলে, তাই আমাদের সেই প্রথম আদি তব সৃষ্টির ঘন ঘন মাথা নাড়ার দিনে যেতে হবে। সেই ২০০৬ সালে। যখন পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং কোম্পানি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হলেন ১১ই মে, আর বিশুদ্ধ সিঙ্গুরে ন্যানো সংক্রান্ত গোলমাল শুরু হল এর ঠিক দু সপ্তাহ পরে, ২৫শে মে । ঐ দিন সিঙ্গুর বাজার থেকে মাইল দুই দূরে গোপালনগর এলাকায় জমি দেখতে গেলে ঝাঁটা ও জুতো নিয়ে টাটার প্রতিনিধিদের তাড়া করে স্থানীয় কৃষককূল। বঙ্গে নিউজ চ্যানেলের আধিক্যজনিত কারণে ব্যাপারটা নিয়ে হই হুল্লোড় একেবারে চেপে না রাখা গেলেও, পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে আমরা জানতে পারি, যে, খবরটি একেবারেই গুরুত্বহীন। গুজবও হতে পারে। সিঙ্গুর ফিঙ্গুর না, ঐদিন বঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর ছিল, পুঁজির খোঁজে মুখ্যমন্ত্রী বু ¤দ্ধদেব ভট্টাচার্যের সম্ভাব্য আমেরিকা ভ্রমণের সুসংবাদ। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত "পুঁজির খোঁজে এ বার আমেরিকামুখী বুদ্ধদেব" শীর্ষক ঐ খবরটি থেকে আমরা জানতে পারি, যে, "সপ্তম বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পরে এখন রাজ্যে শিল্পায়নের জন্য বাইরে থেকে পুঁজি আনতে মরিয়া মুখ্যমন্ত্রী। শিল্পোন্নয়ন, নগরোন্নয়ন, পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকেল্পর রূপরেখা প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে। জমি অধিগ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এখন দরকার বিনিয়োগ। এবং সেই দিক থেকে মার্কিন পুঁজির প্রয়োজনীয়তা সবার উপরে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, 'শুধু সমাজতান্ত্রিক পুঁজি কোথায় পাব? চিনের সঙ্গে বাণিজ্য করলেও সেটা যথেষ্ট নয়।'

    এটা শুধু মাথার উপরের খবর। প্রথম পাতার পাশের দিকের দ্বিতীয় হেডলাইনটি, ঐ একই দিন আমাদের জানায়, যে, "টিম বুদ্ধ" ইতিমধ্যেই একটি যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। বিনিয়োগের যুদ্ধ। "গত পাঁচ বছরে যেটুকু জমি ফিরে পাওয়া গিয়েছে, তার উপরে ভিত্তি করে প্রশাসনিক সংস্কার এবং শিল্পনীতিকে সংহত করে বিনিয়োগ টানতে চারমুখী নতুন যুদ্ধনীতি ছকে ফেলেছে রাজ্যের শিল্প দফতর।"

    এই প্রতিবেদনটি পড়ে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি, যে শিল্পায়ন আসলে একটি যুদ্ধ। তার জন্য দরকার যথার্থ যুদ্ধনীতি। আর কে না জানে, যুদ্ধে চাট্টি ক্ষয়ক্ষতি হয়েই থাকে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে সৈন্যদের প্রাণ যায়, দু-চারপিস উলুখাগড়া অনাহারে মরে, বিস্তর লোকে কানা-খোঁড়া-নুলো-ল্যাংড়া হয়। দেশ দশ ও জাতির স্বার্থে সেসবকে উপেক্ষা করুন। লোকে যখন মরছে, তখন টেনথ ফ্লোরে বসে শিল্পের ধামাকা মাচান, লোকের চোখ ধাঁধিয়ে দিন। ৫০ ইঞ্চি স্ক্রিনে শিল্পায়নের হুলা-হুলা নৃত্য দেখে লোকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা সব ভুলে যাবে। আর সিঙ্গুর-ফিঙ্গুরে ওরকম দু-চার পিস বুলশিট বিক্ষোভের খবরও ধামাচাপা পড়ে যাবে বেমালুম। শিল্পের জয়পতাকা উঠবে দিগ্বিদিকে, যুদ্ধ জয়ের দিকে গুটি গুটি করে এগিয়ে যাবে বঙ্গসমাজ।

    যুদ্ধজয়ের সহজ পন্থা কী?

    প্রতিরোধ। কারণ, উপেক্ষার মতো গান্ধীবাদী অস্ত্র প্রয়োগে সবসময় কাজ হয়না। শত্রু যখন শিয়রে, তখন "কুকুরে করেছে কুকুরের কাজ" বলে বাড়িতে বসে ভাতঘুম দিয়ে লাভ নেই, পাল্টা লড়াইও দিতে হয়। যেমন কুকুর তেমন মুগুর। পুলিশ দিয়ে চাষীদের ডান্ডাপেটা করতে হয়, ক্যাডার দিয়ে ঘটাতে হয় সূর্যোদয়, আর প্রতিক্রিয়াশীল প্রগতি-বিরোধিতার বিরুদ্ধে তীব্র মতাদর্শগত সংগ্রাম গড়ে তোলা হয় সংবাদপত্রে।

    প্রগতি ও উন্নয়নের পক্ষে এই সুতীব্র মতাদর্শগত সংগ্রামের জন্য আনন্দবাজারের নাম বঙ্গের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই যুদ্ধের শুরু হয়, ২০০৬ সালের ১৮ ই ডিসেম্বর। ঐ দিন সিঙ্গুরে তাপসী মালিক নামক একটি অকালপক্ক তরুণী মারা গেল(খুন হল) আর দুম করে সে নিয়ে বন্ধ ডেকে ফেললেন আর এক কান্ডজ্ঞানহীন মহিলা। রাজ্যব্যাপী বিশৃঙ্খলা তৈরির এই খেলাকে আনন্দবাজার মেনে নিতে পারেনি। পরের দিনই তাপসী মালিকের মৃত্যু নিয়ে সুযোগ-সন্ধানী হুজুগেরা হট্টগোল বাধিয়ে দিল আর "না" শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে আনন্দবাজার জানাল "সিঙ্গুর উপলক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তাঁহার সহমর্মীরা প্রথম হইতেই অস্বাভাবিক পথ অনুসরণ করিতেছিলেন, যাহাকে কানাগলি বলিলে কোনও অত্যুক্তি হয় না। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে স্নায়ুর লড়াই লড়িতে গিয়া তাঁহারা সম্মানজনক পশ্চাদপসরণের পথগুলি ক্রমাগত বন্ধ করিয়া আসিতেছেন। ফলে তাঁহাদের 'খেলা শেষ' করিবার সমস্যা বহুগুণ কঠিন।"

    এই হল সেই আপোষহীন সংগ্রামের শুরু। এর কদিন পরেই জনা ছয় হেভি পন্ডিত অর্থনীতিবিদ এক সাথে লিখে ফেললেন, "পশ্চিমবঙ্গে সমস্যা আরও জটিল। এক দিকে শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নে এই রাজ্যের বিরোধী পক্ষ চরম অদূরদর্শী এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করে চলেছে, অন্য দিকে রাজ্য সরকার চূড়ান্ত প্রশাসনিক অকর্মণ্যতার পরিচয় দিয়েছে।" (অশোক সঞ্জয় গুহ, মৈত্রীশ ঘটক, মৃণাল দত্ত চৌধুরী, অভিজিৎ বিনায়ক বেন্দ্যাপাধ্যায়, প্রণব বর্ধন, কৌশিক বসু, মুকুল মজুমদার,দিলীপ মুখোপাধ্যায় এবং দেবরাজ রায়, আবাপ, ২৫ এপ্রিল ২০০৭)।
    এসব পড়ে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি, যে, জমি অধিগ্রহণ টহন তো ঠিকই ছিল, সরকারের অপদার্থতা হল, শুধু "প্রশাসনিক"। সারা দেশে যেমন হয়, তেমনই, বিরোধীপক্ষের শুধু "প্রশাসনিক" অংশটিরই বিরোধিতা করে, বাকিটা সোনা মুখ করে মেনে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন বিরোধীরা তা না করায়, প্রতিরোধের যুদ্ধ দীর্ঘ ও তিক্ত হয়ে ওঠে, যে লড়াইয়ের এক স্তম্ভ আনন্দবাজার।

    লড়াইটি দুই ফ্রন্টে লড়তে হয়। একদিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বিরোধীদের সঙ্গে। অন্যদিকে, যে, পুঁজির ভগীরথ হিসেবে যে ব্র্যান্ড বুদ্ধের উপর ভরসা রাখা হয়েছিল, তার অপদার্থতার বিরুদ্ধে। অনশনের নামে বিরোধী নেত্রী রাজ্যময় চূড়ান্ত হট্টগোল শুরু করলে আনন্দবাজার সম্পাদকীয় লেখে : "এখনও ঘরে এবং বাহিরে বিনিয়োগকারীরা পশ্চিমবঙ্গে শিল্পবাণিজ্যের পরিবেশ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত নহেন। গত কয়েক বছর যাব্‌ৎ এই ধারায় পরিবর্তন সাধনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটি জোরদার চেষ্টা চলিতেছে, পশ্চিমবঙ্গে একবিংশ শতাব্দীর সূচনা হইতে বাস্তবিকই উন্নয়নের নূতন উদ্যোগ শুরু হইয়াছে। সিঙ্গুরে টাটা মোটরস-এর প্রস্তাবিত শিল্পোদ্যোগের বিরুদ্ধে যাহারা জঙ্গি আন্দোলন শানাইয়াছেন, তাঁহারা এই উদ্যোগকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করিতে চাহেন। লক্ষণীয়, তাঁহাদের মধ্যে কেবল সতত দিগভ্রা¡ন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলীয় অনুগামীরাই নাই, তাঁহাদের কার্যত পিছনে ফেলিয়া মঞ্চের প্রথম সারি দখল করিয়াছেন রকমারি নকশালপন্থী, যাহারা আজও বালখিল্য বামপন্থার ব্যর্থ ধ্বজা বহন করিতেছেন।
    ...
    মুখ্যমন্ত্রী গত কয়েক দিনে এই পরাজয়ের কথা প্রচার করিয়াছেন, বলিয়াছেন যে, এই ঘটনাবলি রাজ্যের সম্পর্কে সর্বত্র ভুল বার্তা পৌঁছাইয়া দিয়াছে। কথাটি সম্পূর্ণ সত্য, কিন্তু পূর্ণসত্য নহে। এই পরাজয়ের দায়ভাগ তিনিও অস্বীকার করিতে পারেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন-কাণ্ডকে এত দূর অবধি গড়াইতে দিয়া তিনি এবং তাঁহার প্রশাসন নিজের দ্বিধাগ্রস্ত দুর্বলচিত্ততাকেই প্রকট করিয়া তুলিয়াছে। সিঙ্গুর প্রকল্পকে কোনও ভাবেই বানচাল হইতে দিবেন না বলিয়া তিনি যে দৃঢ় অবস্থান লইয়াছেন, সিঙ্গুরে হাঙ্গামার প্রশাসনিক মোকাবিলায় তিনি যে বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়াছেন, অনশনরত বিরোধী নেত্রীর মুখোমুখি দাঁড়াইয়া তাহা কার্যত অন্তর্হিত হইয়াছে। মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়া তিনি যে ভাবে বারংবার মমতা বেন্দ্যাপাধ্যায়কে চিঠি লিখিয়া অনশন প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ জানাইয়াছেন তাহাও ঐ আসনের মর্যাদা বাড়ায় নাই। লক্ষণীয়, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীও এই অগভীর মানবিকতার তাড়নায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখিয়া নিজেদের পদমর্যাদার অসম্মান করিয়াছেন। তাঁহারা সকলেই ভুলিয়া গিয়াছেন যে রাষ্ট্রীয় উচ্চাসনে বসিয়া প্রতিটি আচরণে সংযম পালন করিয়া চলিতে হয়।" (ডিসেম্বর ৩০, ২০০৬)

    এই জ্বালাময়ী সম্পাদকীয় পড়ে কোনো সন্দেহ থাকেনা, যে, জমি টমি নিয়ে এসব আন্দোলন করা অত্যন্ত খারাপ কাজ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সতত দিগভ্রান্ত বলেই বালখিল্য নকশালপন্থীদের প্ররোচনায় ক্রমাগত অবিমৃষ্যকারিতার ফাঁদে পা দিচ্ছেন। মমতাকে ঠেঙিয়ে অনশনমঞ্চ থেকে তুলে দিলেই যথার্থ গণতান্ত্রিক কাজ করা হত সন্দেহ নেই। সিঙ্গুরে যথেষ্ট দৃঢ়তার পরিচয় দিলেও, শিল্পের স্বার্থে এই মহান গণতান্ত্রিক কাজটি না করে, রাজ্যসরকার মহাপাতক হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীও মমতাকে চিঠি লিখে মহা অপরাধ করে ফেলেছেন। আর এইসব মহাবিচ্যুতির উল্টোদিকে আখাম্বা লাইট হাউসের মতো শিল্প ও গণতন্ত্রের একমাত্র ধারক ও বাহক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গবাসীর জীবনের অঙ্গ, শিল্পায়নের যুদ্ধের একাকী সৈনিক, আলোকোজ্জ্বল আনন্দবাজার।

    এই যুদ্ধে জিতল কে?

    তাঁরা একটি এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধের ঘটনায় সারা বাংলার সব সব্জি আর মাছ পচে গেল বলে হাহাকার করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন নিয়ে ফক্কুড়ি করেছেন। এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধই হোক, বা অনশন, বারবার ঠেঙিয়ে কেন তুলে দেওয়া হচ্ছেনা বলে বিলাপ করেছেন। সরকারকে সচল হতে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। টাটার বিদায়ের সম্ভাবনায় চোখের জল ফেলেছেন। ব্র্যান্ড বুদ্ধের পক্ষে বাজি রেখেছেন। কিন্তু টাটার বিদায় আর বঙ্গের পারপিচুয়াল-কনসেন্ট-ম্যানুফ্যাকচারিং-মেশিন বামফ্রন্ট সরকার লোকসভা নির্বাচনে কুপোকাৎ হবার পরে, কেউ যদি ভাবেন, এই হার ওনাদেরই হার, তবে তাঁরা ভুল ভাবছেন।

    ওনারা হারেন না। বুদ্ধিমানেরা হারেনা, শুধু দল বদলায়। ২০০৬ সালের পয়লা ডিসেম্বর তাঁরা লিখেছিলেন : "ব্‌ৎসরের শেষ পর্বে বঙ্গবাসীর সম্মুখে দুই বাঙালির দুই ভিন্ন মুখ ভাসিয়া উঠিল। একটি ইতিবাচক, অন্যটি নেতিবাচক। একটি সুশৃঙ্খল, অন্যটি বিশৃঙ্খল। একটি সৃষ্টিশীল আশার, অন্যটি ধ্বংসাত্মক নৈরাশ্যের। প্রথম মুখটি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের। ... বাঙালির সামনে অন্য মুখটি যাহার, তাঁহার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।" এর পরে মমতা কিছু বদলেছেন বলে আপনার-আমার জানা নেই, কিন্তু আনন্দবাজার তা বিলক্ষণ টের পেয়েছে। এবার নির্বাচনে অনেক গোলে জেতার পর তারা জানিয়েছে "তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এক নতুন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি 'অগ্নিকন্যা' ভাবমূর্তি পিছনে ফেলে অনেক শান্ত, পরিশীলিত, বিচক্ষণ। এই মমতা অতীতের মতো ভোট বাক্সে সাফল্য পেয়েই রাজ্য সরকার ফেলে দেওয়ার দাবি করছেন না। উল্টে বলছেন, 'উন্নয়নের প্রশ্নেÀ রাজ্যের দিকে সব রকম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে আমি রাজি।'" (২১ মে ২০০৯)

    কেউ যদি পড়ে চমকে ওঠেন, তো, তাঁকে জানিয়ে দেওয়া যাক, আদর্শের জন্য লড়াই বড়ো সোজা জিনিস নয়। এর অনেকগুলি ধাপ আছে। প্রথম ধাপে আদর্শবিরোধীদের উপেক্ষা করুন। না পারা গেলে, পরের ধাপে প্রতিরোধ করুন। তাতেও না এঁটে উঠলে, তাদের দলে যোগ দিন। দল বদলানো কোনো খারাপ কাজ নয়। দল বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা হল আদর্শ। এ ভোটে কোনো দল জেতেনি, জিতেছে উন্নয়ন। জিতেছে আনন্দবাজারের আদর্শ। মুখ্যমন্ত্রী আসবে যাবে, ব্র্যান্ড বুদ্ধ ভোগে গেলে ব্র্যান্ড মমতা হবে, লালের বদলে সবুজ জামা হবে, কিন্তু উন্নয়নের আদর্শ থেকে যাবে। আর সেই পথের আলোর দিশারী হয়ে থেকে যাবে আনন্দবাজার। এ পথ আলোর পথ। বুদ্ধ হোক বা মমতা, সে আলো দেখবেন না, ধড়ে এতগুলো মাথা কার আছে?

    জুন ১৪, ২০০৯
  • বিভাগ : খবর | ১৪ জুন ২০০৯ | ৬৫ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • করোনা

  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত