এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • গাঁজাখোর

    জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৩ মে ২০১৯ | ১২৪৩ বার পঠিত
  • বহু কষ্টে আব্বুর সাথে চয়ন গুন্ডাকে দেখা করতে রাজি করিয়েছি। চয়ন গুন্ডার সাথে আমার দশবছরের প্রেম।‌‌ছোটবেলায় যখন আমি চুলে দুই ঝুঁটি করে বাসার পেছনের গাছতলায় ফুল কুঁড়াতাম চয়ন গুন্ডা সেইসময় বন্ধুবান্ধব নিয়ে সেই গাছতলার এক চিপায় বসে গান্জা টানত। মাঝেমধ্যে আমি ফুল হাতের নাগালে না পেলে সে এসে গাছে ঝাঁকি দিয়ে ফুল ঝরাতো। সেই সূত্রেই আমাদের পরিচয়।

    শিশুহৃদয় লজিক বোঝে না। সেই ছোটবেলায়‌ই তাই চোপাভাঙ্গা গান্জাখোর চয়ন গুন্ডাকেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম। পরিবারের বকাবকি, মারধোর কোনো কিছুতে কোনো অবস্থাতেই চয়ন গুন্ডাকে ছাড়তে রাজি হ‌ইনি। পরিবার আমার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেও বিফল হয়েছে।চয়ন গুন্ডা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেপক্ষকে আসতে দেখলেই পিটিয়ে, ভয় দেখিয়ে ফেরার রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এখন আর আমাকে দেখতে‌ কোনো ছেলেপক্ষ‌ও আসে না।

    গান্জাখোর হলেও চয়ন গুন্ডার হৃদয় অনেক বড়,উদার মানসিকতার মানুষ সে। সবসময় মানুষকে সাহায্য করে,সবার পাশে থাকে,এলাকায় কারোর কোন বিপদ হলে, সমস্যা হলে সবার আগে এগিয়ে আসে চয়ন গুন্ডা। তারপরেও এলাকার লোকের ভয় যায় না। গান্জাখোর ছেলে! কখন কি করে!

    আমাকেও সে নানাভাবে সাহায্য করে। ইন্টারের টেস্ট পরীক্ষা খারাপ হলো। স্যারেরা বললেন,আবার পরীক্ষা দিতে হবে,নাহয় আমাকে এডমিট কার্ড দিবে না। চয়ন গুন্ডা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের অফিসে গিয়ে টেবিলে গদাম করে একটা ঘুষি বসাতেই ড্রয়ার ভেঙ্গে পড়লো,তার ভেতর থেকে সে এডমিট কার্ড নিয়ে বেরিয়ে আসলো।

    গান্জা টানার কারণে চয়ন গুন্ডার মন সবসময়ই উদাস থাকে। গান্জা খেয়ে এপর্যন্ত তাকে কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করতে আমি দেখিনি। বরং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সে গলা ছেড়ে গান গায় আর অকারণে কাঁদে। তার গানের গলা ভালো।

    বেশ কয়েকবছর এভাবে কাটার পর পরিবার আর আত্নীয়-স্বজন আব্বুকে অনেক বোঝালো। মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে,চয়ন গুন্ডা ওর অন্য কোথাও বিয়ে হতেও দেবে না। এভাবে চললে মেয়ে সারাজীবন কুমারী থাকবে, নাহলে চয়ন গুন্ডার সাথে পালিয়ে যাবে। তখন মান-সম্মান সব শেষ হয়ে যাবে। সুতরাং কথা বলে দেখো,ছেলেটাকে বাড়িতে ডাকো।

    অনিচ্ছা সত্ত্বেও সর্বসম্মতিক্রমে আব্বু এক বিকেলে আমাকে বললেন চয়ন গুন্ডাকে বাড়ীতে নিয়ে আসতে। আমি খুশী মনে তখন‌ই বাসার পেছনে র‌ওনা হলাম। চয়ন গুন্ডা এইসময় পুকুরঘাটে বসে সিগারেটের ভেতর গান্জা পুরে টানে।

    পুকুরঘাটে‌ই তাকে পাওয়া গেল। আমি বলে আসলাম পরদিন সকালে যেন আমার আব্বুর সাথে গিয়ে দেখা করে,এবং কোনোরকম নেশা করে যাওয়া চলবে না।

    নেশার ঘোরে চয়ন গুন্ডার তখন কথা বলার মতোও অবস্থা নাই। মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে সে গান ধরলো,

    ''ও বন্ধুরেএএএএএএএএএ"

    এএএ টান শেষ‌ই হচ্ছে না। আমি বাড়ি চলে আসলাম।

    পরদিন সকালবেলা চয়ন গুন্ডা আব্বুর সাথে দেখা করতে এসেছে। সাথে আর কেউ আসে নাই। আব্বুর ঘরে আমি,আম্মু,আমার দুই আপু,দুই দুলাভাই,বড় কাকা,খালামনি,ছোটফুপু,আর ছোটফুপা।

    আব্বু খানিকক্ষণ তীব্র দৃষ্টিতে চয়ন গুন্ডার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, তুমি আমার মেয়ের পেছনে লেগেছো কেন? আমার মেয়ের বিয়ে দিতে পারছি না তোমার কারণে, বারবার ঝামেলা বাঁধাও,ছেলেপক্ষ মেরে তাড়াও.....

    চয়ন গুন্ডা জবাব দিল না। চুপ করে তাকিয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছি সকাল থেকে গান্জা টানতে না পারার ফলে তার মাথা হ্যাং। স্বাভাবিকভাবে গান্জা টানলেই মানুষের কথাবার্তা জড়িয়ে যায় কিন্তু চয়ন গুন্ডার হিসাব আলাদা। গান্জা ছাড়া বেশীক্ষণ থাকলে তার কথাবার্তা জড়িয়ে যায়।

    আব্বু সবার দিকে একবার তাকিয়ে আবার বললেন,কতবড় বেয়াদব দেখছেন সবাই? আমি মুরুব্বি! ঘরে ঢুকল একটা সালাম দিলো না,এখন কথার জবাবও দেয় না! আর আপনারা বলেন এরে আমার মেয়ের জামাই বানাবো!

    আব্বুকে থামিয়ে দিয়ে বড় দুলাভাই চয়ন গুন্ডার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই যে ভাই! কি দেখে তোমার হাতে আমাদের শালী দেবো বলতে পারো? কি আছে তোমার? এই পরিবারের জামাইদের যোগ্যতা জানো? আমি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ‌লেকচারার আর মেজজন একটা ওষুধ কোম্পানির ম্যানেজার! তোমার মতো রাস্তায় বসে গান্জা টানা একটা ছেলেকে কোনো বাবা-মা কি ভরসায় মেয়ে দেবে বলতে পারো?

    চয়ন গুন্ডা উশখুশ করছে। লজিক তাকে কাবু করে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে।

    আব্বু আবার বললেন,তুমি কি চাও বলো? কতো টাকা পেলে আমার মেয়েকে ছাড়বে?

    চয়ন গুন্ডা মুখ খুললো। বললো,

    আপাতত একহাজার দেন। গান্জা কেনার টাকা নাই।

    মুহুর্তে ঘরের ভেতর শুনশান নীরবতা নেমে এলো। আমি কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লাম। আমার দশবছরের ভালোবাসার মূল্য মাত্র একহাজার টাকা? এককোটি চাইলেও আমার মান রক্ষা হতো!

    মেজ দুলাভাইয়ের মাথায় মুহূর্তে বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা আইডিয়া এলো। সে চয়ন গুন্ডার হাত ধরে আলাদা ডেকে নিয়ে তাকে কি কি যেন বললো। সেগুলো আমি শুনতে পেলাম না। শুধু দেখলাম চয়ন গুন্ডা জোরে জোরে কয়েকবার মাথা নাড়ল।

    তারপর ফিরে এসে আমার হাত ধরে খুশী খুশী গলায় বললো, ভালো থেকো কেমন!

    আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবা?

    চয়ন গুন্ডা হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ল।

    দুলাভাইয়ের কাছে গিয়ে আমি চিৎকার করে বললাম,কিসের লোভ দেখিয়েছেন ওকে? সত্যি করে বলেন! কতটাকা দিতে চেয়েছেন? নাকি গাড়ি,বাড়ি, প্রোপার্টির লোভ দেখিয়েছেন? কি দিয়ে কিনে নিলেন আমার ভালোবাসা বলুন দুলাভাই বলুন!!

    দুলাভাই হাসিমুখে বললেন,আমি ওকে গাঁজা গাছের বাগান করে দিতে চেয়েছি। সেখানে ও মনের সুখে গাঁজা চাষ করবে আর খাবে।

    দুলাভাইয়ের কথা শেষ হতেই চয়ন গুন্ডা হাসিমুখে বললো,আগে গান্জা, তারপর তো প্রেম!

    লেখা- জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ০৩ মে ২০১৯ | ১২৪৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • র২হ | ১০ মে ২০১৯ ১২:৩৯48281
  • যাহ! ছোট মেয়েকে গাছ ঝাঁকিয়ে ফুল তুলিয়ে দেয় এমন হৃদয়বান গাঁজাখোরের গল্পের এরকম শেষ পছন্দ হলো না।
  • | ১১ মে ২০১৯ ০২:৫৮48284
  • গাঁজা র এই অকমান ধম্মে স ইবে?
  • কল্লোল | ১১ মে ২০১৯ ১২:০৮48283
  • র২হ। আপনি ক্খনো গাজায় ড দেন নাই
  • কল্লোল | ১১ মে ২০১৯ ১২:০৮48282
  • র২হ। আপনি ক্খনো গাজায় ড দেন নাই
  • কল্লোল | ১২ মে ২০১৯ ০১:৫৮48285
  • কেন? এর মধ্যে গাঁজার অকমান কিদ্দিএ হলো? আবার উপুরে গাঁজাই সত্য/তাহার উপরে নাই
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন