• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা  শনিবারবেলা

  • পেন্সিলে লেখা জীবন (১৪)

    অমর মিত্র
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৩৪৬ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মাল্যবান, জলপাইহাটি, বাসমতীর উপাখ্যান লেখা হয়েছিল পেনসিলে। গোপনে লিখতেন কবি, আর ভাই অশোকানন্দ দাশের বাড়ি গিয়ে ট্রাঙ্কে জমা করে ফিরে আসতেন। , ১৭২/৩ রাসবিহারী এভিনিউয়ের সেই বাড়ি অতি সম্প্রতি ভাঙা শুরু হয়েছে। সেখানেই ছিল সন্দেশ পত্রিকার অফিস। বাড়িটি পেনসিলে আঁকা বাড়ির মতো ধূসর হতে হতে মুছে গেল। ট্রাঙ্কগুলি অনেকদিন আগেই জাতীয় গ্রন্থাগারে জমা পড়েছিল। অনুজ প্রতিম লেখক আফসার আমেদ তা কপি করে আনত ন্যাশানাল লাইব্রেরি থেকে। ভাইরাস আক্রান্ত এই অন্তরীন কালে আমি আমার জীবনের কথা বলব ভাবছি। জীবনানন্দ মুছে যাননি, আমার লেখা অস্পষ্ট হতে হতে হারিয়ে যাবে জানি। আমি সামান্য মানুষ, জীবনভর কলমে লিখেছি, তার উপরে জল পড়ে লেখা ধুয়ে গেছে কতবার। আমি আমার কথা পেনসিলে লিখতে শুরু করলাম। এই ভাইরাস আক্রান্ত কালে মানুষের কথা মানুষ লিখে যাচ্ছেন পেনসিলেই। কোনটি থাকবে, কোনটি আবার ভেসে উঠে আমার কাছে চলে আসবে দু’বছর বাদে, আমি জানি না। তবু লেখা। কারণ জীবনে এক জাদু আছে, জীবনের জাদুতে কতবার মুগ্ধ হয়েছি, কতবার অশ্রুপাত করেছি, সেই কথাই তো লিখব, লিখতে বসেছি। অতি প্রত্যুষে এই পেনসিলিয়া খবরিয়ার নিদ্রা ভাঙে। তখন বাইরে অন্ধকার। কাকও ডাকে না। কী করবে সে? এ নভমণ্ডল তখন হিম নীলাভ, চারদিকে অসীম স্তব্ধতা, সেই নীরবতার ভিতরেই জীবনের আরম্ভে পৌঁছে যেতে চায় সে, মাতৃগর্ভে স্মৃতির কাছে ফিরে যেতে চায়। সেই স্মৃতিলেখ এই বিবরণ।
    চৌদ্দ

    সময় বড় বলবান। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কৃশকায় গ্রন্থ ছিল। সেই পুস্তিকার ভিতরে সময়ের গ্রাসে চলে যায় কত জীবন আর কীর্তি সেই কথা ছিল। সময় মুছে দেয় অনেক কিছু। আবার সময় বাঁচিয়ে তোলে বিস্মৃত সময়ের মহৎ চিহ্নকে। আমার মনে পড়ে ১৯৭৪-৭৫ নাগাদ পাওয়া যেত না ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস। আমি কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে একটি পুরোন বই পেয়েছিলাম। সেই আমার প্রথম তিতাস পড়া। এখন তিনি স্বমহিমায় জ্বলজ্বল করছেন। কত প্রকাশক ছেপেছেন তিতাস। সতীনাথ ভাদুড়ীর বইও তখন অমিল ছিল। সময় বাঁচিয়ে তুলেছে তাঁকে। তখন তাঁকে পড়ত না বাঙালি পাঠক, এখন তাঁকে না পড়লে সাহিত্য ও জীবনের অনন্য সৌন্দর্য অনুভব করা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। সময়ের এই সংকট থাকে। সময় অনেক সময় চিনতে পারে, অনেক সময় পারে না। যাঁকে পারে, তিনি ভাগ্যবান। যাঁকে পারে না, তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মহাযাত্রায় যান। কিন্তু এও পুরো সত্য নয়। মানিকের আলো চেনা গিয়েছিল। কিন্তু মানিককে বঙ্গবাসী বই কিনিয়ে পাঠককুল সেই ভাবে চেনেননি। জনতা পাঠকই বা চিনবেন কেন? মানিক যা লিখেছিলেন, তার পাঠক এবং রমা ও মোহনের পাঠক নিশ্চিত ভাবে এক নয়। সকলের জন্য নয়, তিনি লিখেছেন দীক্ষিত পাঠকের জন্য। সাহিত্য-শিল্প শুধু মাত্র বিনোদন নয়। কোনো শিল্প কর্মই তা নয়। আবার এখন বিনোদনের নানা মাধ্যম। তা সাহিত্যে থাবা মারছে। বইয়ের পাঠক কমছে। কিন্তু একটি কথা বলার থাকতে পারে টেলিভিশনের জন্য কি ভাল থিয়েটার সিনেমার দর্শক কমেছে ? টিভি সিরিয়াল দেখা আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়া এক ঘটনা নয়। এমনিতে পৃথিবী জুড়ে সিরিয়াস সাহিত্যের পাঠক কমেছে হয় তো। জনগণেশের সাহিত্য যাঁরা করেন, তাঁদের কণ্ঠস্বর উচ্চ হয়েছে। চিরকাল তা উচ্চই ছিল, এখন আরো বেড়েছে। যখন লিখতে শুরু করি, যাঁদের সঙ্গে মিশি, তাদের অধিকাংশই অন্য রকম লিখতে চান। লিখতে এসে পড়তে পড়তে বুঝতে পেরেছিলাম, আমি যে পথে যেতে চাই, সে পথ খুব কুসুমাস্তীর্ণ নয়। কিন্তু লিখব যে তা ঠিক করে ফেলেছিলাম, আর তাই খুঁজে খুঁজে জগদীশ গুপ্ত, রমেশচন্দ্র সেন পড়ছি, বড় লেখকদের খুঁজে নিচ্ছি নিজে শিখব বলে। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, অসীম রায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পড়ছি। না পড়ে লেখা যায় বলে বিশ্বাস করতাম না। এখনো করি না। এখন পড়ার ব্যাপ্তি প্রসারিত হয়েছে। কত নবীন লেখক এসে গেছেন। ভালো লাগলে তাঁদের লেখা পড়ি।

    বেলিয়াবেড়া থেকে চলে আসি ১৯৭৮-এর ডিসেম্বরে। আর ভালো লাগছিল না ঐ অঞ্চল। নানা কারণে মেদিনীপুরের পশ্চিম অঞ্চল ছেড়ে আসতে চাইছিলাম। আমি জেলার সেটেলমেন্ট অফিসারকে বলেছিলাম এবার আর এক নদীর ধারে যেন বদলি হই। শাল মহুয়া ছেড়ে সমুদ্রের কাছাকাছি যেতে চাই। আমার তখন একটা অর্জন হয়েছিল, একে বছর বছর নতুন জায়গায় বদলি করে দাও, আনন্দে চলে যাবে। বিয়ে করেনি, ঘুরতে ভালোবাসে। ও লেখে। এলাম হলদিয়ার নিকটবর্তী বালুঘাটায়। একেবার হলদি নদীর ধারে আমার অফিস। থাকি ব্রজলাল চক, নির্মীয়মাণ হাইওয়ের ধারে বটবাবুর বাড়িতে ভাড়ায়। একতলায় দুটি ঘরে চারজন, আর আমি ছাদের ঘরে একা। লিখি বলে এই ব্যবস্থা করে দিল সহকর্মী বন্ধুরা। তাদের নাম ভুলিনি। বিদ্যুৎ পাল চৌধুরী বাগবাজার স্ট্রিটের ছেলে, ফর্সা, দীর্ঘকায়, খুবই বন্ধুবৎসল। রামদাস কর্মকার, তাদের পরিবার ছিল স্বর্ণকার। স্বর্ণ নিয়ন্ত্রণ আইন তার বাবা কাকাকে বসিয়ে দিয়েছিল। থাকত বাগমারি বস্তিতে। রামদাসের বিয়েতে আমি গিয়েছিলাম। মনোরঞ্জন চৌধুরী, কৃষ্ণ বর্ণের এক রোখা যুবক। সি পি আই এম, কমিউনিস্ট পার্টি করত। আর ছিল হাওড়া জেলার কাশীনাথ মাজি। এঁরা সকলে ছিলেন সৎ। এঁরা ছিলেন দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল। কাশীনাথ মাজি বয়সে বড় ছিলেন। বালুঘাটায় অফিস। ব্রজলাল চকে দাঁড়িয়ে দুদিকে দুহাত মেলে দিলে এক দিকে চৈতন্যপুর, অন্যদিকে বালুঘাটা। বালুঘাটার হলদি নদীর ওপারে নন্দীগ্রাম থানা। নদীর ধারে যাওয়া নিত্য অভ্যাস ছিল।

    ১৯৭৯ সালেই আমি অমৃত পত্রিকায় ‘পাহাড়ের মতো মানুষ’ ধারাবাহিক লিখতে আরম্ভ করি। তা ব্রজলাল চকের সেই মেসবাড়ির চিলেকোঠার ঘরে বসে লিখতাম। হ্যাঁ, বেলেবেড়ায় আমার জীবন বিপন্ন হয়েছিল। সেই কারণেও আমাকে দূর পশ্চিম থেকে বদলি করে পুবের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রামচন্দ্রপুর নামে একটি আদিবাসী, সাঁওতাল জনজাতি অধ্যুষিত গ্রামের জমি নিয়ে একটি সমস্যা হয়েছিল। খুব জটিল ছিল সেই সমস্যা। জমি এক ব্যক্তির। তিনি উচ্চবর্ণের মানুষ ছিলেন। তাঁর সন্তানাদি ছিল না। স্ত্রীও মারা গিয়েছিলেন। জমি চাষাবাদ করে দিত আদিবাসী কৃষকরা। অকস্ম্যাৎ তাঁর মৃত্যুর পর পুরুলিয়ার এক আশ্রমের সন্ন্যাসীরা একটি দলিল নিয়ে এসে জমি ও বাড়ির দখল নিয়ে চাষীদের জমি থেকে উচ্ছেদ করে। চাষীরা বলে জাল দলিল। বাবু আচমকা মারা গেছে। তার ভাইপোরা পেতে পারে জমি। আর তারা বহুদিনের চাষী, উঠবে না জমি থেকে। রামচন্দ্রপুর অনেকদূর। আমি টিম নিয়ে তদন্ত করতে গিয়েছিলাম। এক ক্লাব ঘরে ছিল থাকার ব্যবস্থা। খাটিয়া চাদর এবং মশারি। খাওয়ার ব্যবস্থা আদিবাসী চাষীরা করেছিল। হ্যাঁ, আমরা টাকা দিয়েছিলাম। তারা রান্না করে দিত। তদন্ত করে জমির স্বত্ব লিখনই কাজ। আদিবাসীদের নাম বর্গাদার হিসেবে সাব্যস্ত হলো। এতে সাধুরা বিরূপ হয়েছিল। তারা ঐ জমি আর বাড়িতে ঐ অঞ্চলে আশ্রমের শাখা খুলবেন ঠিক করেছিলেন। যেদিন কাজ শেষ হয়, বুড়ো হপনা মুরমুর কাছে সন্ধ্যায় আদিবাসী পুরাণের সৃষ্টিতত্ব শুনছিলাম। পৃথিবীর জন্ম হলো কীভাবে, আগুনের জন্ম হলো কীভাবে...এই সব। রাত ন’টায় খেতে যাব অন্যত্র। সেদিন উৎসব করে হ্যাজাক আলো জ্বালিয়ে গ্রামের আদিবাসী, নিম্নবর্গের মানুষরা আমাদের মুর্গি মাংস ভাত খাওয়াবে ঠিক ছিল। ন’টার পর তারা ডাকতে আসবে। মাসটা নভেম্বর। হিম পড়তে শুরু করেছিল। রাত আটটার সময়ে এক দীর্ঘদেহী সাঁওতাল পুরুষ, যিনি কলকাতা পুলিশে চাকরি করেন বলে গ্রামে খুব প্রতিপত্তি, আমাকে ডাকতে এলেন। সায়েব চলেন। খাবেন না। সব রেডি। আমরা ক’জন যাব বলে তৈরি হচ্ছি, হঠাৎ বুড়ো হপনা মুরমুর সন্দেহ হতে এক যুবককে পাঠালেন পুলিশকে ডাক দেখি। সে এলে বুড়ো তাকে জেরা করতে লাগল, তাকে কে পাঠিয়েছে এঁদের ডাকতে। রান্না হয়ে গেলে সকলকে ডাকবে তো। এক সঙ্গে ভোজ হবে। খবর দিল কে ? বুড়োর কী তেজ! “এই একে ধর। বাঁধ। কে পাঠাল সায়েবকে ডাকতে খোঁজ নে। হাঁক দে। এ সাধুদের চ্যালা হয়েছে।”

    লোকটা পালিয়েছিল। সেই রাতে আমাদের ক্লাব ঘর পাহারা দিয়েছিল যুবকেরা। সকালে বাস রাস্তা অবধি গিয়ে বাসে তুলে দিয়েছিল। পাহাড়ের মতো মানুষ উপন্যাসের বড় অংশ সেই আশ্রমের সন্ন্যাসীদের জমি দখল। যখন ধারাবাহিক লিখি, আমি একটি ভয় দেখানো চিঠি পেয়েছিলাম। পত্রলেখক আমাকে আমার লেখা বন্ধ করতে বলেছিল। সে ছিল সাধুদের সংগঠনের অনুগামী। যাই হোক, বন্ধ করিনি লেখা। অমৃত পত্রিকায় ‘পাহাড়ের মতো মানুষ’ পড়েছিলেন অনেকে। প্রশংসা পেয়েছিলাম। আবার এক অগ্রজ, পরম শ্রদ্ধেয় লেখক বলেছিলেন, শ্যামল তোমাকে নষ্ট না করে দেয়। কেন বলেছিলেন তা বুঝি। সাহিত্যের জগত খুব নিষ্কলুষ নয়। একজন লেখককে খুব সাবধানে পা ফেলতে হয়। তিনি আমার প্রিয় ছিলেন। তাঁর লেখার অনুরাগী আমি। কিন্তু তাঁর কথায় টের পেয়েছিলাম, মানুষের যে ঔদার্যকে আমরা দেখতে পাই সামনে, তা-ই হয়ত সব নয়। যাই হোক, এসব নিয়েই জীবন।

    কবি অনন্য রায়, মণীন্দ্র রায়ের পুত্র, রূপবান দেবদূত, হার্টে ছিদ্র ছিল শুনেছি। তার কবিতার বই, ‘দৃষ্টি অনুভূতি ইত্যাকার প্রবাহ এবং আরো কিছু’, ‘নৈশ বিজ্ঞপ্তি’, ‘আমিষ রূপকথা’, ‘চুল্লীর প্রহর’, ‘নীল ব্যালেরিনা’ এবং কাব্যনাট্য-আলোর অপেরা’য় ফিরে ফিরে আসেন ত্রুণ কবিদের কাছে। তুষার চৌধুরী ও তাই। তো অনন্য এক সন্ধ্যায় কোথা থেকে যে আমাকে পেয়েছিল মনে নেই। এমন হতে পারে এক সঙ্গে মদ্যপান হচ্ছিল, বন্ধুরা চলে গেছে, অনন্য আমাকে আটকে দিয়েছে। আমি সামান্য পানের মানুষ। আমি শৃঙ্খলাবদ্ধ মানুষ। কিন্তু অনন্য বলছিল, তোমার সঙ্গে আমার সারারাত কথা হবে। রাত একটা পর্যন্ত রিকশায় ঘুরে আমরা ওদের প্রাসাদোপম বাড়িতে পৌছেছিলাম যখন কলকাতা নিস্তব্ধ। অনন্য যে এত পড়েছে আমার সেই সামান্য ক'টি গল্প এবং উপন্যাস তা আমি জানতাম না। একটি দৃশ্য ছিল ময়ূরের পিঠে চেপে কলাবনি, ( উপন্যাসের পটভূমি ) দেখছে চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন। এখন আর অত মনে নেই। উপর থেকে একটি জনপদ দেখতে কেমন লাগে, তা দেখছে পরিব্রাজক। সেই অংশটি নিয়ে রাত তিনটে অবধি তার কথা শুনেছি। তারপর ঘুম এল। অনন্যর অকাল প্রয়াণ হয়েছে। তুষারও বেঁচে নেই। এই দুজন খুব বড় কবি। সময়ে ফিরে আসবেন। এঁদের আমি সমীহ করতাম। নতুন লেখা যদি এদের সামনে পড়া যেত, ভয়ই করত, কী মন্তব্য করে দু’জন। পড়ুয়া হিসেবে সমীরও খুব ভালো।

    বালুঘাটায় থাকাকালীন সেই ১৯৭৯-র পৌষ সংক্রান্তিতে, জানুয়ারির ১৩-১৪ নাগাদ আমি গঙ্গাসাগর মেলায় যাই নদীপথে তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে। একা আমি সাগর মেলায় যাচ্ছি শুনে আমাদের বাড়িওয়ালা বটবাবুর স্ত্রী হা হা করে উঠলেন। দাদা একা যাবেন ? তিনি আমাকে পুটুলি ভরে দিলেন, নাড়ু, মুড়কি, চিড়ে, পাটালিগুড়। বালুঘাটা নদীঘাট থেকে সেই অতি বৃহৎ পাল তোলা নৌকো ছাড়ল রাত আটটা নাগাদ। সব গ্রামের মানুষ, চেনা পরিচিত তারা পরস্পরে, আমিই শুধু আলাদা মানুষ। আমাকে তেমন কেউ চেনে না। কিন্তু জায়গা করে দিলেন। আমি ছইয়ের নিচে ব্যাগ রাখলাম, সেখানে খড় বিছানো। খড়ের উপর কম্বল পেতেছে কেউ, কেউ চাদর। এক বৃদ্ধার পাশে আমার জায়গা হলো। তাঁর জ্বর এসেছিল কলেরা ইঞ্জেকশন নিয়ে। কলেরা ইঞ্জেকশনের সার্টিফিকেট ব্যতীত নৌকোয় যাত্রী নেবেই না। কেন না গঙ্গাসাগর মেলায় কলেরা লাগত তখন। মড়ক লাগত এক এক সময়। নৌকোয় যাত্রী ছিল জনা তিরিশ। কত তা এখন মনে নেই। কমও হতে পারে। পরপর নৌকো ছাড়বে। অনেক নৌকো। নৌ বহর বলা যায় একে। সব নৌকোয় তীর্থযাত্রী। আমি জায়গা বুঝে নিয়ে বেরিয়ে গলুইয়ে এসে বসেছি। হিম পড়ছে উপর থেকে। শীতবস্ত্র আছে। আছে মাথার মাঙ্কি ক্যাপ। মাঝিরা গামছা বেঁধে নিয়েছে মাথায়। গায়ে মটকার চাদর। আমি মাঝিদের সঙ্গে গল্প করতে লাগলাম। শুনলাম আগামীকাল বেলা চারটে নাগাদ পৌঁছব। ১৮ ঘন্টার যাত্রা। এই যাত্রা জোয়ার ভাঁটার উপর নির্ভরশীল। ভরা জোয়ারে সাগরের দিকে যেতে খুব কষ্ট হবে। মাঝিরা আকাশ চেনে, জোয়ার-ভাটার সময় জানে, তারা যেন দিকদর্শী। অনেক দিন পরে গোসাবা থেকে ক্যানিং হয়ে ফেরার সময়, জোয়ার ভাটা হিশেব করে বেরোনর কথা শুনেছিলাম। ক্যানিঙে মাতলা নদ বুঁজে এসেছে চর পড়ে পড়ে। তখন ব্রিজ হয়নি। নৌকোয় পার হতে হত ডকের ঘাট। জোয়ারের জন্য বসে থাকতে হত নদীঘাটে। এই অভিজ্ঞতা পরের বছর নন্দকুমার থেকে দীঘা যেতে হলদি নদীর ধারে নরঘাটে হয়েছে দীর্ঘদিন। জোয়ার হিসেব করে না গেলে বসে থাকতে হত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভাঁটার সময় নদীর বুক প্রায় খালি হয়ে যেত। এখন নরঘাট ব্রিজ হয়ে দীঘার দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে। ট্রেনও চালু হয়েছে ঐ পথে। নদীর বুক ভাঁটার সময় খালি হয়ে যাওয়ার এক অপূর্ব বিবরণ পড়েছিলাম বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘নদীর সঙ্গে দেখা’য়। বরেনদা প্রায় বিস্মৃত হয়েছেন। কিন্তু অনন্য লেখক ছিলেন। ‘তোপ’ গল্পটি সংগ্রহ করে কেউ পড়ুন, অমন গল্প আমাদের ভাষায় কম লেখা হয়েছে। বরেনদার সঙ্গে আলাপ শ্যামলদার বাড়িতেই। তাঁর নিশীথফেরি উপন্যাসের কথা মনে পড়ে। অকৃতদার মানুষ। প্রতি বছর হিমালয় যেতেন। পিণ্ডারী হিমবাহর কথা তাঁর লেখায় পড়ি প্রথম। হুঁ, জোয়ার ভাঁটা এই লেখায় ঘুরে ঘুরে আসছে। বলছি নদীর খালি বুকের কথা।

    কোন কথা থেকে কোন কথায় যাচ্ছি। বলছি গঙ্গাসাগর তীর্থে যাত্রার কথা। নদীর জলস্রোতের অভিমুখ, এবং বাতাসের গতি প্রকৃতি বুঝেই বহর চলবে। একদল তীর্থযাত্রী খোল-কত্তাল নিয়ে কীর্তন আরম্ভ করেছে। বেশ লাগছে। মাঝিরা হাঁক মারছে অন্য নৌকোর উদ্দেশে, প্রত্যুত্তর আসছে। আমি মাঝি হাল ধরে থাকা মাঝির সঙ্গে গল্প জুড়েছি। আকাশের তারারা তত স্পষ্ট নয়। ধ্রুবতারাই তো দিক নির্দেশ করে। আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল, কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের কথা। কুয়াশায় তীর্থ থেকে ফেরার পথে নৌকো পথ হারিয়ে যেখানে পৌঁছেছিল তা অচেনা এক সমুদ্রতটে। আসলে তা কাঁথির নিকটে এক জায়গায়। কপালকুণ্ডলার মন্দির আছে সেখানে। অশ্বচরিত উপন্যাসে আছে কপালকুণ্ডলা পাঠ। সে কথা পরে হবে। নাহলে কুয়াশাভরা শীতের নদীতে আমি আবার দিকহারা হয়ে যাব। নৌকো সব একসঙ্গে চলবে। নইলে জলদস্যুদের হাতে নিগৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা। মাঝি আমাকে কত কিছু বলল, শেখাল। গাঙে দু’রকম বাতাস আছে, তার একটা হলো জগন্নাথ ঠেলা বায়ু। মানে পুরী ধামের দিকে বইবে সে বাতাস। তখন পাল নামিয়ে রাখতে হবে, নইলে সাগর দ্বীপে যাওয়া যাবে না। নৌকো চলে যাবে পুরী। কত রকম বাতাসের কথা বলল মাঝি। সে বুঝতে পারে।

    অনেক রাতে ঘুম এল। কীর্তনিয়ারা ঘুমতে গেছে। মাঝি বলল, যান কত্তা, ঘুমাই নেন, কাল সারাদিন যাওয়া, বিকেলে পৌঁছন। আমি তাদের সঙ্গে ঠিক করে নিয়েছি পরদিন দুপুরে তাদের সঙ্গেই খাব। তারা ভাতেভাত খাবে। ছইয়ের ভিতরে আমি আমার জায়গায় শুতে গিয়ে দেখি পাশের জন, সেই বৃদ্ধা জ্বরে কোঁকাচ্ছেন। কপালে হাত দিলাম। খুব তাপ। মাঝিদের বলতে তারা বলল, কিছু হবে না, সুঁইয়ের গরম। কমে যাবে। ঘুম ভাঙল ভোরে। বেরিয়ে এসে দেখি, নৌকো থেমে আছে। গাঙের ধারে নোঙর করেছে সব নৌকো। কারণ নাকি জগন্নাথ ঠেলা বাতাস এবং জোয়ার। আমি হাঁটু মুড়ে দেখলাম সাগরে সূর্যোদয়। ভুলতে পারিনি সেই অপার্থিব সূর্যোদয়। ঐ দিকেই সাগরদ্বীপ। এখনো মনে পড়ে জলে সিঁদুরে আলো পড়ল। যে ভূখণ্ডের গায়ে নৌকো নোঙর করা হয়েছিল, তা জঙ্গলাকীর্ণ। দেখলাম সিগাল উড়ছে। ডানা ঝাপটা দিচ্ছে। পরপর গোটা দশ নৌকো দাঁড়িয়ে আছে। বেলা হতে নৌকো ছাড়ল। পাল উড়ল। ভাটা শুরু হয়ে গেল। দুপুরে মাঝিদের সঙ্গে ভাত আলুসেদ্ধ, মুসুরডাল এবং তেঁতুলের অম্বল। নোনা গাঙে টক অবশ্যই খেতে হয়। সারাদিন নৌকো চলল, একটা সাময় সাগরে ঢুকে পড়ল। সুগোল জলের থালা। দিক নেই কোনো দিকে। নৌকো আর থামেনি। জোয়ার আর ভাটার টান সাগরের ভিতরে নেই। একটা জায়গায় দেখেছি দুই দিকেই স্রোতের টান। দুপুরের দিকে দেখতে পেলাম শত শত পাল উড়ানো নৌকো। সব চলেছে সাগরের দিকে। মনে হয়েছিল শত শত পায়রা ডানা মেলেছে সাগর দ্বীপের উদ্দেশে। ঐ সব নৌকো আসছে মেদিনীপুরের উপকূল অঞ্চল থেকে, খেজুরি, হেঁড়িয়া, কাঁথি...ইত্যাদি এলাকা থেকে। চারটে নাগাদ নৌকো পৌঁছতেই এক অপূর্ব দৃশ্য দেখলাম। সেই জ্বরতপ্ত বৃদ্ধা সকলের আগে নিচে নেমে সাগরের জলে ডুব দিলেন। মানুষের বিশ্বাস এমন। সাগরজলে সিনান করে তার জ্বর ধুয়ে যাবে। হয়েছিলও তাই।

    সাগর থেকে ফিরেছিলাম সেই রাত্র থেকে পরের দিন মকর সংক্রান্তির স্নান দেখে। ফেরা হয়েছিল কচুবেড়িয়া থেকে হারউড পয়েন্ট, বাসে কলকাতা। বাড়ি এসে স্নান ঘুম। তীর্থ করে এলাম তো। মাকে বর্ণনা দিয়েছিলাম কপিল মুনির আশ্রম, সারারাত মেলায় ঘোরা, সমুদ্রযাত্রা ইত্যাদির। এখন গঙ্গাসাগরে নৌকো করা তীর্থযাত্রা নিষিদ্ধ, ১৯৯৫-৯৬ নাগাদ এক ভয়াবহ নৌকোডুবি হয়। প্রশাসন অনেক সতর্ক।

    বালুঘাটায় ছিলাম এক বছর। ১৯৭৯-র ডিসেম্বর নাগাদ বদলি হই দীঘায়। স্বইচ্ছায়। আমি চেয়েছিলাম সমুদ্রতীরে থাকব। প্রশাসন আমার সাধ পূরণ করেছিল। না হলে তমলুক, মহিষাদল কোথাও বদলি হতাম অথবা বালুঘাটায় থাকতাম। বটবাবুর কাছে হলদিয়া নগরের জন্য জমি অধিগ্রহণের কথা শুনতাম। শুনতাম ঘোড়ামারা দ্বীপের কথা, দ্বীপটি ডুবে যাচ্ছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এখনো অবশ্য যায়নি। কিন্তু সবই আমাকে বিস্মিত করত। বিস্ময় ব্যতীত জীবন সুন্দর হয় না। বিস্ময়বোধই তো আমাকে লিখিয়ে নেয় এখনো। বালুঘাটা থেকে কলকাতা ফেরা সহজ ছিল। চৈতন্যপুর হয়ে কুকড়াহাটি বোটঘাট। হুগলি নদী পার হয়ে ডায়মণ্ড হারবার। ডায়মণ্ড হারবার, হিরক বন্দরে ঝড়েশ্বর থাকে। তখন তপন বন্দ্যোপাধ্যায় মহকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। অমিতাভ দত্ত গল্প লেখে, সেও থাকে ওখানে। আমি ঝোলায় করে গল্প নিয়ে যাই। এক বিকেলে পৌঁছে তপনদার কোয়ার্টারে রয়ে গেলাম। অনেক রাত্তির অবধি গল্প পড়া, আলোচনা হল। লেখক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সুভদ্র মাটির মানুষ আমি কম দেখেছি। আমাদের সম্পর্ক একটুও নষ্ট হয়নি। এক ছুটির দিনে বেলা এগারটা নাগাদ আমি হীরক বন্দরে পৌঁছেছি। ঝড়েশ্বর বলল, অমর, তোমাকে নতুন গল্প শোনাব থেকে যাও। বিকেলে বাড়ি যেও। ঝড়েশ্বরের বাবার একটি ঝুপড়ির হোটেল। সেখানেই তার ঘর। বাঁশের মাচায় থাকে। একটি বুক সেলফে কিছু বই। ‘পুবের মেঘ দক্ষিণের আকাশ’ নামে ঝড়েশ্বরের একটি উপন্যাস আছে তেতাল্লিশের মন্বন্তর তার বিষয়। তখনই ঐ ভাতের হোটেল খোলা হয়। খুবই গুরুত্ব পূর্ণ।

    দীঘায় গেলাম ১৯৭৯-র ডিসেম্বরে। তখন আমার একটি সখের রেকর্ড প্লেয়ার হয়েছে। এইচ এম ভি কোম্পানির ফিয়েস্তা। রেকর্ড ছিল কম না। রবি শঙ্কর, আলি আকবর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় এর যন্ত্রসঙ্গীত, সেতার সরোদের বাজনা থেকে, হেমন্ত, মান্না, সতীনাথ, অখিলবন্ধু ঘোষ, লতা, সন্ধ্যা থেকে যূথিকা রায় পর্যন্ত। দীঘায় ছিলাম একটি হোটেলে। মালিকের নাম শ্রীনাথ জানা। তাঁর তিনটি ঘর। সামনে খাওয়ার ব্যবস্থা। শস্তার হোটেলে। ঘরের মাসিক ভাড়া ৬৫ টাকা। তো সেই হোটেলওয়ালা ছিল গাঁজাখোর। আর তার ছিল একটি টাট্টু ঘোড়া। সেই ঘোড়ার ছিল একটি পালক। তার নাম ভানু। ভানু ছিল সবহারা এক মানুষ। উঞ্ছবৃত্তি করে দিন কাটত তার। আর সেই ঘোড়া সে পালাত মাঝে মাঝে, তাকে তখন খুঁজতে বের হতো সে। আসলে খোঁজার নাম করে ঘোড়ার মালিকের কাছ থেকে টাকা আদায় করাই ছিল যেন কাজ। আমি শীতে যখন যাই, জানালার পাশে সেই শাদা ঘোড়া নিঃঝুম দাঁড়িয়ে থাকত। তারপর একদিন সে উধাও। সেই পলাতক ঘোড়া আর ভানু দাসকে নিয়ে আমি ১৯৮১ সালে ‘বিভ্রম’ নামে একটি নভেলেট লিখি।

    একদিন, বোধ হয় বৈশাখ নাগাদ পাশের ঘরে এল এক ফরাসি যুবক। হিপি। তার সঙ্গে আমার বন্ধুতা হয়ে গেল। আমি যে সামান্য পড়েছি ভিক্তর উগো, বালজাক, ফ্লবেয়ার, মোপাসা তা বলতাম তাকে। ভিনদেশে বসে এক তরুণের মুখে নিজের ভাষার লেখকের কথা শুনলে আনন্দ হবেই। আর রেকর্ডে গান শুনত। বিভোর হয়ে বাজনা শুনত। হেমন্ত শুনত। বড়ে গুলাম আলি শুনত। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সঙ্গে ফ্রেদরিকের বন্ধুতা ছিল। ভোরে মৎস্যজীবীদের ঝুপড়িতে যেত। তাদের সঙ্গে কর্তাল বাজিয়ে হরে রাম হরে কৃষ্ণ গেয়েই যেত। ফ্রেদরিক বেশ ছিল। একদিন এক মাছ ধরার ট্রলারে করে গভীর সমুদ্রের ভিতর থেকে ঘুরে এল। এক একদিন সে রাতে ফিরত না। জেলেদের ঝুপড়িতে নাকি তার রাত্রিবাস হয়েছে। সারারাত সে সমুদ্র দেখেছে। ফ্রেদরিক বলত, সমুদ্রই লর্ড কৃষ্ণ। এক সন্ধ্যায় ফ্রেদরিক একটি মস্ত বই নিয়ে এল তার ঘর থেকে। ফরাসি কবি বোদলেয়ারের সংকলন। অমন বই আমি আর দেখিনি। সোনার জলে আঁকা তার নাম। আয়তনে ২৫০০ পাতা হবে হয়ত। না, অত পাতা নয়, তার ভিতরে ছিল অসামান্য সব পেইন্টিং। সেগুলি বিশেষ আর্ট পেপারে ছাপা। আর বইয়ের কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপার কাগজের ঘনত্ব ছিল অনেক। ফলে বইটির আয়তন বেড়ে গিয়েছিল। বইয়ে ছিল বোদলেয়ারের ফরাসি কবিতা, ইংরেজি অনুবাদ, পাশে বিখ্যাত চিত্রকরদের আঁকা ছবি। বোদলেয়ারের উপর পৃথিবীর সব দেশের লেখক, সমালোচকের লেখা। আমি সম্ভ্রমের সঙ্গে বইটিতে হাত রাখলাম। পাতা উলটে উলটে দেখলাম জগদ্বিখ্যাত পেইন্টারদের আঁকা ছবি। ফ্রেদরিক আমাকে বলল, সে জেলেদের ঝুপড়িতে গিয়ে থাকবে, তার বইটি আমি রাখব কি না। ঝুপড়িতে ঐ বই নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বর্ষাকাল। বই নষ্ট হয়ে যাবে। ঐ বইয়ের কোনো দাম হয় না। হোটেলের ঘর ছাড়ছে ফ্রেদরিক, কারণ সে সারাদিন সমুদ্র দেখতে চায় সমুদ্রের ধারে থেকে। আমাদের হোটেল থেকে সমুদ্র দূরে, গর্জনও শোনা যায় না। সে জ্যোৎস্না রাতে জেগে থাকতে চায় সমুদ্রতীরে। সমুদ্রই লর্ড কৃষ্ণ। সে কৃষ্ণের কাছাকাছি থাকতে চায়। আমি মুগ্ধ হয়ে সেই রূপবান কৃষ্ণপ্রেমী আমার বয়সী যুবককে দেখছিলাম। কতদূর ফরাসি দেশ। ইংলিশ চ্যানেল, সেন নদীর তীরে প্যারি শহর, আইফেল টাওয়ার, ফরাসি আর ইংরেজদের ভিতর খুব দ্বন্দ্ব, ফরাসিরা ইংরেজি বলতেই চায় না শুনেছি। ফ্রেদরিক তাই ইংরেজি তেমন জানত না। তবে কাজ চালাতে পারত। আমার কাছে বইটি রেখে ফ্রেদরিক সেই হোটেল ছেড়ে চলে গেল জেলেদের অস্থায়ী ঝুপড়িতে। ইলিশের সিজিন। তারা সন্ধেয় ইলিশের নৌকো ভাসায়, পরদিন সকালে ফিরে আসে মাছ নিয়ে। ফ্রেদরিক রাতে জেলে বউয়ের সঙ্গে প্রেম করত। জেলে তখন মাছের নৌকো নিয়ে সমুদ্রে। সেপ্টেম্বর নাগাদ ফ্রেদরিক বলল, পুরী যাবে। পুরী থেকে এক মাস বাদে ফিরবে। বইটি রেখে গেল আমার কাছে। অত ভারি বই নিয়ে সে ঘুরতে পারবে না। ফ্রেদরিক আর আসেনি। আমি ডিসেম্বরে চলে আসি দীঘা থেকে। জানা মশায় বলল, বই আপনার সঙ্গে থাকুক। ঠিকানা দিয়ে যান। ও আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। যোগাযোগ করেনি সে। সেই বই আমার সঙ্গে আছে। দুষ্প্রাপ্য, দুর্মূল্য। ফ্রেদরিক কবিতা লিখত। জানি না, সে এখনো লেখে কি না।


    (ক্রমশঃ)

    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৩৪৬ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
গল্প - moulik majumder
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৬:২৮102335
  • কী ঐশ্বর্যবান জীবন !  আমার ঈর্ষা হয় ! 

  • সমীর চট্টোপাধ্যায় | 103.151.156.98 | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২০:২৪102361
  • পড়তে পড়তে ঘোর লেগে যায়। অনেক ঘটনা অনেক কাহিনি ওর মুখে শুনেছি ফিরেফিরে , লেখায় এসেছে সেসব , পড়েছি , কিন্তু আবার এখন কথকঠাকুরের কথকতার মতো এই লেখা পড়ে নতুন করে আবিষ্ট না হয়ে উপায় নেই। এমনই লেখনীর সৌন্দর্য , এমনই স্নিগ্ধতা। এক একটি পর্ব পড়ি , ইচ্ছে করে পুরনো পর্বে ফিরে যাই , ফিরে পড়ি , পুরনো গান যেমন শুনি। পরবর্তী পর্বের জন্য আগ্রহ বেড়ে ওঠে। এমনই জাদু এই লেখার। 


    অমরকে বাহবা। ভালোবাসা। 

  • শাহাব আহমেদ | 2600:8807:c80d:5600:a06b:3bf1:458b:8834 | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২২:০৯102367
  • একটানে পড়ে ফেললাম, খুব ধরে রাখলো। এমন লেখা মনে আঁচর কাটে।

  • সেবন্তী ঘোষ | 43.252.140.26 | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১০:২৩102378
  • অসামান্য ! অপেক্ষায় থাকি এই ধারাবাহিকের


    অনন্য রায় আমার প্রিয় কবি। তুষারদার লেখাও ভালো লাগে। 

  • Dipak Das | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:২৫102381
  • এমন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জীবন। ভাল লাগাটা ছাড়তে চাইছে না। 


    ‘একটি দৃশ্য ছিল ময়ূরের পিঠে চেপে কলাবনি, ( উপন্যাসের পটভূমি ) দেখছে চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন। এখন আর অত মনে নেই’—ঝাড়গ্রামে কলাবনি নামে জায়গা আছে। জঙ্গল আছে। তারই কি প্রভাব? 


    হলদিয়ায় বহু ধরনের মানুষ থাকেন। বহু পেশার বহু মানব গোষ্ঠীর। তাঁদের জীবনযাত্রা জানলে জীবন জানা যায়। 

  • Amar Mitra | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৮:০০102384
  • দীপক দাসঃ   পটভূমি তো এই  ধারাবাহিকেই আছে।   উপন্যাসে   জায়গার নাম কি হুবহু  থাকে ? এই হলদিয়া ৪০ বছর আগের। সবে  বন্দর গড়ে উঠছে। 


    অমর মিত্র

  • রেখা রায় | 2409:4060:e8b:41d1:ab6d:d1b8:bcbe:325a | ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১১:৫৩102407
  • অমরদার লেখাতে মতামত দেবার মত যোগ‍্যতা আমার নেই। অসম্ভব সুন্দর লেখা, ছবির মত। 


    যখন এটি পুস্তকাকারে আমরা পাব, তখন দু একটি বানানের প্রতি অবশ‍্যই যত্নবান হবেন বই প্্ররকাশক।

  • রেখা রায় | 2409:4060:e8b:41d1:9b09:1ead:f656:c55 | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১১:৫০102456
  • আগে পড়েছিলাম এখানেই। মতামতও লিখেছিলাম। আবার এল। আবারো পড়লাম। ছবির মত সুন্দর লেখা। মহাজনদের জীবন সম্পর্কে ঔৎসুক‍্য থাকেই। আর এত সুন্দর লেখনী দাদার! খুব ভালো লাগছে পড়তে। প্রতি মুহূর্তে জীবন বেগবান, গতিশীল। অপেক্ষায় রইলাম পরবর্তীর জন‍্য।

  • পার্থপ্রতিম মন্ডল | 2405:201:800a:e028:fcb8:e622:ce01:18b6 | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:০৭102462
  • সত্যিই ঘোর লেগে যাচ্ছে। বাংলা গদ্যসাহিত্যে এমন লেখা বিরল। নেশাগ্রস্তের মতো পড়ে চলেছি একটির পর একটি পর্ব।

  • বিকাশ রায় | 103.125.120.33 | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২২:০০102501
  • অসাধারণ! পড়তে পড়তে মন চলে যায় আপনার ফেলা আসা সেইসব স্মৃতির জগতে!

  • বিতস্তা ঘোষাল | 103.76.82.74 | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১২:৫২102549
  • অপেক্ষায় থাকি এই ধারাবাহিকটা পড়ার জন্য 

  • তপনজ্যোতি মিত্র | 120.155.73.23 | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৫:১১103111
  • একটি অসাধারণ স্মৃতিময় লেখা

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

Amar+Mitra, Memoir, Bengali
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন