• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা  শনিবারবেলা

  • পেন্সিলে লেখা জীবন (১১)

    অমর মিত্র
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১৭৭ বার পঠিত
  • মাল্যবান, জলপাইহাটি, বাসমতীর উপাখ্যান লেখা হয়েছিল পেনসিলে। গোপনে লিখতেন কবি, আর ভাই অশোকানন্দ দাশের বাড়ি গিয়ে ট্রাঙ্কে জমা করে ফিরে আসতেন। , ১৭২/৩ রাসবিহারী এভিনিউয়ের সেই বাড়ি অতি সম্প্রতি ভাঙা শুরু হয়েছে। সেখানেই ছিল সন্দেশ পত্রিকার অফিস। বাড়িটি পেনসিলে আঁকা বাড়ির মতো ধূসর হতে হতে মুছে গেল। ট্রাঙ্কগুলি অনেকদিন আগেই জাতীয় গ্রন্থাগারে জমা পড়েছিল। অনুজ প্রতিম লেখক আফসার আমেদ তা কপি করে আনত ন্যাশানাল লাইব্রেরি থেকে। ভাইরাস আক্রান্ত এই অন্তরীন কালে আমি আমার জীবনের কথা বলব ভাবছি। জীবনানন্দ মুছে যাননি, আমার লেখা অস্পষ্ট হতে হতে হারিয়ে যাবে জানি। আমি সামান্য মানুষ, জীবনভর কলমে লিখেছি, তার উপরে জল পড়ে লেখা ধুয়ে গেছে কতবার। আমি আমার কথা পেনসিলে লিখতে শুরু করলাম। এই ভাইরাস আক্রান্ত কালে মানুষের কথা মানুষ লিখে যাচ্ছেন পেনসিলেই। কোনটি থাকবে, কোনটি আবার ভেসে উঠে আমার কাছে চলে আসবে দু’বছর বাদে, আমি জানি না। তবু লেখা। কারণ জীবনে এক জাদু আছে, জীবনের জাদুতে কতবার মুগ্ধ হয়েছি, কতবার অশ্রুপাত করেছি, সেই কথাই তো লিখব, লিখতে বসেছি। অতি প্রত্যুষে এই পেনসিলিয়া খবরিয়ার নিদ্রা ভাঙে। তখন বাইরে অন্ধকার। কাকও ডাকে না। কী করবে সে? এ নভমণ্ডল তখন হিম নীলাভ, চারদিকে অসীম স্তব্ধতা, সেই নীরবতার ভিতরেই জীবনের আরম্ভে পৌঁছে যেতে চায় সে, মাতৃগর্ভে স্মৃতির কাছে ফিরে যেতে চায়। সেই স্মৃতিলেখ এই বিবরণ।
    এগার

    কলকাতায় ফিরে আসি।

    ১৯৭১-৭২ সালে আমি ও আমার পাড়ার বন্ধুরা ভোটার লিস্টে প্রস্তুতির কাজ করেছিলাম আর এক বন্ধু বিপুল সোমের বাড়িতে বসে। বিপুলদের প্রেস ছিল। সেই প্রেসে নির্বাচক তালিকা ছাপা হত। প্রতিশ্রুতি পত্রিকাও ছাপা হত। আমি প্রতিশ্রুতিতে তখন দুটি গল্প লিখেছি। বিপুলদের বউ বাজারের প্রেসে গিয়েও কাজ করে কিছু টাকা পেয়েছিলাম। ওদের ফ্ল্যাট দত্তবাগান-মিলক কলোনির সরকারি হাউজিং। ওদের ফ্ল্যাটে যাওয়ার বড় আকর্ষণ ছিল রেকর্ড চেঞ্জারে গান শোনা। আমার বাড়িতে একটা এইচ এম ভি ক্যালিপসো রেকর্ড প্লেয়ার ছিল বটে, তার কোনো স্পিকার ছিল না। রেডিওর সঙ্গে যুক্ত করে শুনতে হত। ওইটা দাদার ছিল। রেকর্ড চেঞ্জারে বারবার রেকর্ড বদলাতে হত না। ওদের রেকর্ড সংগ্রহ ছিল অসামান্য। ময়মনসিংহর লোক ছিল ওরা। বেহালার যদু কলোনি হয়ে মিল্ক কলোনিতে এসেছিল সরকারি হাউজিঙে। এখনো যোগাযোগ আছে। বিপুলের দাদা নীতিন সোম মশায় কৃতবিদ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বিদেশ ঘুরে এসেছিলেন। করোনায় মারা গেছেন কয়েকমাস আগে। তিনি এদেশের এবং ঢাকার মেট্রোরেলের উপদেষ্টা ছিলেন। আমার লেখা প্রতিশ্রুতি পত্রিকায় তিনিই দিয়েছিলেন। ময়মনসিংহ নিয়ে কত কথা হলো বিপুলের মেয়ের বিয়ের সময় ২০১৮-এর নভেম্বরে। তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন মেট্রোর কাজ পরিদর্শন করতে। সেখান থেকে ময়মনসিংহ শহরে। বাড়িটাই খুঁজে পাননি। আমি ময়মনসিংহ নিয়ে লিখছি শুনে আশীর্বাদ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমি একজন প্রকৃত পাঠক হার‍্যেছি।

    কলকাতা শহর সত্তর দশক ধরে, আশির দশকেরও মধ্যভাগ পর্যন্ত অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। ১৯৭২ সালে ভারতের ভিতরে প্রথম পাতাল রেলের সূচনা, ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন হয় ধর্মতলায়। তারপর কাজ শুরু হলো বছর খানেক বাদে। কাট অ্যান্ড কভার ছিল মেট্রোর কাজের পদ্ধতি। বড় বড় টানেল কাটা হচ্ছে। তার উপরটা ইস্পাতের চাদর দিয়ে ঢাকা হচ্ছে। বেলগাছিয়ায় আমি থাকি, বেলগাছিয়া থেকে পাতাল রেল পাতালে নেমেছিল। সমস্ত কলকাতা ছিল যাতায়াতের অযোগ্য। রাস্তায় মাটির পাহাড় রাস্তার অর্ধেক টিনের বেড়া দিয়ে আলাদা করা। গাড়ি নড়তেই চায় না। আর বর্ষায় ভয়ানক অবস্থা হত শহরের। তার ভিতরেই সিনেমা, থিয়েটার, সভা, সমিতি সবই হত। প্রথম মেট্রো চালু হয় ধর্মতলা থেকে ভবানীপুর। ১৯৮৪-র অক্টোবরে। উত্তর কলকাতায় আরো পরে দমদম থেকে বিবেকানন্দ রোড বা গিরিশ পার্ক। আমার মেজ মাসির মৃত্যু হয়েছিল মধ্যমগ্রামে। তাঁরা আমাদের পূর্ব বঙ্গের গ্রাম ধূলিহরের সংলগ্ন ব্রহ্মরাজপুরের বাসিন্দা ছিলেন। দেশভাগের পর এদেশে আসেন। মাসিমার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মধ্যমগ্রাম গিয়েছিলাম সকলে। আমি আর দাদা ফেরার সময় দমদম অবধি ট্রেনে এসে মেট্রোয় চেপেছিলাম। দাদা চলে গেলেন গিরিশ পার্ক অবধি। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি তখন অধ্যাপনা করেন। কলকাতায় মেট্রো, টালিগঞ্জ থেকে দমদম অবধি চালু হয় আরো ক’বছর বাদে। মনে হয় তা ছিল কলকাতাবাসীর প্রতি রেল কর্তৃপক্ষের শারদ উপহার। আমাদের ছেলেবেলায় বাসে বাদুড় ঝোলা হয়ে মানুষ যাতায়াত করত। মেট্রো চালু হলে বেশ কিছুদিন ধরে দমদম স্টেশনে রেলের কাউন্টার ইত্যাদি ভাঙা হত। একটা চক্র কাজ করেছিল, যারা মূলতই সড়ক পরিবহন ব্যবসায়ীরা। বেশ কিছু রুটের মিনিবাস বন্ধ হয়ে যায় মেট্রো রেল চালু হতে। সেই কলকাতার কথা মনে পড়ে। আমি ক্রমশ প্রবেশ করছি সাহিত্যের জগতে।

    ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে আমি গোপীবল্লভপুরে বদলি হই। সেই হল্কা ক্যাম্পের নাম ছিল অমর্দা হল্কা ক্যাম্প। কিন্তু সেই গ্রামে উপযুক্ত বাড়ি মানে মাটির বাড়ি টালির চাল ছিল না, দোকানপাট ছিল না, তাই ক্যাম্প হয় বংশীধরপুরে। বংশীধরপুর অনেক দূর। একবার পাকাপাকি ভাবে বংশীধরপুর থেকে ফিরে এলে আর যাওয়া যায় না। ১৯৭৫-এর ডিসেম্বরে গিয়ে ১৯৭৬-এর ডিসেম্বরে চলে এসে আর যেতে পারিনি সেই গ্রামে। কিন্তু যতদিন ছিলাম বংশীধরপুরে, পনেরদিন অন্তর বা মাসান্তে কলকাতা এসে আবার ফিরে যেতে হতো। ফিরে যেতে কত কষ্ট! কলকাতা থেকে কেওনঝোড়- বারিপদার পথে জামশোলা ব্রিজ সিং কোম্পানির বাসে ছয় থেকে সাত ঘন্টা। বাবুঘাট থেকে ছাড়ত সেই বাস। তখন মুম্বই রোড এখনকার চেয়ে দুই তৃতীয়াংশ কম চওড়া। ভাঙাচোরা। জামশোলা ব্রিজ সুবর্ণরেখা নদীর উপরে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ( এখন ঝাড়খন্ড ) ও ওড়িশা মিলেছে। ব্রিজ থেকে পুবে বংশীধরপুর হেঁটে ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট। পথ বলতে নেই। জামশোলা ব্রিজ জায়গাটি ওড়িশার ভিতরে পড়ে। এখান থেকে বাম দিকে অর্থাৎ পুবে বাংলা। পুবে শাল জঙ্গল, সেই জঙ্গলের ধারে সুবর্ণরেখা। তার দুই তীর প্রস্তরাকীর্ণ। জায়গাটির নাম হাতিবাড়ি। হাতিবাড়ি এখন ভ্রমণকারীদের কাছে প্রিয় জায়গা। তখন হাতিবাড়িতে একটি ফরেস্ট বিট অফিস ছিল। বিট অফিসার ছিলেন শীর্ণকায় এক ব্যক্তি। ফরেস্ট ডিপারট্মেন্টের বাংলো মানে বিট অফিসারের কোয়ার্টার ছিল। আমাকে জামশোলা ব্রিজ থেকে বংশীধরপুর যেতে ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট হাঁটতে হত। রাস্তা মানে জঙ্গল, নামো জমি মানে চাষ জমি, চড়াই উৎরাই। টিলা টিকরি, ঝোরা পার হয়ে যেতে হত। অপূর্ব সে পথ। আবার মন খারাপের পথও বটে। ঐ দূরে পায়রাকুলি গ্রাম টিলার উপরে। তারপরে আবার জঙ্গল। ডানদিক দিয়ে সুবর্ণরেখা নদী বয়ে যাচ্ছে। নদী জামশোলা হাতবাড়ি থেকে নেমে এসেই ছড়িয়ে গেছে দুদিকে। মস্ত তার বিস্তার। দুই দিকে দু’হাত ছড়িয়ে দিয়েছে যেন। জল অনেকটা দূরে, মস্ত বালুচর পার হয়ে যেতে হয়। বংশীধরপুরে দণ্ডপাট ভাইদের প্রতাপ আছে। সম্পন্ন গৃহস্ত। তাঁদের বাড়িতেই হল্কা ক্যাম্প। মানে হল্কা ক্যাম্পের বাড়িটির মালিক তাঁরা। তাদের নিজস্ব বাড়িতে মাটির প্রাচীর। বড় ভাইয়ের দুই বিয়ে। দুই স্ত্রীই এক বাড়িতে থাকেন। ছোট ভাই মিশুকে বেশি। আর একটি যুবকের কথা মনে পড়ে। নাম ভুলে গেছি। বিকেলে আসত আমাদের ক্যাম্পে। মাটি কিংবা ইট-মাটির দেওয়াল, মাটির মেঝে, বড় দাওয়া। তিনটি ঘর। দাওয়ায় কর্মচারীরা তাসের আসর বসাত সন্ধে বেলায়। আমি ঘরে কাঁচের লম্ফতে লিখতাম সুটকেস ডেস্ক করে মাদুরে বসে। ক্লিপ বোর্ডে কাগজ আটকে লেখা হত কালির কলমে। কালির কলমে আমি ২০১১ অবধি লিখেছি। নানা রকম পেনে উৎসাহ ছিল। রাইটার পেন, আরটেক্স পেন থেকে পারকার, সেফারস পর্যন্ত। কালি অবশ্যই সুলেখা কোম্পানির। হ্যাঁ, সেই যুবকটি ছিল শান্ত প্রকৃতির। সে আদিবাসি, মুসলমান আর নক্সালদের ঘৃণা করত। হিন্দু রাজ্যের স্বপ্ন দেখত তখনই। কিন্তু তখন জরুরি অবস্থা। অবাক লাগত তার কথা শুনে। মানুষের ভিতরের বিষ সেই প্রথম অনুভব করেছিলাম। আবার সে আমার কাছে কলকাতার কথা শুনতে চাইত। শহর বলতে সে বারিপদা গেছে। আমি অবাক হয়ে বারিপদার গল্প শুনতাম তার মুখে। ছোট ভাই দণ্ডপাট মিশুকে ছিল। সে আমাকে বংশীধর ঠাকুরের কথা বলত। গাঁয়ে তাঁর ছোট মন্দির। প্রতি পূর্ণিমায় বংশীধর কৃষ্ণ বাঁশি হাতে গ্রাম পরিক্রমায় বের হন। সেই বাঁশি শুনলে, কুমারী, বিবাহিতা সকল কন্যারা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে বাঁশির সুরে। পূর্ণিমায় তাই মেয়েদের সাবধানে রাখতে হয় রাতে। কোনো পূর্ণিমায় আমি শুনিনি অবশ্য বাঁশির সুর। পুরুষ বলে কি ?

    ছোট ভাই দণ্ডপাট আর বলত ষাটিদহর কথা। হাতিবাড়ির সুবর্ণরেখা খুব গভীর নদী। ষাট হাত জল সেখানে। পুরাকালে এই অঞ্চলের রাজা যাবতীয় অনাচারে রুষ্ট হয়ে সুবর্ণরেখার ভিতরে নেমে গিয়েছিলেন তাঁর প্রাসাদ নিয়ে। কিন্তু রাজা তো প্রজা বৎসল ছিলেন। তাই নদীতে বান এলে, পশিমের জল নেমে এলে বন্যার হাত থেকে প্রজাদের বাঁচাতে জলের নিচে প্রাসাদে ঘন্টা বাজিয়ে দিতেন। বন্যার সময় নাকি সেই ঘন্টাধ্বনি শোনা যায়। আমার প্রথম উপন্যাস, ‘নদীর মানুষ’ এই বংশীধরপুরের পটভূমিকায় লেখা। সেখানে হাতিবাড়ির ষাটিদহর পুরাণ-কথা ব্যবহার করেছিলাম। অনেক পরে ২০১৫ নাগাদ লেখা একটি গ্রাম একটি নদী উপন্যাসেও এই অঞ্চল ফিরে এসেছে। আমার ডি-গ্রুপ স্টাফ ছিল ধরা যাক মুচিরাম মুরমু। সাঁওতাল জনজাতির যুবক। তার কথা না বললেই নয়। তার আগে সমীর, শচীন, দীপাঞ্জনের কথা বলি। দীপাঞ্জন নাকতলা থাকত। আবর্ত নামে একটি পত্রিকা করত। আবর্ত পত্রিকায় আমি লিখেছি। ওরা তিনজন আমার সঙ্গে বংশীধরপুর গিয়েছিল, আমি কেমন থাকি দেখতে। শচীন করণ্ডায়ও গিয়েছিল। তো বংশীধরপুরে গিয়ে ওরা সুবর্ণরেখায় স্নান করেছিল কয়েক ঘন্টা ধরে। গ্রীষ্মেই গিয়েছিল না কি পুজোর পর শীতের আরম্ভে, হেমন্তে এখন তা মনে নেই। মুচিরামের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল সমীরের। সাঁওতালি নৃত্য-গান দেখার ব্যবস্থা করল মুচিরাম। তার স্যাঙাৎ আছে মৌভাণ্ডার গ্রামে। বিকেলে মৌভাণ্ডারে গেলাম। সেই রাতে চাঁদ উঠেছিল একটু দেরিতে, সাড়ে সাত-আটটা নাগাদ। পেট্রোম্যাক্স জ্বলছিল। আমরা আকাশের নিচে বসে ছিলাম। মহুয়া দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করা হয়েছিল। আমি যেহেতু ওখানে চাকরি করি, আমার ভিতরে অস্বস্তি ছিল। কিন্তু সমীর দীপাঞ্জনরা নাচতে আরম্ভ করল। রাত দশটা নাগাদ খাওয়া হল। মুর্গির মাংস এবং রুটি। নেশায় আমার ঘুম এসে গিয়েছিল। দাওয়ায় খাটিয়ায় শুয়ে পড়েছিলাম। প্রায় সমস্ত রাত ধামসা মাদল আর আশ্চর্য সুরের সাঁওতালি গান শুনেছিলাম। একজন গেয়ে উঠছে, সকলে গলা মেলাচ্ছে। নারী ও পুরুষ এক সঙ্গে। সেই যে সুর, যা আমি শুনেছিলাম প্রায় সমস্ত রাত আধো ঘুম আধো জাগরণে, তা এখনো কানে লেগে আছে। ভুলতে পারিনি। এখন মনে হয় সুর নামছিল হেমন্তের আকাশ থেকে শিশির কণার সঙ্গে। সমীর সেই স্ত্রী পুরুষের দলে ঢুকে গিয়ে নেচেছিল প্রায় সমস্ত রাত। দীপাঞ্জন এবং শচীন রাত জেগে দেখেছিল। সকালে ছবি তুলেছিল দীপাঞ্জন তার কোডাক ক্যামেরা দিয়ে। বুড়ো র‍্যাংটা মুরমু জ্যাকেট পরে ধামসা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কাঁসার গ্লাসে চা এল। চা খেয়ে আমরা রওনা দেব তো হাজির ঐ অঞ্চলের বাবুরা। তাঁরা বড় জোতের মালিক ক’জন। খোঁজ নিতে এসেছেন কেজিও বা কানুনগো সায়েব কাদের নিয়ে এসেছেন কলকাতা থেকে ? হ্যাঁ, কাদের? ১৯৭৬ সাল। জরুরি অবস্থা চলছে। এই এলাকা কয়েক বছর আগে উপদ্রুত অঞ্চল হয়ে উঠেছিল। বড় জোতের মালিকরা বিপ্লবী যুবকদের ভয়ে পালিয়েছিলেন জামসেদপুর, ঘাটশিলা, বারিপদা। সন্তোষ রাণা এই অঞ্চলের যুবক। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলে নক্সাল আন্দোলনের প্রধান মুখ। কলকাতার ছেলে কানুনগো হয়ে এসে কি আবার সংগঠিত করছে আদিবাসী জনজাতিদের ? এরা কি নক্সাল ? জনজাতিরা, সাঁওতাল, মুণ্ডারা, এই সব মানুষের কাছে ঘৃণ্য, জংলী। হ্যাঁ, দণ্ডপাটও জংলী বলত মুচিরামকে। আমাকে প্রায় তিরস্কার করলেন তারা, স্যার যদি জংলী নাচ, দেখবেন, বললেন না কেন, তারাই ব্যবস্থা করত। মহুয়া কেন, বিলিতি নিয়ে আসত। স্যার এবং তাঁর বন্ধুদের কী চাই। ছি ছি ছি, এমনি করে এই গ্রামে ভদ্রলোকের ছেলেরা রাত কাটায়! মুচিরাম মুরমুকে বললেন, খবরদার, উপরে রিপোর্ট করব তোর নামে, জংলীর বাচ্চা।

    আমাদের ভিতরে বর্ণাশ্রম, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ যায়নি। লুকিয়ে আছে আলব্যের কামুর প্লেগ উপন্যাসের প্লেগের বীজানুর মত। অন্ধকারে লেপ তোষকের ভাঁজে, কোথায় তা আমরা টেরও পাই না। মনের অন্ধকারে। দশ বছর বাদে শালতোড়ায় মনসা পুজোর নেমতন্ন পেয়েছিলাম বাউরি ঘরে। রক্ষা করেছিলাম। তা জানতে পেরে আমার অফিসের অধঃস্তন কর্মচারী এক ব্রাহ্মণ যুবক আমাকে তিরস্কার করেছিল ভয়ানক। বলেছিল, তারা ওদের হাতে জল খায় না, আর আমি কি না নেমতন্ন খেয়ে এলাম।

    মুচিরামের কথা খুব মনে পড়ে। সে ডি-গ্রুপের চাকরি করত, কিন্তু গান গাইত চমৎকার। সাঁওতাল জনজাতির ভাষা লিপি, অলচিকি বর্ণমালার স্রষ্টা পন্ডিত রঘুনাথ মুরমুকে গান লিখে আমাকে শুনিয়েছিল সুরে। এখনো তা মনে আছে, “ কুলগুরু রঘুনাথ, দিশম গুরু রঘুনাথ...। সে আর একটা গান শুনিয়েছিল আঞ্চলিক বাংলায়, “ বারিপদার পথে যেতে, কেহ নাই মুর সঙ্গে সাথে, কে রে মোহনে তকে দোলুই দোলুই, ও বারিপদার পথে হবে দেখা।” মুচিরামের বাড়ি ছিল ঐ থানার এক গ্রামে। অনেক দূর হবে। বোধ হয় নয়াগ্রাম গোপীবল্লভপুরের সীমান্তে, জঙ্গলের ভিতরে। জঙ্গল মহল তো এইসব এলাকা। মুচিরামের একটি সাইকেল ছিল। আমি তার সাইকেলের পিছনে বসে ঐ এলাকা ঘুরে বেড়াতাম। সে সব বলত আমাকে। তার বাবা মা, সামান্য জমি, তার নক্সাল আন্দোলনে সংযুক্ত থাকার কথা। আমরা পরস্পরকে বিশ্বাস করতাম। আমি সেই তরুণ সাঁওতাল যুবককে ভালোবেসেছিলাম। যখন নক্সাল আন্দোলন তুঙ্গে, বছর পাঁচ আগে, নক্সাল নেতা লেবাচাঁদ টুডু ( পরে যিনি এম এল এ হয়েছিলেন )-র জঙ্গলে আত্মগোপন কালে মুচিরাম তার জন্য ভাত তরকারি নিয়ে যেত।

    যা বলা হয়নি, আমাকে দণ্ডপাট ভাইদের বড় ভাই সুখদেব দন্ডপাট বলেছিল, মুচিরামের উপর নজর রাখতে। সুখদেব বলেছিল, চার বছর আগে নকশালির ভয়ে তাদের পালাতে হয়েছিল বারিপদা, ওড়িশা। সুতরাং আমি যেন সাবধানে থাকি। আর নকশালি ঢুকতে দেবে না তারা। পুলিশ নজর রাখে সব। পুলিশের চর নাকি সব গ্রামে আছে। এই কথা আমি মুচিরামকে বলতে সে আমাকে বলেছিল, দন্ডপাটরাই পুলিশের চর। দন্ডপাটদের সঙ্গে সাবধানে কথা বলতে।

    মুচিরাম বলেছিল, একজন সাঁওতাল সরকারি চাকরি করবে তা ওদের সহ্য হয় না। তাই অপবাদ দিয়ে যে কোনো ভাবে তার চাকরি খেয়ে নিতে চায় বাবুরা। সে সরাসরি নকশাল আন্দোলনে যুক্ত ছিল না, কিন্তু জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বিপ্লবীদের ভাত পৌছে দিত। বিপ্লব হতে হতে হয়নি, তাই বিশ্বাস করত মুচিরাম। বলত বিপ্লব হলে দুবেলা ভাত পাবে মানুষ। ওই সব অঞ্চলে দুবেলা ভাত ছিল স্বপ্ন। বিপ্লব হলে সকলে জমি পাবে চাষের জন্য। সেই বংশীধরপুর, সাসরা, পাঁচকানিয়া, এই রকম যত যত গ্রাম আছে জঙ্গলমহলে, সেখানকার সব জমি সমান ভাগে ভাগ হয়ে যাবে গরিব মানুষের ভিতর। মুচিরাম রোমান্টিক যুবক ছিল। আমি মুচিরামের সঙ্গে এক শ্রাবণের দিনে সাইকেলে রওনা হয়েছিলাম নগর গোপিবল্লভপুর, বর্গীডাঙার উদ্দেশে। মেঘময় আকাশের নিচে সেই যাত্রাপথ ছিল অনুপম। টিলা, টিকরি, বনপথ, লালমাটির রাস্তা। সবুজ বনভূমি। চাষ জমিতে ধান রোয়া আরম্ভ হয়ে গেছে। মেয়ে পুরুষ নেমে গেছে চাষ জমিতে। ধান রোয়ার কাজ করে মেয়েরাই বেশি। আমাকে নিয়ে যেতে যেতে মুচিরাম হঠাৎ দাঁড়ায়। দূর থেকে আদিবাসী কন্যারা হাত তুলে ডাকছে তাকে, “এ পেড়াহর, পেড়াহর...।’’ সাঁওতালি ভাষায় পেড়াহর হলো বন্ধু। আমাকে দাঁড় করিয়ে সেই সব প্রকৃতির কন্যাদের টানে প্রকৃতি-পুরুষ মুচিরাম চলল জমির দিকে। আমি বসে থাকলাম এক মহুয়া গাছের নিচে মাটিতে। সাইকেল দাঁড় করান রয়েছে। নিস্তব্ধ প্রকৃতি। মেঘের ভারে আকাশ নেমে এসেছে অনেক নিচে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। কদিন আগেও ছিল অসহনীয় তাপ, সব বদলে গেছে। কোথায় আমার বাড়ি, আছি কোথায়! বসেই থাকলাম প্রায় আধ ঘন্টা। ্মুচিরাম গেল তো গেল। বন্ধুনিদের সঙ্গে রঙ্গ রসিকতা করছে হয়ত। তারা ধান রোয়া করতে করতে মুচিরামের কথায় তারা হেসে গড়িয়ে পড়ছে হয়তো। মুচিরাম কিন্তু ফিরল মুখ গম্ভীর করে। আকাশের সব মেঘ বুঝি তার মুখে। কী হয়েছে ্মুচিরাম ?





    মুচিরাম মনখারাপ করা কন্ঠস্বরে বলল, সার, খবর ভাল না, পুলিস হামার বন্ধুকে তুলি নিইছে, উয়ার সঙ্গে যার বিয়া হবে, সেই চাঁদমণি খবর দিল, চাঁদমণি ওই জমিনে রোয়া করছে, কানছিল সার, সার কী যে হবে এবার ?

    বন্ধু কে ? তার গ্রাম মৌচুরিয়ার সেই বন্ধুর নাম বুধন টুডু। বুধন নকশাল ছিল। কলকাতার বাবুদের সঙ্গে বেলপাহাড়ির দিকে বিপ্লব করতে গিয়েছিল। বাবুরা কেউ ধরা পড়েছে, কেউ ফিরে গেছে বাড়ি। বুধনকে পুলিস খুঁজছিল অনেকদিন। কিন্তু পাত্তা করতে পারছিল না। সে খুব বুদ্ধিমান। বার বার পুলিশকে ধোঁকা দিয়েছে। ধরতে পারলে জেলে ঢুকিয়ে দেবে। মেরেও ফেলতে পারে। সে কোথায় থাকে, কোথা থেকে গ্রামে ফেরে, তা পুলিশের খোঁচড় বুঝে উঠতেই পারে না। তার দেড় বিঘে জমিন আছে চাষের। সেই জমিই তাকে টেনে এনেছিল গ্রামে। ধান কাটার সময় গত অঘ্রানে এসেছিল। তখন পুলিস টের পায়নি। যখন খবর গিয়েছিল, সে কাজ সেরে পালিয়েছিল। এই বর্ষার দিনে চাষের টানে আবার ফিরে এসেছিল। গ্রামের চাষিবাড়ির ছেলে, প্রায় ভূমিহীন বুধন। জমি পাবে ভাত পাবে, তাই শহরের বাবুবাড়ির ছেলেদের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাড়ি ছেড়েছিল। বিপ্লবের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। বাবুবাড়ির ছেলেরা ফিরে গেছে শহরে। চিঠির জবাব আসে না। তারা কি ভুল ঠিকানা দিয়ে গিয়েছিল? নাকি তারা বেঁচেই নেই। বুধন ধান রোয়া করতে এসে ধরা পড়েছে। তাই বুধনের ভালবাসা পাওয়া চাষিবাড়ির মেয়ে চাঁদমণি খবর দিয়েছে মুচিরামকে। মুচিরাম সরকারি চাকরি করে। সেটেলমেন্টের পিয়ন। মুচিরাম কি বুধনকে ছাড়িয়ে আনতে পারবে না ? সেই কথা বলে চাঁদমণি কাঁদছিল।
    মুচিরাম বলল, সার আমি কী করব?
    আমি জবাব দিতে পারি না।
    মুচিরাম বলল, সার, চাঁদমণি খুব ভালোবাসে বুধনকে।
    আমি চুপ করে থাকলাম।
    সার আপনি বললে হবে না ?
    কাকে বলব ?
    থানায় বলবেন সার, বড়বাবুকে, ঝাড়্গাঁ চালান হঁই গেছে বুধন।
    আমি সামান্য চাকুরে। আমি বললে কী হবে ? হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, তাতে পুলিস আমাকেই সন্দেহ করবে। আমার স্বার্থ কী ? আমি কেন বলছি? আর আমার সেই পদ মর্যাদা নেই, সেই ক্ষমতা নেই যা দিয়ে আমি বুধন টুডুকে ছাড়িয়ে আনতে পারি।

    আমরা আবার রওনা হলাম বর্গীডাঙার পথে। সারাটা পথ মুচিরাম সেই বুধনের কথা বলতে লাগল। বুধনের জমিনে রোয়া হয়নি। জমি তৈরি করেছিল বুধনই। তখন টেরই পায়নি পুলিসের লোক। ধান রোয়ার দিনই তাকে তুলে নিয়ে গেছে। গাঁয়ের কেউ একজন খবর দিয়েছিল নিশ্চয়। মানুষ ভাল না। এখন কী হবে বুধনের? জমি পড়ে আছে, চাষ হবে না। পুলিস বলে গেছে ওই জমিতে যে নামবে তাকেই তুলে নিয়ে গিয়ে ঝাড়গ্রাম চালান করে দেবে। আমি নিশ্চুপ শুনতে লাগলাম। মুচিরাম আমাকে সব বলছিল কেন না আমি শহর থেকে চাকরি করতে যাওয়া যুবক। আমার মতোই কেউ কেউ এসে তাদের স্বপ্ন দেখিয়ে চলে গেছে। যেন আমিই তাদের কেউ। আর সে ভাবছিল আমি যদি প্রভাব খাটিয়ে বুধনকে বের আনতে পারি। সব ক্ষমতাই তো শহরের মানুষের হাতে। শহরের মানুষ আর বাবুরা পারে না এমন কাজ নেই। বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাতে পারে আবার জেল-হাজতে ভরে দিতেও পারে নিরীহ মানুষকে। বড় বড় অফিসার, পুলিস সবই তো শহর থেকে আসা মানুষ। আমি কিছুই বলতে পারছিলাম না, হাঁ, হুঁ করা ছাড়া।

    আমরা কাজ মিটিয়ে পরদিন ফিরে এসেছি বংশীধরপুরে। মুচিরাম আমাকে বলল, সে একবার গ্রামে যাবে, বুধনের জমিতে যাতে রোয়ার কাজ করা যায়, সেই জন্যই তাকে যেতে হবে। বিঘে দেড় জমিতে বিশ-পঁচিশ মন ধান হবে। টিলার নিচে বুধনের জমি। ধান না হলে তার বাবা মা দুই বোন না খেয়ে মরবে। মুচিরাম শেষ অবধি পেরেছিল। ধান রুয়ে দিয়ে এসেছিল। না, পুলিশের খোঁচড় খবর দেয়নি। দেয়নি, কেন না মুচিরাম সেটেলমেন্টের পিয়ন। জমির অফিসের লোক। সে গাঁয়ে গিয়ে নিজের অলীক ক্ষমতার কথা বলেছিল। সে জমির অফিসের লোক। তার সেই ক্ষমতা আছে যে, কারো জমি অন্যের নামে করে দিতে পারে। পুলিস যদি খবর পায় তবে সে দেখে নেবে, কী করতে পারে। খোঁচড় কে তা সে জানে। তার ভিটেমাটির খতিয়ান পর্চা সব কেটেকুটে এমন মানুষের নামে করে দেবে যে সে মামলা করেও ছাড়াতে পারবে না। মুচিরাম ফিরে এসে সব বলেছিল। ধান রোয়া হয়েছে, কিন্তু বুধনকে ফেরাবে কী করে? চাঁদমণি যে বারবার খবর দিচ্ছে তাকে। আমি কি পারব একটু তদ্বির করতে। আমার সে ক্ষমতা নেই তা বিশ্বাস করে না ্মুচিরাম। সেই বছর ধান কাটার সময়, অঘ্রানে, ডিসেম্বর মাসে আমি বদলি হয়ে চলে আসি। তখন বুধন বোধ হয় ঝাড়্গ্রাম থেকে মেদিনীপুর জেলে। চাঁদমণি মুচিরামকে খবর পাঠাচ্ছিল ক্রমাগত। ্মুচিরামও ছুটছিল চাঁদমণির কাছে। চাঁদমণির সঙ্গে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে। ফিরে আসছিল অন্ধকার মুখে। চাঁদমণির মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছিল কি না মুচিরাম তা আমার জানা নেই। কতদিন হয়ে গেল। কতকাল গেল। আমার চোখের সামনে চাঁদমণি আর ্মুচিরামের মুখটি অবিকল ভাসে এখনো। এরপর জঙ্গলমহলে মাওবাদিরা এসেছে বহু বছর বাদে। গরিব মানুষের পেটে ভাত না থাকলে তারা কী করবে ? তাদের জমি চলে গেছে বাবুদের হাতে। বর্ণ হিন্দু এবং অন্য জাতির ধর্মের মানুষের ভিতর আদিবাসীদের জমি হস্তান্তর নিষিদ্ধ। তার জন্য মহকুমা শাসকের অনুমতি দরকার হয়। তবু তো হয়। গরিব জনজাতির জমি ধনী জনজাতি নিয়ে নেয় আবার বাবুরা নেন অনুমতি সংগ্রহ করে কিংবা জমির দখল নিয়ে নেন সামান্য টাকা দিয়ে। জমি তো কাগজপত্রের নয়, জমি হলো দখলের। দখল না থাকলে কাগজপত্রের কোনো দাম নেই। আমি এর কয়েক বছর বাদে ১৯৮০ সাল নাগাদ ‘দানপত্র’ গল্পটি লিখি একেবারে জমি হস্তান্তরের দলিলের আঙ্গিকে। দানপত্র সাহিত্য অকাদেমির আধুনিক বাংলা গল্প সংকলনে আছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভূমিকায় লিখেছিলেন, গল্পটি পড়ে তাঁর মনে হয়েছিল জাতি সঙ্ঘের কাছে আমেরিকার জনজাতিদের পাঠানো দাবিপ্ত্রের কথা, তারা যে দাবি-সনদে নিজেদের হারানো মাটি হারানো আকাশ হারানো পাহাড় নদী যা শ্বেতাঙ্গরা দখল করে নিয়েছে তা ফেরত চাওয়ার দাবি ছিল প্রধান। আমি এসব জানতাম না তখন। ১৯৮০ সালে মানুষ কতটুকুই বা জানতে পারত ? কিন্তু জমি হস্তান্তর হয়ে গেছে এ আমি দেখেছি। গল্পটি ছিল হস্তান্তরের ইতিহাস। এই গল্প অনীক পত্রিকায় ছাপা হয়। অনীকে ছাপা হওয়ার পিছনে মহাশ্বেতাদির উৎসাহ ছিল। তিনিই দীপঙ্কর চক্রবর্তীকে গল্পটি দিয়েছিলেন। তারপর থেকে দীর্ঘ তিরিশ বছর আমি অনীক-এ লিখেছি। বংশীধরপুরে থাকার সময় আমি দুটি গল্প লিখেছিলাম, দেবী ভাসান, রাজকাহিনী। ‘নদীর মানুষ’ লিখি ১৯৭৭ সাল জুড়ে, তখন আমি সাঁকরাইল থানার কুলটিকরি গঞ্জে। সাঁকরাইল ঝাড়গ্রাম মহকুমার এক থানা। কয়েক বছর আগে মাওবাদিরা সেখান থেকেই পুলিশের ও,সি,কে অপহরণ করেছিল, ২০০৮-০৯ নাগাদ হতে পারে। ১৯৭৭ সাল আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আসলে আমি বংশীধরপুর থেকে ফিরেছিলাম অভিজ্ঞ হয়ে। আর কী লিখব, কীভাবে লিখব তা বুঝতে পারছিলাম স্পষ্ট। জীবন শুরু হয়ে গেল মনে হয় পরিপূর্ণ ভাবে।


    (ক্রমশঃ)

    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১৭৭ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ ১২:৫৪101367
  • হাতিবাড়ির সুবর্ণরেখার পাশে বসে থেকেছি। এমন একটি উপকথা জড়িয়ে আছে জানলে দেখাটা অন্যরকম হত। আমরা লেখককে পড়ি, ভাবি কল্পনাই বোধহয়, কিন্তু পেছনে থাকে অগাধ জানা আর পড়াশুনোর ব্যাক রেস্ট। 

  • আশিস সেনগুপ্ত। | 117.226.131.66 | ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ ১৫:১৭101368
  • মুগ্ধ হয়ে পড়ছি। 

  • সমীর চট্টোপাধ্যায় | 103.211.20.169 | ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ ১৯:৪৯101372
  • মুচিরাম মুর্মুকে ভুলিনি। ভুলিনি সেই পর্বের ঘোরাফেরা। ভোলা সম্ভব নয় মৌভাণ্ডারের সেই রাত। সারা জীবনের সঞ্চয়  , সারা জীবনের ঐশ্বর্য। দেখেছি নিজের চোখে কী পরিবেশ কী জায়গা ছিল তোর কর্মস্থল। ওই মানুষজন ওই পরিবেশ ওই প্রকৃতি তোর লেখক জীবনের ভিত। তুই যে আজও প্রকৃতি মানুষ জড়িয়ে মানুষের কথা লিখিস তার তার বাঁধা হয়েছে তোর প্রথম যৌবনের এই বিস্তৃত অথচ গভীর জীবন যাপনে। আমি বলব এ তোর সৌভাগ্য , সব লেখকের এমন জীবন ধরা দেয় না, মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয় না , পরের মুখের ঝাল খেতে হয়। 


    অপূর্ব নেশা ধরানো লেখা। পড়তে পড়তে কখন যে লেখকের জীবনে ঢুকে যেতে হয়। কখন যে অসহায় মানুষদের কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে হয়। 


    প্রতিটি পর্ব পরবর্তী পর্বের আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাহ। 

  • পার্থপ্রতিম মন্ডল। | 2402:3a80:a62:f89f:0:6c:16c3:5601 | ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ ২৩:০৭101375
  • অনেক অনেক দিন পর কোনও লেখা পড়ে এতখানি মুগ্ধ হচ্ছি। শুধু ব্যক্তির ইতিহাস নয়, সমষ্টির ইতিহাস, এ রচনা উপন্যাসের চেয়েও টানটান। 

  • aranya | 2601:84:4600:5410:2188:f354:a69c:e632 | ২৭ ডিসেম্বর ২০২০ ০৩:২৮101378
  • অপূর্ব 

  • Kalyan Santra | ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ১৯:২৯101418
  • খুব ভালো লাগল। এরপর আশাকরি হাতিধরা গ্ৰামের কিছু কথা পাব।

  • Saumya Chakrabarti | ১০ মার্চ ২০২১ ০৭:৪০103405
  • অমর মিত্রের লেখাটি অনবদ্য। একটা  সময় এর দলীল। এই সময়, অনেকের লেখাতেই আগে এসেছে কিন্তু এভাবে নয়। এখন বুঝতে পারছি  পাহাড়ের মতো মানুষ উপন্যাস টির  প্রেক্ষিতে কি ছিলো।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন