এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  সমাজ

  • হাংরি যুগ

    Malay Roychoudhury লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | সমাজ | ০৮ জুন ২০২৩ | ৮৪৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • 103 | 104 | 105 | 106 | 107 | 110 | 113 | 114 | 119 | 120 | 121 | 123 | 124 | 124 | 125 | 125 | 126 | 127 | 127 | 128 | 129 | 131 | 133 | 134 | 135 | 136 | 138 | 139 | 140 | 141 | 143 | 144 | 145 | 147 | 148 | 149 | 149 | 150 | 151 | 152 | 153 | 154 | 155 | 156 | 157 | 158 | 159 | 160 | 161 | 162 | 163 | 164 | 165 | 167 | 168 | 169 | 170 | 171 | 172 | 173 | 174 | 175 | 176 | 176 | 177 | 178 | 179 | 180 | 181 | 182 | 183 | 184 | 185 | 186 | 187 | 188 | 189 | 190 | 191 | 192 | 192 | 193 | 194 | 195 | 196 | 198 | 199 | 200

    হাংরি যুগ : মলয় রায়চৌধুরী


    ভূমিকা

    অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, ‘কল্লোল যুগ’ বইতে লিখেছেন : ‘কল্লোল’ উঠে যাবার পর কুড়ি বছর চলে গেছে। আরো কত বছর চলে যাবে, কিন্ত ওরকমটি আর “ন ভূতো! ন ভাবী”। দৃশ্য বা বিষয়ের, পরিবর্তন হবে দিনে-দিনে, কিন্তু যে যৌবন-দীপ্তিতে বাংলা সাহিত্য একদিন আলোকিত হয়েছিল তার লয়-ক্ষয-ব্যয় নেই–সত্যের মত তা, সর্বাবস্থায়ই সত্য থাকবে। যারা একদিন সেই আলোক-সভাতলে একত্র হয়েছিল, তারা আজ বিচিত্র জীবনিয়মে পরম্পর-বিচ্ছিন্ন, প্রতিপুরণে না হয়ে হয়তো। বা প্রতিযোগিতায় ব্যাপৃত – তবু সন্দেহ কি, সব তারা এক জপমালার গুটি, এক মহাকাশে গ্রহতারা। যে যার নিজের ধান্দায় ঘুরছে বটে, কিন্তু সব এক মন্ত্রে বাঁধা, এক ছন্দে অন্বর্তিত। এক তত্বাতীত সত্য-সমুদ্রের কল্পোল একেক জন। বাহু বিভিন্ন, আসলে একত্র। কর্ম নানা, আনন্দ এক। স্পর্শ নানা, অনুভূতি এক। তেমনি সবঘাটে এক আকাশ, সর্বপীঠে এক দেবতা, সর্বদেহে এক অধিষ্ঠান। “একো দেবঃ সবভূতেষু গুড়; সর্বব্যাপী সর্বভূতীস্তরাত্মা।” তাই সর্বত্র মহামিলন। ভেদ নেই, হ্বৈত নেই, তারতম্য নেই, সবার এক সনাতনের উপাসন!"।

    অচিন্ত্য সেনগুপ্ত কল্লোল সাহিত্যপত্রের সময়কালকে ‘কল্লোল যুগ’ হিসেবে চিহ্ণিত করে উপন্যাসের আঙ্গিকে বইটি লেখার পর তাঁদের কালখণ্ডকে ‘কল্লোল যুগ’ বলা আরম্ভ হয়েছিল। কল্লোল পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ১৯২৩ থেকে ১৯২৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত ছয় বছরের কাল-পরিধিতে বাংলা সাহিত্যে তাঁরা আধুনিকতার সূত্রপাত করেছিলেন আর স্বাভাবিকভাবেই আক্রান্ত হয়েছিলেন, পুলিশের নেকনজরে পড়েছিলেন, যেমনভাবে হাংরি যুগের কবি-লেখক-চিত্রকররা হয়েছেন। ‘কল্লোল’ পত্রিকার আবহে সমসাময়িক আরও কিছু পত্রিকা হলো — কবিতা, প্রগতি, উত্তরা, কালিকলম, পূর্বাশা ইত্যাদি। অচিন্ত্য সেনগুপ্তের বইটি সম্ভবত প্রকাশকের অনুরোধে উপন্যাসের আঙ্গিকে লেখা।

    আমি উপন্যাসের আঙ্গিকে ‘হাংরি যুগ’ লেখার প্রয়াস করছি বটে, তবে এই আন্দোলন একটিমাত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটি শহরের ঘটনা নয়, তাই চেষ্টা করব সমগ্র যুগকে একটি পরিসরে তুলে আনার। হাংরি আন্দোলন নিয়ে অনেক বই আছে, কিন্তু এর আগে সেই বিস্তৃত কালখণ্ডের যুবক-যুবতীদের কর্মকাণ্ডকে ‘হাংরি যুগ’ হিসাবে চিহ্ণিত করে কোনো বই লেখা হয়নি। যে বইগুলো লেখা হয়েছে সেগুলো গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। যদি হাংরি কর্মকাণ্ডকে ১৯৬১ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত ধরা হয়, যাকে অচিন্ত্য সেনগুপ্ত বলেছেন বাংলা সাহিত্য একদিন “যৌবন-দীপ্তিতে আলোকিত হয়েছিল তার লয়-ক্ষয-ব্যয় নেই–সত্যের মতো তা সক্রিয় ছিল”, তা্হলে সম্পূর্ণ ও ব্যাপক ‘হাংরি যুগ’-এর কথা বলা হবে না। ১৯৬৭-এর পরেও হাংরি আন্দোলন সক্রিয় ছিল বিভিন্ন শহরে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর পত্রিকার মাধ্যমে, যেমন প্রতিদ্বন্দী, চিহ্ণ, ক্ষুধার্ত, ক্ষুধার্ত খবর, জিরাফ, ফুঃ, ঋত্বিক, কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, ধৃতরাষ্ট্র, ক্ষুধার্ত সময়, ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ, রোবোট, কুরুক্ষেত্র, পাগলা ঘোড়া, দ্রোহ, বিকল্প, দন্দশূক, সময়সূত্র, যুদ্ধযাত্রা, মন্বন্তর, এখন এই রকম, অনার্য, পাখি সব করে রব ইত্যাদি এবং আশির দশকের শেষ পর্যন্ত কলকাতাসহ উত্তরবঙ্গ আর ত্রিপুরার তরুণ কবি-লেখকরা সেই যুগকে করে তোলেন মহামিলন-ক্ষেত্র।

    ‘কল্লোল’-এর তুলনায় হাংরি যুগে বহু তরুণ দেখা দিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায়, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, অবনী ধর, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, অজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ, তপন দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, রবীন্দ্র গুহ, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অলোক গোস্বামী, মলয় মজুমদার, রাজা সরকার, কিশোর সাহা, প্রবীর শীল, রতন নন্দী, কুশল বাগচী, সুমন্ত ভট্টাচার্য, পল্লবকান্তি রাজগুরু, চন্দন দে, বিকাশ সরকার, নির্মল হালদার, সূর্য মুখোপাধ্যায়, দেবজ্যোতি রায়, অরুণেশ ঘোষ, অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ রাউত, আপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরণি বসু, প্রিতম মুখোপাধ্যায়, সুনীতা ঘোষ, রবীন দত্ত, সেলিম মুস্তফা, রবিউল, অরুণ বণিক, রসরাজ নাথ, রত্নময় দে, সাত্বিক নন্দী, নিত্য মালাকার, সুভাষ কুণ্ডু, স্বপন চক্রবর্তী, সুবীর মুখোপাধ্যায়, দীপকজ্যোতি বড়ুয়া, নির্মল হালদার, সৈকত রক্ষিত, রবীন্দ্র মল্লিক, বিজন রায়, স্বপন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। এই কবি ও লেখকদের অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। তাঁদের মধ্যে অনেকে পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। সবার মাঝে যোগসূত্র গড়ে তোলার প্রয়াস করব “হাংরি যুগ”-এর পরিসরে। তাছাড়া, কয়েকজন আমার অবদানকে অস্বীকার করার জন্য ‘হাংরি’ ভাবকল্পটিকে নিজের-নিজের ভাবনার মোড়কে উপস্হাপন করতে চেয়েছেন ও মূল ভাবকল্প সম্পর্কে পড়াশোনা না থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে আমার কথাগুলোই অন্যভাবে বলেছেন। অনেকে ভেবেছিলেন ‘হাংরি টাইম’ মানে ‘আমরা খেতে পাচ্ছি না’, যদিও তাঁরা ভালো চাকরি বা শিক্ষকতা করতেন, ফ্ল্যাটের বা বাড়ির মালিক ছিলেন। যুগ হিসেবে তাতে হাংরি কালখণ্ডের হেরফের হয় না।

    ‘যুগ’ অভিধাটি ব্যবহার করায় আপত্তি থাকা উচিত নয়। যুগ সাধারণত সময়ের বয়স নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। ঋগ্বেদে, যুগ জন্মকে বোঝায়, দীর্ঘ সময়কাল, খুব সংক্ষিপ্ত সময়কাল বা সংযোজক। মহাভারতে, যুগ ও কল্প (ব্রহ্মার এক দিন) শব্দগুলি পরস্পর বিনিময়যোগ্যভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সৃষ্টি ও ধ্বংসের চক্রকে বর্ণনা করার জন্য। সূর্যসিদ্ধান্ত ও ভগবদ্গীতা অনুসারে, ‘যুগ’ ও ‘বয়স’ নামগুলি সাধারণত চতুর্যুগ (কৃতযুগ বা সত্য যুগ, ত্রেতা যুগ, দ্বাপর যুগ ও কলি যুগ) বা ‘চারটি যুগচক্র’ কে নির্দেশ করে। আমি হাংরির বিভিন্ন পত্রিকা গোষ্ঠীর সাহিত্য ও ছবি আঁকার সময়ের বয়সকে চিহ্ণিত করছি ‘যুগ’ শব্দটি দিয়ে, ১৯৬১ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত, ঠিক যেমন কল্লোল পত্রিকার সময়কে অচিন্ত্য সেনগুপ্ত বলেছেন ‘কল্লোল যুগ’।

    হাংরি যুগ : প্রস্তাবনা : সন্দীপ দত্ত

    বীজেশ সাহা সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার ১ জুন ২০২২ সংখ্যায় ‘পাঁচ ছয় দশকের কিছু পত্রিকা-কথা’ প্রবন্ধে লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্ণধার সন্দীপ দত্ত, যাঁর লাইব্রেরিতে ভারতের ও বিদেশের নানা ভাষার লেখক-গবেষকরা পুরোনো বই-পত্রিকার খোঁজে যান, তিনি লিখেছেন : “বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে হাংরি প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন। ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের মাধ্যমে যার সূচনা। স্রষ্টা, নেতৃত্ব ও সম্পাদক যথাক্রমে মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায়। পত্রিকার চিন্তনভূমি পাটনা হলেও তার প্রকাশ স্হান ছিল ২৬৯ নেতাজি সুভাষ রোড, হাওড়া; হারাধন ধাড়া বা দেবী রায়ের ঠিকানা। যদিও ছাপা হয়েছিল পাটনা থেকে।’’

    মলয় রায়চৌধুরী তখন ২২ বছরের তরুণ, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র। কবি জিওফ্রে চসারের (১৯৩৯-১৪০০) In The Sowre Hungry Tyme পড়ে মলয় Hungry শব্দের অভিঘাতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। হাংরির পরিকল্পনা তখন থেকেই। সময়ের প্রেক্ষাপটটিও গুরুত্বপূর্ণ। সদ্য স্বাধীন দেশ। দেশভাগ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়। দারিদ্র, ক্ষুধা, নিরন্ন মানুষ। বাংলা কবিতার হালও খুব খারাপ। ৩০-৪০ এর গতানুগতিক কবিতা নির্জীব হচ্ছে। ৫০-এর কবিরা সবে নিজেদের প্রকাশ করছে। নিজস্বভূমি আবিষ্কার হয়নি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় একসময় এলেন পাটনায়। মলয় শক্তিকে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনের কথা বলেন। প্রথম বুলেটিনে কবিতা বিষয়ক একটি ইশতাহার ইংরেজিতে ছাপা হলো।

    ১৯৬২ ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলায় প্রথম ইশতাহারটি প্রকাশ পায়। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০৭টি হাংরি বুলেটিন প্রকাশ পায়। এইসব বুলেটিনে প্রকাশের কোনো তারিখ থাকতো না। নানা রঙের কাগজে, এমনকি মলাটের বাদামি কাগজেও বেরোতো এক সপ্তাহে ২৪টি আবার কখনও বছরে একটি হয়তো।

    হাংরি সূচনাকালে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাত্র চারজন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায়, সমীর রায়চৌধুরী ও মলয় রায়চৌধুরী। এরপর একে একে যুক্ত হন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ফালগুনী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ত্রিদিব মিত্র, অরুণেশ ঘোষ, সুবো আচার্য প্রমুখ।

    ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকে অস্বীকার ও প্রচলিত গতানুগতিক ধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লেখালিখিতে নতুন আবিষ্কারই প্রকৃত সাহসী ও মৌলিক পথ মানতো হাংরিরা। কৃত্তিবাস বা শতভিষা গোষ্ঠী হাংরি আন্দোলনকে মেনে নিতে পারেনি। প্রবীণ সাহিত্যকাররাও বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন হাংরিদের সম্পর্কে। সংবাদপত্রে সমালোচিত হয়েছে হাংরি গোষ্ঠী।

    অথচ সর্বভারতীয় ভাষায় বরেণ্য হয়েছিল এই আন্দোলন। হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, গুজরাটি তরুণ লেখকরা এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল। অন্য ভারতীয় ভাষার পত্রপত্রিকায় প্রভাব পড়েছিল হাংরি আন্দোলনের। মারাঠি ভাষার লেখক অশোক সাহানে, দিলীপ চিত্রে, অরুণ কোলটকর প্রমুখ, তেলেগু ভাষায় নিখিলেশ্বর, নগ্নমুনি, জ্বলামুখী প্রমুখ। হিন্দি লেখক ফণীশ্বরনাথ ‘রেণু’ হাংরি লেখকদের মূল্যায়ন করেন।

    বহির্বিশ্বেও হাংরি আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।

    ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে হাংরি জেনারেশনের একটি বুলেটিনকে কেন্দ্র করে অশ্লীলতার অভিযোগে মলয় রায়চৌধুরীসহ হাংরিদের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। ৪৮ শঙ্কর হালদার লেন, আহিরিটোলা, কলকাতা- ৫ থেকে ওই সংখ্যায় দশজন লেখক ও প্রকাশক সমীর রায়চৌধুরীর নাম পাওয়া যায়। লেখক তালিকায় ছিলেন মলয় রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক, উৎপলকুমার বসু, দেবী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ ও সুবো আচার্য। এই বুলেটিনেই প্রকাশ পায় মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি।

    এই কবিতাকে কেন্দ্র করে অশ্লীল রচনার দায়ে হাংরি জেনারেশন পত্রিকার বিরুদ্ধে লালবাজার প্রেস সেকশনের সাব ইন্সপেক্টর কালীকিঙ্কর দাস অভিযোগ আনলেন। শুরু হলো ধড়পাকড়। ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও ধরা হলো ৬ জনকে। মামলা অবশ্য শেষ পর্যন্ত দায়ের করা হয়েছিল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে। দীর্ঘ দিন মামলা চলল। ১৯৬৫ সালের মে মাসে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এই ১৯৬৫ সালেই হাংরি আন্দোলনের ইতি ঘটে। এই বছরেই ২৮ ডিসেম্বর নিম্ন আদালতে মলয় রায়চৌধুরীর সাজা হয়। পরে, ১৯৬৭ সালের ২৬ জুলাই মলয় রায়চৌধুরী হাইকোর্টে পিটিশন দ্বারা মামলা করার ভিত্তিতে, তাঁকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি দেয়া হয়।

    আন্দোলনের কথা পৌঁছে যায় নিউইয়র্কের TIME পত্রিকায়। এই প্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত একটি পত্রিকা বিদেশে প্রচারিত হলো। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাংরি জেনারেশনের এই আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে একটি দীঘস্হায়ী ছাপ রেখে গেল।

    এক : একজনকে খুঁজে পেলুম

    সালটা ১৯৬১। অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর হয়ে চাকরি করছি পাটনায়। ১৯৫৯-৬০ সালে আমি দুটি লেখা নিয়ে কাজ করছিলুম। একটি হল ‘ইতিহাসের দর্শন’ যা পরে বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যটি ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এই দুটো লেখা নিয়ে কাজ করার সময়ে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনটা আমার মাথায় আসে। ইতিহাসের দর্শন নিয়ে প্রবন্ধ আর ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ নামে একটা বই লেখার সময়ে পরিচিত হয়েছিলুম অসওয়াল্ড স্পেংলারের সমাজভাবনায় আর মেলাবার চেষ্টা করেছিলুম দেশভাগ-পরবর্তী ভারতবর্ষ ও পশ্চিমবাংলার সঙ্গে। সেই সময়ে, দেশভাগের পর, পশ্চিম বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সাথে উদ্বাস্তু শরণার্থীর ভিড়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্বরাজের স্বপ্নকে চুরমার করে আরম্ভ হয়েছে স্বার্থ আর নোংরা রাজনীতির খেলা। স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতীয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা টকে গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তরঔপনিবেশিক কালখণ্ডে।
    — আমরা এই অবস্হার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলি। দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে বলেছিলুম।
    — কেমন করে আওয়াজ তুলব ? আমাদের তো কেউই চেনে না।
    — আমরা লিফলেট ছাপিয়ে আমাদের বক্তব্য রাখব আর পাবলিকের মাঝে বিলোবো।
    — চাইবাসায় আমার নিমডির বাসায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় এখনও আছে, ওকে তবু লোকে চেনে। সঙ্গে আনবো, ওকে তোর আইডিওয়াটা এক্সপ্লেন করিস।

    শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আমি চিনতুম চাইবাসায় কয়েকবার গিয়ে; দাদার বাসায় থাকতো। শক্তির উপন্যাস ‘কুয়োতলার’ পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার খুবই ভালো লেএছিল। চিনতুম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসুকে, যারা প্রায়ই চাইবাসায় এসে দাদার বাসায় থাকতো। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সিটি কলেজে পড়ার সময়েও পাটনায় এসেছে; দাদা পাটনাই দিশি মদ ঠররা খাইয়ে সুনীলকে এমন মাতাল করে দিয়েছিল যে রাতভর বারান্দার নালিতে বমি করেছিল; মা পাতিলেবুর শরবত খাইয়ে সামলেছিলেন।

    ১৯৬১ সালে একটা পত্রিকায় হারাধন ধাড়া নামে একজনের চিঠি পড়লুম, ছোটোগল্প সম্পর্কে লিখেছে। ঠিকানা দেয়া ছিল ২৬৯ নেতাজি সুভাষ রোড, হাওড়া। ধাড়া পদবিটা আকর্ষণ করেছিল। বাবাকে জিগ্যেস করে জানতে পারলুম ওরা মাহিষ্য, মানে কৃষিপ্রধান সম্প্রদায়। ‘কল্লোল’, ‘কবিতা’ বা তার পরের দশকগুলোতে কৃষক কবি-লেখকের কথা শুনিনি বলে আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। একটা পোস্টকার্ড লিখে পাটনা থেকে গেলুম ওর বাড়ি। হাওড়ার একটা সরু প্রায়ান্ধকার গলি দিয়ে পৌঁছোলুম ২৩৯ নেতাজি সুভাষ রোড। বেশ কয়েকটা পরিবার থাকে উঠোনের চারিদিকের চালাঘরে, তার একটায় হারাধন ধাড়া থাকে ভাই আর মা-বাবার সঙ্গে। একটাই ঘর, মাঝখানে পালঙ্ক, মেঝেয় আর খাটের তলায় বই আর পত্রিকা । হারাধন বেশ ফর্সা গোলগাল, কৃষক পরিবারের সদস্য বলতে যে মাসকুলার বডি বোঝায়, তেমন নয়।

    হাংরি নামের আন্দোলন আরম্ভ করার ব্যাপারটা আলোচনা করলুম, চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ আর স্পেংলারের দর্শন খোলোশা করলুম ওর কাছে। হারাধনকে বোঝালুম ‘হাংরি’ শব্দটা পেয়েছি ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের 'In Swore Hungry Tyme' বাক্য থেকে। আর আন্দোলনের তাত্বিক বনেদ হলো দার্শনিক অসওয়াল্ড স্পেঙ্গলারের লেখা 'The Decline of the West' বইটার কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য।
    — হাংরি মানে জানি, কিন্তু ইংরেজ কবির লেখা থেকে কেন ? জিগ্যেস করল হারাধন।
    বললুম, এই হাংরি শব্দটা খাওয়ার নয়, সময়ের, খারাপ সময়ের।
    — অনেকে ক্ষুধার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে পারে। ভাববে হাংরি মানে ক্ষুধার্ত। ভাববে আমরা খেতে পাচ্ছি না বলে-বলে লেখালিখি করতে হবে। চোখ কুঁচকে বলল হারাধন।
    — আমি তাই চসারের ‘হাংরি টাইম’ শব্দবন্ধের কথা বলছি; ভারত আর বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, দেশভাগের পর একটা খারাপ সময়ের আবর্তে পড়েছে; সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্ম, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, জাতিপ্রথা বলো, আমরা উত্তরঔপনিবেশিক ঘুর্ণিতে পাক খাচ্ছি। মানে, এসট্যাবলিশমেন্ট নামের অক্টোপাস বা ক্ষমতার পীঠস্হানগুলো সব কয়টা আঁকশি দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। আমরা পীঠস্হানগুলোর সব কটা আঁকশিকে আঘাত করব।
    বললুম, বাঙালির সমাজে স্থিতাবস্থা ভাঙার আওয়াজ তুলে, ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে, সমাজ,শিল্প ও সাহিত্যের আন্দোলন শুরু করব আমরা, তার নাম হবে হাংরি বা হাংরিয়ালিস্ট। আর্তি বা কাতরতা শব্দগুলো মতাদর্শটাকে সঠিক তুলে ধরতে পারবে না। হাংরি আন্দোলন, এই শব্দবন্ধ বাংলাভাষায় ঠিক সেভাবে গ্রাহ্য হবে যেভাবে মুসলিম লিগ, কম্ম্যুনিস্ট পার্টি বা কংগ্রেস দল ইত্যাদি শংকরায়িত শব্দবন্ধগুলো হয়েছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ডিসকোর্সের সংকরায়ণকে স্বীকৃতি দেব আমরা।
    স্পেঙ্গলারের বক্তব্য ব্যাখ্যা করলুম : কোনো সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটা সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না| যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার উপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটা নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে। কিন্তু একটা সংস্কৃতির অবসান সেই সময় আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন।
    — বাংলার হালত দেখে ভালোই বুঝতে পেরেছি তোমার কথাগুলো। কমিউনিস্টরা এই ব্যাপারটা বুঝতে চায় না।
    — দেখতেই পাচ্ছো, উনিশ শতকের পর বাঙালির সমাজ কোথায় পৌঁচেছে। বললুম আমি।
    — জানি, আমি কিছুদিন আগে পর্যন্ত চায়ের ঠেকে কাজ করতাম। সম্প্রতি পোস্ট অফিসে চাকরি পেয়েছি। আমি নিজের নাম বদলে দেবী রায় রাখতে চাই। এফিডেভিট করছি। কিন্তু আমাকে কী করতে হবে ?
    — তুমি আমার সঙ্গে পাটনায় চলো। দাদা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে চাইবাসা থেকে নিয়ে আসবে। চারজনে মিলে একটা প্ল্যান তৈরি করব। নানা ব্যাপারে লিফলেট ছাপিয়ে তোমাকে পাঠাবো, তুমি কলকাতায় বুদ্ধিজীবীদের মাঝে বিলি করবে। যারা যোগ দিতে চায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেখা যোগাড় করবে। আমি আর দাদা খরচের দিকটা দেখব।
    হারাধন রাজি, ওর বাড়ির ঠিকানাটা ব্যবহার করতেও রাজি। তবে মন খারাপের ব্যাপার হলো যে নামটা পালটে ফেলছে। হারাধন ধাড়া নামের জন্য সাহিত্যজগতে স্বীকৃতি পাচ্ছে না, তাই নামটা বদলে দেবী রায় করতে চায়। আমি প্রস্তাব দিলুম, প্রকাশক হিসাবে হারাধন ধাড়া নামটা থাকুক আর সম্পাদক হিসাবে দেবী রায়।
    হারাধনের বন্ধুবৃত্ত ছিল না তখন কেননা আমাকে দেখে হারাধনের মায়েরও ভালো লেগেছিল। আমার বিষয়ে অনেক কথা জিগ্যেস করলেন। বললেনও যে হারাধন সবায়ের সঙ্গে মিশতে চায় না।
    —এবার দেখবেন, লোকে যেচে এসে মিশবে। বলেছিলুম হারাধনের মাকে।
    ট্রেনে করে পাটনায় যাবার সময়ে দেখলুম দেবী রায় বেশ সহজে মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করতে পারে যা আমি একেবারেই পারতুম না।

    তার আগের এক অভিজ্ঞতার কথা বলি। দাদা তখন সিটি কলেজে পড়ছে। মামার বাড়ি পাণিহাটি থেকে প্রতিদিন ট্রেনে করে শিয়ালদহ হয়ে স্টেশন থেকে হেঁটে কলেজে যেতো। আমি উত্তরপাড়ায় গেলে কোন্নগর থেকে নৌকো করে পাণিহাটিতে যেতুম। পাণিহাটি থেকে দাদার সঙ্গে কলকাতায় যাবার সময়ে শিয়ালদহ স্টেশনে উদ্বাস্তুদের অবস্হা দেখে দাদাকে জিগ্যেস করেছিলুম, এনারা এই ভাবে কতোদিন রয়েছেন? দাদা বলেছিল, কলকাতায় এনাদের কেউ নেই, টাকাকড়িও নেই, তাই শিয়ালদা স্টেশন চত্বরে থাকা ছাড়া আর অন্য উপায় নেই। রোজ এতো পরিবার পালিয়ে আসছে যে স্টেশন প্ল্যাটফর্ম ছাপিয়ে, স্টেশনের সামনে খোলা চত্বরে চটের ছাউনি দিয়ে, এরা ঝড়, জল আর রোদে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে। শুনে, মনখারাপ পুষে চুপ করে রইলুম। আর যাইনি শিয়ালদহ হয়ে দাদার কলেজে। দাদাও উত্তরপাড়ার আদিবাড়িতে চলে এসেছিল। দাদার কলেজের বন্ধুরা আড্ডা মারতে আসতো উত্তরপাড়ার খণ্ডহর হয়ে যাওয়া জমিদারবাড়িতে। দাদা বেছে নিয়েছিল চিলেকোঠার ঘর, সিগারেট ফোঁকার সুবিধার জন্য।

    আমি দেবী রায়কে নিয়ে পাটনায় পৌঁছোবার পর দাদা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে এলো। আমি চসার আর স্পেংলারের আইডিয়াটা ব্যাখ্যা করলুম। শক্তি বেশ মন দিয়ে শুনলো। শক্তির নাম নেতা হিসেবে, দেবী রায়ের নাম সম্পাদক হিসেবে আর স্রষ্টার নাম থাকবে আমার। পরে টের পেয়েছিলুম যে এইভাবে প্রথম লিফলেটেই নামগুলো ছাপানো বোকামি হয়ে গিয়েছিল।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায় আইডিয়াটা শুনে বলল, সুনীলকে না জানিয়ে আন্দোলন করা কি উচিত?
    — কৃত্তিবাস পত্রিকা তো কোনো আন্দোলন নয়, ওটা বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকার পাশাপাশি একটা আলাদা প্ল্যাটফর্ম। কৃত্তিবাস পত্রিকায় তো আমি লিখেছি। আমার একটা কবিতার বই বেরোবার কথা কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে। আর দাদা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘একা এবং কয়েকজন’ বইটা নিজের মাইনের টাকায় ছাপিয়ে দিয়েছে। কৃত্তিবাস ছাপাবার খরচও দেয় মাঝে-মধ্যে।
    — সমীর বোঝাক সুনীলকে, ও তো কলেজের বন্ধু। তোমাদের উত্তরপাড়ার বাড়িতে আড্ডা মারতে যেতো। খাবার আইডিয়াটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। সুনীল কিন্তু চটে যেতে পারে। সন্দীপন আর উৎপলের সঙ্গে মাঝে সুনীলের তর্কাতর্কি হয়েছিল কৃত্তিবাস নিয়ে; ওদের মনে হয়েছে সুনীল ওদের কনট্রোল করতে চাইছে। সমীর জানে ব্যাপারটা। উৎপল একটা আলাদা পত্রিকা বের করতে চায়।
    — হ্যাঁ, সুনীলের আপত্তির কারণ নেই। কৃত্তিবাস তরুণদের কবিতা লেখার প্ল্যাটফর্ম। আন্দোলন নয়। মলয় বলছে টোটাল আন্দোলনের কথা, এসট্যাবলিশমেন্টের কথা, ক্ষমতার পীঠস্হানগুলোকে আক্রমণের কথা।
    — আপনি কতোকাল প্রেম করছেন, প্রেমিকাকে নিয়ে কবিতা লিখছেন, বিয়ে করে ফেলুন এবার। আমি বললুম শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে।
    — বুঝেছি, সমীরের ঘাড়ে বসে খাচ্ছি বলে তোমার আঁতে লাগছে। বলল শক্তি।
    — আরে ওর সঙ্গে সুধীরবাবু বিয়ে দিতে রাজি হবেন না, চালচুলো নেই, মুখ থেকে ভুরভুর করে মহুয়া মদের গন্ধ বেরোয়, আগে একটা চাকরি পাক, তারপর। বলল দাদা।
    — হ্যাঁ, ততোদিন সমীরই ভরসা।
    — হাংরি বুলেটিনে দেবার জন্যে ও একটা কবিতা লিখে দেবীকে দেবে কলকাতায়। দেবী রায় হাংরি বুলেটিনে ছাপাতে পারবে। দেবীকে কিছু টাকা দিলে দাদা।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই কবিতাটাই হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত প্রথম কবিতা, তখন ভারত আক্রমণ করেছে চীন। প্রথম ভারত-চীন যুদ্ধ ভারত ও চীনের মধ্যে ১৯৬২ সালে সংঘটিত একটি যুদ্ধ। সীমানা নিয়ে বিরোধ থেকে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। যুদ্ধে চীনের কাছে ভারত পরাজিত হয়। চীন তিব্বত দখল করার পর ভারতের বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীনকে চীনের অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলে দাবী করে, এভাবে যে সীমান্ত সমস্যার শুরু হয় তা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সূচনা করে। যুদ্ধে চীনজয়ী হয়ে একতরফা যুদ্ধবিরতি জারি করে, আকসাই চীন দখলে রাখে কিন্তু অরুণাচল প্রদেশ ফিরিয়ে দেয়, যুদ্ধের পর ভারত সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ভারতের শান্তিবাদী বিদেশনীতিও কিছু পরিমাণে পরিবর্তিত হয়। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য ভারতকে সমর্থন করে, অন্যদিকে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে মিত্রতা বাড়াতে সচেষ্ট।

    একটি ভিখারি ছেলে ভালোবেসে দেখেছিল ভাত আর পরখ করেছিল
    জ্যোত্স্নায় ছড়ানো ধানগাছগুলি, ধানের গোড়ায় শুদ্ধ জলভরা মাখনের মতো
    মাটির সাবলিলতার চিকণ-ফাঁপানো ধান, ধানগুলি ভাত হতে পারে ?
    নির্বাক দেবতা কথা বলতে পারে
    লোহা গলতে পারে
    কাঠের ভূভাগ পারে চিৎ হতে নারীদের মতো ?
    তবু সে ভিখারি ছেলে ভালোবেসে দেখেছিল ভাত।
    ভালোবেসে দেখেছিল, বহুতর দর্শন জীবনে
    জীবন ছেড়েও কতো’ গাঁজায় আক্রান্ত হয়ে কতো
    জীবনেও ধান ছাড়া, নারী ছাড়া, জ্যোত্স্নাটুকু ছাড়া ওপরে কি যেন আছে !
    সবারই ওপরে আছেন ভগবান পান্থ-নির্যাতনে
    সবারই ওপরে আছেন ভগবান পরিব্রজাতার
    সবারই ওপরে আছেন ভগবান মানুষের হয়ে
    ভিখারি ছেলেটিকে দুটি ভাত দেবার ব্যস্ততায়
    ভিখারির ভালো ছেলে ছাড়া ছিল বহু মন্দ ছেলে
    তারা ভালোবাসা নিয়ে মাখামাখি করেনি কখনো
    তারাও তো বেঁচে আছে তারাও তো আছে অনাবিল
    আমলকির মতো কত ভলো ধরণের ফলই পৃথিবীতে আছে
    ভিখারির ভালো ছেলে মন্দ ছেলে ঝরে গেছে ভিখারিমাতার পেট থেকে
    অপরূপ উলোটপালট হয়ে পৃথিবীতে ঘটনা এখন জীবনের শান্তি, মুক্তি, বিষণ্ণতা
    প্রভৃতি যুদ্ধের নিকটে দাঁড়িয়ে থাকে
    যেকোনো প্রকারে যুদ্ধ বন্ধ করো
    ওদের পেটের ছেলে - বোমাগুলি খসাতে হবে না
    ওদের পেটের মেয়ে – বোমাগুলি মরে যাক পেটে
    বছর বছর হোক প্রাণঘাতী বিবাহবার্ষিকী
    ক্রুশ্চভ-কেনেডি নাই প্রসূতি হবে কী কোনো দিন ?
    তবে বন্ধ করো হিংসা মেগাটন যুদ্ধ অগ্ন্যুৎপাত
    নতুবা ক্ষুধার্ত খাবে ছিঁড়ে মাংস প্রয়োজনমত।
    উপদ্রুত ভারতের সীমান্তের তুষারহায়নার দল থেকে
    ধর্মহীনতার লাল ঝাণ্ডা নিয়ে কেবল দেহের খোঁড়া ক্ষুধা নিয়ে
    এবং তুষার হায়নার চোখে নারীর কপোল খাওয়া ক্ষুধা আঁকা দেখে
    মুখ্যমন্ত্রী, পাঠিয়ে দাও একদল ক্ষুধার্ত কবিকে
    তারা লিখতে জানেও না, গিলতে জানে অলৌকিকভাবে
    সমগ্র সীমান্ত খেয়ে কফিহাউসে করবে আলোচনা
    আধুনিক গল্পে জপ পদ্যে হয়তো খুব ভেদাভেদ নাই
    বাংলাদেশে বিয়ে হয় ৩টে - ৩০-এ
    জ্যোতিবাবুকেই দাও বেন্টিক স্ট্রিটের চর্মমালা
    সৌমিত্র কেমন করলো অভিনয় চীনা-অভিযানে
    কবিতা ভাতের মতো কেন লোকে নিতেই পারছে না
    যুদ্ধ বন্ধ হলে নেবে ? ভিখারিও কবিতা বুঝেছে
    তুমি কেন বুঝবে না হে অধ্যাপক, মুখ্যমন্ত্রী সেন ?

    — আমার মা ঘরের পরদা সরিয়ে খেতে ডাকলেন, “ওই ঘরে আসন পেতে খেতে দিয়েছি।” মা জানতেন যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দাদার চাইবাসার বাসায় থাকেন আর শীলার সঙ্গে প্রেম করেন।পাটনায় তখন ডাইনিঙ টেবিল ছিল না।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বোধহয় ব্যাপারটা ঠাহর করতে অসুবিধা হচ্ছিল। তাই রাতের খাবারের আগে যখন মদ খাওয়া চলছিল, আমি বললুম, স্পেংলার বলেছিলেন, একটি সংস্কৃতি কেবল সরলরেখা বরাবর যায় না; তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়। তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোনদিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতিটি বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়। তার সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে, তা বাইরে থেকে যা পায় ত-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তখন তৃপ্তিহীন। দেশভাগের ফলে ও পরে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মণীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয়। হাংরি হবে কাউন্টার কালচারাল আন্দোলন, আর হাংরি সাহিত্যকৃতি হবে কাউন্টার ডিসকোর্স।
    — বুঝেছি, বুঝেছি, বলে মাথা নাড়ল শক্তি।
    আমি তবু বোঝানো বজায় রাখলুম।
    — ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের ধারণার বনেদের ওপর; কল্লোল’, ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’ যে নবায়ন এনেছে সে কাজগুলো কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেন না সেগুলো যুক্তিগ্রন্হনা-নির্ভর, আর তাঁদের মনোবীজে অনুমিত রয়েছে যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটা একক, নিটোল ও সমন্বিত।"
    — জানি, জানি। বলল শক্তি।
    আমি তবুও বলা বজায় রাখলুম, কেননা বললে পরে দেখেছি নিজেকে ঝালিয়ে নেয়া যায়।
    — ওই ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে সন্দর্ভগুলো নিজেদেরকে পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে, আর স্থানিকতেকে ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে। ওই ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে-মননসন্ত্রাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্থানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।
    — হ্যাঁ, কারেক্ট। দাদা বলল।
    —ওই ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ। ঠিক এই কারণেই, ইউরেপীয় শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো। কবিতা আর কৃত্তিবাস পত্রিকার দিকে তাকালে দেখা যাবে যে পুঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে আর প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে ‘শতভিষা’ গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন। এমনকি ‘কৃত্তিবাস’ও সীমিত হয়ে গেছে মাত্র কয়েকজন মেধাসত্বাধিকারীর নামে। পক্ষান্তরে, যদিন ঔপনিবেশিক-তন্ত্রের আগেকার প্রাক-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবা হয়, তাহলে দেখা যায় যে পদাবলী সাহিত্য নামক ম্যাক্রো পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব ও শাক্ত কাজ, মঙ্গলকাব্য নামক পরিসরে সংকুলান ঘটেছে মনসা, চণ্ডী, শিব, কালিকা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর। লক্ষ্যণীয় যে প্রাকৌপনিবেশিক কালখণ্ডে সন্দর্ভ গুরুত্ত্বপূর্ণ ছিল, তার রচয়িতা নয়।
    — বুঝেছি, বুঝেছি, তোমাকে অতো বক্তৃতা দিতে হবে না, কলেজে তো অধ্যাপকের চাকরি পেয়েছিলে, গেলেই পারতে, বলল শক্তি।
    চাইবাসায় দাদা ট্যুরে গেলে শক্তিকে নিজের শশুরবাড়িতে রেখে যেতো। একবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শক্তির খোঁজে চাইবাসায় পৌঁছে অবাক হয়ে বলে, “তুই এখানে ইস্টিশান পুঁতে ফেলেছিস?” প্রেমিকা কলেজে পড়তে গেলে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ফিরে আসার রাস্তায় কোনো গাছতলায় দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ অপেক্ষা করত।
    পাটনায় দেবী রায় আরও কয়েক দিন থেকে গেল। আমার ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’ বইটার পাণ্ডুলিপি আর উনিশ হাজার টাকা শক্তিকে দিলুম বইটা কলকাতায় ছাপাবার জন্য। বইটা এমনভাবে ছাপিয়েছিল যে শেষে চটে গিয়ে শক্তির উল্টোডাঙা বাসার সামনে ডাঁই করে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলুম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দাদাকে বলেছিল যে, তুই আর লোক পেলি না। তালপাতা প্রকাশনী থেকে ‘সুনীলকে লেখা চিঠি’ নামে একটা বই প্রকাশিত হয়েছে যাতে হাংরি আন্দোলন নিয়ে অনেকের চিঠি আছে, আমার চিঠির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শক্তির সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল সেই থেকে। আর শক্তিও ভাবলো যে ওর প্রেমিকার সঙ্গে বিয়েতে বাগড়া দিয়েছি আমি আর দাদা।

    দুই : হাংরি ইশতাহার

    পাটনায় এক পাতার বুলেটিন ছাপিয়ে দেবী রায়কে পাঠাবো এরকম প্ল্যান ঘা খেলো কেননা বাংলা প্রেস পেলুম না। অগত্যা ১৯৬১ সালের নভেম্বরে ইংরেজিতে লিফলেট ছাপিয়ে দেবীকে গোছা করে পাঠালুম। লিফলেটে যা ছাপানো হয়েছিল :

    প্রথম ইংরেজি ইশতাহার (নভেম্বর ১৯৬১)

    Poetry is no more a civilizing manoeuvre, a replanting of the bamboozled gardens; it is a holocaust, a violent and somnambulistic jazzing of the hymning five, a sowing of the tempestuous hunger. Poetry is an activity of the narcissistic spirit. Naturally, we have discarded the blankety-blank school of modern poetry, the darling of the press, where poetry does not resurrect itself in an orgasmic flow, but words come up bubbling in an artificial muddle. In the prosed-rhyme of those born-old half-literates, you must fail to find that scream of desperation of a thing wanting to be man, the man wanting to be spirit. Poetry of the younger generation too has died in the dressing room, as most of the younger prosed-rhyme writers, afraid of the satanism, the vomitous horror, the self-elected crucifixion of the artist that makes a man a poet, fled away to hide in the hairs. Poetry from Achintya to Ananda and from Alokeranjan to Indraneel, has been cryptic, short-hand, cautiously glamorous, flattered by own sensitivity like a public school prodigy. Saturated with self-consciousness, poems have begun to appear from the tomb of logic or the bier of unsexed rhetoric.'

    কয়েকজন আলোচক প্রশ্ন তুলেছেন যে লিফলেটগুলোতে তারিখ দেয়া নেই কেন। তারিখ দেয়া নেই কেননা সাহিত্য পত্রিকা হিসাবে কোনো লিফলেট প্রকাশিত হয়নি। যাই হোক, দেবী রায় জানালো যে লিফলেট বিলি করার পর অনেকে যোগ দিতে চাইছে, ব্যাপারটা সম্পর্কে খোঁজখবর করছে। আমি এবার দেবী রায়কে বাংলায় লেখা ম্যাটার আর টাকা পাঠিয়ে দিতে লাগলুম, যাতে ওখানেই ছাপিয়ে নিতে পারে। লিফলেটগুলো এরকম ছিল :

    প্রথম বাংলা ইশতাহার (নভেম্বর ১৯৬১)

    কবিতা এখন জীবনের বৈপরীত্যে আত্মস্হ। সে আর জীবনের সামঞ্জস্যকারক নয় , অতিপ্রজ অন্ধবল্মীক নয়, নিরলস যুক্তিগ্রন্হন নয়। এখন, এই সময়ে, অনিবার্য গভীরতার সন্ত্রস্তদৃক ক্ষুধায় মানবিক প্রয়োজন এমনভাবে আবির্ভূত যে, জীবনের কোনো অর্থ বের প্রয়োজন শেষ। এখন প্রয়োজন অনর্থ বের করা, প্রয়োজন মেরুবিপর্যয়, প্রয়োজন নৈরাত্মসিদ্ধি। প্রগুক্ত ক্ষুধা কেবল পৃথিবী বিরোধিতার নয়, তা মানবিক, দৈহিক এবং শারীরিক। এ ক্ষুধার একমাত্র লালনকর্তা কবিতা, কারণ কবিতা ব্যতীত কী আছে আর জীবনে। মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে। কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয়। কবিতা থাকা সত্ত্বেও, অসহ্য মানবজীবনের সমস্তপ্রকার অসম্বদ্ধতা। অন্তর জগতের নিষ্ঠুর বিদ্রোহে, অন্তরাত্মার নিদারুণ বিরক্তিতে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে রচিত হয় কবিতা। উঃ, তবধ মানবজীবন কেনএমন নিষ্প্রভ। হয়তো, কবিতা এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে যাঁরা অভ্যস্ত তাদের অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব এই সঙ্কটের নিয়ন্ত্রক। কবিতা বলে যাকে আমরা মনে করি, জীবনের থেকে মৌহমুক্তির প্রতি ভয়ংকর আকর্ষণের ফলাফল তা কেবল নয়। ফর্মের খঙাচায় বিশ্বপ্রকৃতির ফাঁদ পেতে রাখাকে আর কবিতা বলা হয় না। এমনকি প্রত্যাখ্যাত পৃথিবী থেকে পরিত্রাণের পথরূপেও কবিতার ব্যবহার এখন হাস্যকর। ইচ্ছে করে, সচেতনতায়, সম্পূর্ণরূপে আরণ্যকতারবর্বরতার মথ্যে মুক্ত কাব্যিক প্রজ্ঞার নিষ্ঠুরতার দাবির কাছে আত্মসমর্পণই কবিতা। সমস্ত প্রকার নিষিদ্ধতার মথ্যে তাই পাওয়া যাবে অন্তরজগতের গুপ্তধন। কেবল, কেবল কবিতা থাকবে আত্মায়। ছন্দে গদ্য লেখার খেলাকে কবিতা নাম দিয়ে চালাবার খেলা এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন। টেবলল্যাম্প ও সিগারেট জ্বালিয়ে, সেরিব্রাল কর্টেক্সে কলম ডুবিয়ে, কবিতা বানাবার কাল শেষ হয়ে গেছে। এখন কবিতা রচিত হয় অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে। সেহেতু ত্রশ্নূ বলাৎকারের পরমুহূর্তে কিংবা বিষ খেয়ে অথবা জলে ডুবে 'সচেতনভাবে বিহ্বল' হলেই, এখন কবিতা সৃষ্টি সম্ভব। শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত। শখ করে, ভেবে-ভেবে, ছন্দে গদ্য লেখা হয়তো সম্ভব, কিন্তূ কবিতা রচনা তেমন করে কোনো দিনই সম্ভব নয়। অর্থব্যঞ্জনাঘন হোক অথবা ধ্বনিপারম্পর্ষে শ্রুতিমধুর, বিক্ষুব্ধ প্রবল চঞ্চল অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তিরশক্তি না থাকলে, কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরীর মতো অনুন্মেষিণী হয়ে যেতে পারে।”

    মুক্তি বিষয়ক ১৪-বিন্দু ইশতাহার (১৯৬২)

    ১. আমার সম্পূর্ণ অহং-এর খাঁটি আবিষ্কার।
    ২. কবিতা চলাকালীন আমাকে এবং আমার সমস্ত কিছুকে যতরকমভাবে পারা যায় উপস্হিত করা।
    ৩. কবিতায় আমাকেঠিক সেই মুহূর্তে আটক করে ফাঁস করা যখন আমি কোনো না কোনো কারণে ফেটে পড়েছি, আর আমার ভেতর দিকতা বেরিয়ে পড়েছে।
    ৪. নিজস্ব অহং দিয়ে প্রতিটি মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ, তারপর স্বিকার আধবা প্রত্যাখ্যান।
    ৫. সমস্তকিছুকে বস্তু মনে করে আরম্ভ, এবং প্রত্যেকটিকে নাড়িয়ে দেখে নেওয়া যে তা প্রাণবন্ত কি না।
    ৬. সামনে এসে পড়া ব্যাপারকে হুবহু গ্রহণ না করে তার প্রত্যেকটি দীক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা।
    ৭. পদ্যছন্দ ও গদ্যছন্দ উভয়েরই অবলুপ্তি ঘটিয়ে একটা সহজসরল নিজস্ব শৈলীর ব্যবহার যা ধাঁ করে ঢুকে যাবে যাকে জানানো হচ্ছে তার মেজাজে।
    ৮. কথা বলার সময়ে যে ধরন, মাপ আর ওজনের শব্দ ব্যবহার করা হয়, কবিতাতেও অবিকল তাই।
    ৯. কথা বলার সময়ে শব্দের ভেতরে যে ধ্রণের ধ্বনি পুরে দেয়া হয়, কবিতাকে সেই ধ্বনিতে আরও চাঁচাছোলা করে উদ্‌ঘাটন করা।
    ১০. পাশাপাশি দুটি শব্দের এতাবতকালের আঁতাত ধাক্কা দিয়ে ভেঙে দেয়া এবং তদ্বারা অসবর্ণ ও অবৈধ শব্দ এবং বাক্য তৈরি।
    ১১. কবিতায় আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত সমস্ত সাহায্য প্রত্যাখ্যান, আর বাইরের কোনো রকম ঘুষ না নিয়ে কবিতাকে নিজেই মৌলিক হতে দেয়া।
    ১২. কবিতাই মানুষের সর্বশেষ ধর্ম, সে ব্যপারটা খোলাখুলি স্বীকার করা।
    ১৩. তীরের মতো বয়ানে অতিষ্ঠ অস্তিত্ব, বিবমিষা, বিরাগ আগাগোড়া তীব্রভাবে জানানো। ১৪. অন্তিম প্রাতিস্বিকতা।

    রাজনীতি বিষয়ক ইশতাহার (১৯৬৩)

    ১. প্রতিটি ব্যক্তি-মানুষের আত্মাকে রাজনীতিমুক্ত করা হবে।
    ২. প্রাতিস্বিক মানুষকে বোঝানো হবে যে অস্তিত্ব প্রাক-রাজনৈতিক।
    ৩. ইতিহাস দিয়ে বোঝানো হবে যে, রাজনীতি আহ্বান করে আঁস্তাকুড়ের মানুষকে, তার সেবার জন্যে টানে নান্দনিক ফালতুদের।
    ৪. এটা খোলসা করে দেয়া হবে যে গান্ধীর মৃত্যুর পর এলিট ও রাজনীতিকের মধ্যে তুলনা অসম্ভব।
    ৫. এই মতামত ঘোষণা করা হবে যে রাজনৈতিক তত্ব নামের সমস্ত বিদগ্ধ বলাৎকর্ম আসলে জঘন্য দায়িত্বহিনতা থেকে চাগিয়ে ওঠা মারাত্মক এবং মোহিনী জোচ্চুরি।
    ৬. বেশ্যার মৃতদেহ এবং গর্দভের লেজের মাঝামাঝি কোথাও সেই স্থানটা দেখিয়ে দেয়া হবে যেটা বর্তমান সমাজে একজন রাজনীতিকের।
    ৭. কখনও একজন রাজনীতিককে শ্রদ্ধা করা হবে না তা সে যেকোনো প্রজাতি বা অবয়বী হোক না কেন।
    ৮. কখনো রাজনীতি ধেকে পালানো হবে না এবং সেই সঙ্গে আমাদের কান্তি-অস্তিত্ব থেকে পালাতে দেয়া হবে না রাজনীতিকে।
    ৯. রাজনৈতিক বিশ্বাশের চেহারা পালটে দেয়া হবে।

    রাজনৈতিক ইশতাহার নিয়ে তখনকার ‘যুগান্তর’ সংবাদপত্রে প্রধান সম্পাদকীয়, লেখা হয়েছিল, ১৯ জুলাই ১৯৬৪ তারিখে; হাংরি আন্দোলন মামলা রুজু হবার আগে।

    শিরোনাম : ‘আর মিছিলের শহর নয়’

    “বাংলাদেশে দলাদলিতে দীর্ণ বিশ্বাসহীন রাজনীতি আজ নিজের মস্তক চর্বণ করিতে ব্যস্ত। এই আবহাওয়ার জন্যই কি সমাজে এক ধরণের নিরাশাবাদ জন্মলাভ করিতেছে, যার চেহারা ড্রেনপাইপ মস্তানি, যার আওয়াজ রাস্তার রোমিওদের শিস এবং সাহিত্যের ‘ক্ষুৎকাতরতার’ মধ্যে ভয়াবহভাবে প্রকাশ পাইতেছে ? কাজেই ইহা আশ্চর্য নয়, এই সব বিকৃতির উপাসকরা যারা ‘হাংরি জেনারেশন’ নাম ধারণ করিয়াছে, তারা পরম শ্রদ্ধাহীন অবজ্ঞায় ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের মাঝে কোথাও’ রাজনীতিকদের স্হান নির্দেশ করিতে চাহিতেছে। কলিকাতার ক্ষুধার্ত ছেলেরা এই ধিক্কার দিতেছে এবং আত্মধিক্কারের মধ্যে বন্দী হইতেছে, ইহা কি বন্ধ্যা রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত অথবা অসুস্হ সমাজের অভিশাপ ?”

    যারা আন্দোলনে যোগ দিচ্ছিল তাদের নাম এক পিঠে আর অন্য পিঠে নিজের লেখা ছাপিয়ে পাঠাচ্ছিলুম দেবী রায়কে। দেবী জানালো যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, অরূপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী প্রমুখের লেখা পাওয়া গেছে। তাই পুস্তিকার আকারে প্রকাশ করতে হবে। আমি টাকা পাঠিয়ে দিলুম। সেটা ছিল দশ নম্বর বুলেটিন, তাতে বিনয় মজুমদারের ‘একটি উজ্বল মাছ’ কবিতাটা ছাপা হয়েছিল:

    একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
    দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে
    পুনরায় দুবে গেল - এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে
    বেদনার গাঢ় রসে আপক্ব রক্তিম হলো ফল।
    বিপন্ন মরাল ওড়ে, আবিরাম পলায়ন করে,
    যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নীচে
    রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ;
    স্বল্পায়ু বিশ্রাম নেয় পরিশ্রান্ত পাহাড়ে পাহাড়ে;
    সমস্ত জলীয় গান বাষ্পীভূত হয়ে যায়, তবু
    এমন সময়ে তুমি, হে সমুদ্রমৎস্য তুমি... তুমি...
    কিম্বা,দ্যাখ,ইতস্তত অসুস্হ বৃক্ষেরা
    পৃথিবীর পল্লবিত ব্যাপ্ত বনস্হলী
    দীর্ঘ দীর্ঘ ক্লান্ত শ্বাসে আলোড়িত করে
    তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে
    চিরকাল থেকে ভাবে মিলাইবে শ্বাসরোধী কথা।
    সেই সংখ্যাতেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘শিল্প ও কার্তুজ’ শিরোনামে এই কবিতাটা প্রকাশিত হয়েছিল :
    দুঃসাহসী কেউ নেই যে সে পেচ্ছাব করবে মুখে
    জানে কামড়ে দেবো, জানে অঙ্গহানি হলে বুদ্ধদেব
    কে পুনর্গঠিত করবে, পাগলা রামকিংকর বেইজ ছাড়া?
    জীবনেই একবার শিল্পঅনুরাগিনীর কাছে
    ন্যাংটার উদ্বৃত্ত অংশ হাতড়ে বলেছিলুম, কী ভাবো
    শিল্পই যথেষ্ট! কেন কার্তুজ লটকানো হল দেহে ?

    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ১৯৬৩ সালের একটা চিঠিতে দেবী রায়কে এই নির্দেশ দিলেন বুলেটিনে তাঁর লেখা ছাপার ব্যাপারে

    মির্জাপুর, ৫ অক্টোবর ১৯৬৩
    প্রিয় হারাধনবাবু
    হাংগরি জেনারেশনের জন্য লেখা পাঠালাম। প্লট, কনটেন্ট, ক্র্যাফ্ট — এসব বিষয়ে ডেফিনিশন চেয়েছেন, আপাতত অন্য কতকগুলো ডেফিনিশন পাঠালাম, ওগুলো পরে লিখব। প্রকাশযোগ্য কিনা দেখুন। ছাপালে সবকটি একসঙ্গে ছাপাতে হবে — নইলে খাপছাড়া লাগবে। ছাপার ভুল যেন বেশি না থাকে, দরকার পড়লে অনুগ্রহপূর্বক একটা ফ্রেশ কপি করে প্রেসে দেবেন।
    ‘অমৃত’তে আমার বইয়ের যে বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছিল, দেখেছেন? নইলে পাবলিশারের কাছে গিয়ে তার একটা কাটিং পাঠাবার ব্যস্হা করেন তো খুশী হই। ওই বিজ্ঞাপনটাই দেশে বেরোবার কথা আছে — যদি বেরোয় তার প্রুফটা কাইন্ডলি দেখে দেবেন। আনন্দবাজারে লেখকদের লেখকদের কোনো বিবৃতি বেরিয়েছিল নাকি? তাহলে তারও একটা কাটিং পাঠাবেন।
    সামনের মাসে বাড়ি পাল্টাব। আরো একমাস থাকবো বা ততোধিক। সহজে যাব না। শরীর ভালো। ছোটোগল্পে আবার লেখা দিতে পারলাম না, সম্ভব হলে ক্ষমা করবেন।
    আগামি সপ্তাহে নতুন ঠিকানা পাঠাবো। তার আগে চিঠি দিলে, কুমুদ বাঙলো, রুম নং ৫, টিকোর, চুনার, মির্জাপুর, — এই ঠিকানায় দেবেন। ‘আক্রমন’ বানান কী? ‘ন’ না ‘ণ’?
    লেখাটা প্রকাশ হবার আগে আপনি ছাড়া কেউ যেন না দেখে। অনেক বাদ দিয়ে, খুব নরম করে, সবদিক বাঁচিয়ে লিখেছি, ভয় নেই।
    হাংগরি জেনারেশনের একটা সিম্বল করতে বলেছিলুম, তার কী হল? ৫ নয়া পয়সা দাম করতে পারেন।
    কমাগুলো ভেবেচিন্তে দিয়েছি, ওইগুলোই আসল জিনিস যেন থাকে।
    শেষের তারিখটা যেখানে আছে, ওখানে প্রকাশের তারিখ দেবেন।
    ‘অভিযান’ পূরবীতে হয়েছিল তো?
    সুনীলবাবুকে ( হাজরা ) প্রীতি জানাচ্ছি।
    ইতি
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

    বুলেটিন ছাপিয়ে বিলি করার জন্য অনেকে নানা কথা বলেছেন। নন্দিনী ধর, যিনি হাংরি কবিতাকে বলেছেন ‘পোঁদ পোঁছার কবিতা’, তিনি ‘আয়নানগর’ পত্রিকার অক্টোবর ২০১৯ সংখ্যায় লিখেছেন, “একথা মেনে নিতে আমার কোনো অসুবিধে নেই যে হাংরি আন্দোলনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল এক ধরনের বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ তার ছাপ রেখে গেছে একধরনের বাজারবিমুখীনতায়, একধরনের আন্ডারগ্রাউন্ড ছোট পত্রিকা ইস্তেহার সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। বলা যেতে পারে, হাংরি আন্দোলন একধরনের বিকল্প ছাপাখানার সংস্কৃতি আন্দোলন। সে বিকল্প সংস্কৃতি এক দিক থেকে একগুঁয়ে, জেদী। বাজারের বাইরেই তার মূল কেন্দ্রবিন্দু, বসবাস। আজ যখন আমি নিজে লেখালেখি করি, পত্রিকা করি, ছোটপত্রিকার রাজনৈতিক সাহিত্যিক ভূমিকা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করি, তখন তো সেই বিকল্প ছাপাখানার ইতিহাসের দিকেই তাকাই অনুপ্রেরণার জন্য, শেখার জন্য। না, সেখানে শুধু হাংরি নয়, আছে হাংরি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনেক অনেক বিকল্প ছাপাখানা ও বিকল্প গণমাধ্যম প্রয়াস। কিন্তু, আরো একাধিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠির সাথে সাথে, হাংরি গোষ্ঠীও যে আমার অন্যতম পূর্বসুরী, একথা আমার মেনে নিতে কোনো আপত্তি নেই।”
    বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালা’ ছিল হাংরি যুগের জলবিভাজক গল্প। এই প্রসঙ্গে অজিত রায় লিখেছে, “বাসুদেব দাশগুপ্তের 'রন্ধনশালা' তেষট্টিতে ম্যাগাজিনে কৃষ্ণহরফ পায়। গদ্যটি গ্রন্থত্ব লাভ করে উৎপলকুমার বসুর হেফাজতে, ১৯৬৫-তে। শুধু এই রন্ধনশালার কথাই যদি বলতে হয়, এবং ১৯৬৩-র প্রথম আলোকনের সালটিকেই যদি ধরতে হয়, বলব, সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের সহস্র সহস্র বছরের সর্বঅস্তিত্বগ্রাসী ক্ষুধার এ-তুল্য বহিঃপ্রকাশ এবং তার এহেন গ্রাম্য আদিম রাস্টিক তথা অস্বস্তিকর ভাষায় আত্মপ্রকাশ একটা বড়সড় তহেলকার চেয়ে বিন্দুমাত্র উনিশ ছিল না। এ ছিল এমন লেখা, যা পড়ার পর, বাংলা সাহিত্যের পাঠক আগের যা-কিছু পড়া সমস্ত হকহকিয়ে বমি করে দ্যায়। বাংলা গদ্যের শেলফ প্রায় খালি হয়ে যায় রন্ধনশালা পৌঁছনোর পর।‘রন্ধনশালার’ হব্যাশে সেদিন আকখা কলকাতা তোলপাড়। খাসির ল্যাজ তুলে যাঁরা মাংসের বহর আন্দাজাতে পটু, সেইসব ঘোড়েল সমালোচকেরা অব্দি রচনাটিকে ফ্রানজ কাফকা, লুই ফার্দিনান্দ সিলিন এবং গিন্সবার্গ-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাসু-বন্ধু শৈলেশ্বর কবুল করেছিলেন : ইমাজিনেটিভ সাহিত্যের এহেন উদাহরণ বাংলাভাষায় খুব বেশি নেই। বাস্তব অভিজ্ঞতাই লেখকের পা রাখার জায়গা, তারপরই বাসুদেব পাঠককে নিয়ে যান এক সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে।

    ১৯৬৩ সালেই উৎপলকুমার বসু ঠিকুজির আদলে একটা লম্বা কাগজে ওনার ‘পোপের সমাধি’ কবিতাটা ছাপিয়ে নিজেই বিলি করলেন

    [VERA PAPA MORTUUS EST]

    A Hungry Generation message on the death of Pope John XXIII

    লাল হলুদ কাচের জানালার দিকে তাকিয়ে
    সেদিন অকস্মাৎ
    বিকেলের অপরিচ্ছন্ন মুহূর্তে আমি
    জটিলতাহীন
    সূর্যরশ্মির দিকে চোখ মেলে
    'পোপের সাম্রাজ্য আর
    তাঁর অসুখের
    রহস্যময় স্হিতিস্হাপকতা'
    আঙুলে একটি বড়
    গ্লোব পৃথিবীর
    বর্তুল পরিধি দেখিয়ে
    আমি কলকাতায় তোমাকে বলেছিলাম
    'পোপের সাম্রাজ্য
    আর তাঁর অসুখের রহস্যময় বীজাণুর স্হিতিস্হাপকতা
    কতখানি দেখা যাক।'
    বীজাণুর সঙ্গে তুমি চাও না কি যুদ্ধ হোক ?
    অন্তত আমি তা চাই না
    কারণ সে যুদ্ধ যদি ধর্মযুদ্ধ না হয় তাহলে
    কুরুক্ষেত্রে কার মুখব্যাদানের অন্ধকারে
    আমি ছোট পৃথিবীর গ্লোবের প্রতিচ্ছায়া দেখে
    হতচকিতের মতো
    কৌরবের খেলার পুতুল হব ?
    নাড়া দিয়ে ভিতরের
    বীজাণুর, সন্ত্রাসের, সিকি-আধুলির শব্দ,
    গড়াগড়ি তোমাকে শোনাব ?
    অন্য বহু পুরুষের মতো এই সাতাশ আটাশ
    বছরের খিন্ন জীবনের কেবলই
    ঝিল্লি শিরা অন্ত্রবহুল
    ঐকান্তিক শরীরের প্রেমে
    বারবার নেমে এসে
    আমাদের দ্বিধা হল কেন ?
    যথার্থ মাতাল, পাপী,
    ধর্মজ্ঞানী, সাধু ও চোরের সঙ্গে মাখামাখি হল না তেমন।
    নৌকোয় বেশিদূর বেড়ানো হল না
    ভালোবাসা জোরালো হল না--
    খালপারে বিবাদ হল না--
    পাঠক, এখন, রোমের চত্বর থেকে
    দূর জানালায় চোখ রেখে
    দেখা গেল দ্যুতি নিভে যায়
    ক্যাথলিক মিশনের কাছে
    আমি ভারতের অপুষ্টির জন্য
    গুঁড়ো দুধ চাইব আয়াসে
    ঊনচল্লিশ পোপের মৃত্যুর পর কূটজ্ঞানে
    চল্লিশ পোপের জীবাণুমুক্ত আয়ু ফিরে আসে -- এই বোধে।
    কিন্তু আমাদেরো
    অন্য বহু পুরুষের মতো
    আরো কুড়ি, বাইশ বছরের আয়ু বাকি আছে।
    ততদিন বিমান বন্দরে গিয়ে বসে থাকি
    অথবা ছাপার কলে গিয়ে বলি আমার কবিতাগুলি
    ছেপো না বা বুড়ো আঙুলের দাগ ছেপো না বা
    ল্যাজের খুরের দাগ ছেপো না বা
    আমাকে বদল করো
    রহস্যময় মূল জানালায়
    অন্ধকারে যখন হলুদ নীল ভিন্ন রং
    মুছে গিয়ে পোপের সাম্রাজ্য আজ
    বীজাণুর মতো ছোট
    সংখ্যাহীন, ধূর্ত ও কোমল
    মাতব্বর ঈশ্বরের আবির্ভাব হল সদলবলে।

    দেবী রায় প্রথম থেকেই কবিতায় এক নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছিল যাকে উত্তরাধুনিক আলোচকরা বলেছেন রাইজোম, লজিকাল ক্র্যাক, অনির্ণেয়তা, আয়রনি। এখানে দেবী রায়ের ‘আমি চুপ করে থাকলে’ কবিতাটা তুলে দিচ্ছি

    আমি চুপ করে থাকলে

    নখ কাটতে গিয়ে আমার আঙুলে ব্লেড গঁথে যায়
    আনেক গভীর
    আমি আপেক্ষা করি, রক্তের — দেখা নেই
    দারুন ভয় আমাকে চিৎ করে ফ্যালে, আমি ঢোঁক গিলি
    এই ভয় — বিষম অন্তরঙ্গ কোনো মৃত্যুরই সমান আবিশ্বাস্য
    বাস-ট্রাম আমায় বহু সময় গিলে নেয় কোনো কোনো
    বন্ধুর ফ্ল্যাটে যেতে
    এক পায়ে খাড়া হয়ে কড়া নাড়ি দরোজায় বহুক্ষণ
    এক নাগাড়ে
    হাত ধরে যায় ‘বাড়ি নেই’ অপরিচিত বিদেশী স্বরে কেউ বলে ওঠে
    অথবা সরব হুক খোলার শব্দে দাড়ি কামানোর পর প্রথম
    আয়নায় নিজের মুখ দেখার সময়ে আমি
    হুডখোলা – কার
    ছুটি, রেড রোড ধরে ফাঁকা রাস্তায়
    বন্ধুর স্ত্রী ঠেসে পরিচিত হতে চায় ফ্যাকাশে হেঁসে
    দারুণ ক্ষিদেয় আমি অস্হির হয়ে উঠি – দারুণ ক্ষিদেয়
    আমি
    এখন বাসট্রাম অব্দি খেয়ে ফেলতে পারি – বেথানিয়া থেকে –
    আসার সময়ে যিশু অব্দি এম্নি ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিল
    আমি চুপ করে থাকলে রাস্তার পাথর অব্দি চিৎকার করে
    ওঠে
    মানুষের মুখের দিকে চেয়ে আমি বুঝি নপুংসক হয়ে জন্মায়
    কেউ
    মানুষের হাতে রাজনৈতিক নপুংসক হয়েছে
    কেউ
    কবিতাকে ধর্মের সমান দেখতে চেয়ে
    নিজেকে নপুংসক করেছে

    ইতিমধ্যে সুবিমল বসাক নামে এক যুবক আন্দোলনে যোগ দেবার ফলে আমার সুবিধা হলো। তার মা আর ভাইরা পাটনায় থাকে। বলল, ইনকাম ট্যাক্স অফিসে স্টেনোগ্রাফার। দেবী রায়ের তুলনায় বেশ পেশিবহুল চেহারা। বাঙাল বুলিতে কবিতা আর উপন্যাস লিখছে, স্কেচও আঁকছে। সেগুলো তো কলকাতার কোনো পত্রিকা ছাপবে না।ওকে আইডিয়া দিলুম স্টেনসিলে কবিতা লিখতে আর ছবি আঁকতে। ও প্রায় প্রতি সপ্তাহে একটা বা দুটো বুলেটিন প্রকাশ করতো, তাতে ওর আঁকা স্কেচ থাকতো। সুবিমলের একটা কবিতা দিলুম এখানে :

    সারারাত্র বাত্তি আঙাইয়া আমি আর উই শুইয়া কাটাই
    নীল হেজহানে লাগালাগি চাম ছেঁওয়াইয়াও কতো আল্‌গা আছি
    অর চ্যারায় কুনো পীরিতের চিন্‌হী নাই
    আমার চ্যারায়ও কুনো পীরিতের চিন্‌হী নাই
    ভয়ান্নক রূপ দেহনের ডরে আমরা দুইজনে চোক্ষু জুইব্বা আছি
    তবও নিষ্ঠুরের লেহান আওগাইয়া
    কয় দণ্ড মুহূর্ত
    কিছুটা সময়-ওক্তো
    আমরা ‘পীরিতের খেলা-পীরিতের খেলা’ খেলি

    সুবিমল বসাকের আহ্বানে ত্রিদিব মিত্র আর ওর বন্ধুনি আলো মিত্র যোগ দিয়েছিল আন্দোলনে। ওরা উন্মার্গ আর The Waste Paper নামে দুটো পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করল। পরে ওরা আমাকে লেখা চিঠির দুটো সংকলন প্রকাশ করেছিল। সুবিমল বসাক ‘হাংরি আন্দোলনের দ্রোহপুরুষ’ নামে ত্রিদিব আর আলো সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ লিখেছিল, পুরোটাই তুলে দিচ্ছি, সেই সঙ্গে ত্রিদিবের কবিতাও :

    হাংরি আন্দোলনের দ্রোহপুরুষ ত্রিদিব মিত্র এবং তাঁর তদানীন্তন প্রেমিকা আলো মিত্র (যাঁকে তিনি পরবর্তীকালে বহু ঝড়-জলের পর বিয়ে করেন) সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় বিশেষ লেখালিখি দেখতে পাওয়া যায় না, তার কারণ হাংরির কয়েকজন আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, যাতে এই প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি বিশেষ বিজ্ঞাপিত ও প্রচারিত না হন। হাংরি কেবল একটি পত্রিকা হয়ে থেকে যেত ত্রিদিব ও আলোর অবদান ছাড়া। তা যে সাড়া ফেলতে পেরেছে তার কারণ এঁদের দুজনার অভাবনীয় তৎপরতা।কালীদা, যিনি খালাসিটোলা ভাটিখানার মালিক বা ম্যানেজার ছিলেন, বলেছিলেন যে আলো মিত্রের আগে আর কোনো মহিলা খালাসিটোলায় ঢোকার সাহস করেননি।

    ষাটের দশকে যা নতুন-নতুন কার্যকলাপ সাহিত্যিকরা আরম্ভ করেছিলেন তা ত্রিদিব মিত্র ও আলো মিত্রর মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁরাই প্রথম পোস্টকার্ডে কবিতা, পুস্তিকার আকারে কবিতা, রঙিনকাগজে কবিতা, ভাঁজকরা কাগজে কবিতা আরম্ভ করেছিলেন।তাঁরাই প্রথম মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমাধিতে কবিতা পাঠের আয়োজন করেছিলেন। তাঁরাই প্রথম খালাসিটোলা নামে কলকাতার বিখ্যাত ভাটিখানায়, জীবনানন্দ দাশের জন্মদিনে, পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশের অনুষ্ঠান করেছিলেন।খালাসিটোলায় কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানও তঁদের অবদান। তাঁরা দুজনে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন; ইংরেজিতে 'ওয়েস্ট পেপার' ও বাংলায় 'উন্মার্গ'। তাঁদের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে পত্রিকার এরকম নাম রাখার কথা কেউ চিন্তা করতে পারতেন না। বস্তুত, তার পর থেকে পত্রিকার নামকরণে বিপ্লব ঘটে গিয়েছে পশ্চিমবাংলায়।

    মলয় রায়চৌধুরী ও দেবী রায় যে-সমস্ত মুখোশ হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিলি করার জন্য ছাপিয়েছিলেন, জোকার দানব পশু পাখি মিকিমাউস দেবী-দেবতা ইত্যাদি, সেগুলি এনারা দুজনে পৌঁছে দিয়ে আসতেন তখনকার মন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্ণধারদের, সংবাদপত্র-মালিকদের , যার জন্য যথেষ্ট বুকের পাটা দরকার। এনারা দুজনে কাঁধে মই নিয়ে কলকাতা ও হাও্ড়ার কলেজ ও অন্যত্র হাংরি আন্দোলনের পোস্টার সাঁটতেন; পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায়।হাংরি আন্দোলনের পূর্বে কবিতার পোস্টারের ধারণা কলকাতার সাহিত্যিকদের ছিল না।ত্রিদিবের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল খালাসিটোলার ভাটিখানায়।তারপর আমার মাধ্যমে মলয়ের সঙ্গে ও অন্যান্যদের সঙ্গে। মলয়ের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে ওঠে ত্রিদিবের এবং সেকারণেই ত্রিদিবের পত্রিকা দুটি হাংরি আন্দোলনের অভিমুখ হয়ে ওঠে।ওর পত্রিকা প্রকাশিত হলেই আমরা দল বেঁধে খালাসিটোলায় অনুষ্ঠান করতাম; তারপর বাইরে বেরিয়ে কলকাতার পথে অনেক রাত পর্যন্ত চরে বেড়ানো; কখনও বা গাঁজার পুরিয়া ম্যানেজ করে রামকৃষ্ণ ঘাটে সারা রাত। পকেটে টাকা থাকলে বেপাড়ায়। পেটে মদ পড়লেই ত্রিদিবের কন্ঠ থেকে কথা ছুটতে শুরু করত; অন্য সময় ও একেবারে চুপচাপ, কারোর সঙ্গে তখন কোনো কথা বলত না।একেবারে ফালগুনী রায়ের বিপরীত চরিত্র।আমরা কফিহাউসে একত্রিত হলেও অত্যধিক কথাবার্তায় বিরক্ত ত্রিদিব সাধারণত কফিহাউসে যেত না। যেত তখনই যখন হাংরির কোনো বুলেটিন বা মুখোশ বা পোস্টকার্ড বা ফোল্ডার বিলি করার থাকত, কিংবা কফিহাউসের সিঁড়ির দেয়ালে পোস্টার লাগাবার থাকতো। অনেকে পোস্টার ছিঁড়ে দিতো বলে ত্রিদিবের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি রুখতে হতো আমাদের।

    কেবলমাত্র দুটি কবিতা-পুস্তিকা রেখে গেছেন ত্রিদিব -- ঘুলঘুলি ও প্রলাপ-দুঃখ। ঘুলঘুলি ছিল ফোল্ডারের আকারে এবং প্রলাপ-দুঃখ ছিল ৪৮ পৃষ্ঠার, ল্যাকভার্নিশহিন কালো রঙের মলাট, কাভারে ত্রিদিবের কোমর পর্যন্ত নেগেটিভ ছবি -- শুয়ে আছে ঘাসের ওপর, হাতে সিগারেট। গণেশ পাইন এঁকে দিয়েছিলেন ওর প্রলাপ-দুঃখ বইটির প্রচ্ছদ। বইটি প্রকাশের পরও ত্রিদিব সেইভাবে প্রচার করেনি, যখন কিনা হাংরি বুলেটিন সে পৌঁছে দিত সকলের টেবিলে বা বাসায় বা দপতরে।

    ত্রিদিবের ‘হত্যাকাণ্ড’ কবিতাটা তুলে দিলুম:

    আমাকে বারবার জীবন থেকে হড়কে জীবনের ফাঁদে পড়তে হচ্ছে
    মৃত্যু কেবলই কেবলই প্রতারণা করছে আমার সঙ্গে
    চারটে বাঘ আর তিনটে বুনো শুয়োরের
    ধ্বস্তাধস্তি চলছে আবছা জ্যোৎস্নায়
    আমার মিথ্যে জিভ থেকেই সত্যের চ্যালেঞ্জ ফঁড়ে
    ঝলসা দিচ্ছে মানু-বাচ্চাদের
    তাদের কান্না শুনে বধির হয়ে যাচ্ছে আমার কান
    আনন্দে সাততলা অব্দি লাফিয়ে উঠছে আমার জিভ
    প্রেমিকার কষ্ট দেখে আনন্দে কঁদে উঠেছিলাম আমি
    চুমু খেতে গিয়ে আলজিভ শুকিয়ে আসছে আমার
    চারিদিকের ভিজে স্যাঁতসেতে অন্ধকার থেকে
    আমি দানব না যিশুকৃষ্ট বুঝতে না পেরে
    রেস্তঁরায় ভিড় করছে মেয়েমানুষেরা
    আজ আর কোনো রাস্তা খঁজে পাচ্ছে না কেউ সরলভাবে হাঁটবার
    সব রাস্তাই লুটিয়ে থাকে
    সব পাপোষের তলায় গড়িয়ে যায় ধুলোর ঝড়
    সব জীবনের মথ্যেই ভয়ংকর কাঁপানো অর্থহীনতা শূন্যতা
    আঃ মৃত্যু বাঞ্চোৎ মৃত্যু
    অপমৃত্যুও ফেরার হয়ে পালাচ্ছে আমার ভয়া
    কেননা আমি বুঝে গেছি মৃত্যুর দমবন্ধ ভান
    কেননা আমি মৃত্যুর কাছে গিয়েছিলাম সরল চোখে
    ভয়ে কঁচকে গিয়েছিল তার চোখ
    অন্ধ চোখে কঁদে উঠেছিল মাথা নিচূ করে
    এবং খালি হাতে নির্জন রোদে ফিরতে হল আমাকে জটিল চোখে
    নিজেকে নিজের থেকেও লুকিয়ে রাখতে পারছি না আর
    আমার নপুংসকতা দেখে তুমি হেসে উঠেছিলে-আমার ভালবাসা
    ভয় আর ভালবাসার মধ্যে শুয়ে তুমি ফিরে গেলে ভয়ের কাছে
    বঁচার তাগিদে তুমি ফিরে এলে মগজের কাছ-বরাবর
    ফালতু মগজের জ্যামিতিক অঙ্ক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমি বিশৃঙ্খলায়
    সভ্যকে ঘৃণা করেও লুকিয়ে রইলে সভ্যতার কলকব্জায়
    বদহজম থেকে তৈরি হল আমার বদরাগ
    সমাজের ভুল চেতনা থেকে নিজেকে ঝুলিয়ে দিলাম শূন্যের বেতারে
    টেলিফোনের মধ্যে দিয়ে রোজ তিন কোটি চুমু
    এপার-ওপার করছে পৃথিবীময়
    রেলের মোটা তার বেয়ে উড়ে যাচ্ছে ৭৪ কোটি মাছি
    আমার শরীরের চারিদিকে অসংখ্য 'টোপ'
    নিজেকে ঝাঁঝরা করে জীবনের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে
    খেলতে চাইলাম চাতুরী
    তোমার প্রতারণা থেকে ভালবাসা আলাদা করতে পারছি না একদম
    আমি ভাবছি আমাদের প্রথম অভিসম্পাতের কথা
    আমি ভাবছি আমাদের শেষ চুম্বনের কথা
    আমার দিব্যজ্যোতি আমার আম্ধকার
    আমার চারধারে বেইজ্জতি আর বেলেল্লাপনা বারবার
    চলছে মানুষের
    আমি বুঝতে পারছি মানুষ মানুষকে ভালবাসতে পারছে না
    ....মানুষ মানুষকে কোনোদিনই ভালবাসেনি
    উঁচু বাড়ির মাথা থেকে লাফিয়ে পড়ছে হৃদয়সুদ্ধ লাশ
    আমি দেখতে পাচ্ছি প্রয়োজন কিরকম মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে আকাশের দিকে
    আমার ধর্ম কি মনে করতে পারছি না কোনোদিন বুঝিনি বলে
    আমার শিরা থেকে রক্ত ছিনিয়ে নেবে বলে
    স্হায়ী-অস্হায়ী যুদ্ধ চলছে মানুষের আগুপিছু
    পাঁজর গুঁড়ো করে বেরিয়ে আসছে রজনীগন্ধার ডানা
    অ্যালকহলিক রক্তের ফেনা থেকে তৈরি হচ্ছে আঁশটৈ ক্ষুরধার ভালবাসা
    আমি ক্রমশ প্রেম থেকে শরীরহীনতায় ভাসছি
    প্রেমিকার বেগুনি মুখ জ্বলে উঠছে ফঁসে যাচ্ছে প্রয়োজনমত
    অদরকারি কাগজপত্রে ঢেলে দিচ্ছি আমার বর্তমান
    কবিতা আমার বুক থেকে শুষে নিচ্ছে আমার আয়ু
    আমার ভালবাসা রক্তমাংস থেকে মানুষ তৈরি করছে তাদের ফিচলেমি
    অসুস্হ ভালবাসা ফিরিয়ে আনবার জন্য
    মনুষ্যযন্ত্রের সঙ্গে হায় তুমিও
    আমার সকল উত্তাপ জযো করে তৈরি করলাম লালগোলাপের পালক
    ব্যবসায়িক উৎপাদন থেকে কুড়িয়ে নিলে তুমি একমুঠো প্রতারণা
    আগুনের হল্কা চুঁড়ে দিলে আমার গায়ে
    শিশুর মত হেসে উঠলাম আমি
    পুড়ে গেল আমার সমস্ত শরীর
    আকাশ ঘঁষে ছুটে গেল আমার ক্রোধ
    স্বাধীনতার হাতে হাত রাখতে পারছে না কেউ ভয়ে
    ওঃ
    আমার আর সবার মাঝখানে গজিয়ে উঠছে একটা সুদীর্ঘ গভীর ফাটল
    আমি বুঝতে পারছি আমার দ্বারা কিছুই হবে না
    নিজেকেও তেমন করে ভালবাসা হল না আমার
    এই এক জন্মেই হাঁপিয়ে উঠছি আমি
    এক সঙ্গেই হাসছি আর হাসছি না
    ওঃ ক্লান্তি ক্লান্তি - অক্লান্ত আওয়াজ - আঁকাবাঁকা টানেল -
    লুপ - পরিসংখ্যান - ক্ষুধা - মহব্বৎ - ঘৃণা -
    কেবল বোঝা বয়েই জীবন চলে যায় ১০১% লোকের
    আত্মাকে খঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সমস্ত শরীর ছেঁকেও
    বিপ্লবউত্তেজনানারীসংঘর্ষহিংস্রতাবন্যনীরবতা নাচছে
    আমি একবারও নিজের দিকে তাকাতে পারছি না ফিরে
    মানুষের কোনো কাজই করে উঠতে পারলাম না আজ ওব্দি
    ফালতু অব্যবহার্য হয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছি বমিওঠা চোখে
    মগজে চোলাই কারবার চলছে গুপ্ত ক্ষমতার
    কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা ওরফে আমার ভালবাসা আমার অসহায়তা
    মানুষের রক্তাক্ত পেঁজা শরীরের পাহাড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে
    অক্ষম আর আঊর্ব স্বাধীনতা
    মানুষের ক্ষীণ শরীর বেয়ে শরীর ঘিরে শরীর ধরে চলেছে
    অসংখ্য বিশৃঙ্খল শৃঙ্খলা
    ওঃ আমি কোনো দিনই ভালবাসতে চাইনি
    আঃ .................................. আঃ
    কলজে গঁড়িয়ে যায় চাপা হিংস্রতায়
    বুকের ভেতর ইনজিনের চাপা ক্রোধ
    রক্তের উত্তেজনে থেকে তৈরি হচ্ছে বন্যতা
    অস্তিত্বহীন আত্মার পায়ে স্বেচ্ছায় প্রণাম রেখেছিল সুবো
    তিন মাস জঘন্য নীরবতার পর আঁৎকে উঠে কুঁকড়ে গিয়েছিল প্রদীপ
    মানুষের সাহসিকতাকে ভুল করে সন্দেহ করতে শিখেছি
    ভুল জেনে ভুল মানুষের সঙ্গে মিশে
    আমি চালাক হতে ভুলে যাচ্ছি স্বেচ্ছায়
    ভাঁটার সঙ্গে সঙ্গে চতুরতা মূর্খতাও গড়িয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে
    ত্রিদিবের মুখ ত্রিদিব নিজেই কতদিন চিনতে পারেনি
    আদপে সত্য কোনো স্পষ্ট মুখ খঁজে পাচ্ছি না নিজের
    "মানুষের নিজস্ব কোনো চরিত্র নেই" বলতে ককিয়ে উঠেছিল
    ৩৫২ কোটি মানুষ তায় ঐতিহ্য আর পোষা চরিত্রহীনতা
    ওঃ অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে এখন
    কে বা কারা গলা টিপে ধরছে ভুল করে
    আমার।
    তাদের অজান্তেই…

    শান্তিনিকেতনে থাকাকালে ‘স্বকাল’ নামে একটা পত্রিকা সম্পাদনা আরম্ভ করেছিল প্রদীপ চৌধুরী। বিদ্যাভবনের ছাত্রী ঈশিতা ঠাকুরের প্রতি ইনফ্যাচুয়েশানে আক্রান্ত প্রদীপ নিজের কবিতায় যুবতীটির নাম উল্লেখ করে; মেয়েটির তা পছন্দ হয়নি এবং বিদ্যাভবন কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করে। তাঁরা প্রদীপকে সতর্ক করে দ্যান কিন্তু ইনফ্যাচুয়েশানে আক্রান্ত প্রদীপের পক্ষে মেয়েটিকে ভোলা সম্ভব হচ্ছিল না। মেয়েটিকে আবার উল্লেখ করে নিজের কবিতায়। এখনকার মেয়েরা হয়তো দলবেঁধে যুবকটিকে গোটাকতক চড় মেরে বা হুমকি দিয়ে ছেড়ে দিত, কিন্তু এই ঘটনা পঞ্চাশ বছরের আগেকার তরুণীদের নিয়ে। সেই বিতর্কিত কবিতাগুলো প্রদীপ আমাকে পড়ায়নি; ওই সংখ্যায় আমার কবিতা বা গদ্য ছিল না।
    বিদ্যাভবন কর্তৃপক্ষ প্রদীপ চৌধুরীকে রাস্টিকেট করে দিলেন। প্রদীপকে বলা যায় হাংরি আন্দোলনের প্রথম ক্যাজুয়ালটি। বিহিষ্কারপত্রটা তুলে দিচ্ছি এখানে :

    নং. আই.ডি.পি/VII-১০/৬৩-১০
    তারিখ ১৮ জুলাই ১৯৬৩

    শ্রীপ্রদীপ চৌধুরী
    আপনাকে সতর্ক করে দেওয়া সত্তেও এই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ থেকে আপনি বিরত হননি। কর্তৃপক্ষের নির্ণয় অনুযায়ী এই পরিসরে ছাত্র হিসাবে আপনার উপস্হতি কোনোমতেই কাম্য নয়। অতএব আজ দ্বিপ্রহরের পূর্বেই আপনাকে ছাত্রাবাস ত্যাগ করার আদেশ দেওয়া হচ্ছে এবং জানানো হচ্ছে যে যতো সত্বর সম্ভব আপনি আপনার ট্রান্সফার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে নিন ও সমস্ত বকেয়া চুকিয়ে দিন।

    কালিদাস ভট্টাচার্য পি.সি দাশগুপ্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত
    অধ্যক্ষ বিদ্যাভবন প্রোকটর বিভাগীয় প্রধান
    শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী ইংরেজি

    প্রদীপ চৌধুরীর কবিতা ‘রক্তের ভেতর ঢুকে পড়ছে কালো হাত’ তুলে দিচ্ছি এখানে

    রক্তের ভেতর ঢুকে পড়ছে কালো হাত।
    ‘কিছু দাও’ শরীরময় প্রতিধ্বনিত চীৎকার।
    আমি এই লোভীকে কিছু দিতে পারি না।
    আমার গোপনীয়তা শেষ।
    আমার ভালবাসা ক্রীয়াশীল নয়।
    আমি শিরার ভেতর কার চাপা হাসি শুনি।
    সে-ও আমি।

    রাস্টিকেট হবার পর প্রদীপ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। যাদবপুরে পড়াকালীন প্রদীপের ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। এরপর তিনি হায়দরাবাদে ‘Central Institute of English and Foreign Languages’ (বর্তমান নাম: English and Foreign Languages University) এ ফরাসি ভাষা শেখেন। ফরাসি ভাষার প্রতি ওনার এতই তীব্র আকর্ষণ জন্মায় যে পরবর্তীকালে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি প্রদীপ ফরাসি ভাষাতেও কবিতা লেখা শুরু করেন। কলেজ জীবনেই প্রদীপ আকৃষ্ট হন ফরাসি কবি আর্তুর র্যাঁবোর প্রতি। ফরাসি কবি লোত্রেয়ামোঁর লেখাও প্রদীপকে প্রভাবিত করে। পরবর্তীকালে তাকে হাংরি কবি হিসেবে টাইপকাস্ট করা হোক তা চাইতো না। ফুঃ পত্রিকাটা ফরাসি, ইংরেজি আর বাংলায় প্রকাশ করতো। ফ্রান্সে বহুবার গেছে কবিতাপাঠ আর বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে বক্তৃতা দেবার জন্য। করোনায় মারা যাবার পর গণচিতায় ওর শব দাহ করা হয়েছিল।

    ত্রিদিব মিত্রের নিকটবন্ধু ছিল সুবো আচার্য। পরে সুবো আচার্যর নৈকট্য গড়ে ওঠে প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে। আমার সঙ্গে সুবো আচার্য একবার দাদার বাসায় গিয়েছিল। দাদা তখন দুমকায় পোস্টেড। আমি আর সুবিমল বসাক বহুবার গেছি দুমকায়। শেয়ালদা থেকে রামপুরহাট। তারপর বাসে করে দুমকা।একবার ডেভিড গার্সিয়াকে নিয়ে গিয়েছিলুম। দোল খেলেছিলুম আমরা সবাই। সুবো আচার্য দেওঘরে গিয়ে অনুকুল ঠাকুরের শিষ্য হয়ে গেল। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, সুবো গিয়ে অনুকুল ঠাকুরকে বলেছিল, “আমাকে বাঁচান, আমি অধঃপতনের পথে চলে গেছি।” প্রদীপ চৌধুরী শুনে বললে, সেসব কিছু নয়, ওরা পারিবারিক স্তরে বামুন পুরুতের পরিবার। সুবো এখন বর্ধমানের অনুকুল ঠাকুরের আশ্রমের প্রধান। সাধু হয়ে যাবার আগে লেখা সুবো আচার্যর ‘রিক্ত’ শিরোনামের কবিতা তুলে দিচ্ছি:

    আমার যাত্রার আজ কেউ জেগে নেই, পাথুরে
    জমিতে সূর্য্য ঢলে পড়ে, ছিলো কি শৈশব?
    প্রত্যেকেই বড়ো দূর, মৃতপ্রায়, একা কিম্বা
    শূকর প্রচ্ছদের ভিতর ঢুকেছে
    চতুদিকে আসন্ন রাত্রির ছায়া, নক্ষত্রের ষড়যন্ত্র, চাঁদের ইশারা,
    মানুষও ফেলেছে দূরে তার নিজ বিভা, কবির প্রতিভা
    ভয় পেয়ে সত্যের গা-থেকে মাংস খুবলে নিতে গিয়ে হাত সরায়
    একশো দশ মাইল দূরে অপর যুবার নীচে তুমি শুয়ে হাসছো,
    হাসো, গাও কিম্বা আলজিভ দিয়ে শীৎকার দাও,
    তার সাথে পুনরাও শোও,
    আমাদের প্রেম নেই, ভয় নেই, ব্যথা নেই, দুঃখ কষ্ট নেই,
    লিঙ্গ তীব্র রেখেও বুঝতে পারি একদিন, এ-জীবন ছিলো
    কি রকম আশ্চর্য্য সরল; ছিলো নাকি ? একদিন প্রেম ছিলো ?
    ভালোবাসা ছিলো ? সেরকম নারী ছিলো ?
    ভাবতেই চাঁদ ও নক্ষত্র কেউ চুরি করে নিয়ে যায় যেন
    আমার চারিদিকে জেগে থাকে মাতৃ গর্ভের মতো মৌলি অন্ধকার-
    পৃথিবীতে আর একবার জন্মের জন্য আমি রিক্ত হই।

    ফালগুনী রায় আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল সুবিমল বসাকের ডাকে। ‘জেব্রা’ প্রথম সংখ্যা আর হাংরি লিফলেটগুলো ফালগুনীকে টেনে এনেছিল সুবিমলের কাছে। ফালগুনীকে নিয়ে শেয়ালদা স্টেশানে বসে অনেকক্ষণ গল্প করেছিল সুবিমল।ফালগুনী সদ্য পাঠ-সমাপ্ত কবিতার গোছা থেকে একটি কবিতা দেয়। ‘জেব্রা’ দ্বিতীয় সংখ্যার প্রস্তুতি চলছিল, তাতে ওই কবিতা ছাপা হয়। পরে বাসুদেব দাশগুপ্ত ওর এক ফর্মার কবিতার বই ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিসন’ প্রকাশ করেছিল। ফালগুনীর মৃত্যুর পর সুবিমলের কাছে যে কবিতাগুলো ছিল সেগুলো নিয়ে ‘ফাল্গুনী রায়সমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে দুই বাংলায়, বেশ কয়েকবার। ওর সব কবিতাই বিখ্যাত। ওর ‘এইখানে’ কবিতাটা তুলে দিচ্ছি :

    এইখানে সমুদ্র ঢুকে যায় নদীতে নক্ষত্র মেশে রৌদ্রে
    এইখানে ট্রামের ঘন্ টিতে বাজে চলা ও থামার নির্দেশ
    এইখানে দাঁড়িয়ে চার্মিনার ঠোঁটে আমি রক্তের হিম ও উষ্ণতা
    ছুঁয়ে উঠে আসা কবিতার রহস্যময় পদধ্বনি শুনি— শুনি
    কবিতার পাশে আত্মার খিস্তি ও চিৎকার এইখানে
    অস্পষ্ট কু-আশার চাঁদ এইখানে ঝরে পড়ে গণিকার ঋতুস্রাবে
    এইখানে ৩২৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের কোন গ্রীকবীর রমণ ও ধর্ষণের
    সাধ ভুলে ইতিহাসে গেঁথে দ্যায় শৌর্য ও বীর্য এইখানে
    বিষ্ণুপ্রিয়ার শরীরের নরম স্বাদ ভুলে একটি মানবী থেকে মানবজাতির দিকে
    চলে যায় চৈতন্যের ঊর্ধবাহু প্রেম—সর্বোপরি
    ইতিহাস ধর্মচেতনার ওপর জেগে থাকে মানুষের উত্থিত পুরুষাঙ্গ এইখানে
    এইখানে কবর থেকে উঠে আসা অতৃপ্ত প্রেমিকের কামগন্ধ
    কয়েকলক্ষ উপহাসের মুখোমুখি বেড়ে ওঠে আমার উচ্চাশা এইখানে
    প্রকৃত প্রশ্নিল চোখে চোখ পড়লে কুঁকড়ে যায় আমার হৃদপিণ্ড এইখানে
    এইখানে সশ্রদ্ধ দৃষ্টির আড়ালে যাবার জন্য পা বাড়াতে হয়
    আমি নারী মুখ দ্যাখার ইচ্ছায় মাইলের পর মাইল হেঁটে দেখি শুধু মাগীদের ভিড়
    সাতাশ বছর –-একা একা সাতাশ বছর বেক্তিগত বিছানায় শুয়ে দেখি
    মেধাহীন ভবিষ্যৎ জরাগ্রস্ত স্নায়ুমণ্ডলীর পাশে কবিদের কবির কবিতা
    চারিধারে ঢিবি দেওয়ালের নিরেট নিঃশক্ত অন্ধকার।

    ফালগুনীর দিদি থাকতেন পাটনায় যেখানে ওর প্রেমিকার বিয়ে হয়েছিল। আমরা দুজনে নানা জায়গায় গিয়ে গাঁজার বরফি, শরবত খেতুম বা পাতা ফুঁকতুম। তখন সরকারি দোকানে এগুলো পাওয়া যেতো।

    বেনারসের দুজন শিল্পী-লেখক আমার সূত্রে হাংরিতে যোগ দিয়েছিল। অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায়। করুণা একটা দারুন গদ্য দিয়েছিল বুলেটিনে, ‘জন্মমৃত্যু সম্পর্কে’ শিরোনামে:

    “আজ ভোর ৬.৪৫ মি. আমার একমাত্র ছেলে আরক মারা গেলো। ব্রংকোনিমোনিয়া। আমি ওকে একা নিয়ে চলে গেলাম নদীর ওপারে বালিয়াড়িতে। বসে বসে অনেক কিছু ভাবলাম। তারপর ওর গায়ের সঙ্গে ভারি পাথর বেঁধে মাঝগঙ্গায় ফেলে দিলাম। পাথর খুঁজতে প্রায় দুঘণ্টা লেগে গেলো।বাড়ি ফিরে এসেছি। আমার বৌ ভীষণ কাঁদছে। মানুষের সেন্টিমেন্ট নষ্ট করার মতো আমার কাছে কিছুই নেই। আজ দুপুরে অফুরন্ত সময় ছিল। আমার জন্ম কাশীতে। বাবা তখন আই এন এতে নেতাজির গ্রুপে। তারপর পঁচিশ বচর যখন, বাবা আমায় নিয়ে যান রেংগুনে। আই এন এ ছেড়ে দিয়ে বাবা পুলিশে চাকরি নেন। রেংগুনে একনাগাড় প্রায় ১০ বছর। তারপর সাইরেন, ব্ল্যাকআউট, সংবাদপত্রের হেডলাইন, হাসপাতাল। জাহাজে চেপে বর্মা থেকে সোজা খিদিরপুর। খিদিরপুর থেকে আবার কাশী। জানতে পারলাম বাবা কোনো বার্মিজ মেয়েকে বিয়ে করেছেন। সেই থেকে সমাজের বিরুদ্ধে, সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, নিজের বিরুদ্ধে লড়াই। লেখাপড়া হলো না। ক্লাস টেনে পৌঁছে বাবার বাবার টাকা বন্ধ হয়ে গেল। তখন থেকেই আমি নেমে গেলাম। হেল্প ! হেল্প !! হেল্প !!!
    ছোটোবেলায় আঁকার ঝোঁক ছিল। ক্লাসে ফার্স্ট বয় ছিলাম। ছবি আঁকতে গিয়ে সব তালগোল পাকিয়ে গেল। কাশীতে একটা ঘর ভাড়া করে নিজের স্টুডিও করলাম। ছবি দেখে লোকে পাগল বলতে লাগল। বাড়ির লোকে মা বোন সকলেই পাগল বলে বাড়ি থেকে বের করে দিলো। আমি বাড়ির বড়ো ছেলে। ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে একজন কায়স্হ মেয়েকে বিয়ে করলাম। অব্রাহ্মণ বলে বাড়িতে ঢুকতে পাই না।
    কেই নেই। কেউ নেই।’’

    শম্ভু রক্ষিত ‘ব্লুজ’ নামে একটা হাংরি পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করে হাওড়া থেকে। শম্ভু তখনকার লেটারপ্রেসে গিয়ে নিজেই কমপোজ করতো। হাংরির “জেব্রা” পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলুম, তার দ্বিতীয় সংখ্যায় শম্ভুর যে কবিতাটা প্রকাশিত হয়েছিল তার শিরোনাম ছিল “আমি স্বেচ্ছাচারী”, তাতে শম্ভু বলছে যে ও রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছেনি-শাবল চায়, আর হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে বাঘের মতন লাফিয়ে পড়বে --- শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের “আমি স্বেচ্ছাচারী” কবিতার অনেকদিন আগেই লিখেছিল শম্ভু। কবিতাটা এখানে দিলুম, লক্ষনীয় যে সেই সময়ের একরৈখিক কবিতার অনুশাসনকে শম্ভু ষাটের দশকে শুরুতেই অস্বীকার করেছিল :

    আমি স্বেচ্ছাচারী

    এইসব নারকেল পাতার চিরুনিরা, পেছন ফিরলে, এরাও ভয় দেখায়।
    কিছুই, এক মিনিট, কিছুই জানি না, সাম্যবাদী পার্লামেন্টে জনশ্রুতি সম্পর্কে বা।
    চণ্ডাল কুকুরদের আর্তনাদ আমাকে ঘিরে-- এবং আমাকে আলবৎ জানতে হবে, আলবৎ আমাকে
    ডুবতে দিতে হবে, যেতে দিতে হবে যেখানে যেতে চাই না, পায়চারি করতে দিতে হবে।
    আমার গলা পরিষ্কার -- আমি স্বেচ্ছাচারী - কাঁচের ফেনার মধ্যে চুল -- স্পষ্ট করে কথা বলতে দিতে হবে
    আর কথাবার্তায় তেমন যদি না জমাতে পারি সেরেফ
    পায়চারি করে ঘুরে বেড়াবো -- সমস্ত পৃথিবীর মেঘলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে।
    ক্রোধ ও কান্নার পর স্নান সেরে। ঘামের জল ধুয়ে -- শুদ্ধভাবে আমি সেলাম আলয়কুম জানিয়ে
    পায়চারি করে ঘুরে বেড়াবো ১ থেকে ২ থেকে ৩, ৪, ৫ গাছের পাতার মতো। রিরংসায়।
    মাটিতে অব্যর্থ ফাঁদ পেতে রেখে। রাস্তায়। ব্রিজের ফ্ল্যাটে। ট্রেনে,
    যে কোনো কিশোরীর দেহে। শেষ রাতে -- পৃথিবীর মানচিত্র এঁকে, কেবল স্হলভাগের
    হু হু করে জেটপ্লেনে আমি যেতে চাই যেখানে যাবো না, এর ভেতর দিয়ে
    ওর ভেতর দিয়ে -- আর। হুম। একধরনের ছেনি-শাবল আমার চাই--
    যা কিছুটা অন্যরকম, রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের নয় -- ঠিক
    খেলার মাঠে স্টার্টারের পিস্তলের মতো -- রেডি -- আমি বাঘের মতন লাফিয়ে পড়ব। খবরদার।

    ইন্দিরা গান্ধির চাপানো এমারজেন্সির সময়ে জেলে পোরা হয়েছিল শম্ভু রক্ষিতকে, ওর জেলের স্মৃতিকথা পড়িনি, জানি না লিখেছে কিনা। বিনয় মজুমদার পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে চলে গিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। সেখানে বিনয়কে তিন মাসের জন্য জেলে পোরা হয়েছিল। শম্ভু রক্ষিত আর জ্যোতির্ময় দত্ত আট মাস জেলে ছিল। স্পেশাল ব্রাঞ্চের যে পুলিশ অফিসার ওদের ওপর দৈহিক অত্যাচার করেছিল তার নাম তারাপদ। অক্ষয়কুমার রমনলাল দেশাই সম্পাদিত “ভায়োলেশান অফ ডেমোক্র্যাটিক রাইটস” এর তৃতীয় খণ্ডে লেখা হয়েছে যে ১৯৭৬ সালে পুলিশ শম্ভু রক্ষিত, জ্যোতির্ময় দত্ত আর প্রশান্ত বসুর ওপর হাজতে অকথ্য অত্যাচার করেছিল, তারপর বিনা বিচারে তাদের আটমাস আটক রাখা হয়েছিল। গ্রেপ্তার করার সময়ে তাদের বাসস্হানের সমস্ত জিনিস পুলিশবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে লণ্ডভণ্ড করেছিল। জ্যোতির্ময় দত্তের বাড়ি শম্ভু রক্ষিতের হাওড়ার ফ্ল্যাটের তুলনায় অভিজাত ছিল। জ্যোতির্ময় দত্তের মেয়ে সেই সময়ে পুলিশের আচরণের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা পড়ে শম্ভু রক্ষিতের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছিল, তার হদিশ মেলে, কেননা গরিবের ওপর অত্যাচার করে পুলিশ যারপরনাই উল্লসিত হয়। শম্ভু রক্ষিতের তখনকার পোশাক যেমন ছিল, পরেও তেমনই জীর্ণ ও মলিন, পায়ে রবারের চটি।

    আমার সঙ্গে শম্ভু রক্ষিতের আবার দেখা হলো কবি দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুটিয়ারির বাড়িতে, তখনও পুরোনো বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাটবাড়ি হয়নি। আমি হুইস্কির একটা বড়ো বোতল নিয়ে গিয়েছিলুম। আমার “অ” বইটা উৎসর্গ করেছিলুম দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়কে, সেটা দিতে গিয়েছিলুম, আর বইটা সেলিব্রেট করার জন্য হুইস্কি। কিছুক্ষণ পরে শম্ভু রক্ষিত এলো, দেবীপ্রসাদের কাছ থেকে কবিতা নেবার জন্য আর ওনাকে ‘মহাদিগন্ত’ দেবার জন্য, হাতে একগোছা প্রুফ-- দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার। কাঁচাপাকা কয়েক দিনের দাড়ি, মাথার সামনে দিকে টাক পড়ে গেছে, চোখের কোল বসে গেছে, হনু আর কন্ঠা ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, রোগাটে হয়ে গেছে। শম্ভু রক্ষিত চলে যাচ্ছিল, আমি বললুম, কিছুক্ষণ থাকো, মদের বোতলটা ঝোলা থেকে বের করলুম। শম্ভুর মুখে ঔজ্বল্য ফুটে উঠলো। গেলাসের পর গেলাস খেয়ে মাতাল হয়ে গেল শম্ভু। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন শম্ভুকে টালিগঞ্জ মেট্রোয় পৌঁছে দিতে। ভূমেন্দ্র গুহ, আমার দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাকের পর যিনি আমার চিকিৎসা করেছিলেন, তিনি গিয়েছিলেন হলদিয়ার সুতাহাটার প্রত্যন্ত গ্রাম বিরিঞ্চিবেড়িয়ায় শম্ভুর বাড়িতে, বেশ খানিকটা হাঁটা পথ। বলেছিলেন যে ঢুকেই দেখা যায় দেয়ালে বড়ো-বড়ো করে লেখা রয়েছে মহাপৃথিবী। ভাঙাচোরা চালা। নিজেই কোদাল চালিয়ে চাষবাস করে। ওর একমাত্র টেবিল ফ্যানটা চোরে তুলে নিয়ে চলে গেছে। শম্ভুর শরীর অত্যন্ত খারাপ আর রোগ সারাবার টাকাকড়ি না থাকায় ভূমেন্দ্র গুহর উদ্যোগে কলকাতার একচল্লিশজন খ্যাতনামা পেইনটাররা, পরিতোষ সেন, যোগেন চৌধুরী, রবিন মন্ডল, তপন মিত্র আর বুদ্ধিজীবি কালীকৃষ্ণ গুহ, সন্দীপ রায় প্রমুখ শম্ভু রক্ষিতের সাহায্যার্থে একটি প্রদর্শনী করেছিলেন, আর পেইনটিং বিক্রির টাকা শম্ভুকে দেয়া হয়েছিল। সে যাত্রা শম্ভু সেরে ওঠেন। শম্ভুর কবিতা ইংরেজি ও হিন্দিতে অনুদিত হয়েছে। আসলে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সামন্তবাদী ভুলভুলাইয়ার বাইরে সম্পূর্ণ বেপরোয়া না হলে নিজের যা ইচ্ছে লেখা যায় না, যা আমরা দেখেছি উইলিয়াম ব্লেক, আর্তুর র‌্যাঁবো, মালার্মের প্রথাবহির্ভূত কবিতার ক্ষেত্রে। শম্ভুর কবিতা পড়ে টের পাওয়া যায় যে ও কারোর তোয়াক্কা করে না, যেমন ইচ্ছে হয় তেমনভাবেই লেখে। আমি প্রতিষ্ঠান শব্দটা প্রয়োগ করলুম না। প্রতিষ্ঠান ভাবকল্পটা এমন ঘেঁটে গেছে যে বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতির সামন্তবাদী ক্ষমতার পীঠস্হানগুলোর কুকর্ম চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যায়।

    যাঁরা আমাদের সংবিধান লিখেছিলেন তাঁরা কেউই অনুমান করতে পারেননি যে উত্তর-ঔপনিবেশিক সামন্তবাদ ওই সংবিধানেই ঘুমিয়ে আছে, আর সময়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। ক্ষমতাবানদের জুতো সাফ করবে বা জুতোর ফিতে বেঁধে দেবে আমলারা, সরকারি চাকুরেকে চটিপেটা করে ফলাও করে সেকথা বলে বেড়াবেন সাংসদ। হাজার-হাজার গরিবের টাকা মেরে লোপাট করে দেয়া হবে, আর জেলফেরত রাজনৈতিক আসামীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে, জেল থেকে বেরিয়ে দু-আঙুল তুলে ভিক্টরি সাইন দেখাবে, বুড়ো-বুড়িরা তাঁদের থেকে কম বয়সী নেতা-নেত্রীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবেন। উত্তর-ঔপনিবেশিক সামন্তবাদের পচাইতে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি যে ভাবে পচেছে, দিকে-দিকে গজিয়ে উঠেছে গ্যাঙলর্ডরা আর তাদের জিহুজুরিরা।

    তিন : মনোমালিন্যের শুরু

    ‘এই সময়’ পত্রিকার আগস্ট ২০১৫ সংখ্যায় বৈজয়ন্ত চক্রবর্তী হাংরিদের মনোমালিন্য নিয়ে এই আহ্লাদের গদ্যটা লিখেছিলেন : “২রা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, সকাল ৭.৩০ মিনিট৷ সুভাষ এবং আমি সবে ঘুম থেকে উঠেছি, বাইরে গিয়ে চা খাব, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল৷ দরজা-খোলা মাত্র ঘরের মধ্যে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ৮/১০ জন লোক৷ মেঝের বিছানায় জুতা সহ দাঁড়িয়ে গেল ওরা৷ টেনে হিঁচড়ে ফেলতে লাগল জিনিসপত্র, বইপত্র৷ হাতে সার্চ ওয়ারেন্ট ধরিয়ে বলল, তারা লালবাজার থেকে আসছে’’ - হাংরি জেনারেশন আন্দোলন, শৈলেশ্বর ঘোষ গ্রেফতার হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ এবং সুভাষ ঘোষ৷ পরে দেবী রায়, মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী ও প্রদীপ চৌধুরী৷ অভিযোগ? সাহিত্য অকাদেমী প্রকাশিত ‘হাংরি জেনারেশনের স্রষ্টাদের ক্ষুধার্ত সংকলন’-এর ভূমিকায় শৈলেশ্বর ঘোষ জানাচ্ছেন- ‘অশ্লীল সাহিত্য রচনা এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’৷ স্বাধীনতার পর বাংলা সাহিত্যে যৌনতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ন্যাকামির এটিই কি প্রথম বহিঃপ্রকাশ? অতঃপর জীবন গিয়াছে চলে একান্ন বছরের পার৷ রাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের স্বভাবজাত উজবুকপনা থেকেই থাকে৷ কিন্তু স্বাধীন দেশের সতেরো বছর বয়স হতেই কবিতা নিয়ে এহেন রাষ্ট্রীয় শিরঃপীড়া এবং গোদা টাইপের দাদাগিরি আমাদের মতো আজকালকার ছোঁড়াদের চোখে যদি কিঞ্চিত্‍ অলীক ঠেকে, সেই গুস্তাকিটুকু নির্ঘাত্‍ মাফ করে দেবেন এই কুনাট্যের দুর্ভাগা কুশীলবগণ৷ বলছি না যে রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু এখন স্তিমিত৷ বরং খবরদারি বেড়েই চলেছে৷ প্রতি মূহুর্তে৷ কিন্তু মনে হয় না এখন আর ‘তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি পুণ্য বিছানায়’ (ঘোড়ার সঙ্গে ভৌতিক কথাবার্তা, শৈলেশ্বর ঘোষ) বা ‘আমাকে তোমার গর্ভে আমারি শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও’ (প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার, মলয় রায়চৌধুরী) লেখার জন্য কাউকে কাঠগড়ায় উঠতে হবে৷ যাঁরা ক-অক্ষরে কাম (এবং অবশ্যই গোমাংস) খুঁজে পান, তাঁদের সাম্প্রতিক বাড়বাড়ন্ত সত্ত্বেও সরকারি গা-জোয়ারির পরিসরটি আপাতত অন্য রকম৷ অশ্লীলতা নয়, ‘ভাবাবেগ’ নিয়েই ইদানীং যতেক পাঁয়তাড়া৷ আর বাংলায় কেউ কিসু পড়লে তো মাথাব্যথা! অতএব, হাংরি জেনারেশন আন্দোলন এবং তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক মাতব্বরি ও পুলিশি চোখরাঙানি একটি বিশেষ সময়ের ফসল৷ যার আদলটি ঠাহর করতে হলে ইতিহাসের দ্বারস্থ হওয়া আবশ্যিক৷ কম্মোটি যদিও নেহাত্‍ই সহজ নয়৷ হাংরি আন্দোলনকারীরা পরবর্তী সময়ে যে ইতিহাস লিখেছেন, সেগুলি উত্‍সাহী অথচ নিরপেক্ষ পাঠকের জন্য অসহনীয় রকমের কোন্দলাকীর্ণ এবং লেঙ্গিলাঞ্ছিত৷ মলয় রায়চৌধুরী ও সম্প্রদায় বনাম শৈলেশ্বর-বাসুদেব-সুবো-সুভাষ-প্রদীপ দ্বন্দ্বের আগ্রাসী শব্দবাণগুলির ভিড় থেকে সত্যটিকে খুঁজে বের করা দুরূহ৷ আন্দোলনের পিতৃত্বের দাবি নিয়ে তাঁদের অভিযোগ ও প্রতি-অভিযোগের অবিরত পালাগান বামপন্থীদের মতাদর্শগত কুঁদুলেপনাকেও লজ্জায় ফেলবে৷ তবুও অপাঠবিদ্ধ পাঠকের খাতিরে একটি সংক্ষিপ্ত আখ্যান পেশ করা জরুরি৷ শৈলেশ্বর ঘোষ জানিয়েছেন হাংরি জেনারেশন শব্দটির সূত্রপাত করেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়৷ ১৯৬২ সালে ‘সম্প্রতি’ নামের একটি পত্রিকায় বিনয় মজুমদারের কবিতার সমালোচনায় শক্তি লেখেন- ‘বিদেশে সাহিত্য কেন্দ্রে যে সব আন্দোলন বর্তমানে হচ্ছে, কোনটি বীট জেনারেশন কোনটি এ্যাংরী বা সোবিয়েত রাশিয়াতেও সমপর্যায়ী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বাংলা দেশেও কোন অনুক্ত বা অপরিষ্কার আন্দোলন ঘটে গিয়ে থাকে তবে তা আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক বা সামাজিক পরিবেশে ক্ষুধা সংক্রান্ত আন্দোলন হওয়াই সম্ভব’৷ আন্দোলনের সঙ্গে শক্তির সম্পর্কের এটিই শুরু এবং এটিই প্রায় শেষ৷ এক-দু’বছরের মধ্যেই উভয় পক্ষের সম্পর্ক দাঁড়াবে আদায়-কাঁচকলায়৷ হাংরি আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্ব যাঁরা, তাঁরা ইতিমধ্যেই একক ভাবে লেখালেখি করছিলেন৷ ‘উপদ্রুত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বাসুদেব দাশগুন্তের ‘রন্ধনশালা’, যেটি সন্দেহাতীত ভাবে বিশ শতকের সেরা বাংলা ছোট গল্পগুলির মধ্যে অন্যতম৷ ‘এষণা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতা ‘ঘোড়ার সঙ্গে ভৌতিক কথাবার্তা’৷ কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় মলয় রায়চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ ‘শয়তানের মুখ’৷ মূলত বিচ্ছিন্ন ইশতেহার এবং বুলেটিনের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল এই সমান্তরাল ধারার লেখালেখি৷ এগুলি সংবদ্ধ করা হয় ১৯৬৪ সালে৷ প্রকাশিত হয় হাংরি জেনারেশন সঙ্কলন৷ লেখকগণ- সুবো আচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুন্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, উত্পলকুমার বসু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায়চৌধুরী ও সুভাষ ঘোষ৷ লেখা ছিল, এটি ‘মাতৃহারা মাতৃতান্ত্রিক মাতৃহন্তারক কবিদের কবিতা সংকলন’৷ অতঃপর পুলিশি হানা এবং কাঠগড়ায় লেখককুল৷ ঘটনাটির অভিঘাত ছিল ব্যাপক এবং আন্তর্জাতিক৷ মার্কিন মুলুক থেকে উড়ে আসেন ‘টাইম’ পত্রিকার সাংবাদিক লুই কার৷ প্রতিবেদনে লেখা হয়:

    ‘Last week, in a land that has become so straitly laced that its movie heroines must burst into song rather than be kissed, five scruffy young poets were hauled into Calcutta’s Bankshall Court for publishing works that would have melted even Vatsyayana’s pen. The Hungry Generation had arrived.’

    বঙ্গীয় প্রতিক্রিয়াগুলিও কৌতূহলোদ্দীপক|

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় - ‘সাহিত্যের নামে এরা নোংরামি করছে’৷
    জ্যোতির্ময় দত্ত - ‘ভাবতে দুঃখ হয় যে, ফরাসি দেশে যা একশ তিরিশ বছর আগে ঘটে গেছে তা এখন আমাদের দেশে বৈপ্লবিক বিবেচিত হয়৷’
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় - ‘এমন এক দলের আবির্ভাব হয়েছে যারা নিজেদের নাম দিয়েছেন ক্ষুত্কাতর সম্প্রদায়৷ এঁদের লেখার কোন দৃষ্টান্ত দেয়া আমার পক্ষে সাধ্যাতীত৷’
    সন্তোষকুমার ঘোষ - ‘ক্ষুধিত (কী না পেয়ে জানিনে) লেখক যা লিখতে চেয়ে পারছেন না, খালি আগাছার চাষ বাড়াচ্ছেন, বয়স্ক সমরেশ যেন তাঁদের দেখিয়ে দিতেই ‘বিবর’ লিখলেন৷’

    পরবর্তী সময়ে এই গোষ্ঠীতে যোগ দেন অরুণেশ ঘোষ, সমীরন ঘোষ, অবনী ধর ইত্যাদি এবং অবশ্যই ফালগুনি রায়৷ অন্য দিকে অমিতাভ দাশগুন্ত, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, দেবেশ রায় প্রমুখ অ-ক্ষুধার্ত লেখক নিছক নিন্দাবাদের পরিবর্তে প্রয়াসী হন হাংরি লেখকদের সাহিত্যকাণ্ডের বস্তুনিষ্ট মূল্যায়নে৷ সর্বোপরি, এই আন্দোলনই শঙ্খ ঘোষকে প্রণোদিত করে একটি কিংবদন্তি নিবন্ধ রচনায়- ‘শব্দ আর সত্য’৷

    ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকায় শঙ্খ ঘোষ একটি সাক্ষাত্‍কারে নাকচ করেন অশ্লীলতার অভিযোগটি৷ অরুণেশ ঘোষকে বলেন -
    ‘সত্যিকারের পাঠকের কাছে এই ‘অশ্লীলতা’ কথাটির কোনও মানে হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না৷ আপাত-শ্লীলতার মধ্যে দিয়েও বহু লেখা ব্যর্থ হয়, আপাত-অশ্লীলতার মধ্য দিয়েও বহু লেখা উত্তীর্ণ হয়৷ প্রশ্ন এই ব্যর্থতা আর উত্তীর্ণতার, শ্লীলতা-অশ্লীলতার নয়৷’
    কিন্তু শঙ্খ ঘোষও লক্ষ করেন হাংরি ‘চেতনায় নৈরাজ্যবাদের একটা লালন’৷

    দেবেশ রায়ও নকশালবাদী নৈরাজ্যপন্থার সঙ্গে হাংরি ভাবনার সরাসরি তুলনা করেন৷ যে প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করেন প্রদীপ চৌধুরী তাঁর ‘শব্দ ও গোপন সত্য (অথবা কলিংবেল যাদের আতঙ্কিত করে)’ নিবন্ধে - ‘সন্দেহ নেই, সমাজ ও সভ্যতার বিষাক্ত সাইরেন আমাদের হাড়ও কাঁপিয়ে তোলে… কিন্তু আপনি কী করে ভুলে গেলেন এরই সঙ্গে মাখামাখি আমাদের ব্যক্তিগত সম ও অসমকামী নানা ধরনের ভিশান, গতব্যক্তি ঐশী জীবনের বিষণ্ণতা, আনন্দ ও সন্ত্রাস-স্বপ্ন৷ এটাকে কোনো একমুখী রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে একই কম্পার্টমেন্টে আপনি কিছুতেই ঢোকাতে পারেন না৷’

    শুধু লেখাই নয়, হাংরি কবি-গল্পকারদের দৈনন্দিন জীবনচর্যাও গতানুগতিক সামাজিকতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিল অবশ্যই৷ ভিখিরি ও বেশ্যাদের সঙ্গে যাপিত জীবন, বোহেমিয়ানার ট্র্যাডিশনাল পীঠস্থান শ্মশান-বেশ্যালয়-শুঁড়িখানায় নেশাতুর বিচরণ এবং খালাসিটোলায় জীবনানন্দ জন্মোত্‍সব পালনের মাধ্যমে তাঁরা মত্ত হস্তীবত্‍ বঙ্গের সুললিত পদ্মবনে আলোড়নও তুলেছিলেন৷ কিন্তু এটুকুই সব? তাঁরা তো রাষ্ট্রীয় ‘বিপ্লব চেয়ে দোষী’ ছিলেন না৷ ধূসরিমার অর্ধশত রূপ নিয়ে লাফালাফির যুগে বিতর্কটিকে সামান্য অলীক মনে হলে কি কিছু ভুল থেকে যাবে?

    একটু পড়াশুনা করলে একজন আলোচক জানতে পারবেন যে একটা আন্দোলনে প্রচুর যুবক সমবেত হলে স্বাভাবিকভাবেই মতবিরোধ হয়। ডাডা, সুররিয়ালিস্ট, বিট, সিমবলিজম, প্রগতিশীল লেখক, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী, নিম সাহিত্য, ইতালির ভবিষ্যবাদ, ধ্বংসকালীন, নতুন কবিতা ইত্যাদি আন্দোলনেও মনোমালিন্য হয়েছে; সুররিয়ালিস্টরা তো প্যারিসের রাস্তায় হাতাহাতিও করেছে।

    হাংরিদের মধ্যেও পরস্পরের সঙ্গে মনোমালিন্য আরম্ভ হলো। হাংরি আন্দোলনের তৃতীয় বছরে, ১৯৬৩ সালে সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল দেবী রায়, “ইনি আমাদের আন্দোলনে যোগ দিতে চাইছেন, লেখা এনেছেন সঙ্গে, নিয়ে নেওয়া যাক”। সুভাষ ঘোষের ছোট্টো গদ্যটা নিয়ে নিলুম, সেটাই হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত সুভাষের প্রথম লেখা। আমি তখন অফিসের কাজে তিন মাসের জন্যে কলকাতায়, থাকি ডালহাউসি স্কোয়ারে অফিসের গেস্ট হাউসে, খাওয়া-থাকা অফিসেরই, ট্র্যাভেলিং অ্যালাউন্স যা পাই তা দিয়ে হাংরি বুলেটিন বের করার কোনো অসুবিধা নেই।গেলুম টালা ব্রিজের তলায় পাশের রাস্তায় সুভাষের ভাড়া-করা বাসায়, বলল, আরেকজনের সঙ্গে থাকে, তার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ, দুজনেই উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতায় এসেছে, পড়াশুনা আর চাকরি-বাকরির ধান্দায়। “এষণা” নামে একটা চটি পত্রিকা দিল সুভাষ, সম্পাদক সতীন্দ্র ভৌমিক, তাতে শৈলেশ্বের ঘোষের “ঘোড়ার সঙ্গে ভৌতিক কথাবার্তা” পড়ে বললুম, এটা ইংরেজিতে অনুবাদ করব। সুভাষ বলল, কালকে ও কফিহাউসে আসবে তোমায় লেখা দিতে, তখন পরিচয় হবে। পরের দিন শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে লেখা নিলুম। আমার অনুবাদ করা কবিতা আর যে কবিতা শৈলেশ্বর দিল, এই দুটিই কেবল হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল। আমি বাসুদেব দাশগুপ্ত আর সুভাষ ঘোষ দুজনেরই ফোটো নিয়ে কোলাঝ তৈরি করেছিলুম। সুভাষ বলেছিল, “তুমি পারশিয়ালিটি করছ, বাসুদেবের কোলাঝটা আমার হবার কথা ছিল, আমি কপালে বিকৃত শিশুর লিঙ্গ নিয়ে জন্মেছি।” বাসুদেবের কোলাঝটা বাসুদেব যত্ন করে রেখেছিল, সুভাষ ওর কোলাঝটা কি করল জানি না। দুটো কোলাঝের ব্লক পাটনাতেই করিয়েছিলুম; কলকাতা পুলিশ যখন পাটনায় আমাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল তখন ব্লকের দোকানে ঢুঁ মেরেছিল। ‘আর্তনাদ’ নামে যে পত্রিকা সুভাষরা প্রকাশ করেছিল তার ব্লকও আমার তৈরি করা।

    বাসুদেব দাশগুপ্ত সম্পর্কে সুবো আচার্য লিখলো, “বামপন্হী আদর্শ বেছে নেয়ার পর থেকে সে যা লিখেছে তাতে একজন স্টাইলিশ বামপন্হী মনে হয় এবং এও মনে হয় ঐ আদর্শ তাঁর মধ্যে খুব ভালোভাবে কেটে বসে যায়নি। আসলে অহং-এর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ঝোঁক, এক ধরণের নার্সিসাস কমপ্লেক্স তার মধ্যে কাজ করছে, এক ধরণের আত্মগর্বও তার মধ্যে দেখতে পাই।”
    হাংরিতে বন্ধুরা যোগ দেয়ায়, আর বিনয় মজুমদারের বই রিভিউ করতে গিয়ে হাংরির আওয়াজ তোলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও চটে গিয়েছিলেন। তাঁকে নিরস্ত করার জন্য দাদার এই চিঠি সুনীলকে:

    ২০/৫/১৯৬৩

    সুনীল,
    তোর দীর্ঘ চিঠি পেলাম। তোর মানসিক অবস্হা জেনে যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছি। শক্তিকে আমরাই এত বড় করে তুলেছি। এর মূল দায়িত্ব তোর, আমার ও মলয়ের। এবং এখনও আমার প্রতিটি বন্ধুকে বড় করেই তুলতে চাই আমি। শক্তিকে লেখার জন্য প্রাথমিক উৎসাহ তুইই দিয়েছিলি। বারেবারে বাহবা দিয়ে ‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি’ একথা তুইই প্রথম তুলেছিস। অর্থাৎ শুধু এই যে আজ শক্তি সেকথা নিজে বলছে। চাইবাসায় থাকতেই তোকে বাদ দিয়ে শিল্পের সিংহাসনে বসার একটা ঘোরতর প্ল্যান উৎপল ও শক্তি অনেকদিন আগেই করেছিল। আমাকেও উপস্থিত থাকতে হয়েছিল এই সব আলোচনায়। পত্রিকা বের করার প্ল্যান তখনই হয়। আন্দোলনের ব্যাপারটাও মলয় বারবার তাগাদা দিতে থাকে। আমি বরাবরই কৃত্তিবাসকে ছাড়তে পারব না জানিয়েছি। নানান সেন্টিমেন্টাল কারণে কৃত্তিবাসকে আমি আমার নিজের পত্রিকা মনে করি। অনেকের মতন ‘সুনীলের কাগজ’ মনে করা সম্ভব নয়। শক্তি ও উৎপল তোকে বাদ দিয়ে ‘জেব্রা’ বার করতে পারবে কিনা মনে হয় না। অন্তত মলয় এটা হতে দেবে না। তাছাড়া সমস্ত নীচতার মধ্যেও সূক্ষ্ম বোধশক্তির দংশন শক্তিও এড়াতে পারবে না। আমাদের মধ্যে একটা ভাঙন গড়ে উঠবে এ আমার বিশ্বাস হয় না। হলে শক্তিরই প্রচণ্ড ক্ষতি হবে। টাকাপয়সার দরকার ওর শিল্পের জন্যও, শীলাও আছে, দার্শনিক ঋণও প্রয়োজন, সমীর ও মলয়কে ও সেইসঙ্গে সুনীলকে বাদ দিলে যে মারাত্মক অবস্হায় ও পড়বে তা ও জানে। আমাকে শক্তি লিখেছে ‘জেব্রা’য় তোর লেখা থাকছে। বেরোতে নাকি মাস দুয়েক দেরি। বরং উৎপলই একটু বেশিমাত্রায় তোর বিরোধী। হয়তো ঈর্ষা, হয়তো অন্য কোনো কারণ। উৎপলকে খুশি রাখতে গিয়ে হয়তো এই সব জটিলতায় শক্তি বাধ্য হচ্ছে। মলয়ের অভিমান এই যে তুই ওকে বিন্দুমাত্র স্নেহ করিস না; নিতান্ত ছেলেমানুষী। সেবার শীলা পাটনায় ভর্তি হতে গেলে শক্তিকে পাটনায় নিয়ে যাই আমি। সেখানে মলয় ওকে এই আন্দোলন সম্পর্কে Convince করে। ছোটোগল্পে লিখেছে যে গল্পটা, তারই প্লট ও প্ল্যান মলয় শক্তিকে দেয় (ক্ষুৎকাতর আক্রমণ)। ঠিক হয় যে কলকাতায় গিয়ে পুস্তিকা বের করে ব্যাপারটা আরম্ভ হবে। আমরা সবাই থাকবো। তুইও নিশ্চয়ই। আমাদের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা না করেই শক্তি কলকাতায় ফিরেই ব্যাপারটা আরম্ভ করে দেয়। এদিকে ট্রেনিং-এ চলে আসতে হয় আমাকে। মলয় পাটনায়। কলকাতায় শক্তি একা নানানভাবে নিজের স্বপক্ষে সিংহাসন গড়ে তোলে ক্রমে। তুই ব্যাপারটায় যোগ না দেওয়ায়, যেটা ভুল-বোঝাবুঝিতে পেছিয়ে গেছে, আজ অবস্থা এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা মলয়ও বলেছে। মলয় এখন যে কোনো রকমে তোকে চায়। ফলে হয়তো তোকে এই ধরনের আক্রমণ চালাচ্ছে। অদ্ভুত সব জটিলতা। ‘ক্ষুধার্ত’ নামে একটা কবিতা সংকলন বার করতে চায় ও। আমাকে লিখেছে তোকে পদ্য পাঠাতে বলতে। ব্যাপারটা নিজেই সম্পাদনা করতে চায়, শক্তির জটিলতা এড়িয়ে। সন্দীপনও বোধহয় একটা গদ্য সংকলন বের করবে। আমি ‘চিহ্ণ’, ‘ছোটগল্প’ ও ‘জেব্রা’র জন্য ছোটগল্প পাঠিয়েছি ওদেরই অনুরোধে।
    খ্যাতির প্রতি শক্তির প্রলোভন চিরদিনই আছে। ওর পরিবেশ অনুযায়ী হয়তো এটা স্বাভাবিক। আসলে মানুষ না হয়েই শিল্পী হওয়া যায়, এটাই যতো গণ্ডগোলের। ছোটোলোক, নীচ ও চোরও শিল্পী হতে পারে। শিল্পী হওয়ার জন্য বরং এসব ব্যাপার সাহায্যই করে। ফলে বন্ধুত্ব, মনুষ্যত্ব নিয়ে গণ্ডোগোল বাধে।
    এক মুহূর্তেই হয়তো শক্তির সমস্ত দম্ভ, অহংকার, নীচতা ভেঙে চুরমার করে দেওয়া যায় বাংলাদেশের কাছে। এর উপযুক্ত নজিরের অভাব নেই আমার কাছে; কিন্তু শক্তির বিরুদ্ধে বা কারোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় কোনোদিন। আমার কতকগুলো নিজস্ব আদর্শ আছে, তা ভুল বা ঠিক হোক আমি তা নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। প্রতিক্রিয়া হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।
    কৃত্তিবাসের জন্যও তোর যে আদর্শ, তাকে ধরে রাখতে হবে তোকে, আশপাশের কারো চিৎকারে বিব্রত হওয়ার কিছুই নেই। কৃত্তিবাস আমরা বের করে যাবোই। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিল্পের চেয়ে মানুষকে বেশি ভালোবাসি। শক্তি শিল্পী হিসেবে অনেক বড়ো ও মানুষের চেয়ে শিল্পকে অনেক অনেক বড়ো মনে করে। আমি শিল্পকে পৃথক মনে করতে পারি না।
    প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গী পৃথক হওয়াই স্বাভাবিক এবং উচিতও। শক্তি বা উৎপলের মতো কবিতা না লিখলে কবি নয়, এসব ছেলেমানুষীতে আমি বিশ্বাস করি না। শক্তির কিছু-কিছু কবিতা যেমন আমাকে উন্মত্ত বিহ্বল করে, অলোকরঞ্জনের কোনো কোনো কবিতায় আমি তেমনই প্রস্ফূট হয়ে যাই। সেই মুহূর্তে অলোকরঞ্জনকে আমার সমস্ত স্বত্তার মালিক মনে হয়। কী করে তাকে অস্বীকার করি? তেমনই হয়তো এমনও কেউ আছেন যাঁর তারাপদর পদ্যে আরোগ্য হয়। এসব শ্রেষ্ঠত্ব স্থির করার আমরা কে? যারা কবিতা পড়েন তাদের ওপরই, সময়ের ওপর, এসব ছেড়ে না দিয়ে নিজেদের ঢাক ঢোল নিয়ে কাড়াকাড়ি করার কি যে সুখ আমি বুঝি না। এসব চালিয়ে গেলে শক্তি অনেক বড়ো ভুল করবে। যতো বড়ো হতে পারে ও তাকে নিজ হাতে খর্ব করবে। হয়তো অ্যালেনের বিশ্বজোড়া নাম দেখে ও কিছুটা উত্তেজিত হয়েছে। একথা শক্তি কয়েকবার বলেওছে আমাকে।
    জুনে পনেরো তারিখে এখান থেকে রওনা হয়ে সতেরো তারিখে চাইবাসা পৌঁছোব। তুই আয় না তখন। শক্তিকেও আসতে বলব। একসঙ্গে তিনজন থাকলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ভেঙে যাবে আপনা থেকেই। চারিদিকে বেড়িয়ে বেড়ানো যাবে। বেলাও বেশ সুস্হ হয়ে উঠেছে।
    চিঠি দিস। হাংরি জেনারেশনের বিরুদ্ধেই না হয় কয়েকটা প্রচণ্ড গদ্য ও পদ্য লেখ। হাংরি জেনারেশনের একটা বিশেষ পুস্তিকায় বের করব আমি; মলয়ও রাজি হবে। আসলে এই সব আন্দোলনের চেয়ে হৃদয়ের আন্দোলনটাই আগে দরকার।
    সারা জীবন একাকীত্বের দুর্ভোগ হয়তো এভাবেই আত্মসাৎ করে যেতে হবে আমাকে। তবু এবং হয়তো এই জন্যেই শিল্পের চেয়ে আমি মানুষকে পৃথক করতে পারি না, বড়ো মনে করার বা ছোট মনে করার কারণ খুঁজে পাই না।

    সমীর রায়চৌধুরী

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দাদার পোস্টিঙের সব শহরেই গেছেন, একা বা সস্ত্রীক, পাটনা, ধানবাদ, চাইবাসা, ডালটনগঞ্জ, মুজফফরপুর, দ্বারভাঙ্গা ইত্যাদি, কিন্তু ওনাদের বন্ধুত্ব সেই কলেজের দিনগুলোর মতন আর হয়নি, মূলত হাংরি আন্দোলনের কারণে। দাদা মারা যাবার পর সুনীল গঙ্গেপাধ্যায় দাদার সম্পর্কে এই সংক্ষিপ্ত গদ্য লিখেছিলেন–

    “একটি চিঠিপত্রের সংকলন প্রকাশিত হচ্ছে, আমাকে লেখা বিভিন্ন সময়ে অনেকের লেখা চিঠি। তাতে ছাপা হচ্ছে সমীর রায়চৌধুরীর কয়েকটি চিঠি। আমার স্মৃতিশক্তি ইদানিং দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, ওই চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু আমার মনে ছিল না। সেই সব চিঠিতে বিধৃত হয়েছে হাংরি জেনারেশন গড়ার ইতিহাস আর কৃত্তিবাসের সঙ্গে সমীর রায়চৌধুরীর সম্পর্ক। আমার মনে পড়ে গেল, একসময় আমি কৃত্তিবাস নিয়ে বেশ সংকটে পড়েছিলাম। তখন আমার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল সমীর। সে আমাকে বুঝিয়েছিল যে কিছুতেই কৃত্তিবাস বন্ধ করা যাবে না। সে সব রকম সাহায্য করতেই প্রস্তুত, এমনকী টাকা পয়সা দিয়েও।
    সমীর অন্য অনেক সময়েও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। একই কলেজে পড়ার সুবাদে বন্ধুত্ব, যদিও আমাদের বিষয় ছিল আলাদা। সমীরের জীববিজ্ঞান আর আমার অর্থনীতি। কলেজে তো অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়, কিন্তু কারুর কারুর সঙ্গে সে-বন্ধুত্ব খুব গাঢ় হয়ে ওঠে। গ্র্যাজুয়েশানের পর সমীর বেশ তাড়াতাড়ি চাকরি পেয়েছিল। আমি বেশ কয়েক বছর বেকার অবস্হায় টিউশানি-মিউশানি করে কাটিয়েছি। সেই সময় সমীর কৃত্তিবাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে কৃত্তিবাসের খানিকটা টানাপোড়েন তো ছিলই, সমীর সেটা মেলাবার অনেক চেষ্টা করেছে। ওর ছোটোভাই মলয় রায়চৌধুরীকে পুলিশ গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করে, তাতে, হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক না থাকলেও মলয়ের পক্ষে প্রথম সাক্ষী দিয়েছিলুম আমি।
    বিহারে চাকরিরত হলেও সমীর কলকাতা থেকে একটি প্রকাশনা সংস্থা চালু করতে চেয়েছিল। তার প্রথম বই আমার ‘একা এবং কয়েকজন’। তখন আমাকে কবি হিসাবে ক’জনই বা চেনে। তবু আমার কবিতার বই প্রকাশ করায় সমীরের অনেকখানি ঔদার্য প্রকাশ পেয়েছিল। সমীরের কাব্যগ্রন্থ বেরুল, ‘ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি’। নামটা বোধহয় আমারই দেওয়া। প্রেসেও ছোটাছুটি করেছি আমি। সে সময়ে সমীর চমৎকার রোমান্টিক কবিতা লিখত। পরে তার কবিতা একটা অন্যদিকে বাঁক নেয়। ওই সংস্থা থেকে সমীরের আরেকটি বই বেরিয়েছিল, ‘আমার ভিয়েৎনাম’। পরে সেই প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। লেখালিখি ছাড়াও সমীরের সঙ্গে আমার একটা গভীর নৈকট্যের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়, যে সম্পর্কের মধ্যে কখনো ভুল বোঝাবুঝির প্রশ্ন থাকে না। আমি জানতাম এই দীর্ঘকায়, সুঠাম চেহারার বন্ধুটির ওপর সব সময় নির্ভর করা যায়। আমার দিক থেকে ওকে কখন কী সাহায্য করেছি, তা বলতে পারি না। চাকরিসূত্রে সমীর যখন যেখানে বদলি হয়েছে, আমি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছি। যেমন ডালটনগঞ্জ, ভাগলপুর, দুমকা, মুজফফরপুর, চাইবাসা, দ্বারভাঙ্গা এবং ওদের নিজস্ব বাড়ি পাটনায়। সেই সময়কার আড্ডার উজ্জ্বল মধুর স্মৃতি কখনো ভোলার নয়। বিয়ের সময়, সমীর বেশ একটা কৌতুক করেছিল। আমরা জানতুম, চাইবাসার বেলার সঙ্গেই ওর ভালোবাসার সম্পর্ক। কিন্তু সমীর রটিয়ে দিল, ও অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করছে। খুবই উদ্বিগ্ন অবস্থায় আমরা কয়েকজন বিবাহবাসরে যোগ দিতে গেলাম চাইবাসায়। সমীরকে কিছু জিগ্যেস করলে সে মুচকি হাসে। অনুষ্ঠান শুরুর আগে নববধুর মুখ দেখে আমার বুক থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। লাবণ্যময়ী বেলা পরে সমীরের সব বন্ধুকেই আপন করে নিয়েছিল। স্বাতীর সঙ্গে আমার বিয়ে উপলক্ষ্যেও সমীর আর বেলা দুজনে এসে উপস্থিত হয়েছিল আমাদের দমদমের বাড়িতে। বউভাতের রাতে নববধূকে কিছু একটা উপহার দিতে হয়, তা আমার জানা ছিল না। জানব কী করে, আমি যে কাঠ বাঙাল। সমীরই প্রায় শেষ মুহূর্তে সেই কথাটা মনে করিয়ে দেওয়ায় দু-জনে বেরিয়ে কিনে আনলাম একটা লেডিজ ঘড়ি, খুব সম্ভবত সমীরই সেটার দাম দিয়েছিল। তারপর এই দুই পরিবারের একটা ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়।
    সমীরের সঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় প্রথমে আমিই করিয়ে দিই। তারপর শক্তি-সমীরের চাইবাসা পর্ব নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। বিহারে থাকলেও সমীর মাঝে মাঝেই কলকাতা এসে অন্য সব লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে।
    হাংরি জেনারেশন আন্দোলন শুরু হবার পর ওদের সঙ্গে আমার খানিকটা দূরত্ব তৈরি হয়। আমার ‘আনন্দবাজারে’ যোগ দেওয়া ও কবিতা ছাড়াও প্রচুর গদ্য লেখালিখি ওরা অনেকেই পছন্দ করেনি, শুনেছি। সেটা তো এস্টাব্লিশমেন্টের খপ্পরে পড়া, এবং কথাটা ঠিকই। কয়েক বছর পর শক্তিও অবশ্য ‘আনন্দবাজার’ সংস্থায় যোগ দিয়েছিল।
    রাজনীতির মতন সাহিত্য জগতেও নীতিগত আপত্তি ও দূরত্ব থাকতেই পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সেই দূরত্ব সৃষ্টি করার পক্ষপাতী আমি কোনোদিনই নই। হাংরি জেনারেশন পর্ব চুকে গেলে শক্তির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতায় সামান্য সাময়িক ফাটল খুব সহজেই জোড়া লেগে যায়। যেমন সন্দীপনেরও। কিন্তু কেউ কেউ দূরত্বটাই পছন্দ করে। সমীরের সঙ্গে বিচ্ছেদটাই আমার বেশি মনে লাগে। সমীরের লেখা, সাহিত্য সম্পর্কে ওর নানারকম পরিকল্পনা আমার বরাবরই পছন্দ ছিল। সবচেয়ে বেশি আপন মনে করতাম মানুষ সমীরকে।
    জীবন কত নিষ্ঠুর। জীবনের গতি কোন সময় কোন বাঁক নেবে, তা আগে থেকে কিছুই বলা যায় না। এক সময়কার সেই প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, আড্ডা, পানাহার, পরস্পরের স্বপ্ন বিনিময়, এসবই কখন যেন ধূসর হয়ে যায়। বিহার ছেড়ে সমীর এখন কলকাতারই উপকন্ঠে বাড়ি করে সপরিবারে চলে এসেছে। অথচ ওর সঙ্গে আমার আর প্রায় দেখাই হয় না। কেন কে জানে! হয়তো আমার দিক থেকেই অনেক ত্রুটি আছে।
    একটা সাম্প্রতিক ঘটনা বলি। চোখের চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাতী আর আমি গেছি একটা চিকিৎসালয়ে। বেশ ভিড়। তারই মধ্যে স্বাতী আঙুল দেখিয়ে বলল, ওইখানে সমীর বসে আছে না? কাছে গিয়ে দেখি, সত্যিই সমীর আর বেলা। কুশল বিনিময় হল। ছেলেমেয়েদের কথা হল। এক সময় আমি সমীরকে বললাম, কানাইলাল জানার বাড়িতে যে একটা উৎসব হল কদিন আগে, শুনেছিলাম, তোরও সেখানে যাবার কথা ছিল। তুই গেলি না কেন? তোর বাড়ির তো কাছেই।
    সমীর আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল, আমি যাইনি, যদি তুই আমাকে সেখানে চিনতে না পারিস?
    আমার বুকে যেন একটা বুলেট বিদ্ধ হল। এরকম নিষ্ঠুর কথা আমি বহুদিন শুনিনি। যে বন্ধুর সঙ্গে আমার তুই-তুই সম্পর্ক, যার সঙ্গে আমার কখনো ঝগড়াঝাঁটি হয়নি, কোনোদিন তিক্ততার সৃষ্টি হয়নি, তার সঙ্গে দেখা হলে আমি চিনতে পারব না? এমন অভিযোগ শোনার জন্য কী দোষ বা অন্যায় করেছি আমি, তা জানি না। এরপর কয়েকদিন বেশ বিমর্ষ হয়েছিলাম। মনে হল, জীবনের কাছ থেকে এরকম আকস্মিক আঘাত আরও কত পেতে হবে কে জানে!
    হয়তো সমীরও কোনো গভীর অভিমানবোধ থেকে এই কথা বলেছিল। আমি নিজেই নিশ্চয়ই সেরকম কোনো কারণ ঘটিয়েছি, কিন্তু তার বিন্দুবিসর্গও আমার জানা নেই।”

    নব্বুই দশকে কলকাতার বাঁশদ্রোণীতে এসে দাদা “হাওয়া ৪৯” নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ আরম্ভ করেন। তিনি সুনীল, সন্দীপন, শক্তি, উৎপল, শরৎ প্রমুখ সবার সঙ্গে দেখা করে লেখা দেবার আহ্বান জানান। একমাত্র উৎপল ছাড়া আর কেউ সাড়া দেননি। দাদা অত্যন্ত দুঃখিত হন তাঁর নিকটবন্ধু সুনীলের ব্যবহারে। প্রায় দুই বছর দাদা কৃত্তিবাস পত্রিকাকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু যখন দাদা এবং অন্যান্য হাংরিরা গ্রেফতার হন ও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয় তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটি সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। দাদা এই আচরণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। ভূমেন্দ্র গুহের মাধ্যমে দাদাকে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে, সবাই যখন অকাদেমি পুরস্কারের জন্য তাঁকে খোশামোদ করছে তখন দাদা তাঁর বাড়িতে একবারের জন্যও কেন যান না। হাংরি মামলায় কলকাতায় দাদার যখন মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, তখন সুনীল একবারের জন্যও বলেননি তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিতে। দাদার গল্পগ্রন্থ “খুল যা সিমসিম” নিয়ে যখন কলকাতার তরুণ লেখকমহলে আলোচনা আরম্ভ হয়েছিল গল্পের একটি নবদিগন্ত খুলে দেবার জন্য, তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বইটি সম্পর্কে কোথাও এক লাইনও লেখেননি। বিদেশে গিয়েও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বার্ধক্যেও হাংরির বিরুদ্ধে প্রচার করেছেন, অ্যালেন গিন্সবার্গকে বুঝিয়েছেন যাতে আন্দোলনকে কোনো গুরুত্ব দেয়া না হয়, দাদা তা জানতে পেরেছেন বিভিন্ন বিদেশী গবেষকদের কাছ থেকে। অমিতাভ ঘোষের বিদেশিনী স্ত্রী যখন “এ ব্লু হ্যাণ্ড” নামে একটি বই গিন্সবার্গকে নিয়ে লিখছিলেন তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে বিপথগামী করেন, যে কারণে বইটিতে সত্য তথ্য নেই বললেই চলে। শেষ বয়সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আত্মরক্ষা করতে চেয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায় সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি তাঁর ‘কিন্নর কিন্নরী’ উপন্যাসে। অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ উপন্যাসে সমীর রায়চৌধুরীকে গুরুত্ব দেননি, যখন কিনা ঘটনাবলী চাইবাসায় ঘটেছিল।

    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় হাংরিতে যোগ দিয়েছিলেন বলে সুনীল আমেরিকা থেকে তাঁকে একটি চিঠিতে হাংরি ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই চিঠি পাবার পর সন্দীপন হাংরি সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন।
    আমাকে আমেরিকা থেকে যে চিঠিটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন তাকে হুমকি বলাই ভালো। কিন্তু আমার যে চিঠির জবাবে এই চিঠিটা লিখেছেন, মজার ব্যাপার, সেটা ‘সুনীলকে লেখা চিঠি’ বই থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। সুনীলের চিঠিটা এইরকম

    আয়ওয়া
    ১০ জুন ১৯৬৪

    মলয়,
    তুমি কলকাতায় কী সব কাণ্ডের বড়াই করে চিঠি লিখেছ জানি না। কী কান্ড করছ ? আমার বন্ধুবান্ধবদের কেউ-কেউ ভাসাভাসা লিখেছে বটে কফিহাউসে কী সব গণ্ডোগোলের কথা। কিছু লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার লক্ষ্য বেশি। রাত্রে তোমার ঘুম হয় তো ? এ-সব কিছু না — আমার ওতে কোনো মাথাব্যথা নেই। যত খুশি আন্দোলন করে যেতে পারো — বাংলা কবিতার ওতে কিছু আসে যায় না। মনে হয় খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার। পেতেও পারো বলা যায় না। আমি এসব আন্দোলন কখনো করিনি, নিজের হৃৎস্পন্দন নিয়ে আমি এতই ব্যস্ত। তবে, একথা ঠিক, কলকাতা শহরটা আমার। ফিরে গিয়ে আমি ওখানে রাজত্ব করব। তোমরা তার একচুলও বদলাতে পারবে না। আমার বন্ধুবান্ধবরা অনেকেই সম্রাট। তোমাকে ভয় করতুম, যদি তোমার মধ্যে এখন পর্যন্ত একটুও জেল্লা দেখতে পেতুম। আমার চেয়ে কম বয়সিদের মধ্যে একমাত্র তন্ময় দত্ত এসেছিল, আমার চেয়ে অন্তত ছ বছরের ছোটো— কিন্তু জীবনানন্দের পর অত শক্তিশালী কবি এদেশে আর কেউ আসেনি। প্রচণ্ড অভিমান করে ও চলে গেছে। সেজন্যে এখনও আমি অপরের হয়ে অনুতাপ করি। আমি নিজে তো এখনও কিছুই লিখিনি, লেখার তোড়জোড় করছি মাত্র, কিন্তু তোমার মতো কবিতাকে কমার্শিয়াল করার কথা আমার কখনো মাথায় আসেনি। বালজাকের মতো আমি আমার ভোকাবুলারি আলাদা করে নিয়েছি কবিতা ওগদ্যে। তোমার প্রতি আমার যতই স্নেহ থাক মলয়, কিন্তু তোমার কবিতা সম্বন্ধে এখনো কোনোরকম উৎসাহ আমার মনে জাগেনি। প্রতীক্ষা করে আছি অবশ্য।অনেকের ধারণা যে পরবর্তি তরুণ জেনারেশনের কবিদের হাতে না রাখলে সাহিত্যে খ্যাতি টেকে না। সে জন্যে আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কেউ-কেউ একসময় তোমাদের মুরুব্বি হয়েছিল। আমি ওসব গ্রাহ্য করি না। নিজের পায়ে আমার যথেষ্ট জোর আছে, এমনকী একা দাঁড়াবার। আমার কথা হল : যে যে বন্ধু আছ, কাছে এসো, যে ভালো কবিতা লেখো কাছে এসো — যে যে বন্ধু নও, বাজে কবিতা লেখো, দূর হয়ে যাও কাছ থেকে। বয়সের ব্যবধান তোলা আমার কাছে অত্যন্ত ভালগার লাগে।
    চালিয়ে যাও ও সব আন্দোলন কিংবা জেনারেশনের ভণ্ডামি। আমার ওসব পড়তে কিংবা দেখতে মজাই লাগে। দূর থেকে। সাহিত্যের ওপর মৌরসি পাট্টা বসাতে এক-এক দলের অত লোভ কী করে আসে, কী জানি। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো। আমাকে দেখেছ নিশ্চয় শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষ। আমি তাই-ই, যদিও গায়ে পদ্মাপাড়ের রক্ত আছে। সুতরাং তোমাদের উচিত আমাকে দূরে-দূরে রাখা, বেশি খোঁচাখুঁচি না করা। নইলে, হঠাৎ উত্তেজিত হলে কী করব বলা যায় না। জীবনে ওরকম উত্তেজিত হয়েছি পৌনে একবার। গতবছর। দুএকজন বন্ধুবান্ধব ও-দলে আছে বলে নিতান্ত স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশন গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি। এখনও সেক্ষমতা রাখি, জেনে রেখো। তবে এখনও ইচ্ছে নেই ও খেলাঘর ভাঙার।আমার এক বন্ধু জানিয়েছে যে তোমরা নাকি আমার কোনো-কোনো চিঠির অংশবিশেষ ছাপিয়েছ/ পত্রসাহিত্য-ফাহিত্য করার জন্য আমি চিঠি লিখি না। আমার চিঠি নেহাত কেজো কথা। অবশ্য লুকোবারও কিছু নেই। কিন্তু আগে-পরের কথা বাদ দিয়ে, ডটডট মেরে চালাকির জন্য আমার কোনো চিঠি কেউ ছাপিয়ে থাকে— তবে আড়াই মাস পরে ফিরে তার কান ধরে দুই থাপ্পড় লাগাব বলে দিয়ো/ আশা করি শারীরিক ভালো আছ। আমার ভালোবাসা নিও।

    সুনীলদা

    শক্তি চট্টোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়ে গেল, মূলত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চাপে আর সংবাদপত্র মালিকের শর্ত পূরণ করার জন্য। মুখোশ, কার্ড, শাদা-কাগজ, জুতোর বাক্স ইত্যাদি কাজগুলোয় আমার সঙ্গে দেবী রায় আর সুবিমল বসাকও থাকত। আমাকে কফিহাউসে না পেয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দলবল নিয়ে কফিহাউসের সামনে সুবিমল বসাককে মারধর করার জন্য ঘিরে ধরেছিল, পেটানোর জন্যে কফিহাউসের সিঁড়ির তলায় পান-সিগারেটের দোকানে লোহার রড লুকিয়ে রেখেছিল। সুবিমল বসাকের চেহারা তখন ছিল কুস্তিগিরের, ওর হিন্দি গালমন্দের হুংকারে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দলবল নিয়ে পালায়।
    শৈলেশ্বর ঘোষ অসাধারণ কবিতা লিখতো, লিখে গেছে। আমি ওর কবিতা ‘ঘোড়ার সঙ্গে ভৌতিক কথাবার্তা’ ইংরেজিতে অনুবাদ করে বুলেটিনে ছাপিয়েছিলুম। মূল কবিতাটা তুলে দিচ্ছি এখানে :

    এক

    বৃক্ষাকাশে কবিতা টাঙাবো না আমরা, শোবার ঘরেই গাছ সঞ্চার হয়েছে,
    গাছেতে ভূমধ্যাকর্ষণ হয় চোরাচালান বোঝে— শোবার ঘরেই চলে
    অহরহ বিক্ষোভ-আক্রমণ; গাছের সঙ্গেই সুদীর্ঘকাল ফলে ওঠে
    ভালবাসাবাসি— কলকাতায় দশবছর খারিজ নীলাম
    দরসরবরাহ নিদ্রাপ্রেমের মূল্যবৃদ্ধি— ফাটকায় হাতবদল
    দিনমান হৃদয় চিৎ— দিনমানভর তেত্রিশ হিজরের গর্ভ হয়
    দিনমানধরে হে ঘোড়া ভৌতিক ক্ষুধা কবিতার।

    দুই

    বহুকাল তেত্রিশ ভূতের সাথে প্রেম-সূত্রপাত বহুকাল
    কোলকাতাবাংলায় খাতাপত্রে আক্ষেপ—
    বহুকালধর্মলোল রাজপথে হে ঘোড়া কোথায় গেলে
    একশ বালিকার বুকে তৃণগুল্ম খেয়ে কবিতা ফলন হয় !

    তিন

    একশ ভাদ্রবধূ সাধ খায়, কবিতারই শুধু রক্তপাত
    দাতব্য চিকিৎসালয় খুলেছি আমরা পেচ্ছাবখানায়
    কোলকাতা গলে যায়— হৃদয়ে সঙ্গমসূত্রউৎপাত ইত্যাদি
    ধোয়ামোছা হয়— ময়দা বাণিজ্য করি না হে আমরা
    একশ শয়তান মিলে দিনমান ভূত হয়, কলকারখানা প্রসব করে,
    একশ শয়তান মিলে কুলবধূর গর্ভপাত করে—
    একশ শয়তানের বিবিধ উৎপাত তাজ্জব হয়
    সারাদিনমান কবিতার হে ঘোড়া এ কি ঋতুস্রাব !

    চার

    ছাব্বিশ বছরে খুব শোক হয় ছাব্বিশ বছর যেন তো নয়
    ছাব্বিশ বছর নিদ্রারস পচে তবু দেখা নাই
    হা লৌকিক হা অলৌকিক হা নিষ্ঠুর তবু দেখা নাই !
    ছাব্বিশ বছরে কুমির ফসল নিয়ে যায়— জলপাহাড়
    ফেটে যায় যানবাহন আত্মসাৎ ঘটে— ছাব্বিশ বছর
    ক্ষুধাতৃষ্ণাহীন বসে আছি জুয়াচোর বেশ্যার মন্দিরে
    ছাব্বিশ বছরের উপরই বলাৎকার ছাব্বিশ বছর
    রক্তেই ক্রমসূত্রপাত ঘটে ভূতপ্রেত আসে
    ছাব্বিশটি একান্নবর্তী বছর কোনোক্রমেই যেন নয়
    হে ঘোড়া নিষ্ঠুর ছাব্বিশ বছর কেন দেখা নাই !

    পাঁচ

    কোন একদিন অবাধ সংকেত বিনিময়ে
    ভালবাসার নৌকায় বাদাম পরানো হয়েছিল—
    ২৬ বছর গুণটানা ব্যবসায়ে জেগে বসে আছি
    ঘোড়া তুমি জান পরিচয় তাদের
    কেননা তোমারই খুরের মারে মুছে যায় কালির ছাপ
    তোমারই প্রত্যাশাময় মুখের কাছে ভেসে ওঠে,
    কোনো একদিন উঠেছিল ঘাসের চুমায় বিস্মিত হৃদয়—
    কোনো একদিন স্ত্রীপুরুষের চোখে মুহূর্তে লাগান হয়েছিল বলে
    আজও সেই মানুষের হল না প্রস্তুতি সময়
    বহুবার বহুপথে হয়েছে ফেরা তবু হায়
    ২৬ বাঘের মত অতিহিংস্র গর্জন শেখেনি কোন পথে
    ফিরে আসা হয়— অবাধ সংকেতবিনিময়ে একদিন হয়েছিল
    দেখা মার্বেল পাহাড়ের সাথে— মাদিমদ্দ দুই
    বেহদ্দ বেড়ালের থাবা জানতে পেরেছিল,
    পাখীই কেবল ফিরে আসে ঘরে— বারংবার ২৬ বছর
    দূর থেকে ছুটে আসে পশমের বল বিছানার কাছে
    দেখা যায় সমুদ্রময় গড়ে উঠছে ত্রস্ত পোতাশ্রয়
    হে ঘোড়া প্রত্যাশালিপ্ত সিঁড়ির উপরেই দেখা হবে।

    ছয়

    হে ঘোড়া তোমার হৃদয়েই ছিল ভালবাসা
    মেঘময় বিছানো ছিল পরমায়ুর খোল
    ঘনিষ্ট চুমায় ছিঁড়ে যায় ব্লাউজশায়া ডুবোজাহাজ
    ব্যভিচারবোধ ভরে তোলে ইতিহাসআদালত—
    জানা গেছে বয়সকালে আমাদের ঊরুদেশময়
    ভৌতিক সমুদ্র জাগে— জানা গেছে জুয়ার টেবিলেই
    হয়েছিল যুদ্ধের জ্ঞান— জানা গেছে জন্মের নির্বাচন
    হয়নি সফল— জানা গেছে জাহাজের পরাশ্রয়ীটান
    গোয়েন্দারও কাপড় খুলে দ্যায়— হে ঘোড়া
    তোমার নিশান আমার মুখের উপর চুম্বনতিথির
    মত উড়ে আসে— রক্তের অভিমান বেশ্যার পেটে
    ছেলে জন্মায়— চারদিকে দন্তোদ্গম উৎসবের আলো
    খুরশব্দ লিখা টেবিলে তবু সহচর জেগে বসে আছি।

    সাত

    তিন ঘণ্টা বসে আছি বেদনাপ্রধান চিঠি পকেটে
    কোলকাতা চৌরঙ্গী লিখা এমন নিস্তব্ধ বন্দুক হাতে
    কতদিন ঘুমজাগা প্রহরায় কাটাই— দশমনুমেণ্ট
    ময়দান পকেটমারে এক একর জমির দাম !
    তিন ঘণ্টা সবুজপল্লী অনুধাবনীয়তার হাতে মার খায়
    হাঁস তবু উড়িয়েছিলাম গায়ে পড়া আধুনিক-জামা
    পাড়াগাঁর স্ত্রীলোকের স্বামীসম্ভাষণ পূর্ণিমাগভীরে
    হাজার শিশুর হাসিখেলা আক্রমণ কোলকাতা
    তিনঘণ্টায় সাতসমুদ্রতল, মনুমেন্টময়দান
    মেঘের পেটে যায়, বেদনাপ্রধান চিঠি পকেটে
    এক একর জমির বিক্ষোভ দিনমান— বন্দুক
    হাতে রাতজাগাপ্রহরায় হে ঘোড়া কতদিন কাটাই !

    আট

    তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি পুণ্য বিছানায়
    হে ঘোড়া, কোলকাতায় তিনগেলাস স্বাস্থ্যসুধাপান
    পরিত্রাণহীনতা হাসে পুরুতের নামাবলীগীতা
    ধাতুধর্ম সাতবার গড়াগড়ি খায়— তিন বিধবা
    দক্ষিণসাগরে বায়ুসেবী বেড়াতে যায়—
    তেত্রিশ দেবতা ফলভোগী— চাষা মাশুল গুণে দেয়
    পুণ্যচোর সদর দরজায়— গৃহস্থের মেয়েরা সব
    আইবুড়ো ঘুম জেগে সারারাত খিল তুলে দেয়
    পুরাণগীতা পড়ে কুলধর্ম রক্ষা শেখে, ঘোড়া তুমি
    রেশমগুটিপোকায় প্রেম দিলে হৃদয় কোথায় !
    গীতাধর্ম পাঠ শুনে কুকুরের অণ্ডকোষে ধাতুমুদ্রা জমে
    ঘোড়া তুমি তেত্রিশ কোটি পুণ্যের গায়
    নামাবলী লেখ হৃদয় কোথায় ?
    তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি পুণ্যধর্মহীন
    রহস্য তলায় হে ঘোড়া
    পরিবহনযোগ্য রাস্তা বহুদূর শূন্য পড়ে আছে !

    চার : কেষ্টবিষ্টুদের নালিশ

    কল্লোল যুগ বইতে অচিন্ত্য সেনগুপ্ত লালবাজারের পাল্লায় পড়ার যে বর্ণনা দিয়েছেন, আমাদের তা থেকে আরেকটু বেশি কড়কানোর ব্যাপার ছিল কেননা তারপরেই শুরু হবে নকশাল আন্দোলন। নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা অচিন্ত্য সেনগুপ্ত এইভাবে দিয়েছেন:

    “পরদিন সকালে মুরলীধর বসু আর শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় লালবাজারে গিয়ে উপস্থিত হলেন। ভীতভয়সূদন শূলপাণির নামগান করতে-করতে।
    প্রথমেই এক হোমরাচোমরার সঙ্গে দেখা। বাঙালি, কিন্তু বাংলাতে যে কথা কইছেন এ নিতান্ত কৃপাপরবশ হয়ে।
    দেখতে তো সুখী-সজ্জনের মতই মনে হচ্ছে। আপনাদের এ কাজ?
    পড়েছেন আপনি?
    Darn it—আমি পড়ব ও সব ন্যাস্টি স্নাং? কোনো রেসপেকটেবল লোক বাংলা পড়ে?
    তা তো ঠিকই। তবে আমাদেরটাও যদি না পড়তেন–
    আমরা পড়েছি নাকি গায়ে পড়ে। আমাদেরকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে পড়িয়ে ছেড়েছে। আপনাদেরই বন্ধু মশাই। আপনাদেরই এক গোত্র।
    কে? কারা?
    সাহিত্যজগতের সব শূর-বীর, ধন-রত্ন—এক কথায় সব কেষ্টবিষ্টু। তাদের কথা কি ফেলতে পারি? নইলে এ সব দিকে নজর দেবার আমাদের ফুরসৎ কই? বোমা-বারুদ ধরব, না, ধরব এসব কাগজের ঠোঙা?
    পুলিশপুঙ্গব ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন। পরে মনে করলেন এ ভঙ্গিটা যথার্থ হচ্ছে না। পরমুহূর্তেই মেঘগম্ভীর হলেন। বললেন, রবিঠাকুর শরৎ চাটুজ্জে নরেশ সেন চারু বাঁড়য্যে—কাউকে ছাড়বনা মশাই। আপনাদের কেসটার নিষ্পত্তি হয়ে গেলেই ও-সব বড় দিকে ধাওয়া করব। তখন দেখবেন–
    বিনয়ে বিগলিত হবার মতন কথা। গদগদ ভাষে বলেন মুরলীধর :
    এ তো অতি উত্তম কথা। পিছুতে-পিছুতে একেবারে ভারতচন্দ্র পর্যন্ত। তবে দয়া করে ঐ বড় দিক থেকে সুরু করলেই কি ঠিক হতনা?
    না। প্রবলপ্রবর হুঙ্কার ছাড়লেন : গোড়াতে এই এটা একটা টেস্ট কেস হয়ে যাক।
    রাঘববোয়াল ছেড়ে দিয়ে চিরকালই কি চুনোপুঁটিদের দিকে নজর? গদির অধিপতিদের ছেড়ে সামান্য মুদি-মনিহারি?
    চালান হয়ে গেলেন পুলিশ-োকোর্টে।
    সতীপ্রসাদ সেন—আমাদের গোরাবাবু-পুলিশ-কোটের উদীয়মান উকিল-জামিনের ব্যবস্থা করে দিলেন। মোকদ্দমা জোড়াবাগান কোর্টে স্থানান্তরিত হল। তারিখ পড়ল শুনানির।
    এখন কি করা?
    প্রভাবান্বিত বন্ধু ছিল কেউ মুরলীধরের। তিনি এগিয়ে এলেন। বললেন, বলো তো, তারক সাধুকে গিয়ে ধরি। তারক যখন তখন নিশ্চয়ই ত্রাণ করে দেবেন। ত্রাহি মাং মধুসূদন না বলে ত্রাহি মাং তারকব্রহ্মন বলতে নিশ্চয়ই কাজ হবে।
    মুরলীধর হাসলেন। বললেন, না, তেমন কিছুর দরকার নেই।
    তা হলে কি করবে? এ সব বড় নোংরা ব্যাপার। আর্টের বিচার আর আদালতের বিচার এক নাও হতে পারে। আর যদি কনভিকশান হয়ে যায় তা হলে শাস্তি তো হবেই, উপরন্তু তোমার ইস্কুলের কাজটি যাবে।
    তা জানি। তবু—থাক। মুরলীধর অবিচলিত রইলেন। বললেন, সাহিত্যকে ভালবাসি; পূজা করি সেবা করি সাহিত্যের। জীবন নিয়েই সাহিত্য-সমগ্র, অখণ্ড জীবন। তাকে বাদ দিয়ে জীবনবাদী হই কি করে? সু আর কু দুইই বাস করে পাশাশাশি। কে যে কী এই নিয়ে তর্ক। সত্য কতদূর পর্যন্ত সুন্দর, আর সুন্দর কতক্ষণ পর্যন্ত সত্য এই নিয়ে ঝগড়া। প্রুডারি আর পর্নোগ্রাফি দুটোকেই ঘৃণা করি। সত্যের থেকে নিই সাহস আর সুন্দরের থেকে নিই সীমাবোধ-আমরা স্রষ্টা, আমরা সমাধিসিদ্ধ।
    ভদ্রলোক কেটে পড়লেন।
    ঠিক হল লড়া হবেনা মামলা। না, কোনো তদবির-তালাস নয়, নয় ছুটোছুটি-হয়রানি। শুধু একটা স্টেটমেন্ট দাখিল করে দিয়ে চুপ করে থাকা। ফলাফল যা হবার তা হোক।
    গেলেন ডক্টর নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তর কাছে। একে সার্থকনামা উকিল, তার উপরে সাহিত্যিক, সর্বোপরি অতি-আধুনিক সাহিত্যের পরাক্রান্ত পরিপোষক। অভিযুক্ত লেখা দুটো মন দিয়ে পড়লেন অনেকক্ষণ। বললেন, নট-গিলটি প্লিড করুন।
    যতদূর মনে পড়ে, চিত্রবহার দুটি পরিচ্ছেদ নিয়ে নালিশ হয়েছিল। এক যৌবনবেদনা, দুই নরকের দ্বার। আর শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহের গোটাটাই।
    সবচেয়ে আশ্চর্য, চিত্রবহকে প্রশংসা করেছিল শনিবারের চিঠি। এমন কি, তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছিল।
    এই ভূতের-মুখে-রাম-নামের কারণ আছে। সুরেশবাবু মোহিতলালের বন্ধু। আর চিত্রবহ মোহিতলালের সুপারিশেই ছাপা হয় কালি-কলমে।
    শনিবারের চিঠিতে চিত্রবহা সম্বন্ধে লেখা হয় :
    ..লেখক মানবজীবনের ভালো-মন্দ সুন্দর-কুৎসিত সকল দিকের মধ্য দিয়া একটা চরিত্রের বিকাশ ও জীবনের পরিণাম চিত্রিত করিয়াছেন। জীবনকে যদি কেহ সমগ্রভাবে দেখিবার চেষ্টা করেন তবে কিছুই বাদ দিবার প্রয়োজন হয়না। কারণ তাহা হইলে তাহার সৰ্বাংশের একটা সামঞ্জস্য ধরা পড়ে। কু ও সু দুই মিলিয়া একটি অখণ্ড রাগিনীর সৃষ্টি করে, তাহা morale নয়, immoraleও নয়—আরও বড়, আরও রহস্যময়।…
    চমৎকার সুস্থ মানুরের মত কথা। ঋদ্ধিবাচন করতে জানে তাহলে শনিবারের চিঠি! তা জানে বৈকি। দলের হলে বা দরকার হলে করতে হয় বৈকি সুখ্যাতি। অয়মারম্ভঃ শুভায় ভবতু।
    নরেশচন্দ্র স্টেটমেন্টের খসড়া করে দিলেন। বললেন, প্রত্যেকে একখানা করে কপি কোর্টে পেশ করে দিন।
    তথাস্তু। কিন্তু উকিলের দল ছাড়েন। বলে, ফাইট করুন। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মার খাবেন কেন?
    বুঝবেনা কিছুতেই, উলটে বোঝাবে। ব্যাপারটা বুঝুন। এ ছেলেখেলা নয়, জরিমানা ছেড়ে জেল হয়ে যেতে পারে। ফরোয়ার্ডে না খেলুন গোলে গিয়ে দাঁড়ান। ফাঁকা গোলে বল মেরে পুলিশ জিতে যাবে এক শটে?
    মহা বিড়ম্বনা। এক দিকে সমালোচক, অন্য দিকে পুলিশ, মাঝখানে উকিল। যেন একদিকে শেয়ালকুল অন্য দিকে বাবলা, মধ্যস্থলে খেজুর।
    মুরলীধর তবু নড়েন না।
    এর মশাই কোনো মানেই হয়না। হয় স্রেফ apologise করুন, আর না-হয় আমাদের লড়তে দিন। ফি-র ভয় করছেন, এক পয়সাও ফি চাইনা আমরা। সাহিত্যের জন্যে এ আমাদের labour of love।
    মনে-মনে হাসলেন মুরলীধর। বললেন, ধন্যবাদ।
    ভিড় ঠেলে আদালত-ঘরে ঢুকলেন তিনজনে। সার্জেন্ট আর লালপাগড়ি, গাঁটকাটা আর পকেটমার, চোর আর জুয়াড়ী, বেশ্যা আর গুণ্ডা, বাউণ্ডুলে আর ভবঘুরে। তারই পাশে প্রকাশক আর সম্পাদক, আর সাহিত্যিক।
    ঢুকলেন প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট। কটা ছেঁড়া মামলার পর ডাক পড়ল কালি-কলমের।
    কে জানে কেন, কাঠগড়ায় পাঠালেন না আসামীদের। চেয়ারে বসতে সংকেত করলেন।
    এলেন মহামান্য পি-পি, হাতে একখণ্ড বাঁধানো কালি-কলম। অভিযুক্ত অংশবিশেষ নীল পেন্সিলে মোটা করে দাগানো। বইখানা যে তাকে সরবরাহ করেছে সে যে ভিতরের লোক তাতে সন্দেহ কি।
    যারা আমাদের মতের ও পথের বিরোধী, অথবা ভিন্নপন্থী ও ভিন্নমত, তাদের অভ্যুদয় দেখলে আমাদের মন সংকুচিত বা অপ্রমুতি হয়। সেটা মনের আময়, অশুদ্ধতা। মনের সেই অপবিত্রতা দূর করবার জন্যে ভিন্নপন্থীদের পুণ্যাংশ চিন্তা করে মনে মুদিতা-ভাব আনা দরকার। পুষ্পহার দুজনকেই প্রসন্ন করে, যে ধারণ করে আর যে ঘ্রাণ নেয়। তেমনি তোমার অর্জিত পুণ্যের সৌরভে আমিও প্রমুদিত হচ্ছি। এই ভাবটিই। বিশুদ্ধ ভাব।
    কিন্তু এ কি সহজ সাধনা? সাহিত্যিক হিসেবে যার আকাঙ্ক্ষিত যশ হলনা সে কি পারে পরের সাহিত্যধর্মে হৃদয়ে অনুমোদনভাব পোষণ করতে?
    পি-পি বক্তৃতার পিপে খুললেন। এরা সমাজের কলঙ্ক, দেশের শত্রু, রাষ্ট্রের আবর্জনা। এদেরকে আর এখন নুন খাইয়ে মারা যাবেনা, যদি আইনে থাকত, লৌহশলাকায় বিদ্ধ করতে হত সর্বাঙ্গে।
    আসামীদের পক্ষে কি বক্তব্য আছে? কিছু নয়, শুধু এই বিবৃতিপত্র। শুধু বাক্য থাকলেই কাব্য হয়না। বক্তৃতা দিয়ে রস বোঝানো যায়না অরসিককে।
    সেই নামহীন উকিল তবু নাছোড়বান্দা। সে একটা বক্তৃতা ঝাড়বেই আসামীপক্ষে। বিনা পয়সায় এমন সুযোগ বুঝি আর তার মিলবেনা জীবনে।
    আমাদের পক্ষে কোনো উকিল নেই। বললেন মুরলীধর : একমাত্র ভবিষ্যৎই আমাদের উকিল।
    ম্যাজিষ্ট্রেট উকিলকে বসতে বললেন।
    তারিখ পালটে তারিখ পড়তে লাগল। শেষে এল রায়-প্রকাশের দিন।
    আদালতের বারান্দায় দুই বন্ধু প্রতীক্ষা করে আছে। শৈলজানন্দ আর মুরলীধর। সাহিত্য-বিচারে কী দণ্ড নির্ধারিত হয় তাদের! দারিদ্র আর প্রত্যাখ্যানের পর আর কী লাঞ্ছনা!
    কি হবে কে জানে। শুষ্ক মুখে হাসল শৈলজা।
    কি আবার হবে। বড়জোর ফাইন হবে। মুরলীধর উড়িয়ে দিলেন কথাটা।
    শুধু ফাইনও যদি হয়, তাও দিতে পারবনা।
    অগত্যা ওদের অতিথিই না হয় হওয়া যাবে দিন কতকের জন্যে। তাই বা মন্দ কি! মুরলীধর হাসলেন : গল্পলেখার নতুন খোরাক পাবে।
    সেই লাভ। সান্ত্বনা পেল শৈলজা।

    দুপুরের পর রায় বেরুল। পি-পির সাহিত্য ও সমাজবিজ্ঞানের আখ্যান-ব্যাখ্যান বিশেষ কাজে লাগেনি ম্যাজিস্ট্রেটের। আসামীদের তিনি benefit of doubt দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।
    হাংরিদের লেখাও খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে পুলিশকে পড়ানো হচ্ছিল। পুলিশের বক্তব্যও এক : “সাহিত্যজগতের সব শূর-বীর, ধন-রত্ন—এক কথায় সব কেষ্টবিষ্টু। তাদের কথা কি ফেলতে পারি? নইলে এ সব দিকে নজর দেবার আমাদের ফুরসৎ কই? বোমা-বারুদ ধরব, না, ধরব এসব কাগজের ঠোঙা?” আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশ কেস হতে পারে তার আঁচ কফিহাউসে ছড়িয়ে পড়েছিল আর তা আমাকে লেখা দেবী রায়ের এই চিঠি থেকে টের পাওয়া যায়:

    সকালে, বাড়িতে
    ২২/৬/১৯৬৪

    মলয়,
    তুমি-আমি নাকি কলকাতায় অ্যারেস্ট হয়ে গেছি। চতুর্দিকে গুজব। কয়েকজন চেনা, হাফচেনার সঙ্গে দেখা হলে অবাক চোখে তাকাচ্ছে; ভাবখানা এই, ‘কখন ছাড়া পেলে’। আমার তো এখন একতারা নিয়ে বাউল হয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে কলকাতায়। সবাই তালে আছে, ‘বাঘে ছুঁইয়ে দেওয়ার’, পর্নোগ্রাফি প্রমাণ করার। সুবিমলকে মে সে কে একজন বলেছে, ‘দেখব কী করে ‘হাংরি জেনারেশন’ বের হয়। সমীর রায়কে টেলিফোন করে ‘আমাদের দাদারা’ বাণী দেওয়ার তালে ছিল; কিন্তু বুঝে গেছে সমীর খচ্চর ছেলে, শালাদের কোঁচা খুলে নেবে। সমীরদার কী খবর ? এদিকে পারিজা খচে লাল। আমরা কেন গনদা পরতিকা দিয়েছি ইত্যাদি… শৈলেশ্বর বালুরঘাট থেকে ফিরেছে, দেখা করেনি, চিঠিও দেয়নি…ডাকে পাঠিয়েছি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’। শৈলেশ্বররা লেখে এক, করে এক, বলে এক, ভাবে আরেক, ছোঃ: ‘এষণা’-র ব্যাপারটা জেনে নিও। চিঠি দিও। লালমোহন বলছিল, ‘ছোটোগল্প’ বেরোবে।

    দেবী রায়

    নালিশ ঠুকেছিল কলকাতার কেষ্টবিষ্টুরা, দুটো নাম জানতে পেরেছিলুম, সন্তোষকুমার ঘোষ আর আবু সয়ীদ আইয়ুব। কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামের সচিব এ. বি. শাহ মুম্বাই থেকে কলকাতায় এসে দেখা করে পুলিশের ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে। আমাকে চিঠিতে লিখে জানায়, “I met the Deputy Commissioner of Police the day after we met at the office of Radical Humanist at Calcutta. I was told that they would not have liked to bother themselves with the Hungry Generation but for the fact that a number of citizens to whom the writings of your group were made available, insisted on some action being taken.”

    আবু সয়ীদ আইয়ুব কতো চটেছিল তা অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা এই চিঠিতে স্পষ্ট:

    Dear Mr Ginsberg,

    I am amazed to get your pointlessly discourteous letter of 13th. That you agree with the Communist characterization of the Congress for Cultural Freedom as a fraud and a bullshit intellectual liberal anti-communist syndicate did not, however, surprise me; for I never thought the Congress had any charge of escaping your contempt for everything ‘bourgeois’ or ‘respectable’. If any known Indian literature or intellectual comes under police repression for their literary or intellectual work, I am sure the Indian Committee for Cultural Freedom would move in the matter without any ungraceful promptings from you. I am glad to tell you that no repressions of any kind have taken place here currently. Malay Roychoudhury and his young friends of the Hungry Generation have not produced any worthwhile to my knowledge, though they have produced and distributed a lot of self-advertizing leaflets and printed letters abusing distinguished people in filthy and obscene language ( I hope you agree that the word ‘Fuck’ is obscene and ‘Bastard’ at least in the sentence “Fuck the bastards of the Gangshalik School of Poetry’, they have used worse language in regard to poets whom they have not hesitated to refer to by name ). Recently they hired a woman to exhibit her bosom in public and invited a lot of people including myself to witness this wonderful avant-garde exhibition ! You may think it your duty to promote in the name of Cultural Freedom such adolescent pranks in Calcutta from halfway round the world. You would permit me to differ from you in regard to what is my duty. It was of course foolish of the police to play into the hands of these young men and hold a few of them in custody for a few days ( they have all been released now ) thus giving the publicity and some public sympathy—publicity is precisely what they want to gain through their pranks. I do not agree with you that it is the prime task of the Indian Committee for Cultural Freedom to take up the cause of these immature imitators of American Beatnik Poetry. I respect your knowledge of European literature but can not permit myself to be guided by your estimation of writers in my language —- a language of which you choose to remain totally ignorant. With all good wishes in spite of our grave disagreements and in admiration of some of your wonderful poems.

    Yours Sincerely
    Abu Sayeed Ayyub

    আবু সায়ীদ আইয়ুব গিন্সবার্গকে লিখে জানাচ্ছে যে হাংরিদের পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। বস্তুত পুলিশ তখন মামলা সাজাচ্ছে আর কাউকেই তখনও ছাড়া হয়নি। আইয়ুব-এর চিঠির প্রেক্ষিতে বিদেশি ও অবাঙালি কবিদের চিঠি পড়া যাক:

    Allen Ginsberg, 704 East, 5th Street, New York, 28 September, 1964

    Dear Malay,

    I saw clippings from BLITZ, Sept 19, 1964 p6 and also I think Calcutta STATESMAN 17 September 1964 that you were arrested as well as Samir and two boys named Ghosh whom I don’t know, for your HUNGRY GENERATION manifestoes. Are these the same as were printed in the issue of KULCHUR#15? As soon as I read about it, I racked my brain about what I could do to help, and so today I wrote a whole bunch of letters to the following:-1 )A.S.Raman, Editor, Illustrated Weekly, Dr. Dadabhai Naoroji Road, Bombay. 2 ) Sharad Deora, Editor,Gyanodaya, 18 Brabourne Road, Calcutta. 3 ) Abu Sayeed Ayub, Editor, Quest ( sent a message to him indirectly), and member of Indian Congress for Cultural Freedom. 4 ) Shyam Lall, Editor, Times of India, New Delhi. 5) Khushwant Singh, novelist and member of Congress for Cultural Freedom, 49 East Sujan Singh Road, New Delhi.
    I also wrote to Jyoti Dutta and phoned Lita Hornick of KULCHUR. I asked them, the Indians above all, what they could do to help you, suggested they activate the congress for Cultural Freedom as this sort of thing is the proper activity of the Congress and Quest magazine, and told them that the manifestoes were printed here in CITY LIGHTS JOURNAL and KULCHUR, and were not obscene. So the whole mess was scandalous bureaucratic illiteracy. Please if you need literary help or advice do try to contact these people for support. And in addition perhaps ask for advice/help from Mrs. Pupul Jayakar, 130 Sundar Nagar, New Delhi—she was our protectress in India, we stayed with her, she’s a friend of Indira Gandhi and others. I also notified Bonnie Crown here in New York, the Asia Society, 112E 64 Street, NYC—she commissioned poetry to be translated by Sunil and others and that pack of poems plus your rhythms etc. will be printed together by CITY LIGHTS. She can send you a letter on her official stationery saying your manifestos are known, published and respected in the US and not considered obscene. I will also enquire about Mr. S.K.Roy, the Indian Consul General here in New York who I do not know what he can do at this distance.
    If there is anything you want me to do let me know. Write to me and let me know what the situation is and what is the cause of the trouble. In judging from BLITZ I suspected jealous ideological Marxists or something. Are you ruined at the bank?? I hope not. Regards to your family. Get the Congress for Cultural Freedom to supply you with a good lawyer who’ll take no fee. If the Indian Congress doesn’t cooperate, let me know, we’ll explain to the European office. Who are the Ghosh brothers? The manifestoes on prose and politics are pretty funny. I thought they were a little literary-flowery, but they MUST HAVE HIT SOME MENTAL NAIL ON THE HEAD. Good Luck.

    Jai Ram

    Allen Ginsberg
    --
    Allen Ginsberg, 704 East 5th Street, NYC, January 11, 1965

    Dear Malay,

    Enclosed copies of letters from KULCHUR, from Abu Sayeed ayub ( 3 letters in answer to mine—each letter 2 pages) and one from A.B.Shah—Congress in Bombay. You should follow their letter up. Congress office in Paris has been contacted & they will probably send some note, notice to the Indian Committee. I answered some of your letters via Utpal—I sent copies of these letters, also, to show Sunil, Jyoti, etc. CITY LIGHTS JOURNAL#2 is on its way to you.
    That Jyoti, Sunil, Sandipan & yourself are all working at slight cross-purposes is making things difficult. I suppose they are embarrassed by your ‘brashness’ (as TIME magazine might term it) or your slight edge of naivete as I would term it. However, if it is possible to reconcile with them & put up a united front it would be best for everybody’s safety. Best thing is to stop all cutty gossip, for it is only mainly gossip that Abu Sayeed is using as an excuse. Obviously they also were questioned by the Police, and so, feel a common threat with you. Don’t get angry at them—just work out a basis where you can all defend each other—and try you now—the only present basis (since there seems to be some literary disagreement) being freedom of literary expression. They all don’t want to be grouped as Hungry exclusively apparently, and they may resent or be scared or not want you to lump them all under your Hungry banner. And this is natural. Once a MOVEMENT gets name and publicity it is also a drawback as I’ve found. Also, the name is irrelevant & a drag sometimes to one’s individuality. See the first sentence of my letter to Shakti, Feb10,1963 that was published in a Hungry type magazine in Bengali. Best not to get angry at anyone—Jyoti, Abu Sayeed—even the police. Think carefully & coolly & get all working together if it is possible. I leave for Cuba in a week and will be back in 2 months.
    Love & Happy New Year
    Allen
    --
    Margaret Randall, Mexico City, June 17, 1965

    Dear Malay,

    Please, please excuse so much time without writing, and now that I finally am able to sit down to write, this jumpy typewriter is driving me out of my mind. The man promised to come this week to fix it but this is Mexico (land of ‘manana’) etc!. How are things going for you—the trial; your case, the things taken from you and your friends, etc.??? All over the world, through EL CORNO, people write asking about you and wish you well, it has caused an international scandal among people in the arts, at least. I hope for good news, please write!!! And the book with Carlos Coffeen’s drawing on the cover—did it come out???

    Under separate cover and by regular surface mail I have sent you two copies of our 13 in which I printed your letters. Hope they arrive one of these days and in good shape. Naturally: when the issue was printed I sent you a copy, but it must have gone astray. I don’t know why Samir Ray received his and you didn’t. Here we are in deep problems with the magazine. No money, for one thing, and tremendous work. Just when EL CORNO seems to have become a world wide interest spiritually and literally, it faces a quick death financially. The change of government here in Mexico in December has thrown us into utter gloom. All our base patronage was cut out from under us, and we were faced with stopping publication altogether, and so we had to turn to a thousand improvised plans to get us through. At the moment we are having a giant art show (more than 50 painters and other artists have donated works to sell for the benefit of the magazine). The show opened at a local gallery a week and a half ago. So far we have sold 18 works, keeping the linotype purring at least through the first part of 15. 15 is now at press and we hope to get through all of it, fingers crossed. I’ll try to use your poem in the first part of next year, but it isn’t at all sure. We have so much work at hand and so little space and money. In reality, space and money are the same thing! Otherwise we are fine. Working like hell! Translating; writing, praying, trying to keep the mag going. Learning daily from our children (now there are three), the youngest is a year old today! Be well. Write. Good luck with the court case! Love

    Margaret Randall
    --
    Allen Ginsberg, c/o City lights, 261 Columbus, SF, Calif, July 11, 1965

    I have been wandering around from Moscow to Havana to Warsaw to Prague & thus didn’t get your letter of Jan 29th, much of which is obsolete by now? I have gotten so many conflicting letters & gossip from every body, I actually have no idea who’s doing what to who in India. Is your trial over or not, & what’s what? I’ve done all I can from here. I went to Cuba, as a judge of a poetry contest ( and later got kicked out for talking too much). It was a Latin American contest, the judges (as myself) all had to be able to read Spanish. Also they’d published poetry of mine & I had friends there and I had spent years in South America. So I got invited. I’ve been back a week & will leave again for San Francisco in 2 days. Then settle down to solitary poesy again. Write me news. I haven’t much time to correspond, though, except in big emergencies.
    As ever
    Allen
    --
    Daisy Aldan, 325 East 57 Street, New York, February 1, 1966

    My dear Malay Roychoudhury
    A friend of yours, Howard McCord, has sent me your address. I am distressed to hear about your plight, and hope that the situation will be ameliorated as soon as possible, even though, I do not at present, agree with the kind of poetry you and your friend are writing. I think YOU ARE EXTREMELY TALENTED. I am a poet myself and Editor, and a great associate of the Avant Garde. I consider myself in the forefront of the true Avant Garde. I published a magazine called FOLDER which presented poets whose work could not be published elsewhere because of its contemporaneity. But I think what you are doing now is first of all, passé, and second of all, a debasement of the spirit and language. I also think it is all wrong for India, and that there is room for excellence and contemporaneity without debasement. However, this is just my opinion, and I am sure you have good reasons for yours. You certainly should not be persecuted for your poems.
    The major reason for this letter is to let you know that I am editing a book for Thomas Crowell called POEMS OF INDIA and I would be happy to consider some of your poems, and those of your friends. I wish to include poems of every region of India. Since the book is directed to young people, I can not publish any of the poems of the nature of the one Howard McCord published (a copy of which I have). If you wish to choose poems that do not deal with sex in this way, then I shall be more than happy to consider including them. I am eager to publish much contemporary work. Also any suggestions you may have about poems of the past which should definitely be included would be deeply appreciated. If any of your friend wishes to send me poems, then they should include a brief biography and permission for me to use.I will send you under separate cover, my own poems: THE DESTRUCTION OF CATHEDRALS, SEVEN:SEVEN, and A NEW FOLDER:AMERICANS:POEMS AND DRAWING, an anthology. Since it takes months for mail to get to India, I hope your answer will arrive before you receive them. All submitted poems, by the way, must be in English or translations. I spent four months in India last year—mostly in Bombay and gave a lot of readings of my work. I met many poets whose work I admire, among them, Padgaonkar, Karandikar, Ezekiel, Bapat, Katrak.I love India, and happy to be involved in this project. My best wishes to you, and I look forward to hearing from you soon.
    Fraternally,
    Daisy Aldan
    --
    Lawrence Ferlinghetti, San Francisco, 26 March, 1966

    Dear Malay:
    I have read the legal decision on your case, and thank you very much for sending it. I find it laughable. I want to publish it together with your poem STARK ELECTRIC JESUS in the next ‘City Lights Journal’ which will be out this coming summer, and I enclose a small payment immediately, since I know you must need it desperately. I am sending a Copy of this letter to Howard McCord. Perhaps he knows the answers to the following questions and will send them to me right away, since time is of essence, and it may take some time to get a reply from you. I think it is a wonderful poem, and I will certainly credit McCord for having first published it. Bravo. Allen is in NY and his new address is: 408 East 10 Street, (Apt 4C), New York, NY. I need to know the answers to the following questions: (1). Was the poem first written in Bengali and was it the Bengali or the English version which was seized and prosecuted? (2). Is this your own translation, or whose is it? (3) Do you wish me to use the typewritten copy of the poem which you sent me last year, or the version printed by McCord? (I find some differences.) Let me hear as soon as you can. Holding the press.And Good Luck. I hope you are still able to survive! With love.

    Lawrence Ferlinghetti
    --
    Octavio Paz, New Delhi, The 16th of July, 1966

    Dear Mr. Choudhury:
    Last time I was in Calcutta, I met some of your friends who talked to me about you.I hope I shall find an opportunity to meet you when I visit your city or whenever you get a chance to come to Delhi. Meanwhile please accept my best regards.
    Cordially yours,
    Octavio Paz
    --
    Ameeq Hanfee, 104 Gandhi Park Colony, Indore, 26 July 1966

    My dear Malay,
    I am extremely grateful to you for your permission to translate your poem ‘Zakhm’ into Urdu. I assure that the Urdu version of your poem will do full justice to it and may even sound better than the Hindi one. The Hindi translator has done his job very well, no doubt, but at places either he or the press has not been very careful in the use of ka! ki! Ke! etc., as well as certain Urdu words. On the whole the Hindi version seems to be a fairly faithful reproduction of the mood, spirit and expression of the original. I had written to Basak to send me literature of and on the Hungryalist writings and movement, and he had promised to enlighten me, but I did not get anything except his own article, the Calcutta Presidency Court judgment and the Hindi version of ‘Zakhm’. Whatever I know about your movement is through what I read in BLITZ, TIME, DHARMAYUG, MARAL, GYANODAYA, ANIMA, and LAHAR. I wish to go still deeper before venturing to write about the Hungryalists in Urdu. I am a poet and find your poetry—Hungryalist poetry—full of inspiration, freshness, fire and oxygen. I am looking forward to the day when we will meet and not only compare notes but also exchange heart and mind. I was all the more interested in ‘Zakhm’ because I found that you and I share a lot of common ground. There are so many lines in ‘Zakhm’ which express the same or similar experiences I have expressed in my long poems ‘Sindbad’, ‘Sharzad’ and ‘Shabgasht’. I must give you the credit of being more modern—rather up to date in your imagery, diction and poetic statements than I could be. Still your wound is not very different from mine. Let us all succeed in exploding the atom for real peace and freedom—the atom of our individual experience. After all the subterranean source is the same from which we all have our blood-lines connected. With admiration, regards and love
    Ameeq Hanfee
    --
    Dan Georgakas, Box 418, Stuyvesant Station, New York, New York 10009, August 23, 1966

    Dear Malay,
    Sorry to be so long about writing but you can see I have been moving around. Your ‘In Defense of Obscenity’ is a beauty. Allan Van Newkirk is going to print it in GUERILLA. Allan and I are not connected with Artists Workshop except for in the most casual way. Smyrna Press is separate and so too is the new GUERILLA. Karl Heinz Weissner tells me he has contacted you (at my urging), and he is tuned on by Stark Electric Jesus. I hope you will dig my own Manifesto For The Grey Generation. Allen and I have founded a group called The League of Revolutionary Poets: Torp. We combine politics with poetry-in-happening—action events. Example: On August 6th we attended a peace parade and hung Johnson in effigy and flew the NLF flag. August 7th we attended the Festival of People at Artists Workshop, and held a mock trial (they had no warning) of love-dove poems, which angered many in the audience. August 9th: Anti-war poems: reading at downtown rally. August 13th: letter to paper congratulating Detroiters on letting their Greek Theatre die since any nation supporting a Vietnam atrocity could not support Gk Theatre too. New activities: war crime tribunal in Detroit, melon poetry reading in Pittsburgh, trial of love in Chicago. We seek creative vandalism. Today I read a foul story in the Village Voice. Wiped my ass with it and sent it into the paper. I am getting a squirt gun and will fill it with paint. Shoot when ready, the Grey Generation. I want to go to the opening night of the Opera when all the shitheads are there, and hurl anti-war poems from the galleries when the war-criminals enter. DADA lives. SURREALISM returns. Lasslett in Australia, Weissner in Germany. Nutall in Britain. Partisans of the world unite. Towers, open fire.Doubleday & Co will anthologize a poem for me. Story in homosexual magazine. Poem in communist magazine. Makes me a capitalist homosexual communist dog or a chameleon. Clifton de Berry is our man. io! ee! This is the world, begins with a BaaaaaaaaaaannnnnnnngggggggGGGGGGGGG…..’’’’’ Wichita Vortex Sutra—–wonderful. Ginsberg reads in Washington Square on Sunday to test new law about pornography and such. Allen says he has sent Miller’s Sexus. Prices sky high in New York. Faces ugly. Squalor everywhere. But a vitality. The Blacks are beautiful. Anger. Revolution. You must stay in India and smash them. This is the age of sabotage and subversion. Smash the word. Destroy the logic. Warp the system until it snaps. Love, oxygen, semen, tulip buds, serendipity syringes—-breakthrough in the grey room—dan georgakas
    Dan
    --
    Carl Weissner, 24 September 1966

    Dear loving brother guru
    This finds me in the process of recovery from illness & series of bringdowns & now again working diligently on issue 4 of the mag….before the sickness had led my metabolic blues astray. I had got a job & they had to pay me for the whole period of illness which is the only pleasant thing about a job,…I have been able to cut costs for printing the mag down to something like 150 bucks, but still…Tell me: did you get your copy of the manifesto? (I mailed two copies to Subimal Basak) and did you get my last letter? What abt the proceedings of appeal? already over? And what is the outcome? favourable for you I hope!….yes will write to Donatella…..she has just sent an English translation of her Ginsberg essay which appeared in ‘Studi Americani’ in Italy last year…also good letters from Carol and Dan…. YES! BY ALL MEANS SEND THE TYPE SCRIPT OF LIFE , ARREST, TRIAL, GINSBERG, CALCUTTA!!!!! Listen:!! Gerard Malanga just sent a large and fantastic collection of poems, 4 of them dedicated to Allen! Also magnificent photos of Allen and himself! He will probably also write for KLACT abt his friendship with Allen! And Diana Di Prima sent a collection of cute short poems, all from 1957….all this will be included in KLACT 5 (spring 67)…I have also written to Allen & asked him to contribute original work, hoping he be willing to do so…COULD YOU WRITE HIM AND TELL HIM A FEW GOOD WORDS ABOUT ME AND KLACTO PLAN AND URGE HIM TO SEND STUFF??!!!! He is at 408 East 10th Street, Apt. 4C, New York, NY 10009…I have not yet found time to contact the people you told me, but will do so any day now….I will concentrate on Subimal’s and your work, tho… in No 5….but may be I will also contact Howard McCord (please give me his address!)….if it shd turn out that I have space left for more Bengali/Indian in No 5….. DID YOU RECEIVE THE ‘ICONOLATRE’ ISSUE I SENT YOU??!!! Also Larry Eigner sent me more poem: today, which will be in KLACT 5…yeah, things are really swinging now!….I am also thinking of publishing George Dowden’s new great visionary poem RENEW JERUSALEM in a limited edition, sometime later this year, if I have the money….(!)….. The English original of your article of course will be in KLACT, and I will translate it into German, too, and look around for possible publication in German mag…ok? O YEAH! Looking forward to translated passages from ‘JAKHAM’ plus one page in original BENGALI! GREAT! Please note: Bengali pages, if possible, should be written on white sheet of paper in black ink, and should be sent whole, that is, not folded—-so that it can be used for repro…. Do you know MAHENJODARO (ed. Samir Roy, 55/4 Natabar Pal Road, Howrah)? What is it like?—and POETRY TODAY (ed. Nissim Ezekiel, The Retreat, Bellasis Road, Bombay 8)? Qk. So much for this time. All best to you, Love
    Carl
    --
    Carl Weissner, 5 December 1966

    Dear malay
    The great sky is open—-northern Italy washed away in vast mud & storm chaos & deluge—-desperate letters from Donatella Manganotti—-priceless artwork destroyed forever—and just a few minutes ago I hear in the news that they are in for yet another meteorologic showdown—Bihar province like a vast dried-up cunt I gather—hunger & revolts everywhere—German government collapsed, neo-Nazi movement scoring for the gaps: Christian & Social Democrats joining forces to make a last desperate attempt at saving the old ship St. Nanana already half drowned—Hanoi set ablaze by efficient hordes of technicians of death masterminded by sick pentagon eunuchs & a corny Texan cowboy putting out fake charismatic vibrations that materialize in tons of explosives & charred remnants of Asian bodies enabling Wall Street to hang on for another fiscal year—you see how they are caught in loops and spins of lethal genetic roulette—a uniform grey generation scurrying among nuclear debris of heavily infected areas of cancerous mind like rats in terminal stage of dream withdraw eating erogenous holes in huge chaotic setup of punch-cards that represent lives marked for Total Disposal—one more turnstile before the whole shithouse blows up—Nova Criminals wishing up dwarfed marks everywhere on this sick planet—SECONDS TO GO—you can already hear that heaving human blues heading for its irrevocable Dead Whistle Stop—so? Burning heavens, mister—nova armies conspiring across the wounded galaxies—icarus, nova-directed asteroid, due to blot out a terrestrial spot of bother the size of new york or tokio or London, on june 15, 1967—or September 13, 1968—what’s the difference—with the impact of one thousand hydrogen bombs—you see how things have grown to hitherto unimaginable bad proportions—a disarmament conference would have to include representatives of Nova, Interzone & Minraud, and there’s little chance that one could ever bomb this intergalactic gook rot to parley—and god knows how many of their agents are already operating among us disguised as word & image technicians seconds to go—we’ve got to attune our paranoiac feelers to that vast danger around us, spot them wherever they show a blind spot & stop them dead in their tracks—
    In order to achieve this we have to provide ourselves with an insight into their methods & operating schedules, and the work of Bill Burroughs & a few other semantic cosmonauts shows precisely who they are & how they operate—in supersonic patterns of sense-wave control—or long, medium, short & ultra short waves of the world—in cozy bed sitters, court-rooms, arenas, parliaments, newspapers, or gone streets—in subcutaneous offices of annexed brains around the paralyzed globe—right where you are sitting now there in Bad News Department walking in on you cool & casual with a perfunctory ‘hello there’—and metamorphosing you into an obedient Hate Virus host in a matter of seconds—if you are not fully aware—each second & if you do not know who they are & how to fight them—now—in forthcoming issue of KLACTOVEEDSEDSTEEN you will find more details & outlines of steps to be taken towards an immediate universal survival training in a piece by Mr. Burroughs & Mr. Weissner; called LAGUERRE PARTOUT (war everywhere), precisely showing some of the hideous techniques by which the nova criminals try to mono-police & control & manipulate so-called ‘reality’ in order to subvert & takeover mind & consciousness of every single of us—
    Carl
    --
    George Dowden, London. 22 April 1967

    Dear Malay,
    Good to hear from you; glad you have some kind of job now. I’ve gotten together with Utpal Basu here, good bloke, but doesn’t seem to be doing any writing here; just teaching. He introduced me to the shehnai (recording: The Magical Shehnai of Bismillah Khan), which is a lovely instrument. I dig the morning raga on that recording, but not the evening one particularly. I also wrote to Dick Bakken about collecting SALTED FEATHERS, just yesterday. I am about to write to the National Library of India about Ginsberg, as you suggested. Meanwhile, if you have spare copies of any Indian mags he was in, please send, like UTTARSURI of Dec 1963, MOHENJODARO of 1963 etc. AS I said, I’ll pay—or send you things in exchange. You mentioned wanting books on Cubism, Surrealism and Dadaism—there is a good series here, which includes all of these, a book on each; the publisher is Thomas Hudson; the Cubism book is by Edward f. Fry, Surrealism by Patric Waldberg, Dadaism by Hans Richter. Do you have these available there? If not, I’ll get them for you and send them. Let me know. Did RENEW JERUSALEM arrive all right? Let me hear you about it. Seeing lawyers now, wanting to safely bring out an edition here. America is getting worse and worse; lies and destruction, a threat to the whole world. Fortunately the youth are not listening to their bullshit except to jeer at it, and as long as that goes on, can not be stopped, there is hope. If the totalitarian impetus in America gets its own way, and all the power, then all hope is gone. South America would become the next Vietnam, and so on. But I think they will be stopped—though not until more blood flows. Let me know how you are doing. Write soon. Cheers,
    George Dowden

    পাঁচ : আইন আদালত : প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার

    ১৯৬৩ সালে আমি ৯০ লাইনের কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ লিখেছিলুম। কবিতাটা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে। প্রকাশের পর আদালতে হাংরিদের বিরুদ্ধে তিনটি ধারায় মামলা হয়। কবিতাটি "হাংরি বুলেটিন ১৯৬৪" সংখ্যায় প্রকাশের পর হাংরির মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভারতীয় দণ্ড বিধির ১২০বি (রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র), ২৯২ (সাহিত্যে অশ্লীলতা) এবং ২৯৪ (তরুণদের বিপথগামী করা) ধারায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। যারা সংখ্যাটিতে লিখেছিল তাদের মধ্যে ছয়জনকে কলকাতা পুলিশ গ্রেফতার করে। ১৯৬৫ সালের মে মাসে বাকি সবাইকে মুক্তি দেয়া হলেও আমার বিরুদ্ধে ২৯২ ধারায় চার্জশীট দেয়া হয় আর ৩৫ মাসব্যাপী মামলা চলে। আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত এবং সত্রাজিত দত্ত আর বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, পবিত্র বল্লভ, সমীর বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু। পবিত্র বল্লভ আর সমীর বসু ছিল পুলিশের খোচর, ভুয়ো সাক্ষী।ব্যাঙ্কশাল কোর্ট আমাকে সর্বোচ্চ সাজা ২০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে একমাসের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল। গ্রেফতারি পরোয়ানার দরুন কবি উৎপলকুমার বসু অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়। ঔপন্যাসিক সুবিমল বসাক আর কবি দেবী রায়কে কলকাতা থেকে মফঃস্বলে বদলি করে দেয়া হয়। ১৯৬৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ব্যাঙ্কশাল কোর্টের রায় নাকচ হয়ে যায়। কবিতাটা বিভিন্ন ভাষায় ভারতের, পূর্ব এশিয়া আর ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত 'মর্ডান অ্যান্ড পোস্টমর্ডান পোয়েট্রি অফ দ্য মিলেনিয়াম" সংকলনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে একমাত্র কবিতা হিসেবে কবিতাটা অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটা এখানে দেয়া হলো

    'ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
    আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
    আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
    সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
    শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ-আঙরাখার ভেতরে চলে যেতে দাও
    চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
    সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
    আর আমি পার্ছিনা, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
    আমি যানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
    প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
    শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
    মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
    তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম
    কিন্তু কিছুই ভালো লাগে না আমার কিছুই ভালো লাগছে না
    একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
    ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন
    কবিতার আদিত্যবর্ণা মুত্রাশয়ে
    এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ
    সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা
    ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
    শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়
    দিতেই হবে শুভাকে
    ওঃ মলয়
    কোল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
    কিন্তু আমাকে নিয়ে কী কোর্বো বুঝতে পার্ছিনা
    আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
    আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
    আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
    প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
    অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
    শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার
    অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্থতা
    যোনিকেশরে কাঁচের টুকরোর মতো ঘামের সুস্থতা
    আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
    আমি বুঝতে পার্ছিনা কী জন্য আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
    আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণ চৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি
    আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোর্তে হবে
    শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমাকে
    জন্মমুহুর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
    আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
    মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
    তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
    শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
    তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাততাড়িত কঙ্কাল
    আমাকে তোমার গর্ভে আমারি শুক্র থেক জন্ম নিতে দাও
    আমার বাবা-মা অন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
    সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?
    আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
    শুভা না থাকলে আমি কি পেশাদার ভালোলোক হতুম মৃত ভায়ের
    ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
    শুভা, ওঃ শুভা
    তোমার সেলোফেন সতিচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও
    পুনরায় সবুজ তোশকের উপর চলে এসো শুভা
    যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়
    ১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে
    তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ
    পাঁজর নিকুচি-করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে
    হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
    আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
    মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছিনা
    তুল্কালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়
    সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
    শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব
    কবিতার জন্য আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
    শুভা
    আমাকে তোমরা ল্যাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোর্তে দাও
    দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
    বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে
    কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে
    কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁ পেচেছাপে বয়ে যাইনি
    কেন আমি রজঃস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায়
    অথচ আমার নিচে চিত আধবোজা অবস্থায়
    আরাম গ্রহণকারিনী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার
    এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
    আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
    এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
    মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
    আমি মরে যাব
    ওঃ এ সমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে
    আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না
    পায়জামার শুকিয়ে যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে
    ৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
    ঝাঁকে ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
    এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
    হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌন-পর্চুলায়
    ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখী আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
    কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠ খেয়োখেয়ি।'

    ২০১৪ সালে এই কবিতা অবলম্বনে মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায় এবং হ্যাশ তন্ময় একটি নির্বাক স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ চলচ্চিত্রটি ব্রিটেনের নো গ্লস লিডস্‌ ইণ্টারন্যাশানাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সহ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, প্যারিস, বার্সেলোনা, জার্মানি, স্পেনসহ মোট ১২টি দেশের ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অফিসিয়াল সিলেকশন এবং স্পেনের ম্যাডাটাক ইণ্টারন্যাশানাল ফিল্ম ফেস্টিভেলে সবচেয়ে আশাপ্রদ ভিডিও শিল্পীর (Most Promising Video Artist) পুরস্কার পেয়েছে।

    ছয় : উত্তরবঙ্গ আর ত্রিপুরায় হাংরি যুগ

    আশির দশকের শুরুতে শিলিগুড়ি থেকে অলোক গোস্বামীর সম্পাদনায় ‘কনসেকট্রেশান ক্যাম্প’ আর মনোজ রাউতের সম্পাদনায় ‘ধৃতরাষ্ট্র’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে হাংরির শরীরে নতুন রক্ত এনেছিল কয়েকজন তরুণ কবি-লেখক, যাদের মধ্যে উল্লেখ্য , অলোক গোস্বামী, অরুণেশ ঘোষ, রাজা সরকার, সমীরণ ঘোষ, মলয় মজুমদার, বিকাশ সরকার, জীবতোষ দাস, মনোজ রাউত, রতন নন্দী, নিত্য মালাকার, সুব্রত রায়, নকুল মণ্ডল, তনুময় সরকার, দিবাকর ভট্টাচার্য, বিজয় দে, অন্যমন দাশগুপ্ত, জামালউদ্দীন, অনুভব সরকার, সুমন্ত ভট্টাচার্য, পল্লবকান্তি রাজগুরু, চন্দন দে, প্রবীর শীল, কিশোর সাহা, কুশল বাগচি, দেবজ্যোতি রায় প্রমুখ।

    হাংরি যুগ আরম্ভ হয়েছিল ১৯৬১ সালে আর কিছুটা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল মামলার পর, যদিও সুভাষ, শৈলেশ্বর, বাসুদেব, প্রদীপ ‘ক্ষুধার্ত’ নামে একটা পত্রিকা কলকাতা থেকে প্রকাশ করছিল: কিন্তু আশির দশকে উত্তরবঙ্গে হাংরিকে নতুন উদ্দীপনা দিলো কুড়ি-বাইশ বছরের তরুণের দল ‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার শারদ ১৪২২ সংখ্যায় স্মৃতিচারণ করাকালে অলোক গোস্বামী লিখেছে : “দিব্যি চলছিল প্রতিষ্ঠার সাম্পানে সওয়ারি হওয়ার লড়াই। মাঝপথেই হঠাৎ রাস্তাটা বাঁক নিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে গেল। সবার নয়। আমাদের কয়েকজনের। নিজেরাই ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ঘোরার ভাবনাটা বদলাতে সাহায্য করেছিল কিছু সাহচর্য ও লেখাপত্র। জেনেছিলাম সাহিত্য নিছকই বিনোদনের মাধ্যম নয়। নয় ভাতঘুমের সহায়ক বটিকা। পাঠক রুচি নামক ইওটোপিয়াকে সামনে রেখে শিল্প-সংস্কৃতির যে বেসাতি চালু আছে তার মূল উদ্দেশ্য শুধুই মুনাফা নয়, জনচেতনাকে দাবিয়ে রাখাও। সাহিত্য এবং জীবনকে একই মুঠোয় ধরতে হয়। এবং সত্য কোনো একমাত্রিক বিষয় নয়। প্রকৃত সত্যকে গোপন করতেই কলাকৈবল্যবাদ কিংবা প্রগতিশীলতার তত্ত্বের জন্ম। লিটল ম্যাগাজিনের মূল উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানের লেখন সাপ্লাই করা নয়, কিংবা নয় হাত পাকাবার আসর। লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে আরেকটি শব্দ ওপ্রোত জড়িত— ‘আন্দোলন’। যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য, পাঠককে সচেতন করে তার প্রত্যাশা বাড়ানো। তেজস্ক্রিয় ভাষা মারফত প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা। প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণা জীবনের তলা থেকে উঠে আসে না। সুতরাং গা গতরের ভাষা ব্যবহার করে ভাষাকে এলিটিজম থেকে মুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ কিনা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে হবে। আমরা কয়েকজন আস্হা রাখলাম নতুন শ্লোগানের সঙ্গে— ‘প্রতিবাদের সাহিত্য’।”

    উত্তরবঙ্গের এই হাংরিরা আমার লেখাপত্রের সঙ্গে পরিচিত ছিল। তারা জানতো না যে আমার ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল; মুচলেকা দিয়ে তাতে রাজসাক্ষী হয়েছিল শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ। তার মানে উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলনকে আবার জাগিয়ে তোলায় আমার কোনো ভূমিকা নেই। আদি হাংরি আন্দোলনের মতন তারাও স্বয়ম্ভূ। ওই একই প্রবন্ধে অলোক গোস্বামী লিখেছে, “যা পড়লাম তা মাথা বিগড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা। পরিচিত হলাম সুভাষ, শৈলেশ্বর, ফালগুনী, প্রদীপ, বাসুদেব, অরুণেশদের লেখাপত্রের সঙ্গে। হাতের কাছে পেয়ে গেলাম রোল মডেল। ব্যাস শুরু হয়ে গেল মফঃসসল শহরে আমাদের জেহাদি জীবন। আমরা কয়েকজন নিজেদের পত্রিকার ঝাঁপ নামিয়ে প্রকাশ করলাম যৌথ-সম্পাদিত কাগজ — ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’। ক্ষুধার্তদের সঙ্গে যখন আমাদের যোগাযোগ হয়, ততদিনে জেল-জরিমানা পর্ব মিটে গিয়ে ক্ষুধার্ত আন্দোলনের ওপর থেকে প্রচারের আলো সরে গিয়েছে দূরে। নতুন প্রজন্মের কাউকে আকর্ষণ করতে পারছিল না ক্ষুধার্ত আন্দোলন। সুতরাং বলা যেতেই পারে, আটের দশকে ক্ষুধার্ত চেতনার পুনরুথ্থান ঘটেছিল শিলিগুড়িতে। এবং তা ঘটিয়েছিল ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’। তারপর সমগ্র উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল হাংরি চেতনা। ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’-এর পাশাপাশি অন্যান্য শহর থেকেও প্রকাশিত হয়েছিল অজস্র পত্রিকা, যেমন ‘জিরাফ’, ‘রোবট’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘কুরুক্ষেত্র’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘দ্রোহ’, ‘বিকল্প’ ইত্যাদি।” উত্তরবঙ্গের তরুণ হাংরি আন্দোলনকারীদের ওপর প্রথমে নেমে এলো উপেক্ষার খাঁড়া। তারপর কলকাতা নিবাসী এক কবি, যিনি উত্তরবঙ্গেরই লোক, তিনি সাংস্কৃতিক-রাজনীতি করে, উত্তরবঙ্গের হাংরিদের যৌথতাকে ভেঙে দেবার প্রয়াস করলেন ও সফল হলেন; ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’ ভেঙে গেল এবং শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। ‘চন্দ্রগহণ’ পত্রিকার ওই সংখ্যায় রাজা সরকার লিখেছেন, “ এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে প্রায় দুই দশক অতিক্রান্ত হলেও হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে শিলিগুড়ির লেখক-জগৎ তখনও অন্ধকারে। খোঁজ খবর বইপত্র কিছুই পাওয়া যায় না। তার ওপর তখনো অতীতের নানা চাপের ফসল হাংরি লেখকদের ওপর দায় হিসাবে রয়ে গেছে। পত্রিকা বের হয় না। নিজেরাও তাঁরা তখন অনেকটা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। আজ আর অস্বীকারের উপায় নেই যে ষাট দশকের হাংরি লেখকরা ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’-এর মাধ্যমেই উত্তরের এইসব অঞ্চলে পরিচিতি পান। আমরা টের পেলাম একটা হাংরিয়ালিজম দানা বাঁধছে কিছু হাংরি লেখকের মনে। দুই দশক পরে তখন আন্দোলনের একটা তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। হাংরি ম্যানিফেস্টোর অসম্পূর্ণতা দূর করার চেষ্টা। ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’ সেই কাজে কিছুটা ব্যবহৃত হয়েছে।”
    অলোক গোস্বামী তাঁর মেমারি লোকাল বইতে লিখেছে, “সদ্য প্রকাশিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বগলে নিয়ে এক ঠা ঠা দুপুরে আমি হাজির হয়েছিলাম শৈলেশ্বরের বাড়ির গেটে। একা। ইচ্ছে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে মুখোমুখি বসে যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবো। যেহেতু স্মরণে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তাই আস্থা ছিল শৈলেশ্বরের প্রজ্ঞা,ব্যক্তিত্ব,যুক্তিবোধ তথা ভদ্রতাবোধের ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শৈলেশ্বর আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন এবং যৌথ আলোচনাই পারবে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন উদ্যমে একসাথে পথ চলা শুরু করতে। কিন্তু দুভার্গ্য বশতঃ তেমন কিছু ঘটলো না। বেল বাজাতেই গেটের ওপারে শৈলেশ্বর। আমাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে ফেললেন।
    –কী চাই!
    মিনমিন করে বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলবো।
    –কে আপনি?
    এক এবং দুই নম্বর প্রশ্নের ভুল অবস্থান দেখে হাসি পাওয়া সত্বেও চেপে গিয়ে নাম বললাম।
    –কি কথা?
    –গেটটা না খুললে কথা বলি কিভাবে!
    –কোনো কথার প্রয়োজন নেই। চলে যান।
    –এভাবে কথা বলছেন কেন?
    –যা বলছি ঠিক বলছি। যান। নাহলে কিন্তু প্রতিবেশীদের ডাকতে বাধ্য হবো।
    এরপর স্বাভাবিক কারণেই খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম কারণ আমার চেহারাটা যেরকম তাতে শৈলেশ্বর যদি একবার ডাকাত, ডাকাত বলে চেঁচিয়ে ওঠেন তাহলে হয়ত জান নিয়ে ফেরার সুযোগ পাবো না। তবে ‘ছেলেধরা’ বলে চেল্লালে ভয় পেতাম না। সমকামিতার দোষ না থাকায় নির্ঘাত রুখে দাঁড়াতাম।
    ভয় পাচ্ছি অথচ চলেও যেতে পারছি না। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে আরও খানিকটা জানা বোঝা জরুরি।
    –ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। তবে পত্রিকার নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে সেটা রাখুন।
    এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন শৈলেশ্বর।
    –কোন পত্রিকা?
    –কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।
    –নেব না। যান।

    এরপর আর দাঁড়াইনি। দাঁড়ানোর প্রয়োজনও ছিল না। ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি ব্যক্তি শৈলেশ্বর ঘোষকে চিনতে ভুল হয়নি আমাদের। আর এই সমঝদারি এতটাই তৃপ্তি দিয়েছিল যে অপমানবোধ স্পর্শ করারই সুযোগ পায়নি। Aftershock শুরু হলো তারপর। শৈলেশ্বরের হাত ঝাপটানিতে ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ থেকে সরে গেলেন অনেকে। অরুণেশ তো সরে গিয়েছিলেনই, সঙ্গে নিয়ে গেলেন তাঁর কিছু কাছের মানুষজনকেও যাদের কাউকে কাউকে আমরাও কাছের মানুষ ভাবতাম। তাতে অবশ্য আমাদের কিছু এসে গেল না। বরং কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পের কভারে লিখে দিলাম, “সত্যের ঘাত অসহ্য হলে বুর্জোয়া ভাইরাসেরা গড়িয়ে যায় নিজস্ব ভাগাড়ের দিকে।” লিখে দিলাম, “ জানি পাঠক, তুমি পাজামা কিংবা পেন্ডুলাম নও।” কিন্তু আমাদের কিছু না এসে গেলেও একজনের গিয়েছিল, সুভাষ ঘোষের। চটে গিয়েছিল সুভাষ-শৈলেশ্বর রসায়ন। যদিও নিজস্ব অবস্থান এবং অসহায়তার কথা বন্ধু ‘শৈলেশ’কে আপ্রাণ বোঝাতে চেয়েছিলেন সুভাষ কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই ব্যর্থতা এতটাই চরমে উঠেছিল যে খোদ কোলকাতাতেই শৈলেশ্বরের ইশারায় সুভাষকে শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিতও হোতে হয়েছিল। বাল্যবন্ধুর সেই লাঞ্ছনা সংবাদ উত্তরবঙ্গের অনুচরদের কাছে পৌঁছে দিতে দ্বিধা দেখাননি শৈলেশ্বর ঘোষ।

    হাংরি যুগের যে কবিকে বলা যায় সবচেয়ে প্রতিভাবান, সে উত্তরবঙ্গেই থাকতো আর ‘জিরাফ’ নামে একটা হাংরি পত্রিকা সম্পাদনা করতো। তাতে আমার সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। তার নাম অরুণেশ ঘোষ। তার সম্পর্কে ভূমেন্দ্র গুহ ‘গোঁয়ারগোবিন্দ অরুণেশ ঘোষ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘‘আনন্দবাজার পত্রিকা'র এক-কালের দোর্দন্ডপ্রতাপ ব্যক্তিত্ব, সন্তোষকুমার ঘোষ, শোনা যায়, কোনও এক সময় তাঁর কোনও-কোনও সাহিত্য প'ড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন, এবং তাঁর দারিদ্রের বিষয়ে জানতে পেরে তাঁকে আনন্দবাজার পত্রিকা'য় একটা চাকরি দিতে চেয়েছিলেন; অরুণেশ নিজেকে অপবিত্র করতে চাননি ব'লে সবিনয়ে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, আনন্দবাজার পত্রিকা'য় চাকরি করতে-করতে তিনি অবশ্যই বেশি চালাকচতুর হবেন, টাকাকড়ি বিষয়ে দুশ্চিন্তা অনেকটাই কেটে যাবে হয়তো তাঁর, পারিবারিক দায়দায়িত্বগুলিও বেশি ভদ্রস্থভাবে সামলাতে পারবেন, কিন্তু এক সময় হয়তো চার্লি চ্যাপলিন'র মডান টাইমস ছবিটার চার্লি'র মতন খাঁজ-কাটা ক'টা ঘুরন্ত চাকার খপ্পরে অসহায়ভাবে প'ড়ে যাবেন, এবং কাজটা সঠিক করেছেন ব'লে নিজেকে নিজে বোঝাতে থাকবেন। তা অসহনীয় ভাবে বড়ো দুঃখের হবে তাঁর পক্ষে। ভয়টা কাটাবার জন্য সন্তোষকুমার ঢের বুঝিয়েছিলেন তাঁকে, সবারই-যে এ-রকম হতে হবে, তার কী মানে আছে, যার হয়, তার নিজের অনবধানতাবশত হয় অথবা জ্ঞানতই হয়, কিন্তু ভবি ভোলেননি।”

    সাত দশকের মাঝামাঝি অরুণেশ ঘোষ তার "জিরাফ" পত্রিকার মাধ্যমে হাংরিকে আবার চাঙ্গা করে তুলেছিল। অরুণেশ উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার হাওয়ার গাড়ি গ্রামে বসবাস করতো আর উত্তরবঙ্গে প্রায় কুড়ি জন কবি ও লেখককে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নতুন হাংরিদের মধ্যে পরবর্তীকালে যারা খ্যাত হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ছোটোগল্প লেখক অলোক গোস্বামী, আর কবি রাজা সরকার , নিত্য মালাকার, জীবতোষ দাশ, সমীরণ ঘোষ, মনোজ রাউত, বিকাশ সরকার, সুব্রত তায়, নকুল মণ্ডল, তনুময় সরকার, দিবাকার ভট্টাচার্য, বিজয় দে, অন্যমন দাশগুপ্ত, জামালুদ্দীন, অনুভব সরকার, রাজীব সিংহ, মলয় মজুমদার, সুমন্ত ভট্টাচার্য, অরুণ বণিক, সেলিম মুস্তফা, রসরাজ নাথ প্রমুখ।। উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও অরুণেশ সারাজীবন নিজের গ্রামে বুনিয়াদি স্কুল শিক্ষক ছিল। গ্রাম ছেড়ে যেতে চায়নি কলকাতায়। গ্রামের বাড়িতে একান্নবর্তী পরিবারের অরুণেশই ছিল কর্তাব্যক্তি। সেকারণে তাকে ব্যতিক্রমী গৃহস্হ কবিও বলা হয়। অরুণেশ বিশিষ্ট সাঁতারু ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও পুকুরে স্নান করার সময়ে জলে ডুবে মারা যায়।

    কলকাতা মেট্রোপলিস থেকে বহুদূরে সম্পূর্ণ গ্রামীণ পটভূমিতে তারা নিয়ে এসেছিল গ্রাম ও গঞ্জের পাগল, গণিকা, মাতাল পুরুষ, বেশ্যালয়ের উঠোন, নগ্ন কিশোর, দালাল, ধর্ষক, খুনি, অপরাথী, সন্ন্যাসী, বিকলাঙ্গ, প্রসবঘর, ভাটিখানা, সিফিলিস, বেশ্যার সন্তান, গর্ভফুল, ভবঘুরে, গ্রামীণ রাজনীতি, দলতন্ত্র, ক্যাডারদের অত্যাচার, শ্মশান ইত্যাদি। ব্যক্তিমানুষের প্রান্তিক অস্তিত্ব, কৌম জীবনের ব্রাত্য, অন্ধকার দিকগুলো বার বার উঠে এসেছে তাদের লেখনীতে। সামাজিক স্হিতিজাড্য, নিয়ন্ত্রিত জীবনচর্চার বিপ্রতীপ অবস্হানে তারা আস্হা রেখেছিল। অস্হিরতা, তীব্র সংঘাত ইত্যাদির ভিতর দিয়ে গূঢ় উপলব্ধির স্তরে নিয়ে যেতে চেয়েছে পাঠবস্তুকে। তার সংগে মিশিয়েছে উত্তরবঙ্গের লৌকিক যাদুবাস্তবতা, লোকজীবনের বর্ণময় জগৎ।অরুণেশের দুটো বিখ্যাত কবিতা পড়ে নেয়া যাক:

    ছোট শহরের অতিথি

    নক্ষত্রের তলায় যেখানে এই
    ভাঙাচোরা বাস আর আস্তাবল
    যেখানে মরচে পড়া লোহালক্কড়ের
    আবর্জনার মধ্যে আমাদের মদ ভাঙের আড্ডা
    ফিসফিসানি মেয়েদের, চাপা হাসি আর থুতু ছেটানো
    দুই পা দুই দিকে ছড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাইতোলা
    সেইখানে, ভাঙা গাড়ির আস্তাবল
    তোকে বয়ে নিয়ে এসেছে তোর মা
    এ যেন আমাদের ছোট শহরের বেঁটেখাটো আর দাড়িওয়ালা
    ঈশ্বরের সঠিক নির্দেশ: এক গাঁ থেকে আরেক গাঁয়ে
    পালিয়ে না বেড়িয়ে সোজা চলে যায় আমার এখানে
    এই ভাঙা গাড়ি, নেশুড়ে আর বেশ্যাদের আস্তানায়
    আমরা যখন খাটো গলায় ধমক দিচ্ছিলাম মাতালদের
    ‘চুপ চুপ…পুলিশ’
    যখন মেয়েরা অন্তর্বাসের তলায় গুঁজে রাখছে
    ময়লা দোমড়ানো মোচড়ানো লালচে দুটাকার নোট
    যখন গেলাশ উপচে গড়িয়ে পড়ছে মদ
    মদে ভিজে উঠছে মৃত ধাতুর কঙ্কাল
    ফণা তুলে জেগে উঠেছে চারপাশে
    মদের নেশায় মদের গন্ধে মরচে-পড়ার মধ্যেও
    টুকরো-টাকরা হয়ে যাওয়ার মধ্যেও হিস হিস চিৎকার
    অতিথি
    ‘এতগুলো টাকার বিনিময়ে কী পাওয়া গেল
    বেশ্যার কাছ থেকে?’ - ভোর হওয়ার আগেই
    সে বেরিয়ে পড়তে চায় ঘর ছেড়ে, পরে নেয় জামা ও প্যান্ট
    কল্পিত আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঠিক করে নেয় চুল ও গোঁফ
    একবার, দু-বার, তিনবার হলুদ রুমালে মুছে নেয় মুখ
    জানতে চায়
    জানতে চায় আধ-ঘুমস্ত আধ-ন্যাংটো মেয়েটির কাছে
    মুখে কোনো ছাপ থেকে যাচ্ছে কিনা
    কখনও মনে হয় গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে
    নেহাতই এক মধ্যবিত্ত
    কখনও - ভিন্ন এক গ্রহ থেকে আসা - ভাবি
    এই আমাদের মূল নায়ক - শুধু মাথায় কিছুটা খাটো
    হৃদপিণ্ডের ওপর একই মানিব্যাগে টাকা আর প্রেমিকার ছবি
    মদের টেবিলে খুলে দেখায় সে
    বেশ্যাকে টাকা গুনে দেওয়ার পর বেশ্যার উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁদে
    এক হাতে জড়িয়ে ধরে নিষিদ্ধ পল্লীর উধের্ব মাথা-বাড়ানো
    নাম-না-জানা গাছ
    একই আচ্ছাদনের তলায় শুয়ে কেটে গেল আরও একটি রাত
    একই স্ত্রীলোকের দু-পাশে দুজন, শরীরে বেশ্যার কাঁথা ও শরীর
    যোনিতে হাত দিতে গিয়ে দেখি অধিকার করে আছে
    আরেকজনের রোমশ থাবা
    তবুও নারী বঞ্চিত করতে চায় না আমাকে
    গোপনে মুখ টেনে নিয়ে গুঁজে দেয় স্তনের বোঁটায়
    একটি হাত, একটি স্তন, একটি নিতম্বের গভীর চাপ
    এমনকি নিজের যোনিদেশ দ্বিখণ্ডিত করে দুহাতের -
    তালুতে নিয়ে বিপুল দাঁড়ায় অন্ধ রাত্রি জুড়ে
    পরিহাস করে দেবতারা
    কুকুরের কান্নায় চমকে ওঠা অতল রাতে চিত হয়ে ভাবি ‌
    এই যে দুই পাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া
    উপর্যুপরি বীর্যপাত, মিশে গেল, মিলিয়ে গেল
    কোন দুঃখের নদীতে?
    রাস্তায় বেরিয়ে এসেই পরস্পরের অচেনা হয়ে যাই আমরা
    ব্রাহ্মমুহূর্তের আকাশ ঢুকে পড়ে বুকে, মাথায় ও গুহ্যদ্বারে
    মাথার ওপারে থাকে একটি নক্ষত্র ও ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ
    মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ি তার
    কপাল থেকে যখন ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত
    তখনই সে বুঝতে পারে
    ‘এতগুলো টাকার বিনিময়ে কী পাওয়া গেছে বেশ্যার কাছ থেকে’
    ছুটে ফিরে যায় সে একই ঘরে, সূর্য জেগে উঠেছে তখন
    জেগে উঠেছে ঘুমন্ত বেশ্যার শরীর আর শহর
    আমাদেরই গোটা মাথা জুড়ে ও জড়িয়ে
    তখনই মনে হয় এই আমাদের মূল চরিত্র - বাবা শ্রমিক মা মধ্যবিত্ত

    উত্তরবঙ্গে হারি আন্দোলনের প্রসার যাঁরা ঘটিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম রাজা সরকার। তাঁর জীবন ও কবিতা ‘অনুধ্যান’ পত্রিকায় আলোচনাকালে শিমুল মিলকী লিখেছেন : “কবি রাজা সরকারের জীবন ও কবিতা নিয়ে মূলত আলোচনা থাকলেও এর সাথে নেত্রকোণাকে জড়িয়ে আলোচনা করতেই হচ্ছে। কেননা, কবির জীবনের স্থানিক ও কাল-পরিচয়ের মধ্যে কবিতারও একধরনের পরিচয় আভাসিত হয়। কবির জীবনপঞ্জিকা ঘেঁটে কিছুটা সেই আলামত পাওয়া যায়।রাজা সরকার তাঁর আত্মজীবনীমুলক গ্রন্থ আঁতুড়ঘর-এ বলেন- “রাতে স্বপ্ন দেখি বালক বয়স। স্বপ্ন দেখি ঘুরে বেড়াচ্ছি শ্রীমন্তপুর গ্রামে। এখন সেটা অন্যদেশ। ওখানে এখন ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায় না। এসব কথা কি কাউকে বলা যায়?… নস্টালজিক।”বলা না গেলেও এই কথা বলা হয়ে গেছে তার কবিতায় –

    “প্রতিবারেই আমি উৎসের দিকে যেতে চাই
    পরিণতি ছুঁয়ে আছে পায়ের আঙুল
    জঙ্ঘা ও স্তন পেরিয়ে হাত
    হাতে আগুন
    গৃহস্থালি বসেছে তার উপর, সঙ্গে
    এই সুদাহ্য শবশয্যা-”

    বিশেষ সংবেদনশীল হওয়ায় কবিকে আজীবন যে সংগ্রাম করে এগুতে হয় তা সাধারণের বাইরে। সেই সংগ্রাম অবশ্যই বহুমাত্রিক হয়ে থাকে। – জীবনের না-পাওয়া, হারানোর যন্ত্রণা ও অপমানের মধ্যে সেই সংগ্রাম যেমন গ্রথিত, তেমনি সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রপঞ্চের মধ্যেও কবির রয়েছে সাহসিক বিস্তৃতি। তবে কবির এই সংগ্রাম মূলত কবিতার জন্যেই সংগ্রাম বলে ধরে নেবো। কেননা তিনি আমাদের কবিতাই উপহার দেন। তাঁর কাছে আমরা শেষমেশ কবিতাই চাই। কবিতার বিচার বড়ই কঠিন কাজ এবং প্রকৃত কবিতা চেনারও কঠিন বলে মনে করি। রাজা সরকারকে পড়তে গিয়ে আরাম প্রিয় পৃথিবীর মোহভঙ্গ হয়। তাকিয়ে দেখি বাস্তবে রক্তাক্ত উঠান। তিনি বলেন -

    ‘‘আলোর বিকারে জন্মেছিল যে কিট, সে এসে দাঁড়িয়েছে এই নিস্প্রভ আলোতে,
    হাতে খড়্গ, চোখের জল, ঠোঁটের কোণে রক্ত-
    আঁচল ভর্তি মুদ্রা খসে পড়ে, ভিড় হয়, ট্রাফিকে হল্লা, ভাঙ্গে ঘুম
    আক্রান্ত মানুষ পালায়, রুগ্ন পিষ্ট হয়, দুর্বৃত্ত লুট করে আরো কিছু।’’

    রাজা সরকারের কবিতায় এমনিভাবে দেখতে পাই সমাজ, সংসার ও ধর্ম কাঠামোয় নানাবিধ আগ্রাসনের ছায়া। যেখানে আবেগোত্থিত অনুভূতি, উপলব্ধি ও জীবনের নির্মম বাস্তবতা ধরা দিয়েছে। গূঢ় পর্যবেক্ষণ ও বিচার বিশ্লেষণের দক্ষতা দিয়ে তিনি নিজস্ব বয়ানে তাঁর কবিতাতীর্থে নব রূপায়ন ঘটিয়েছেন। তিনি তাঁর কবিতায় বলেন- ‘এটা সৌভাগ্যের যে তুমি বাইনারি শনাক্ত করে ফেলেছো। রক্তের প্লাজমা নিয়ে গবেষণা, মৌলতত্ত্ব, অনুপরমানুর ঝড়- চুইয়ে পড়া ফিদেল হাসিতে তুমি এসিড পোড়া নারীর কাছে জানতে চেয়েছো তার অনুভূতি কি রকম? কিংবা

    ‘পৃথিবী শুধু মাংসের হয়ে গেলে নখের দ্বারা বোবাছন্দের চাষ হবে। দেহাতীত সবকিছুকে নির্বাসনে রেখে আমরা ছন্দবদ্ধ দেহ নিয়ে উৎসব করতেই পারি…প্রেতাত্মা ছাড়া শুধু মাংসের সেদ্ধ হয় না আজ’। তাঁর কবিতায় আছে দীর্ঘ জীবনযন্ত্রণার ইতিহাস। আছে মৃত্যুর ছায়াছবি। আছে রক্তের হিসেব। তাকে বাল্য বয়সে বাংলাদেশ ছেড়ে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে। ট্রাজেডির শুরু মূলত এখানেই। শরনার্থী ক্যাম্পের কষ্টকর জীবনের সাথে তাকে মানিয়ে নিতে হয়েছে। তারপর শিলিগুড়ি। সত্তরের দশকে নকসাল আন্দোলনের আবহ। শেষে কলকাতার জীবন। এই আবর্তনের মধ্যদিয়েই তাকে লেখাপড়া, চাকরি, বিয়ে, সন্তান লালন পালন সহ সবই করতে হয়েছে। জীবনের নানা স্তরে রক্তাক্ত অভিজ্ঞতায় তাঁর দিকদর্শন যেনো আরও প্রকট হয়ে ওঠেছে।কিন্তু কবিতায় তিনি অপ্রতিরোধ্য, বিদ্রোহী, সমঝোতা হীন, বেপরোয়া। মিতভাষী এই কবি অকপট বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন দুর্দান্ত কবিতার মাস্তুল।

    আমাদের রেখে যেতে হবে সীমান্তের চোরাপথ
    রেখে যেতে হবে তুমুল যৌন সতর্কতার ভেতর নির্বিকার আত্মহত্যা
    শূন্য ভাড়ার তুলে রাখা ছাই আর পাটাতনে গোপন গর্তভরা
    আমাদের কঙ্কাল আজও কামনা করে আগুন-হানাদার পেট্রোল-বোমা
    আমাদের রেখে যেতে হবে কুঠার, কেটলি আর লবণ
    রেখে যেতে হবে না-বাঁধা জ্বালানী কাঠের বোঝা, ময়লা গামছা
    রেখে যেতে হবে জং ধরা বল্লম

    রেখে যেতে হবে শূন্য ভিটে, আগাছা আর ঘাতকের ছায়াছবি

    উত্তরবঙ্গে হাংরি যুগের ফাটলের রেশ এখনও বজায় আছে, যেমন স্নেহাশীস রায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ধরা পড়ে: “শৈলেশ্বরকে লেখা অরুণেশের প্রায় ৮০টির মতো দীর্ঘ চিঠি (Inland Letter Card) উদ্ধার হল। ‘সৃষ্টিক্ষমতাহীন কুকুরের দল এই ঘেউঘেউ চিরদিনই করে এসেছে’র পাশাপাশি অরুণেশ চাইছেন ‘আত্মমগ্ন গর্ভবতীর মতো নিজেকে নিয়ে থাকতে’। তাঁর সঙ্গে মিলারের লেখালিখির হাস্যকর তুলনা প্রসঙ্গে অরুণেশের মনে পড়ে যাচ্ছে জীবনানন্দকে ইয়েটস্ এর অনুকারক এমনকি পাশাপাশি রেখে উভয়ের লাইন তুলে মেলানোর প্রাণপণ চেষ্টার কথা! আর্থিক সংকট, বেশ্যা ও না-বেশ্যা অসংখ্য সংগমে তিনি কি না-প্রেমিক। না, এসবের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতার সঙ্গে সহবাস করতে চাইছেন। দেশ, আনন্দবাজার, আজকাল প্রভৃতি বাজারি কাগজ সম্পর্কে একহাত নিতে ছাড়ছেন না এবং কৃষ্ণ ধর ও অমিতাভ দাশগুপ্তকে হিজড়ে লেখক বলতে রেয়াত করছেন না।হাংরি জেনারেশন সাহিত্য, রাজনীতি, কলকাতার সাহিত্য, পাণ্ডুলিপি করে শৈলেশ্বরকে পাঠানো। ‘রোবট'(সম্পাদক : জীবতোষ দাশ) নিয়ে ভয়াবহ আবেগ।নিজের কাগজ ‘জিরাফ’ নিয়ে চিন্তাভাবনা। বাবার অসুখ। চিকিৎসকদের ‘মাগী’ বলা, টাকাও ধ্বংস করে রোগীও মারে।উত্তরবঙ্গের তৎকালীন অন্যান্য পত্রিকার রাজনীতি। এমনকি নাম নিয়ে রাজা সরকারের (সম্পাদক : কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প) ঈর্ষা ও কূটনীতি সত্ত্বেও তাঁকে শোধরানোর চেষ্টা। আরও কত কী কথা বলেছেন চিঠিতে শৈলেশ্বরকে।এই চিঠিগুলো নিয়েই একটা সাংঘাতিক বই হয়ে যায়।একটা সময়, দীর্ঘ কবিতাযাপন, জৈব আততি ও ঐতিহাসিক দলিল তো বটেই।বোমাটা ফেলব নাকি!”

    সাত : হাংরি যুগে ছবি আঁকা ও বিটদের সঙ্গে তুলনা

    বিষয়টি নিয়ে জুলিয়েট রেনল্ডস, শিল্প সমালোচক, এই কথাগুলো লিখেছেন–
    দুটি আন্দোলনেই, কবি ও লেখকদের সংখ্যাধিক্যের কারণে, বেশ কম লোককেই পাওয়া যাবে যিনি তর্ক জুড়বেন যে বিট আন্দোলন এবং হাংরি আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে ছিল সাহিত্যের আন্দোলন। দুটি আন্দোলনই ডাডাবাদীদের সঙ্গে তাঁদের তুলনাকে আকৃষ্ট করলেও, কেউই এই দুটিকে শিল্পের আন্দোলন বলতে চাইবেন না, যা কিনা ডাডা আন্দোলনকে বলা হয়, তাঁদের গোষ্ঠীতে সাহিত্যিকরা থাকলেও।

    কিন্তু বিট এবং হাংরিয়ালিস্টদের ইতিহাস ও উত্তরাধিকারকে যদি খুঁটিয়ে দেখা হয় তাহলে সন্দেহ থাকে না যে যেমনটা আলোচকরা মনে করেন তার চেয়ে অনেকাংশে বেশি ছিল শিল্পীদের অবদান এই দুটি আন্দোলনে। বিট আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিশ্লেষণেই তা সত্য বলে প্রমাণিত হয়। তাঁদের আন্দোলনে শিল্পের যে স্হির-নিবদ্ধ সন্দর্ভ প্রথম থেকে ছিল তা কখনও থামেনি। অবশ্য মনে রাখতে হবে যে বিটদের সম্পর্কে তথ্যাদি ভালোভাবে নথি করা হয়েছে, যা হাংরিদের ক্ষেত্রে হয়নি, ব্যাপারটা প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের ফাটলের অবদান। বিট আন্দোলন কাউন্টার কালচার হিসাবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে উদয় হয়েছিল, যখন কিনা হাংরি আন্দোলন তার কায়া পেয়েছিল দরিদ্র, অবিকশিত একটি দেশে, তাও তারা সীমিত ছিল একটি রাজ্যে বা এলাকায়। তাছাড়াও, হাংরিদের রাজনৈতিকভাবে যেমন করে দাবিয়ে দেয়া হয়েছিল তেমন বিটনিকদের ক্ষেত্রে একেবারেই ঘটেনি। গিন্সবার্গ, ফেরলিংঘেট্টি, কোরসো, বারোজ এবং বাকি সবাই তাঁদের কুখ্যাতিকে নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে পেরেছিলেন, তাঁরা তা না চাইলেও পেরেছিলেন। এর ফলে তাঁদের আন্দোলন বহুকাল টিকে থাকতে পেরেছিল এবং লতায় পাতায় বেড়ে উঠতে পেরেছিল, জনমানসে কাল্ট হিসাবে স্হান করে নিতে পেরেছিল।

    অপরপক্ষে, ১৯৬১ সালে মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমীর রায়চৌধুরী ও দেবী রায় যে আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন তা কয়েক বছরের মধ্যেই সরকারি লাঠিচালনা ও নিজেদের মধ্যে অবনিবনার কারণে স্তিমিত হয়ে যায়, অবনিবনার কারণ ছিল সরকারের লোকেদের দ্বারা আন্দোলনকারীদের হয়রানি ও নাকাল করার চাপ। অশ্লীলতার আরোপে মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা ও পরে মলয়ের জেলজরিমানা ছিল হাংরি আন্দোলন ভেঙে ফেলার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিকল্পনা। তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে প্রত্যেক সদস্যের বাড়িতে নির্মম পুলিশি হানা দিয়ে বৌদ্ধিক ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, বই, পাণ্ডুলিপি এবং চিঠিপত্র।

    হাংরি শিল্পীদের ক্ষেত্রে, বেনারসে, অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় এবং সহযোগী শিল্পীদের ‘ডেভিলস ওয়র্কশপ’ নামে স্টুডিও তছনছ করে দিয়েছিল পুলিশ, নষ্ট করে দিয়েছিল তাঁদের আঁকা পেইইনটিঙ, আন্দোলনের নথিপত্র, যা পরে আর ফেরত পাওয়া যায়নি। সৌভাগ্যবশত অনিল করঞ্জাইয়ের কিছু কাজ, হাংরি আন্দোলনের সময়ের, সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছিল এবং তাঁর সংগ্রহের দুর্মূল্য সম্পদ হিসাবে সংরক্ষণ করা গেছে, যেগুলোয় পাওয়া যাবে হাংরি আন্দোলনের আইডিয়া এবং উদ্বেগ। এগুলো থেকে হাংরি আন্দোলনকে আরও গভীর ভাবে বোঝা যায়। এটা বলা ক্লিশে হবে না যে শব্দাবলীর তুলনায় উদ্দেশ্যকে ছবি আরও স্পষ্ট করে মেলে ধরতে পারে। অনিল করঞ্জাই ( ১৯৪০ - ২০০১ ) ছিলেন হাংরি আন্দোলনের প্রতি সমর্পিত একমাত্র শিল্পী। একই ধরণের বিট চিত্রশিল্পী ছিলেন রবার্ট লাভাইন ( ১৯২৮ - ২০১৪ )। অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছেন যে বিট আন্দোলনের জন্ম দেয়ায় রবার্টের বেশ বড়ো অবদান আছে। রবার্টের সান ফ্রানসিসকোর বিশাল বাড়িতে বোহামিয়ান, পোশাকহীন, বুনো তরুণ-তরুণী বিট আন্দোলনকারীরা সবাই মিলে বিট আন্দোলনকে চরিত্র দিয়েছিলেন। বিট আন্দোলনের গ্রাফিক্স আর পোস্টার এঁকে দিতেন রবার্ট। অনিল এবং করুণাও হাংরি আন্দোলনে একই কাজ করতেন।

    গিন্সবার্গ এবং রবার্ট নিজেদের মধ্যে নান্দনিক ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁরা দুজনেই আণবিক কাখণ্ডে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত যুবসমাজের চেতনায় প্রতিফলিত অবক্ষয় ও মৃত্যুবোধকে নিজেদের কাজে প্রতিফলিত করতে চাইতেন, রবার্ট লাভাইনের কথায়, “স্হায়ীত্বের মিথ্যা” সম্পর্কে তিনি গিন্সবার্গের থেকে জেনেছিলেন। যে জগতের ভবিষ্যৎ নেই সেখানে স্হায়ী শিল্পকর্মের ধারণা তাঁকে অবশ করে দিয়েছিল, যা থেকে তাঁর মুক্তি পাওয়া অসম্ভব ছিল যদি না তিনি বিটনিকদের সংস্পর্শে আসতেন। ‘পাগল, ল্যাংটো কবি’ হিসাবে লোকে গিন্সবার্গকে জানতো, এবং রবার্টকে গিন্সবার্গ বলেছিলেন ‘মহান উলঙ্গ শিল্পী’, দুজনেই সহকর্মী ও বন্ধুদের চরিত্র তুলে ধরেছিলেন নিজের নিজের কাজে, প্রথমজন জ্বলন্ত ‘হাউল’ কবিতায় এবং দ্বিতীয়জন তাঁর রেখা ও রঙে। তাঁর আঁকা যুবক গিন্সবার্গের অয়েলপেইন্ট ব্যাপারটাকে বিশদ করে তুলেছে।

    বিটদের তুলনায় অনিল করঞ্জাই পোরট্রেট আঁকা বেশ দেরিতে আরম্ভ করেন। স্টাইলের দিক থেকেই আর্টিস্ট দুজন ভিন্ন, কিন্তু তাঁদের আঁকা বেশ কিছু পোরট্রেটে পাওয়া যাবে ব্যক্তিবিষয়ের কোমলতা। এটা অনিলের ক্ষেত্রে পাওয়া যাবে করুণার বাচ্চা মেয়ের চারকোল স্কেচে, যে বাচ্চাটাকে অনিল জন্মের সময় থেকেই জানতো, আর হাংরি আন্দোলনকারীদের ম্যাসকট হয়ে উঠেছিল।

    রবার্ট লাভাইন, প্রেমে গিন্সবার্গের প্রতিদ্বন্দ্বী, পিটার অরলভস্কির যে বিরাট পেইনটিঙ এঁকেছিলেন, সেইটিই ছিল গিন্সবার্গের সবচেয়ে প্রিয় ছবি। উলঙ্গ, সুন্নৎ না-করা লিঙ্গ যৌনচুলে ঢাকা, ছবিটা যৌনতা উত্তেজক হলেও দুঃখি আর বিষণ্ণ। গিন্সবার্গ লিখেছেন যে তিনি পিটার অরলভস্কির সঙ্গে পরিচয়ের আগে ছবিটা যখন দেখেছিলেন তখন ‘চোখের দিকে তাকিয়ে প্রেমে বিদ্যুৎপৃষ্ট বোধ করেছিলেন।’ সেই সময়কার মানদণ্ড অনুযায়ী গিন্সবার্গ এবং লাভাইন দুজনেই ছিলেন পর্নোগ্রাফার। কিন্তু কবির তুলনায় শিল্পী বেঁচে গিয়েছিলেন আদালতের হয়রানি থেকে, বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কেননা সত্তর দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সামনাসামনি নগ্নতা এবং সমকামকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ মনে করা হতো। রবার্ট লাভাইনের মতো অনিল করঞ্জাইও নগ্নিকা এঁকেছিলেন এবং আদালতের চোখরাঙানি পোহাতে হয়নি। কিন্তু অনিলের ‘ক্লাউডস ইন দি মুনলাইট ( ১৯৭০ ) রোমা্টিক ক্যানভাসে বিট পেইনটারের তুলনায় অনিলকে ভিশানারি বলে মনে হয়।

    প্রখ্যাত কবি এবং ‘সিটি লাইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, যাঁকে ‘হাউল’ প্রকাশ করার জন্য অশ্লীলতার আরোপের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং যিনি হাংরি আন্দোলনকারীদের মামলার সময়ে হাংরিয়ালিস্টদের রচনা প্রকাশ করেছিলেন, নিজেও শিল্পী ছিলেন। ফেরলিংঘেট্টির এক্সপ্রেশানিস্ট দৃশ্যাবলী, প্রথম দিকে বিমূর্ত, পরে ফিগারেটিভ এবং প্রায়ই সরাসরি রাজনৈতিক -- দর্শকদের নাড়া দেয় এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী হিসাবে তাঁর গুরুত্ব বৃদ্ধি করে।

    ‘নেকেড লাঞ্চ’ গ্রন্হের লেখক উইলিয়াম বারোজ, যাঁকে আইনের ফাঁদে পড়তে হয়েছিল, বিট জেনারেশনের একজন নামকরা সদস্য, তিনিও ছিলেন ভিশুয়াল আর্টিস্ট। কিন্তু বারোজের পেইনটিঙ এবং ভাস্কর্য প্রকৃতপক্ষে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। তিনি অনেক সময়ে নিজের মনের গভীরতাকে তুলে ধরার জন্য চোখ বন্ধ করে আঁকতেন, যাগুলো হতো উন্মাদগ্রস্ত, কেবল কড়া মাদক সেবনের এবং অযাচারী যৌনতার ফলেই নয়। বেশ কিছু ক্যানভাসে বুলেটের ছ্যাঁদা আছে, তাঁর দর্শকদের জানাবার জন্য যে উইলিয়াম টেলের মতন গুলি চালাতে গেলে তিনি নিজের স্ত্রীকে খুন করেছিলেন, স্ত্রীর মাথাকে খেলার বল মনে করে। বারোজকে বলা হতো ‘পাঙ্ক’-এর পিতা, পরে ‘পপ শিল্পের পিতা’ অ্যাণ্ডি ওয়ারহল-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন এবং দুজনে একত্র হলে আমোদ করতেন। অ্যাণ্ডি ওয়ারহল বন্দুকের ব্যাপার ভালোই জানতেন, যদিও তিনি ছিলেন আক্রান্ত, আক্রমণকারী নন। ‘দি ফ্যাক্টরি’ নামে খ্যাত ওয়ারহলের নিউ ইয়র্কের স্টুডিওতে বারোজ প্রায়ই যেতেন।

    প্রথম দিকে বিটদের বিমূর্ত এক্সপ্রেসানিস্ট পেইনটারদের সঙ্গে একাসনে বসানো হয়েছিল, যদিও বিমূর্ত এক্সপ্রেশানিস্ট পেইনটাররা তাঁদের জীবনযাত্রায় বিটদের অচিরাচরিত ব্যক্তিগত জীবনের মতন ভবঘুরে ছিলেন না। তাঁরাও মিডিয়াকে ও দর্শকদের তাঁদের কাজের মাধ্যমে চমকে দেবার প্রয়াস করতেন। তাঁরাও, একইভাবে, প্রথানুগত আঁকার রীতিনীতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করতেন। তার জন্য তাঁরা বিশাল বিশাল ক্যানভাসে দ্রুত তরল স্ট্রোক দিতেন; একে তাঁরা বলতেন ‘অরগ্যাজমিক ফ্লো’, আর এই ‘অরগ্যাজমিক ফ্লো’ ছিল হাংরিয়ালিজমের মননবিন্দু। বিমূর্ত এক্সপ্রেশানিস্ট পেইনটিঙকে এখন নৈরাজ্যবাদী মনে হতে পারে, যা বিট এবং হাংরি আন্দোলনের রচনাপদ্ধতিতে একই ধরনের ছিল বলা যেতে পারে, কিন্তু হাংরি পেইনটারদের শিল্পকলা ছিল সুচিন্তিত, তাঁদের কেঅস ছিল পরিকল্পিত।

    একজন শিল্পী উন্মাদের মতন অনিয়ন্ত্রিত আবেগে এঁকে চলেছেন ব্যাপারটা নিছক ক্লিশে, এবং কম সংখ্যক শিল্পীই অনিল করঞ্জাইয়ের মতন এই ব্যাপারটায় জোর দিয়েছেন। নিওফাইট হিসাবেও, অস্হির তেজোময়তা ও পরিপূর্ণ জোশে অনিল করঞ্জাই এঁকেছেন প্ররিশ্রমান্তিক সুচিন্তিত ক্যানভাস। হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে থাকার কারণে, যাঁদের মধ্যে তাঁর বয়স ছিল সবচেয়ে কম, এই বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। যে একমাত্র শিল্পী তাঁকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন, তিনি হলেন ডাচ শিল্পী হিয়েরোনিমাস বশ ( ১৪৫০ - ১৫১৬ )। বশের গ্রটেস্ক বিদ্রুপাত্মক চিত্রকল্প অনিল করঞ্জাইকে অনুপ্রাণিত করত, যে সময়ে অনিল শ্রেণিবিভাজিত এবং শোষিত সমাজের একক ভিশন নিজের পেইনটিঙে গড়ে নেবার প্রয়াস করছিলেন। বিমূর্ত এক্সপ্রেশানিজম সম্পর্কে অনিল বহু পরে জেনেছেন।

    সবচেয়ে কুখ্যাত বিমূর্ত এক্সপ্রেশানিস্ট জ্যাকসন পোলক -- ‘ফোঁটাগড়ানো জ্যাক’ --- একজন ‘অ্যাকশান পেইনটার’, ক্যালিফর্নিয়ার ‘দি আমেরিকান মিউজিয়াম অভ বিট আর্ট’’-এ বহু শিল্পীর সঙ্গে স্হান পেয়েছেন। চরম ডাডাবাদী মার্সেল দুশঁও পেয়েছ, যিনি, বিটনিকরা জন্মাবার আগেই ‘অ্যান্টি-আর্ট’ শব্দবন্ধটির উদ্ভাবন করেছিলেন, এবং সেকারণে বিটদের আদর্শ। কিন্তু শোনা যায় যে পঞ্চাশের দশকে যখন অ্যালেন গিন্সবার্গ ও গ্রেগরি কোরসো প্যারিসে দুশঁর সঙ্গে দেখা করেন, দুজনে নেশায় এমন আচ্ছন্ন ছিলেন যে গিন্সবার্গ দুশঁর হাঁটুতে চুমুখান, আর কোরসো নিজের টাই কেটে ফ্যালেন। বয়স্ক দুশঁর তা পছন্দ হয়নি। বিটদের সেসময়ের আচরণ এমনই স্বার্থপরভাবে অসংযত ছিল যে তাঁরা অনেককে চটিয়ে দিতে সফল হয়েছিলেন, এমনকি জাঁ জেনেকেও, যাঁর আদবকায়দা মোটেই ভালো ছিল না।

    বেনারসে বসবাসের সময়ে অনিল করঞ্জাই ও অ্যালেন গিন্সবার্গের মাঝে ছবি আঁকার বিষয় নিয়ে কোনো অর্থবহ আলোচনা হয়েছিল বলে মনে হয় না। মার্কিন লোকটির আগ্রহ ছিল উচ্চতর ব্যাপারে প্রতি, অর্থাৎ সাধু, শ্মশানঘাট, মন্ত্র, গাঁজা ইত্যাদি। হিন্দি ভাষার বৌদ্ধ কবি নাগার্জুনের সঙ্গে অনিল ও করুণা অ্যালেন গিন্সবার্গকে হারমোনিয়ামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পাশাপাশি গিন্সবার্গ ও অরলভস্কিকে ছিলিম টানার কায়দা শিখিয়ে ছিলেন, যা প্রায় ধর্মাচরণের ব্যাপার এবং মোটেই সহজ নয়। এ ছাড়া হাংরি আন্দোলনকারীদের ছবি আঁকায় গিন্সবার্গ বিশেষ আগ্রহ দেখাননি। অনিলের খারাপ লাগেনি কেননা তাঁর বয়স তখন কম ছিল, আনন্দ পেয়েছিলেন ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ পেয়ে, যা ভাষায় অনিল তখন অত সড়গড় ছিলেন না। অনিল আর করুণা দুজনেই খ্যাতিপ্রাপ্ত মার্কিন সাহেবকে বিশেষ পাত্তা দিতেন না, কিন্তু পরবর্তীকালে গিন্সবার্গের আমেরিকা কবিতার পঙক্তি চেঁচিয়ে অনিল বলতেন, “আমেরিকা তোমার ডিমগুলো কবে ভারতে পাঠাবে?”

    সন্দেহ নেই যে গিন্সবার্গ রেসিস্ট ছিলেন না, অন্তত সচেতনতার স্তরে। কিন্তু তাঁর মধ্যে সাদা চামড়ার মানুষের ঔদ্ধত্য ছিল, যা অন্যান্য বিটদের মধ্যেও ছিল। প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন হওয়া সতবেও একটা স্তরে তা ছিল অত্যন্ত এলিটিস্ট। যেমন বারোজ, স্ত্রীকে খুন করার পরেও ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলেন, কেননা তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছিলেন এবং তাঁর পরিবার ছিল বৈভবশালী। গিন্সবার্গ ততোটা ধনী পরিবারের না হলেও বেশ কমবয়সেই সুপারস্টার হয়েগিয়েছিলেন। তিনি ভারতে এসে যতোই গরিব সেজে থাকুন, তা তাঁকে তাঁর মঞ্চ থেকে নামাতে পারেনি, তা ছাড়া ভারতে তিনি চামচাগিরির সুখও পেয়ে থাকবেন। সম্ভবত হাংরি আন্দোলনকারীরাই একমাত্র তাঁর সঙ্গে সমানে-সমানে আইডিয়া আদান-প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর কবিতায় ও ভাবনাচিন্তায় হাংরি আন্দোলনকারীদের প্রভাব স্বীকার না করাটা তাঁর সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি করে না।

    গিন্সবার্গ, যিনি ভারতের ধর্মে পরোক্ষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন বলে মনে হয়, হাংরি আন্দোলনকারীদের ধর্ম সম্পর্কিত ভাবনাচিন্তাকে গ্রহণ করতে পারেননি। হাংরি আন্দোলনকারীরা ঈশ্বরকে বিসর্জন দিয়েছিলেন আর যে কোনো ধরণের উপাসনা-অর্চনা সম্পর্কিত বিশ্বাসকে সমসাময়িক ভাষায় নিন্দা করেছেন। অনিলের শৈশব বেনারসে কাটার দরুন তিনি ছোটোবেলা থেকেই ধর্মে বিশ্বাস করতেন না; তিনি মন্দিরের বয়স্কদের বারো বছর বয়স থেকেই চ্যালেঞ্জ করতেন, আর তাদের তর্কে হারিয়ে দিতেন হিন্দুধর্মের জ্ঞানের সাহায্যে। বিজ্ঞাননির্ভর মানসিকতা নিয়ে অনিল সারাজীবন আস্তিক ছিলেন। প্রথম দিকের বৌদ্ধধর্ম তাঁকে আকৃষ্ট করলেও অনিল তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সমালোচনা করতেন, আর শেষ জীবনে অ্যালেন গিন্সবার্গ এই ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। অবশ্য বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে বিট কবিদের যুদ্ধবিরোধী রাজনীতির মিল ছিল, যেমনটা ছিল হাংরি আন্দোলনের অন্যান্য সদস্যদের।

    হাংরিদের রাজনীতির কথা যদি বলতে হয়, শেকড়পোঁতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সবাই যেমন তীব্র আক্রমণ চালাতো তাকে অনিল করঞ্জাই সমর্থন করতেন, কিন্তু তাদের অ্যানার্কিজমকে মেনে নিতে পারেননি অনিল। হাংরিদের বক্তব্য যে মানবাস্তিত্ব হল রাজনীতিরও আগের এবং রাজনৈতিক মতাদর্শগুলোকে বর্জন করা দরকার, তাও মানতে পারেননি অনিল। অনিল কিছু দিনের জন্য কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন কিন্তু হাংরিতে যোগ দেবার আগেই বেরিয়ে আসেন। তা সত্বেও অতিবামের দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল। হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে যাবার পরে তিনি নকশাল দলে যোগ দিয়েছিলেন, এই কথাটা সত্য নয়।

    এ কথা সত্য যে বেনারস ও কাঠমাণ্ডুতে হাংরিরা যৌথ যৌনতার অর্গিতে নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন, কিন্তু তা বিটদের যৌনজীবনের হইচইয়ের সামনে অত্যন্ত হালকা। অনিল এবং করুণা হিপি আর বিদেশি সাধক-সাধিকাদের সঙ্গে বেনারসে আন্তর্জাতিক কমিউনে বসবাস করেছিলেন, এমনকি করুণা ছিলেন সেই কমিউনের ম্যানেজার ও মুখ্যরাঁধুনি। চেতনার বিস্তারের জন্য তাঁরা এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম ইত্যাদি মাদক নিয়ে পাঁচিল ঘেরা জায়গায় এক্সপেরিমেন্ট করতেন। অনিলের চেতনায় এর প্রগাঢ় প্রভাব পড়েছিল কেননা অনিল দায়িত্বহীনভাবে মাদক সেবন করতেন না, পজিটিভ থাকার প্রয়াস করতেন, পেইনটার হিসাবে ভিশানের বিস্তার ছিল তাঁর কাম্য। ‘ড্রাগ অ্যাবিউজ’ বলতে যা বোঝায় তার খপ্পরে তিনি পড়েননি। ( মলয় রায়চৌধুরী তাঁর অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা উপন্যাসে তাঁদের যৌন জীবনের ছবি দিয়েছেন।)

    হাংরিরা তাঁদের পেইনটিঙ ইচ্ছে করে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, এটাও বাড়িয়ে-চাড়িয়ে তৈরি করা গালগল্প, ১৯৬৭ সালে কাঠমাণ্ডুর বিখ্যাত একটি গ্যালারিতে প্রদর্শনীর শেষে এই সমস্ত ব্যাপার ঘটেছিল বলে প্রচার করা হয়। লেখকদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যাতে মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যান্য হাংরিদের কবিতা পাঠের জন্য আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। করুণা তার যাবতীয় পেইনটিঙ পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলেছিলেন। অনিল করঞ্জাই একপাশে দাঁড়িয়ে মজা উপভোগ করেছিলেন। অমন শিল্পবিরোধী কাজ তাঁর মানসিকতার সঙ্গে খাপ খায়নি। অনিলের আইকনোক্লাজম ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের।

    হাংরিদের মতাদর্শের সঙ্গে তাঁর কিছুটা অমিল থাকলেও, হাংরির নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে দিয়েছিলেন অনিল। ষাটের দশকে বেনারসের কমিউনে টানা বাহান্ন ঘণ্টায় আঁকা তাঁর ‘দি কমপিটিশন’ পেইনটিঙে তা প্রতিফলিত হয়েছে, কাজটা একটা বটগাছকে নিয়ে, যাকে তিনি উপস্হাপন করেছিলেন কেঅস এবং সময়ের সঙ্গে লড়াইয়ের মেটাফর হিসাবে। এই পেইনটিঙে হাংরিদের উদ্দেশ্য যেমন ফুটে উঠেছে তেমনই বিটদের উদ্দেশ্য; প্রকৃতিপৃথিবীর সঙ্গে মানুষের একাত্মতা, যে পৃথিবীতে অশ্লীলতা বলে কিছু হয় না এবং মানুষের ইনোসেন্স পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
    হাংরির পরের দশকগুলোয় অনিল করঞ্জাইয়ের অঙ্কনজগতে পরিবর্তন ও পূর্নতাপ্রাপ্তি ঘটলেও, হাংরির সময়কার অভিজ্ঞতা তাঁর চেতনায় থেকে গিয়েছিল। তাঁর আইডিয়াগুলো হয়তো বিভিন্ন সূত্র থেকে আহরিত, কিন্তু হাংরির লক্ষ্য তাঁর দৃষ্টির বাইরে কখনও যায়নি। তাঁর আঁকা পরবর্তীকালের ছবিগুলো অনেকাংশে ক্লাসিকাল, বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর ল্যাণ্ডস্কেপগুলো দেখলে প্রথমদিকের পরাবাস্তব চিত্রকল্পের বিরোধাভাসমূলক মনে হবে, যা তাঁর দর্শকদের বিভ্রান্ত করে। কিন্তু একথা নিশ্চয় বলা যেতে পারে যে প্ররোচনাদায়ক অলঙ্কারপূর্ণ চিত্রকল্প থেকে তিনি দূরে সরে গেলেও, ছবির ভিত্তিতে পরিবর্তন ঘটেনি। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অনিল করঞ্জাইয়ের ছবিতে পাওয়া যাবে মানবাস্তিত্বের নাট্য যা প্রকৃতি নিজের মুড ও আঙ্গিকের মাধ্যমে প্রকাশ করে চলেছে। আর হাংরিদের কবিতার সঙ্গে তা খাপ খায়। বিনয় মজুমদার তাঁর ‘একটি উজ্বল মাছ’ কবিতায় চিত্রকল্পর আত্মাকে ধরে রেখেছেন, যখন তিনি বলেন:

    পৃথিবীর পল্লবিত ব্যাপ্ত বনস্হলী
    দীর্ঘ দীর্ঘ ক্লান্ত শ্বাসে আলোড়িত করে
    তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে
    চিরকাল থেকে ভাবে মিলাইবে শ্বাসরোধী কথা।

    অনিল করঞ্জাইয়ের জীবনেও মিলনের এই স্বপ্ন বার বার ফিরে এসেছে তাঁর আঁকা ছবিগুলোয়। ১৯৬৯ সালে আঁকা ‘দি ড্রিমার’ নামের পেইনটিঙে অনিল স্পষ্ট করে তুলেছেন সৃষ্টিকর্মীর একাকীত্ব : সেই ‘ড্রিমার’ হাংরিদের সংঘর্ষময় এলএসডি মাদকে মুখিয়ে রয়েছে; অনিলের আরেকটি ওয়াটার কালারে মলয় রায়চৌধুরীর ঘোষণা এসেছে ছবির থিম হয়ে। মলয় বলেছিলেন, “আমি মনে করি প্রথম কবি ছিলেন সেই জিনজাসথ্রপাস প্রাণী যিনি লক্ষ লক্ষ বছর আগে মাটি থেকে একটা পাথর তুলে নিয়ে তাকে অস্ত্র করে তুলেছিলেন।” পরের দিকে অনিলের আঁকা কবি ও দার্শনিকরা, পাথরে খোদাই করা, প্রকৃতির শৌর্যমণ্ডিত, তাদের অস্ত্র কেবল তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। এই ছবিগুলো মহান আর্টিস্টের মতন করে আঁকা। হাংরিতে অনিলের মতন এমন একজন ছবি আঁকিয়ে ছিলেন যিনি মৌলিক।

    আট : হাংরি যুগের ক্ষুধার্ত পত্রিকা পর্ব

    হাংরিতে অংশগ্রহণকারীদের মুচলেকা দেয়া আর আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হওয়া নিয়ে ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার কার্তিক-পৌষ ১৩৯১ সংখ্যায় তাঁর সম্পাদকীয়তে শিবনারায়ণ রায় লিখেছিলেন : “যেটি আমার কাছে সবচাইতে গ্লানিকর মনে হয়েছে সেটি পুলিশের মূঢ়, অতিনৈতিক জুলুমবাজি নয়, সেটি হল প্রথম ধাক্কাতেই বিদ্রোহী লেখকদের হার মানা। মকদ্দমা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল মলয়ের বিরুদ্ধে; তাঁর বেশির ভাগ সাহিত্যিক সহকর্মীই হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক পুলিশের কাছে অস্বীকার করেন। শহিদ হওয়া শিল্পীদের দায়িত্ব নয়; কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধ এবং বিপন্ন বন্ধুর প্রতি আনুগত্য না-থাকলে কোনও আন্দোলনই শক্তি অর্জন করতে পারে না। শিল্পকৃতির জন্য আন্দোলন জরুরি নয়; শিল্পী ও ভাবুকদের মধ্যে অনেকেই নির্জনে বসে সাধনা করবার পক্ষপাতী। কিন্তু কোনও আন্দোলন — শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে হোক, আর জীবনের অন্য বিন্যাসেই হোক — প্রভাব ফেলতে পারে না, যদি না সেই আন্দোলনে যাঁরা অ২শভাক তাঁরা সৎ, নীতিনিষ্ঠ, এবং পরস্পরের কাছে নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হন। যেমন উৎসবে ব্যাসনে তেমনি দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে যে পাশে থাকে সেই তো বন্ধু “।

    কলকাতা হাইকোর্টে ব্যাঙ্কশাল আদালতের রায় খারিজ হবার পর আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাই আর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নোট পোড়াবার চাকরি থেকে যাতে নিষ্কৃতি পাই তাই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ছেড়ে যোগ দিই অ্যাগরিকালচারাল রিফাইনান্স অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশানে। নতুন চাকরিতে আমাকে কৃষি আর গ্রামীণ জীবন নিয়ে এতো বই পড়তে হতো আর ট্রেনিঙ নিতে হতো যে সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। পাটনার ইমলিতলা বস্তিতে বসবাস করে বাজরা আর জোয়ারের খেতের তফাত, মুসুরি আর মুগডালের খেতের তফাত, খেতে জলসেচের নানা পদ্ধতি, ভারত জুড়ে ছাগল, গোরু, শুয়োর ইত্যাদি পশুদের তফাত জানতুম না। হিমালয়ের তরাইতে যে জংলি গোরুর পাল থাকে তা জানতুম না। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি ছাড়ার ফলে তুলনামূলকভাবে আমার পেনশন কমে গেছে, যদিও ভারতবর্ষ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রচুর।

    হাংরি বর্জনের বয়ানের কারণেই হয়তো, যারা কলকাতায় রইল তারা ‘ক্ষুধার্ত’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করল। ১৯৬৯ সালে প্রথম সংখ্যা আর ১৯৮৪ সালে সপ্তম বা শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম তিনটি সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী এবং পরের চারটি সংখ্যা শৈলেশ্বর ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।এই সময়ে অনেক নতুন লেখক হাংরি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্ষুধার্ত পত্রিকায় লেখা দিয়েছিল। এই সংখ্যাগুলো নিয়ে শঙ্খ ঘোষের উদ্যোগে সাহিত্য অকাদেমি থেকে একটা সংকলন ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়। বলাবাহুল্য সাহিত্য অকাদেমি ক্ষমতার একটি পীঠস্হান।

    শঙ্খ ঘোষের উদ্যোগে দে’জ থেকে একটা হাংরি জেনারেশন সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। বইটি সম্পর্কে কথাকলি দত্ত ‘৩৬৫ দিন’ সংবাদপত্রে ‘ইতিহাসের বিকৃতি’ শিরোনামে লিখেছেন,
    “হাংরি জেনারেশন রচনা সংগ্রহ যখন দে’জ এর মতন নামী প্রকাশন সংস্হা প্রকাশ করে, তখন মনে ফুর্তি হয়। তাই বইটি তড়িঘড়ি সম্পাদকের কাছ থেকে সংগ্রহ করি। সম্পাদক সব্যসাচী সেনকে আমি জানি না। প্রথমে ভেবেছিলাম, ঘ্যাম কেউ হবেন বোধহয়, খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম, না না, তেমন কেউ নন, শৈলেশ্বর ঘোষের চামচা। শঙ্খ ঘোষ অবধি এখনও পৌঁছোতে পারেনি বেচারা , চেষ্টা যদিও আছে খুবই, তবে শঙ্খর চামচা অভীক মজুমদারের কাছ অবধি পৌঁছে গেছে। যদি ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে। কথা হচ্ছে হাংরিদের নিয়ে -- এর মধ্যে আবার শঙ্খ ঘোষ এলেন কোথ্থেকে ! অভীক ভাইটি, সব্যসাচীর ভাইপোটি, শঙ্খ ঘোষকে আমি আনিনি -- এনেছ তোমরা -- বইয়ের শুরুতে। যে মাঝারি মাপের কবিটি লম্বা জিব বের করে সারা জীবন আনন্দবাজারের পা চেটে-চেটে কবিগুরু হলেন, তিনি নাকি হাংরি ! সোনার পাথরবাটি ! কাঁঠালের আমসত্ব ! তাঁর খিদে তো অন্য ভাই অভীক, ভাইপো সব্যসাচী। এখন ৬৭০ পাতার বই তোমাদের প্রকাশ করতে হল শুধু শঙ্খর নির্দেশে, শৈলেশ্বরকে হিরো বানাতে এবং হাংরি স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীকে হেয় করতে ! বেচারা ! ইতিহাস চক-ডাস্টার নয় যা চাইলেই মুছে দেওয়া যায়। যে যাই বলুক, হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীই ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরও অনেকেই হয়তো ছিলেন, কিন্তু মলয় রায়চৌধুরী এই আন্দোলনের জনক। অভিভাবকবাবুরা কথা ঘোরাতে চাইলেও সত্যিটা সত্যই থাকবে। মলয়ের নেতৃত্বে ১১ টি প্রস্তাবের ইশতাহার বের করেছিল আন্দোলনকারীরা। একটা টকে যাওয়া ও পচে যাওয়া সময়ের বিরুদ্ধে ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী প্রতিবাদ।”

    কথাকলি দত্ত যাই বলুন না কেন, শৈলেশ্বর ঘোষ হাংরি যুগের একজন প্রতিভাবান কবি; কবিতায় নবায়ন এনেছে শৈলেরশ্বর। তার অনুগামীদের যে ‘ক্ষুধার্ত’ অভিধা সরিয়ে ‘হাংরি’ ভাবকল্পটিকে সংকলনগুলোতে স্বীকার করতে হয়েছে তা হাংরি যুগের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। তবে শেষ বয়সে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পাশে বসে ফোটো তোলানো শৈলেশ্বর ঘোষের উচিত হয়নি।

    এই প্রসঙ্গে সব্যসাচী সেনকে দেয়া শৈলেশ্বর ঘোষের সাক্ষাৎকারের অংশটা উল্লেখ্য

    সব্যসাচী সেন : আমরা তো আমাদের কবিদের দেখছি, তারা ছুটছেন প্রচারের পেছনে, পুরস্কারের পেছনে, ছুটছেন সামাজিক প্রতিষ্ঠার পেছনে- সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, সাফল্যের পেছনে-

    শৈলেশ্বর ঘোষ : আজকের সারা পৃথিবীই তো 'সাফল্য' শব্দটার পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। এটাই তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো অসুখ। এখানেও তুমি একটা ভুল করলে, 'সকলে কবি নয় কেউ কেউ কবি'। সাফল্যের পেছনে যারা ছোটেন তারাই তো ক্ষমতার মূল্যবোধগুলিকে মানুষের মনে বৈধতা দিয়ে দেন এবং ক্ষমতা তাদের আরো বড়ো সাফল্যের দিকে ছুটতে বলে।

    ক্ষুধার্ত পর্বে ছোটোগল্প লেখক অবনী ধর এক নতুন প্যানারমা সৃষ্টি করেছে। কবি শুভঙ্কর দাশ আর শর্মী পাণ্ডেকে অনুরোধ করে আমি অবনী ধরের সব কয়টি গল্পের সংকলন সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলুম।

    ১৯৬৮ সালের সন্ধ্যা। হাংরি আন্দোলনকারীরা খালাসিটোলায় জড়ো হয়েছেন জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন পালনের জন্য। টেবিলে উঠে পড়লেন অবনী ধর আর নাচের সঙ্গে গাইতে লাগলেন এই গানটা, যা তিনি জাহাজে খালসির কাজ করার সময়ে গাইতেন, বিদেশি খালাসিদের সঙ্গে। উপস্হিত সবাই, এমনকি হাংরি আন্দোলনের কয়েকজন ভেবেছিলেন গানটা আবোল-তাবোল, কেননা ইংরেজিতে তো এমনতর শব্দ তাঁদের জানা ছিল না। যে সাংবাদিকরা খবর কভার করতে এসেছিলেন তাঁরাও গানটাকে ভেবেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীদের বজ্জাতি, প্রচার পাবার ধান্দা। পরের দিন দি স্টেটসম্যান যে সংবাদ দিয়েছিল তাতে ভাসা-ভাসা উল্লেখ ছিল। সেই সপ্তাহের ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ শিরোনামে ঠাট্টা করে দুই পাতা চুটকি লেখা হয়েছিল, অবনী ধরের কার্টুনের সঙ্গে। ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ তকমাটি যিনি ব্যবহার করেছিলেন তিনি জানতেন না যে এই শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন গারট্রুড স্টিন এবং বিশ শতকের বিশের দশকে প্যারিসে আশ্রয় নেয়া আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, টি. এস. এলিয়ট, জন ডস প্যাসস, ই ই কামিংস, আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ, হার্ট ক্রেন প্রমুখকে বলা হয়েছিল ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সদস্য। গানটা এরকম, মোৎসার্টের একটা বিশেষ সুরে গাওয়া হয়:

    জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,
    জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু।
    জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,
    জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু।
    হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা উউউউউহ,
    হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা, উহ
    শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি।
    উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ।

    ১৯২০ সালে, প্রথম বিশ্ব স্কাউট জাম্বোরির জন্য, রবার্ট ব্যাডেন-পাওয়েল, প্রথম বারন ব্যাডেন-পাওয়েল (স্কাউটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা) সিদ্ধান্ত নেন যে একটা মজার গান পেলে ভালো হয়, যা সব দেশের স্কাউটরা গাইতে পারবে; কারোরই কঠিন মনে হবে না। উনি মোৎসার্টের এক নম্বর সিম্ফনির ইবি মেজরে বাঁধা সুরটি ধার করেছিলেন। গানটা স্কাউটদের মধ্যে তো বটেই সাধারণ স্কুল ছাত্রদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়েছিল। এই স্কাউটদের কেউ-কেউ জাহাজে চাকরি নিয়ে খালাসি এবং অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে এটাকে ছড়িয়ে দিতে সফল হন। অবনী ধর বেশ কিছুকাল জাহাজে খালাসির কাজ করেছিল এবং তারও ভালো লেগে যায় সমবেতভাবে গাওয়া গানটি।
    অবনী ধরের নৃত্য হাংরি যুগকে অন্যান্য সাহিত্যিক ভাবনাচিন্তা থেকে আলাদা করে তোলে। কেউ কি ভাবতে পারেন যে কল্লোল যুগের কোনো লেখক খালাসিটোলায় টেবিলের ওপরে উঠে নাচতে-নাচতে গান গাইছেন ?

    নয় : হাংরি যুগের সার্থকতা

    হাংরির সার্থকতা নিয়ে অভিজিত পাল যে কথাগুলো বলেছেন তা আমি এখানে তুলে ধরছি। বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশনের ন্যায় আর কোনও আন্দোলন তার পূর্বে হয় নাই। হাজার বছরের বাংলা ভাষায় এই একটিমাত্র আন্দোলন যা কেবল সাহিত্যের নয় সম্পূর্ণ সমাজের ভিত্তিতে আঘাত ঘটাতে পেরেছিল, পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। পরবর্তীকালে তরুণ সাহিত্যিক ও সম্পাদকদের সাহস যোগাতে পেরেছে।

    ১) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্ণিত করতে অস্বীকার করেছিলেন। কেবল তাই নয়; তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করতেন। তাঁরাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড কবিতা, ও পোস্টারে কবিতা ও কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন। পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায়। ফোলডারে স্কেচ আঁকতেন সুবিমল বসাক। ত্রিদিব মিত্র তাঁর ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নিজে আঁকতেন। পরবর্তীকালে দুই বাংলাতে তাঁদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

    ২) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। তাঁদের আগমনের পূর্বে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করার কথা সাহিত্যকরা চিন্তা করেন নাই। সুভাষ ঘোষ বলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার বিরোধিতা নয়, সংবাদপত্র বিরোধিতা নয়; হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত করে নবতম মূল্যবোধ সঞ্চারিত করার। নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরণ, ডিকশন, উদ্দেশ্য, শব্দ ব্যবহার, চিন্তা ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হী সরকার সত্বেও বামপন্হী কবিরা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে নিষ্কৃতি পান নাই। শ্রমিকের কথ্য-ভাষা, বুলি, গালাগাল, ঝগড়ার অব্যয় তাঁরা নিজেদের রচনায় প্রয়োগ করেন নাই। তা প্রথম করেন হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগন; উল্লেখ্য হলেন অবনী ধর, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখ। সুবিমল বসাকের পূর্বে ‘বাঙাল ভাষায়’ কেউ কবিতা ও উপন্যাস লেখেন নাই। হাংরি জেনারেশনের পরবর্তী দশকগুলিতে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিদের রচনায় এই প্রভাব স্পষ্ট।

    ৩) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে ল্যাবিরিনথাইন করে প্রয়োগ করা। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ও গল্প-উপন্যাস। মলয় রায়চৌধুরী সর্বপ্রথম পশ্চিমবাংলার সমাজে ডিসটোপিয়ার প্রসঙ্গ উথ্থাপন করেন। বামপন্হীগণ যখন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রচার করছিলেন সেই সময়ে মলয় রায়চৌধুরী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো।উল্লেখ্য তাঁর নভেলা ‘ঘোগ’, ‘জঙ্গলরোমিও’, গল্প ‘জিন্নতুলবিলদের রূপকথা’, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ ইত্যাদি। তিনি বর্ধমানের সাঁইবাড়ির ঘটনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে লেখেন ‘আরেকবারে ক্ষুধিত পাষাণ’। বাঙাল ভাষায় লিখিত সুবিমল বসাকের কবিতাগুলিও উল্লেখ্য। পরবর্তী দশকের লিটল ম্যাগাজিনের কবি ও লেখকদের রচনায় এই প্রভাব সুস্পষ্ট।

    ৪) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের চতুর্থ অবদান হলো পত্রিকার নামকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। হাংরি জেনারেশনের পূর্বে পত্রিকাগুলির নামকরণ হতো ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’, ‘শতভিষা’, ‘পূর্বাশা’ ইত্যাদি যা ছিল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ পত্রিকার নামকরণ করলেন ‘জেব্রা’, ‘জিরাফ’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘উন্মার্গ’, ‘প্রতিদ্বন্দী’ ইত্যাদি। পরবর্তীকালে তার বিপুল প্রভাব পড়েছে। পত্রিকার নামকরণে সম্পূর্ণ ভিন্নপথ আবিষ্কৃত হয়েছে।

    ৫) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল। ‘কবিতা’, ‘ধ্রুপদি’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’ ইত্যাদি পত্রিকায় নিম্নবর্গের কবিদের রচনা পাওয়া যায় না। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের বুলেটিনগুলির সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন কবিরা তাঁর এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হন। এছাড়া আন্দোলনে ছিলেন নিম্নবর্গের চাষী পরিবারের শম্ভু রক্ষিত, তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাক, জাহাজের খালাসি অবনী ধর, মালাকার পরিবারের নিত্য মালাকার ইত্যাদি। পরবর্তীকালে প্রচুর সাবঅলটার্ন কবি-লেখকগণকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে দেখা গেল।

    ৬) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রচনায় যুক্তিবিপন্নতা, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা, আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু হওয়া ও শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না দেয়া, ক্রমান্বয়হীনতা, যুক্তির দ্বৈরাজ্য, কেন্দ্রাভিগতা বহুরৈখিকতা ইত্যাদি। তাঁদের আন্দোলনের পূর্বে টেক্সটে দেখা গেছে যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন যুক্তি ধাপে-ধাপে এগোতো, কবিতায় থাকতো আদি-মধ্য-অন্ত, রচনা হতো একরৈখিক, কেন্দ্রাভিগ, স্বয়ংসম্পূর্ণতা।

    ৭) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে লেখক-কবিগণ আশাবাদে আচ্ছন্ন ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট প্রভাবে। ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখতেন। বাস্তব জগতের সঙ্গে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ছিলেন। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ প্রথমবার হেটেরোটোপিয়ার কথা বললেন। হাংরি জেনারেশনের কবি অরুণেশ ঘোষ তাঁর কবিতাগুলোতে বামপন্হীদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। হাংরি জেনরেশনের পরের দশকের কবি ও লেখকগণের নিকট বামপন্হীদের দুইমুখো কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে গিয়েছে, বিশেষ করে মরিচঝাঁপি কাণ্ডের পর।

    ৮) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে কবি-লেখকগণ মানেকে সুনিশ্চিত করতে চাইতেন, পরিমেয়তা ও মিতকথনের কথা বলতেন, কবির নির্ধারিত মানে থাকত এবং স্কুল কলেজের ছাত্ররা তার বাইরে যেতে পারতেন না। হাংরি জেনারেশনের লেখকগণ অফুরন্ত অর্থময়তা নিয়ে এলেন, মানের ধারণার প্রসার ঘটালেন, পাঠকের ওপর দায়িত্ব দিলেন রচনার অর্থময়তা নির্ধারণ করার, প্রচলিত ধারণা অস্বীকার করলেন। শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার সঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

    ৯) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে ‘আমি’ থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক আমি থাকতো, লেখক-কবি ‘আমি’র নির্মাণ করতেন, তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড থাকতো, সীমার স্পষ্টিকরণ করতেন রচনাকার, আত্মপ্রসঙ্গ ছিল মূল প্রসঙ্গ, ‘আমি’র পেডিগ্রি পরিমাপ করতেন আলোচক। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ নিয়ে এলেন একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব, মানদণ্ড ভেঙে ফেললেন তাঁরা, সীমা আবছা করে দিলেন, সংকরায়ন ঘটালেন, লিমিন্যালিটি নিয়ে এলেন।

    ১০) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে শিরোনাম দিয়ে বিষয়কেন্দ্র চিহ্ণিত করা হতো। বিষয় থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক মালিকানা ছিল, লেখক বা কবি ছিলেন টাইটেল হোলডার। হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবিগণ শিরোনামকে বললেন রুবরিক; শিরোনাম জরুরি নয়, রচনার বিষয়কেন্দ্র থাকে না, মালিকানা বিসর্জন দিলেন, ঘাসের মতো রাইজোম্যাটিক তাঁদের রচনা, বৃক্ষের মতন এককেন্দ্রী নয়। তাঁরা বললেন যে পাঠকই টাইটেল হোলডার।

    ১১) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হতো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী একরৈখিক রীতিতে। তাঁদের ছিল লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত লেখা, একক গলার জোর, কবিরা ধ্বনির মিল দিতেন, সময়কে মনে করতেন প্রগতি। এক রৈখিকতা এসেছিল ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্হের কাহিনির অনুকরণে; তাঁরা সময়কে মনে করতেন তা একটিমাত্র দিকে এগিয়ে চলেছে। আমাদের দেশে বহুকাল যাবত সেকারণে ইতিহাস রচিত হয়েছে কেবল দিল্লির সিংহাসন বদলের। সারা ভারত জুড়ে যে বিভিন্ন রাজ্য ছিল তাদের ইতিহাস অবহেলিত ছিল। বহুরৈখিকতারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘মহাভারত’। হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকগণ একরৈখিকতা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার সূত্রপাত ঘটালেন। যেমন সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাস, মলয় রায়চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘জখম’, সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হ ‘আমার চাবি, ইত্যাদি। তাঁরা গ্রহণ করলেন প্লুরালিজম, বহুস্বরের আশ্রয়, দিকবিদিক গতিময়তা, হাংরি জেনারেশনের দেখাদেখি আটের দশক থেকে কবি ও লেখকরা বহুরৈখিক রচনা লিখতে আরম্ভ করলেন।

    ১২) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে মনে করা হতো কবি একজন বিশেষজ্ঞ। হাংরি জেনারেশনের কবিরা বললেন কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী প্রজন্মে বিশেষজ্ঞ কবিদের সময় সমাপ্ত করে দিয়েছেন নতুন কবির দল এবং নবনব লিটল ম্যাগাজিন।

    ১৩) ঔপনিবেশিক প্রভাবে বহু কবি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতেন। ইউরোপীয় লেখকরা যেমন নিজেদের ‘নেটিভদের’ তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠত্ব, বিশেষ একজনকে তুলে ধরা, নায়ক-কবি, সরকারি কবির শ্রেষ্ঠত্ব, হিরো-কবি, এক সময়ে একজন বড়ো কবি, ব্র্যাণ্ড বিশিষ্ট কবি আইকন কবি ইত্যাদির প্রচলন ছিল। হাংরি জেনারেশন সেই ধারণাকে ভেঙে ফেলতে পেরেছে তাদের উত্তরঔপনিবেশিক মূল্যবোধ প্রয়োগ করে। তারা বিবেচন প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতা সরিয়ে দিতে পেরেছে, কবির পরিবর্তে একাধিক লেখককের সংকলনকে গুরুত্ব দিতে পেরেছে, ব্যক্তি কবির পরিবর্তে পাঠকৃতিকে বিচার্য করে তুলতে পেরেছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার কথা বলেছে। সার্বিক চিন্তা-চেতনা ও কৌমের কথা বলেছে। তাঁদের পরবর্তী কবি-লেখকরা হাংরি জেনারেশনের এই মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন।

    ১৪) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শব্দার্থকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচলন ছিল। রচনা ছিল কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন। হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকরা বলেছেন কথা চালিয়ে যাবার কথা। বলেছেন যে কথার শেষ নেই। নিয়েছেন শব্দার্থের ঝুঁকি। রচনাকে মুক্তি দিয়েছেন আত্মমনস্কতা থেকে। হাংরি জেনারেশনের এই কৌম মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন পরবর্তীকালের কবি-লেখকরা। এই প্রভাব সামাজিক স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ১৫) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত ছিল ‘বাদ’ দেবার প্রবণতা; সম্পাদক বা বিশেষ গোষ্ঠী নির্ণয় নিতেন কাকে কাকে বাদ দেয়া হবে। হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সাংস্কৃতিক হাতিয়ার ছিল “এলিমিনেশন”। বাদ দেবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে তাঁরা নিজেদের আয়ত্বে রাখতেন। হাংরি জেনারেশনের সম্পাদকরা ও সংকলকরা জোট বাঁধার কথা বললেন। যোগসূত্র খোঁজাল কথা বললেন। শব্দজোট, বাক্যজোট, অর্থজোটের কথা বললেন। এমনকি উগ্র মতামতকেও পরিসর দিলেন। তাঁদের এই চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালের সম্পাদক ও সংকলকদের অবদানে স্পষ্ট। যেমন অলোক বিশ্বাস আটের দশকের সংকলনে ও আলোচনায় সবাইকে একত্রিত করেছেন। বাণিজ্যিক পত্রিকা ছাড়া সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রে এই গুণ উজ্বল।

    ১৬) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত একটিমাত্র মতাদর্শকে, ইজমকে, তন্ত্রকে, গুরুত্ব দেয়া হতো। কবি-লেখক গোষ্ঠীর ছিল ‘হাইকমাণ্ড’, ‘হেডকোয়ার্টার’, ‘পলিটব্যুরো’ ধরণের মৌরসি পাট্টা। হাংরি জেনারেশন একটি আন্দোলন হওয়া সত্বেও খুলে দিল বহু মতাদর্শের পরিসর, টুকরো করে ফেলতে পারলো যাবতীয় ‘ইজম’, বলল প্রতিনিয়ত রদবদলের কথা, ক্রমাগত পরিবর্তনের কথা। ভঙ্গুরতার কথা। তলা থেকে ওপরে উঠে আসার কথা। হাংরি জেনারেশনের পরে সম্পূর্ণ লিটল ম্যাগাজিন জগতে দেখা গেছে এই বৈশিষ্ট্য এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব।

    ১৭) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত দেখা গেছে ‘নিটোল কবিতা’ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ এলিটিস্ট কবিতা রচনার ধারা। তাঁরা বলতেন রচনাকারের শক্তিমত্তার পরিচয়ের কথা। গুরুগম্ভীর কবিতার কথা। নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক মডেলের কথা। যেমন সনেট, ওড, ব্যালাড ইত্যাদি। হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ নিয়ে এলেন এলো-মেলো কবিতা, বহুরঙা, বহুস্বর, অপরিমেয় নাগালের বাইরের কবিতা। তাঁদের পরের প্রজন্মের সাহিত্যিকদের মাঝে এর প্রভাব দেখা গেল। এখন কেউই আর ঔপনিবেশিক বাঁধনকে মান্যতা দেন না। উদাহরণ দিতে হলে বলতে হয় অলোক বিশ্বাস, দেবযানী বসু, ধীমান চক্রবর্তী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, প্রণব পাল, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের রচনা।

    ১৮) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল স্হিতাবস্হার কদর এবং পরিবর্তন ছিল শ্লথ। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ পরিবর্তনের তল্লাশি আরম্ভ করলেন, প্রযুক্তির হস্তক্ষেপকে স্বীকৃতি দিলেন। পরবর্তী দশকগুলিতে এই ভাঙচুরের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যেমন কমল চক্রবর্তী, সুবিমল মিশ্র, শাশ্বত সিকদার ও নবারুণ ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে; তাঁরা ভাষা, চরিত্র, ডিকশন, সমাজকাঠামোকে হাংরি জেনারেশনের প্রভাবে গুরুত্ব দিতে পারলেন।

    ১৯) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে নাক-উঁচু সংস্কৃতির রমরমা ছিল, প্রান্তিককে অশোভন মনে করা হতো, শ্লীল ও অশ্লীলের ভেদাভেদ করা হতো, ব্যবধান গড়ে ভেদের শনাক্তকরণ করা হতো। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা সংস্কৃতিকে সবার জন্য অবারিত করে দিলেন। বিলোপ ঘটালেন সাংস্কৃতিক বিভাজনের। অভেদের সন্ধান করলেন। একলেকটিকতার গুরুত্বের কথা বললেন। বাস্তব-অতিবাস্তব-অধিবাস্তবের বিলোপ ঘটালেন। উল্লেখ্য যে বুদ্ধদেব বসু মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁর দ্বারে দেখামাত্র দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালের লিটল ম্যাগাজিনে আমরা তাঁদের এই অবদানের প্রগাঢ় প্রভাব লক্ষ্য করি।

    ২০) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল ইউরোপ থেকে আনা বাইনারি বৈপরীত্য যা ব্রিটিশ খ্রিস্টানরা হা্রণ করেছিল তাদের ধর্মের ঈশ্বর-শয়তান বাইনারি বৈপরীত্য থেকে। ফলত, দেখা গেছে ‘বড় সমালোচক’ ফরমান জারি করছেন কাকে কবিতা বলা হবে এবং কাকে কবিতা বলা হবে না; কাকে ‘ভালো’ রচনা বলে হবে এবং কাকে ভালো রচনা বলা হবে না; কোন কবিতা বা গল্প-উপন্যাস উতরে গেছে এবং কোনগুলো যায়নি ইত্যাদি। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা এই বাইনারি বৈপরীত্য ভেঙে ফেললেন। তাঁরা যেমন ইচ্ছা হয়ে ওঠা রচনার কথা বললেন ও লিখলেন, যেমন সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হগুলি। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন বহুপ্রকার প্রবণতার ওপর, রচনাকারের বেপরোয়া হবার কথা বললেন, যেমন মলয় রায়চৌধুরী, পদীপ চৌধুরী ও শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতা। যেমন মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা ও ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাস। যেমন সুবিমল বসাকের বাঙাল ভাষার কবিতা যা এখন বাংলাদেশের ব্রাত্য রাইসুও অনুকরণ করছেন। হাংরি জেনারেশনের পরের দশকগুলিতে তাঁদের এই অবদানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, এবং তা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে।

    ২১) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল আধিপত্যের প্রতিষ্ঠার সাহিত্যকর্ম। উপন্যাসগুলিতে একটিমাত্র নায়ক থাকত। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ আধিপত্যের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন তাঁদের রচনাগুলিতে। বামপন্হী সরকার থাকলেও তাঁরা ভীত হলেন না। হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সেকারণে ছিল খণ্ডবাদ বা রিডাকশানিজমের গুরুত্ব। হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন কমপ্লেকসিটিকে, জটিলতাকে, অনবচ্ছিন্নতার দিকে যাওয়াকে। যা আমরা পাই বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক, মলয় রায়চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ প্রমুখের গল্প-উপন্যাসে। পরবর্তী দশকগুলিতে দুই বাংলাতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

    ২২) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল গ্র্যাণ্ড ন্যারেটিভকে। হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন মাইক্রো ন্যারেটিভকে, যেমন সুবিমল বসাকের ‘দুরুক্ষী গলি’ নামক উপন্যাসের স্বর্ণকার পরিবার, অথবা অবনী ধরের খালাসি জীবন অথবা তৎপরবতী কঠিন জীবনযাপনের ঘটনানির্ভর কাহিনি। পরবর্তী দশকগুলিতে দেখা যায় মাইক্রোন্যারেটিভের গুরুত্ব, যেমন গ্রুপ থিয়েটারগুলির নাটকগুলিতে।

    ২৩) হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ নিয়ে এলেন যুক্তির ভাঙন বা লজিকাল ক্র্যাক, বিশেষত দেবী রায়ের প্রতিটি কবিতায় তার উপস্হিতি পরিলক্ষিত হয়। পরের দশকের লেখক ও কবিদের রচনায় লজিকাল ক্র্যাক অর্থাৎ যুক্তির ভাঙন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। যেমন সাম্প্রতিক কালে অগ্নি রায়, রত্নদীপা দে ঘোষ, বিদিশা সরকার, অপূর্ব সাহা, সীমা ঘোষ দে, সোনালী চক্রবর্তী, আসমা অধরা, সেলিম মণ্ডল, জ্যোতির্ময় মুখোপাধ্যায়, পাপিয়া জেরিন, প্রমুখ।

    ২৪) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে রচনায়, বিশেষত কবিতায়, শিরোনামের গুরুত্ব ছিল; শিরোনামের দ্বারা কবিতার বিষয়কেন্দ্রকে চিহ্ণিত করার প্রথা ছিল। সাধারণত বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত এবং সেই বিষয়ানুযায়ী কবি কবিতা লিখতেন। শিরোনামের সঙ্গে রচনাটির ভাবগত বা দার্শনিক সম্পর্ক থাকতো। ফলত তাঁরা মৌলিকতার হামবড়াই করতেন, প্রতিভার কথা বলতেন, মাস্টারপিসের কথা বলতেন।হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ শিরোনামকে সেই গুরুত্ব থেকে সরিয়ে দিলেন। শিরোনাম আর টাইটেল হোলডার রইলো না। শিরোনাম হয়ে গেল ‘রুবরিক’। তাঁরা বহু কবিতা শিরোনাম র্বজন করে সিরিজ লিখেছেন। পরবর্তী দশকের কবিরা হাংরি জেনারেশনের এই কাব্যদৃষ্টির সঙ্গে একমত হয়ে কবিতার শিরোনামকে গুরুত্বহীন করে দিলেন; সম্পূর্ণ কাব্যগণ্হ প্রকাশ করলেন যার একটিতেও শিরোনাম নেই।

    ২৫) হাংরি জেনারেশন তৎকালীন সমাজের প্রথাগত নীতিবোধ আর চেতনায় দারুণ আঘাত হেনেছিল। প্রতিঘাতে তাদেরও আক্রান্ত হতে হয়েছিল। হ্যান্ডবিল আকারে প্রকাশিত হাংরি বুলেটিনগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ‘হাংরি জেনারেশন’ যেসব সাহিত্যিকদের জন্ম দিয়েছে, তারা ব্যক্তিগত জীবনে এক অর্থে অসফল হলেও তাদের এই আন্দোলন পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নাগরিক জীবন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অসঙ্গতিকে, এত অল্প সময়ে এভাবে কলমের আঘাতে আর কোনো সাহিত্যকেন্দ্রিক আন্দোলন, জর্জরিত করতে পারেনি।

    ২৬) হাংরি আন্দোলন সাবলম্বী করেছে বাংলা সাহিত্যকে, আধুনিকোত্তর সাহিত্যের ভিত্তি মজুবত হয়েছ এই আন্দোলনের প্রভাবে। এমন নজির পৃথিবীর খুব কম ভাষাতেই রয়েছে। হাংরি আন্দোলন অনন্য করে তুলেছে বাংলার গদ্য ও কাব্যধারাকে, সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষাই বাংলা কবিতার ক্ষুধা আন্দোলনের স্রষ্টা।

    ২৭) কবিতা ক্যাম্পাস পত্রিকায় অলোক বিশ্বাসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কবি-অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “হাংরির পরে আরও আন্দোলন হল, কোনোটাই হাংরির কৌলিন্য পায়নি।”

    —-----------------xxxxxxxxxxxxx—--------------------------
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    103 | 104 | 105 | 106 | 107 | 110 | 113 | 114 | 119 | 120 | 121 | 123 | 124 | 124 | 125 | 125 | 126 | 127 | 127 | 128 | 129 | 131 | 133 | 134 | 135 | 136 | 138 | 139 | 140 | 141 | 143 | 144 | 145 | 147 | 148 | 149 | 149 | 150 | 151 | 152 | 153 | 154 | 155 | 156 | 157 | 158 | 159 | 160 | 161 | 162 | 163 | 164 | 165 | 167 | 168 | 169 | 170 | 171 | 172 | 173 | 174 | 175 | 176 | 176 | 177 | 178 | 179 | 180 | 181 | 182 | 183 | 184 | 185 | 186 | 187 | 188 | 189 | 190 | 191 | 192 | 192 | 193 | 194 | 195 | 196 | 198 | 199 | 200
  • আলোচনা | ০৮ জুন ২০২৩ | ৮৪৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ০৪ জুলাই ২০২৩ ১৬:০৩520989
  • আজ দিনভর এই লেখাটি পড়ে কবিতা সম্পর্কে এতোদিনের জ্ঞান সব ভণ্ডুল হয়ে গেল। 
     
    এ যেন এক নবুয়ত লাভ।
     
    ব্রাভো @ ক্ষুধিত প্রজন্ম।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন