এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • তেমন কোন ভয়ের গল্প নয় 

    Arundhati Sarkar Santra লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ৩০ জানুয়ারি ২০২৩ | ৭০৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • মনের রাগ চোখের তারায় ফুটিয়ে না তোলার একটা কায়দা রপ্ত করেছে তিয়াষ।
    কাজের সূত্রে যে সব জায়গায় যাতায়াত করে ও, সেই জায়গায় এই কায়দা না জানলে মুশকিলে পড়তে হয়। এই যেমন এখন সামনে বসে থাকা লোকটার ওপর রাগে গা জ্বলে গেলেও মুখে একটুকরো হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। লোকটা চিবিয়ে চিবিয়ে নিজের লোকসানের কথা বুঝিয়ে চলেছে। লোকটা এই সিতাপুরের লোক্যাল পার্টির নেতা, ছোটখাটো একটা ব্যবসাও চালায়। টিভি, সোফা, ফ্যান এসবের কভার তৈরি করে।  
    তিয়াষের কাজ হল এই সিতাবপুরের মত জায়গায় এই ধরণের ছোট উদ্যোগগুলোতে মেয়েদের হাতেকলমে কিছু কাজ শেখার ব্যবস্থা করা, যাতে ভদ্রভাবে কিছু উপার্জন করতে পারে। ওদের ট্রেনিং, কাঁচামাল এসবের জন্য সরকার থেকে টাকা দেয়।
    এখানে এই অসীম ঘোষালের কভার সেন্টার এ জনা বিশেক মেয়ের ট্রেনিং নিয়েছে।
    তিয়াসের অফিসিয়াল পোস্টিং কলকাতায় হলেও বেশিরভাগ সময়েই এইসব গ্রামগুলোতে সুপারভাইজ করতে যেতে হয়। এই  সিতাবপুরে কুড়িটা মেয়ে কভার বানানো শিখেছে ছয়মাস ধরে। প্রথম তিনমাস ট্রেনিং, তারপর তিনমাস হাতেকলমে কাজ।
    কথা ছিল ঘোষাল শেষ তিনমাসের জন্য কিছু মজুরি মেয়েগুলোর হাতে দেবেন। 
    কিন্তু আজ তিনি বলছেন এরা যা বানিয়েছে সেগুলো কিছুই নাকি বেচার যোগ্য হয়নি। মোটকথা মেয়েদের টাকা পয়সা কিছু দেওয়া যাবেনা। 
    চেবানো পানের রস অসীম ঘোষালের কষ বেয়ে গড়িয়ে নামছে। হাতের উল্টোপিঠে সেই রসটা মুছে নিয়ে বলল, “বুইলেন না দিইমনি, এমন সব কাজ করিছে,সব বেঁকাতেরা। ওসব একিবারে জঞ্জাল।” 
    “ই কি বলেন গো দাদা। তখুন তো তা বলুনি। তখুন তো বলতে সব মাপে মাপ হইছে।” একটা মেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। 
    তিয়াষ ভাবে গ্রামপ্রধানকে নালিশ করবে নাকি লোকটার নামে? নাকি নিজেই একটু চেষ্টা করে দেখবে।   
     একটু ভেবে ও  নেত্রী মতন মেয়েটাকে বলে, “ট্রেনিঙের সময় তোমরা কতগুলো কি বানিয়েছ লিখে রেখেছ তো? কাল দাদার কাছ লিস্ট থেকে মিলিয়ে নিয়ে নিও। আমি কলকাতার অফিসে পাঠিয়ে দেব।”
    তারপর অসীম ঘোষালের দিকে তাকিয়ে বলে, “ইসস কুড়িটা মেয়ে ছ’মাসে কিছুই শিখল না। ট্রেনিংটা তবে একেবারেই বেকার গেল। আমি প্রধানকে বলে দেব, আপনি কিস্তির টাকা যা পেয়ে গেছেন, ঐ রইলো। বাকি কিস্তিটা ট্রেনিং ঠিকঠাক হলে তবেই পাবেন এমনই কথা ছিল।”     
    অসীম ঘোষালের কষ বেয়ে লাল রঙের লালা গড়াচ্ছে, তিয়াসের মনে হল ওটা যেন পানের রস নয়, গরীব মেয়েগুলোর রক্ত।
    লোকটা একটু থতিয়ে গেছে।
    মেয়েদের তৈরি কভারগুলোর দাম নাকি ট্রেনিং দেওয়ার জন্য দ্বিতীয় কিস্তির টাকা? দ্রুত হিসেব কষছে।
    তারপর একটু ইতস্তত করে বলল, “মানে কথা হল দিইমনি, তা নয়। আমি তো যা সেকানোর শিক্কেছি, একন উয়ারা মাতামোটা হলে এই গরিবের কি দোষ ব্লুন দেকি?”
    তারপর একটু বেজার ভাবে মেয়েদের বললেন, “ যাস তবে কালকের দিকে, ছেঁটে কেটে দেখব নয় একবার।”
    তিয়াষ বুঝতে পারে, ওষুধ ধরেছে।  
     
    কিন্তু পঞ্চায়েত থেকে ফেরার সময় এক বিপদ। গাড়িটা কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না। সারিয়ে ফিরতে গেলে অনেক রাত হয়ে যাবে। 
    বিকেল মরে আসছে।
    তিয়াষ একটু বিরক্ত হল, ট্রেন ধরতে হবে অগত্যা। 
    ষ্টেশনে পৌঁছতে ভরসা জীপের মত একটা গাড়ি। এখানে বলে ট্রেকার।
    আজও ওরকমই একটা ট্রেকার এসেও গেল। মনে মনে একটু নিশ্চিন্তই হয় তিয়াষ।
    শেষ বিকেলের আলোও মরে গিয়েছে, সন্ধ্যের হাল্কা হাওয়াতে যেন সারাদিনের ক্লান্তি কেটে যাচ্ছে ওর। উল্টোদিকের সিটটায় বসেছে দুটি বউ। ওদের পায়ের কাছে গুটিশুটি হয়ে দুটো বাচ্ছা বসে আছে। একটি বছর ছয়েকের ছেলের কোলে আর ছোট্ট একটি ছেলে। ছোটটা বছর দুয়েকের হবে কিন্তু ভারি চুপচাপ, শান্ত। তিয়াষ একবার ভাবল ওদের মায়েরা একটু চেপে বসলেই তো বাচ্ছা দুটোকে সিটে বসিয়ে নিতে পারত। তিয়াষের দিকের সিটে তো এতটুকুও  জায়গা নেই।
    কে জানে, হয়তো ওরা এভাবেই যেতেই অভ্যস্ত। ফুলছাপা শাড়ি পড়া বউদুটি নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। খুঁটিনাটি ঘরকন্নার কথা সব। ডাল, ঝাল, ঝোলের গল্পের মধ্যেই ট্রেকারটা কালো পিচের রাস্তা ছেড়ে দিয়ে লাল মোরামের পথে ঢুকে পড়ল।   
    পঞ্চায়েত ক্লার্ক মিতালীর বলে দেওয়া সময়ের আগেই চলছে গাড়িটা। এই রাস্তাতেই পরপর বুড়োশিবের থান, জলার মাঠ, বটতলার পর গঞ্জের বাজার ছাড়ালেই রেলস্টেশন।
    তবে মিতালী এটা বলে দেয়নি যে এইসব ল্যান্ডমার্কগুলোর মাঝে বসতি খুবই কম। আদিগন্ত বিস্তৃত চাষের জমি। সব জমিতেই যে ফসল হয়ে আছে তা নয়। কোথাও কোথাও ধান কেটে নেওয়ার পর ফাঁকা ক্ষেত পড়ে আছে। দূরে দূরে লম্বা গাছগুলো হাওয়াতে মাথা নেড়ে নেড়ে দুলছে।  
    এই রাস্তায় লোকজন অল্প। দু একটা সাইকেল, মোটর সাইকেল যাচ্ছে। স্ট্রিটলাইট বলতে এখানে কিছু আছে বলে মনে হয় না। সে রকম অন্ধকার নামলে গাড়ির হেডলাইটই ভরসা।
    তিরতিরে হাওয়ায় একটু চোখ বুজে এসেছিলো তিয়াষের। 
    হঠাৎ "ঘ্যাঁস" শব্দ করে গাড়িটা ব্রেক কষল। 
    আচমকা ব্রেক কষায় তিয়াষ সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। শুধু তিয়াষই কেন, সামনের বৌ দুটিও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে টাল সামলালো, ওর পাশের লোকদুটোও বেশ চমকে উঠেছে।
    ড্রাইভার মুখ থেকে থুতু ফেলে চিত্কার করে বলল, " হঠ্, পাগলী শালি। কেবল ফালতু ক্যাচাল।" 
    ঘটনার আকস্মিকতায় তিয়াষ একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল।
    গাড়িটার পিছনে বসে যতটা দেখা যায়, তাতে ও দেখল একটি এলোমেলো শাড়িপড়া অবয়ব পাশের ক্ষেতের দিকে তাড়া খাওয়া জন্তুর মত নেমে যাচ্ছে। এখানে চাষ নেই, মাঠ ফাঁকা।   
     গাড়ি থামতে বৌ দুটি নেমে দাঁড়িয়েছে। ওরা আর যাবে না। হয়তো গন্তব্যের কাছাকাছিই এসে গেছিল। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে অন্য দিকে নেমে গেল। 
    তিয়াষ দেখতে পেল দূরে ফাঁকা ক্ষেতের মধ্যে সেই পাগলী ওদের উল্টোদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নেড়ে নেড়ে কাকে যেন ডাকছে।
    মাঠ ধু ধু করছে, সময়টা ঠিক দিন আর রাতের সন্ধিক্ষণ। সেই আধো আঁধারে, মাঠের ধুলোয়, আবছা মলিন অবয়বটি হঠাৎ দেখলে প্রেতিনী  বলে মনে হতেই পারে।
    এই ফাঁকা মাঠের মধ্যিখানে তিয়াষের বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল একবার।  
    ট্রেকারের ড্রাইভার তবু দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিয়াষ জিজ্ঞাসা করল, “দাদা আর কত দেরি?’’
    ড্রাইভার মুখ ঘুরিয়ে তিয়াষের দিকে তাকিয়ে বলল, “কলকাতার লোক নাকি? টেরেন ধরিবেন? এখুনি ছেড়ে দেব।” 
    ড্রাইভার থুতু ফেলে উঠে বসল। এতক্ষণে রাত নামছে। ট্রেকারটি আবার ছেড়ে দিল।
    তিয়াষ এতক্ষণ খেয়াল করেনি হয়তো বাচ্ছা দুটোও ওদের মায়েদের সঙ্গেই নেমে গেছে।
    ভারি মায়াবী চোখ ছেলেদুটোর। তিয়াষের মাথায় বড় ছেলেটির মায়াবী চোখ দুটো গেঁথে গেছে। আর ওদের জড়াজড়ি করে বসার ভঙ্গীটাও। 
    একটু পরেই স্টেশন চত্বরের লাগোয়া বাজারের আলোর ঝলক দেখা গেল। নাগরিক ব্যস্ততার কোলাহল আর ঐ বৈদ্যুতিক আলো যেন ঢেঊ এর মত অন্ধকারের দিকে ভেসে আসছে। আলো, ভিড়, দোকান, আর ট্রেনের  ঘোষণার মধ্যে একটু আগের ঘটনাতে তিয়াষ যে ভয় পেয়েছিল, এখন সেটা একেবারেই ছেলেমানুষি  বলে মনে হচ্ছে ওর।
    ভাড়া মিটিয়ে ট্রেন ধরতে দৌড়ল সে।
     
    মাস দুয়েক খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটল। 
    দিল্লিতে বড় কনফারেন্স ছিল। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের মেয়েদের হাতে তৈরি শিল্পসামগ্রী নিয়ে সরকারি উদ্যোগে বড় প্রদর্শনী হবে।
    তিয়াষদের অফিস থেকেও যেসব জায়গার মেয়েরা শিল্পকর্ম নিপুণ তাদের নিয়ে যেতে হবে। এসব কাজে উটকো জ্বালা অনেক। বাড়ির লোকজনের মত করিয়ে, জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে তবে যাওয়া।
    তবু চেষ্টা করে তিয়াষরা।
    মেয়েগুলোও করে বৈকি। কেউ কেউ পারে না। কেউ কেউ পারে, গুছিয়ে নেয় নিজেদের বানানো পাটের সৌখিন ব্যাগ, তুলো তুলো নরম পুতুল, পেনটিং, কাঠবাঁশের হাতের কাজ। আকাশ ছুঁতে না পারুক, নিজেদের গণ্ডিটা অন্তত পেরোতে চায়।
    কত রকমের মানুষ, কত রকমের জানার বিষয় সেখানে। মেয়েগুলোও ভারি খুশি হল। ওদের কোটাবাটা, রান্নাবান্নার বাইরে একটা সম্ভাবনার আলো আলো জগত। সেই আলো মেয়েরা প্রাণভরে গায়ে মেখে নিচ্ছে।
     
    এইসবের মধ্যে সিতাবপুরের কথা একবারেই মাথায় ছিলনা তিয়াষের। ফিরে আসার পর একদিন ফোন এল ওখান থেকে। 
    পরের ধাপের ট্রেনিং, আগের হিসেবের তাগাদা এসব তো ছিলই, তারসঙ্গে কয়েকজন মেয়ে সেই কভার বানানোর কাজটা ভালোই করছে। ওরাই কথা বলতে চায় ওর সঙ্গে।    
    সেদিন আবার সিতাবপুর যেতে গিয়ে আরেক সমস্যা। ড্রাইভার জিতুদার মেয়েকে বিকেলের দিকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সে লাঞ্চের পর আর ডিউটি করবে না।
    কিন্তু এই মুহূর্তে সিতাবপুর যাওয়াটা ক্যান্সেল করাও যায়না, মেয়েরা সবাই ওর জন্যই এসে অপেক্ষা করবে। এখন আর ট্রেন বা বাস পাল্টে যাওয়ারও সময় নেই।
    যাই হোক শেষ পর্যন্ত ঠিক হল জিতুদা তিয়াষকে সিতাবপুরে নামিয়ে দিয়ে চলে আসবে, আর ও ফেরার সময় ট্রেন ধরে নেবে। 
    ট্রেনে ফেরার কথায় তিয়াষের স্মৃতিতে আবার জেগে উঠল আগেরদিন সিতাবপুর থেকে ফেরার সময়ের সেই খোলা মাঠ, জড়াজড়ি করা শিশুদুটি আর ধানখেতে দৌড়ে নেমে যাওয়া একটি  ধূসর অবয়ব। 
    সিতাবপুরের পঞ্চায়েত থেকে আগের দিন যে মন খারাপ নিয়ে ফিরেছিল তিয়াষ, আজ তার অনেকটাই কেটে গেল। মেয়েদের মধ্যে অনেকেই বেশ ভালো করে শিখেছে কাজটা। অসীম ঘোষাল ওদের মধ্যে কয়েক জনকে নিজের ব্যবসাতে কাজও দিয়েছে। 
    কিন্তু ওরা ভাবছে নিজেরাই তৈরি করবে নানাধরণের কভার, তারপর আশেপাশের বাজার গুলোতে বিক্রি করবে। অসীম ঘোষালের কাছ থেকে নামে মাত্র মজুরি ছাড়া তো আর কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। 
    তিয়াস খুশি হয়। ওর কিছু লোকজন চেনা আছে, যারা এইসব মারকেটিং এ সাহায্য করতে পারে। 
    আজ গ্রাম প্রধানের সঙ্গেও দেখা হয়ে গেল।
    দু একটা কাজের কথা বলতে বলতেই বেলা গড়িয়ে গেল।
     
    এদেরও ছুটির সময় হয়ে গেছে। বেরনোর মুখে দেখা হয়ে গেল মিতালীর সঙ্গে। তিয়াষের সঙ্গে গাড়ি নেই শুনে মিতালী বলল, “ চলুন দিদি, আজ আমিই আপনাকে ষ্টেশনে ছেড়ে দিয়ে আসি।” 
    ভারি মিষ্টি মেয়ে মিতালী। তিয়াষ যদিও কাজের জায়গায় কোন সুবিধা নিতে চায় না। 
    তবু শেষ পর্যন্ত মিতালীর স্কুটিতে চড়তেই হল। 
     
    সেই একই রাস্তা। আজ আরও একটু রাত হয়েছে। একফালি বাঁকাচাঁদ দেখা যাচ্ছে।  
    এখন বোধহয় চাষের সময়। মাঠের মাঝে মাঝে এখন সবজে ফসলের গালচে পাতা রয়েছে।
    মিতালীর স্কুটিতে বেশ স্পিড।
    আগের দিনের সেই মহিলার কথা তিয়াষ বলতে যাবে সেই সময়েই খানিক দূরে হঠাৎ রাস্তার পাশে সেই বাচ্চা দুটোকে দেখতে পেল। 
    এই আধো অন্ধকারে, বেশ খানিকটা দূরে তবু ওদের চিনতে পেরেছে সে। সেই ছোটবড় দুজনে। সেই ঘাড় হেলানো ভঙ্গীতে ছোটটা বড়কে জড়িয়ে রয়েছে। 
    এই অন্ধকারে সুনসান মাঠের মধ্যে কোথায় চলেছে ওরা?
    মিতালীকে বলার আগেই ওরা রাস্তায় উঠে পড়েছে। 
    কিন্তু মিতালী এতটুকু স্পিড কমাচ্ছে নাতো!
    ও কি দেখতে পাচ্ছে না ওদের ?
    বাচ্চা দুটো একেবারে স্কুটির সামনে এসে পড়েছে। 
    মুখে শব্দ করে বোঝানোর আগেই, মস্তিষ্কের তাড়নায় মিতালীর হাত টিপে ধরেছে তিয়াষ। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে ও। 
    একটা এক্সিডেন্ট হয়েই গেছিল প্রায়! 
    তবে মিতালী দক্ষ হাতে দ্রুত ব্রেক কষায় স্কুটিটা রাস্তার কোনাকুনি গিয়ে থেমে গেল।
    ওদের গাড়ির হেডলাইটের চড়া আলো গিয়ে পড়েছে পাশের ধান ক্ষেতে। সেই অন্ধকারে একটি মানুষ অর্ধেক শরীর জলেকাদায় ডুবে বসে রয়েছে। 
    হেড লাইটের তীব্র আলো না থাকলে মানুষটিকে একটি কাদার ঢিপি বলেই মনে হত নিশ্চয়। 
    গাড়ির আলো এসে পড়তেই সে তিয়াষদের দিকে দেখেই উঠে দৌড়ে চলে গেল রাস্তা থেকে আরও দূরে ক্ষেতের দিকে, অন্ধকারে। 
    তবে  মূর্তিটি চোখ তুলে তাকিয়েছিল যখন, তিয়াষ দেখেছে সেই মণিটি একেবারে বোবা। কোন ভাষা নেই সেখানে। কিন্তু কাদামাখা মুখের ভাঁজে ভাঁজে যেন কিসের আর্তি, দুঃখের বলিরেখা।         
    আগের দিনের সেই পাগল মহিলা। আজ তিয়াষ একেবারে সামনে থেকে দেখেছে।
    এই ক্ষণিকের চমকের জন্য প্রস্তুত ছিল না তিয়াষ। মুহূর্তের বিস্ময় সরিয়ে রেখে বাচ্ছাদুটোকে দেখতে গিয়ে দেখে, ওরা দুজনে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। সামনে, পিছনে, ডানে, বামে কোথাও নেই। তিয়াষ একটু চমকে যায়। 
    তবে কি ভুল দেখল ও? এতটা ভুল? এমনকি ঐ দুইভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরা পর্যন্ত?    
     
    স্কুটিটাকে স্ট্যান্ড করে এতক্ষণে তিয়াষের দিকে ফিরেছে মিতালী। 
    মিতালী বললে, “আপনি অন্ধকারে ওকে দেখতে পেয়েছিলেন নাকি তিয়াষদি? ভয় পাবেন না। ও কারো ক্ষতি করে না। মাথায় একটু গোলমাল আছে। ও মাঠেঘাটে বাচ্ছাদের খুঁজে বেড়ায়।” 
    তিয়াস একটু সামলে উঠেছে, বলল “তবে তো শিগগির পুলিশে যাওয়া উচিত, বাচ্ছাগুলোকে ঐ পাগলে ধরলে কি হবে ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।” 
    মিতালী যেন  একটু মলিন হাসল, “পুলিশ পাগলের কি করবে তিয়াসদি? আর বাচ্ছাই বা এখন কোথায়?”
    তিয়াস এবার অবাক হয়ে তাকায় মিতালীর দিকে বলে, “বাচ্ছা দুটো তো………
    পাশ দিয়ে একটা টেম্পো হর্ন বাজিয়ে চলে যায়। জায়গাটা মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে যায়। খুব অন্ধকার অবশ্য নয়। আকাশে চাঁদ উঠেছে।  
     মিতালী হয়তো ঠিক শুনতে পায়নি তিয়াষের কথা। 
    সে বলতে থাকে, “জানেন দিদি, ওরা প্রতিবছরই আসে। ছোট ছোট দলে। কোন দল আসে দক্ষিণের জলজঙ্গলের এলাকা থেকে। আবার কোন দল আসে পশ্চিমের রুখু মাটি থেকে। যেখানে আগুনে রোদে মাটি বেবাক ফুটিফাটা হয়ে থাকে বছরের বেশিরভাগ সময়। সেখানে জল নেই, কাজ নেই, ভাতও নেই। ওরা তখন বাপমায়ে ছেলেমেয়ে কোলে কাঁখে নিয়ে এই সিতাবপুরের মত জায়গায় কামলা খাটতে আসে।
    এইসব হরিপুর, নবাবগঞ্জ, সিতাবপুরে। এদিকের মাটি উর্বর, দোফসলি। ধান, চালের মাটি। সারা বছর ধরে এখানে ক্ষেতে, খামারে খাটিয়ে লোকের  দরকার।
     ওরা আসলে  দল বেঁধে থাকে ঐ বটতলার ধারে। তাঁবু খাটিয়ে হইহই করে। 
    ঐ পাগলীটাও একসময় এসেছিল এরকমই কোন একটা দলের সঙ্গে। তখন অবশ্য ও  পাগল ছিলনা।
    মানুষের পোষা গরু ছাগল ছাড়াও এই মাঠ আর জলার ধারে দু একটা অন্য জন্তুও যেমন শেয়াল, হায়েনা এসবও  ঘোরাফেরা করে। বছর কুড়ি আগে আরও জঙ্গল ছিল এদিকে। সুযোগের অপেক্ষায় থাকে ওরা। কখনো যদি এদের ফেলে দেওয়া খাবারের উচ্ছিষ্ট মেলে। খুব একটা বেশি জোটেও না অবশ্য। এদের হাঅন্ন পেটে সব ঢুকে যায়। 
    শুধু তাঁবুর আশেপাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায় গরম ভাতের সুঘ্রান, মাছের কাঁটাচচ্চড়ির আঁশটে গন্ধ। 
    তবে কোন একদিন হয়তো সুযোগ এসে গেছিল। 
    ছয় বছরের বড় ছেলেটার সঙ্গে আড়াই বছরের ছোটটাও তাঁবুতে ঘুমিয়ে ছিল। মা বাপে গেছিল জমিতে খাটতে। হায়েনা বা শিয়ালে কখন ছোটটার ঘাড় মুটকে টেনে নিয়ে গেছিল কে জানে? বড়টাও কি দৌড়ে গেছিল ভাইকে বাঁচাতে?
    তবে জঙ্গলের কাছে মাঠে যখন পাওয়া গেছিল, ছোটটা বেঁচে ছিল না। মুখ, ঘাড় থেকে মাংস খুবলে নিয়েছিল দাঁতালের দল। বড়টা লড়েছিল বোধহয়। কামড়ও খেয়েছিল অনেক। তখনও নাকি বেঁচেছিল কিন্তু ছোট্ট শরীরটা চিকিৎসার ধকল নিতে পারেনি। তিনদিনের মাথায় সেও মারা যায়।
     সেই থেকে ওদের মা আর দলের সঙ্গে ফিরে যায় নি। রয়ে গেছে এখানেই, তাও বছর কুড়ি হল। সারাদিন এই বটতলার চারিপাশে ঘোরে। এর বাড়ি, ওর বাড়ি থেকে কেউ খাবার দিলে খায়। রাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে একটা ঘরে শুয়ে থাকে। আবার কখনো থাকে না, রাতভর ঘুরে বেড়ায়।
    অপঘাতে মৃত্যু বলে ছেলে দুটোকে এই মাঠের আশেপাশেই কোথাও পুঁতে দিয়েছিল। সেই থেকে এই মাঠটার নামই হয়ে গেছে ছেলেপোঁতার মাঠ।’’
    একটু থেমে মিতালী বলে, “তবে আগে নাকি অনেককে বলতো ও এখানে ছেলে দুটো কে দেখতে পায়, এখন তো অনেক দিন কথাও বলেনা আর।’’
    মিতালী স্কুটিতে স্টার্ট দেয়। 
    তিয়াষ নির্বাক। ও উঠে বসে। 
    ওদের সামনে হেডলাইটের চড়া আলো। 
    তিয়াষ মুখ ঘুরিয়ে দেখে, পিছনে অন্ধকার। গাঢ় অন্ধকার।

     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ৩০ জানুয়ারি ২০২৩ | ৭০৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2601:14a:500:e780:89aa:3a3d:229f:f1c2 | ৩০ জানুয়ারি ২০২৩ ২১:০৪516118
  • ভীষণ ভয়ের গল্প! নানা লেয়ারে ভয়।
  • :|: | 174.251.160.9 | ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ ০৪:৩৮516126
  • ঠিক। ভালো পরিবেশনা।  ধন্যবাদ। 
  • &/ | 151.141.85.8 | ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ ০৪:৫৮516127
  • এই গল্প ভালো লাগল। আশ্চর্য মায়া জড়ানো গল্পটি।
  • Kishore Ghosal | ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ ২০:৪০516149
  • তেমন ভয়ের নয় মানে? বেশ ভয়ের গল্প। বড্ডো অসহায় মানুষগুলি। ভয়ের থেকেও সেটাই টের পাওয়া যায়...   
  • মোহাম্মদ কাজী মামুন | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:৫৫516183
  • বাপরে! হঠাৎ ঝাঁকুনি দেয় না মূর্ছিতও হতে হয় না কিন্তু একটা শিরশিরে অনুভূতি আগাগোড়া দখল করে রাখে বেরুতে দেয় না এই অনুভূতিগুলি হঠাৎ ঝাঁকুনির থেকেও মারাত্মক কাহিনী শেষ হয়ে গেলেও ধরে রাখে অনেকদিন একটু একটু করে ঝাঁকাবে সে অনেকটা সময় ধরে এমন পরিকল্পনা করেই সে জন্মেছে যেন। 
    "পাশ দিয়ে একটা টেম্পো হর্ন বাজিয়ে চলে যায়। জায়গাটা মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে যায়।"

    এভাবে আলো-আঁধারে পাঠককেও ঘুরিয়ে এনেছে। 
    "তিয়াষ দেখতে পেল দূরে ফাঁকা ক্ষেতের মধ্যে সেই পাগলী ওদের উল্টোদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।   মাথা নেড়ে নেড়ে কাকে যেন ডাকছে।"
    ঐ যে অব্যাখ্যাত অনুভূতিটার কথা বলছিলাম! পাঠক স্পষ্ট দেখতে পেল তাকেও কে যেন ডাকছে! এখানেই লেখিকার মুন্সিয়ানা শব্দের যাদুতে একটি ধানক্ষেতের ডাক ল্যাপটপের পর্দায় তুলে আনা। 
    "আকাশ ছুঁতে না পারুক, নিজেদের গণ্ডিটা অন্তত পেরোতে চায়।"

    বাহ। 
    "মাঠের মাঝে মাঝে এখন সবজে ফসলের গালচে পাতা রয়েছে।"

    গালচে- বাহ। 
  • Ranjan Roy | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৭:০৯516185
  • বেশ ভালো লেখা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন