এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  বইপত্তর

  • সুবিমল বসাক, অন্যরকমের গদ্যকার 

    Malay Roychoudhury লেখকের গ্রাহক হোন
    বইপত্তর | ০৭ নভেম্বর ২০২২ | ২৯২ বার পঠিত
  • 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 | 32 | 33 | 34 | 35 | 36 | 37 | 38 | 39 | 40 | 41 | 42 | 43 | 44 | 45 | 46 | 47 | 48 | 49 | 50 | 51 | 52 | 53 | 54 | 55 | 56 | 58 | 59 | 60 | 61 | 62 | 63 | 64 | 65 | 66 | 67 | 68 | 69 | 70 | 71 | 72 | 73 | 74 | 75 | 76 | 77 | 78 | 79 | 80 | 81 | 82 | 83 | 84 | 85 | 86 | 87 | 88 | 89 | 90 | 91 | 92 | 93
    সুবিমল বসাক, অন্যরকমের গদ্যকার : মলয় রায়চৌধুরী



    এক

    সুবিমল বসাকের ডাইরি নিয়ে লেখাটা কীভাবে শুরু করি ভাবছিলুম, তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠলো কফিহাউসের সামনে একদল কবি-লেখক সুবিমলকে প্যাঁদাবে বলে ঘিরে ধরেছে। আর দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা সুবিমলের এই চিঠিটা পেয়ে গেলুম নেটে :

    ১৩ বিপিন গাঙ্গুলি রোড
    দমদম, কলকাতা ৭০০ ০৩০
    ২৭/৭/১৯৬৪

    প্রিয় সমীরদা

    আমি পাটনায় গিয়েছিলুম, শুনলুম আপনি চাইবাসায়। মলয়কে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা বলেছি। শক্তি একদিন ( যেদিন যুগান্তরে নিউজ বেরিয়েছিল ) আমায় কফিহাউস থেকে নীচে ডেকে মারধোর করার চেষ্টা করেছিলো। আপনি জানেন, আমি পাটনার ছেলে, মুখে কথা বলার চেয়ে কাজে বেশী--- সেদিনই আমি শক্তিকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দিতুম, কিন্তু আমার বন্ধুদের জন্য করলাম না। তবে আমি ডায়েরি করেছি থানায়, এই বলে রটিয়েছি, এবং ভবিষ্যতে শক্তির নামে কেস ঠুকে দেবো বলেছি। 'হাংরি জেনারেশান' বুলেটিনটা এখনও বের হল না। প্রেসগুলি ছেপে দেবে বলে কথা দিচ্ছে অথচ ম্যাটার দেখে সরে যাচ্ছে। এখানে অবশ্য নানা রকম রিউমার শোনা যাচ্ছে। অনেক কথা। আজ স্টেনসিলে একটা 'হাংরি বুলেটিন' বের করে দিলাম-- ডিসট্রিবিউট করিনি। ওটা পাটনা থেকে ছেপেছি, বলেছি। কলকাতায় কবে আসছেন ? মলয় সম্ভবত অগাস্টে আসবে বলে কথা দিয়েছে। দেখা যাক। এখন এলে পরে সবার সঙ্গে দেখা করার চান্স আছে। মলয়কে 'হাংরি' বুলেটিন পাঠিয়েছি।

    সুবিমল


    আরেকটা চিঠি কবিরুল ইসলামের, সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ পড়ার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন:

    কবিরুল ইসলাম
    লেকচারার ইন ইংলিশ, সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ, পো: সিউড়ি, জেলা বীরভূম
    ৭.১২.১৯৬৫

    সবিনয় নিবেদন,

    আপনার কার্ড যথাসময়ে পেয়েছি। চিঠির জন্য ধন্যবাদ খুব।
    শ্রী সুবিমল বসাক বিরচিত ‘ছাতামাথা’ পেয়েছি। জেব্রা এখনও আমার হস্তগত হয়নি। আমার জনৈক বন্ধু কোলকাতায় তাঁর বাসায় ভুলক্রমে ফেলে এসেছেন। বড়দিনের ছুটিতে তিনি এনে দেবেন। ভর্তি শীতে।
    ছাতামাথা গ্রন্হটি আমার পক্ষে রিভ্যু করা অসাধ্য কাজ কেননা যে বিশেষ আঞ্চলিক ভাষায় গ্রন্হটির কথা-শরীর রচিত তার সূক্ষ্মতা, ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য আমার কাছে একার্থে দুর্গম। দেখেছি, আঞ্চলিক ভাষা মাত্রেই কাব্যধর্মী এবং একমাত্র কবিতা--- লিভিং পোয়েট্রি। পুরুষানুক্রমে পশ্চিমবাংলার বীরভূমে আমাদের বসবাস। কাজেই এই বাঙাল ভাষায় আমার প্রবেশ নিষেধ প্রায়। সেক্ষেত্রে এই গ্রন্হটির মূল্যায়ন ? আমার আয়ত্তের বাইরে। তবে ছাতামাথা আমি আদ্যন্ত রুদ্ধশ্বাসে পড়েছি, বুঝেছি, অগ্নিমুখ আন্তরিকতা শিল্পীর এই প্রাথমিক শর্তে  গ্রন্হটি চিহ্ণিত। এই শর্তে তিনি নক্ষত্রভেদে সমর্থ। একটি অনুচ্চারিত-পূর্ব স্বগতোক্তি। কবিতার সংগোত্র।
    আপনাদের গ্রন্হাদি এখানে আমার বন্ধুদের ভালো লেগেছে। জেব্রা'র পরবর্তী সংকলন আমাকে অবশ্যই পাঠাবেন। প্রথম সংকলনের দাম পাঠিয়ে দেব। পড়লে আমার প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবো।
    সিউড়ি আসার জন্য আপনাকে, সুবিমলবাবুকে নিমন্ত্রণ জানাই।
    আশাকরি কুশলে আছেন। চিঠি দেবেন।

    বিনীত--
    কবিরুল ইসলাম

    ‘ছাতামাথা' ছাড়াও, সুবিমল বসাক আরও গল্প-উপন্যাস, কবিতা আর অনুবাদ প্রকাশ করেছে। সম্পাদনা করেছে  হাংরি আন্দোলনের অন্যতম মুখপত্র  'প্রতিদ্বন্দ্বী' পত্রিকা। এই পত্রিকার প্রচ্ছদ সুবিমলই আঁকতো বা কাগজের কাট-আপ তৈরি করতো। সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। হাংরি আন্দোলনের ঐতিহাসিক দলিল এই পত্রিকা। গুরুত্বপূর্ন ইতিহাস বলা যেতে পারে। সুবিমল বসাক ক্ষেত্রসমীক্ষা করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের ঢাকাই বিয়ার গীত এবং বাঙালির কুসংস্কার সংগ্রহ করে গ্রন্হাকারে প্রকাশ করেছিল। বিদেশের পত্র-পত্রিকাতে সুবিমল বসাকের রচনা প্রকাশিত হয়েছিল ষাটের দশকে, যেমন ১৯৬৩ এবং ১৯৬৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত ‘সিটিলাইট জার্নাল’  ১, ২, আর ৩ সংখ্যায়, যেগুলো সম্পাদনা করেছিলেন  লরেন্স ফেরলিংহেট্টি।  লিটা হর্নিক দ্বারা সম্পাদিত ‘কুলচুর’ পত্রিকাসহ আমেরিকার বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যাগুলোতে। জার্মানির কার্ল ওয়েইসনার  সম্পাদিত ‘ক্ল্যাক্টোভেডসেডস্টিন’ পত্রিকায়। স্প্যানিশ পত্রিকা ‘এল কর্নো এমপ্লুমাদোতে’, যেটিস সম্পাদনা করেছিলেন মার্গারেট র‌্যাণ্ডাল। ডিক বাকেন হাংরিদের রচনা নিয়ে ‘সল্টেড ফেদার্স’এর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন যাতে সবিমল বসাকের জীবনী ছিল। অ্যালান ডি লোচ সম্পাদিত ‘ইনট্রেপিড’ পত্রিকায় ছিল সুবিমলের গদ্যানুবাদ। ‘ক্ষুধার্ত’ গোষ্ঠীর শৈলেশ্বর ঘোষ, যিনি  আমাকে  ‘সিংহচর্মাবৃত গাধা’ খেতাব দিয়েছেন ওনার ক্ষুধার্ত সংকলনের সম্পাদকীয়তে, তাঁর লেখাপত্র এই পত্রিকাগুলোতে আমিই প্রকাশের ব্যবস্হা করেছিলুম। খেতাবটা বোধহয় এই জন্য যে আমি ‘অ্যালেন গিন্সবার্গের ক্যাডিশ’-এর অনুবাদ বইটা ওনাকে আর ওনার স্ত্রীকে উৎসর্গ করেছিলুম।



    দুই

    সুবিমল বসাক ডাইরি লেখে জানতুম, ওকে প্রশ্ন করলে সুবিমল বলত ওর ছোটো ছেলে ওর লেখালিখিতে আগ্রহ দেখায় আর ওর আশা যে ও সুবিমল যাবার পর  ছোটো ছেলে চিলেকোঠায় যত্ন করে রাখা হাংরি আন্দোলনের আরকাইভটা কাজে লাগাবে। জীবনের ঘটনাবলী আগাম আঁচ করা বেশ কঠিন। ওর ছোটো ছেলে যৌবনে পৌঁছোবার পর, বিয়ের পরে, নানা সমস্যায় আক্রান্ত হবার দরুন আগ্রহ হারিয়ে ফেলল, এমনকী তার জীবনের ঘটনায় সুবিমলেরও  স্বাস্হ্য খারাপ হয়ে গেল। আগেই বড়ো ছেলের আর্থিক অনটন সম্পর্কে চিন্তিত থাকতো। এরই মধ্যে, বৃষ্টির কারণে, চিলেকোঠার ঘরে জল ঢুকে একদিন সব এমন সপসপে ছাতাপড়া হয়ে গেল যে হাংরি আরকাইভের বেশির ভাগ পত্রিকা, বই, লিফলেট, পোস্টার নষ্ট হয়ে গেল। সুবিমলের আরকাইভে সুবিমলের আঁকা বহু লিফলেট ছিল, যেগুলো সাইক্লোস্টাইল করে প্রকাশ করা হতো আর  এইগুলোই কফিহাউসে কাউন্টার কালচারাল কন্ঠস্বরের রূপ নিতো। সেগুলো আর পাওয়া যাবে না। আমেরিকার ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মারিনা রেজা নামে এক গবেষক এসেছিলেন, তাঁকে বলেছিলুম সুবিমল বসাকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ; সুবিমল তাঁকে প্রচুর তথ্য আর কাগজপত্র দিতে পেরেছিল। কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত যতো সংবাদ প্রকাশিত হতো তার একটা বেশ মোটা ফাইল ছিল সুবিমল বসাকের আরকাইভে ; সেই ফাইলটা সুভাষ ঘোষ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি ; সুবিমল সেসময়ে সুভাষকে থাকতে দিয়েছিল ওর ভাড়া বাড়িতে। ফাইলটা সম্ভবত শেষ পর্যন্ত শৈলেশ্বর ঘোষের চেলাদের হাতে পৌঁছোয়, কেননা চেলাদের পত্রিকায় বাছাই করে কিছু-কিছু অংশ প্রকাশিত হয়েছে।



    ড্যানিয়েলা ক্যাপেলো, যিনি ডক্টরেট করার জন্য হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস জমা দিয়েছেন, তিনি জানিয়েছেন যে ইউরোপ-আমেরিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে হাংরি আন্দোলনকারীদের ফোটো, লিফলেট, পুস্তিকা, বই দেখেছেন, সংরক্ষণ করা হয়েছে। এদেশে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে যাঁরা গবেষণা করতে আগহী, তাঁদের আমি সুবিমল বসাক আর সন্দীপ দত্তর সঙ্গে দেখা করতে বলতুম। এখন তন্ময় ভট্টাচার্য সুবিমল সম্পর্কে বিশদ জানার পর, গবেষকরা তন্ময়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। সুবিমল বসাকের ডাইরিতে ও কী লিখেছে তা আমি জানি না, কখনও আগ্রহ হয়নি। বই বেরোলে জানতে পারব। তবে সেই সময়টা ছিল আমাদের উথালপাথাল যৌবনের বেপরোয়া কাজ-কারবারে ঠাশা।

    আমি নিজে ডাইরি লেখার চেষ্টা করেছিলুম ; ছেড়ে দিতে হলো কেননা জীবনের সব কথা লিখে ফেলা বেশ কঠিন, লিখব কিনা তাও ভাবতে হয়। আমার ছোটোলোকের ছোটোবেলা, যুববেলা আর শেষবেলা পড়ে বহু আত্মীয়-জ্ঞাতি গালমন্দ করেছেন।  জীবনানন্দ তাঁর জীবনের গোপন ঘটনাগুলো সংকেতে লিখে গেছেন, স্বমেহন-করা, স্ত্রীর অরগ্যাজম, জাঠতুতো বোনের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক, শিশুর কান্নায় বিরক্তি, যৌনকর্মীদের পাড়ার পথে ঘোরা ইত্যাদি। সংকেতে লেখার জন্যও তো প্রতিভা চাই। হাংরি আন্দোলনের আর কেউ ডাইরি লিখতো কিনা জানি না। শৈলেশ্বর ঘোষকে লেখা বাসুদেব দাশগুপ্তের চিঠি থেকে জানা যায় ওরা সোনাগাছির তিনজন যৌনকর্মী বেবি, মীরা আর দীপ্তির সঙ্গে দুপুরবেলায় যৌনসম্পর্ক করতে যেতো ; দুপুরবেলায় রেট কম থাকে। বেবি আর মীরার সঙ্গে আমিই ওদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলুম, যখন ডেভিড গারসিয়া কলকাতায় এসেছিল আর বাঙালি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চাইছিল। বেবি ছিল ছিপছিপে শ্যামা আর মীরা ছিল বেশ ফর্সা আর মোটা। দীপ্তিকে আমি দেখিনি, তবে মেয়েটি সম্ভবত দীপ্তের পাশের ঘরে থাকতো, যার সঙ্গে প্রদীপ চৌধুরী দুপুর বেলায় ফিসফিস করে কথা বলছিল। বেবিকে কোনো বাড়িউলি কিনে তার আস্তানায় নিয়ে গেলে বাসুদেব নিজের দুঃখের কথাও লিখেছিল শৈলেশ্বর ঘোষকে। বেশ বয়স পর্যন্ত বাসুদেব আকৃষ্ট ছিল এই মেয়েগুলোর প্রতি, কেননা একবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ওর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হওয়ায় আমার কাছ থেকে এক হাজার টাকা চেয়েছিল ভায়াগ্রা কেনার জন্য। ডাইরি লিখে থাকলে বাসুদেব আর শৈলেশ্বর এইসব ঘটনা লিখেছে কি না জানি না।

    যাই হোক, ওর ডাইরিই এখন আমাদের জীবনযাপন আর সাহিত্য-সংবাদের যেটুকু সম্ভব সংরক্ষণ করতে পেরেছে। ডাইরি সুবিমল বহুকাল যাবত লিখছে, সম্পূর্ণ প্রকাশিত হলে অনেককিছু জানা যেতো। তা তো সম্ভব নয়। আমাদের বইগুলোই তো এখন বুড়ো বয়সে কোনো কোনো প্রকাশক ছাপছেন। সুবিমলের ডাইরির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫, হাংরি আন্দোলনের সময়কার, তরুণ কবি ও গবেষক তন্ময় ভট্টাচার্য সম্পাদনা করে প্রকাশ করার তোড়জোড় করেছেন। সুবিমল বসাকের আরকাইভের কিছুটা অন্তত সংরক্ষণ করতে পারবেন। সুবিমলের বইগুলোও বহুকাল পরে তন্ময়ের উদ্যোগে আবার প্রকাশিত হয়েছে।

    এই প্রসঙ্গে ড্যানিয়েলা ক্যাপেলোর কথাগুলো উল্লেখ্য, কেননা তিনি হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণার জন্য কলকাতায় এসে বিদ্যায়তনিক ভদ্রলোকেদের এবং নামকরা কবি-লেখকদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁর ইংরেজিতে লেখা একটা ছোটো গদ্য বাংলায় অনুবাদ করে শুভঙ্কর দাশ প্রকাশ করেছেন ওনার ‘গ্রাফিত্তি’ পত্রিকার মে ২০২২ সংখ্যায়। ড্যানিয়েলের অভিজ্ঞতা বেশ মজার। ওনার লেখা থেকেই তুলে দিচ্ছি, যাতে টের পাওয়া যায় যে এখনও, ষাট বছর পরে, হাংরি আন্দোলনের কথা শুনলে নাক সেঁটকাবার অভ্যাস মধ্যবিত্ত বাঙালিবাবুদের  বজায় আছে। ড্যানিয়েলা অবশ্য গান্ধিনগর আইআইটির তরুণ অধ্যাপক অর্ক চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হাংরি আন্দোলন নিয়ে একটা সেমিনার করেছিলেন সেখানকার ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে আন্দোলনটা সম্পর্কে বিশদ জানতে পারে। খড়গপুর আইআইটির অধ্যাপক সোমনাথ রায় আমার বই বের করার জন্য গুরুচণ্ডালী প্রকাশককে আর্থিক সাহায্য করেছেন। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিষ্ণুচন্দ্র দে এবং উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উদয়শংকর বর্মা হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচডি করেছেন। সুবিমল বসাকের বইগুলো আবার প্রকাশ করেছেন সৃষ্টিসুখ প্রকাশনীর রোহন কুদ্দুস। আমি বলতে চাইছি যে তন্ময় ভট্টাচার্যদের নতুন প্রজন্ম হাংরি আন্দোলনের একটা স্পষ্ট ছবি পাঠকদের সামনে তুলে ধরছেন। সুবিমল সম্পর্কে তরুণ কবি-লেখক জুবিন ঘোষ, মিলন চট্টোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ দত্ত, সেলিম মণ্ডল, সুমন সাধু, রূপময় ভট্টাচার্য প্রমুখও নিজেদের মতামত লিখেছেন।

    মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরী ‘দি হাংরিয়ালিস্টস’ নামে একটা বই লিখেছেন ; তবে কলকাতার যেসব বাবুরা কটুক্তি করেছিলেন, উনি তাঁদের বক্তব্য বাদ দিয়ে দিয়েছেন। ইংরেজি ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষের স্ত্রী ডেবোরা বেকার বিট আন্দোলনের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ভারতবাস  নিয়ে ‘দি ব্লু হ্যাণ্ড’ নামে যে বই লিখেছেন, তাতে অযথা হাংরি আন্দোলনকে টেনে এনেছেন, যদিও কোনো হাংরি আন্দোলনকারীর সঙ্গে দেখা করেননি। ডেবোরা বেকার যদি সুবিমল বসাকের আরকাইভ ব্যবহার করতেন তাহলে সঠিক তথ্য পেতেন। উনি হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে তথ্যের জন্য যোগাযোগ করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ; উপন্যাস লেখার কারণে সুনীলের হাতে সময় ছিল না, সুনীল ডেবোরা বেকারকে পাঠিয়ে দিলেন তারাপদ রায়ের কাছে। তারাপদ রায়ের মেসোমশায় ছিলেন লালবাজারে ডেপুটি কমিশনার দেবী রায়, যিনি আমাদের মামলাটা তদারক করেছিলেন, আর পরবর্তীকালে ওনার নকশাল দমন এখন কিংবদন্তি। ডেবোরা বেকারের বইটির প্রকাশক কিন্তু এরকম দামামা বাজিয়ে চলেছে : 

    Drawing from extensive research in India, undiscovered letters, journals, and memoirs, acclaimed biographer Deborah Baker has woven a many layered literary mystery out of Ginsberg's odyssey. A Blue Hand follows him and his companions as they travel from the ashrams of the Himalayan foothills to Delhi opium dens and the burning pyres of Benares. They encounter an India of charlatans and saints, a country of spectacular beauty and spiritual promise and of devastating poverty and political unease.

    In Calcutta, Ginsberg discovers a circle of hungry young writers whose outrageousness and genius are uncannily reminiscent of his own past. Finally, Ginsberg searches for Hope Savage, the mysterious and beautiful girl whose path, before she disappeared, had crossed his own in Greenwich Village, San Francisco, and Paris.

    In their restless, comic and oftimes tortured search for meaning, the Beats looked to India for answers while India looked to the West. A Blue Hand is the story of their search for God, for love, and for peace in the shadow of the atomic bomb. It is also a story of India — its gods and its poets, its politics and its place in the American imagination.



    শুভঙ্কর দাশের অনুবাদ করা ড্যানিয়েলার প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে দিচ্ছি। 

    “আমি যখন একটা অনুবাদের কাজ নিয়ে প্রথম কলকাতায় আসি ( আমার প্রথম ভারতে আসার অভিজ্ঞতা ) আমি এই শহরটা আর তার লোকজনদের প্রেমে পড়ে যাই, বাংলা শিখতে শুরু করি, নিজে নিজে চেষ্টা করে, কয়েকটা কোর্স আর আমার বাঙালি বন্ধুবান্ধবদের সাথে কথা বলতে বলতে। ওটাই ছিল আমার প্রাচ্যের সাথে পথ চলার সেই ম্যাজিকের শুরু। আর সে পথ মসৃণ ছিল না মোটেই। পরে আসবে হাংরিরা আর আমার মুখে মারবে এক ঘুষি, যাতে আমি টের পাই কলকাতার নিচুতলার নোংরা জীবনের স্বাদ। এটি ছিল ‘অদ্ভুত অন্য’-র দিকে তাকানোর একটি পুরোনো উপায়ের সমাপ্তি  : একটি খাঁটি, স্হানীয় ভারতবর্ষের স্বপ্ন শেষ হয়ে গিয়েছিল, যখন আমি সীমালঙ্ঘন, বহুভাষিকতা, অস্পষ্টতা এবং দ্বন্দ্বের জগতে আমার দৃষ্টি ফিরিয়েছিলাম, যখন তা ধরা পড়ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পতনের পর ভারতের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে।

    “হাংরি জেনারেশন আন্দোলন সম্পর্কে প্রথমে যা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল তা হলো দুটি ব্যাপার। প্রথমটি ছিল ১৯৬৪ সালে অশ্লীলতার জন্য তাদের শাস্তির প্রতি কৌতূহল। এই কবিরা সেই মহাকাব্যের মধ্যবিত্ত পাঠকের কাছে  কতটা উত্তেজক এবং মর্মান্তিক ছিল ? আমি কৌতূহলী ছিলাম যে তাদের কবিতাকে কতটা অশ্লীল বলে সংজ্ঞায়িত করা যায় এবং সেই অশ্লীলতা ঠিক কী?

    “দ্বিতীয়টি ছিল এই আন্দোলন সম্পর্কে ‘নীরবতা’, যা অ্যাকাডেমিয়ায়, সাহিত্যের ইতিহাসে এবং জনসাধারণের ভেতর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অশ্লীলতা এবং সেনসরশিপের বিষয়গুলো ২০১০ সালের পরে এবং বিশেষত বিজেপির উথ্থানের সাথে এবং জনসাধারণের ক্ষেত্রে হিন্দুত্বের মতাদর্শের প্রত্যাবর্তনের ফলে বেশ জোরালোভাবে উঠে আসছিল। আমার পছন্দের অনেক লোক যেমন ইতিবাচকভাবে বিস্মিত এবং এমনকী বিমোহিতও হয়েছিলেন, তবু তাঁদের কারোর কারোর প্রতিক্রিয়া অবশ্যই বিভ্রান্তিকর এবং কিছু পরিমাণে, বাঙালি মধ্যবিত্তের সীমালঙ্ঘনকারী এই লেখকদের কাছে আমার ‘রিটার্নিং ভয়েসেস’ বেছে নেওয়ার প্রতি শত্রুতারও কারণ ছিল। কেন একজন ইতালীয় তরুণী, রবি ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র পড়ার পরিবর্তে বা বাংলা ক্যাননের অন্য কোনও ( কম সমস্যাযুক্ত ) আইকন পড়ার পরিবর্তে অ-লিরিকাল  এই বন্য অশ্লীল লেখকদের সম্পর্কে জানতে চাইবেন, যারা তাদের কবিতায় যৌনতার কথা বলেছে ?   এখন আমি সম্পূর্ণরূপে তাদের বক্তব্য বুঝতে পারছি। আমি পরে বাংলা ভাষায় এই সাহিত্যিক প্রতি-সংস্কৃতির ( কাউন্টার কালচার ) অনেকগুলো আকর্ষণীয় – যদিও বিপরীত –দিকগুলো আবিষ্কার করেছি এবং কেন সেগুলো মূল ধারার সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য সমস্যাযুক্ত এবং বিতর্কিত হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল, তাও। তাদের অপবিত্রতা, বিদ্রুপ এবং বিদ্রুপমূলক উপহাসের কবিতাগুলো এই পুরুষদের আচরণের অন্যান্য শেডগুলোর সাথে সহাবস্হান করেছিল : যৌনতাহীন, অতি-পৌরুষ এবং নারীবিদ্বেষ।

    “হাংরিদের সাথে আমার সাক্ষাতের অনেক আগে, আমার গবেষণাটি ছিল স্হানীয় ভাষায় সাহিত্য অন্বেষণ এবং বিশ্বব্যাপী সাহিত্য পাঠের অনুবাদ এবং তা গ্রহণ সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো অনুসন্ধান করা। আমার স্নাতকোত্তর পাঠ শেষ হবার পর, আমি দক্ষিণ এশিয়ায় ‘ছোটো আরকাইভ’ এবং ‘সস্তা’ সাহিত্য  সামগ্রী নিয়ে কাজ করার কথা ভাবছিলাম। সেইসব ‘ক্ষণস্হায়ী’ উপাদান এবং ‘খণ্ডিত’ জ্ঞানের  ভাণ্ডারগুলো তালিকাবিহীন অবস্হায় বিশ্বের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আমি অবাক হয়েছিলাম এবং অবশ্যই দিশেহারা, যখন আমি হাংরি আন্দোলনকারীদের চিঠি, ইশতেহার, লিফলেট এবং ম্যাগাজিনগুলোর একটা বিশাল অংশ বিদেশের সেইসব লাইব্রেরিগুলোতে খুঁজে পেলাম। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছোট আরকাইভের মাধ্যমে যা ছড়িয়ে পড়েছে।

    “বিশৃঙ্খল এবং খণ্ডিত ছিল সেই ১৯৬০-এর দশকের ‘হাংরি আন্দোলনের’  জীবন্ত কিংবদন্তিদের সাথে আমার ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারগুলোও। আমার সাক্ষাৎকারগুলোর মতোই, যেগুলোর জন্য আমি একটি সাধারণ স্মার্টফোনে অনভিজ্ঞ রেকর্ডিঙগুলোকে ট্র্যাক রাখার চেষ্টা করেছি — পটভূমিতে কলকাতার রাস্তার আওয়াজসহ। আমি তো চাই আরও ভালো সরঞ্জাম, একটি সুসঙ্গঠিত পরিকল্পনা এবং স্মার্ট প্রশ্ন নিয়ে ফিরে আসতে। কিন্তু আমার উপকরণগুলো যতোই অগোছালো এবং অসংগঠিত হোক না কেন, আমার হোস্টরা সবসময় সাহায্য করেছেন এবং আমার জিজ্ঞাসার তৃষ্ণা মেটাতে সময় দিয়েছেন।

    “আমি বাঁশদ্রোণীতে সমীর এবং তাঁর স্ত্রী বেলা রায়চৌধুরীর সাথে মিষ্টি খাওয়া এবং আড্ডায় আমার দীর্ঘ রবিবারগুলো লালন করেছি। মুম্বাইতে মলয় এবং সলিলাদির সাথে দেখা, ফোটোশুট এবং গল্প করেছি। হাওড়ায় দেবী রায়, কলকাতায় প্রদীপ চৌধুরী, পার্ক স্ট্রিট কফিডেতে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে তিতি রায়ের সঙ্গে দেখা করেছি। কবি এবং বুকাওস্কি অনুবাদক শুভঙ্কর দাশ এবং কসবার বাড়িতে তার বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেছি। দিল্লিতে হাংরি আন্দোলনের চিত্রশিল্পী অনিল করঞ্জাইয়ের স্ত্রী জুলিয়েট রেনল্ডস এবং আরও অনেকের সাথে দেখা করে তথ্য সংগ্রহ করেছি।

    “আমি সেই ভার্চুয়াল কাব্যিক ‘অন্য জগতের’ স্পেসে প্রতিদিন ফালগুনী রায়ের সঙ্গে দেখা করতাম, তার বিদ্রুপের পাশাপাশি তার যন্ত্রণার সাথেও পরিচিত হতাম। সময়ের সাথে সাথে এই বিভিন্ন সম্পর্কের লালন আমাকে এবং আমার গবেষণার জন্য অনেক কিছু দিয়েছে। তাদের এবং তাদের অনুগামীদের সাথে দেখা করার ফলে একজন লেখক এবং হাংরিয়ালিস্টের অন্তরজগতে থাকা ‘ব্যক্তিটি’ সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট ধারণা দিয়েছে আমায় এবং  ব্যাপারগুলোকে সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে সাহায্য করেছে।

    “সম্ভবত তখন আমি জানতাম না কেন আমি বাংলা কবিতার এই ‘এনফ্যান্ট টেরিবলদের’ , এই হিংস্র এবং শিকারী পুরুষত্বের লেখকদের, বিশেষ করে একজন অবাঙালি নারী হিসেবে, অন্বেষণ করতে এতো দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু সঠিক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখার ফলে আমি বলতে পারি যে, সাহিত্যসমাজের কিছু মানুষের বিভ্রান্তি এবং শত্রুতার বৈশিষ্ট্য আমাকে এই আভাঁগার্দ আন্দোলনের  ব্যাপারে আরও কৌতূহলী করে তুলেছিল। এবং হাংরিদের লেখালিখি সেই লোকগুলোর মতে ছিল নোংরা, অনৈতিক, জঘন্য, বিকৃত, ঘৃণ্য— এবং তাই বাঙালি মধ্যবিত্ত এবং অতিবিদ্বান পাঠকরা হাংরি লেখকদের  ব্যক্তি হিসাবেও বিপজ্জনক মনে করতেন। তাদের যৌন অস্পষ্টতা এবং ভাষাগত ‘মাঝামাঝি অবস্হান’-এর প্রেক্ষিতে হাংরিদের প্রান্তিকতা  বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় ছিল নিন্দনীয়।

    “আমার অবস্হান ছিল এরকম – ইউরোপের একটি দক্ষিণ শহরের বাসিন্দা তরুণী, উত্তর-ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক পাঠিকা-শ্রোতা,  বয়স্ক বাঙালি কবিদের সাথে কথা বলছেন —- তাদের সাথে, যারা একসময় বিদ্রোহী দুষ্টু ছেলে ছিল, যারা লড়াইটা করেছিল। দৃষ্টিভঙ্গীর এই তফাত আমাকে আরও সমৃদ্ধ এবং কৌতূহলী করেছিল।

    “শেষ পর্যন্ত, বছরের পর বছর খোঁজ এবং সংগ্রহ, পড়া, অনুবাদ এবং প্রায়ই বুঝতে না পারা, কয়েকমাস পর একই কবিতায় ফিরে এসে, আবার অনুবাদ এবং পুনঃব্যাখ্যা করে, আমি আমার অনুসন্ধানের ইতিবাচক বৈধতা  বুঝতে পেরেছিলাম ; ‘বোধগম্যতা’ কোনও রৈখিক প্রসারণ নয়। উল্টোদিকে, ট্রিগারগুলোর মধ্যে একটা ছিল বুঝতে পারার অসম্ভাব্যতা, ‘অনুবাদের অগম্যতা’ , শব্দস্হাপন, এবং অনুভূতি যা সর্বদা নৃতাত্বিক অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে থাকে।”

    ড্যানিয়েলার উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় কেন সুবিমল বসাকের বইগুলো, বিশেষ করে ‘ছাতামাথা’ , যা প্রকাশিত হয়েছিল ষাট বছর আগে, অবহেলিত রয়ে গেছে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তাদের কাছে। এই বইয়ের ন্যারেটিভ নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সুবিমলকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো দেশভাগের উদ্বাস্তু নও, তাহলে এই ন্যারেটিভে লিখছো যে !’ সুনীল নিজেও দেশভাগের উদ্বাস্তু ছিলেন না, কিন্তু প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’-এ দেখিয়েছেন যে চার বছর বয়সে পূর্ববঙ্গ থেকে এপারে এসেছিলেন। সুনীলের বাড়িতে কাউকে পূর্ববঙ্গের কোনো অঞ্চলের বুলিতে কথা বলতে শুনিনি কখনও। এপারের লোকেদের মতনই খেলুম, গেলুম, বললুম, চললুম ইত্যাদি ব্যবহার করতেন।



    সুবিমলের বইটা, ফুটপাতে যে সমস্ত খবরের কাগজ ও পত্রিকা বিক্রি হয়, তাতে আলোচিত হয়নি, যদিও সেগুলোয় নিয়মিত পাল্প ফিকশান আলোচিত হয়। ‘ছাতামাথা’ বইটির গদ্য নকল করা হচ্ছে ঢাকা-চিটাগঙ-যশোর-বগুড়ার পত্রপত্রিকায় – কিন্তু তাঁরাও ‘ছাতামাথা’ বইটির মৌলিকত্বকে বিদ্যায়তনিক স্বীকৃতি দেননি এখনও। আমি মনে করি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্তত স্বীকৃতি দেয়া উচিত ছিল । কলকাতার কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন বিশেষ সুবিমল বসাক সংখ্যা প্রকাশ করেছে, এবং তার সম্পাদকরা তরুণ, তাই আশা করা যায় ভবিষ্যতে বইটার গুরুত্ব বুঝতে পারবেন ভাষাবিদরা।



    তিন

    হাংরি আন্দোলনের সময়টা নিয়ে আমি ‘রাহুকেতু’ নামে একটা উপন্যাস লিখেছিলুম। "রাহুকেতু" উপন্যাসে আমি রাহু বা রাহুল সিংহ আর দাদা কেতু বা অনিকেত সিংহ।রামায়ণ নট্ট কোম্পানির অধিকারী সুনীল গাঙ্গুলি হলেন অসীম গাঙ্গুলি। সন্দীপন চট্টো হলেন নৃপতি  ওরফে প্রদীপন চট্টো। শক্তি চট্টো হলেন রক্তিম চট্টো। সুভাষ ঘোষ হলেন প্রভাস চোঙদার। শৈলেশ্বর ঘোষ হলেন কামেশ্বর চোঙদার। দীপক মজুমদার হলেন রূপক মজুমদার। সুবিমল বসাক হলেন সুকোমল রুদ্র। তারাপদ রায় হলেন হরিপদ রায়। দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া হলেন দুর্গা বর্মণ ওরফে হরিচরণ খাঁড়া। অনিল করঞ্জাই হলেন অনীক খাস্তগির। করুণানিধান হলেন নির্মল বাউলা। কুলসুম আপা হলেন তহমিনা আপা। আমার ঠাকুমা অপূর্বময়ী হলেন সবাকসুন্দরী। এর পরের পর্ব লিখেছি ‘চাইবাসা আবিষ্কার’ নামে, তাতে দর্শিয়েছি কেন দাদা বারবার চাইবাসায় পোস্টিঙ নিতেন আর দাদার বন্ধুরা বাঁকুড়ায় আনন্দ বাগচীর আস্তানায় যাবার বদলে চাইবাসায় কেন যেতেন।  



    সম্প্রতি বীজেশ সাহা সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার ১ জুন ২০২২ সংখ্যায় ‘পাঁচ ছয় দশকের কিছু পত্রিকা-কথা’ প্রবন্ধে লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির কর্নধার সন্দীপ দত্ত, যাঁর লাইব্রেরিতে ভারতের ও বিদেশের নানা ভাষার লেখক-গবেষকরা পুরোনো বই-পত্রিকার খোঁজে যান, তাঁর রচনাটা পড়ে মনে পড়ে গেল। সন্দীপ দত্ত জানিয়েছেন, ড্যানিয়েলার মতোই,  বাঙালি প্রবীণ সাহিত্যিকরা হাংরি আন্দোলনের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করলেও সর্বভারতীয় ভাষাগুলোয় বরেণ্য হয়েছিল এই আন্দোলন। বলা বাহুল্য যে ভারতের হিন্দি ভাষার পত্রিকা ও লেখকদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল কারণ হিন্দিভাষী সাহিত্যিকদের  সঙ্গে সুবিমল বসাকের যোগাযোগ ছিল, তাঁদের বইয়ের বাংলায় অনুবাদ এবং সুবিমলের সাইক্ললোস্টাইল-করা লিফলেট, যেগুলো ছাপাতে আমাদের কোনো খরচ হতো না। নিজের গল্প-উপন্যাসের তুলনায় সুবিমল বসাক অনুবাদ করেছে বেশি, সম্ভবত ‘ক্ষুধার্ত’ গোষ্ঠী ওর লেখাকে নাকচ করে দেবার কারণে ; সুবিমলের বই নিয়ে কেউ বোধহয় লেখেনি, ফালগুনী রায় ছাড়া। যখন ওর ছেলেরা ছোটো তখন অনেক অবাঙালি কবি-সাহিত্যিক ওর বেলঘরিয়ার বাড়িতে আতিথ্য নিতো। সুবিমলের ডাইরিতে তাদের প্রসঙ্গ থাকার সম্ভাবনা। 



    সন্দীপ দত্তের প্রবন্ধটা থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে দিচ্ছি :

    “বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে হাংরি প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন। ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের মাধ্যমে যার সূচনা। স্রষ্টা, নেতৃত্ব ও সম্পাদক যথাক্রমে মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায়। পত্রিকার চিন্তনভূমি পাটনা হলেও তার প্রকাশ স্হান ছিল ২৬৯ নেতাজি সুভাষ রোড, হাওড়া ; হারাধন ধাড়া বা দেবী রায়ের ঠিকানা। যদিও ছাপা হয়েছিল পাটনা থেকে।

    “মলয় রায়চৌধুরী তখন ২২ বছরের তরুণ, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র।কবি জিওফ্রে চসারের ( ১৯৩৯ - ১৪০০ ) Sowre Hungry Tyme পড়ে মলয় Hungry শব্দের অভিঘাতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। হাংরির পরিকল্পনা তখন থেকেই। সময়ের প্রেক্ষাপটটিও গুরুত্বপূর্ণ। সদ্য স্বাধীন দেশ। দেশভাগ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়। দারিদ্র, ক্ষুধা, নিরন্ন মানুষ। বাংলা কবিতার হালও খুব খারাপ। ৩০ - ৪০-এর গতানুগতিক কবিতা নির্জীব হচ্ছে। ৫০-এর কবিরা সবে নিজেদের প্রকাশ করছে। নিজস্বভূমি আবিষ্কার হয়নি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় একসময় এলেন পাটনায়। মলয় শক্তিকে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনের কথা বলেন। প্রথম বুলেটিনে কবিতা বিষয়ক একটি ইশতাহার ইংরেজিতে ছাপা হলো। 

    “১৯৬২ ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলায় প্রথম ইশতাহারটি প্রকাশ পায়। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০৭টি হাংরি বুলেটিন প্রকাশ পায়। এইসব বুলেটিনে প্রকাশের কোনো তারিখ থাকতো না। নানা রঙের কাগজে, এমনকি মলাটের বাদামি কাগজেও  বেরোতো এক সপ্তাহে ২৪টি আবার কখনও বছরে একটি হয়তো।

    “হাংরি সূচনাকালে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাত্র চারজন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায়, সমীর রায়চৌধুরী ও মলয় রায়চৌধুরী। এরপর একে একে যুক্ত হন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ফালগুনী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ত্রিদিব মিত্র, অরুণেশ ঘোষ, সুবো আচার্য প্রমুখ। 

    “ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকে অস্বীকার ও প্রচলিত গতানুগতিক ধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লেখালিখিতে নতুন আবিষ্কারই প্রকৃত সাহসী ও মৌলিক পথ মানতো হাংরিরা। কৃত্তিবাস বা শতভিষা গোষ্ঠী হাংরি আন্দোলনকে মেনে নিতে পারেনি। প্রবীণ সাহিত্যকাররাও বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন হাংরিদের সম্পর্কে। সংবাদপত্রে সমালোচিত হয়েছে হাংরি গোষ্ঠী। 

    “অথচ সর্বভারতীয় ভাষায় বরেণ্য হয়েছিল এই আন্দোলন। হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, গুজরাটি তরুণ লেখকরা এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল। অন্য ভারতীয় ভাষার পত্রপত্রিকায় প্রভাব পড়েছিল হাংরি আন্দোলনের। মারাঠি ভাষার লেখক অশোক সাহানে, দিলীপ চিত্রে, অরুণ কোলটকর প্রমুখ, তেলেগু ভাষায় নিখিলেশ্বর, নগ্নমুনি, জ্বলামুখী প্রমুখ। হিন্দি লেখক ফণীশ্বরনাথ
    ‘রেণু’ হাংরি লেখকদের মূল্যায়ন করেন। 

    “বহির্বিশ্বেও হাংরি আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।

    “১৯৬৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে হাংরি জেনারেশনের একটি বুলেটিনকে কেন্দ্র করে অশ্লীলতার অভিযোগে মলয় রায়চৌধুরীসহ হাংরিদের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। ৪৮ শঙ্কর হালদার লেন, আহিরিটোলা, কলকাতা- ৫ থেকে ওই সংখ্যায় দশজন লেখক ও প্রকাশক সমীর রায়চৌধুরীর নাম পাওয়া যায়। লেখক তালিকায় ছিলেন মলয় রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক, উৎপলকুমার বসু, দেবী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ ও সুবো আচার্য। এই বুলেটিনেই প্রকাশ পায় মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি।

    “এই কবিতাকে কেন্দ্র করে অশ্লীল রচনার দায়ে হাংরি জেনারেশন পত্রিকার বিরুদ্ধে লালবাজার প্রেস সেকশনের সাব ইন্সপেক্টর কালীকিঙ্কর দাস অভিযোগ আনলেন। শুরু হলো ধড়পাকড়। ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও ধরা হলো ৬ জনকে। মামলা অবশ্য শেষ পর্যন্ত দায়ের করা হয়েছিল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে। দীর্ঘ দিন মামলা চলল। ১৯৬৫ সালের মে মাসে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এই ১৯৬৫ সালেই হাংরি আন্দোলনের ইতি ঘটে। এই বছরেই ২৮ ডিসেম্বর নিম্ন আদালতে মলয় রায়চৌধুরীর সাজা হয়। পরে, ১৯৬৭ সালের ২৬ জুলাই মলয় রায়চৌধুরী হাইকোর্টে পিটিশন দ্বারা মামলা করার ভিত্তিতে, তাঁকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি দেয়া হয়।
    “আন্দোলনের কথা পৌঁছে যায় নিউইয়র্কের TIME পত্রিকায়। এই প্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত একটি পত্রিকা বিদেশে প্রচারিত হলো। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাংরি জেনারেশনের এই আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে একটি দীঘস্হায়ী ছাপ রেখে গেল।”


     
    চার

    আমাদের আর সুবিমল বসাকদের পরিবার একই শহরে বসবাস করলেও সুবিমলের পরিবারের সঙ্গে আমার বা আমাদের পরিবারের কারোর কখনও যোগাযোগ হয়নি। তবে বাঙালি পরিবারদের সম্পর্কে লোকমুখে নানা খবর পেতেন বাবা আর জেঠারা। সুবিমলদের পরিবার সম্পর্কে ভাসা-ভাসা খবর ছিল ওনাদের কাছে। পাটনা শহরের মাঝখানে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের গান্ধি ময়দানের পশ্চিম দিকে, গোলঘরের পেছনে ছিল সুবিমলদের বাড়ি আর আমাদের ছিল পূর্ব দিকে। সুবিমল পড়ত আরো পশ্চিমের মিলার স্কুলে আর আমি পড়তুম আরও পূর্বদিকে রামমোহন রায় সেমিনারিতে। তার আগে চার বছর পড়েছিলুম ক্যাথলিক স্কুলে।

    শৈশবে আমাদের পরিবার থাকতো ইমলিতলা নামে অত্যন্ত গরিবদের অন্ত্যজ পাড়ায়। সেসময়ে পাটনার বাঙালিরা সচরাচর আমাদের বাড়িতে আসতেন না, পাড়াটা অপরাধী-অধ্যুষিত অনুমান করে। ইমলিতলার বাড়িতে ঠাকুমা আর বড়োজ্যাঠার তৈরি-করা সাংস্কৃতিক কাঠামোর ভেতরে বাড়ির সবাই আটক ছিলুম। ঠাকুমা দেশের বাড়ি উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে চলে যাবার পর তাঁর আসন দখল করেন বড়োজেঠিমা। অথচ পাড়ার অন্ত্যজদের বাড়িতে যাওয়া, তাদের তৈরি খাবার খাওয়া, এমনকি তাড়ি আর পাঁঠার নাড়িভুঁড়ির তৈরি রান্না, শুয়োরের পোড়া মাংস খাওয়ার কোনো নিষেধ ছিল না। নিষেধগুলো ছিল ভিন্ন। যেমন, বাংলা সংবাদপত্র, নাটক, উপন্যাস পড়লে চরিত্র খারাপ হয় ; রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া উচিত নয়, কেননা রবিঠাকুর লোকটা বেমমো। সিনেমা দেখা ভালো নয়, কেননা তাতে শুধু নোংরামি দেখানো হয়। মুর্গি, মুর্গির ডিম আর বিনা আঁশের মাছ খাওয়া সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বাড়িতে নিষিদ্ধ। 



    পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মিশে দাদা সমীর রায়চৌধুরীর চরিত্র খারাপ হয়ে যাচ্ছে অনুমান করে ম্যাট্রিক পাশ করার পর দাদাকে কলকাতায় সিটি কলেজে ভর্তি করে দেয়া হয় ; ওই কলেজের একজন অধ্যাপক ছিলেন মায়ের মামা। দাদা প্রথম দিকে মামার বাড়ি পাণিহাটিতে আর পরে বসতবাড়ির খণ্ডহর উত্তরপাড়ায় থাকতেন। এই সময় বাবা দরিয়াপুর পাড়ায় একটা কুঁড়েঘর কিনে প্রথমে একতলা, বছর কয়েক পরে দোতলা তৈরি করান। একতলা তৈরি হবার সময়ে আমি ওই বাড়িতে গিয়ে থাকা আরম্ভ করি আর যা ইচ্ছে খাওয়া, যা ইচ্ছে পড়া, যা ইচ্ছে করার স্বাধীনতা পেয়ে যাই। দাদা কলকাতা থেকে প্রচুর কবিতা, গল্প, উপন্যাসের বই কিনে আনতেন। বাবা পাটনার একটা দোকানকে বলে দিয়েছিলেন যে আমি যে বই পছন্দ করব তা বাড়িতে এনে দিলে পেমেন্ট পেয়ে যাবে। আমি হয়ে উঠি বইপোকা আর তারই ফলে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত।



    হাংরি আন্দোলনের জন্য কলকাতায় নির্ভরযোগ্য একজন সমবয়সী তরুণকে প্রয়োজন ছিল। তখনই একটা পত্রিকায় হারাধন ধাড়ার নাম-ঠিকানা পেয়ে ওর হাওড়ার বাড়িতে যাই। সেটা ছিল বস্তিবাড়ি। হারাধন ধাড়া নাম আর বস্তিবাড়িটা হাংরি আন্দোলনের ঘাঁটি হিসেবে আমার পছন্দ ছিল। ধাড়ারা কৈবর্ত্য। এই নামে কোনো পত্রিকা ওর লেখা ছাপতে চাইছিল না বলে হারাধন ধাড়া এফিডেভিট করে নিজের নাম পালটে দেবী রায় করে ফেলল। আমি এই ব্যাপারে বলার ফলে ১৯৬২ সালের শেষ থেকেই ওর সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরে যায়। কিন্তু ওকে ছাড়া তো পাটনা থেকে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন, বুলেটিন ছাপিয়ে বিলি করা কঠিন, নতুন কেউ যোগ দিতে চাইলে তাকে লেখার সুযোগ দেয়া কঠিন। ওর আরেকটা দুর্বলতা ছিল ;  দেবী রায়ের কাছে আগের প্রজন্ম মানেই তাদের লেখালিখির মূল্যবোধ, মানদণ্ড, ক্যাননকে মান্যতা দিতে হবে। দেবী রায় বুঝতে পারেনি যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে কড়া ডোজের বার্তা দেবার জন্য উৎপলকুমার বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। বিনয় মজুমদার যোগ দিয়েছিলেন কারণ শক্তি চট্টোপাধ্যায় ওনাকে বলেছিলেন যে মলয় চায় উনিই নেতা হোন। বিনয় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে মলয় তো নেতা, আমাকে করলে পারতো। বিনয় যদি আমাকে বলতেন তাহলে শক্তির বদলে ওনার নামটাই নেতা হিসেবে ছেপে দিতুম। হাংরি আন্দোলন অন্য দিকে মোড় নিতো। দাদা সমীর রায়চৌধুরীর নিকট-বন্ধু ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীলের প্রথম কবিতার বই প্রথম মাইনের টাকায় প্রকাশ করেছিলেন, তাই দাদা হাংরি আন্দোলনে ওই তিনজনের মতো যোগ দেননি। মামলায় দাদা ফেঁসে যান কেননা যে বুলেটিনটার জন্য আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল তাতে দাদার নাম ছিল প্রকাশক হিসেবে। ঠিকানাটা ছিল আমার পিসেমশায়ের বাড়ির, কেননা দেবী রায় আর চায়নি যে ওর নাম প্রকাশক হিসেবে দেয়া হোক।



    এই প্রসঙ্গে অজিত রায়ের একটা লেখে থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে দিই। “প্রাতিষ্ঠানিক মসিহস্তীরা এমন কুচুটে হন কেন? আমেরিকা থেকে সুনীল মলয়কে থ্রেট করলেন , 'তুমি কলকাতায় কীসব কাণ্ড করছো ?  মনে রেখো কলকাতা শহরটা আমার, আমি সেখানে রাজত্ব করব। সুনীলের বন্ধু শক্তি স্বভাবে খুব স্বার্থপর, লোভী আর থুতু-চাটা ছিলেন। সমীর রায়চৌধুরীর চাইবাসার বাসায় গিয়ে তাঁরই টাকায় মাল খেতেন, তাঁরই শালীকে লাইন মারতেন, আবার সেই মানিকজোড় সুনীল-শক্তি মওকা পেলেই সমীরকে হেয় করতেন। শক্তি তো দালালি খেয়ে সমীরকে টুপি পরিয়ে বাঁশদ্রোণীর জমিটা চড়া দামে ঝেড়ে দিয়েছিলেন। এটা খোদ সমীরদাই আমাকে প্রথম আলাপের দিন বলেছিলেন।”

    এখানে নন্দিনী ধর নামে একজন আলোচকের বক্তব্য তুলে ধরাটা জরুরি। ‘আয়নানগর’ পত্রিকার অক্টোবর ২০১৬ সংখ্যায় নন্দিনী ধর হাংরি আন্দোলন আলোচনা করতে বসে দুম করে লিখে দিলেন যে আমার সংকলিত বই থেকে শৈলেশ্বর ঘোষকে বাদ দিয়েছি ; অথচ আমি হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনার কোনো সংকলন প্রকাশ করিনি। নন্দিনী ধর লিখেছেন যে হাংরি আন্দোলনকারীরা নিজেদের ‘ছোটোলোক’ ঘোষণা করে বিবিক্ততাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে ; উনি জানতেন না যে আমি পাটনায় ইমলিতলা নামে এক অন্ত্যজ অধ্যুষিত বস্তি-এলাকায় থাকতুম, অবনী ধর ছিলেন জাহাজের খালাসি আর পরে ক্রেন-ড্রেজার-ডাম্পার অপারেটার, লরি-ট্যাকসি-প্রায়ভেট মোটরগাড়ি চালক, রেলওয়ে ক্যাটারিঙের বেয়ারা, কোককয়লা ফেরি, ঠোঙা ও প্যাকেট তৈরি, পোস্টার-ফেস্টুন লেখা ইত্যাদি, অসংগঠিত শ্রমিকের জন্য যে-ধরণের কাজ পাওয়া যায় সবই করেছিলেন। সমীরণ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ এসেছিলেন দেশভাগের  উদ্বাস্তু পরিবার থেকে, দেবী রায় চায়ের ঠেকে চা বিলি করতেন, শম্ভু রক্ষিত নিজের গ্রামে চাষবাস করতেন, নিজেই প্রেসে গিয়ে কমপোজ করতেন, সুবিমল বসাকের শৈশবে পরিবারকে পথে বসিয়ে তাঁর বাবা দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেন, করুণানিধান মুখোপাধ্যায় হিন্দি পত্রিকার মলাট এঁকে রোজগার করতেন, ফালগুনী রায় কিছুই করতেন না। এ-থেকে টের পাওয়া যায় যে আলোচকরা কোনও বই পড়ার আগেই ভেবে নেন যে হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনা আলোচনার সময়ে কী লিখবেন। হাংরি আন্দোলনকারীদের সমাজচিন্তা ও বিশ্ববীক্ষার তর্ক-বিতর্ক ও লেখালিখি বাদ দিয়ে আলোচকরা তাঁদের অবনিবনাকে গুরুত্ব দেন। নন্দিনী ধর তাঁর প্রবন্ধ শেষ করেছেন এই বলে যে “হাংরিদের রচনার কাগজ দিয়ে কেবল পোঁদ পোঁছা যায়”।



    অন্য বাঙালি লেখকদের ক্ষেত্রে কিন্তু তাঁরা এমন অডিটরসূলভ বিশ্লেষণ করতে বসেন না। বিদেশি সাহিত্যিকদের মাঝে নিজেদের বিশ্ববীক্ষার সমর্থনে পারস্পরিক বিবাদ-বিতর্কের কথা যেমন শোনা যায় তেমনটা বাঙালি লেখকদের ক্ষেত্রে বড়ো একটা লেখালিখি হয় না। আমরা পড়েছি টলস্টয় – ডস্টয়েভস্কি বিবাদ, গোর ভিডাল আর নরম্যান মেইলারের বিবাদ এমনকি হাতাহাতি, ভারগাস য়োসা ঘুসি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের, ভ্লাদিমির নবোকভ – এডমাণ্ড উইলসন বিবাদ, মার্ক টোয়েন – ব্রেট হার্ট বিবাদ, আলেকজাণ্ডার পোপ – জন হার্ভে বিবাদ, সিংকলেয়ার লিউইস – থিয়োডোর ড্রেজার বিবাদ, সালমান রুশডি – জন আপডাইক বিবাদ, হেনরি জেমস – এইচ জি ওয়েল্স বিবাদ, জোসেফ কনরাড – ডি এইচ লরেন্স বিবাদ, ভার্জিনিয়া উলফ – অ্যারনল্ড বেনেট বিবাদ, সি. পি. স্নো – এফ. আর. লিভিস বিবাদ, জন কিটস – লর্ড বায়রন বিবাদ, চার্লস ডিকেন্স – হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাণ্ডারসন বিবাদ, পিকাসো-দালি বিবাদ, আলবেয়ার কামু – জাঁ পল সার্ত্রে বিবাদ, মার্সেল প্রুস্ত – জাঁ লরেনস বিবাদ, রিচার্ড ফোর্ড – অ্যালিস হফম্যান বিবাদ, ডেরেক ওয়ালকট – ভি এস নাইপল বিবাদ, হেমিংওয়ের সঙ্গে ওয়ালেস স্টিভেন্স, এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, ও উইলিয়াম ফকনারের বিবাদ, ইত্যাদি। আলোচকরা কিন্তু তাঁদের রচনাবলী বিশ্লেষণের সময়ে সৃজনশীল কাজকেই গুরুত্ব দেন, বিবাদ নিয়ে খিল্লি করেন না।       

    বাঙালি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, মনে করেন মানুষ ও প্রাণীরা এসেছে অন্য গ্রহ থেকে, তিনি অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য। ওই একই দপতরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর পাশের কেবিনেই বসতেন ,যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না, ডারউইনের তত্বে বিশ্বাস করতেন, বামপন্হী ছিলেন। অথচ পরপস্পরের লেখা আলোচনার সময়ে এই বিষয়গুলো ওনাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যেত, যেন সাহিত্য আলোচনায় লেখকের বিশ্ববীক্ষার ও কৌমচিন্তার কোনো প্রভাব থাকে না। অধিকাংশ বাঙালি সাহিত্যিক এই ধরণের ভাই-ভাই ক্লাবের সদস্য। এদিকে হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনা আলোচনা করতে বসে তাঁদের ব্যক্তিগত অবনিবনাকে তুলে ধরতে আগ্রহী,  আর লেখালিখি না পড়েই খিল্লি করেন।        


     
    দেবী রায় যখন দোনামনায় আক্রান্ত, ঠিক সেই সময়ে, বলা যায় প্রভিডেন্সের কল্যাণে, আবির্ভাব হলো সুবিমল বসাক। সুবিমল সম্ভবত আমার ঠিকানা পেয়েছিল দেবী রায়ের কাছে। দরিয়াপুরের বাড়িতে সুবিমল ঠিক কবে এসেছিল আমার মনে নেই। বোধহয় ১৯৬৩ সালের প্রথম দিকে। সুবিমলের চরিত্র দেবী রায়ের একেবারে উল্টো। তখন ওর স্বাস্হ্যও ভালো ছিল, ডাকাবুকো, নিজের লেখাকে অন্যের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ মনে করা, তাঁতি পরিবার বলে লুকোছাপা নেই। নিম্নবর্ণের একটা সংস্হা সুবিমলের সাহিত্যকৃতির জন্য ওকে পুরস্কৃত করেছে।  বাবা আর জেঠা স্যাকরা বলে হীনম্মন্যতায় ভোগে না। লক্ষ্যনীয় যে প্রচলিত মধ্যবিত্ত সাহিত্যক মূল্যবোধকে স্যাবোটাঝ করার উদ্দেশ্যে সুবিমল নিজের বইয়ের নাম রেখেছে ছাতামাথা, হাবিজাবি, বকবকানি, খোলামকুচি ইত্যাদি।



    তাঁতশিল্পী কিংবা তাঁতের কাপড়  ও ব‍্যবসা ইত‍্যাদি যাদের পেশা তারা তন্তুবায় বা তাঁতি নামে পরিচিত। তন্তবায়দের মধ্যে বিভাজন আছে, যেমন, বসাক, শেঠ, মল্লিক, হালদার ইত্যাদি। তন্তুবায়রা নবশায়ক। বসাক মানে আচ্ছাদন বা পরিধান। বসক থেকে বসাক শব্দের উদ্ভব বলে মনে করা হয়। বঙ্গীয় জাতিমালা বইতে গোবিন্দচন্দ্র বসাক বলেছেন, 'এদের উপাধি বারেন্দ্র সমাজে রায়, প্রামানিক রাঢ়ী সমাজে প্রামানিক, সাহা'। তিনি আরো বলেন যে, বারেন্দ্র তাঁতিরা সবাই বস্ত্রবয়ন কাজে এবং রাঢ়ী সকলেই কাপড়, সুতা কেনাবেচা, মহাজনি ও তেজারতি কারবার করে। আজকাল দুটো সম্প্রদায়ই বসাক উপাধি ব্যবহার করেন। আরবি-ফারসিতে  বোসোক শব্দ তুলা অর্থে প্রয়োগ করা হয়। ইতালীয় ভাষায় তুলার এক নাম শেঠ। 



    মোগল আমলে ঢাকার শেঠ-বসাকরা তাঁতি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। নুরজাহানের আংটির ভেতর দিয়ে পুরো একটা মসলিনকাপড় গলে গিয়েছিল, আর তা ঢাকার তাঁতিদের তৈরি।  একসময় ঢাকার কিছু কিছু সোনার কারবারি সোনার কাজ ছেড়ে তাঁতের কাজ ধরেছিল, কারণ সে সময় তাঁত এতটাই লাভজনক ছিল। তারপর ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের ধাক্কায় যন্ত্রচালিত তাঁতের পেষণে বাংলার তাঁত আক্রান্ত হলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নীল চাষীদের ওপর যেমন অত্যাচার করতো, তেমনই করতে লাগলো ঢাকার তাঁতিদের ওপর, অনেকের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠা কেটে নেয়া হতো।এরপর দেশ স্বাধীন হল। দেশবিভাগের কবলে পড়ে আবার অধিকাংশ তাঁতি উদ্বাস্তু হয়ে পাড়ি জমালো নতুন দেশে, নতুন মাটিতে নতুন করে শেকড় স্থাপন করে বাঁচার লড়াইয়ে টিকেও গেল। পুরোনো ঢাকায় যে প্রাণটা আছে, তা নতুন ঢাকায় নেই।  তাঁতিবাজারের তল্লাটকে বলা হয়, ঢাকার মধ্যে এক টুকরো কলকাতা। তাঁতিবাজারে মূলত ঢাকার বনেদি সোনা ব্যবসায়ীদের বাস। সব সোনা ব্যবসায়ী এখান থেকেই তাঁদের রসদ জোগাড় করেন।  জামদানী শাড়ি বুনতেন এমন একদল তাঁতি বহু আগে থেকেই এখানে বাস করতেন। এখন অনেকেই কলকাতায় চলে গিয়েছেন যদিও, কিন্তু নামটি রয়ে গেছে। তাঁতিবাজারের ভিতরেই পানিটোলা বা জামদানী নগর, চুড়িহাট্টা, শাঁখারি বাজার, কাঁসারি বাজার। গায়ে গায়ে লাগোয়া বহু পুরনো বিল্ডিং। বহু বিল্ডিং ছেড়ে শেঠ-বসাকরা প্রতিটি দাঙ্গায় খেপে-খেপে চলে এসেছেন ভারতে। এখনও দাঁড়িয়ে আছে শেঠ-বসাকদের ভাঙাচোরা বিল্ডিংগুলো। যে কয়েক ঘর বসাক তাঁতিবাজারে রয়ে গেছেন, বাংলাদেশ সরকার তাদের দিয়ে আবার নুরজাহানি মসলিন বোনাতে সফল হয়েছে।


     
    পাঁচ

    সুবিমল বসাক জন্মেছিল ১৯৩৯ সালের  ১৫ ডিসেম্বর.। আমি জন্মেছিলুম ওই বছরের ২৯ অক্টোবর। আমার মতনই সুবিমলের জন্ম ও পড়াশোনা পাটনায়। ঢাকার তাঁতিরা যখন স্যাকরার কাজ করতে আরম্ভ করলেন, সেই সময়ে সুবিমল বসাকের পূর্বপুরষরা তাঁত ছেড়ে স্বর্ণকারের ব্যবসায় চলে যান।  তাঁর বাবা তারকনাথ বসাক   পাটনায়  চলে আসেন আর স্বর্ণকারের দোকান খোলেন। জেঠা কলকাতায় দোকান খোলেন। 
     
    একটা সাক্ষাৎকারে সুবিমল  বলেছিল – “বাবা যৌবনে ঢাকা ছেড়ে আসেন, কাজের ধান্দায় নানান জায়গায় ঘুরে শেষে পাটনায় থিতু হন। ভাল কারিগর ছিলেন, উদ্যমী ছিলেন, পরিশ্রমীও ছিলেন। প্রচুর অর্থ উপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে অভিজাত মহলেও একটা আসন গড়ে তুলেছিলেন। পাটনায় দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন ১৯৩৯ সালে, আমার জন্মবর্ষে, কিন্তু গৃহপ্রবেশ করেছিলেন কয়েকবছর পর; কেননা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে জনৈক মিলিটারি অফিসার আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েন। মা-কে ঢাকা থেকে নিয়ে আসার পর পাটনার স্থায়ী বাসিন্দা। আমাদের স্বজাতি অন্যান্য ব্যবসায়ীর তুলনায় আমাদের অবস্থা খুব উন্নত ছিল বলা যায়। পরিবারের অন্যান্যরা ঢাকায় থাকতেন, যৌথ পরিবারের দরুণ বাবাকে নিয়মিত খরচ পাঠাতে হতো। আমার মামার বাড়িও ঢাকায়, তখন বিয়ের সম্বন্ধ হতো কাছে পিঠে। পরে অবশ্য এক মামা আর মেসো খাগড়ায় স্থায়ী বাসিন্দা হন। মামাতো ভাই-বোনেরা খাগড়াই ভাষায় কথা বলে। ঢাকায় আমরা শেষ যাই পঞ্চাশ সনের কিছু আগে, পাসপোর্ট-ভিসার প্রচলন হয়নি, তখনও ভারতীয় টাকা চলতো – নোটের বাঁ-দিকে সাদা অংশে ‘গভর্নমেন্ট অফ পাকিস্থান’ ছাপা থাকতো, ডানদিকে ষষ্ঠ জর্জ। পঞ্চাশের দাঙ্গায় আত্মীয়-স্বজন সকলেই বাড়ি জমি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ফেলে রেখে চলে আসে। রিফ্যুজি কার্ড হোল্ডার। আমরা অবশ্য সে অর্থে রিফ্যুজি নই, কিন্তু অবস্থা খারাপ ছিল রিফ্যুজি-আত্মীয়দের চেয়েও”। 
     
    সুবিমলের বাবা তারকনাথ বসাক ছিলেন গয়নার দোকানের মালিক। যথেষ্ট স্বচ্ছ্বল অবস্থা থাকা সত্ত্বেও, ১৯৬৩ সালে ভারত সরকারের ‘গোল্ড কন্ট্রোল’ আইনের ফলে অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তিনিও দেনার দায়ে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন আর নাইট্রিক অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। স্বাধীনতার পর , চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধের সময় ১৯৬২ সালে বৈদেশিক মুদ্রা কমে যেতে থাকে। তখনকার অর্থমন্ত্রী মোরারজি দেশাই গোল্ড কন্ট্রোল অ্যাক্ট, ১৯৬২ পাস করান, , যা ব্যাঙ্কের দেওয়া সমস্ত সোনার ঋণ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল এবং সোনার ফরোয়ার্ড ট্রেডিং নিষিদ্ধ করেছিল। ১৯৬৩  সালে, চোদ্দ ক্যারেটের সূক্ষ্মতার উপরে সোনার গয়না উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বহু স্যাকরা দেউলিয়া হয়ে গিয়েছল। বাবা মারা যাবার পর তিন ভাই ও এক বোনের দায়িত্ব শৈশব থেকে সুবিমল বসাকের ওপর বর্তায়। আমার শৈশবের ইমলিতলা পাড়ার মতনই ছিল সুবিমল বসাকের পাড়া লোদিপুর।  এই অঞ্চলের ভাষা সুবিমল বসাককে শৈশব থেকে আকৃষ্ট করেছে আর বিভিন্ন গদ্যে প্রয়োগ করেছে মিশ্রিত বুলি, যাকে অজিত রায় আর রবীন্দ্র গুহ বলেছেন ডায়াসপোরিক। 

      
    প্রথম উপন্যাস ‘ছাতামাথা’ বইতে অবশ্য প্রয়োগ করেছে ঢাকার কুট্টিদের বুলি। এই উপন্যাসের প্রচ্ছদ তৈরি করেছিলুম আমি ; কাট-আপ প্রয়োগ করতে গিয়ে বিটকেল হয়ে গেছে প্রচ্ছদ। ওর পরের বইগুলোর প্রচ্ছদ সুবিমল নিজেই এঁকেছে। উপন্যাসটিতে ন্যারেটিভ লেখা হয়েছে  পূর্ব বঙ্গের কুট্টিদের বুলিতে  এবং সংলাপ  কলকাতার । বাংলা সাহিত্যে পূর্ব বঙ্গের বুলিতে লেখা উপন্যাস  এইটিই প্রথম। সেসময়ে সুবিমল বসাক সাহিত্যের ভাষাকে কলুষিত করছেন বলে সমালোচিত হলেও, পরবর্তীকালে, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে এই ভাষায় সাহিত্য রচনা এখন স্বীকৃত। এর পর ও ঢাকা শহরের কথ্য ভাষায় একট কাব্যগ্রন্হও প্রকাশ করেছে আর তার নাম দিয়েছে ‘হাবিজাবি’। ন্যারেটিভের মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার পরও বজায় রেখেছিল।  পরবর্তী উপন্যাস প্রত্নবীজ-এ  শৈশবের লোদিপুর পাড়ার কথ্য পাটনাই বুলির সঙ্গে মিশ্রিত বাংলা, যা ওই অঞ্চলের বাঙালিরা ব্যবহার করেন  প্রয়োগ করেছে। ‘প্রত্নবীজ’ উপন্যাসের প্রশংসা অ্যাকাডেমিক স্তরেও পেয়েছে।


     
    বহির্বঙ্গের বর্তমান শেষ প্রজন্মটির পাঠকৃতি সেই অর্থে একটি পৃথক সাহিত্যিক ক্যানন তৈরি করেছে, যে-অর্থে স্পেন থেকে পৃথক লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর সাহিত্য, লখনৌ-ইলাহাবাদ থেকে পৃথক পাকিস্তানের উর্দু সাহিত্য, ফরাসি দেশ থেকে পৃথক আফ্রিকার সাহিত্য, ব্রিটেন থেকে পৃথক ব্রিটেন-বহির্ভূত ইংরেজিভাষী সাহিত্য, চিন থেকে পৃথক তাইওয়ান হংকংয়ের সাহিত্য।  পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের সাহিত্যিক মননবিশ্বে মিল নেই।  ঢাকায় যে-ভাবে নজরুল পাঠ ও বিশ্লেষণ হয়, কলকাতায় হয় তার বিপরীত।  লোকনাথ ভট্টাচার্য ফ্রান্সে ছিলেন বলে তাঁর কবিতার ক্যাননিক্যাল্ পরিবর্তন কলকাতার হজম হয়নি।  জার্মানি থেকে ঘনঘন কলকাতায় এসে কলকাতা-কেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে চান করে নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখতেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, পাছে পশ্চিমবঙ্গের চালু অনুশাসন থেকে মুক্ত হয়ে যান! বহির্বঙ্গের ডায়াসপোরিক লেখকরা যা করছেন তা 'ঈর্ষণীয়'। একজন লেখকের পাঠকৃতি কেবলমাত্র তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা-অনুভূতি, ভাষা বা ভাষাসমূহের ওপর দখল নয়, এবং কেবল তাঁর অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ নয়, ----- ভাষা বা ভাষাগুলো এবং সাহিত্য নামক ক্রিয়াকলাপটিরও হাত আছে লেখক-প্রতিস্ব গড়ার।  উৎস ও স্থানিক কাঠামোভেদে সুবিমল বসাকের গদ্যের সঙ্গে অজিত রায় আর রবীন্দ্র গুহর   লেখক-প্রতিস্বের তফাৎ আছে।


     
    নিজের গদ্য সম্পর্কে সুবিমল বলেছে,  “আমি  প্রতিটা গল্পে বা প্রতিটা গদ্যে পাল্টাতে থাকি। নতুন বিষয়,নতুন আঙ্গিক এমনকি নতুন ভাষায়ও। যেমন ‘ছাতামাথা’-টা হচ্ছে পূর্ববঙ্গের ভাষা। আবার ধরো ‘গেরিলা আক্রোশ’ – এইটা আবার পশ্চিমবঙ্গের ভাষায়। ‘প্রত্নবীজ’-টা বিহারের বাঙালিদের ভাষায়... যারা অনেকদিন হিন্দিভাষী অঞ্চলে রয়েছে,তাদের। তাছাড়া আরেকটা আছে,যারা এখানকার বিহারি, এখানে এসে থেকে গেছে,তাদের একটা অন্যরকম ভাষা।” 

     
    ইংরেজরা যখন চটকল বসানো আরম্ভ করেছিল তখন বাঙালি শ্রমিক নিতে চায়নি, বিহার আর পূর্ব উত্তরপ্রদেশ থেকে শ্রমিক এনেছিল ; বিহার আর উত্তরপ্রদেশ থেকে বহু পরিবারকে ইনডেনচার্ড লেবার হিসেবে ভারতের বাইরে বিভিন্ন দেশে নিয়ে গেছে। ভারতের বাইরের বিহারিরা যেমন সেই সব দেশের ভাষাভাষী হয়ে গেছে, তেমনই পশ্চিমবাংলায় এসে তারা খিচুড়ি বাঙালি হয়ে গেছে। চটকলগুলো ক্রমশ বন্ধ হবার পর এই বিহারিরা মিশে যাচ্ছে পশ্চিমবাংলায়। রুটির দোকান, ফুচকার দোকান, মুড়ি-ছোলার দোকান, ধোপা আর আয়রন করার ঠেক ইত্যাদি এখন বিহারিদের আয়ত্তে চলে গেছে। তারা তাদের মতন করে বাংলাতেই কথা বলে, তাদের ছেলেমেয়েরা বাংলা স্কুলে পড়ে।


     
    আসলে যে ব্যাপারটা সুবিমলকে নাড়া দিয়েছিল, তা হলো ব্যাপক ও অনপনেয় সংকরায়ন। ভাষাকাঠামোয়, বাক্যসংগঠনে, শব্দে, শব্দার্থে তো বটেই। সুবিমলের পাঠবস্তুতে এই সংকরায়ন আপনা থেকে ঘটেছে। এসেছে পাটনাই, ভোজপুরি, ঠেট হিন্দি  অভিব্যক্তি-বিন্যাস। কারণ সুবিমল শৈশবে ছিল ভারতবর্ষের দেশ ভাগোত্তর সংকরায়নের টোর্নাডোয়। পশ্চিমবাংলার বহু বাংলাভাষার অধ্যাপকের অভিযোগ যে অন্যান্য ভাষা থেকে অভিব্যক্তি আসছে বলে বাঙালিকে সাবধান হতে হবে যাতে বাংলা ভাষার বিশুদ্ধতা অক্ষুণ্ন থাকে। তাঁদের দুটো-কথা বলা দরকার। প্রথমত, তাঁরা কি জানেন যে, যে কয়েক লক্ষ নিম্নবর্গের বাঙালিকে দেশভাগের পর আন্দামান, দন্ডকারণ্য এবং হিমালয়ের তিনশো কিলোমিটার দীর্ঘ তরাই অঞ্চলে পুনর্বাসন দেয়া হয়েছিল, তাঁদের বাংলা এখন কি রূপ পরিগ্রহ করেছে। তাঁরাও তো বাঙালি। নাকি বাঙালি বলতে কেবল পশ্চিমবাংলার  বাঙালিদের বোঝায়। দ্বিতীয়ত, বাংলা ভাষা তো নিজেই পূর্বী অপভ্রংশ থেকে উদ্গত। সংস্কৃত থেকে জন্ম অথচ শিষ্ট সংস্কৃতে অচল অভিব্যক্তিকে পতঞ্জলি বলেছিলেন অপভ্রংশ। সুবিমল বসাক সংকরায়নকে একইভাবে ডিসকোর্সের আধিপত্য খর্ব করার কাজে প্রয়োগ করেছে। অক্সফোর্ড-কেমব্রিজের ভাষা-আধিপত্যকে নষ্ট করেই তো সম্ভব হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আমেরিকা, কানাডা, সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ইন্ডিয়া, অস্ট্রেলিয়ার ইংরেজি সাহিত্য।



    পাটনার নিম্নবর্গীয় এলাকাগুলো যতটা সামাজিক আতঙ্কের  নিকটবর্তী, ততোটা সুবিমলের পাঠবস্তুগুলোর কন্ঠস্বরের বহুমুখ আর তাদের অভিমুখগুলোর স্বেচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত পরিধিবিন্যাস। সংকরায়নের মাধ্যমে ভাষায় যখনি আধিপত্যকে বিধ্বস্ত করা হয়, তার একটি সামাজিক মাত্রা অবশ্যই থাকে। সমাজের, বলা বাহুল্য ভাষারও, মানে বা অর্থময়তার ওপর কায়েমী স্বার্থে আঘাত হানে। এই কারণে কলকাতার মিডিয়া ক্লোনদের স্ট্রিমলাইনড কবিতা থেকে একেবারে আলাদা সুবিমলের কবিতাগুলো। ‘হাওয়া-৪৯’ পত্রিকায় প্রকাশিত নিষাদ হেমব্রম তাঁর "বর্ণসংকর, দোআঁসলা, হাইব্রিড (২০০০)" রচনায় বলেছেন যে, "বাঙালির সাম্রাজ্যবাদ এত বেশি আধিপত্যবাদী যে সাঁওতাল, মুন্ডা, হো, ওঁরাও, প্রমুখ উপজাতিদের পাশাপাশি বাস করলেও শেষোক্তদের শব্দাবলী বাংলা ভাষায় ঢুকতে পারেনি।"



    সময়ের একরোখ আরম্ভ ও সমাপনের ধারণাটি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে এসেছিল উপনিবেশগুলোয়। কবিতায় দশক বিভাজনের মূর্খামি উদ্গত হয়েছে সময় সম্পর্কে আরম্ভ ও সমাপনের মডার্নিস্ট ধারণা থেকে, যেন প্রতিটি দশকের শেষে বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী। বাড়ি তৈরি করানোর সময়কার নকশাল আবর্ত থেকে সুবিমল ভালভাবেই টের পেয়েছিল যে কোথাও কোনো বিপ্লব ১৯৪৭ এর পর হয়নি। বরং যারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখিয়েছিল তারা নিজেদের খাঁটি জোচ্চোর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। পাশাপাশি মিডিয়া ক্লোনরা গড়ে উঠেছে ভাষা-জোচ্চোর রূপে, কেননা পশ্চিমবঙ্গের পথেঘাটে, চুনো-নেতাদের দাপটে যে অভিব্যক্তি-মশলা প্রতিদিন শোনা যায়, তার দেখা মেলে না মিডিয়া ক্লোনদের রচনায়, অথচ সেই কোনকালে সমসাময়িক পথচলতি অভিব্যক্তিকে নিজের লেখায় তুলে আনার খেই ধরিয়ে দিয়ে গেছেন জীবনানন্দ। তাঁর কবিতায় তাই আচমকা, পাঠকের টনক নড়ায়।


     
    অজিত রায় লিখেছিল, “ডায়াসপোরা তো নিছক স্থানিক নয়, তা মানসিকও বটে ----- তার প্রাচীন উদাহরণ যদি হন ঈশ্বর গুপ্ত, তাহলে নতুন দৃষ্টান্ত কমলকুমার, অমিয়ভূষন মজুমদার, উদয়ন ঘোষ, রবীন্দ্র গুহ, অরুণেশ ঘোষ, মলয় রায়চৌধুরী, সুবিমল বসাক, কমল চক্রবর্তী, নবারুণ ভট্টাচার্য, দেবজ্যোতি রায়, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং, অত্যন্ত দ্বিধাভরে লিখছি, অজিত রায়।  এঁদের ভাষা ও ভাষা সংক্রান্ত ভাবনাচিন্তা সম্পূর্ণত ডায়াসপোরিক।  অতীতে আমরা আরও দেখেছি, যে বিদ্যাসাগর কথায় কথায় স্ল্যাং বলতেন, স্ল্যাং-এর তরফে তাঁর ঐতিহাসিক পক্ষপাতিত্বের কথাও আমাদের অজানা নয়; ---- সেই বিদ্যাসাগরই বাংলা ভাষার বৈজ্ঞানিক বিধিবদ্ধতার ও শিক্ষার প্রকরণ গড়েছিলেন।  তারও আগে বঙ্গলিপি প্রবর্তনের পরবর্তী পর্যায়ে বিদ্বজ্জন বাঙালি নকশা, প্রহসন, ব্যঙ্গ, স্যাটায়ার, নাটক ইত্যাদি ভাষাশিল্পে জনমনোরঞ্জন ও সামাজিক সমালোচনা জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।  শুধুমাত্র কলকাতায় চলে, সেসব নয়, বাংলা ও বাংলার প্রতিবেশী ভাষা থেকেও শব্দ আহরণ করে যারা 'নতুন' বাংলা ভাষার জন্ম দিয়েছেন বা এখনো দিয়ে চলেছেন, তাঁদেরকে বাদ দেবে কোন আহাম্মক?  সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক স্বাধীন ভাবে ভাষাবুনন করেন বৃহত্তর বাংলা সমাজের যে কোন এক বা বহু প্রান্তের সজীব ভাষার প্রত্যক্ষ আহরণ বা পরোক্ষ মিশ্রণ ক'রে।  এখন সাহিত্যিক তাঁর ভাষার মাধ্যমে ভিন্নতর মৌলিকতার সন্ধান ও প্ৰতিষ্ঠা করতে উন্মুখ।  পরিপ্রেক্ষায় অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ 'নিজ' 'অপর' সব মিলেমিশে যাচ্ছে।  ভাষা আন্দোলনে এটি একটি বৈপ্লবিক আয়োজন।  একে নাকচ করতে চাইলেও তা করা যাবে না।


     
    ছয়
     
    সুবিমল কলকাতায় হাংরি আন্দোলনের দায়িত্ব নেয়ায় আমার সুবিধা হলো। সেই সময়ে আমি তিনমাসের জন্য অফিসের কাজে কলকাতায় ছিলুম। যে বুলেটিনটার জন্য মামলা হয়েছিল সেটার লেখা সংগ্রহ করে দেবীকে দিয়ে পাটনা চলে এলুম। কোনো প্রেস ছাপতে চাইছিল না। শেষ পর্যন্ত প্রদীপ চৌধুরী একটা প্রেসে ছাপায়। আমাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়, সে কথা সন্দীপ দত্তের উদ্ধৃতিতে ওপরে বিস্তারিত দেয়া আছে। যখন মামলাটা শুধু আমার বিরুদ্ধে আরম্ভ হলো তখন সবাই পালালো, একমাত্র সুবিমল বসাক ছাড়া। ত্রিদিব মিত্রও ছিল কিন্তু ওকে সবাই উপেক্ষা করার ফলে ও আন্দোলন ছেড়ে দিলো। শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য নিজেদের উদ্বাস্তু গোষ্ঠির হাংরি ঘোষণা করে ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করল। আশ্চর্য যে সুবিমল বসাক ‘ছাতামাথা’ লিখেছিল উদ্বাস্তুর ভাষায় অথচ ওকেই ওরা বাদ দিয়ে দিল। ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকার কোনো সংখ্যায় সুবিমল বসাকের লেখা নিলো না শৈলেশ্বর-সুভাষ। সম্ভবত এই জন্যে যে আমার মামলায় আদালতের ব্যাপারে সুবিমল আমাকে নানা ভাবে সাহায্য করছিল। প্রতিটি বহসের আদালতের সার্টিফাইড কপি নিতে হতো, সেগুলো সংগ্রহ করা, যারা সাক্ষ্য দিচ্ছে তাদের জেরা রেকর্ড করা, সবই করতো সুবিমল। অন্য সবায়ের মতন দেবী রায়ও কেটে পড়েছিল।
     
    মামলার সময়ে খাওয়া-দাওয়া আর রাতে কোথাও মাথা গোঁজার সমস্যা ছিল কেননা তখনকার দিনে উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে থাকলে স্টিম ইঞ্জিনে টানা প্যাসেঞ্জারে চেপে আসতে হতো, যা নির্দিষ্ট সময়ে যাতায়াত করতো না এখনকার ইলেকট্রিক ট্রেনের মতন, যখন কিনা আদালতে সময়মতো পৌঁছোনো জরুরি । এখনকার মতন ভুটভুটিও ছিল না। খেতুম পাইস হোটেলে আর শুতুম শরদ দেওড়া নামের মারোয়াড়ির গদিতে। কোনো বন্ধু তাদের আস্তানায় রাতের বেলায় শুতে বলতো না।  এই সময়েও নির্ভর করেছি সুবিমল বসাকের ওপর। ওর জ্যাঠার বইঠকখানার স্যাকরার দোকানে শুয়েছি রাতে। জেঠার দমদমের বাড়ির দালানে গিয়েও শুয়েছি। অন্য বন্ধুরা কোনো খোঁজখবর নিতো না। সুবিমল এই সময়েও সাইক্লোস্টাইল করা বুলেটিন বের করে হাংরি আন্দোলনকে জিইয়ে রেখেছিল। 


     
    কলকাতায় ছাপানো কঠিন হওয়ায় দাদার এক বন্ধুর বহরমপুরের প্রেসে ছাপাবার ব্যবস্হা করা হয়েছিল। রিপন স্ট্রিটে একজনের কাছে বই-বুলেটিন-পত্রিকা পৌঁছে দিতেন ওনারা। আমি আর সুবিমল সংগ্রহ করে নিতুম। বহরমপুরে মণীষ ঘটক আমাদের দেখে আনন্দিত হয়েছিলেন আর আমাদের সমর্থনের জন্য অচিন্ত্য সেনগুপ্তকে একটা চিঠি লিখে দিয়েছিলেন। ‘জেব্রা’ পত্রিকার দুটো সংখ্যা বহরমপুরের প্রেসে ছাপা হয়েছিল। কয়েকবার আমি আর সুবিমল একসঙ্গে গেছি বহরমপুরে। মুর্শিদাবাদের খাগড়ায় ওর মামার বাড়িতে গিয়েও থেকেছি। একসঙ্গে গেছি বিষ্ণুপুরে সুবো আচার্যর বাড়ি, তখন ত্রিদিব মিত্রও ছিল আমাদের সঙ্গে। অনেকবার একসঙ্গে গেছি দুমকায় দাদার বাড়িতে , শেয়ালদা থেকে রামপুরহাট ট্রেনে আর রামপুরহাট থেকে বাসে। একবার বাস বন্ধ ছিল, আমাদের কাছে ট্যাক্সিতে যাবার টাকাকড়ি ছিল না, একজন ডাক্তার ট্যাক্সিতে একা যেতে ভয় পাচ্ছিলেন, তিনি আমাদের লিফ্ট দেন। ডেভিড গারসিয়াও গিয়েছিল দুমকা। দুমকাতে সুবো আচার্যও গেছে।
     
    আমার মামলা শেষ হবার পরে সুবিমল বিয়ে করেছিল আর বেলঘরিয়ার বাড়ি তৈরি করেছিল। ওর বেলঘরিয়ার বাড়িতে গিয়েও থেকেছি কয়েকবার। একটা সাক্ষাৎকারে সুবিমল বলেছে,  “বেলঘরিয়ায় আমি আসি ১৯৬৭ সালে। তার আগে অনেক আস্তানা বদল করে ডানলপ ব্রিজের কাছাকাছি অশোকগড়ে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম। অশোকগড়ের বাসা ছেড়ে বেলঘরিয়ায় চলে আসি। প্ল্যাটফর্মে ঘরখালি বিজ্ঞাপন দেখে স্টেশনের ধারে যে পাড়া পাই, বিবেকানন্দ নগর – বস্তি-কাম-পাড়া – তাতে বাসা নিই। তখনও জানা ছিল না, পাড়াটা বিহারের তুলনাতেও একটি ভয়ঙ্কর জায়গা। আশেপাশে স্বাধীনতা-উত্তর ওয়াগন ব্রেকার, চুল্লুঠেক এবং খুনেদের সমাহার। যে ঘরটায় আমি থাকতাম, তার উত্তরে খোলা মাঠ, এবং ওই মাঠে যে বহু লাশ গুম করা হত সেটা পরে টের পাই। রাতবিরেতে মাতালদের হল্লা, পুলিশের যখন-তখন আস্ফালন এবং ওয়াগন ব্রেকারদের রাজত্ব বিস্তার।” 
     
    আমরা একসঙ্গে নেপালে গিয়েও থেকেছি ঠমেল নামের এক পাড়ায়। আমি মাসদুয়েকের বেশি ছিলুম। বেনারসে গেছি দুজনে আর থেকেছি কাঞ্চন মুখোপাধ্যায়ের গ্যারাজের ওপরের ঘরে। একবার ‘ইলাসট্রেটেড উইকলিতে’ সাক্ষাৎকার দেবার জন্য কলকাতায় গিয়ে সুবিমলের বাড়িতে থেকেছি। আমি তো চাকরি থেকে সাসপেণ্ডেড ছিলুম বলে ছুটির সমস্যা ছিল না ; সুবিমল কেমন করে ম্যানেজ করতো কে জানে। দাদার কতো বন্ধু ছিল কলকাতায়, তারা দাদার পোস্টিঙের প্রতিটি জায়গায় গিয়ে থেকেছে কিন্তু কখনও দাদাকে আর আমাকে তাদের বাড়িতে রাতের বেলায় আশ্রয় দেয়নি।


     
    কমপিউটার শেখার ভালো সুযোগ ছিল সুবিমল বসাকের। ওর বড়ো ছেলের কমপিউটার কারবারে সুবিমল আর্থিক সাহায্য করেছিল । ওর ছোটো ছেলে কমপিউটার বিশেষজ্ঞ। আমি সত্তর বছর বয়সে পৌঁছে দুবার হার্ট অ্যাটাক, অ্যানজিওপ্লা্টি, হাঁপানি, উচ্চ রক্তচাপ, ভেরিকোজ ভেইনস, আরথ্রাইটিস সত্ত্বেও কমপিউটার শিখলুম, অথচ সুবিমল কমপিউটার শেখায় কোনো আগ্রহ দেখালো না। এমনকী ওর নাতি-নাতনিরা স্মার্টফোন ভালোভাবে হ্যাণ্ডল করতে পারে। কমপিউটার শেখার ফলে আমি ফেসবুক আর ইনটারনেটকে নিজের লেখালিখির  জন্য ব্যবহার করতে পারছি, গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি। কমপিউটার শেখা থাকলে, আমি কলকাতা ছাড়ার পর, এই কাজগুলোই সুবিমল করতে পারতো। সুভাষ-শৈলেশ্বরদের দ্বারা একঘরে হতে হোতো না। সুবিমলকে একঘরে করে দেবার প্রভাব ওর লেখালিখিতেও পড়েছে। নিজের গল্প-উপন্যাস-কবিতার চেয়ে বেশি অনুবাদের দিকে ঝুঁকেছে। তার ফলে সুবিমল বসাক মূলত পরিচিত হয়েছে অনুবাদক হিসেবে। ফণীশ্বর নাথ রেণু'র 'তিসরী কসম', প্রেমচন্দের গল্প সংকলন 'পঞ্চপরমেশ্বর', খাজা আহমদ আব্বাসের 'খুবসুরত' সহ অনুবাদ করেছে অন্তত ১৪টি গ্রন্থ, এ-পর্যন্ত। অবশ্য অনুবাদের জন্য সাহিত্য অকাদেমির পুরস্কার পেয়েছে। নিম্নবর্গের একটি সংস্হা সুবিমলকে সর্ম্ধনা দিয়েছে আর পুরস্কৃত করেছে। ২০১৫ সালে ভারত-নেপাল মৈত্রী সংঘ সুবিমলকে সম্বর্ধনা দিয়েছে।


     
    হাইকোর্টে পিটিশন দিয়ে আমি পাটনায় চলে গিয়েছিলুম, শরীর প্রচণ্ড খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে। উকিল আর ব্যারিস্টারদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল সুবিমল বসাক। ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়কে দেয়া ফাইলটাই সুবিমলের কাছ থেকে চুরি করে নিয়েছিল সুভাষ ঘোষ। হাইকোর্টে মামলা জিতে যাবার দলিলের সার্টিফায়েড কপি  সুবিমল কলকাতা থেকে এনে দিয়েছিল। আমি আবার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরিতে জয়েন করলুম। জয়েন করে বাকি টাকাটা পেয়ে হাইকোর্টের উকিল-ব্যারিস্টারদের দিয়ে এলুম। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে পচা-ছাতাপড়া-তেলচিটে বাতিল নোট কর্মীদের দিয়ে গুনিয়ে পোড়াতে হতো। টেনশানে হাই ব্লাড প্রেশার হয়ে গেল। পেচ্ছাপ দিয়ে রক্ত বেরোবার পর চার মাস রেগুলার ঘুমের ওষুধ খেয়ে ছুটিতে থাকতে বলল ডাক্তার। 
     
    চাকরিটা ছাড়ার সুযোগ খুঁজছিলুম। পেয়ে গেলুম অ্যাগরিকালচারাল রিফাইনান্স অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্ট করপোরেশানে, লখনউতে। এই চাকরিতে যোগ দিয়ে বুঝতে পারলুম যে ভারতের চাষবাস, পশুপালন, জলসেচ, তাঁত, হাতের কাজ, কৃষিমজুরের জীবন ইত্যাদি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। সুতরাং সাহিত্যের বই পড়া আর লেখা বন্ধ করে এই বিষয়গুলো নিয়ে পড়া আরম্ভ করলুম। ভারতের গ্রামে-গ্রামে ট্যুর করে বুঝলুম যে কৃষি-ব্যবস্হার কিছুই জানি না, গোরু-ছাগল কতোরকমের হয় জানি না, সারাদেশে পার্থক্য রয়েছে কতো তার কিছুই জানতুম না। আমার অধস্তন অফিসাররা হয়ে উঠলো আমার বন্ধু। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছাড়ার জন্য মাঝে-মাঝে আফশোষ হয়, কেননা ওদের পেনশান বাড়তে থাকে, আমার বাড়ে না। সরকারের মতে নাবার্ড, যাতে এআরডিসি মিশে গিয়েছিল, তা একটা গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্হা, তাই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সমস্তরের মাইনে আর পেনশন দেয়া যাবে না। বিয়ে করলুম, মহারাষ্ট্রের হকি খেলোয়াড়কে, যার সাহিত্যে তেমন আগ্রহ নেই, যদিও আমার খ্যাতিতে আগ্রহ আছে। দাদা অবসর নেবার পর কলকাতায় থিতু হয়ে ‘হাওয়া-৪৯’ পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করলে তাতে প্রথম উপন্যাস লিখলুম ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’। সুবিমলের মতন আমিও প্রথম দিকে নিজের জীবনের ঘটনা থেকে আহরণ করেছি উপন্যাসের মাল-মশলা।

     
    লখনউতে থাকতে উত্তম দাশ এসেছিল স্ত্রীকে নিয়ে। হাংরি আন্দোলন নিয়ে লিখতে চাইছিল। আমার কাছে যা কাগজপত্র ছিল ওকে দিয়ে দিয়েছিলুম। মহাদিগন্ত পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের কাগজপত্রের প্রতিলিপিসহ ওর লেখাটা প্রকাশ হতে শৈলেশ্বর-সুভাষ যে সমস্ত গল্প চাউর করেছিল তা ভণ্ডুল হয়ে গেল। শৈলেশ্বর একদিন সুবিমলের বাড়িতে গিয়ে বলল যে এখন মলয়ের এই সমস্ত কাগজপত্র প্রকাশ করা উচিত নয়। সুবিমল বুঝতে পারলো যে ওর কাছে যে সমস্ত নথিপত্র আছে সেগুলো এবার প্রকাশ করা দরকার। ঢাকার মীজানুর রহমান ওনার পত্রিকায় হাংরি আন্দোলন নিয়ে লিখতে বললেন, তাতে সুবিমলের আরকাইভের কাগজগুলো কাজে দিল। এই বইটার বেশ কয়েকটা সংস্করণ হয়েছে আর প্রতিবার সুবিমলের আরকাইভ আমাকে সাহায্য করেছে। হয়তো ওর ডাইরি থেকেও বহু তথ্য পাওয়া যাবে।
     
    তবে সুবিমলের একটা ধারণা ভুল। নব্বুই দশকে আমি আমার কলকাতা অফিসে বিভাগীয় প্রধান হয়ে ফেরার পর যখন সন্দীপন, দেবী রায়, শৈলেশ্বর, সুভাষ, প্রদীপের বাড়ি গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করেছিলুম তখন জানতুম না যে ওরা  রাজসাক্ষী হবার হীনম্মন্যতা থেকে বেরোতে পারেনি। সুবিমলের বাড়িও গিয়েছিলুম। ওদের সঙ্গে আর সুবিমলের সঙ্গে দেখা করাকে সুবিমল ভেবেছিল আমি হাংরি আন্দোলন রিভাইভ করতে চাইছি। আসলে আমি যে ইতিমধ্যে সাহিত্যের বাইরে প্রচুর পড়াশুনা করে ফেলেছি, ভারতের বহু গ্রামে ঘোরাঘুরি করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, তার হদিশ ওরা আর সুবিমল পায়নি। যাই হোক, আমার নতুন লেখালিখি নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সুবিমল নিজেই বলেছে যে আমার লেখার ধরন আর ভাবনাচিন্তা পুরো পালটে গেছে। বহু তরুণ আমাকে অনুরোধ করেছে যে হাংরি আন্দোলন আবার আরম্ভ করা হোক। তাদের বোঝাতে হয়েছে যে কোনও আন্দোলন সেই বিশেষ সময়ের ফসল ; তাছাড়া প্রযুক্তি এতো উন্নত হয়ে গেছে যে আর কোনো সাহিত্য আন্দোলন প্রভাবশালী হবে না।
    সাত
     
    ষাটের এলিট বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুবিমল বসাক আবির্ভূত হয়েছিল কাউন্টারকালচারাল ভাবুক হয়ে ।  নবারুণ ভট্টাচার্যের মতন সুবিমল অন্য মানুষদের জীবন থেকে অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেনি, করেছে নিজের নিম্নবর্ণ-নিম্নবর্গ জীবনের লাৎ খাবার অভিজ্ঞতা থেকে। নবারুণ ছিলেন অভিজাত বর্গের সন্তান, তাঁর বাবা আর মা ছিলেন বঙ্গসংস্কৃতির প্রতিনিধি। তিনি লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী এবং নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ছেলে। নে তিনি বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে ভূতত্ত্ব ও পরবর্তীতে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেন।। সুবিমল মিশ্রের মতন শিষ্যের দল ছিল না সুবিমল বসাকের। সুবিমল বসাকের বর্গে শৈশবে গায়ে চামউকুন হয়, চুলে জট পড়ে, নখে ময়লা জমে, ময়লা নখ নিয়েই ভাত-ডাল মাখতে হয়, রাস্তার কলে স্নান করতে হয়, দেনার দায়ে বাপ আত্মহত্যা করলে কৈশোর থেকে সংসার চালাতে হয়। তাই মধ্যবিত্ত জীবনে পৌঁছেও এলিটদের সংস্কৃতিতে ঢোকার অনুমতি পায়নি সুবিমল বসাক। আসলে, যে বিদ্যায়তনিক আলোচকরা এলিট সংস্কৃতির প্রডাক্ট, তাঁরা তাঁদের দোসরদের খোঁজ করেন পাল্প ফিকশানে, কেননা প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়া ছাড়া পাল্প ফিকশান শেকড় পায় না।



    সুবিমল বসাকের প্রথম গ্রন্থ ‘ছাতামাথা’, ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত। তাঁর অন্যান্য বই – হাবিজাবি(১৯৭০), গেরিলা আক্রোশ(১৯৭৪), আত্মার শান্তি দু’মিনিট(১৯৮৫), অযথা খিটক্যাল(১৯৮৭), বিয়ার গীত ও ঢাকাই ছড়া(১৯৮৭), কুসংস্কার ১৫৫(১৯৮৭), প্রত্নবীজ(১৯৯৬), ক্যাজুয়াল লিভ(২০০০), বকবকানি(২০০০), এথি(২০০১), কুট্টি(২০০৩), তিজোরীর ভিতর তিজোরী(২০০৫), গোপন দস্তাবেজ ও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত আত্মা(২০০৭), দুরুক্ষী গলি(২০১১), এখনও কোনো ব্যবস্থা হয়নি(২০১৪), বাইশকোপ-তেইশখোপ , খোলামকুচি,  রেণু, সেলাম রেণু,। এর মধ্যে ‘হাবিজাবি’ ও ‘বকবকানি’ এ দুটি কবিতা সংকলন।
     
    সুবিমল বসাক বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান অনুবাদক। তাঁর অনুদিত গ্রন্থগুলি হল – প্রতিবেশী জানালা(কবিতা সংকলন, ১৯৭৫), তিসরী কসম(ফণীশ্বর নাথ রেণু, ১৯৭৬), পঞ্চপরমেশ্বর(প্রেমচন্দের গল্প সংকলন, ১৯৮০), ফণীশ্বর নাথ রেণু’র শ্রেষ্ঠ গল্প(১৯৮২), দুই সখী(প্রেমচন্দের গল্প সংকলন, ১৯৮৪), জীবন সার(প্রেমচন্দের প্রবন্ধ, ১৯৮৫), উজ্জয়িনীর রাস্তা(শ্রীকান্ত বার্মার কবিতা সংকলন, ১৯৮৬), বোবাদের পল্লীতে(জগদীশ চতুর্বেদীর কবিতা সংকলন, ১৯৮৯), খুবসুরত(খাজা আহমদ আব্বাসের গল্প সংকলন, ১৯৯২), গোমুখ যাত্রা(শীলা শর্মা’র ভ্রমণকাহিনী, ১৯৯২), মোহন রাকেশ(প্রতিভা অগ্রবাল রচিত জীবনী, ১৯৯৩), হিন্দী কাহিনী সংগ্রহ(১৯৯৯), আমার তোমার তার কথা(যশপালের উপন্যাস, ২০০১), যাত্রিক(নীল পদ্মনাভন, ২০০২)।



    বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর বিভাগে সুবিমল বসাকের উপন্যাস অন্তর্ভুক্ত হলেও, সুবিমলের বইপত্রের আলোচনা কয়েকটা লিটল ম্যাগিন ছাড়া বিশেষ কোথাও হয়নি। অলোক গোস্বামী তাঁর ‘মেমরি লোকাল’ বইতে লিখেছেন,  “সুবিমল বসাকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বহু বহু বছর  পেরিয়ে। সুবিমল অসাধারণ কিছু গদ্য এবং কবিতা  লেখা সত্বেও ওঁর বন্ধুদেরই  কখনও দেখিনি ওঁকে গুরুত্ব দিতে। কেন ওই উপেক্ষা, বলতে পারব না। হয়ত মলয়  রায়চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলার অপরাধে। মলয় ছুঁলে আঠেরো ঘা।” 
     
    সত্যিই, শৈলেশ্বরদের ‘ক্ষুধার্ত’, ‘ক্ষুধার্ত খবর’ , সুভাষ ঘোষের ‘আর্তনাদ’, প্রদীপ চৌধুরীর ‘ফুঃ’ আর উত্তরবঙ্গের ‘জিরাফ’, ‘রোবোট’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’ ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’, সব্যসাচী সেনের ‘কারুবাসনা’ , স্বপনরঞ্জন হালদারের ‘বাঘের বাচ্চা’ ইত্যাদি পত্রিকাগুলো হাংরি আন্দোলনকারীদের হলেও, সেগুলোতে সুবিমল বসাকের কোনো বই আলোচিত হয়নি। প্রদীপ চৌধুরী  'স্বকাল' আর 'ফুঃ' নামে ত্রিভাষিক ( ইংরেজি, ফরাসি ও বাংলা ) পত্রিকা সম্পাদনা করতো আর ফরাসি কবিদের প্রাধান্য দিতো। শঙ্খ ঘোষের ছত্রছায়ায় থাকার ফলে ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকার সাতটা সংখ্যা সাহিত্য অকাদেমি থেকে সংকলন হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল ; আমি ওদের বিপদে ফেলেছিলুম কবিতা লিখে, কিন্তু সুবিমল বসাককে বাদ দেবার তো কারণ ছিল না। হ্যাঁ, একবার সতীনাথ ভাদুড়ী প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে সুবিমল বসাকের কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। দে’জ থেকে যে হাংরি জেনারেশন সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, তাতেও সুবিমল বসাকের কোনো লেখা নেই, ওই একই কারণে হয়তো !


     
     সুবিমলের বই সম্পর্কে আলোচনার দু’একটা থেকে অংশ তুলে ধরছি এখানে :
     
    ফালগুনী রায় সুবিমল বসাক-এর 'হাবিজাবি' বইয়ের সমালোচনায় লিখেছিলেন -

    "২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা আন্দোলনে শহিদেরা সুবিমল বসাকের মতই প্যান্ট-শার্ট বা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ছিলেন, বাংলা ভাষার জন্যে নিহত না হলেও সুবিমল শহিদ হয়েছিলেন বাঙাল ভাষার জন্যে -- অর্থাৎ মসী, অসি অপেক্ষাও শক্তিশালী এই প্রবচনের সূত্র ধরে বলা যায় কলকাতার অ্যাকাডেমিক অধ্যাপক বা আধুনিক কবি কেউ-কেউ বাড়িতে যারা মা'র সঙ্গে বাঙাল ভাষায় এবং কলেজে কফিহাউসে খালাসিটোলায় বা বেশ্যার সঙ্গে ক্যালকেশিয়ান ডায়ালেক্টে কথা বলেন --- তাঁরা সুবিমলের ভাষারীতিকে প্রচণ্ড আক্রমণ করেন--- কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারির শহিদরা যেমন একই সঙ্গে শ্রদ্ধেয় সেইমত সুবিমল বসাকও শিক্ষিত কবি-সাহিত্যিকদের উপহাস-গালাগালের গ্লোরিকে ম্লান করে দিয়ে একই ভাষারীতিতে লিখে চলেছেন (১৯৬৪ থেকে)--- লিখে চলবেন।

    সুবিমল গদ্য লেখেন এবং কবিতাও --- সুবিমল রবীন্দ্রনাথের মত দাড়ি রাখেন না কিন্তু টাইপমেশিনের সাহায্যে অই ভদ্রলোকের একটা প্রতিকৃতি তৈরি করেছিলেন ছাত্রাবস্হায়--- দেখেছিলুম। সুবিমল রবিঠাকুরের মত গান বা নাটক লেখেননি কোনোদিন, সো হোয়াট ? রবীন্দ্রনাথ না থাকলে সুবিমল লিখতেন কি ? বিশেষত বাঙাল ভাষায়, উপরন্তু যখন দু'বাংলাকে কেন্দ্র করে পাবলিশাররা তাদের পড়ে যাওয়া মার্কেটকে পুনরায় তোলবার চেষ্টা করছে, তখন লক্ষ্য করে দেখুন, সুবিমলের 'বাংলাদেশ' নামে বাঙাল ভাষায় লেখা লিফলেটটিতে কত কম বঙ্গবন্ধু বা বাংলা-দেশ-এর রেফারেন্স।

    আরশির ওই পারে ফুটছে শয়তানের চ্যারা
    ফিরে-ফিরে প্রতিশোধ লিতে তেইড়্যা আহে
    আমার উল্টাহান'ই আমি নিত্যি দেহি আরশিতে

    ---মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যিনি বাঙালি খ্রিষ্টান ছিলেন, তিনি রাবণের ভেতর দেখতে পেয়েছিলেন --- আপন আত্মার ছায়া --- অনুরূপভাবেই সুবিমল ভগবান-বন্দনা করেননি--- শয়তানের ভেতর দেখেছেন নিজস্ব প্রতিবিম্ব--- কিন্তু এর ফলে যদি কেউ বলে, আর দেখতে হবে না --- ও শালা নিশ্চয় মধুসূদন দ্বারা প্রভাবিত, তখন ত্রাহি মধুসূদন ডাক ছাড়া গত্যন্তর আছে কি ? উপনিষদেও বলা হয়েছিল তিনি আছেন --- রবীন্দ্রনাথও বুঝে ছিলেন ব্যাপারটা--- রবীন্দ্রনাথও কি উপনিষদের চর্বিতচর্বণ ? ব্যাপারটা বলতে হল এই কারণে যে আধুনিক গদ্য-পদ্য'র আন্দোলন-এ (সত্য গুহ লিখিত) পট করে লিখে দেয়া হয়--- অমুক-অমুক কবিরা তমুক-তমুক কবিদের চর্বিত চর্বণ করে কবিতা লিখে চলেছেন। কবিতা লেখা ব্যাপারটা নোট মুখস্হ করে এম.এ. ডিগ্রি পাওয়ার মত সহজ নাকি, যে আশুবাবু গোপালবাবু সুকুমারবাবু ইত্যাদির থিওরি-থিসিসের চর্বিত চর্বণ করলেই বভিষ্যতে অধ্যাপক হওয়া বা হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুলে বাংলা পড়ানো যাবে।

    সুকুমার টের পেয়েছেন--- ব্যর্থতা নিয়া থাকায়ও কারু-কারু সার্থকতা... হেজেহুইতে ট্যার পাই --- কতো-কতো ব্যাপারে ম্যায়ালোকেরে কাৎ কইরা ফেলে বাজারের মাগি। সুবিমল দেখেছেন---
    এই শহরের মাগিদের কোঠায় দেহি সরকারি 'নিরোধ'এর বিজ্ঞাপন
    কালোবাজারের খয়রাতি দানে না-জানি কতো মন্দির তৈয়ার হইতাসে
    এই কিনারে বোমা পরীক্ষা --- আরেক কিনারায় হাসপাতাল”
    সুবিমল লিখেছেন---
    সুখি মানুষেরা একতলা দুইতলা কইরা  উইঠ্যা যায় উপরে
    হাতের লাগল থাকে ম্যায়ামানুষ চেনবান্ধা কুত্তা, আদালতের আইন-কানুন
    এভাবে সুবিমল যা-কিছু টের পেয়েছেন দেখেছেন সবকিছু লিখে রেখে গ্যাছেন, এমন কি শেষ কবিতার প্রথম দুই লাইন---
    ভিয়েৎনামের উপর আমারিকার যুদ্ধনীতি সবরাষ্ট্রের অসমর্থন
    অহনই শোওনের তোড়জোড় করতাসো, রাত্র হপায় পড়লো--

    এভাবেই বাংলাদেশ আন্দোলনের জোয়ার আসার আগে থেকেই পদ্মাপারের ছেলে সুবিমল দ্যাশের ভাষায় গদ্য লিখে বিদেশে পরিচিত হয়ে গেছে, এখন আমরা যারা খুব বাংলাদেশ নিয়ে লেখালিখি মাতামাতি সভাসমিতি করি, তারা যদি সুবিমল-এর ভাষারীতিকে আক্রমণ করি বা এ-সম্পর্কে উদাসীন থাকি তবে সেটা একটা পাপের পর্যায়ে গিয়ে পড়বে...

    অধ্যাপক অলোক রায় লিখেছেন :

    “সুবিমল বসাকের প্রথম উপন্যাস বা গদ্যন্যাস ছাতামাথা (১৯৬৫) আমি পড়িনি। দ্বিতীয় উপন্যাস প্রত্নবীজ (১৯৯৬) কয়েক বছর আগে ছাপা হলেও সদ্য আমি পড়বার সুযোগ পেয়েছি। উপন্যাস, কিন্তু আদৌ অবসর-বিনোদনের সামগ্রী নয়। পড়ে চমকে উঠতে হয়। কারও ভালো লাগবে, কারও লাগবে না, এটাই স্বাভাবিক। তবে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। একটা প্রবল আলোড়ন তোলা সম্ভব। অথচ সেভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। এটাই বিস্ময়কর। অথবা বিস্ময়ের কিছু নেই। প্রত্যেক বছর বাংলায় যে একশো-দেড়শো উপন্যাস বেরোচ্ছে, তার নিশ্চয় বিশেষ একজাতের ভোক্তা আছে। তাঁরা প্রত্নবীজ পড়তে উৎসাহ বোধ নাও করতে পারেন।

    “প্রত্নবীজ-এ প্রচলিত উপন্যাসের নিটোল কাহিনীবৃত্ত প্রত্যাশা করে লাভ নেই। সুবিমল বর্তমানের ঐতিহাসিক, তাই তাঁর রচনায় কিছুটা সাংবাদিকতার ধরন এসেছে। পনেরোটি পরিচ্ছেদে মহল্লের নানা ধরনের মানুষ এসেছে। কারও জীবনের আদ্যন্ত কাহিনী বর্ণন লেখকের উদ্দেশ্য নয়। হয়তো ন'বছরের খোকার চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে বলে তাকে কাহিনীর যোগসূত্র বলা যেতে পারে। কিন্তু সব জায়গায় সেও নেই, বা তার চোখ দিয়ে সব কিছু দেখাও হয়নি। বুধনি কিংবা ফেকন কিংবা বুলকনকে নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোটগল্প রচনা সম্ভব ছিল। কিন্তু সুবিমল বসাকের ঝোঁক ব্যক্তিচরিত্র নয়। অশীন দাশগুপ্ত যাকে বলেন ব্যক্তিসময়, তার ব্যবহার সেভাবে ঘটে না। বড়সময়ের উল্লেখ দুএক জায়গায় আছে, কিন্তু কালনির্দেশ কাহিনীকারের উদ্দেশ্য নয় -- "এক জমানা ছিল, যখন অংগ্রেজ সরকারের খুফিয়াসিআইডিরা তার ওপর নজরদারি করত। কত লাখো-লাখো নওজয়ান তাঁর গানা শুনে সুরাজি দলে ভিড়ে্ছে, ভারি রকম চাঁদা দিত সুরাজি দলে।" ছোটসময় নিয়েই প্রত্নবীজ-এর কথাকারের কারবার। তাই 'তাড়ি নয় বৈশাখি', বাতাসিয়ার শাদির প্রস্তুতি থেকে গৌনা, মাঝে-মাঝে রঙিন ফেরিওয়ালা, হালওয়াইয়ের নজারা, তেল মালিশ, অখাড়াবাজি, মাদারিঅলার করিশমা -- এই সব নিয়ে মহল্লার বিচ্ছিন্ন চিত্রের মধ্য দিয়েই পূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। উৎসব-অনুষ্ঠান বর্ণনার মধ্যে কাহিনীর ভাবৈক্য সন্ধান করলে একেবারে ভুল হবে না।

    “বছরভর কত তোহার-পরব-- ছট, কার্তিক পূর্ণমাসি, দশহরা, দিওয়ালি, পুষ-সংক্রান্তি, হোলি, তীজ, কর্মা, বৈশাখি, গোবর্ধনপুজা, চিত্রগুপ্তপুজা -- এছাড়েও সৎনারানজীর কথা, অখণ্ড সংকীর্তন। কিন্তু হোলি আর দিওয়ালির মতো এমন জমকালো পরব নেই। দশহরাও তেমন করে মানায় না। হোলি হচ্ছে বসন্ত ঋতুর পরব-- জওয়ানি ও মিলনের উৎসব; দিওয়ালি হলো রোশনাইয়ের, লছমি-পুজন। গোবর্ধনপুজা -- গোয়ালা আহিররা করে, বিপৎ গোপের অখাড়ায় খুব ধুমধাম করে উৎসব মানায়, পুজাপাঠ, গানা-ঢোলক, কুস্তি-দাঁও-পেঁচের নুমাইশ চলে। চিত্রগুপ্তপুজা -- দিওয়ালির পর স্রেফ লালা-কায়েতরা। এই দিনে লালারা কোনো লিখা-পঢ়ির কাম করে না, কলম ছোঁয় না। লাখ জরুরত থাকলেও এক অক্ষরও লিখবে না-- মানিঅর্ডার, কর্জ-পর্চা, ডাক্তারি নুস্খা--- কোথাও না। ছট পরব চলে মাহিনা ভর; সুরজ দেওতার পূজা, গঙ্গার কিনারে অস্হায়ী ঝোড়ি। খুব নিয়ম আচার।

    “হোলি আর দিওয়ালির কাহিনীরূপ সুসম্পূর্ণ। বিহারিদের জীবনচিত্র অবলম্বনে সাংবাদিক অসামান্য সংবাদ-বিচিত্রা রচনা করতে পারেন। কিন্তু সুবিমল বসাক সাহিত্যিক --- তাই নিরুদ্দেশ সংবাদ বা চমক সৃষ্টির প্রয়োজন খাসখবর রচনা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। তিনি অঞ্চলকে অবলম্বন করে অঞ্চলের মানুষ, অঞ্চলের মানুষকে অবলম্বন করে আশাআকাঙ্খাময় জীবনের গভীর সত্যকে ধরতে চান।”

    সুবিমল বসাকের ‘বিয়ার গীত ও ঢাকাই ছড়া’ সম্পর্কে ঢাকার মীজানুর রহমান লিখেছিলেন:

    ‘’এই বিরাট মাপের কাজটি আমাদেরই করার কথা, আপনি কাজটি করে আমাদের স্মৃতি উসকে দিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রত্যন্ত এলাকায় এখন মাইকেল জ্যাকসন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে’। 
    মীজানুর রহমান তাঁর ত্রৈমাসিক পত্রিকায় পুরো বইটি ছেপেছিলেন। 

     ‘দুরুক্ষী গলি’  নামে একটা উপন্যাস লিখেছে সুবিমল বসাক, ওর আত্মজীবনী, তাতে সোনার গয়না যে কতো ধরণের হতো আর তাদের বিস্ময়কর নাম ছিল, তা ওর ‘দুরুক্ষী গলি’ পড়ে জানা যায়। আমার মনে হয় এটা ওর সেরা উপন্যস, ধরা পড়ে আর্থসাংস্কৃতিক আর ঐতিহাসিক যুগলক্ষণ, আর সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হতে-থাকা আত্মনির্ভর স্যাকরাদের ইতিহাসও বটে। পুঁজিবাদী স্বার্থের নিরিখে যখন সাহিত্যিকদের খ্যাতি বিবেচিত হচ্ছে, তখন বঙ্গসংস্কৃতিতে হঠাৎ ঢুকে পড়া ব্যাণ্টামওয়েট মুষ্ঠিযোদ্ধার আদলে ময়লা এক যুবক নিজের লেখালিখিকে নিয়ে গিয়েছে কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটির বাইরে। দুরুক্ষী গলিতে ছিল পাটনা শহরের স্বর্ণকারদের দোকান যেমন এখন আছে পুরোনো ঢাকার তাঁতিবাজারে।


     
    অজয় সেন সুবিমল বসাকের 'হাবিজাবি, বকবকানি ও খোলা জানলা' নিয়ে লিখেছেন :
    সুবিমল বসাকের সাথে প্রথম আলাপ কলেজ স্ট্রীটের 'বিভূতি কেবিনে'। সেখানে শৈলেশ্বর, বাসুদেব, সুভাষ অনেকেই আসত, কাছাকাছি কফিহাউস থাকা সত্তেও 'বিভূতি কেবিন' তাদের অনায়াসে সাঁতরানোর জায়গা ছিল।১৯৬৩-৬৪-এর ওই  আড্ডাখানায় শুনতাম বেশি, লক্ষ্য করতাম বেশি হাংরির নব্যযুবকদের, এদের মধ্যে আমার কাছে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিল বাসুদেব দাশগুপ্ত ও সুবিমল বসাক। পরে সুবিমলের সঙ্গে অন্তরঙ্গতার কারণে এক ধরণের ভালোলাগা জন্ম নিয়েছিল, বলা বাহুল্য, আজও যা চিড় খায়নি এতটুকু। ওর অফিসে গিয়ে অনেক দিন অনেক সময় কাটিয়েছি, ডিপার্টমেন্টের প্রত্যেকটি কর্মচারীর নাম. কে কি রকম, কার কি দুর্বলতা, কি কি গুণ খুঁটিনাটি আমাকে সে বলত নিচুস্বরে, চা খেতে-খেতে এই সব গল্প হত আমাদের। আর যে আলোচনার মধ্যে এসব কিছুই থাকত না, তা হল লেখালিখি। সে নিজেরই হোক বা অপরেরই হোক। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত তরুণদের লেখালিখি সুবিমল বেশ মনোযোগ দিয়েই পড়ত, যেটা আমার তাকে ভালো লাগার কারণ। কে কোথায় একটা ভালো লেখা লিখেছেন, সেই লেখার সমালোচনা করে ভালো কি মন্দ অনায়াসে জানিয়ে দিত। আমার লেখা যে সে পছন্দ করে তা প্রথম দিন আলাপের পরই জানিয়েছিল, অবাক হয়েছিলাম বেশ খানিকটা। মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম এই কারণে সদ্য লিখতে আসা নব্য যুবককে উৎসাহ ও প্রচ্ছন্ন সাহস যোগানোর জন্য।

    সুবিমল বসাক প্রকৃত অর্থে ছাই-চাপা আগুন। সে সময় হাংরি আন্দোলন ঝড় তুলেছিল দেশে তো বটেই, বিদেশেও তার ঝাপটা লেগেছিল, সে সময় পুতু পুতু রক্ষণশীলরা চেঁচামেচি শুরু করেন, ফলতঃ শ্লীল-অশ্লীল সাহিত্য রচনা করেছেন, সমাজের ভেজানো দরোজা একের পর এক খুলে দিচ্ছেন, তাদের এসব উদ্যম চিন্তাভাবনা ভালো লাগেনি প্রশাসন এবং এক শ্রেণীর ব্যাঙদের কাছে, ফলতঃ ধরপাকড়, হাজতবাস, কোর্টকাছারি অমোঘ হয়ে নেমে আসে হাংরি আন্দোলনের কবি-সাহিত্যিকদের ওপর। এদের মধ্যে অনেকে,( যেমন শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ ) মুচলেকা দিয়ে দেন, ভাবটা এমনই যে ওপাড়ায় আমি নেজে যাইনি, আমাকে ওরা নিয়ে গেছিলো। সুবিমল ও অন্য কয়েকজন নিজেদের মতই লেখালিখি করে গেছেন। কাউকে, কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করেই। সুবিমলের লেখার মধ্যে একটা প্রাদেশিক সাযুজ্য লক্ষ করি। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ যেমন লিখেছেন, পাশাপাশি প্রাদেশিক কবিতা অনুবাদ এবং জীবনীগ্রন্হ রচনাতেও মাহিরিআনা দেখিয়েছেন। দুটো উপন্যাস, ছয়টি গল্প-গদ্য সংগ্রহ, দুটি কবিতার নিজস্ব চটি বই।প্রবন্ধ অনুবাদ করেছেন অনেক। অনুবাদ সাহিত্যে ২০০৭ সালে যশপাল রচিত অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত সুবিমল। যদিও তা অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল।

    সুবিমল বসাকের লেখালিখি --- প্রথম কবিতার বই 'হাবিজাবি' যখন প্রকাশিত, তখন হাংরি আন্দোলন তুঙ্গে। অধিকাংশ কবিতা ওই সময়ের লেখা, মনে হয় নিজের সম্পর্কে ভাবনা, সমাজের উঠোনে নিজেকে নগ্ন করে খতিয়ে দেখা, নিজের পরিবেশকে খুঁড়তে-খুঁড়তে নিজের সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ, ভাবনা আবিষ্কার করা। ফলতঃ কবিতাগুলোয় প্রেম-অপ্রেম, ভালোবাসা-ভালোবাসাহীনতা, চোরাস্রোতের মত চিন্তা, ঈর্ষা, স্নেহ, জীবন-পারাপার-ভাবনা, দুঃখকষ্ট, অবজ্ঞা-উপহাস, হতাশা, চিল-চিৎকার যাবতীয় ব্যাপার উঠে এসেছে ওই কবিতাগুলির মধ্যে।
    আমি কবিতা পড়তে ভালোবাসি। কবিতার প্রতি আমার যথেষ্ট দুর্বলতা আছে, তো যেটা লক্ষ করি, 'হাবিজাবি' কবিতার বইয়ের মধ্যে, তা হলো ভাষা। সুবিমলের কথায় --- আমার মায়ের ভাষা। পূর্ববাংলার ভাষা তো মাটির ভাষা। এখন লক্ষনীয় 'মা' কোন অর্থে? দেশ-মা না গর্ভধারিণি-মা ? এক অদ্ভুত দেশজ কধ্য ভাষায় এরকম লেখা আমি কখনও পড়িনি। বাংলা সাহিত্যে কবিতার জগতে সুবিমল পাথ-ব্রেকিং।



    ১৯৭০ থেকে ২০০০ সালে প্রায় তিরিশ বছর বাদে দ্বিতীয় কবিতার বই 'বকবকানি'। মোট চব্বিশটি কবিতার চটি বই। রাজনীতি, ব্যাঙ্গ, যৌনতা, দার্শনিক স্ট্রিট রিয়্যালিটির পাশ কাটিয়ে এক মানভাষার আকুতি। 'বকবকানি' সে-অর্থে এক সার্থক দলিল। অবশ্য হাংরি আন্দোলনের বাঁকবদল ছিল উত্তরঔপনিবেশিক এপার-বাংলার ফসল। সমাজ তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় যে জীবনবোধ গড়ে দেয়, তা থেকে এই মোড়বদল আলাদা করা যায়। কবিতা ছাড়াও সুবিমল বসাক অত্যন্ত নিপুণভাবে গদ্য রচনা করেছেন; গদ্য সংগ্রহ যে কয়টি হাতে পেয়েছি, ইতস্তত পত্র-পত্রিকায় পড়েছি, মনে হয়েছে সুবিমল আরও গদ্য লিখতে পারতেন। তবে তিনি যে একজন সফল গদ্যকার এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি হিন্দি কবিতার সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেন 'প্রতিবেশি জানালায়'। অনুবাদ সাহিত্যেও সুবিমল যে মাহির তা বলাই বাহুল্য।

    সুবিমল বসাক ঢাকায় গেছিলেন তাঁদের পৈত্রিক বাড়ির আশে-পাশে যে-সব বুজুর্গরা থাকতেন, তাঁদেরই সান্ধ্য আসরে তাঁদের অনুরোধে লুপ্তপ্রায় এক প্রাচীন শিল্পকলাকে তুলে ধরেছেন। ঢাকার হিন্দু বাঙালিদের 'বিয়ার গীত' ও 'ঢাকাই ছড়া' সংকলনে। খাস কলকাতায় বছর তিরিশ পূর্বেও বিবাহ উৎসবে এসব গানের প্রচলন ছিল, ক্রমশ হ্রাস পেতে-পেতে এসব গান আজ আর কোনো বিবাহ অনুষ্ঠানে শোনা যায় না, হয়তো আর্থ সামাজিক, শহুরে মানসিকতার সঙ্গে খাপ খায়নি, দ্বিতীয়ত এসব গানের উত্তরসূরী তাঁরা রেখে যাননি, তবু এখনও গ্রামাঞ্চলে কোনো প্রাচীনা, বিবাহ উৎসবে আনন্দে উত্তেজনায় গুনগুন করে গেয়ে উঠছেন এই সব গান।তা সুবিমল বসাকের অবদান।

    হাংরি আন্দোলনের পুরোধা সুবিমল বসাক প্রকৃত অর্থে বহু বিচিত্র শিল্পগামী। এখনও তাঁকে লিখে যেতে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করি। তার কারণ তিনি জানেন এমন গদ্য অথবা কবিতা নেই--- যা পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ঠাণ্ডাযুদ্ধও থামিয়ে দিতে পারে --- তাই সুবিমলকে অনুরোধ--- লিখুন, আরও লিখুন। থামিয়ে দিন পৃথিবীর ঙাণ্ডাযুদ্ধ ও উলঙ্গ বিবাদ।

    ধুর্জটি চন্দ 'সুবিমল বসাকের উপন্যাস ছাতামাথা সম্পর্কে লিখেছেন :

    “গত শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে যে-উল্লেখযোগ্য আন্দোলনটির প্রভাবে সারা বাংলা তথা ভারতবর্ষ আলোড়িত হয়েছিল, যার ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আজও, সেই হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট-এর অন্যতম শরিক সুবিমল বসাক, একজন সুচারু ভাষাশিল্পী, একথা আজ অবশ্যমান্য।

    'ছাতামাথা' নামে একটি অনন্যসাধারণ গ্রন্থের প্রণেতা তিনি। প্রকৃতপক্ষে এই গ্রন্হপাঠে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। বস্তুত আলজিভ দিয়ে লেখা উপণভাসের স্বাদ গ্রহণে আমার জিভ অনভ্যস্ত। উল্লেখযোগ্য, গ্রন্হটি আগাগোড়া পূর্ববঙ্গের ভাষায় লেখা। মুখে-মুখে ডায়ালেক্ট ব্যবহার করা হয়ে থাকে সেই ভাষায়। এই গ্রন্হ আঞ্চলিক ভাষায় লেখা হয়ে থাকলেও আঞ্চলিক নয়। প্রমথ চৌধুরীর পর বাংলাদেশে গদ্য সাহিত্যে কমলকুমার মজুমদার এবং তারপর সুবিমল বসাক এক নতুন জোয়ার আনলেন। তাছাড়া এ-যাবৎ অনেক উপন্যাসই লেখা হয়েছে যা কিনা আঞ্চলিক উপন্যাস নামে অভিহিত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হাঁসুলিবাঁকের উপকথা', 'নাগিনীকন্যার কাহিনী'; সতীনাথ ভাদুড়ির 'ঢোঁড়াই চরিতমানস', অমিয়ভূষণ মজুমদারের 'গড় শ্রীখণ্ড' ইত্যাদি। কিন্তু আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা সত্বেও এই গ্রন্হ যে ক্ষুদ্র অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এক আধুনিক, অভূতপূর্ব সার্থক উপন্যাস হতে পেরেছে তা সুবিমলের পাওয়ার অফ অবজারভেশন ও বুদ্ধিকে মগজ থেকে গোড়ালিতে আনার এক মহৎ ফলশ্রুতি।



    “আরো আশ্চর্যভাবে লক্ষ করা যায় --- এখানে সংলাপ চলিত ভাষায় ব্যবহার করছেন এবং ভাষা-ভূমি পূর্ববঙ্গের। মৃনাল সেনের ভূবন সোম হিন্দিতে কথা বলেছেন বটে, কিন্তু যখনি তিনি চিন্তা করেছেন ভিতরে-ভিতরে, আমরা ভুলি না ভূবন সোম বাঙালি চরিত্র। আমার শরীরে ঢাকার নীল রক্ত থাকা সত্বেও সুবিমল বসাকের এই গ্রন্হপাঙে আমাকে বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে। যারা এই দেশীয়, পূর্ববঙ্গীয় নন, তাঁদের পক্ষে এগ্রন্হ উদ্ধার করা শ্রমসাপেক্ষ। এ-গ্রন্হ চলিত ভাষায় লেখা হলে আরও বেশি পাঠক রসগ্রহণে সক্ষম হতেন এবং আধুনিকতা সম্পর্কে সচেতন হতেন বলে আমার বিশ্বাস। সর্বোপরি, বলা যায়, এই গ্রন্হপাঠে এক অদ্ভুত জগতের আবিষ্কার হয়।

    “আটটি অংশে বিভক্ত এই গ্রন্হটিকে উপন্যাস নামে অভিহিত করা হয়েছে। উপন্যাস বলে এতদিন আমরা যা বুঝে এসেছি, এ গ্রন্হ তা নয়। এর প্রত্যেকটি অংশই খাপছাড়া। ১নং গদ্যের সঙ্গে ২নং গদ্যের কোনো মিল নেই, ২নং গদ্যের সঙ্গে ৩নং, ৩নং এর সঙ্গে ৪নং গদ্যের কোনো মিল নেই, এই খাপছানো ভাব এই গ্রন্হে আগাগোড়া। অথচ একটি যোগসূত্র এই গ্রন্হের নায়ক 'আমি'। এই 'আমি'কে কেন্দ্র করেই সুবিমল দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে চিতায় শুয়ে মুখাগ্নিরত শোকাতুর হাতকে কামড়ে ধরতে হয়।

    “এর নায়ককে দেখি গোঁয়ার, গবেট, একমুখী, অভিমানী, সেন্টিমেন্টাল -- যে বিহ্বল, বিমূঢ় হয়ে গেছে সমাজের ব্যবহারে, মানুষের ব্যবহারে, বন্ধুবান্ধবীর ব্যবহারে। কখনও সে ক্রোধে ফেটে পড়ছে,  কখনও নিজের ভুলের জন্য হাত কামড়াচ্ছে, হাঁটু মুড়ে ক্ষমা চাইছে, কখনও বা ক্ষুব্ধ হচ্ছে। যা চাইছে তা ঘটছ না, যা ঘটছে তা কখনওম করেনি, বিচার হওয়ার পূর্বেই সে অপরাধী বলে প্রমাণিত, অথচ কিসের অপরাধ তা সে জানে না। এই ধরনের নেপথ্য কাহিনী আজও দেখতে পাই। সুবিমলের এই গ্রন্হ পড়তে-পড়তে মাঝে-মাঝে আমার মনে হয়েছিল যে এই পৃথিবীটা ট্যান্টালাসের নরক।( গ্রিক পুরাণে ট্যান্টালাস নামে এক রাজার কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে। দেবতার অভিশাপে তিনি পাতালে নিক্ষিপ্ত হলেন। সেই পাতালে থেকে তিনি ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। অমনি তার চোখের সামনে নানাবিধ ফলমূল ঝুলিয়ে ধরা হল। তিনিও অমনি হাত বাড়ালেন। কিন্তু আশ্চর্য! সঙ্গে-সঙ্গে ফলমূল উধাও হল।ঝরণার বারি দেখে তিনি হাঁ করলেন। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে তাও অদৃশ্য হল।এই ভাবে ট্যান্টালাস ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তিলে-তিলে মারা গেলেন। গ্রিক পুরাণে এটাকেই ট্যান্টালাসের নরক বলা হয় ) বাস্তবিকই তা। যাদের শরীরে এখনও আলপিন গেঁথে গেলে যন্ত্রণা হয় ----- অর্থাৎ চামড়া এখনো মোটা হয়নি ----- তারা প্রত্যেকে প্রতি মুহূর্তে এর সত্যতা উপলব্ধি করেন। কাজেই এটা স্বাভাবিক, সুবিমল ভিক্টিম।জন্মের পরমুহূর্ত থেকে একটি শিশু যেমন ট্র্যাপের ভিতর সেঁধিয়ে পড়াছে ----- এবং সে জানে না তাকে কে কোনদিক থেকে ঠেসে ধরতে চায়। যেমন 'তুলো জানে না তাকে কোন রঙে ছুপিয়ে কার দলের পতাকা করা হবে'।

    'ছাতামাথা-র কোনো-কোনো অংশ জার্কিঙের কাজ করে। মগজকে চমকিত করে তোলে। পড়তে-পড়তে হাত বুকের ওপর চলে আসে। দীর্ঘশ্বাস বের হয়। Contemplation is engulfed by action, যারা এ-ধারণা পোষণ করেন, সুবিমলের এই গ্রন্হ তাদের মগজ ধোলাই করতে সাহায্য করবে। Contemplation এবং Actionকে সুবিমল সব্যসাচীর মত কাজে লাগিয়েছেন। ৪নং অংশে যে-ভয়ংকর মুহূর্তের বিশেষ অবতারণা করেছেন --- জীবনে যে-সব ভয়াল পরিণতি অধবা পরিণতির সেই সব ভয়াল মুহূর্ত --- অর্থাৎ মুহূর্ত-বিশেষের পরিবেশ, সেই সব ঘটনা জীবন থেকে বিতাড়ন অসম্ভব।শরীরের চামড়া থেকে গর্ভের গন্ধ সরানো সম্ভব নয়, এবং এরই ধাক্কায় ফেটে পড়ে নানান বোধ --- নিঃসন্দেহে এক নতুন ও ভয়ংকর লেখা। কিংবা ৭নং অংশের লেখা। এধরণের লেখার সঙ্গে পূর্বে কেউ পরিচিত ছিলেন কি না আমার জানা নেই। সুররিয়্যালিজম আন্দোলনে 'অটোমেটিক রাইটিং' -এর প্রচলন ঘটেছিল। এই অংশ সেই বিশেষ লেখন-প্রক্রিয়াকে মনে করিয়ে দেয়। মানুষের টোটালিটি অর্থাৎ একজন মানুষের ভিতর যা থাকে --- ব্যক্তিগত লোভ, হিংসা, মোহ, প্রজানীতি, আতঙ্ক, কপটতা, ভালবাসা, উন্মাদনা, ট্রিকস, ধর্মবোধ, ল্যাং মারামারি, উদারতে, মিননেস, সাধুতা, ছ্যাঁচড়ামি, ঈর্ষা, সাফোকেশান ( গেরিলা আক্রোশ ) সবই হাজির হয়। তাই সুবিমলকে কখনো নিষ্ঠুর, কখনো বিবেক যন্ত্রণায় আক্রান্ত, কখনো অপরিচিত দেখি। হোটেলে একটি মেয়ের মাথা কাপড়ে পাক দিয়ে ঠেসে আগলা নগ্ন শরীরের প্রতি তার মন্ত্রোচ্চারণ চলে --- সবিতা, চন্দ্রাবতী, শকুন্তলা, নীহার, অণিমা, শর্মিলা ও অরুন্ধতী.... ধরা পড়ে যায় চালাকি। নারীর মগজ বাদ দিয়ে শারীরিক প্রয়োজনীয়তা একই --- একথা বোঝার পরে কিছুই থাকে না। কিংবা নায়কের ৫৬৭৮৯-এ রূপান্তরিত হওয়া। 'ক' বাবু জীবনের সঙ্গে আপোস করতে গিয়ে একের পর এক জিনিসের ব্যবহার --- দুরবিন, ডাইরি, গ্রামোফোন --- এই সব উঠে আসে মানুষের কাছে ঘুষের মত। এবং এসবের যখন প্রয়োজন থাকে না, অর্থাৎ জীবনে বেঁচে থাকার মত কোনো কারণ থাকে না --- শিশিরের শব্দের মত সন্ধ্যা নেমে আসে। সুবিমল যখন লেখেন, "গতর থিক্যা হগল সংস্কারের ধুলা ঝাইড়্যা ফেলছি--- তবুও পিরান থিক্যা বাইরাইতে পারি না --- নারীর কাছে সর্বস্ব সমর্পণ করেও প্রতারিত, বিভ্রান্ত, সংস্কার কাটিয়েও বেরোতে পারছেন না, তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার স্টেফানোৎসভাইকের  Twenty four hours in the life of a woman মনে পড়ে। সুনু ওরফে কৃষ্ণা একজন নারী। এই নারীকে কেন্দ্র করে সুবিমল তাঁর চারপাশ খুঁটিয়ে দেখেছেন। নারী নিয়ে সাহিত্যে এমনকিছু লিখলে ন্যাকামি হয়, কিন্তু জীবনে নারীর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।পিকাসোর ব্লু পিরিয়ডের মত এটাও তাঁর রেড পিরিয়ড। হাহাকার, নিজের অপদার্থতা, ভুল জায়গায় নির্ভুল ভালবাসা, ভুল রমণীকে হৃদয় দান --- এই সব রেড পিরিয়ডে দেখা যায়। তাছাড়া লেখায় ভয়ংকর ব্যাপার থাকা সত্বেও এক কবিত্ব লক্ষ্য করা যায়। সম্ভবত আঞ্চলিক ভাষায় বলেই কবিত্ব ফুটে ওঠে কোথাও-কোথাও।

    “সুবিমলের এই stream of consciousnessকে ভয়ংকর সুন্দর বলে মনে হয়। আঞ্চলিক ভাষায় এটা যেন স্বতঃস্ফূর্ত------- "আমি যেই রাস্তা দিয়া চিলি ফিরি, অন্যেরা হেই রাস্তা দিয়া চলাফিরা করে না। আমার রাস্তাঘাত এক্কেরে আপনরাস্তা। আমি যা দেহি, অন্যেরা হেই লেহান দ্যাহে না। মাঠ-ময়দানের ঘাস আমার চোহে লালবর্ণ ----- অন্যেরা দ্যাহে হইলদা। আমি যারে দেহি রক্ত, অন্যেরা দ্যাহে পানি, আমি যারে কই হেজ, অন্যেরা কয় কব্বর।"

    “এরপর আর মোরাভিয়ার  Dialect is an inferior form of expression because it is less cultivated form--- এই উক্তি খাটে না। অবশ্য মোরাভিয়া যদি বাঙালি হতেন, তাহলে নিজেই তাঁর ধারণা পালটে ফেলতেন বলে আমার বিশ্বাস।”

    আট

    বাসুদেব আর সুভাষের তাত্বিক ঝগড়াটা ওদের কাহিনি-বিশ্লেষণে নিয়ে যায়নি ওরা, বা পশ্চিমবঙ্গের সমাজব্যবস্হার ক্রম-অবনমন নিয়ে এগোয়নি তর্কটা, যেমনটা আমরা দেখি ওক্তাভিও পাজ আর কার্লোস ফুয়েন্তেসের পারস্পরিক বিতর্কে ; চার্লস ডিকেন্স আর হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যানডারসনের পারস্পরিক সমালোচনায়, গোর ভিডাল আর নরম্যান মেইলারের, সলমান রুশডি আর জন আপডাইকের, হেনরি জেমস আর এইচ জি ওয়েলসের, জোসেফ কনরাড আর ডি এইচ লরেন্সের, রবের্তো বোলানো আর গ্যাব্রিয়েল মার্কেজের মাঝে। কিংবা পিকাসোর আঁকার স্টাইল নিয়ে মাতিসের । বামপন্থার দুটি ভিন্ন পাটাতনে দাঁড়িয়ে ওদের দুজনের কাছে কাঙ্খিত ছিল যে বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘খেলাধূলা’ উপন্যাস নিয়ে সুভাষ ঘোষ তার বক্তব্য রাখবে আর সুভাষ ঘোষের ‘সাবিত্রীবালা’ কিংবা ‘যুদ্ধে আমার তৃতীয় ফ্রন্ট’ নিয়ে রাখবে বাসুদেব দাশগুপ্ত— পরস্পরের রাজনৈতিক চিন্তার বৈভিন্ন্যের প্রেক্ষিতে। সুভাষ ঘোষ ছিল সেই সময়ের অত্যন্ত ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠান সিপিএমের কার্ড হোল্ডার, মোহোল্লা কমিটির সদস্য, গণশক্তি পত্রিকার বিতরক। সুবিমল বসাকের বইগুলো নিয়ে আলোচনার কথা কী এই প্রসঙ্গে উঠবে না ?  আজিজুল হক সম্পর্কে যখন বক্তব্য রাখতে পারে বাসুদেব তখন হাংরি আন্দোলনের দুই গল্প-উপন্যাস লেখক সুভাষ ঘোষ আর সুবিমল বসাক সম্পর্কে লেখা প্রয়োজন মনে করল না কেন ? এমনকি যখন ‘ক্ষুধার্ত’ সম্পাদনা করল, তখনও সুবিমল বসাককে বাদ দিল। আমি এই ব্যাপারটাকে হালকা করে দেখতে চাই না, এই বাদ দেবার প্রক্রিয়াটা ইউরোপ থেকে আমদানি করা আধুনিকতাবাদী বিদ্বেষমূলক চারিত্র্য। এটা তিরিশের দশকের লেখক-কবিরা আরম্ভ করেছিলেন। আমার তো মনে হয় বাসুদেবের চরিত্রে গোপন ঈর্ষা কাজ করত, দরবারি প্রতিষ্ঠানের নেকনজর পাওয়া সত্ত্বেও, যা সিপিএম কার্ড হোল্ডার সুভাষ ঘোষ পায়নি, আর প্রতিটি রাজনৈতিকপন্হার সমালোচক সুবিমল বসাক একেবারেই পায়নি। সুবিমল বসাককে শেষে আলোচনার কেন্দ্রে আনার প্রয়াস করলেন নিম্নবর্গ ও দলিত বাঙালি লেখকগোষ্ঠী-সংস্হা।     



    বাঙালি লেখকরা এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে একটা ভাই-ভাই ক্লাবের মতন সাহিত্যের আলোচনা করেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, মনে করেন মানুষেরা এসেছে ভিন্ন গ্রহ থেকে, অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য, অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কখনও শীর্ষেন্দুর সাহিত্যে এইগুলির প্রভাব নিয়ে ওনার সাহিত্য আলোচনার সময়ে লেখেননি, যখন কিনা সুনীল ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা ভাবনাচিন্তার মানুষ। একই বক্তব্য খাটে শীর্ষেন্দুর ক্ষেত্রেও। এইটেই প্রাতিষ্ঠানিকতার বিষ।         

    বাসুদেবের গোরু আর শুয়োরের মাংস খাবার সঙ্কোচ ছিল না। সুভাষ কখনও গোরুর আর শুয়োরের মাংস খেতে চাইত না, বলত আমার ধার্মিক ইনহিবিশান কাজ করে, বমি করে ফেলব। সিপিএম-এর কার্ডহোল্ডারের এই ধার্মিক ইনহিবিশান বেশ কনট্রাডিকটরি মনে হয়েছিল। ব্যক্তি-এককের কনট্রাডিকশান অবশ্য থাকবেই।     আমার মনে হয়, বাসুদেব আর সুভাষের মার্কসবাদ নিয়ে কচকচিটা ছিল আড়াল। ওই আড়ালের পেছনে দুজনে দুজনের গদ্য নিয়ে ঈর্ষার লড়াই লড়ত। নয়তো, মাও জে দঙ, চীন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে ১৯৭৮ সালের ‘দন্দশূক’ পত্রিকায় বিতর্কের আর তো কোনো কারণ দেখি না ; সে সময়ের পশ্চিম বাংলার সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রেক্ষিতে ওই সমস্ত তত্ব ছিল জ্ঞান ফলাবার অহেতুক বালখিল্য। পশ্চিমবাংলা ক্রমশ যে গাড্ডায় গিয়ে পড়ল,  তার আভাস নেই ওদের তর্কবিতর্কে। তখন পশ্চিমবাংলা থেকে কল-কারাখানা পালাতে আরম্ভ করেছে অন্যান্য রাজ্যে, অথচ তার কারণ বিশ্লেষিত হল না বা প্রতিফলিত হল না ওদের লেখায়। তারপর যখন স্কুলে মিডডে মিল খাওয়াবার ব্যবস্হা হল, তখন আড়ালে যে উঁচু জাত-নিচু জাতের বিভাজন দিব্বি বজায় রয়েছে, তাও নজরে পড়ল না ওদের!
            
    একদিকে দুজনে মানবতাবাদী তক্কাতক্কি চালাচ্ছে, আরেক দিকে ‘ক্ষুধার্ত খবর’ আর ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকা থেকে বাদ দিয়ে দিচ্ছে ত্রিদিব মিত্র, দেবী রায়, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই আর সুবিমল বসাককে। চরিত্রের দৈন্য ছাড়া কী বলব একে ?  আমাকে বাদ দেবার ব্যাপারটা ব্যাখ্যাযোগ্য, কেননা আমার জন্যই বাকি দশ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরোয় ; ওদের নতুন চাকরি নিয়ে টানাটানির ভয় ছিল। অবিরাম বাদ দিতে থাকার দরুন ত্রিদিব মিত্রও লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিল। ত্রিদিব ‘উন্মার্গ’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করত ; তাতে লেখা দিতে অস্বীকার করল বাসুদেব, সুভাষ, শৈলেশ্বর। বেশ আহত আর অপমানিত বোধ করেছিল ত্রিদিব। পত্রিকাটা তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল ওদের অসহযোগীতায়। বাসুদেবকে আমি যতটা বুঝেছিলুম, মানে সেই সময়, এই রকম আচরণ কাঙ্খিত ছিল না। পরে তো ওরা দে’জ থেকে প্রকাশিত সংকলনে শঙ্খ ঘোষকেও হাংরি বলে চালিয়ে দিলে !  



    হাংরি আন্দোলনের মুখোশ পাঠানোর ব্যাপারটা বাসুদেবের পছন্দ হয়নি। সব সময় বলত, কিছু যদি হয়, যদি সরকার স্টেপ নেয়, ইত্যাদি। সুবিমল বসাকের আঁকা ড্রইংগুলো সম্পর্কেও বাসুদেবের ইনহিবিশান ছিল, বলত ওগুলো নোংরা হয়ে যাচ্ছে না কি। বিভিন্ন ট্যাবলয়েডের সংবাদে বা আমাদের কার্টুন কোনো কাগজে বেরোলে বলত, কাজগুলো বোধহয় উচিত হচ্ছে না। আসলে বাসুদেবের ভীতির কারণ যে পবিত্র বল্লভ নামে এক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, যে পুলিশের কফিহাউস-ইনফমফার ছিল, তা আমরা তখন জানতে পারিনি। আমার মামলায় পবিত্র বল্লভ ছিল আমার বিরুদ্ধে পুলিশের সাক্ষী।  সুভাষ ঘোষের আরেকটা অভিযোগ ছিল। যখন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কার্যক্রম চালাচ্ছে হাংরি আন্দোলনকারীরা তখন বাসুদেব দাশগুপ্ত চুপচাপ নিজের একটি কাহিনি ‘দেশ’ পত্রিকায় জমা দিয়ে এসেছিল। পরবর্তীকালে যখন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘এখন আমার কোনো অসুখ নেই’ উপন্যাস ওই একই বিগহাউস পত্রিকায় প্রকাশিত হল, তখন প্রথম অভিযোগের আঙুল তুলেছিল বাসুদেব দাশগুপ্ত।

    ব্যাঙ্কশাল কোর্টে মামলার ডেট পড়তে দেরি হলে মাঝের সময়টায় আমি আর সুবিমল কলকাতার বাইরে কোথাও চলে যেতুম। ত্রিদিব মিত্র ছাড়া আর কেউ আমাদের সঙ্গে যেতে চাইতো না। একবার খড়গপুরে গিয়েছিলুম, সুবিমলের পরিচিত একজন হিন্দিভাষী লেখকের বাড়ি। তাঁর নাম ভুলে গেছি। শহরের মধ্যেই জমিজমা কিনে চাষবাসও করতেন। আমাদের সঙ্গে ত্রিদিব ছিল। আমরা তিন জন দীঘা যাবার পরিকল্পনা করলুম। শুনলুম যে খড়গপুর থেকে দীঘা যাবার রাস্তা বৃষ্টির ফলে জলে ডুবে গেছে। পরে খবর পাওয়া গেল যে জল কমেছে, বাস ছাড়বে। বাসে কেবল আমরা তিনজন, খালাসি আর ড্রাইভার। তিনজনেই দুটো করে সিটে ঘুমিয়ে পড়লুম। মাঝরাতে উঠে দেখি দুধারে জল থইথই। দীঘায় নেমে দেখি একেবারে ফাঁকা। সব ট্যুরিস্ট পালিয়েছে। আজকালকার মতন লজ, হলিডে হোম, কিছুই ছিল না। সমুদ্রতীরও বাঁধানো ছিল না, কেবল ঝাউ-গাছের সারি। একজন হোটেল ম্যানেজার দৌড়ে এলেন, আমাদের নিয়ে যেতে। তিনটে গোল্ডেন ইগল বিয়ার কিনে, পরে আসবো জানিয়ে তিনজনে উলঙ্গ হয়ে নেমে পড়লুম সমুদ্রে। গোল্ডেন ইগল বোধহয় উঠে গেছে। ঘণ্টা তিনেক সমুদ্রের জলে বিয়ার খেতে খেতে

    ঝাঁপাই ঝুড়ে উঠলুম জনমানবশূন্য তীরে। অমন আবহাওয়াতেও কাঁকড়াগুলো বেরিয়ে  পড়েছে একে আরেকটাকে টেনে গর্তে নামাবে বলে।
    এখন ওই কাঁকড়াগুলোর সঙ্গে ‘হাংরি জেনারেশনের স্রষ্টাদের ক্ষুধার্ত’ সংকলনের সম্পাকের মুখবন্ধটা মনে পড়ে গেল, লিখেছিল শৈলেশ্বর ঘোষ। অসাধারণ কবিতা লিখেছে শৈলেশ্বর কিন্তু ছিল বড্ডো কুচুটে। শৈলেশ্বর মারা যাবার পর প্রদীপ চৌধুরী বলেছিল, বাড়ি তৈরি করে সবাই তা ভোগ করতে পারে না, তাদের অদৃষ্ট-দোষের কারণে। সত্যিই, বাড়িটা কতো সুন্দর অথচ সবাই মারা গেল, যেন মড়কে আক্রান্ত হয়েছিল। বাড়িটা করতে অন্তত পঁচিশ-তিরিশ লাখ টাকা খরচ হয়ে থাকবে। শৈলেশ্বর ঘোষ ওই সম্পাদকীয়তে লিখেছিল “ক্ষুধার্ত” পত্রিকা হলো “আধুনিকতার শবদেহের উপর উল্লাসময় নৃত্য”। লেখার কিছুকাল পরে প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পাশে বসে উল্লাসময় নাচ নেচে ছিল ; মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এখন সিবিআই এনকোয়ারি চলছে। শৈলেশ্বর লিখেছে, “যে পাঁচজন  হাংরি জেনারেশন আন্দোলন সৃষ্টি করেছেন, তাঁরা হলেন বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য এবং শৈলেশ্বর ঘোষ।” পুরো কাঁকড়া ক্যারেক্টার। শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হয়েছিল। আদালতের ট্রেজারি থেকে রাজসাক্ষীর পেমেন্টও নিয়েছিল। সুবিমল বসাক তো মুচলেকা লিখে দেয়নি। মামলা চলার সময়ে কাঁকড়ারা যখন কেটে পড়ল, তখন সুবিমল বসাকই তো ছিল অপরাধী মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে, ব্যাঙ্কশাল কোর্টে আর হাইকোর্টে।

    সম্পাদকীয়তে আমার সম্পর্কে শৈলেশ্বর ঘোষ লিখেছে, এক প্রাক্তন হাংরি নিজের পিঠ বাঁচাতে ১৯৬৫ সালে আন্দোলন ছেড়ে পালায়। অথচ ১৯৬৫ সালের মে মাসে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে আমাকে চার্জশিট দেয়া হয়েছিল। তখনই জানা যায় যে শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ আমার বিরুদ্ধে মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হতে রাজি হয়েছে, মামলা থেকে রেহাই পাবার জন্য। ব্যাঙ্কশাল কোর্ট আমাকে দণ্ডাদেশ দিলে আমি কলকাতা হাইকোর্টে রিভিশন পিটিশন দেবার পর ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসে বেকসুর মুক্তি পাই। নিজেদের তোল্লাই দিতে এসব তথ্যা কাঁকড়াবাজি চালিয়ে ডাহা মিথ্যা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্পাদক লিখেছে যে হাংরি জেনারেশন ছিল উদ্বাস্তু লেখকদের আন্দোলন। তাহলে কেন সুবিমল বসাককে বাদ দেয়া হলো ? সুবিমলই তো একমাত্র হাংরি যে উদ্বাস্তুদের কথ্য ভাষায় উপন্যাস আর কবিতা লিখেছে। চেপে দেয়া হয়েছে সুবিমল বসাকের সৃষ্টিশীলতাকে। আরও বলা হয়েছে, “গায়ে পেট্রল ঢেলে আত্মহত্যা করতে সবাই প্রস্তুত ছিল না, ফলে ১৯৬৫ সালে মামলা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ামাত্র মলয় রায়চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, দেবী রায়, সুবিমল বসাক সরে যায় এই আন্দোলন থেকে।” আমি মামলা থেকে ছাড়া পাই ১৯৬৭ সালে। আর সুবিমল বসাক তো সরে যায়নি। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সাইক্লোস্টাইল করা লিফলেট প্রকাশ করে গেছে। আর ফালগুনী রায়কে কেন বলা হলো না হাংরি ? সে জমিদার পরিবারের সন্তান ছিল বলে ? শম্ভু রক্ষিতকে ? ও চাষা বলে ?



    রাজসাক্ষীদের প্রতি ঘেন্নায় আমি কলকাতা আর কলকাতার সাহিত্যজগত ছেড়ে চলে গিয়েছিলুম, এটা ঠিক। কিন্তু সুবিমল বসাক তো কলকাতাতেই ছিল, সরে যায়নি। তাহলে তাকে অপদস্হ করা কেন ? সম্পাদক লিখেছে যে আমি তখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডাইরেক্টর। কেমন করে একজন বুদ্ধিমান মানুষ ভাবতে পারে  যে-কেউ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডাইরেক্টার হয়ে যেতে পারে। আমি তখন চলে গেছি অ্যাগরিকালচারাল রিফাইনান্স অ্য্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনে। সুবিমল বসাক যখন পাটনায় পরে এসেছিল তখন আমি ওকে যাবতীয় চিঠির কালেকশান আর সংগ্রহের বইপত্র দিয়ে দিয়েছিলুম। বন্ধুদের নামও সুবিমলের কাছে উল্লেখ করতে ঘেন্না করছিল। সুবিমল অবশ্য লিখেছে যে আমার কথাবার্তা আর আচরণে ও ব্যথিত হয়েছিল। কেন হয়েছিলুম তা শিবনারায়ণ রায় ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকায় ওনার সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন।
     
    ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে শিবনারায়ণ রায় যথার্থ লিখেছিলেন,”মকদ্দমা শেষ পর্যন্ত হয় মলয়ের বিরুদ্ধে ; তাঁর বেশিরভাগ সাহিত্যিক সহকর্মীই ( শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ) হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক পুলিশের কাছে অস্বীকার করেন। শহিদ হওয়া শিল্পীদের দায়িত্ব নয় ; কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধ এবং বিপন্ন বন্ধুর প্রতি আনুগত্য না থাকলে কোনও আন্দোলনই শক্তি অর্জন করতে পারে না। শিল্পকৃতির জন্য আন্দোলন জরুরি নয়; শিল্পী ও ভাবুকদের মধ্যে অনেকেই নির্জনে সাধনা করবার পক্ষপাতী। কিন্তু কোনও আন্দোলন — শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে হোক, আর জীবনের অন্য বিন্যাসেই হোক — প্রভাব ফেলতে পারে না, যদি না সেই আন্দোলনে যাঁরা অংশভাক তাঁরা সৎ, নীতিনিষ্ঠ এবং পরস্পরের কাছে নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হন। যেমন উৎসবে ব্যসনে তেমনি দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে যে পাশে থাকে সেই তো বন্ধু।”

    ফালগুনী রায় সম্পর্কে লেখায় সুবিমল বলেছে, “পাটনায় এগজিবিশান রোডের মোড়ে কফিহাউসে, একটি কোণে বসতেন রেণুজী, যেটি রেণুজ কর্নার নামে প্রসিদ্ধি পেয়েছিল। টেবিল ঘিরে আমরা, সমীরদা, মলয়, অলোক ধনওয়া, রাজকমল চৌধরী ও অন্যান্য হিন্দি লেখক। বিহারের রাজ্যপাল দেবকান্ত বড়ুয়ার ভাই নবকান্ত বড়ুয়া পাটনায় এলে আসতেন রেণুজ কর্ণারে। আমাদের কবিতা পড়তে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। ফালগুনীর কবিতাগুলো স্বভাবতই ছিল অন্য রকম, পাঠভঙ্গীও গতানুগতিক নয়। রেণুজী হিন্দিভাষীদের জন্যে মুখে-মুখে অনুবাদ করে শোনান। রাজ্যপাল-ভবনে হাংরি কবিতাকে কারোরই অশ্লীল মনে হয়নি।নবকান্ত বড়ুয়া এরকম কবিতার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না; ফালগুনীকে তিনি অত্যাধুনিক ও ক্রেজি বলেন।
    “পাটনায় ফালগুনীর জন্য তার দিদির চিন্তা ছিল, দায়িত্বও। ওর কোনো খবর না পেলে মলয়ের বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতেন, বকুনি দিতেন মলয়কে। পাটনায় আমরা ভাঙের পকোড়া হাতে গল্প করতে-করতে কখনও গান্ধী ময়দানে, কখনও মহেন্দ্রুঘাটে, কখনও গোলঘরে, কখনও বা শ্মশানে চরস ও মৃত্যুবোধের খোঁজে।দুজরা শ্মশান ছিল আমাদের বাড়ির কাছে, গঙ্গার ধারে। ফালগুনীর স্বাস্হ্যের কিছুটা উন্নতি হত, অনিয়ম সত্তেও। সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় ছিল ফালগুনীর দরোজাখোলা কথাবার্তা, প্রেমিকার সম্পর্কে, শরিকি বাড়ির খেয়োখেয়ি সম্পর্কে। পাটনায় তবু ফালগুনী কিছুটা দুর্নাম কুড়িয়েছিল।ছোটো শহর, বাংগালিবাবু-সমাজের ছেলে কিনা কংকরবাগ তাড়ির ঠেকে বসে তাড়ি খায়। ছিঃ ছিঃ। পাটনার যত্র-তত্র মলয়ের সঙ্গে যেতো, কিন্তু মলয় সেসব কথা লেখেনি এখনও পর্যন্ত।সম্ভবত ১৯৭৪-এ ফালগুনীর অন্তিম পাটনা বাস, কেননা মলয় তখন হাংরি মকদ্দমাকে কেন্দ্র করে বন্ধুদের বিশ্বাসঘাতকতায় বিরক্ত, ও দূরত্ব গড়ে ফেলেছে ; পাটনা ছেড়ে মলয় রওনা দিয়েছে লখনউতে থাকার জন্য। মাঝে-মাঝে ফালগুনী অবশ্য বে-রুটিন হয়ে দিদির বাড়ি থেকে গৃহছাড়া হতো। কখনও গান্ধী ময়দানে, কখনও বা পাটনা রেলওয়ে স্টেশনে, কখনওবা মহেন্দ্রুঘাটের জাহাজি পাটাতনে। কখনও বা ওর শয্যা ফুটপাতের পাথুরে বিছানায়।

    “হাংরি আন্দোলনের সময়ে আরো কয়েকটি আন্দোলন হয়েছিল ভারতবর্ষের নানা ভাষায়। বাইরেও। প্রতিবেশি নেপালে ঘটেছিল ‘রালফা‘ আন্দোলন।রালফা ও হাংরিদের নিয়ে সমীরদা (রায়চৌধুরী) একটা সংকলন প্রকাশ করেছিলেন, নকশাল নেতা কাঙ্চনকুমারের  সহযোগীতায় বেনারস থেকে, হিন্দি কবি নাগার্জুন-এর অভিভাবকত্বে। রালফার নেত্রী ছিলেন পারিজাত, অসামান্যা সুন্দরী, বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। মলয় এই পারিজাতের প্রেমে পড়েছিল, এবং ওর বেশ কিছু কবিতা পারিজাতকে নিয়ে লেখা; পারিজাতও ওর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, কিন্তু সে-গল্প মলয় কোথাও লেখেনি এখনও। কাঠমান্ডুতে আমাদের সদলবলে অভিজান তাঁকে বেশ উৎসাহী ও অনুপ্রাণিত করেছিল। আমরা মহিষের কাঁচা মাংস ‘কাচিলা’ এবং দিশি নেপালি মদ ‘এলা’ খেয়ে পারিজাতের আড্ডায় বহু রাত কাটিয়েছি; আমাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন নেপালি অ্যাকাডেমির কর্ণধার বাসু শশী। নেপালে আমাদের মাসাধিক থাকার ও যথেচ্ছাচারে কাহিনী নিয়ে একটা পৃথক লেখা হতে পারে। সেই পারিজাত, বিমল রালফাকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে উড়ে এসে হাজির আমার আস্তানায়।ত্রিদিব মিত্র  আর আমি তাঁদের তুলে আনি দমদম বিমানবন্দর থেকে — বেলঘরিয়ায়। ত্রিদিব থেকে যায় আমার বাসায়, এবং আশ্চর্যের ব্যাপার সেই রাতে অতি আকস্মিকভাবে ফালগুনী এসে হাজির।

    “তখন আমার ঘরের ডানদিকে ছিল সবুজ ঘেরা মাঠ, অনেক গাছ-গাছালি, পাখিদের আপিলা-চাপিলা, রাতে ঝিঁঝি, একনাগাড়ে চেয়ে থাকলে চোখ সবুজ হয়ে পড়ে, দূষণমুক্ত বাতাসে বুক ফুলে ওঠে। অথচ মাঝে-মাঝে ঐ ১৯৭১-৭২ সালে, মাঝরাতে, নকশাল আন্দোলন  যখন তুঙ্গে, কখনও সন্মিলিত পদশব্দ, দীর্ঘশ্বাস-প্রশ্বাস, চাপা কাতরানি। ঘুম ভেঙে গেলেও কাঠ হয়ে পড়ে থাকতে হতো। ফালগুনীও ছিল তেমন একটি রাতে। পরদিন সকালে সূর্যের  আলোয় শুধু মাটির চাড় ছাড়া আর কিছু লক্ষিত হয় না। বছর ছয়-সাত পরে, যখন বাড়ি তৈরির জন্যে ভিত খোঁড়া হচ্ছে, একাধিক কঙ্কাল, শরীরের খাঁচা। হাতে একজনের লোহার বালা ছিল।

    “ফালগুনী পারিজাতের ইনটারভিউ নিতে শুরু করে। ‘শিরিষ কা ফুল’ উপন্যাসের লেখিকা পারিজাতে পাহাড়ি টোনে উত্তর দিতে থাকেন। তাঁর কন্ঠস্বরে মাদকতা ছিল। ফালগুনী উঠে দাঁড়ায় অসমাপ্ত সাক্ষাৎকারে। “আসছি, রথতলা থেকে…”। কাঠমান্ডুতে আছে সন্তুলা, জাঁড়; কলকাতায় বাংলা, মা-কালী। ফালগুনী গেল রথতলায়, রথতলায় ছোট্ট গুমটি, যদিও বেআইনি, সেই যে গেল, পরদিন দেখা গেল বরানগরে। ইনটারভিউয়ের কাগজ আর পাওয়া যায়নি।

    “আমাদের কয়েকটি গোপন ডেন ছিল, যেখানে যাওয়া-আসা হত, খালাসিটোলা বন্ধ হবার পর, নাইট শোয়ে। এখনও চোখ বুজে, খুললেই দেখতে পাই ফালগুনীর তৎপরতা, গেলাস হাতে, বগলে বোতল। খালাসিটোলায়, খেতে-খেতে সময় অতিক্রান্ত হলে কালীদা এসে তাড়া দিত — গেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, উঠে পড়ুন, উঠে পড়ুন। কাউন্টারের সামনে তখন দাঁড়িয়ে কমলকুমার মজুমদার, সঙ্গে কয়েকজন। ঠুমরি নিয়ে আলোচনা। কমলবাবু মলয়কে ওর মকদ্দমায় ১০০টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। খালাসিটোলায় তখন আমাদের ওঠার লক্ষণ নেই দেখে এক-এক করে বাতি নিভিয়ে দেওয়া হতো। শুধু একটি বাতি মাঝখানে। ফালগুনী নেশাগ্রস্ত অবস্হায় বলে উঠত, “কালীদা, আপনিই তো অন্তর্জলী যাত্রার হিরো। আপনাকে দেখেই তো কমল মজুমদার  ঐ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন”। তবুও কালিদার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেত না, হুমকি দিয়ে তুলে দিতেন আমাদের, ওনার “বাউন্সাররা” ওনার হুকুমের অপেক্ষা করত।

    “বেরিয়ে কখনও জ্যোতি সিনেমা হলের পেছনের ডেন-এ। কফিহাউস থেকে বেরিয়ে কলেজ স্ট্রিট-মার্কেটের পেছনে গাব্বুর ঠেকে। গাব্বুর আসল নাম ছিল মোহম্মদ সিরাজ, বিহারের লোক, মলয়ের চেনা। আমাদের সাপ্লাই করত ‘বাংলা’ — একটু বেশি দামে। গরমকালে পাওয়া যেত তাড়ি, টক, অথচ নেশা হতো প্রচন্ড।আর আমরা খেতাম পরোটা, রুটি, এবং হরেক মাংসের টিকিয়া, চাপ। আমাদের মধ্যে সুভাষ আর শৈলেশ্বর ধর্মের কারণে গরুর মাংস খেত না, ওরা ডিম খেত।মদের সঙ্গে গাঁজা বা সিদ্ধি খেত না ফালগুনী। বড়বাজারে সত্যনারায়ণ পার্কে, সিদ্ধির দোকানে ও ছিল রোজকার খদ্দের। ভাঙের গুলি বা সিদ্ধির সরবৎ ছিল লোভনীয়।”

    শৈলেশ্বর ঘোষের ‘ক্ষুধার্ত গোষ্ঠী’ সুবিমল বসাককে বাদ দিলেও, বাংলাদেশের আলোচক মোমিন মানব সুবিমলের ‘হাবিজাবি’ সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছেন :

    “রাঢ়ি বাঙালি বরেন্দ্রি ঝাড়খন্ডি ও কামরূপি এই তিনটি ভাষারূপকে বাঙলা ভাষার উপভাষা বলা হয়। এর মধ্যে রাঢ়ি হলো পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে নদীয়া জেলায় প্রচলিত ভাষা। আর সেই ভাষাটাই আমরা বাঙলাভাষা হিসেবে মূলত চর্চা করে আসছি বছরের পর বছর। নন্দনতত্ত্বে যেমন রবীন্দ্রনাথের ভিক্টোরিয়ান মোরালিটিটা আমি সম্মান করি না, এই রাঢ়িভাষাটাকে আমি নিজের বলে মানতে পারছি না। তাই আমি আমার বাঙালিভাষাটা, যেটা আমরা বাঙলাদেশের ঢাকা ময়মনসিঙহ কুমিল্লা যশোর খুলনা ফরিদপুর বরিশাল নোয়াখালির বিশাল জনগোষ্টি ব্যবহার করি সেটাকে স্রেফ উপভাষা বলে নেগলেক্ট করে যাচ্ছি। অনেক বছর ধরে আমি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার উপায় খুঁজছিলাম। একদিন হঠাত হাঙরি জেনারেশরনের কবি সুবিমল বসাকের কিছু কবিতা পড়লাম।

    নিত্যি আমি একই লেহান আকাশ দেহি
    কুনোকিচ্ছুতে হেরফের হয় না এক্কেরে
    নিজের গতর থিক্যা বেবাক কুসংস্কারের ধুলা ঝাইর‌্যা ফেলছি
    তবও হায়,
    নিজের পিরন থিক্যা বাইরইয়া আইতে পারি না
    আমি জানি, স্বাধীনতা বেজায় মাঙ্গা—
    আর কিচ্ছু না— স্বাধীনতা মাইনষের শরীলের চাম—
    বংশ মজুদ রাখনের গাদ

    “পড়ে আমি তো থ খেয়ে গেলাম। হাবিজাবি নামের পুরাটা কাব্যগ্রন্থই আমাদের প্রচলিতভাষায় লেখা; মানে বাঙালি(উপ)ভাষায় লেখা। এমন কি ‘ছাতামাতা’ তার উপন্যাসটাও। একজন কবি যিনি সেই পাটনায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবঙ এতো আগে অর্থাত ৬৪/৬৫ সালেই এভাবে লিখছেন। আমি সাহস খুঁজে পেলাম। কিছু কিছু কবিতায় পুরুটাই আমার ভাষায় এবঙ অনেক কবিতায় প্রায় আমি গেঁথে দিতে থাকলাম আমাদের বাগান থেকে তুলে আনা বাঙালিভাষাফুল। ভাষাবিষয়ে আরও আগে থেকেই বিচিন্তা কাজ করেছে লোকগানগুলো শুনে। অনেক লোককবিই সেটা করেছেন, করে যাচ্ছেন।

    “প্রথমেই আমাকে খুব আসক্ত করে ফেলে সুবিমল বসাকের কবিতা। আমাদের ঢাকা অঞ্চলের ভাষায় লেখা তার কবিতা পড়ে রীতিমত আমি হতভম্ব: একজন মানুষ যিনি ভারতের পাটনায় জন্ম এবঙ সেখানে বড়ো হওয়া, তিনি আমার ভাষায় কবিতা লেখেন! সুবিমল বসাকের লেখাই আমাকে সাহস যোগালো আমার নিজের ভাষায় যেটাকে অন্যরা নারায়ণগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষাও বলে সেই ভাষায় কবিতা লেখা। হাংরি মুভমেন্ট নামেই একটা কবিতা লেখলাম এবঙ উতসর্গ করলাম সুবিমল বসাককে। সুবিমল বসাকের সাথে একদিন ফোনে আলাপ চারিতায় সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।”  



    তন্ময় ভট্টাচার্যের কাছে শুনলুম যে সুবিমল অসুস্হ হয়ে হাসপাতালে ছিল। এখন বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। মনে পড়ল, শেষবার সুবিমল যখন আমাকে ফোন করেছিল, তখন বলেছিল, ‘মনে হচ্ছে মরে যাবো’।
    1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 | 32 | 33 | 34 | 35 | 36 | 37 | 38 | 39 | 40 | 41 | 42 | 43 | 44 | 45 | 46 | 47 | 48 | 49 | 50 | 51 | 52 | 53 | 54 | 55 | 56 | 58 | 59 | 60 | 61 | 62 | 63 | 64 | 65 | 66 | 67 | 68 | 69 | 70 | 71 | 72 | 73 | 74 | 75 | 76 | 77 | 78 | 79 | 80 | 81 | 82 | 83 | 84 | 85 | 86 | 87 | 88 | 89 | 90 | 91 | 92 | 93
  • বইপত্তর | ০৭ নভেম্বর ২০২২ | ২৯২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন