এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  বইপত্তর

  • আমার প্রথম দুটো বই প্রকাশের দুর্ভোগ

    Malay Roychoudhury লেখকের গ্রাহক হোন
    বইপত্তর | ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১০৬৪ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 | 32 | 33 | 34 | 35 | 36 | 37 | 38 | 39 | 40 | 41 | 42 | 43 | 44 | 45 | 46 | 47 | 48 | 49 | 50 | 51 | 52 | 53 | 54 | 55 | 56 | 58 | 59 | 60 | 61 | 62 | 63 | 64 | 65 | 66 | 67 | 68 | 69 | 70 | 71 | 72 | 73 | 74 | 75 | 76 | 77 | 78 | 79 | 80 | 81 | 82 | 83 | 84 | 85 | 86 | 87 | 88 | 89 | 90 | 91 | 92 | 93
    আমার কবিতার বইই কেবল নয়, আমার প্রথম বই বেরোনো নিয়েও বেশ ঝামেলা হয়েছিল। প্রথম বইটা ছিল ‘মার্কসবাদের উত্তরাধিকার’; প্রকাশক শক্তি চট্টোপাধ্যায়, হ্যাঁ, প্রখ্যাত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় । দ্বিতীয়টি কবিতার বই, ‘শয়তানের মুখ’ ; প্রকাশক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কৃত্তিবাস প্রকাশনী, হ্যাঁ, প্রখ্যাত কবি এবং ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দাদা সমীর রায়চৌধুরীর সিটি কলেজের সহপাঠী। এনারা দুজনে আমাদের পাটনার বাড়িতে অনেকবার এসেছেন, থেকেছেন, মায়ের হাতের রান্নার প্রশংসা করেছেন ।

    দাদার চাইবাসার বাড়িতে ১৯৫৯ থেকে প্রায় আড়াই বছর ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তার কারণ দাদার শালি শীলা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রেম করতেন, এবং তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো শীলাকে পাওয়া ও না-পাওয়া নিয়ে । প্রেম করতেন বলে নিজেকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতেন শক্তি, মহুয়ার মদ খাওয়া ও মাতলামি ছাড়া। দাদার মনে হয়েছিল, তাঁর নিকটবন্ধু শক্তি লোকটা ভালো; তাই ওনাকে ভার দেন প্রকাশক খুঁজে বইটা কলকাতায় প্রকাশ করার। টাকা আমিই দিয়েছিলুম। শক্তি পাণ্ডুলিপিটা কোনও ছাপাখানায় দিয়ে তাদের বলেন ছাপা-বাঁধাই করে বইটা রেডি করে দিতে; কেউই প্রুফ দ্যাখেনি, প্রচ্ছদ এঁকেছিল প্রেসের কোনো কর্মী। ফলে ১৯৬২ সালে আমার এই বইটা হয়েছিল ডিজ্যাসটার। আমি ক্রুদ্ধ হয়ে ওনার উল্টোডাঙার বস্তিবাড়ির সামনে পেট্রল ঢেলে বইগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিই; প্রচুর লোক জড়ো হয়ে গিয়েছিল এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেই দৃশ্য দেখে সেখান থেকে কেটে পড়েছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে বলেছিলেন, “তুমি কি জানতে না শক্তি কেমন মানুষ?” প্রশ্নের ভেতরে যে উষ্মা লুকিয়ে ছিল, তা হল, ওনাকে বাদ দিয়ে কেন শক্তিকে দায়িত্ব দেয়া হলো!

    দাদার চাইবাসার বাড়িতে পুরো কৃত্তিবাস গোষ্ঠী গিয়ে জড়ো হতেন, অবশ্যই দাদার খরচে। তাঁদের গল্প-উপন্যাসে সেখানকার ঘটনা প্রচুর পাওয়া যাবে। সুনীলের “অরণ্যের দিনরাত্রী”, সন্দীপনের “জঙ্গলের দিনরাত্রী” আর শক্তির “কিন্নর কিন্নরী” চাইবাসার ঘটনাবলী নিয়ে লেখা। প্রসঙ্গক্রমে বলি, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটি চিঠি সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে। যে চিঠিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক আদিবাসী যুবতীর শরীর ছুঁয়ে ‘‌মজা নেওয়া’‌র চেষ্টা নিয়ে রসিকতা করেছেন সন্দীপন। এবং সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেছেন ভিড় বাসে অল্পবয়সি মেয়েদের শরীর ছুঁয়ে থাকার। চিঠিটি পরিচিত এবং বহুল প্রচলিত। সন্দীপনের অন্তত দুটি চিঠিপত্রের সংকলনে সগর্বে জায়গা পেয়েছে সেটি। একথা এখানে বলে নিলুম পরের ঘটনাগুলোর খাতিরে ।

    এবার আসি প্রথম কবিতার বইয়ের প্রসঙ্গে। ১৯৫৮ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর ‘একা এবং কয়েকজন’ বইটা দাদা নিজের টাকায় প্রকাশক হিসাবে ছাপিয়ে ছিলেন, প্রকাশনার নাম দাদা দিয়েছিলেন ‘সাহিত্য প্রকাশক’। আমি আমার কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপিটা প্রথমে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে দিয়েছিলুম ওনার মতামত জানার জন্য; সন্দীপন বলেছিলেন “শয়তানের মুখ’ বদলে অন্য নাম দিতে । নামটা পালটাই নি, কেননা ক্যাথলিক স্কুলে পড়ার দরুন শয়তান-ঈশ্বরের বাইনারি অপোজিট তখনও আমার মগজে গিজগিজ করছিল। তাছাড়া প্রচ্ছদ তৈরি হয়ে গিয়েছিল, মেকসিকোর আঁকিয়ে কার্লোস কফিনের আঁকা, একেবারে নতুন ধরনের, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সেসময়ে আরজেনটিনা-নিবাসী লেখিকা ও সম্পাদিকা মার্গারেট রেনডাল। মার্গারেট লাতিন আমেরিকার সরকারবিরোধী আন্দোলনগুলোয় অংশ নেবার দরুন, আমেরিকার নাগরিকত্ব খুইয়েছিলেন; এখন ফিরে পেয়েছেন।

    সন্দীপনকে পাণ্ডুলিপি পড়তে দেয়াটাই হয়েছিল ব্লাণ্ডার। প্রথমে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে প্রথম বইয়ের ভার দেয়া আর তারপর সন্দীপনকে পাণ্ডুলিপি দেয়া, যাঁর কিনা, সুনীলের মতে, কবিতা সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিল না। বন্ধুদের ভেতরকার সাংস্কৃতিক রাজনীতি তখন বুঝতুম না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন যে বইটা উনি কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বের করবেন। আমার মনে হয় যে দাদা ওনার বই ছাপিয়ে দিয়েছিলেন বলে উনি প্রতিদান হিসেবে আমার বইটা কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বের করতে রাজি হলেন, তবে আমার খরচে। দাদার বই “ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি” এবং “আমার ভিয়েৎনাম” কাব্যগ্রন্হ দুটো উনি কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করেছিলেন, বলা বাহুল্য, দাদার টাকায়। কৃত্তিবাস পত্রিকা প্রকাশ করার জন্যও দাদা আর্থিক সাহায্য করতেন, তা “সুনীলকে লেখা চিঠি” বইটা পড়লেই জানা যাবে। সুনীল নিজেও “হাওয়া৪৯” পত্রিকায় দাদার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সেকথা স্বীকার করেছেন।

    ইতিমধ্যে “হাংরি আন্দোলন” আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, পাটনায় ১৯৬১ সালের নভেম্বরে একটি কবিতার ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথমে টের পাননি যে এই আন্দোলন ক্রমশ উথালপাথাল ঘটাতে থাকবে। উনি ব্যাপারটাকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন আর ব্যস্ত ছিলেন আয়ওয়া পোয়েট্রি ওয়র্কশপে যোগ দেবার কাগজপত্র-পাসপোর্ট-ভিসা ইত্যাদি নিয়ে। আমার কাব্যগ্রন্হ অনুমোদন করে উনি রওনা দিলেন আমেরিকা। এদিকে হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার শুরু হয়েছিল বিভিন্ন এলিট মহলে ও কাগজপত্রে, যে, কলকাতার কোনও প্রেস আমার বইটা ছাপতে রাজি হচ্ছিল না, আমার নামটা তখন বেশ ভীতিকর। দাদার এক বন্ধু বহরমপুরে সমবায় প্রেস খুলেছিলেন, সিগনেস প্রিন্টিং, তিনি ঘটনা জানতে পেরে বললেন সবকিছু ওনাদের পাঠিয়ে দিতে, ওনারা বই রেডি করে রিপন স্ট্রিটে একজন প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে দেবেন। প্রকাশকের নাম ও তাঁর বাড়ির ঠিকানা ৩২/২ যোগীপাড়া রোড, কলকাতা – ২৮ দেখে ওনারা অবাক হন; মণীশ ঘটক থাকতেন বহরমপুরে, উনিও অবাক হন।

    বই তো বেরিয়ে গেল, বিতরণও আরম্ভ করলুম বন্ধুদের ও তখনকার তরুণ কবিদের; অনেকে পরে বইটার কপি বাড়িতে রাখেননি, পুলিশের ভয়ে, যখন আমার বিরুদ্ধে মামলা আরম্ভ হল। হাংরি আন্দোলনের সদস্যরা ভাবছিল মলয় ঢুকে পড়েছে কৃত্তিবাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে। আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বন্ধুরা ওনাকে চিঠি লিখে আমার বিরুদ্ধে নানারকম গল্প পৌঁছে দিচ্ছিলেন। তাঁর বন্ধুদের সেই সব চিঠিগুলো সুনীল তাঁর “সুনীলকে লেখা চিঠি” বইতে কেন দেননি তা বোধহয় খোলোশা করার দরকার নাই। এই বইটায় কিন্তু সবচেয়ে বেশি সংখ্যক চিঠি আছে আমার, তবে আমার যে চিঠিটা পড়ে উনি রাগে রি-রি করে আমাকে আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি লিখেছিলেন তা অন্তর্ভুক্ত করেননি।

    কলকাতায় যে কী ঘটছে সুনীল আঁচ করতে পারছিলেন না, আর ভাবছিলেন যে উনি যদি দ্রুত না ফেরেন তাহলে হাংরি আন্দোলন ওনার ইতিহাসের উড়ন্ত মাদুরটা কেড়ে নেবে। এতোটাই ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ ও আশঙ্কিত হয়েছিলেন যে নিজের অনুমোদন করা আমার কাব্যগ্রন্হটিকে উনি পরবর্তীকালে কৃত্তিবাসের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেননি। ব্যাপারটা বেশ মজার, কেননা, হাংরি আন্দোলনের খবরে উনি বেদম চটে গিয়েছিলেন, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার পত্রপত্রিকায় আমাদের আন্দোলনের সংবাদ ও ফোটো প্রকাশিত হচ্ছিল এবং সেই কাগজগুলো আয়ওয়ার গ্রন্হাগারেও যাচ্ছিল অথচ উনি কাউকে কিছুই বোঝাতে পারছিলেন না। উনিও আয়ওয়া থেকে বন্ধুদের চিঠিপত্র লিখছিলেন নিশ্চয়ই; গবেষকরা তা খুঁজে পাবেন আশা করি, যদি না নষ্ট করে ফেলা হয়ে থাকে। আমি কোনও পত্রিকায় আমার বইটা রিভিউ করতে দিইনি। তখনকার দিনে লিটল ম্যাগাজিন বেশি ছিল না; যাও বা ছিল সবই এলিট সম্পাদকদের নিয়ন্ত্রণে।

    আয়ওয়া থেকে লেখা সুনীলের চিঠিটার অংশ এখানে দিলুম। এখানে সুনীল আমার যে চিঠির উল্লেখ করেছেন তা স্বাভাবিক কারণে ওনার “সুনীলকে লেখা চিঠি” বইতে নেই। এই চিঠিতে আমার বই সম্পর্কে ওনার কোনও আগ্রহ দেখাননি।

    আয়ওয়া, আমেরিকা, ১০ জুন ১৯৬৪

    মলয়,

    তুমি কলকাতায় কি সব কাণ্ডের বড়াই করে চিঠি লিখেছ জানি না। কী কাণ্ড করছ? আমার বন্ধু-বান্ধবদের কেউ-কেউ ভাসা-ভাসা লিখেছে বটে কফিহাউসে কী সব গণ্ডোগোলের কথা।
    কিছু লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার লক্ষ্য বেশি। রাত্রে তোমার ঘুম হয় তো? এসব কিছু না — আমার ওতে কোনো মাথাব্যথা নেই। যত খুশি আন্দোলন করে যেতে পারো — বাংলা কবিতার ওতে কিছু আসে যায় না। মনে হয় খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার। পেতেও পারো, বলা যায় না। আমি এসব আন্দোলন কখনো করিনি; নিজের হৃৎস্পন্দন নিয়ে আমি এতই ব্যস্ত।
    আমি নিজে তো এখনও কিছুই লিখিনি, লেখার তোড়জোড় করছি মাত্র ; কিন্তু তোমার মতো কবিতাকে ‘কমার্শিয়াল’ করার কথা আমার কখনো মাথায় আসেনি। বালজাকের মতো আমি আমার ভোকাবুলারি আলাদা করে নিয়েছি কবিতা ও গদ্যে। তোমার প্রতি যতই আমার স্নেহ থাক মলয়, কিন্তু তোমার কবিতা সম্বন্ধে এখনো কোনোরকম উৎসাহ আমার মনে জাগেনি। প্রতীক্ষা করে আছি অবশ্য।
    অনেকের ধারণা যে পরবর্তী তরুণ জেনারেশানের কবিদের হাতে না রাখলে সাহিত্যে খ্যাতি টেকে না। সে জন্যে আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কেউ-কেউ একসময় তোমাদের মুরুব্বি হয়েছিল। আমি ওসব গ্রাহ্য করি না। নিজের পায়ে আমার যথেষ্ট জোর আছে, এমনকী একা দাঁড়াবার। আমার কথা হল : যে-যে বন্ধু আছ কাছে এসো, যে ভালো কবিতা লেখো কাছে এসো — যে-যে বন্ধু নও, বাজে কবিতা লেখো, দূর হয়ে যাও কাছ থেকে। বয়সের ব্যবধান তোলা আমার কাছে অত্যন্ত ভালগার লাগে।
    চালিয়ে যাও ওসব আন্দোলন কিংবা জেনারেশানের ভণ্ডামি। আমার ওসব পড়তে কিংবা দেখতে মজাই লাগে। দূর থেকে। সাহিত্যের ওপর মৌরসি পাট্টা বসাতে এক-এক দলের অত লোভ কী করে আসে, কী জানি। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো। আমাকে দেখেছ নিশ্চয় শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষ। আমি তাই-ই, যদিও গায়ে পদ্মাপাড়ের রক্ত আছে। সুতরাং, তোমাদের উচিত আমাকে দূরে-দূরে রাখা, বেশি খোঁচাখুঁচি না করা। নইলে হঠাৎ উত্তেজিত হলে কী করব বলা যায় না। জীবনে ওরকম উত্তেজিত হয়েছি পৌনে এক বার। গত বছর। দুএকজন বন্ধুবান্ধব ও-দলে আছে বলে নিতান্ত স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশান গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি। এখনও সে ক্ষমতা রাখি, জেনে রেখো। তবে এখনও ইচ্ছে নেই ও-খেলাঘর ভাঙার।
    আশা করি শারীরিক ভালো আছ। আমার ভালোবাসা নিও।

    সুনীলদা

    একই সময়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠির অংশবিশেষ, যা থেকে স্পষ্ট যে আমার কাব্যগ্রন্হ সম্পর্কে তাঁর কোনও আগ্রহ না থাকলেও আমার সাহিত্যিক কাজকারবারের দিকে তিনি নজর রেখেছিলেন :-

    15 June 1964, 313 South Capital, Iowa City, Iowa, USA

    সন্দীপন,

    কী ভালো লেগেছিল আপনার চিঠি পেয়ে। বিশেষত লাল পেনসিলের অক্ষর। আমার কবিতার জন্য আপনাকে ভয় করি না, কবিতা লেখার ক্ষমতার ওপর আমার বেশি আস্হা নেই, আপনি যেরকম কবিতা ভালোবাসেন, অথবা যাই হোক — আমি সেরকম কখনও লিখব না। আমি কবিতা লিখি গদ্যের মতো, ওরকমই লিখে যাবো। ও সম্বন্ধে আমার কোনো দ্বিধা নেই। শক্তি অসাধারণ সুন্দর বহু লাইন লিখেছে। আমার চেয়ে অনেক বড়, আমি ওকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু শক্তির কবিতা মুণ্ডহীন, আমি ওরকম লিখতে পারব না, চাই না, কারণ আমি ওরকম ভাবে বেঁচে নেই। বরং উৎপলের কবিতা আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করছে।
    দু-দিন পর আজ সকালে আবার আপনার চিঠি পেলুম। কি সব লিখেছেন কিছুই বুঝতে পারলুম না। কেউ আমাকে কিছু লেখেনি। শরৎ ও তারাপদ কফিহাউসে কি সব গণ্ডোগোলের কথা ভাসা-ভাসা লিখেছে। সবাই ভেবেছে অন্য কেউ বুঝি আমাকে বিস্তৃত করে লিখেছে। কিন্তু আপনার চিঠি অত্যন্ত অস্বস্তিজনক। তিনবার পড়লুম, অস্বস্তি লাগছে।
    সন্দীপন, আপনি অনেকদিন কিছু লেখেননি, প্রায় বছরতিনেক। তার বদলে আপনি কুচোকাচা গদ্য ছাপিয়ে চলেছেন এখানে সেখানে। সেই স্বভাবই আপনাকে টেনে নিয়ে যায় হাংরির হাঙ্গামায়। আমি বারণ করেছিলুম। আপনি কখনও আমাকে বিশ্বাস করেননি। ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিলেন। আমি শক্তিকে কখনও বারন করিনি, কারণ আর যত গুণই থাক — শক্তি লোভী। শেষ পর্যন্ত উৎপলও ওই কারণে যায়। কিন্তু আমি জানতুম আপনি লোভী নন।
    হাংরির এই ইংরেজি মতলোব ছাড়া, বাংলা দিকটা আরও খারাপ। ওর কোনো ক্রিয়েটিভ দিক নেই। শর্টকাটে খ্যাতি বা অখ্যাতি পাবার চেষ্টা — অপরকে গালাগাল বা খোঁচা দিয়ে। আপনি মলয়কে এত পছন্দ করছেন — কিন্তু ওর মধ্যে সত্যিকারের কোনো লেখকের ব্যাপার আছে, আপনি নিশ্চই মনে-মনে বিশ্বাস করেন না। আমি চলে আসার পরও আপনি হাংরির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন — হিন্দি কাগজের জন্য আপনি কি একটা লিখেছিলেন — তাতেও হাংরির জয়গান। ভাবতে খুব অবাক লাগে — আপনার মতো অ্যাব্সট্র্যাক্ট লেখক কী করে ইলাসট্রেটেড উইকলিতে ছবি ছাপাটাও উল্লেখের মনে করে। এগুলোই হাংরির গোঁজামিল। এই জন্যেই এর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক থাকাতে বারবার দুঃখ পেয়েছি, দুঃখ থেকে রাগ, রাগ থেকে বিতৃষ্ণা। একটা জিনিশ নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আমি কখনও প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করিনি, ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করিনি। পারতুম। করিনি, তার কারণ, ওটা আপনাদের শখের ব্যাপার, এই ভেবে, এবং আপনারা ওটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করছিলেন কৃত্তিবাস বা সুনীলের প্রতিপক্ষ হিসেবে। সে হিসেবে ওটাকে ভেঙে দেওয়া আমার পক্ষে নীচতা হতো খুবই। বিশ্বাস করুন, আমার কোনো ক্ষতির কথা ভেবে নয়, আপনার অপকারের কথা ভেবেই আমি আপনার ওতে থাকার বিরোধী ছিলুম। এটা হয়তো খুব সেন্টিমেন্টাল শোনালো, যেন কোনো ট্রিক, কিন্তু ও-ই ছিল আমার সত্যিকারের অভিপ্রায়।
    এবারে নতুন করে কী ঘটলো বুঝতে পারলুম না। যে ছাপা জিনিসটার কথা লিখেছেন, সেটা দেখলে হয়তো বুঝতে পারতুম। এবং এটা খুবই গোলমেলে — যে চিঠি আপনি চারজন বন্ধুকে এক সঙ্গে লিখেচেন, যেটা চারজনকে একসঙ্গে পাঠানো যায় না, সেটা হারাধন ধাড়াকে পাঠালেন কী জন্য, বুঝতে পারলুম না। কিংবা আমার বোঝারই বা কী দরকার? আচ্ছা মুশকিল তো, আমাকে ওসব বোঝার জন্য কে মাথার দিব্যি দিয়েছে এই আষাড় মাসের সন্ধ্যাবেলা? আমি কলকাতায় ফিরে শান্তভাবে ঘুমোবো, আলতো পায়ে গুরবো — আমার কোনো সাহিত্য আন্দোলনের দরকার নেই। মলয় আমার চিঠি কেন ছাপিয়েছে? আমার গোপন কিছু নেই — বিষ্ণু দেকে আমি অশিক্ষিত বলেছি আগেও, কৃত্তিবাসের পাতায় ব্যক্তিগত রাগে, কারণ উনি ওঁর সংকলনে আমার কবিতা আদ্দেক কেটে বাদ দিয়েছেন বলে।
    কৃত্তিবাসে আপনার লেখা নিয়ে প্রচুর গণ্ডোগোল করেছি — তবু, এবার কৃত্তিবাসে আপনার লেখা না দেখে মন খারাপ লাগলো। এখান থেকে কোনো জিনিস নিয়ে যাওয়ার হুকুম আছে আপনার কাছ থেকে?
    ভালোবাসা।

    সুনীল

    এবার দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠির অংশ পড়া যাক, যাতে তিনি বলছেন যে মলয় কবিতা লিখতে জানে না। যদি তাইই হবে, তাহলে কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে সুনীল আমার কাব্যগ্রন্হটা প্রকাশ করলেন কেন? মলয় নামের তরুণকে হাতে রাখার জন্য?

    ৩২/২ যোগীপাড়া রোড, কলকাতা ২৮
    ৯/১১/১৯৬৫

    সমীর

    মলয়ের ৫ তারিখের মামলার বিস্তৃত বিবরণ নিশ্চয়ই ওদের চিঠিতে জানতে পারবি, বা জেনে গেছিস। সে সম্পর্কে আর লিখলাম না।
    অপরপক্ষে, মামলার রিপোর্ট কাগজে বেরুবার পর — কফি হাউসের কিছু অচেনা যুবা, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমাকে অভিনন্দন জানাতে আসে। আমি নাকি খুবই মহৎ ব্যক্তি — হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে কখনো যুক্ত না থেকেও এবং কখনো পছন্দ না করেও যে ওদের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছি — সেটা নাকি আমার পক্ষে পরম উদারতার পরিচয়।
    আমার স্ট্যান্ড আমি অনেক আগেই পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছি। আমি হাংরি জেনারেশন পছন্দ করি না (সাহিত্য আন্দোলন হিসেবে)। মলয়ের দ্বারা কোনোদিন কবিতা লেখা হবে না — আমার রুচি অনুযায়ী এই ধারণা।
    সাক্ষীর কাঠগড়ায় মলয়ের কবিতা (প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার) আমাকে পুরো পড়তে দেওয়া হয়। পড়ে আমার গা রি-রি করে। এমন বাজে কবিতা যে আমাকে পড়তে বাধ্য করা হল, সে জন্য আমি ক্ষুব্ধ বোধ করি — আমার সময় কম, কবিতা কম পড়ি, আমার রুচির সঙ্গে মেলে না — এমন কবিতা পড়ে আমি মাথাকে বিরক্ত করতে চাই না। মলয়ের তিনপাতা রচনায় একটা লাইনেও কবিতার চিহ্ণ নেই। মলয় যদি আমার ছোট ভাই হতো, আমি ওকে কবিতা লিখতে বারণ করতাম অথবা গোড়ার অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করতে বলতাম।

    সুনীল

    কাঠগড়ায় দাঁড়াবার আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা পড়েননি; কবিতাটা “শয়তানের মুখ” কাব্যগ্রন্হেও নেই। কিন্তু আমেরিকায় থাকতে তিনি লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির ‘সিটি লাইটস জার্নাল’-এর কবিতাটার ইংরেজি অনুবাদ পড়েছিলেন। পরে, এই কবিতাটা কলকাতা আর ঢাকা থেকে প্রকাশিত আমার কবিতসমগ্রতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০০৮ থেকে ঢাকার একটি সাইটে কবিতাটি নিয়ে অবিরাম বিতর্ক চলছে। ইউ টিউবে এগারোজন পাঠ করেছেন, একজন তরুণী কবিসহ। তরুণীরা আলোচনাও করেছেন, যেমন সোনালী মিত্র, তুষ্টি ভট্টাচার্য, পৃথা রায় চৌধুরী প্রমুখ। কবিতাটা বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, ফারসি ও আরবিকসহ। আমার প্রথম কবিতার বইয়ের প্রকাশক মৃত্যুর আগে এই সমস্ত ঘটনা জেনে গিয়েছিলেন। তবে পেঙ্গুইন রেনডাম হাউজ থেকে যে হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস “দি হাংরিয়ালিস্টস” প্রকাশিত হয়েছে তা জেনে যেতে পারেননি।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 | 32 | 33 | 34 | 35 | 36 | 37 | 38 | 39 | 40 | 41 | 42 | 43 | 44 | 45 | 46 | 47 | 48 | 49 | 50 | 51 | 52 | 53 | 54 | 55 | 56 | 58 | 59 | 60 | 61 | 62 | 63 | 64 | 65 | 66 | 67 | 68 | 69 | 70 | 71 | 72 | 73 | 74 | 75 | 76 | 77 | 78 | 79 | 80 | 81 | 82 | 83 | 84 | 85 | 86 | 87 | 88 | 89 | 90 | 91 | 92 | 93
  • বইপত্তর | ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১০৬৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ক্ষপণক গুপ্ত | 45.64.227.234 | ২৫ অক্টোবর ২০২২ ২১:০৬513178
  • বাঙালির মধ্যবিত্তপনা যাবে কোথায়? খালি " আমাকে কেউ বুঝলো না " সিনড্রোম। এদিকে সুনীল ক্যাম্পে লুসিড গদ্য আর গ্যালন গ্যালন আবেগের ভুসকুড়ি ; অন্যদিকে ৱ্যাশনাল ক্যাম্পের আঁতলামি। আদতে সবই খ্যাতি ও আত্মপ্রচারের মোহ। নইলে অমন ভাষায় সুনীল চিঠি লেখে! 
    নইলে পড়ন্ত বয়সে বহুজ্ঞাত, বহুপঠিত ইতিহাস নিয়ে ফের গুরুতে হ্যাজ নামাতে হয়! সুনীল-মলয় বাইনারি পেয়ে গেছে কলেজস্ট্রিটের সুসভ্য চিন্তাশীল বাঙালি। আর কী চাই!!
     
  • সম্বিৎ | ২৬ অক্টোবর ২০২২ ০৯:৪৭513184
  • সুনীলের কবিতা আমার বিশেষ ভাল না লাগলেও, সম্পাদক হিসেবে সুনীলকে কুর্নিশ জানাতে হয়। মরাচৌ কবি হিসেবে ফুটনোট হয়ে রয়ে গেলেন, তাও ওই হাংরির জন্যে। কলেজে কেউ বলেনি - মরাচৌ পড়েছিস? বলেছে - হাংরির কথা জানিস? হাংরির কথা জানতেই মরাচৌ খামচানো। পঁয়তিরিশ বছর আগে।
  • Ranjan Roy | ২৬ অক্টোবর ২০২২ ১১:১৪513188
  • আমি কবিতা বুঝি না। তাই মলয় বাবুর কবিতা নিয়ে কোন ফুট কাটবো না।
     
    কিন্তু মলয় রায়চৌধুরির গদ্য আমার বেশ ভালো লেগেছে।
    ছোটলোকের ছেলেবেলা বেশ ভাল ।
  • Malay Roychoudhury | ২৮ অক্টোবর ২০২২ ১১:৪৮513245
  • ধন্যবাদ হে পাঠকগণ । আপনাদের মাথার ধুলো আমার লেখার চৌকাঠে পড়েছে তা্-ই আমার গ্রেট প্রাপ্তি । 
  • যোষিতা | ২৮ অক্টোবর ২০২২ ১৪:৩২513249
  • আমরা সকলেই পড়েছি। তবে সকলে সেটা জানায় নি।
  • সিএস | 103.99.156.98 | ২৮ অক্টোবর ২০২২ ১৫:০৪513250
  • এখানেই লিখে রাখা গেল।

    মলয়বাবু পর পর বেশ কিছু লেখা লিখে যাচ্ছেন, উসখুস করি কিছু একটা লেখার জন্য। পাশেই রয়েছে ওনার 'আমার অমীমাংসিত শুভা' নামের বইটি। প্রথম প্রকাশ যখন হয়েছিল - প্রকাশের দিন দেখছি ১৩ই মাঘ, ১৩৭১ - সেই সময়ের বইটিই। বিশ পাতার বইটি, এখন পোকায় কাটা, ফুটো হয়ে যাওয়া। প্রথম পাতায় দেখছি মলয়বাবুর সই করা, ১৮.৫.৬৫ তারিখে বইটি কবি শ্রী শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়কে দিয়েছিলেন; কবি হিসেবে অন্য এক কবিকে ! তো সেই বই ২০০১ সালে আমি গড়িয়াহাট গোলপার্কের পুরোন বইয়ের দোকান থেকে পেয়েছিলাম, আরো অনেক বাংলা পত্রিকা ও কবিতার বই সেই দোকানে ছিল। জানতে পেরেছিলাম শরৎকুমার মুখোপাধ্যাউ তাঁর অনেক বই - পত্রিকা দোকানে দিয়ে গেছেন, সে সবের মধ্যে থেকেই পাওয়া এই বইটি।

    তো দীর্ঘ কবিতাটির মধ্যে থেকে লাইনগুলো এখনো ঝাপটা মারে দেখি, চীৎকার, দীর্ঘশ্বাস আর ইমেজ ও উপমার লাফ দেওয়া সমেত, যদিও জানি এইসবই হাংরিদের সমালোচনার বিবিধ দিক, এখনো যা হয়ে চলেছে। কবিতার উদ্দিষ্ট শুভাকে কি বদলে নিয়ে 'শুভ' হিসেবে পড়ব অথবা 'প্রেম' হিসেবে - বা অতি পুরাতন কাল থেকে যা হয়ে চলেছে, - কবিচরিত্রের বদলে যাওয়া Muse হিসেবে, সেই সব বিশ্লেষণের বিষয় যদিও।
  • Ranjan Roy | ২৮ অক্টোবর ২০২২ ২২:৪৬513264
  • সি এস,
     উরি শ্লা! 
    আপনার পোস্টটি একটি দীর্ঘ কিন্তু ইন্ট্রেস্টিং আলোচনার সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল।
    মলয়বাবুর ধরতাইয়ের প্রত্যাশায়!!
  • Malay Roychoudhury | ২৯ অক্টোবর ২০২২ ১০:৩৮513269
  • প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার
    ................................................................
    ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
    আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
    আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
    সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
    শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ-আঙরাখার ভেতরে চলে যেতে দাও
    চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
    সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
    আর আমি পার্ছিনা, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
    আমি যানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
    প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
    শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
    মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
    তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম
    কিন্তু কিছুই ভালো লাগে না আমার কিছুই ভালো লাগছে না
    একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
    ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন
    কবিতার আদিত্যবর্ণা মুত্রাশয়ে
    এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ
    সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা
    ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
    শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়
    দিতেই হবে শুভাকে
    ওঃ মলয়
    কোল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
    কিন্তু আমাকে নিয়ে কী কোর্বো বুঝতে পার্ছিনা
    আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
    আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
    আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
    প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
    অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
    শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার
    অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্থতা
    যোনিকেশরে কাঁচের টুকরোর মতো ঘামের সুস্থতা
    আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
    আমি বুঝতে পার্ছিনা কী জন্য আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
    আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণ চৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি
    আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোর্তে হবে
    শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমাকে
    জন্মমুহুর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
    আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
    মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
    তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
    শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
    তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাততাড়িত কঙ্কাল
    আমাকে তোমার গর্ভে আমারি শুক্র থেক জন্ম নিতে দাও
    আমার বাবা-মা অন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
    সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?
    আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
    শুভা না থাকলে আমি কি পেশাদার ভালোলোক হতুম মৃত ভায়ের
    ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
    শুভা, ওঃ শুভা
    তোমার সেলোফেন সতিচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও
    পুনরায় সবুজ তোশকের উপর চলে এসো শুভা
    যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়
    ১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে
    তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ
    পাঁজর নিকুচি-করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে
    হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
    আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
    মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছিনা
    তুল্কালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়
    সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
    শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব
    কবিতার জন্য আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
    শুভা
    আমাকে তোমরা ল্যাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোর্তে দাও
    দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
    বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে
    কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে
    কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁ পেচেছাপে বয়ে যাইনি
    কেন আমি রজঃস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায়
    অথচ আমার নিচে চিত আধবোজা অবস্থায়
    আরাম গ্রহণকারিনী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার
    এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
    আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
    এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
    মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে 
    আমি মরে যাব
    ওঃ এ সমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে
    আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না
    পায়জামার শুকিয়ে যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে
    ৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
    ঝাঁকে ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
    এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
    হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌন-পর্চুলায়
    ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখী আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
    কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠ খেয়োখেয়ি।'
     
    চলচ্চিত্র
    ২০১৪ সালে এই কবিতা অবলম্বনে মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায় এবং হ্যাশ তন্ময় একটি নির্বাক স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার চলচ্চিত্রটি ব্রিটেনের নো গ্লস লিডস্‌ ইণ্টারন্যাশানাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সহ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, প্যারিস, বার্সেলোনা, জার্মানি, স্পেনসহ মোট ১২টি দেশের ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অফিসিয়াল সিলেকশনে পুরস্কৃত ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন