ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • জোসনা নামের মেয়েটি যে কারণে পালিয়ে গেল: মো. রেজাউল করিম 

    মো. রেজাউল করিম লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ২৭ জানুয়ারি ২০২২ | ২৭৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • জোসনা নামের মেয়েটি যে কারণে পালিয়ে গেল: মো. রেজাউল করিম

    জোসনা নাম শুনে এ-কথা ভাবার অবকাশ নেই, কোনো এক জোসনা-প্লাবিত রাতে মেয়েটির জন্ম হয়েছিল কিংবা মেয়েটির মুখাবয়ব এমনই যে মনে হয় যেন সেখান থেকে জোসনা’র মতো আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। বস্তুত তার জন্ম হয়েছিল কোনো এক ঘোর কৃষ্ণ রজনীতে, প্রবল বর্ষণমুখর রাতে। তার মুখাবয়ব শুধু নয় শরীরের রঙই কৃষ্ণ বর্ণের। বিয়ের পাঁচ বছর পরেও তার হালকা-পাতলা শরীরে এতটুকু মেদ জমেনি কিংবা তার স্তনজোড়া এতটুকু স্ফীত হয়নি যে তাকে দেখে বিবাহিতা নারী মনে হয়।

    জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরে রাতের শেষপ্রহরে জোসনা’র মা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। ফজরের আযানের পরে পাশের ঘর থেকে তার চাচি এসে নবজাতককে নিজের স্তন্যদান করে ক্ষুধার কান্না থামিয়েছিল। ক্ষুধার কান্না তখনকার মতো থামলেও মেয়েটি জনমভর ক্ষুধার সাথেই বসবাস করেছে। বছর গড়ালে জোসনা’র মালিকানা হস্তান্তর করা হয় তার দাদির কাছে। তখন তাকে বিন্নি ধানের চাল দিয়ে রান্না করে ভাতের লাল-রঙা ফ্যান খাওয়ানো হত; কিছুদিন পরে ভাত চটকে নরম করে হেলেঞ্চা কিংবা কলমি শাকের ভর্তা- এই ছিল তার প্রধান খাবার; ততদিনে তার দরিদ্র বাবা আলতু মিয়া আর একটা বিয়ে করে ঘরে নতুন বউ এনেছে। বিয়ে-বাবদ যৎসামান্য খরচ এ-অঞ্চলের প্রথা অনুযায়ী যৌতুক হিসেবে মেয়ের বাপ দিয়ে দেওয়ায় দরিদ্র ও রোগশোকগ্রস্ত আলতু মিয়াকে টাকার জন্য এর-ওর কাছে হাত পাততে হয়নি।

    দাদা কবে দাদিকে ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র সংসার পেতেছে তা এই পরিবারের সকলে ভুলে গিয়েছে। দাদির জীবন অতিবাহিত হয় তার পেটের ছেলেদের ঘরে খেয়ে না-খেয়ে, অথচ সেই মানুষটারই কাছে দেয়া হয়েছে মাতৃহারা এক কন্যাশিশুকে। জোসনা’র বাবা কোনোদিনই তার মেয়ের ভালো-মন্দ খোঁজ রাখেনি। শিশু জোসনা বড়ো হতে থাকল, কিন্তু বুঝতে পারল না কে তার আপন; বাবা, চাচি নাকি দাদি?

    বার-তের বছর বয়স হতেই জোসনার বিয়ে নিয়ে তার বাবা ভাবতে শুরু করে। কিন্তু সরকারি আইনের বিধিনিষেধের কারণে গ্রামের কাজী রাজি হয় না। এদিকে জোসনা’র দাদি এক নিশুতিরাতে কাউকে কিছু বুঝতে না-দিয়েই পরপারে চলে গেলেন। পাশেই শোয়া জোসনা সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারল, এই পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার অবলম্বনটুকু পরপারে পাড়ি জমিয়েছে।

    মোটা অঙ্কের যৌতুক ছাড়া দরিদ্র আলতু মিয়ার মাতৃহারা কন্যা রোগা-পাতলা কালো মেয়ে জোসনাকে বিয়ে করতে রাজি হয় না কোনো ছেলে। আলতু মিয়া যৌতুক দেয়ার সামর্থ্য রাখে না। জোসনা’র ষোলো বছর বয়সে কাজী রাজি হলেন বিয়ে পড়াতে; জোসনা’র জন্মসাল কোনো দলিলে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়Ñ এই বিশ^াস কাজী সাহেবের ছিল। জোসনা যেহেতু স্কুলে যায়নি সেহেতু সেখানে খোঁজ করলেও তার বয়স জানা যাবে না। ইউনিয়ন পরিষদের সচিবকে সামান্য বখশিস দেয়ায় তিনি দয়াপরবশ হয়ে মেয়েটার জন্মসাল দু’বছর পিছিয়ে লিখে জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন।

    জোসনা’র জন্য বাসররাতটি ছিল চরম যাতনাময়। জন্মাবধি শুয়েছে সে দাদির সাথে, দূর থেকে বাবার শরীর থেকে আসা বিড়ির গন্ধ পেয়েছে, কিন্তু তার স্বামীর শরীর দিয়ে যে গন্ধ বের হচ্ছে তার সাথে জোসনা’র পরিচয় ছিল না। থাকবেই-বা কী করে? জোসনা’র বাপ-চাচারা বিড়ি-সিগারেট খেলেও কেউ গাঁজা খায় না। গাঁজার দুর্গন্ধে স্বামীর পাশে বসে নিশ্বাস নেয়াও তার জন্য নিদারুণ কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিয়ের আসরে জোসনা এই দুঃসহ গন্ধ পায়নি। জোসনা জানত না গাঁজার গন্ধ কেমন কিংবা গাঁজাসেবীর পাশে বসে থাকা কতটা কষ্টকর; ভয়ে সে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারে না। হাঁটু মুড়ে ডান হাতের কনুই দিয়ে নাক চেপে সে বসে ছিল।

    কিছুক্ষণ আগে গাঁজা সেবন করে-আসা তার স্বামী তোজাম্মেল হক ওরফে তোজাম ভাবছিল, নববধূ লজ্জায় এভাবে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। স্বামীর সাথে কথা-বার্তার বিনিময় তেমন কিছু না-হলেও তার স্বামী বেশ কয়েকবার জোসনা’র উপরে উপগত হলোÑ জোসনা’র মনে হলো, তার স্বামী তাকে চরম নির্যাতন করছে। বিয়ের আগের দিন পাশের বাড়ির চাচি জোসনাকে নারী-পুরুষের সঙ্গমের ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলেছিলÑ পুরুষের সাহচর্যে বাসররাত কেমন হয়, সে-বিষয়ে নানান কথা জোসনাকে  বলে গেলেও শুধুমাত্র দাদির তত্ত্বাবধানে বেড়ে-ওঠা জোসনা তখন কথাগুলোর মর্ম বুঝতে পারেনিÑ বাসররাতে জোসনা তা বুঝল।

    সূর্য তখন তার দৈনন্দিন যাত্রাপথে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে। বাবার বাড়িতে জোসনাকে উঠতে হতো কাকডাকা ভোরে। ঘুম থেকে উঠে প্রাকৃতিক কাজ সেরেই বাড়ির উঠোন ঝাড়– দেয়ার মধ্য দিয়ে তার দিনের যাত্রা শুরু হতো। আজ এখানে কাকডাকা ভোরে না-হলেও ঘুম যখন ভাঙল তখন পাখির কিচিরমিচির বন্ধ হয়েছে, দূরে কোথাও মানুষের হল্লা শোনা যাচ্ছে। তখনও তার স্বামী একরকম বেহুঁশ হয়েই ঘুমোচ্ছিল। প্রকৃতির ডাকে জোসনার ঘুম ভেঙেছিল। বিছানাতে শুয়ে উসখুশ, এদিক-ওদিক করায় তার স্বামীর ঘুম ভাঙল। জোসনা বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে ধপাস করেই যেন বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। তোজাম্মেল জোসনা’র শীর্ণ দেহখানি ধরে বেশ যত্ন করেই তাকে বিছানা থেকে নামাল। বাম বাহু ধরে পায়খানাতে নিয়ে গেল; চাটাই-ঘেরা পায়খানা, তার পাশে একটা টিউবয়েল।

    প্রাকৃতিক কাজ সেরে বের হয়ে জোসনা দেখে তোজাম্মেল ওরফে তোজাম দাঁড়িয়ে রয়েছে, জোসনা পানি খাবে বলায় সে ঘর থেকে মেলামাইনের একটা গøাস নিয়ে এল। টিউবয়েলের ঠাÐা পানি খেয়ে জোসনা বেশ ভালো বোধ করল। আবার ঘরে এসে বাপের বাড়ি থেকে আনা ব্যাগ থেকে টুথ পাউডার বের করে আস্তে আস্তে কল চেপে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। জামা-কাপড়, শরীরেও কী উৎকট গন্ধ- কিন্তু কলের পাশে কোনও আড়াল নেই যেখানে গোসল করা যায়। ক্ষুধায় তখন পেটের মধ্যে চেপে চেপে ধরছে। তোজাম তাকে ডেকে নিয়ে গেল পাশের ঘরে, সেখানে চৌকিতে শুয়ে রয়েছে এক বৃদ্ধাÑ চোখ বন্ধ; ঘুমিয়ে, না জেগে- তা বোঝা যায় না।

    তোজাম জানালÑ আমার মা; মানে তোর শাশুড়ি- বেশিদিন বাঁচবে না। সারাদিন শুয়ে থাকে, থালায় ভাত নিয়ে দিলে খাবে, না-দিলেও সাড়াশব্দ করবে না। মাঝে-মধ্যে লাঠিটা হাতে ধরিয়ে দিবি, পায়খানাতে হেঁটেই যাবে, তুই একটু পাশে-পাশে থাকবি। জোসনা দেখল, পক্ককেশ এক বৃদ্ধা উপর দিকে মুখ করে শুয়ে, উজ্জ্বল তামাটে রঙের মুখখানাতে অসংখ্য বলিরেখা। ঠোঁটজোড়া কিছুটা ফাঁক হয়ে রয়েছে, জীবিত না মৃত ঠাহর করা যায় না। দেখে মনে হয়, প্রাচীন এক নারী ক্লান্ত-শ্রান্তÑ ঘুমোচ্ছে বেহুঁশ।

    তোজামের ডাকে জোসনা ঘর থেকে বের হয়ে এল। তোজাম শোবার ঘরের পাশেই পাশে চাটাই ও উপরে টিন-দেয়া রান্নাঘর দেখিয়ে দিল। জানাল- গোসলখানা নেই, টিউবয়েলের পাশে বসে বসে গোসল সেরে ঘরে গিয়ে কাপড় পাল্টাতে হবে, বাড়ির চারপাশে ঘন গাছপালা, এদিকটায় কেউ আসে নাÑ তাই তেমন সমস্যা নেই। তোজাম স্বগতোক্তি করল, ‘খাওয়া দিইয়ি যায়নি কেউ? হারামি’র বাচ্চা। সকালের খাবার দিইয়ি যাওয়ার কথা অথচ দেয়নি, মা-ও না-খ্যায়া রয়ছে। তুই ঘরে বয়, আমি আসতিছি।’

    খানিক বাদেই তোজাম্মেল ফিরে এল। পেছনে কিশোরবয়সী একটা ছেলে দুই হাতে গামলা ধরে রেখেছে, গামলার উপরে দুটো বাটি। তোজাম্মেল গামলা ও বাটি ছেলেটার কাছ থেকে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। জোসনাকে বলল, আয়; জোসনা পেছন পেছন রান্নাঘরে ঢুকল, ততক্ষণে তোজাম্মেল বাটির ঢাকনা তুলে ফেলেছে। এক বাটিতে আলুভর্তা আর এক বাটিতে লাউয়ের তরকারি; গামলায় ভাত। তোজাম্মেল নিজেই তিনটি থালা ও গøাস নিয়ে কলপাড়ে গিয়ে ধুয়ে নিয়ে এল। ভাত-তরকারি তিন প্লেটে সাজিয়ে একটা প্লেট শাশুড়ির ঘরে নিয়ে খাওয়াতে বলল জোসনাকে। শাশুড়িকে খাওয়ানোর পর রান্নাঘরে এসে দেখে তোজাম্মেল খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘরে চলে গিয়েছে। জোসনা ভাত খেয়ে গামলা, বাটি, থালা নিয়ে কলপাড়ে গেল। ধোয়াধুয়ি করে রান্নাঘরে দু’পাশে ইটের উপরে কাঠের তক্তা— তাক বলা যেতে পারে, সেখানে রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল— কিংকর্তব্যবিমূঢ়, কী করা উচিত তাই চিন্তা করতে থাকল।

    কিছুক্ষণ পরে রান্নাঘর ছেড়ে শোবার ঘরে ঢুকল, ঘর ততক্ষণে সিগারেটের ধোঁয়ায় প্রায়ান্ধকার। তোজাম্মেল তাকে বসতে বলল, পুরনো জীর্ণ চাদর, তার নিচে সম্ভবত মোটা কাঁথা। সংকোচ নিয়েই মাথায় ঘোমটা টেনে চৌকির এক কোনায় বসল জোসনা। তোজাম্মেল মুখ খুলল, ‘শোন্ বউ, তোর ভাগ্য ভালোই; তোর দেবর, ননদ নিইকো। এ বাড়িত্ তোর একডা ঝামেলাই পোহাতে হবি, শাশুড়িক্ একটু দেখাশোনা করতি হবি— বাকি সুময়ে রান্নাবান্না কইরি শুয়ি ঘুমাবি। ইছাড়া তোর কুনু কাম নিইকো। আশেপাশে বাড়িঘর তেমন নিই, আর আমি গরিব মানুষ, অইন্যি মানুষ ই-বাড়িত্ তেমুন কেউ আসবি না।’

    জোসনা কী বুঝল কে জানে, বুঝে অথবা না-বুঝে সে ঘাড় কাত করল। তবে এক সকালেই সে বুঝে গেল, বাপের বাড়িতে যেমন খেয়ে-না-খেয়ে তার দিন কেটেছে, স্বামীর বাড়িতেও সেভাবেই তার দিন কাটবে। তার বাবা যে লোকটার সাথে তার বিয়ে দিয়েছে সে বোধ হয় পৃথিবীর নিকৃষ্টমানের বিড়ি-সিগারেট খায়। এই লোকের পাশে শুয়ে তার রাতগুলো কাটাতে হবে এটুকুই তখন মাথায় এল, পূর্ব-রাতের অভিজ্ঞতাও তার মধ্যে ভীতির সঞ্চার করল।

    পরের রাতগুলোতে তোজাম জোসনা’র শরীর নিয়ে মাতামাতি করলেও জোসনা’র পক্ষে তেমন কোনো অস্বস্তির ব্যাপার ঘটেনিÑ তোজাম অনেকদিন পর তাকে পেয়ে হাপুস-হুপুশ করলেও গাঁজা খাওয়ার কারণে সে আসলে পুরুষত্ব অনেকটাই হারিয়েছে। জোসনা তখনও জানে না যে তার স্বামী গাঁজা সেবন করে, এর আগে ’গাঁজা’ শব্দটির সঙ্গে তার পরিচয় ঘটলেও গাঁজার গন্ধ কেমন তা  সে জানতও না।

    বেশ কিছু সময় ধরে তোজাম নিশ্চুপ রইল। খানিক বাদে তোজাম জোসনাকে তার শাশুড়ির ঘরে নিয়ে চাল-ডাল ও কিছু সবজি দেখিয়ে রান্না করতে বলল। বিয়ের পরের দিন জোসনা নিজে হাতে রান্না করে নিজে খেয়ে, স্বামী ও শাশুড়িকেও খাওয়াল। রাতের খাওয়ার সময় তার হৃদয়-মন অস্থির-অশান্ত হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পরেই তার ওপরে যে বিভীষিকা নেমে আসবে স্বামী তার শরীরটাকে দলাই-মলাই করে, কামড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলবেÑ সেই দুশ্চিন্তায় শুকনো শাক-ভাজি মাখানো ভাত তার গলা দিয়ে নিচে নামছিল না, বেশি করে ডাল নিয়ে কয়েক মুঠো ভাত যেন ঠেলে ঠেলেই পেটে চালান করল জোসনা।

    ভাত খেয়ে তোজাম বাইরে গেল, কিছুক্ষণ পরে ফিরেও এল সেই বিদঘুটে গন্ধ নিয়ে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই কিছুক্ষণ পরে কুড়ুৎ কুড়ুৎ শব্দে তার নাসিকা-গর্জন শুরু হল। জোসনা বুঝল, তার স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে। জোসনা যে বিভীষিকার আশঙ্কা করেছিল, রাতে তেমন কিছু ঘটেনি। ঘুমিয়ে পড়ার আগে জোসনা ভাবল, গ্রামের এক বাড়িতে নতুন বউ এলো, অথচ সারাটি দিনে একজন মানুষ তাকে দেখতে এলো না, এর চেয়ে বেশি কিছু ভাববার ক্ষমতা বিধাতা তাকে দেননি। স্বামীর কাছ থেকে কিছুটা দূরে নাকে কাপড় দিয়ে সে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

    পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙতে জোসনা দেখল, সূর্য মাটি ছাড়িয়ে বেশ উপরে উঠেছে। পাখিদের কিচির-মিচির তখন নেই, কিন্তু কাকের বেসুরো কা-কা ডাক পরিবেশকে অশান্ত করে তুলেছে। বালিশে মাথা রেখেই ঘরের দরজায় একটা কুকুর দেখে আর শুয়ে না-থেকে বাম হাতে ভর দিয়ে শরীরটাকে ঠেলে তুলল। শাশুড়ির ঘরে গিয়ে দেখল, শাশুড়ি তখনও ঘুমে, তোজামের দেখা পাওয়া গেল না। পেটে টান পড়তেই জোসনা এমনভাবে রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল যেন এ-বাড়িতে সে কতদিনের পরিচিত মানুষ। শাশুড়িকে টেনেটুনে পায়খানা করিয়ে ভাত খাওয়াল। বৃদ্ধা কথা বলেন না, নাকি বলতে পারেন নাÑ তা সে বুঝল না, তার কৌতুহলও হলো না।

    দ্বিতীয় দিনে এ-বাড়িতে এক আগন্তুকের দেখা পাওয়া গেল, আশে-পাশেই কোনও বাড়িতে থাকেন হয়ত মহিলা- নতুন বউ দেখতে এসেছেন। তাঁর চেহারা দেখে জোসনা উপলব্ধি করল শীর্ণকায়া, কৃষ্ণবর্ণের ছোটখাটো মেয়েটাকে বউ হিসেবে তাঁর পছন্দ হয়নি। পছন্দ না-হবার অন্য কোনও কারণও থাকতে পারে। মহিলা জোসনা’র সাকিন-ঠিকুজি জানতে চাইলেন; আরও জানতে চাইলেন গায়ে-গতরে মাংস নেই কেন। পান চিবুতে চিবুতে বাড়ির আঙিনার বাইরের দিকে অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘তোজামের বউ হতি হলি গায়ে-গতরে মাংস থাকতি হয়, চেলাকাঠ আর রান্নাঘরের খড়ি দিয়ি পিটন শুরু করলি মাইরগুলান সব হাড্ডিতেই পড়বিনি।’
               
    স্বামীর হাতে পিটুনি খাওয়ার অভিজ্ঞতা না-থাকায় সেই সম্ভাবনার কথা শুনে জোসনা তার ভয়াবহতা বুঝতে পারল না, তবে অজানা আশংকায় একটা শিরশিরে অনুভ‚তি তার ঘাড় থেকে মেরুদণ্ড হয়ে পা বরাবর নেমে গেল। চলে যাবার কথা বললেও মহিলা জোসনা’র আরও কাছে এসে বসলেন।

    তিনি যা বললেন, তা শুনে জোসনা’র  বাবা- যার কাছে শুধু আশ্রয় ও দু’মুঠো ভাত পেয়েছে, আদর-স্নেহ-ভালোবাসা কস্মিনকালেও পায়নি- সেই বাবার প্রতি অভিমানে তার চোখদুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠল।

    আগন্তুক মহিলা জানালেন, তোজাম বাঁজা পুরুষ। আগে সে আরও দুটো বিয়ে করেছে, নিয়মিত ভাত-কাপড় দিতে না-পারলেও বাড়িতে এসে ভাত চায়, না পেলে বউকে পেটায়। প্রথম বউ বছরতিনেক স্বামীর অত্যাচার মেনে নিলেও একসময় পাশের জঙ্গলে গাছে ফাঁসি নিয়েছে। তার পরে গাঁয়ের আরও দুটো মেয়ে ঐ একই গাছে ফাঁসি নিয়েছে। সেই থেকে পাড়ার ঐ জঙ্গলের দিকটার নাম হয়ে গেছে ফাঁসিতলা। এই গাঁয়ের আসল নাম ফুলতলা। প্রথম বউ ফাঁসি নেয়ার দুই-তিন মাসের মাথায় তোজাম আবার বিয়ে করল। দ্বিতীয় বউটার বাচ্চা-কাচ্চা হল না। পাড়া-প্রতিবেশী সবাই বুঝল বউয়ের দোষ নেই, তোজামই বাঁজা। তোজাম জুয়া খেলে টাকা-পয়সা পেলে চাল-ডাল আর তেল, মশলা কিনে আনে। তরকারি কেনার টাকা প্রায় সময়ই থাকে না। সামনের বিল থেকে তুলে আনা কলমি শাক, হেলেঞ্চা শাক, শাপলার ডাঁটা হচ্ছে এ-বাড়ির নিয়মিত তরকারি। খেয়ে-না-খেয়ে পাতলা-পায়খানা করতে করতে গতমাসেই তোজামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরল। আর এই মাসেই তোজাম অঅর একটা বিয়ে করে আনল শুধু রান্নার জন্যÑ নিজের আর ওর বুড়ি মায়ের খাওয়ার জন্য।’

    ‘হারামজাদা চইলি আসবার পারে’ বলে আগন্তুক মহিলা দ্রæত প্রস্থান করলেন।

    জোসনা মহিলাটির কথা শুনে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। চিন্তা করার ক্ষমতা তার রইল না। শক্তি রহিত, হাত-পা অনেকটাই অসার। তবুও কিছুক্ষণ পরে উঠে শাশুড়ির ঘরে গেল। চাল, ডাল নিয়ে ঢুকল রান্নাঘরে— দুপুরের খাবার রান্না করতে হবে। তোজাম সকালে কোথায় গিয়েছে কে জানে, দুপুরে আসলে তো খাবার দিতে হবে।

    জোসনা’র বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে গেলেও, জোসনার বাবা তাকে নিজ বাড়িতে নেয়া তো দূরের কথা, দেখতেও আসেনি; তোজামও কোনোদিন ও-মুখো হয়নি। এর মধ্যে তোজামের মা মারা গত হয়েছে। তোজামের মা মরে যাওয়ায় তার যেন ভালোই হয়েছেÑ এখন চাল বাবদ খরচ একটু কম হয়।
     
    বিয়ের পরের দিন সেই আগন্তুক মহিলা যা বলেছিল, তার সত্যতা সম্বন্ধে জোসনা’র কোনো সন্দেহ রইল না।— জোসনা নিজের শরীর দিয়ে রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করেছে তা। সেদিনের সেই আগন্তুক মহিলা তার পড়শি; বিলে শাক তুলতে যাওয়া কিংবা আসার সময় চোখাচোখি হয়, তবে কথা হয় না। এ-পাড়াতে তোজাম অনেকের মাঝে থেকেও একাকী, সে কারোর সাথে মেশে না অন্যেরাও তাকে এড়িয়ে চলে। বিলে শাক কিংবা শাপলা তোলার সময় অবিবাহিতা তরুণী-কিশোরীদের সঙ্গে দেখা হয়, তারাও দরিদ্র। জোসনা ছাড়া এ-গাঁয়ে বিবাহিত নারীরা বিলে শাক কিংবা শাপলার ডাঁটা তুলতে যায় না। বিল থেকে ফেরার সময় পড়শিদের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলে জোসনা’র মনে হয়, তারা বুঝি করুণাভরা দৃষ্টিতেই তাকে দেখছে।

    সেদিন রাত্রি প্রথম প্রহর। নিজে খেয়ে, তোজামের খাবার চৌকির পাশে পাটিতে গুছিয়ে রেখে কুপিটা জ্বালিয়েই শুয়েছে জোসনা স্বামীর অপেক্ষায়। গোটা বাড়ি ফাঁকাÑ দ্বিতীয় কোনো প্রাণী নেই। চরাচরে তখন অসীম নৈঃশব্দ, মাঝে মাঝে পেঁচার ডাক শোনা যায়। আজ ঝিঁঝিঁগুলো যেন সাঁঝরাতেই ঘুমিয়েছে। মাঝে মাঝে রাত-জাগা পেঁচার ডাক কানে ঢুকে জোসনা’র মনে এক ধরনের ভীতি তৈরি করে। দরজায় পরিচিত খুট খুট আওয়াজ আর তোজামের কণ্ঠ শুনে দরজার শিকল নামিয়ে ছিটকানি খুলে দিল।

    প্রতিদিনের মতোই তোজামের শরীর থেকে গাঁজার তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে- জোসনা কলস থেকে এক বদনা পানি ঢেলে গামছাটা এগিয়ে দিল। হাত-মুখ ধুয়ে তোজাম শাক-ভাজি আর ডাল দিয়ে পেট ভরেই খেল। কুপিবাতির স্বল্প আলোয় জোসনা খেয়াল করল, স্বামীর চোখদুটো অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ একটু বেশিই লাল, হয়তো গাঁজা বেশি খেয়েছে। মুখমÐলও খুব ভার, খাওয়ার আগে কিংবা পরে কোনও কথাই বলেনি তোজামÑ খাওয়া শেষে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টেনে শেষ করল, তাকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে। ঘরে এসে জোসনাকে বলল-
    ‘চল, এক জায়গায় যাতি হবি।’
    ‘এত রাইতে কুথায় যাতি হবি আমাক্?’
    ‘আমার বন্ধুর বউয়ের বাচ্চা হবি, দাই পাওয়া যাচ্চে না। সিখানে তার মা আছে, তুইও থাকবি, তাড়াতাড়ি কর।’

    স্বামীর কথায় জোসনা বাসা থেকে বের হয়ে অন্ধকারে মাটির রাস্তায় হেঁটে চলল, দু’জন মানব-মানবী- স্বামী-স্ত্রী তারাÑ কোথায় যাচ্ছে তোজাম জানে, জোসনা জানে না। রাত বুঝি বারটা, রাস্তার দু’পাশে ঝিঁঝিঁ পোকা অবিরাম শব্দ করে চলেছে। তোজামের হাতে টর্চলাইট থাকলেও তা সে জ্বালাচ্ছে না, দশমীর চাঁদের আলোতে রাস্তা বেশ দেখা যায়, জোনাকীপোকারা ওদের পথ চলতে সহায়তা করছে।

    তোজাম জোসনা’র সাথে বাড়িতেও খুব কম কথা বলে। এই নিশুতিরাতে পথপ্রদর্শক তোজাম স্ত্রীকে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করছে না। কথা বলতে গেলে যা বলতে হবেÑ তা এখুনি জোসনাকে বলা যাবে না। গাঁজার প্রভাবে তোজামের চিন্তা করার শক্তি থমকে গেছে- সে শুধু এতটুকুই মনে করতে পারছে জোসনাকে গন্তব্যে নিয়ে যেতে হবে।

    আধঘণ্টা হাঁটার পর মাটির রাস্তা থেকে শুকনো বিলের মধ্যে নেমে পড়ল ওরা। রাস্তা বলা যায় না, তবে মানুষ চলার কারণে প্রায় দু’হাত চওড়া পায়ে-হাঁটা পথ তৈরি হয়েছে। দশমীর চাঁদের আলো বৃক্ষশূন্য উন্মুক্ত বিলকে যেন গ্রাস করেছে, দু’পাশে গাছপালা থাকায় রাস্তা তেমন আলোকিত ছিল না। চাঁদের আলোতে জোসনা সামনে তাকিয়ে ঝোপ-ঝাড় ঘেরা একটা বাড়ি দেখতে পেল। ওটাই তার গন্তব্য বলে ধরে নিল সে। তার পঞ্চ-ইন্দ্রিয় তাকে তার আপাত-গন্তব্য ঠিকই জানিয়ে দিয়েছে। তার মনে ভীতিও সৃষ্টি হয়েছে। ঝোপ-ঝাড় পেরিয়ে বাড়ির উঠোনে পা রেখে গাঁজার ধোঁয়া ও তীব্র গন্ধে তার ভীতি আরও বেড়ে গেল। পোয়াতি মেয়ের পেট খালাস করতে হবে, সেই বাড়িতে এভাবে কেউ গাঁজা খেতে পারে কিনা তা তার মনে সংশয় সৃষ্টি করল, তার পা আর এগোচ্ছিল না।

    আবার ভাবল তোজামের বন্ধুর বাড়ি, সে তো তোজাম থেকে ভিন্ন রকমের হবে না, সে-ই হয়তো গাঁজা খাচ্ছে। তোজামের ডাকে সম্বিত ফিরে পেল। ‘আয়, এই ঘরে আইসি পড়।’ তোজাম আঙুলের উল্টো দিক দিয়ে টোকা দিল, দরজা খুলে গেল। কোনো মানুষজন জোসনা’র চোখে পড়ল না। আবারও তোজামের কণ্ঠস্বর শোনা গেল,  ‘আয় এই ঘরে’।

    মানুষ অনেক সময় আসন্ন বিপদের সংকেত পায়, সংকেত পেলেও দ্বিধার কারণে সরে আসতে পারে না, অনেক সময় এড়ানোর পথও থাকে না; বিপদ এড়ানোর পথ জোসনা’র ভাগ্যেও ছিল না। হয়তো তার জীবনের পাতায় এই ঘটনাটা ছিল পূর্বনির্ধারিত।

    ঘরে প্রবেশ করামাত্রই কেউ-একজন তোজামকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজার খিল এঁটে দিল। ঘরে জ্বলছে একটা হেরিকেন, গাঁজার ধোঁয়ায় হেরিকেনের আলো ম্রিয়মাণ। কোনোরকম সুযোগ না-দিয়েই দু’জনের একজন জোসনাকে পেছন থেকে জাপটে ধরল; অপরজন গামছা দিয়ে তার মুখ পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলল।

    তোজামকে যে ধাক্কা দিয়েছিল সে ঘুরে জোসনার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘শোন্ মাগী, তোর ভাতার জুয়া খেইলি এক মাসে আমাদের কাছে সুমানে হাইরিছে। আমরা দশ হাজার টাকা পাই, ও কুনুদিনও ট্যাকা দিতি পারবি না। কাইল আবার খেলার জন্য আরও এক হাজার টাকা ধার নিইছে। আর তোক্ আমাদের কাছে তিন রাইতের জন্যি বেইচি দিইছে, তুই আজ দিয়ি তিনরাত আসবি। ঐ হারামজাদা তো বাঁঝা। আমরা তোর পেট বানা দেবোনে।’ বলেই তিনজন তাকে ঠেলে চৌকিতে তুলল।

    গাঁজার কল্যাণে জোসনা’র স্বামীর মতোই এদেরও পুরুষত্ব-শক্তি প্রায় নিঃশেষিত- কিন্তু হাত-পা-আর দাঁতের ব্যবহার করে জোসনা’র শরীরকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলল তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই। অল্প সময়ের মধ্যেই পশুতুল্য মানুষগুলোর মর্ষকামপর্ব শেষ হয়ে গেল। জোসনা’র একবার শুধু মনে হয়েছিল, কোনো নারীর স্বামী এমনতরো কাজও করতে পারে?

    জোসনাকে চৌকিতে শুয়ে থাকতে বলে তিনজনই ঘুমিয়ে পড়েছিল, একটু পরে ঘুম থেকে উঠে আবার জোসনা’র শরীর ওলট-পালট করবে বলে জানিয়ে রেখেছে তারা। জোসনা কাপড়-চোপড় ঠিকঠাক করে নিঃশব্দে খুব সাবধানতার সাথে দরজার ছিটকানি খুলে ঘর থেকে বের হয়ে এল। নরপশুগুলোর একজন কাৎ হয়ে মাথার নিচে ডান হাত ভাঁজ করে দিয়ে মাটিতে শুয়ে রয়েছে। চোখজোড়া ঈষৎ খুলে সে জোসনার চলে যাওয়া হয়ত দেখল, কিন্তু তখন তা না আছে জ্ঞান, না আছে উঠে দাঁড়ানোর তাগত। জোসনা ভয় হচ্ছিল, হয়তো তোজাম বাইরে অপেক্ষা করছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, না তোজাম বা অন্য কোনো প্রাণধারী মানুষ, কুকুর, শিয়াল কিছুই নেই।

    বিপদ থেকে মুক্তি পেতে মানুষ সবসময়ই সাহসী হয়। জোসনাও সাহস সঞ্চয় করল, এখন আর তার হারাবার কিছই নেই। উঠোন, ঝোপঝাড়ের আড়াল পেরিয়ে সে বিলে এসে দাঁড়াল। গোটা চরাচর তখন গভীর ঘুমে। কোনো রাতজাগা পাখি, প্যাঁচার ডাক কিংবা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও শোনা যায় না। সকলেই কি পালিয়েছে! নাকি তারা জোসনা’র দুঃখে শোক পালন করছে, কে জানে!

    আকাশের দিকে তাকাতেই জোসনা চাঁদটাকে দেখতে পেল। কেন যেন তার মনে হলোÑ চাঁদটা এখন বেশি আলো ছড়াচ্ছে তাকে লজ্জা দেবার জন্য। এত আলো কেন তা দেখার জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে সে একাধিক চাঁদ দেখতে পেল দুটো নয়, অনেকগুলো। চাঁদগুলো এদিক-ওদিক সরে যাচ্ছে, যেন নাচানাচি করছে।

    জোসনা ভাবল, ওরা কি তবে জোসনা’র দুর্দশায় আনন্দে নাচানাচি করছে? জন্মাবধি সে দেখেছে আকাশে একটি চাঁদ। আজ এত চাঁদ কিভাবে আকাশে দেখা যাচ্ছে! চাঁদের আলো তার কাছে অসহ্য মনে হল। সে বিলের মেঠোপথ দিয়ে ক্ষতবিক্ষত শরীর, ভাঙা মন নিয়ে দৌড় দিল রাস্তার দিকে। বিল পেরিয়ে যখন রাস্তায় উঠল, চাঁদ তখন গাছপালার আড়ালে; নিঃশব্দে দ্রæত পায়ে জোসনা হেঁটে চলল।

    শৈশব থেকে আজ অবধি তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জোসনা’র চোখের সামনে একের পর এক চলচ্চিত্রের মতো উপস্থিত হলো- সেখানে আছে শুধুই ক্ষুধা, অনাদর, তিরস্কার, প্রহারÑ এই পৃথিবীতে একজন মানুষের জন্য নেতিবাচক প্রাপ্তি যা কিছু থাকতে পারে, শুধু সেগুলোই। আর কত? এর কি শেষ নেই? এই কি জীবন? জোসনা আজ অন্য মানুষ, ভিন্নরকম তার চিন্তা, ভিন্নরকম তার সিদ্ধান্ত। তোজামের কাছ থেকে তাকে পালিয়ে যেতে হবে, তবেই তার মুক্তিÑ সে পালানোর পথ সে ঠিক করে ফেলেছে। জোসনা তার স্বামীর বাড়ির দিকে চলা শুরু করল। চলেছে ঊর্ধর্¦শ্বাসে। সে হাঁটছে, নাকি দৌড়াচ্ছে এই নিশীথ রাতে দেখার কেউ নেই। একসময় তার মনে হল সে দৌড়োচ্ছে, পালিয়ে যেতে হবেÑ তবেই শান্তি।

    পরদিন সকাল ফুলতলা গাঁয়ের জন্য বিশেষ এক সকাল হিসেবে উপস্থিত হল। গাঁয়ের কিছু মানুষ তোজামের ঘরের উঠোনে, কিছু মানুষ পেছনের ঝোপ-জঙ্গল ফাঁসিতলায়। বেশিরভাগ মানুষই ফাঁসিতলায়। তোজামের ঘরের উঠোনে দুই হাত পিছমোড়া করে কদমগাছের সাথে বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। এলোপাথারি কিল-ঘুষিতে তার মুখমণ্ডল বেশ খানিকটা ফোলা, ঠোঁটের কোনা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ার দাগ। উৎসাহী কিছু কিশোর তাকে দেখছে। ফাঁসিতলায় মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। গ্রামের চৌকিদার মাঝে মাঝে বাঁশি বাজিয়ে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। পুলিশ না-আসা পর্যন্ত লাশ নামানো হবে না।

    ছাতিমগাছে নিজের পরনের শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস-নেয়া মেয়েটাকে দেখার জন্য মানুষের আগ্রহের যেন শেষ নেই। যে পড়শিরা কোনোদিন মেয়েটার খোঁজ নিতে আসেনি, সে খেয়েছে নাকি অভুক্ত রয়েছে তার খোঁজ নেয়নিÑ আজ তারা জোসনা’র জন আহা-উহু করছে। ব্লাউজ ও পেটিকোট-পরা শীর্ণ মেয়েটার চোখ বন্ধ, মাথাটা একদিকে কাৎ হয়ে রয়েছে; তবুও তার মুখাবয়ব অবিশ্বাস্য রকম শান্ত, স্নিগ্ধ ও নির্মল। গোটা জীবন মেয়েটার কেটেছে ক্ষুধা, অনাদর, নিপীড়নে। আজীবন নির্যাতিত ক্লিষ্ট মেয়েটাকে এখন দেখতে বড় নির্ভার লাগছে।

     
  • | রেটিং ৫ (১ জন) | বিভাগ : গপ্পো | ২৭ জানুয়ারি ২০২২ | ২৭৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    লাইক-ইট - Anirban M
    আরও পড়ুন
    বর্ম - Anirban M
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন