• হরিদাস পাল  আলোচনা  সমাজ

  • কালোমানিক

    Rajkumar Mahato লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | সমাজ | ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ২৯৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ডাকাবুকো একখান ছেলে। কুস্তি লড়তেন একসময়। তারপর নিজের বর্ত্মানের সঙ্গে অতীতকে মেলাতে চেষ্টা করতেন। বহুবার, অনেকবার। তার চিন্তাভাবনা যতদূর অতীতে যায়, নিয়ে যেতেন। মনে পড়ত কিছু, কিছু মনে পড়ত না। সেই স্মৃতিগুলোকে এক খামে বন্দি করে বর্তমানটাকে সেখানে মেশানোর আপ্রান চেষ্টা করতেন। সে পাঁকে পুঁতে মৃত্যু সামনে থেকে দেখা হোক অথবা খাটের নিচে নরুন দিয়ে আকুবুকি কাটা।

    কলেজে পড়াকালীন বাম রাজনীতির দিকে ছুঁকে পড়েছিলেন। তার পাশাপাশি চলছিল সাহিত্য চর্চা। ফলস্বরুপ পরপর দু-বার ফেল। বড়দা রেগে গেলেন। চিঠি লিখে জানালেন তিনি আর টাকা পাঠাতে পারবেন না। কালোমানিক এদিক থেকে লিখলেন, “আপনি দেখে নেবেন, কালে কালে লেখার মাধ্যমেই আমি বাংলার লেখকদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে স্থান করে নেব। রবীন্দ্রনাথ- শরৎচন্দ্রের সমপর্যায়ে আমার নাম ঘোষিত হবে।’’ নিজের উপর, নিজের স্বপ্নের উপর ঠিক কতটা বিশ্বাস থাকলে মানুষ এই কথাটি বলতে পারেন?

    “পদ্মা নদীর মাঝি”, “পুতুলনাচের ইতিকথা” যাঁর কলমের ডগা থেকে বেরিয়েছিল, যিনি একদিন দাদাকে গর্ব করে বলেছিলেন সে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রবাবুর মত বড় সাহিত্যিক হবেন। তিনি একদিন বললেন, ‘‘দেখো, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।’’ এবার ভাবুন একজন লেখক কতটা ক্ষত-বিক্ষত হলে তবে এই কথা বলতে পারেন। আমাদের ভাবনার বাইরে সে-সব।

    যিনি এত কালজয়ী সৃষ্টি আমাদের উপহার দিয়ে গিয়েছেন তাঁর প্রথম সন্তান যখন মারা গেল। তখন তাঁর স্ত্রী ডলি দেবী হাসছেন। একচোখ জল নিয়েও তিনি হাসছেন। আর কালোমানিকের দিকে তাকিয়ে আছেন। মানিক বাবু নিজের ডাইরিতে লিখলেন, ‘‘বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি অখুশি নয়। অনেক হাঙ্গামা থেকে বেঁচেছে। বলল, বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করেছি বাড়ি ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনি বিদায় দেব। অনেক খরচ বাঁচবে।’’ একজন মায়ের জন্য তাঁর সন্তান মারা যাওয়ার পর মুখে হাসি রাখার মানে হয়ত আমরা আজ বুঝি, কিন্তু সেইদিন বুঝি নি।

    মধ্য জীবন থেকেই মৃগী রোগে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। আর সেই রোগ ভুলতেই নাকে অবাধে চলত মদ্যপান। কিন্তু শুধু কি রোগ ভুলতে? নাকি, এই জং ধরা, পচা-গলা সমাজটার মরে যাওয়া এক অবয়ব আপন চোখে সয্য করতে পারতেন না তিনি। জানিনা, আজও সেই পচা-গলা সমাজেই বাস করছি আমরা। যেখানে এখনও কিছু প্রকাশক একজন লেখকের লেখা থেকে নয়, মুখ দেখে লেখা ছাপেন।

    যাই হোক, সেই কথা বলতে এই লেখা নয় যদিও। তিনি প্রবোধকুমার বন্দোপাধায়্ ওরফে কালোমানিক আর আমাদের কাছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সালটা ১৯৫৬, ২ ডিসেম্বর নীলরতন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বর্তমানের সেই মানিককে। পাশে একমাত্র স্ত্রী ডলি। সবথেকে মর্মান্তিক ব্যাপার হল যখন একজন লেখক মানিক বাবুকে দেখতে এসে স্ত্রীকে বললেন, “বৌদি যখন এমন অবস্থা তখন আমায় খবর দেননি কেন?”

    ডলি দেবী হেসে বলেছিলেন, “তাতেও পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই, সেটাই নাই”।

    একজন লেখকের অসুস্থতার খবর দেওয়ার জন্য তাঁর স্ত্রীর কাছে ফোন করার টাকা নেই। সেই অসহায়তা আমাদের মাথার উপর দিয়ে যাবে হয়ত।

    ৩ ডিসেম্বর মারা গেলেন ৪৮ বছরের শুকনো, কয়েকটা হাড়-পাঁজরের উপর মাংসের একটা আস্তরণ দেওয়া, পেটে কাটা মানুষটা। সময়ের পাঁকে, নেশার তীরে, আর মানুষের অবহেলায় একজন লেখকের সমাপ্তি ঘটল। সেইদিন নাকি ফুলে ফুলে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল তাঁর নিথর দেহ। ভাবলেও হাসি পায়, মানুষটা বেঁচে থাকতে তাকে সম্মান দেওয়া হলনা, মরে যেতে তাকে ফুলে ঢেকে দেওয়া হল।

    সেইদিন তাঁর এক বন্ধু লিখলেন, “সামনে পিছনে, দুইপাশে বহু মানুষ। সর্বস্তরের মানুষ। মোড়ে মোড়ে ভিড়। সিটি কলেজের সামনে মাথার অরণ্য। কিন্তু কাল কেউ ছিল না, কিছু ছিল না...জীবনে এত ফুলও তিনি পান নি।’’

    আজ তাঁর মৃত্যুদিনে তাঁকে অন্তরের শ্রদ্ধা।

     

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ২৯৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন