ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের ছেলেটি - সপ্তম পর্ব

    Rajkumar Mahato লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৬ মে ২০২২ | ২৭৫ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • এক এক করে প্রায় অনেকগুলোই বসন্ত পেরিয়ে গিয়েছে । পদ্মপুকুরের জলের রং এখন সামান্য কালচে হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে পদ্মের সংখ্যা কম হয়ে এসেছে। গাছের ফাঁক থেকে কোন চরিত্রহীন শিবপ্রসাদ আর দেখেনা মহিলাদের স্নান। সে এখন বিয়ে করে সংসারী হয়েছে। যদিও পুজো-অর্চনা তেই তার বেশি মন। তার স্ত্রী শিবরানীও একেবারে অন্ধ দূর্গা কালী ভক্ত। মায়ের নাম করে ঘুমায় আর মায়ের নাম করে জাগে। মা দুর্গাকে সে দেখতে পায়। তার ভাতের থালার ভাতের মধ্যে, তার কাঁসার গ্লাসের জলের মধ্যে, তার উঠোনের নিম গাছটার নিচে, মাঠের পরে ডুবতে থাকা সুর্যের লাল আভায় সে মা দুর্গাকে দেখতে পায়। মা তাকে দেখে হাসেন। তার পুজো পেতে দিন রাত পরে থাকে এই ভাঙা কোঠা বাড়িটার মধ্যে।

    পুজো সেরে ঠাকুর ঘরের বাইরে এল শিবরানী। শরতের আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত জোড় করে বলল “মাগো, আয় মা। সময় হলো যে তোর আসার।“

    শরতের আকাশে পেঁজা তুলোর মাঝে মায়ের মুখটা যেন ভেসে উঠল। শিবরানী উঠোনে নেমে এসে জোড়ে চেঁচিয়ে বলল “ওই যে, ওই যে মায়ের মুখ। আমার মা আসছে আমার বাড়ি।“ তার চোখে মুখে সেই চেনা আনন্দ। সে প্রতিদিন তার ঠাকুরকে অনুভব করে। কথা বলে। তার ভক্তি বারংবার মা দুর্গাকে তার কাছে টেনে নিয়ে আসে। মায়ের সাথে অনেক গল্প করে শিবরানী। অনেক না বলা কথা মা দুর্গাকে বলে সে। যে কথাগুলো আর কেউ জানেনা।

    মোটা থামের আড়াল থেকে সবটা দেখছিল একটি শিশু। মাথা ভরা ঘন কালো উসকো খুস্কো চুল। পরনে একটা সাদা ধুতি। খালি শরীর। বাঁ পাশের চিবুকে কিছুটা ধুলো লেগে সাদা হয়ে আছে। গড়ণ রোগাটে। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ।

    মায়ের এইরকম অবস্থা হামেশাই দেখে ছোট্ট শিবরাম। তার এসব প্রায় একপ্রকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। প্রতিদিন পুজো দেওয়ার পর মা যেন কেমন উন্মাদ আচরণ করে। চুল খেলিয়ে উঠোনে নেমে আসে। কখনও বড় বড় চোখ করে বলে “ওই মা আসছে।“

    আবার কখনও একেবারে নম্র স্বরে বলে “ মা এসে বসে আছে নিম গাছের তলায়।“ কাঁসার গ্লাসে জল নিয়ে গিয়ে রাখে নিম গাছের নীচে বাঁধানো বেদিটার উপর। কখনও আবার ছোট রেকাবিতে নিয়ে আসে দুটো বাতাসা। বেদিটার উপর রেখে ভিতরে চলে যায় শিবরানী। থামের আড়ালে অন্য দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর কিছুক্ষন পর আবার পুনরায় নেমে আসে উঠোনে। ততক্ষণে বাতাসা আর জলের কিছু অংশ শেষ হয়ে যায়। মাথায় কাপড় তুলে নেয় শিবরানী। নেচে ওঠে আনন্দে। তার হাতের খাবার স্বয়ং মা খেয়েছেন এই বিশ্বাস তাকে আরও মা দুর্গার কাছে নিয়ে যায়।

    থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে শিবরাম। হালকা স্বরে বলে “মা কিদে পেয়েচে।“

    “কিদে” কথার অর্থ মনে হয় বাঙালি সব মায়েরাই বোঝে। শিবরানিও তাদের ব্যতিক্রম নয়, তাই সেও বুঝে যায় ছেলের ক্ষিদে পেয়েছে। হাতের ঈশারা করে ডাকে শিবরামকে। গুটি গুটি পায়ে আর ভয় ভয় মুখে উঠোনে নেমে আসে শিবরাম। শিবরানি হাঁটু গেড়ে বসে আকাশের দিকে তাকায়। আঙুল দেখিয়ে বলে “দেখ শিবু, মা আসছে।“

    শিবরাম উপর দিকে তাকায়। কিন্তু কয়েক গুচ্ছ মেঘ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়না। অনেকগুলো মেঘ পরস্পর পরস্পরের পিছনে সারি বেঁধে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। উঠোনের দক্ষিন কোনের শিউলি গাছ থেকে শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। শিবরাম উপর দিকে তাকিয়েই বলে “কই মা? দে…দে…দেখতে পেলুম না তো!”

    শিবরানী হেসে বলে “ আর একটু আগে এলে দেখতে পেতিস। মা আমাকে দেখে হাসছিলেন।“

    শিবরাম মুখটা মায়ের দিকে করে বলে “কার মা? তোমার মা, মা?”

    শিবরানী হেসে উত্তর দেয় “ধুস পাগল। আমার একার নয়, পুরো জগতের মা তিনি। জগৎজননী ভবতারিণী।“

    শিবরাম অত শত বোঝেনা। পেটে হাত বুলিয়ে বলে “কিদে মা। কিদে পেয়েচে।“

    শিবরানী আবার তাকায় শিবরামের দিকে। মলীন দৃষ্টিতে বলে “তিনিই জোগাড় করবেন তোর আহার। মায়ের কাছে চেয়ে দেখ। কত কি খাবার আসবে তোর কাছে।“

    শিবরামের এসব কথা যেন মাথায় উপর দিয়ে যায়। মায়ের যে মাঝে মাঝে কি হয়, কিছুই বোঝেনা সে। তবুও আবার বলে “মা কুব কিদে পেয়েচে।“

    শিবরানী আবার বলে “মা’কেও আমি খেতে দিই। এইযে এই গাছের তলায় বসেন মা। আমার হাতের জল বাতাসা খান।“

    শিবরাম যেন একটু প্রতিবাদের সুরেই বলে “আমিতো সেদিন দেখলুম কাথবেড়ালি এসে বাসাতা খেল।“

    শিবরানি হো হো করে হেসে ওঠে। তারপর হাসি থামিয়ে বলে “ওই তো মা’রে। কোন রুপে আসবেন তিনি কেউ জানেনা।“

    শিবরামের ক্ষিদেটা আরও বেড়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সে যে ক্ষিদে একেবারেই সহ্য করতে পারেনা। শিবরানীর আঁচলটা টেনে বেশ জোড়েই চেঁচিয়ে বলে শিবরাম “কিদে মা কিদে। মা……”

    হয়ত এবার একটু স্বাভাবিক হয় শিবরানী।  চোখ কচলে বলে ওঠে “আসন পেতে বোস ওখানে। আনছি।“ বলেই রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। শিবরাম উঠোন থেকে উঠে আসে বারান্দায়। চারকোণা লাল-কালো সিমেন্টের খোপ কাটা ডিজাইন এর মেঝেতে আসন পেতে বসে সে।

    কিছুক্ষন পর একটা বাটিতে কিছু খ‌ই আর পাটালি গুড় নিয়ে আসে শিবরানী। ছেলের সামনে দিয়ে বলে “নে বাবা, খেয়ে নে।“

    শিবরাম প্রথমেই পাটালিতে একটা কামড় বসায়। তার যে মিষ্টি খুব প্রিয়। শিবরানী ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে আহাররত ছোট্ট শিবরামের দিকে। তার কপালের মাঝখানে সে দেখতে পায় মা দুর্গার মুখ। তার বুকে দেখতে পায় নারায়ণ কে। তার নাভিতে দেখতে পায় মা লক্ষীকে।

    তার জীবনে আর কিই বা আছে? কলকাতার মেয়ে বিয়ে হয়ে এসেছে এই অজ পাড়াগাঁয়ে। তার উপর যার হাত ধরে সে এখানে এসেছে। সে নিজেকে বাবার সাধক প্রমানিত করতেই ব্যস্ত। আর বাকি সময় বইতে মুখ গুঁজে পরে থাকেন । বৌ ছেলেদের নিয়ে তার তেমন একটা মাথাব্যাথা নেই। লোকমুখে তার অনেক বদনাম শুনেছে শিবরানী। কিন্তু ভারতীয় মেয়েদের স্বামীর দোষ দেখতে নেই। স্বামী মানেই ঈশ্বর, আর ঈশ্বরের কোন দোষ হয়না। তারা ভুলও করতে পারেনা।

    কলকাতায় বড় হলেও এইসব ভাবনা থেকে মুক্তি পায়নি শিবরানীও। তাকেও শেখানো হয়েছে পতি পরমেশ্বর। শিবপ্রসাদের সুঠাম চেহারা, আর মহাদেবের প্রতি ভক্তি তাকে খুব মুগ্ধ করেছিল একসময়। কিন্তু আজ সেই ভক্তিই যেন তাদের মধ্যে অনেকটা দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে। তাই নিজেকে মায়ের সেবায় ব্যাস্ত রাখে শিবরানী। মঠ থেকে তার বাড়িতে আসেন অনেক সন্ন্যাসিনী। তাদের সাথে মেতে থাকে সে। ছেলেদের যতটা দরকার ততটাই দেখাশোনা করে। বাকি সময় এই কোঠা বাড়িটার এককোণে গিয়ে মা'কে ডেকে বলে " ভালো আছি মা। তোমায় নিয়ে ভালো আছি। "

    হয়ত সেও জানে, নিম গাছের তলায় দেওয়া জল বাতাসা কাঠবেড়ালী খেয়ে যায়। কিন্তু তার মনকে সে বোঝায়, না তার‌ও গুরুত্ব আছে। মা দূর্গাই ওই রুপে এসে আহার গ্রহণ করে।

    (চলবে)
  • ধারাবাহিক | ২৬ মে ২০২২ | ২৭৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন