ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের ছেলেটি - অষ্টম পর্ব

    Rajkumar Mahato লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩০ মে ২০২২ | ৩১২ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • উঠোনের নিম গাছটার নিচে শুয়ে ছিল শিবপ্রসাদ। হাতে প্রবাসী পত্রিকা। একদম সদ্য এই মাসের তাজা পত্রিকা। নতুন কাগজের গন্ধ লেগে রয়েছে। আজ ঘরে থাকা যায়না, কি ভীষণ রকমের গরম। তাই দুপুরের খাওয়া সেরে বেনা ঝোপের বোনা চাটাই পেতে নিম গাছের নিচে শুয়ে পরেছে শিবপ্রসাদ। সদ্য আসা পত্রিকাটা খুলে সূচিপত্র দেখছে।

    পাশের পাড়ার রমাকান্ত উপাধ্যায় সদর দরজা পেরিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল। শিবপ্রসাদকে এইভাবে শুয়ে থাকতে দেখে বলল “কি হে, এই ভর দুপুরে নিম গাছের নিচে শুয়ে রয়েচ। বাতাস টাতাস লেগে যাবে ভাই।“

    রমাকান্ত পাশের পাড়ার একজন বিদ্বান লোক। কলকাতা থেকে সদ্য কি একটা যেন পাশ করে গ্রামে ফিরেছে। বিশাল মান্যি এখন তার এই গ্রামে। এতদিন সবাই শিবপ্রসাদকে শিক্ষিত ভাবত। এ নাকি তার থেকেও বেশি পড়েছে। তাই এখন শিবপ্রসাদের থেকে রমাকান্তের মান্যতা গ্রামে বেশি। তার কথায় অনেক নতুন কাজ হচ্ছে। ছেলে হিসেবে ভালই। তবে কথায় কথায় খুব কলকাতায়ানা ঝাড়ে। কলকাতায় এই আছে, ওই আছে। এইসব বলে আরকি।

    শিবরানির সাথে তার বেশ ভাব জমেছে। যদিও সে শিবরানীর থেকে অনেকটাই বড়। অনেক বেশি বয়সে পড়াশোনা শেষ করেছে কিনা ছেলেটা। শিবরানী কলকাতার মেয়ে। নিজের জন্মস্থান নিয়ে গর্ব করা তার সাজে কিন্তু এই রমাকান্ত তো এই গ্রামেই জন্মেছে। তাও সে এই গ্রামের নিন্দে করে অনেক। এই গ্রামে ফিরে যে তার ক্ষতি হয়েছে, সে অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রতি পদে পদে গ্রামের মানুষকে সে এগুলো বোঝাতেই ব্যস্ত। আর এটাই শিবপ্রসাদের রাগের কারণ। তবে শিবরানী তার সাথে অনেক গল্প করে। কলকাতার দর্জিপাড়ার গল্প। তার শৈশব কালের গল্প। তার বাপের ঘরের গল্প। রমাকান্ত সেইসব গল্প মন দিয়ে শোনে আর মাঝে মাঝে সে যে দর্জিপাড়া খুব ভালো করে চেনে, তার প্রমান দিতে হুঁউউউ হুঁউউউ করে দীর্ঘ শব্দ উচ্চারণ করে। শিবরানী খুব খুশি হয়। কখনও কখনও তার দু চোখ জলে ভরে যায়। মনে পরে যায় দর্জিপাড়ার গলিটা। তাদের বাড়িটা।

    শিবপ্রসাদ এই সময় এইভাবে রমাকান্তকে এখানে আশা করেনি। তাই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল “ এই সময় তুমি?”

    রমাকান্ত চাটাইয়ের উপর থেবরে বসে পরল। তারপর শিবপ্রসাদের ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল “ ওই এলাম। একটু বৌ-দিদির সাথে গল্প করব বলে।“

    রমাকান্তের এ হেন কথায় শিবপ্রসাদ যেন একটু চটেই গেল। এমনিতেই এই মানুষটার প্রতি খুব একটা সন্তুষ্ট নয় সে। তার উপর এই ভর দুপুরে তার বাড়িতে এসে তার বউয়ের সাথেই নাকি ছোঁড়া গল্প করবে। শিবপ্রসাদ গম্ভীর স্বরে বলল “ কলকাতার ছেলেরা বুঝি মেয়ে মানুষদের সাথে পরের বাড়ির হাঁড়ির খবর নিয়ে গল্প করে?”

    রমাকান্ত হেসে উঠল। শিবপ্রসাদ তার এই বিকট হাসি পছন্দ করল না। উঠে বসে পাশে পত্রিকাটা রেখে বলল “ ভর দুপুর ভায়া। বাড়ির লোক ঘুমোচ্ছে। এইভাবে হেসোনা। বাচ্চারা উঠে পরবে।“

    রমাকান্ত হাসি থামিয়ে বলে “ওহ, বুঝিনি দাদা। আসলে কলকাতায়……”

    শিবপ্রসাদ এই ভর দুপুরে তার কলকাতার গুনগান শুনতে একেবারেই ইচ্ছুক নয়। অহেতুক বকবক তার একেবারেই পছন্দ নয়। আর সে জানে রমাকান্ত কাজে কম, বকে বেশি। তাই সে তাকে থামিয়ে বলে “আচ্ছা তুমিতো অনেক পড়াশোনা শিখেছ। তা বলো দেখি। প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক কে?”

    রমাকান্ত মুচকি হেসে বলল “ এই পত্রিকা তো কিছুদিন হল বেরোচ্ছে। সম্পাদক তেমন নাম করেনি। আর তুমি তো জানোই ভায়া আমি বাংলা পত্রিকা খুব একটা পড়ি না।“

    শিবপ্রসাদ ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলল “ বাঙালির ছেলে হয়ে বাংলা পত্রিকা পড় না? আর এই পত্রিকা সেই ১৯০১ থেকে বেরোচ্ছে ভায়া প্রতি মাসে। অনেক বড় বড় সাহিত্যিক লেখেন এখানে। সেই প্রথম মাস থেকেই আমি পড়ে আসছি বাৎসরিক আড়াই টাকা দিয়ে। বাঙালির ছেলে হয়ে বাংলা জানবে না, নিজের জন্মভূমিকে জানবে না?”

    রমাকান্ত যেন একটু অস্বস্তিতে পরল। একটু নড়ে-চড়ে বসে বলল “ আসলে কলকাতায়…”

    আবার তাকে থামিয়ে দিল শিবপ্রসাদ। মুচকি হেসে বলল “কলকাতায় তো পত্রিকার কমতি থাকা উচিৎ নয় ভায়া। এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত হলেও এই পত্রিকা কলকাতা হয়েই আসে। “

    রমাকান্ত গভীর চিন্তায় পরল। এতদিন বৌ দিদির সাথে সে কলকাতার নানা জায়গার গল্প করেছে। কলকাতার খাবার আর এখানের খাবারের পার্থক্য তৈরি করেছে। এসব সাহিত্য নিয়ে আলোচনা সে করেনি কোনদিন কারও সাথে।

    রমাকান্ত একবার এদিক তাকায়, একবার ওদিক তাকায়। কোনমতে এখান থেকে উঠে পালাতে হবে তাকে। এ লোকের সাহিত্য সম্বন্ধে বেশ জ্ঞান আছে বুঝতে পারে সে। এখন যদি কোন ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে প্রশ্ন করে বসে। তাহলে খুব বড় বিপদে পরতে হবে তাকে। সম্মান যাবে এই গেঁয়ো লোকেদের কাছে। উঠে পরে রমাকান্ত। “ আজ তাহলে আসি ভায়া“ বলেই সদর দরজার দিকে অগ্রসর হয়।

    শিবপ্রসাদ এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। হাতটা ধরেই টেনে আবার চাটাইয়ের উপর বসিয়ে দেয় রমাকান্তকে। মুচকি হেসে বলে “ এইতো এলে ভায়া। এত তাড়াতাড়ি তোমায় যেতে দিলে চলে? রানীকে বলি চাট্টি খই আর পাটালি দেবে এখন। খেয়ে যাও।“

    রমাকান্তের অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। সে এখান থেকে কোনমতে পালাতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু অনেকদিন পর শিবপ্রসাদ তাকে বাগে পেয়েছে। এত সহজে ছাড়তে পারবে না সে। শিবপ্রসাদ গলা উঁচিয়ে বলে “ওহে বউ, শুনছ?”

    ভেতর থেকে কোন আওয়াজ আসেনা। শিবপ্রসাদ আরও একবার চেঁচাবে বলে গলা উঁচু করে। রমাকান্ত তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে “ না না, ওসব থাক। অন্য একদিন হবে।“

    শিবপ্রসাদ রমাকান্তের হাতে পত্রিকাটা দিয়ে বলে “ খুলে দেখ ভায়া। বাংলা পড়া আবার ভুলে যাওনি তো?”

    রমাকান্ত পত্রিকা হাতে নিয়ে প্রথমেই সম্পাদকের নামটা দেখল। শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। তারপর  পাতা ওলটাতে শুরু করে। সূচীপত্রের প্রথম নামটাই চোখে পরল তার । শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শিবপ্রসাদের দিকে তাকিয়ে বলে “আহা, গুরুর লেখা আছে! নামটা দেখেই প্রানটা জুড়িয়ে গেল।“

    শিবপ্রসাদ কৌতুকের স্বরে বলল “ কেন? কলকাতার লেখক বলে?”

    আবার অস্বস্তিতে পরল রমাকান্ত। মুচকি হেসে বলল “তা নয়। সাহিত্য জগতে তার নাম প্রচুর। এটা তোমার জানার কথা ভায়া।“

    আসলে শিবপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথকে একেবারেই পছন্দ করতেন না আগাগোড়াই। তার কাছে কবিত্ব কোনদিন পায়রার খোপে বসে হয়না। কবিত্ব করতে গেলে ডানা মেলতে হয়। আর তার কাছে রবি ঠাকুর পায়রার খোপের মধ্যে থাকা সেই পায়রা যে কিনা বাইরে বেরোতে ভয় পায়।

    শিবপ্রসাদ রমাকান্তের কথায় মুচকি হেসে বলে “ কবি হলেন মাইকেল মধুসূদন, হেমচন্দ্র এরা। আর হ্যাঁ নবীন সেনও বটে। এরা উন্মুক্ত আকাশ নিয়ে লিখত। কারণ, তারা আকাশ দেখেছে। বন্ধ ঘরে কবিত্ব করা যায়না ভায়া। নবীন সেন, ভাগবতগীতা বাংলায় কাব্যানুবাদ করেছিল। পড়েছ?”

    রমাকান্ত আর কিছুই বলেনা। সে বুঝে গেছে কলকাতার রসগোল্লা থেকে শুরু করে কবি কোনটাকেই এই আলোচনায় জায়গা করে দিতে পারবেনা সে। শিবপ্রসাদের সামনে চাঁচরের সামনে টিঁকতে পারবেনা কলকাতা। তাই সে চুপ করেই থাকে। 

    শিবপ্রসাদ চাটাই ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। এবার একটু ভদ্রতা না দেখালেই নয়। যতই অপ্রিয় হোক লোকটা দুপুরে তাদের বাড়ি এসেছে। কিছু না কিছু খেতে না দিলে গৃহস্থ বাড়ির অকল্যাণ হবে। সেই ভেবে শিবরানীকে ডাকতে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। এদিকে সেই সুযোগে রমাকান্ত সদর দরজা খুলে পালায় নিজের বাড়ির দিকে। নিম গাছের তলায় বিছানো চাটাই একা একা পরে থাকে অনেকক্ষন।

    (চলবে)
  • ধারাবাহিক | ৩০ মে ২০২২ | ৩১২ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নাইটো - একক
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন