ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • মুক্তারাম স্টিটের ছেলেটি - দশম পর্ব

    Rajkumar Mahato লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১১ জুন ২০২২ | ১৯০ বার পঠিত
  • বাড়ির উঠোনটা প্রতিদিন বিকেলে একটা খেলার মাঠে রুপান্তরিত হয়ে যায়। ওদিক থেকে ডাক্তার পরিবারের চার ছেলে-মেয়ে আর এদিকে শিবরাম ও শিবসত্য সবাই তখন বড় বড় খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। রিনির সাথে খেলতে ভালো লাগে শিবরামের। তাদের মধ্যে একটা গভীর সখ্যতা গড়ে উঠেছে। কিন্তু রিনির দাদাটা বড্ড বদ। রাবন বধ খেলায় সে রাবণ সাজে। শিবরাম রাম আর শিবসত্য সাজে লক্ষন। কখনও নানু সীতা হয় আবার কখনও রিনি।

    রিনি সীতা হলে রাম সাজতে খুব ভালো লাগে শিবরামের। কিন্তু নানু সীতা হলে কেমন যেন একটা কিন্তু কিন্তু ভাব থাকে ছেলেটার মধ্যে। সেদিন সে ভাইকে বলে রাম হতে। কিন্তু তাতে রাজি হয়না রাবণ। বড় ভাই সবসময় রাম হবেই। এই তার আদেশ।

    বাল্মিকীর রামায়ণে রামের কাছে রাবণ পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু চাঁচরের রাজবাড়ির এই রামায়ণে কিছুতেই রাবণ পরাজিত হতে চায়না। সে সর্বদা রামকে হারিয়ে দেয়। আর তাতেই বড্ড রাগ হয় শিবরামের। রাম প্রভু সে রাক্ষসের কাছে হেরে যাবে? এটা কি করে সম্ভব? কিন্তু রিনির দাদাকে বোঝানো মুশকিল।

    রিনির দাদা শিবরামের থেকেও বয়সে বড়। মানে এই খেলুয়ে দলের মধ্যে সে সবথেকে বড় খেলোয়াড়। বয়সেও আর গায়ের জোরেও। তাই তার দর্প বেশি। রোগা চেহারার শিবরাম তার সাথে তর্কেই পেরে ওঠে না আর হাতাহাতি করতে গেলে পাছে হাড় ভাঙে তাই সে পথেও এগোয় না। অগত্যা তার কথাই শেষ কথা। মানতে হয় সকলকে।

    সেদিন রাম রাবণের খেলায় আবার রাবণ জিতে গেল। প্রবল মন খারাপ করে উঠোনের এককোণে গিয়ে বসে পরল শিবরাম। আজ রিনি খেলতে আসেনি। নানু আজ সীতা হয়েছিল। এমনিতেই তার মন খারাপ। রিনি না আসলে খেলায় মন বসেনা। কিছু একটা অসম্পুর্ন বলে মনে হয়। নিম গাছটা ঠিকঠাক হাওয়া ছাড়তে পারেনা। শিউলির গন্ধও আসেনা। তবে রিনি যেদিন আসে, সেদিন এইসব হয়। শিউলির গন্ধে ভরে যায় উঠোনটা। নিম গাছের শীতল হাওয়া বইতে থাকে।

    শিবরামকে এভাবে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে নানু তার পাশে এসে বসল। শিবু তাদের বাড়ির পেছনের দিকের ভাঙা অংশটার দিকে তাকিয়ে কি যেন একটা ভাবছিল। নানু পাশে এসে বসতে তার তন্দ্রা কাটল।

    শিবরামের বাড়ির পিছনের দিকটায় অনেকটা জায়গা জুড়ে রাজবাড়ির ভেঙ্গে পরা অংশটা রয়েছে। সেদিকে কেউ যায়না। মা বলে ওখানে নাকি ভূত থাকে। গুপ্তধনের রক্ষাকর্তী। তাই সে পথ মাড়ানো বারণ।

    নানু সেদিকে তাকিয়ে বলল “শিবু, যাবি ওখানে?”

    শিবুর যাওয়ার ইচ্ছে অনেকদিনের। কিন্তু মায়ের ভয়ে যেতে পারেনি আজ পর্যন্ত। নানুর কথাটা শোনামাত্রই সে লাফিয়ে উঠে বলল “ যাবে নানু দি? সত্যি যাবে?”

    নানু বলল “হ্যাঁ চ না দেখে আসি একবার।“

    শিবরাম এদিক ওদিক দেখে বলল “ চুপি চুপি কিন্তু কেউ যেন না জানে। মা জানলে খুব বিপদ হবে।"

    শুরু হয় নানু আর শিবুর গুপ্তধন রহস্য সমাধান অভিযান । শিবরাম মনে মনে ভাবে যদি কোনভাবে গুপ্তধন পাওয়া যায়, তাহলে সে সব গয়না রিনিকে দেবে। কিছুটা মা-কে দেবে বটে তবে বেশির ভাগটাই রিনিকে দেবে। গয়না পরে রিনিকে খুব সুন্দর লাগবে। একেবারে মা দুর্গার মত।

    ভাঙা অংশটার এখানে ওখানে বট অশ্বত্থ গাছ জন্মেছে। বালি খসে পরে ইটগুলো দাঁত বের করে আছে। একটা ভাঙা দরজা দিয়ে তারা দুজন ঢুকল ভেতরে। ভেতরটা বেশ অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে। কিছুটা গিয়ে নানু থমকে দাঁড়িয়ে পরল।

    “ও শিবু, এই সুরঙ্গে কি আছে জানিস?” নানু অধীর আগ্রহে প্রশ্নটা করল শিবরামকে।

    শিবরাম কিছুক্ষন বাইরে থেকে পরীক্ষন নিরীক্ষণ করে তারপর মুখের ভাঁজটা একটা গোয়ান্দা সংস্থার প্রধানের মত করে বলল “নানু দি, এখানে গুপ্তধন থাকতে পারে। মায়ের মুখে শুনেছি সে যুগে এত ব্যাঙ্ক ছিলনা। তাই রাজা মহারাজারা বাড়ির নীচে এইসব সুরঙ্গ খুঁড়ে তাদের সম্পত্তি লুকিয়ে রাখত।“

    নানু বেশ আগ্রহের সাথে আবার বলল “চল নেমে যাই। দেখিনা কি আছে। যদি কিছু পাওয়া যায়!”

    শিবরাম মুখটা শুকনো করে বলল “যদি সাপ-কোপ থাকে। কামড়ে দেবে।“

    নানু একটু গর্বিত ভাবে মুখটা উপর দিকে করে  বলল “আমার বাবা ওষুধ দেবে, ঠিক হয়ে যাবে। তিনি কলকাতা ফেরত ডাক্তার কিনা।“

    শিবরাম নানুর কথায় যদিও একটু সাহস পেল তবুও সুরঙ্গের ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছে তার একেবারেই ছিলনা। তাই সে নানুকে বলল “ না না, এতটা ঠিক আছে নানুদি। বেশি লোভ করা ভালো না। জানোনা লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু।“

    নানু পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল “ধুস, বড্ড ভীতু তুই। যখন এতটা এসেছি দেখব না ভিতরে কি আছে! ভয় নেই, আমিতো আছি। আয়।“

    শিবরাম কিন্তু আর এগোল না। নানুকে ফিরে আসতে বললেও সে ফিরছিল না। তবুও শিবরাম তাকে একা ফেলে যেতেও পারছিল না। অগত্যা দাঁড়িয়ে দুজন দুজনের সম্মতির অপেক্ষা করছিল। এমন সময় তারা দেখল ভাঙা থামের পাশ থেকে কেউ একজন উঁকি মারছে। শিবরাম ভয় পেল ঠিকই কিন্তু কাপুরুষের মত পালিয়ে গেলনা। সে ভাল করে দেখল। একটি মহিলা তার দিকে তাকিয়ে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তার রুপের ছটায় শিবরামের চোখ আঁটকে যাওয়ার জোগাড়। পড়নে দামী শাড়ি, সারা গা ভর্তি চকচকে গয়না। বেশ পরিপাটি করে সেজে সে এসেছে এখানে।

    শিবরাম নানুর দিকে তাকিয়ে বলল “ নানুদি সামনে দেখো। ও কে?”

    নানু সামনে তাকিয়ে দেখল। তখনও সেই রুপসী মহিলা থামের আড়াল থেকে তাদের দেখছে। নানু শিবরামের থেকে কয়েক বছরের বড়। তাই সেও ভয় না পেয়ে বলল “এই যা না, তোকে ডাকছে। গলার হারটা এনে দে-না আমায়। পরব।“

    শিবরামের গলাটা শুকিয়ে এসেছিল। আতু আতু করে বলল “তুমি গলার হার পরবে, আমি এনে দেব কেন? যদি রিনি পরত তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখতুম। যাও নিজে গিয়ে নিয়ে এসো।“

    নানু কথাটা কানে না নিয়ে বলল “কিন্তু কে বলত উনি?”

    শিবরাম মুখটা শুকিয়ে বলল “রানী ভূতেশ্বরী হবে মনে হয়। নিজের সম্পত্তি পাহারা দিচ্ছেন হয়ত। পালিয়ে চলো নানুদি।“

    ঠিক সেই মুহুর্তে সেই মহিলাটি এগিয়ে আসতে লাগল তাদের দিকে । শিবরাম আর সেখানে এক মুহুর্তও দাঁড়াল না। আর তার পেছনে নানুও ছুট দিল “দাঁড়া শিবু, দাঁড়া বলছি। আমার হারটা এনে দে। ও শিবু এনে দে না ভাই। ভাইফোটায় তোকে বেশি করে মিষ্টি খাওয়াব। “

    শিবরাম আর সেখানে দাঁড়ায় নি। সোজা গিয়ে ধাক্কা দিল তার মা-কে। ছেলেকে এভাবে দৌড়াতে দেখে শিবরানি খানিক অবাক হলেন এবং নিজের দুর্গা-নাম জপ ছেড়ে জিজ্ঞেস করলেন “কি হয়েছে শিবু? এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন?” পেছনে নানু এসে শিবরানীকে সব ঘটনা খুলে বলল। শিবরানি মায়ের পায়ের ফুল এনে শিবরামের মাথায় ঠেকিয়ে বলল “মা-দুর্গা রক্ষা করেছে, আর কখনও যাসনে বাবা ওদিকে। যখের ধন আগলে পড়ে আছে মেয়েমানুষ।“

    রক্ষে পেল শিবরাম আর নানু।

    (চলবে)
     
    তথ্য ঃ ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা, আনন্দবাজার ইন্টারনেট
  • ধারাবাহিক | ১১ জুন ২০২২ | ১৯০ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নাইটো - একক
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন