• হরিদাস পাল  গপ্পো

  • ত্রিবেণী তীর্থপথে

    তামিমৌ ত্রমি লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ০১ মার্চ ২০২১ | ৫০৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ত্রিবেণী তীর্থপথে


    না।


    সেই অনন্তগঙ্গাপ্রবাহমধ্যে, বসন্ত বায়ুবিক্ষিপ্ত বিচিমালায় আন্দোলিত হইতে হইতে কপালকুণ্ডলা প্রাণত্যাগ করে নাই। চৈত্রবায়ুতাড়িত যে বিশাল তরঙ্গ কপালকুণ্ডলাকে নদীগর্ভে নিক্ষেপ করিয়াছিল, তাহারই ন্যায় অপর এক প্রভঞ্জনাঘাতে নবকুমার পুণ্যসলিলা স্রোতস্বিনীর  অন্তরে নিমজ্জিত হইলেন, বা বলা ভালো স্বেচ্ছানির্বাসন লইলেন, কারণ সন্তরণ প্রক্রিয়া তাঁহার অবগত ছিল। 


    কিন্তু কপালকুণ্ডলার ললাটে মরণ নাই। এক দুর্বার অশালীন স্রোত তাহার মৃত্যুকামনাকে তুচ্ছ করিয়া রাবণের ন্যায় বলপূর্বক হরণ করিয়া ভাসাইতে ভাসাইতে অচৈতন্য অবস্থায় তাহাকে ফেলিয়া গেল গঙ্গার অপর ঘাটে। 


    ক্রমে বেলা বাড়িলে তরঙ্গ স্ফুলিঙ্গের দু চারটি


    চুম্বন যখন তাহাকে অধীর করিয়া তুলিল, অংশুমালী  যখন কপালকুণ্ডলার সর্বাঙ্গ রুদ্ররসধারায় সিক্ত করিয়া দিলেন, ক্রমে ক্রমে তাহার সংজ্ঞা ফিরিয়া আসিল।


     অলকচূর্ণ ললাট হইতে সরাইয়া কপালকুণ্ডলা তাহার স্নিগ্ধ উদ্ভাসিত আঁখি- বিহঙ্গ দুটি ভাসাইয়া দিল অনন্ত নীলাভ স্বর্ণালী সমারোহে। তাহার আজানুলম্বিত কেশরাজি গভীর অরণ্যে ঘনায়মান সন্ধ্যার ন্যায় পৃষ্ঠদেশে বিরাজ করিতে লাগিল।


    সেই সময়ে একটি নৌকা ঘাটে আসিয়া ভিড়িল। কপালকুন্ডলা দেখিল, দুজন সম্ভ্রান্ত থান পরিহিতা স্ত্রীলোক কর্তিত কেশবিশিষ্ট  মস্তকে ঘোমটা টানিয়া নৌকা হইতে ফেলা কাষ্ঠের তক্তা বাহিয়া ঘাটে অবতরণ করিল।


     নিখিলেশের মৃত্যুর পর বিমলার আর মন টেকে না সংসারে। উপস্থিত সে তাহার বড় জাকে লইয়া গঙ্গার তীরে তীরে তীর্থ করিয়া বেড়াইতেছে । 


    পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গার সুশীতল স্রোতস্পর্শ তাহাকে কিছুমাত্র স্বস্তি দেয় নাই। পরন্তু নদীবক্ষ হইতে উৎসারিত উদাসী বাতাস তাহার অন্তরে নিখিলেশের যে চিতা অহরহ জ্বলিতেছে তাহার সর্বগ্রাসী অগ্নিসত্ত্বাকে  উসকাইয়া দেয়। আবার  গঙ্গার অপর পারের দৃশ্য  যেমন  আবছায়া অবভাসরূপে প্রতীয়মান হয় সেইরূপ  অস্পষ্ট ও অসমীচীন আরেক ব্যক্তির  মুখাবয়ব তাহার মানসপ্রতিমায় মধ্যেমধ্যে 


    প্রতিভাত হয়। সে যতবার সেই চিত্রকে  কালিমালিপ্ত করিয়া নষ্ট করিতে চায়, ততবার এক অদৃশ্য  তুলি তাহার মানসচিত্রপটে লিখিয়া যায়- ' মক্ষী...'


    দুই বিধবা  ধাপে ধাপে উঠিয়া আসিয়া কপালকুণ্ডলার সমীপবর্তী হইল। রতনে রতন চেনে, অভাগী চেনে অভাগীকে।  যে শাশ্বত শোকসায়রের ত্রিতারে তাহারা বাঁধা, সেই বাদ্যের করুণ বিলাপে এক দণ্ডে তাহারা পরস্পরকে চিনিতে পারিল। 


    বিমলা তাহার ব্যথাতুর আঁখিদুটি কপালকুণ্ডলার পলাশ- নয়নে স্থাপন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল- ' অনন্ত অসীম নীলাম্বুরাশির তীরে বাড়িয়া উঠিয়া পরম বাহির থেকে ঘর - সংসারের ক্ষুদ্র পিঞ্জরে অর্গলবদ্ধ হইয়া তুমি কী পাইলে?'


    কপালকুন্ডলা তাহার নেত্র বিন্দুমাত্র না সরাইয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া উত্তর করিল, ' ঘর-  সংসারের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ থেকে বাহিরের অনন্ততরঙ্গিণী বিশ্বে চরণ রাখিয়া তুমি যাহা পাইলে, আমিও ঠিক তাহাই পাইয়াছি।'


    উত্তর  পাইয়া বিমলা অল্প একটু শব্দ করিয়া হাসিল। তাহার জা হাসিল নীরবে মুখ টিপিয়া। সে ভাগ্যবিড়ম্বিতা নারীর বাকযন্ত্র হইতে কোনপ্রকার শব্দ বা কথা  বহুদিন হইল উত্থিত বা উচ্চারিত হয় নাই । তাহার কথার প্রয়োজন ফুরাইয়াছে। সে তাহার সাধারণ বুদ্ধিমত্তায়  আজীবন পিঞ্জরাবদ্ধ জীবনে একটি সত্য বর্ণে বর্ণে উপলব্ধি করিয়াছিল, জগৎ সংসারের সমুদয় বিড়ম্বনা সহ্য করিবার একটিই সহজ পন্থা আছে-


     নীরবতা


    তাহারা তিনজনেই তিনপ্রকারে হাস্য করিল, কিন্তু তাহাদের অক্ষিকোটর  হইতে বুভুক্ষু সর্পের ন্যায়  নয়নলোর উথলিয়া উঠিল। গণ্ডদেশে পিছলাইয়া চিবুক চুম্বন করিয়া সেই গঙ্গা যমুনা সরস্বতীর ত্রিধারা  তাহাদের বক্ষদেশ বাহিয়া অন্তরের অন্তরালে বিলীন হইয়া গেল...


    তবু অনন্তগঙ্গাপ্রবাহে জল এতটুকু বাড়িল না।


    তামিমৌ ত্রমি 


    ছবি নেট থেকে প্রাপ্ত

  • বিভাগ : গপ্পো | ০১ মার্চ ২০২১ | ৫০৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
লকডাউন - Anirban M
আরও পড়ুন
একক - Debayan Chatterjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • :|: | 174.251.160.53 | ০৫ মার্চ ২০২১ ০৫:৪৪103172
  • যদ্দুর জানি তরঙ্গ বা ওয়েভ = বীচি আর সীড অর্থে বিচি। বীচিমালা বোধহয় ঠিক বানান। একটু কেউ কনফার্ম করবেন?  

  • তামিমৌ ত্রমি | ২৮ মার্চ ২০২১ ০৯:১৯104165
  • বানান ঠিকই আছে। কপালকুণ্ডলায় তাই ছিল। 'বীচি' 'বিচি'ও হয়। বিচিত্র ব্যাপার।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন