এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  গপ্পো

  • ছোটদের উপন্যাস - হেমকান্ত মীন 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | গপ্পো | ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৩৫৫ বার পঠিত
  •  
    একটি রহস্য উপন্যাস - তবে কোন খুনোখুনি নেই - তাহলে কিসের রহস্য? - জানতে  এবং পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করতে হবেঃ 
     
    https://joydhakweb.in/uponyas8702/
     
    প্রায় সাত বছর আগে এই  উপন্যাসটি সম্পাদকমণ্ডলীর কঠোর কাঁচিতে নির্মেদ হয়েছিল ঠিকই,  কিন্তু অধম এই লেখকের মনে হয়েছিল লেখাটি তার লাবণ্য হারিয়েছে। লেখকের লক্ষ্য ছিল দুটি রহস্য উদ্ঘাটন এবং সাবেক বাংলার পুজোবাড়ির পরিবেশ পরিবেশন।  নিচেয় আমার মূল লেখাটি তুলে দিলাম - ভালোমন্দ বিচারের ভার তুলে দিলাম প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের উপর। 
     
     
     
    হেমকান্ত মীন
     
     

    বাবা চাকরি সূত্রে বাইরে থাকলেও পূজোর কটাদিন অন্য কোথাও যান না। বাড়িতেই থাকেন। আর রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর প্রত্যেকবারই গাড়ি নিয়ে আমরা ঠাকুর দেখতে বের হই। একদিন কলকাতার উত্তর, একদিন দক্ষিণ আর একদিন পাড়ায়, মোটামুটি এই আমাদের প্রোগ্রাম থাকে। এইবারে ষষ্ঠীর দিন রাতে বাড়ি ফিরে বাবা খাওয়া দাওয়ার পর মাকে বললেন, ‘আমাদের কলিগ  নীল, তোমার নীলকে মনে আছে তো’?
    ‘বারে। মনে থাকবে না কেন? কতবারই তো এসেছে আমাদের বাড়ি। আজকাল আসে না, তুমি বাড়িতে থাক না বলেই। তুমি মাসে কদিন আর থাক বাড়িতে, যে আত্মীয় স্বজন লোকজন বাড়ি আসবে? আমরাও তো কারো বাড়ি যাই না কতদিন। লোকেদের দায় পড়েছে আমাদের সঙ্গে একপেশে সম্পর্ক জিইয়ে রাখতে! তোমার শুধু চাকরি ছাড়া আর কিছুই...’। মায়ের মনের এই দুর্বল জায়গাটি আমিও জানি, বাবাতো জানেনই, কাজেই বাবা আর মাকে কথা বাড়াতে দিলেন না, অন্য প্রসঙ্গ টেনে মাকে বললেন,
    ‘নীলদের দেশের বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়, বহুদিনের পুরোনো নাকি, প্রায় সত্তর-আশি বছর তো হবেই। একদম বাঙালি মতে সাবেকি পূজো। একচালা ঠাকুর, সবুজ রঙের মহিষাসুর আর সিংহটাও ঠিক সিংহ নয়, সিঙ্গি। বহুবারই বলে ওদের ওখানে যাবার কথা, এবারও বারবার বলছিল, তোমাদের সকলকে নিয়ে যাবার জন্যে। যাবে নাকি, তাহলে অষ্টমীর দিন ভোরে বেড়িয়ে পড়ব, সন্ধি পুজো দেখে, নবমীর বিকেলে চলে আসব’।
    কথাটা শুনে মা আমার দিকে তাকালেন। আসলে পুজোর সময় কলকাতা ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার কথা আমি কেমন জানি ভাবতে পারিনা। মা সেটা জানেন, তাই বললেন, ‘আমার কোন আপত্তি নেই। তোমার ছেলেকে রাজি করাও। ও তো আবার বন্ধুবান্ধব, সাঙ্গ-পাঙ্গ ছেড়ে পুজোর কলকাতা ছাড়তে নারাজ’। বাবা উত্তরে বললেন,
    ‘কলকাতার পুজো আর ছাড়ছে কোথায়? আজ ষষ্ঠী দেখল, কাল সপ্তমী দেখবে, ফিরে এসে আবার দশমী দেখবে, মাঝে দুটোদিন শুধু কলকাতা ছাড়া’।  
    মাও বাবার সুরে গলা মেলালেন, ‘একদম ঠিক, এতবছর তো কলকাতার পুজো দেখলি, এবার অন্যরকম একটা পুজোও দেখ না। কলকাতার পুজো তো আর পালাচ্ছে না’। মা বাবাকে যেভাবে সমর্থন করলেন, বোঝা যাচ্ছে মা যেতে খুবই ইচ্ছুক।
    ‘ওই পুজোটাই বা পালাচ্ছে কোথায়? এই তো বাবা বলল, নীলকাকুদের পুজো প্রায় সত্তর বছরের পুরোনো’।  আমি কলকাতার হয়ে লড়ে যাবার চেষ্টা করলাম।
    মা কিন্তু ছেড়ে দিলেন না, আমাকে কনভিন্স করার জন্যে আবার বললেন, ‘ওই পুজোটা পালাচ্ছে কিনা জানিনা, কিন্তু পুজোর আমেজটা হারিয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। জানিস না তাই বলছিস, এই সাবেকি পুজোগুলোই হচ্ছে সত্যিকারের পুজো’। মা বেশ আবেগ নিয়ে বললেন। আমি তাও তর্ক করলাম, ‘ও, কলকাতার পুজোগুলো সব মিথ্যে পুজো? এই এত আয়োজন, এত ভাবনা চিন্তার থিম সব ফালতু’?
    আমার কথা শুনে মা একটু অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘ছি, ছি, ফালতু হবে কেন? আসলে কলকাতার পুজো আর ঠিক নিছক পুজো নেই- বহুদিনই এটা একটা মহাউৎসবে পরিণত হয়ে গিয়েছে, এখানে পুজোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে জড়ো হচ্ছেন হাজার হাজার শিল্পী আর তাঁদের আশ্চর্য শিল্পভাবনা। আমাদের প্রায় হারিয়ে যাওয় লোকশিল্প, লোকসংস্কৃতি আবার নতুন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে কলকাতার এই উৎসবকে ঘিরে। কত অচেনা অজানা শিল্পীরা উঠে আসছেন তাঁদের অপূর্ব সব ভাবনা নিয়ে। এটা শুধু মহাউৎসব নয়, সত্যি বলতে মহাউদ্যোগ। এটাকে বাজে বা ফালতু বলতে যাব কোন দুঃখে। কিন্তু এটাও ঠিক, এত সবের মধ্যেও এখানে পুজোটা নেই বললেই হয়। এখানে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে চমক লাগে, মুগ্ধ হয়ে যেতে হয় বার বার, কিন্তু পুজোর সেই আনন্দটা মেলে না। সেটা একদম অন্যরকম, একদম আলাদা। সেটা তোদেরকে ঠিক বোঝানো যাবে না’।
    বাবা আমাদের দুজনের কথা শুনছিলেন, এখন বললেন, ‘নীল বলছিল, ওদের এবারের পুজোটা বোধহয়, ওদের গ্রামের বাড়ির শেষ পুজো। ওই বাড়িটা ওরা কোনো প্রমোটারকে না কাকে বেচে দিচ্ছে, ওখানে রিসর্ট বা হোটেল টোটেল কিছু হবে।  তাছাড়াও, আমায় খুব স্পষ্ট করে বলল না, কোন একটা ব্যাপারে তোমার সাহায্য নাকি ওদের খুব দরকার’। বাবা মাকে বললেন।
    ‘আমাকে দরকার? রহস্যজনক কিছু’? মা বাবাকে জিগ্যেস করলেন। 
    ‘হুঁ, রহস্যজনক। বলল, বৌদির তো দেখেছি দারুণ অবজারভেশন আর চট করে অনেক কিছু বুঝে ফেলতে পারেন, বৌদি যদি আসেন, আমাদের হয়তো খুব উপকার হতে পারে। খুলে বলল না, বলল, ওদের খুব দামি একটা জিনিষ খুঁজে পাচ্ছে না, বেশ কিছুদিন। চুরি বা হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেটাও নিশ্চিত হওয়া দরকার’। বাবা উত্তর দিলেন।
    ‘এটা আগে বলবে তো, ফ্যান্টাসটিক। গ্রামবাংলার পুজো, তার সঙ্গে দামী জিনিষের রহস্যভেদ, ওফ তাহলে তো যেতেই হয়। সেক্ষেত্রে অষ্টমী কেন, কালই সকালে বেরিয়ে পড়লে হয়’ আমি উৎসাহে ফেটে পড়লাম।
    ‘কাল বললেই কাল যাওয়া যায় নাকি? গোছগাছ করতে হবে না’? এবার মা বেঁকে বসলেন।
    বাবা বোঝালেন, ‘কতক্ষণ আর লাগবে, চলো না হাতে হাতে গুছিয়ে ফেলি। আজ তোমার ছেলের সুমতি হয়েছে, কাল আবার কী হয়, কিছু ঠিক আছে?’ কথা বলতে বলতে বাবা ফোন লাগালেন নীলকাকুকে, আমরা আগামীকাল যে নীলকাকুর দেশের বাড়ি যাবো, বাবা সেটা জানিয়ে দিলেন। 



    ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা এনএইচ৬ এ পড়লাম আধঘন্টার মধ্যে, ডান দিকে বেঁকে বালি গিয়ে হয়ে গেল এনএইচ২, আরো খানিকটা গিয়ে সোজা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে পড়লাম, আর ডানদিকে চলে গেল দিল্লি রোড। টোল প্লাজার ট্যাক্স মিটিয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বাবা গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন বর্ধমানের দিকে। সিদ্ধান্ত পাক্কা হবার পর মা গতকাল রাত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন আমাদের ব্যাগপত্র গোছাতে আর আমি বসে গিয়েছিলাম গুগল সার্চ করে নীলকাকুর গ্রামে পৌঁছবার রোডরুট বার করতে। আর আমাদের দুজনেরই সঙ্গে থেকে বাবা পরামর্শ দিচ্ছিলেন। মায়ের ব্যাগ গোছানো আর আমার রুটম্যাপের প্রিন্ট আউট নেওয়া যখন শেষ হল, ষষ্ঠীর রাত শেষ হতে আর বেশী দেরি নেই। আমরা যখন শুতে যাচ্ছিলাম, তখনও আমাদের বাড়ির সামনের নির্জন রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝেই একএকদল উৎসাহী দর্শনাথী বাড়ি ফিরছিলেন ষষ্ঠীর ঠাকুর দেখে।
    একটানা ঘন্টা খানেক চলার পর আমরা শক্তিগড়ে থামলাম। দুপাশেই অজস্র ল্যাংচার দোকান। বাংলা ভাষায় ঘর আর দোকানের যতগুলো প্রতিশব্দ হওয়া সম্ভব, ততগুলোই দোকান চোখে পড়ল। ঘর, আলয়, মহল, গৃহ, বিপণি, আপণ, কি নেই! মা গাড়িতেই বসে রইলেন, আমরা একটা দোকানে ঢুকে বিশাল সাইজের ল্যাংচা দুটো করে, একটা করে গরম সিঙাড়া আর চা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে ফেললাম। গাড়িতে বসে মাও খেলেন। আমি অবশ্য চা খাই না। শক্তিগড় ছেড়ে একটু পরেই এক্সপ্রেসওয়ে ছেড়ে বর্ধমান শহরে ঢুকলাম, পুরোনো জি টি রোড ধরে।  
    বিজয় তোরণের একটু দূরে বাবা গাড়ি সাইডে পার্ক করে মাকে বললেন, ‘তুমি গাড়িতেই একটু বোসো, আমি জ্যোতিকে নিয়ে যাচ্ছি, একটু মিহিদানা আর সীতাভোগ নিয়ে আসি’। মা সায় দিতে, আমি বাবার সঙ্গে বিজয় তোরণের ভেতর দিয়ে খুব ব্যস্ত বি সি রোডে ঢুকে পড়লাম।
    বাবা বললেন, ‘এই গেটটার এখনকার নাম বিজয় তোরণ, আগেকার নাম ছিল কার্জন গেট। লর্ড কার্জনের নাম পড়েছিস তো, সেই যে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের খলনায়ক, সে সময় ভাইসরয় এবং গভর্নর জেনারেল অব ইন্ডিয়া ছিলেন। ১৯০৩ সালে সেই সময়কার বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাব কার্জন সায়েবের সম্মানে এই গেট বানিয়েছিলেন’। আমি একটু দাঁড়িয়ে আরেকবার ভালো করে দেখলাম এই সেই বিজয় তোরণ – বেশ সুন্দর।
    বাবা আরও বললেন, ‘দামোদরের ধারে বেড়ে ওঠা এই শহর কিন্তু বহুদিনের পুরোনো – তোদের কলকাতার মতো বৃটিশদের বানানো ভুঁইফোঁড় শহর নয়। ইতিহাসে যা প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায়, খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর, বর্ধমানস্বামীর নামেই নাকি এই জায়গার নাম হয় বর্ধমান, উনি বেশ কিছুদিন এখানে ছিলেন, তার আগে এই জায়গার নাম ছিল আস্তিকগ্রাম। আস্তিক মানে জানিস’?
    ‘হ্যাঁ, যারা ধর্ম মেনে চলে’।
    ‘গুড, চল এখন বর্ধমানের বিখ্যাত দোকানের বিখ্যাত মিহিদানা-সীতাভোগ কিনে ফেলি, এখন নীলদের জন্যে নিয়ে যাই, ফেরার সময় কিনব আমাদের জন্যে’। বেশ বড় মিষ্টির দোকানটি থেকে আমরা মিহিদানা আর সীতাভোগ কিনলাম। দোকানের ভিতরটা ঘিয়ের সুঘ্রাণে ভরে আছে। কেনাকাটা সেরে ফেরার পথে বাবা আবার বললেন –‘কাজেই বুঝলি তো এই শহরটা কত পুরোনো আর ইতিহাসের কত ঝড়ঝাপটা সামলেছে? আমি তো তাও বললাম প্রথম প্রমাণ পাওয়া ইতিহাসের কথা, তার আগেও প্রায় প্রস্তর যুগ থেকেই নাকি এই অঞ্চলে সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। কাশী বা বারাণসী বিশ্বের প্রাচীনতম লিভিং সিটির মধ্যে অন্যতম জানিস তো?
    ‘লিভিং সিটি মানে’?
    ‘লিভিং সিটি মানে প্রাচীন যে শহর আজও স্বমহিমায় বেঁচে আছে। পৃথিবীতে অনেক জমজমাট প্রাচীন শহরের কথা ইতিহাসে আমরা পড়েছি, কিন্তু দেখতে পাই তাদের পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ। বারাণসী আজও একইরকম গুরুত্বপূর্ণভাবে জীবন্ত, সেই কোন প্রায় প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে। বর্ধমানও কিন্তু লিভিং সিটি হিসেবে প্রাচীনতায় নেহাত ফ্যালনা নয়। হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, মুসলিম, সুফি, বৈষ্ণব, শাক্ত, তন্ত্র, খ্রীষ্টান - সব  ধর্মের প্রভাব আছে এই শহরের ইতিহাসে। এ সব তোর মা, আমার চেয়েও ভালো বলতে পারবে। চল, তোর মা খুব বোর হচ্ছে নিশ্চই, তাড়াতাড়ি ফেরা যাক’। আমরা গাড়ির কাছে পৌঁছে গেছিলাম।
    আমি গাড়ির পিছনে উঠে মিষ্টির পাত্রদুটো রাখতে মা সামনের সিট থেকে পিছন ফিরে দেখলেন, বললেন, ‘চ্যাঙাড়িদুটো সাবধানে রাখিস। কতটা করে নিলে’? শেষ কথাটা বাবাকে জিগ্যেস করলেন মা।
    ‘ইয়েস চ্যাঙাড়ি, নামটা ভুলে গিয়েছিলাম। দুকিলো করে নিলাম – হবে না’? বাবা বললেন।
    ‘কি বললে, চ্যাংড়া’?  আমি জিগ্যেস করলাম বাবাকে,
    আমার কথা শুনে মা হাসলেন। বললেন, ‘চ্যাঙাড়ি। খুব পাতলা করে কাটা বাঁশের চাঁচ দিয়ে বানানো হাল্কা ঝুড়ি। অনেকটা ফাঁক ফাঁক করে বোনা। তাকে বলে চ্যাঙাড়ি। আর দ্যাখ একটা পাতা বিছোনো আছে ঝুড়ির ভেতরে – ওটা সাধারণতঃ শালপাতা হয়, কিন্তু বর্ধমানে পদ্মপাতা ব্যবহার হয়। পদ্মপাতায় তেল বা রস চিপকে যায় না। সহজে ছিঁড়ে যায় না বা ফেটেও যায় না। এত ভালো ইকোফ্রেন্ডলি প্যাকেজিং পাবি আর কোথাও, এই বাংলা ছাড়া’?
    মা মুচকি হেসে আমার দিকে তাকালেন, বললেন, ‘সাধে কি বলি, কলকাতার বাইরে বের হ’।
    বাবা একটা শার্প টার্ন নিয়ে জি টি রোড ছেড়ে কাটোয়া রোডে উঠলেন। রেল ওভার ব্রিজ পার হবার সময় সদাব্যস্ত বর্ধমান স্টেশানটা নীচে দেখা যাচ্ছিল। একটু যাওয়ার পর একটা তিনরাস্তার মোড় পড়ল, আমরা যাব বাঁদিকে, কাটোয়া রোড ধরে, ডানদিকে চলে গেছে কালনা লিংক রোড।
    শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে একটু ফাঁকা রাস্তায় পড়ে, বাবা মাকে বললেন,
    ‘মিষ্টি কিনতে যাবার সময় জ্যোতিকে বলছিলাম, এই বর্ধমান আর তার আশে পাশের এই সব জায়গা কত প্রাচীন, আর কত ঐতিহাসিক ঘটনা জুড়ে আছে এইসব জায়গার সঙ্গে’।
    ‘এক্স্যাক্টলি। এই বর্ধমান, ওদিকে কালনা, আর আমরা যে এই কাটোয়া রোড ধরে যাচ্ছি, কাটোয়া, আর ওপাশে নবদ্বীপ এইসব জায়গাতেই ঘটে গিয়েছিল নবজাগরণ। পূবে গঙ্গা, উত্তরে অজয় আর পশ্চিমে দামোদর, এই তিনটে নদীর উর্বর অববাহিকায়, সম্পন্ন গ্রাম ও সমৃদ্ধ শহরগুলিকে কেন্দ্র করে, দারুণ এক নতুন চেতনার সৃষ্টি হয়েছিল এবং সেই নতুন ভাবনা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। যার প্রভাব অল্পবিস্তর হলেও, আজও আছে এই আমাদের সময় পর্যন্ত’।
    ‘কিন্তু, বাংলার নবজাগরণ বা রেনেসাঁতো এসেছিল রামমোহন রায়, ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গলদের সময়।’ আমি বললাম মাকে।
    ‘হ্যাঁ, একদম ঠিক। কিন্তু এর আগেও এই বাংলায় আরেকবার রেনেসাঁ ঘটেছিল, আজ থেকে পাঁচশ বছরেরও আগে। অদ্ভূত প্রতিভা আর ভাবনা নিয়ে শ্রীচৈতন্যদেব এসেছিলেন। তাঁর হাত ধরে’।

    কথায় কথায় আমরা শহরের সীমানা ছেড়ে অনেকটা চলে এসেছি। রাস্তার দুপাশে তাকিয়ে অন্যরকম এক জগৎ মনে হচ্ছিল। এক্সপ্রেসওয়ে ধরে চলার পথেও দুপাশে গ্রাম আছে, আছে চাষের ক্ষেত, কিন্তু তার সঙ্গে এই রাস্তার দুধারের গ্রাম জীবনের বিস্তর ফারাক লাগছে। তফাৎটা ঠিক কোথায় বলা মুশকিল, কিন্তু রয়েছে। শরতের নীল আকাশ আছে। আছে চোখ জুড়োনো সবুজ। তার সঙ্গে দুপাশের মানুষজন যেন মিশে আছেন পোশাকে পরিচ্ছদে, চলাফেরায়, কাজে কর্মে। ধীরে ধীরে আমার মাথার মধ্যে সত্যি সত্যি কলকাতার ভূত নেমে সবুজ আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ছবিগুলো বাসা বাঁধতে শুরু করল। ভাল লাগছিল বেশ। আসলে এক্সপ্রেসওয়ে দৌড়ে চলেছে সমস্ত গ্রামগুলোকে ঠেলে পাশে সরিয়ে দিয়ে, আর এই রাস্তাটা চলেছে সমস্ত গ্রামগুলোকে মালার মতো গেঁথে নিয়ে। তাদের সুখদুঃখ, কান্না-হাসির অংশীদার হয়ে।
    একটা গঞ্জমতো, বেশ অনেক দোকানপাটওয়ালা জায়গায় বাবা একটা চায়ের দোকান দেখে, গাড়ি সাইড করে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘চ, একটু চা খাই, আর নীলদের বাড়ির রাস্তাঘাটের খোঁজখবরটাও জেনে নিই। তুমি খাবে তো চা’? মাকে জিগ্যেস করলেন বাবা।
    ‘খাব, দাঁড়াও, আমিও নামি একটু। উফ, সকাল থেকে সেই একভাবে বসে বসে পা ধরে গেছে’। আমরা সকলেই নামলাম। চা খেয়ে বাবা চায়ের দোকানে বসা লোকজনদের থেকে ভালো করে বুঝে নিলেন নীলকাকুদের গ্রামে যাওয়ার রাস্তাঘাট। আমাদের যাত্রা আবার শুরু হল। গাড়ি আবার সহজ রাস্তায় চলা শুরু হতেই বাবা মাকে বললেন, ‘তখন শ্রীচৈতন্যদেবের কথা কি বলছিলে’?
    মা একটু চিন্তা করে নিয়ে বললেন, ‘হুঁ। ১৪৮৬ সালের দোলপূর্ণিমার দিন শ্রীচৈতন্যদেবের জন্ম হয়েছিল এমন একটা সময়ে, যখন বাংলার সামাজিক এবং ধর্মীয় অবস্থা যাকে বলে নিদারুণ। একরকমের মাৎস্যন্যায় বললেও ভুল বলা হয় না। মাৎস্যন্যায় মানে জানিস তো, ভুটকু’? আমার ভালো নাম জ্যোতিষ্ক, ডাকনাম জ্যোতি, মা আদর করে ভুট্‌কুও বলেন।
    ‘বড় মাছ যেমন ছোটমাছদের গ্রাস করে ফেলে - দেশে অপশাসনের জন্য ক্ষমতাবান প্রভাবশালী লোকেরা সাধারণ আম জনগণের ওপর অত্যাচার করেও যখন পার পেয়ে যায় আর গরিব মানুষগুলো কোন প্রতিকার না পেয়ে পেয়ে ধ্বংস হতে থাকে...’।
    ‘বাঃ, খুব সুন্দর বলেছিস তো...ঠিক ওইরকম অবস্থাই ছিল সেসময়, আমাদের এই বাংলা...একদিকে মুসলিম শাসকদের অত্যাচার, কাজিদের অবিচার আর অন্যদিকে ব্রাহ্মণদের অত্যধিক পুজোপার্বণ, নিয়মকানুন, ছ্যুত-অছ্যুত, ছোটজাত-নীচুজাত...সব মিলিয়ে সাধারণ জনসমাজের একদম দমবন্ধ করা অবস্থা। সেই সময় শ্রীচৈতন্যদেব এনে দিয়েছিলেন মুক্তির বাতাস। তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য আর তীক্ষ্ণ বিচার বুদ্ধি দিয়ে, সেই সময়কার বাংলার যতো পণ্ডিতকে পরাস্ত করতে পেরেছিলেন। দাঁড় করাতে পেরেছিলেন তাঁর মত ও আদর্শ। সবচেয়ে বড়ো কথা হল তাঁর নিজের জীবন দিয়ে, তাঁর সহজ সরল ব্যক্তিত্ব দিয়ে সকলকে বোঝাতে পেরেছিলেন – পুজোধ্যান, যাগযজ্ঞ, তন্ত্র-মন্ত্র কিচ্ছু নয়, ভক্তি আর প্রেমই হল একমাত্র ধর্ম আর তাতেই মিলবে মুক্তি এবং ঈশ্বরের সন্ধান। শুদ্ধ মনে, অন্তরের ভালোবাসায় নাম সঙ্কীর্তন করলেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব, এই সহজ কথাটা তিনি তাঁর জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন সেই সময়ের অন্ধ বিশ্বাস আর সংস্কারে আচ্ছন্ন সঙ্কীর্ণ সমাজকে। হিন্দু-মুসলিম, ব্রাহ্মণ-শূদ্র বড়জাত-ছোটজাত, ধনী-দরিদ্রকে একই ভক্তি পথের ধুলোতে নিয়ে এসেছিলেন। পাল্টে দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের ভাবনা।
    এতক্ষণ বলার পর মা একটু থামলেন। আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে মার কথা শুনছিলাম, মনে হছিল, আমরা যে রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে চলেছি, কতদিন আগে, কে জানে হয়তো, এই রাস্তা দিয়েই পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব, প্রায় ঈশ্বরের মতো ব্যক্তিত্ব নিয়ে। তাঁর মহিমায় মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল এই পথ, মাঠঘাট, প্রকৃতি আর মানুষজন।
    মা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এমন নয় যে, তাঁর দেখানো পন্থায় সব্বাই বৈষ্ণব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর আদর্শ প্রভাব ফেলেছিল, তাঁর বিরোধী ধর্মে যাঁরা বিশ্বাস করতেন, তাঁদেরও। তাঁর ভালোবাসার আর সরল ভক্তির পথ কমবেশী ছড়িয়ে পড়েছিল সবার মধ্যেই! মা দুর্গা হয়ে গেলেন আমাদের ঘরের আদরের মেয়ে, মা কালী হয়ে গেলেন ঘরের মা, যাঁর কাছে আদর, আবদার, ঝগড়া-অভিমান সব করা যায়। এমন কি তিনি মেয়ে হয়ে ঘরের বেড়া বাঁধতেও সাহায্য করে যান। এক কথায় ভালোবাসা আর কোন স্বার্থ না থাকা ভক্তিতে মেতে উঠেছিল দেশ। সেই রেশ অনেকদিন পর্যন্ত রয়ে গিয়েছিল আমাদের সমাজে।’ মা আবার থেমে গেলেন। অনেকক্ষণ আমরা কেউ কোন কথা বলছিলাম না, ভাবছিলাম মায়ের কথাগুলো।
    বেশ কিছুক্ষণ পর বাবা আমার হাতে মোবাইলটা দিয়ে বললেন, ‘নীলকে লাগাতো’।
    গাড়ি চালানোর সময় বাবা ফোন ধরেন না, মিটিং মোডে রেখে দেন। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম চারটে মিস কল রয়েছে; তার মধ্যে দুটো নীলকাকুর, আর বাকি দুটো অন্য কারো। নীলকাকুর নম্বর ডায়াল করতেই, নীলকাকু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফোন ধরলেন, বললেন, ‘আরে, সমরেশদা, আপনি কদ্দূরে, আপনাকে দুবার ফোন করলাম, ওঠালেন না’।
    ‘কাকু, বাবা তো ড্রাইভ করছেন, তাই আমি ফোন করছি’। আমি ফোনের স্পিকার অন করে দিলাম।
    ‘ও জ্যোতি, শোনো, তোমরা কদ্দূরে’?
    ‘বাবা, আমরা কদ্দূরে গো, নীল কাকু জিগ্যেস করছেন’।
    ‘বল, আমরা মিনিট পাঁচেক আগে “হিমানী হিমঘর” পার হয়ে এসেছি’। আমাকে আর বলতে হল না, নীল কাকু শুনতে পেয়ে বললেন, ‘বাঃ, তাহলে তো চলে এসেছো। একটু লক্ষ্য করে চালাতে বলো বাবাকে, আমরা বড়ো রাস্তার বাঁদিকেই দাঁড়িয়ে আছি। একটা গ্রে স্করপিও’। আমাদের কথা শেষ হতে না হতেই, বাবা বললেন, ‘দ্যাখ তো ওটাই না, গ্রে স্করপিও’। ঠিকই ওই গাড়িটাই। নীলকাকু হাত নাড়ছিলেন। সঙ্গে নীলকাকুর ড্রাইভার গোবিন্দদা।
    বাবা গাড়ি সাইড করে দাঁড়াতেই নীলকাকু জানালার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘নমস্কার বৌদি, যাক, অবশেষে আসা হল তাহলে, ওয়েলকাম। সমরেশদা, আপনি আমাদের গাড়িটা ফলো করে চলে আসুন। এখান থেকে এই মিনিট পনের লাগবে, একটু ভেতরের দিকে’।
    ‘ও কে, নীল। তোমাদের রাজ্যে এসেছি, যেমন তোমার আদেশ’, বাবা হেসে বললেন।
    ‘কি যে বলেন, সমরেশদা। আসুন আসুন, সেই কোন কাকভোরে বেড়িয়েছেন, বাড়ি চলুন আগে’। বলতে বলতে নীলকাকু এগিয়ে গাড়িতে উঠল, গোবিন্দদা গাড়ি স্টার্ট করে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলল। বাবাও ফলো করতে লাগলেন। বড়ো রাস্তা ছেড়ে খুব সরু পিচের রাস্তা, একটার বেশি গাড়ি চলা বেশ কঠিন, পাস বা ওভারটেক করতে হলে রাস্তা ছেড়ে মাটিতে সাইড করে দাঁড়াতেই হবে। বেশ কিছুটা যাবার পর অনেক গাছপালা ঘেরা একটা বিশাল বাড়ি চোখে পড়ল, প্রাসাদের মতো। দেখে অবাক না হয়ে পারা যাবে না। এমন একটা জায়গায় এমন বাড়ি! ভাবা যায় না!
    ‘বাবা, ওই বাড়িটাই নীলকাকুদের মনে হয়, তাই না?
    ‘নিশ্চই তাই, এ তো আর কলকাতা নয়, যে এমন বাড়ি পাশাপাশি অনেকের থাকবে...’।
    ‘কিন্তু এমন জায়গায় এমন বাড়ি?
    ‘এটা কি আজকের বাড়ি নাকি? অন্ততঃ শতখানেক বছরের পুরোনো তো হবেই। তখনো এইসব অঞ্চলের জমিদার বা বড়োলোকেরা কলকাতাকে নিজেদের জায়গা বলে ভাবতেন না। এই গ্রামেই যতটা সম্ভব আধুনিক বিলাসবহুল প্রাসাদ বানিয়ে তাঁরা বাস করতেন। আর এই জায়গার সঙ্গেই তাঁদের থাকত আত্মার যোগ। কাজে কর্মে, মামলা মোকদ্দমায় বর্ধমান বা কলকাতায় যেতেন, কেউ কেউ বাড়িও বানিয়ে ফেলতেন সেখানে, কিন্তু স্থায়ী ভাবে থাকার কথা ভাবতেন না’।    
    বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে স্করপিওর পিছন পিছন আমরা ঢুকে পড়লাম সেই প্রাসাদের কম্পাউণ্ডে। মুরাম বিছোনো রাস্তা গোল হয়ে ঘুরে গেছে গাড়ি বারান্দার নিচে দিয়ে। স্করপিওটা একটু আগে গিয়ে দাঁড়াল, যাতে আমাদের গাড়িটা একদম দরজার সামনেই দাঁড়াতে পারে।
    গাড়ির শব্দ পেয়ে দরজায় এলেন নীলকাকুর স্ত্রী রত্নাকাকিমা, নীলকাকুর দুই মেয়ে, ইতি আর উতি। ইতি বড়ো, ক্লাস থ্রিতে পড়ে আর উতি ছোট্ট তবে স্কুলে যায়, কেজি ওয়ান বা টুতে পড়ে। একটু পিছন থেকে ধীর পায়ে হেঁটে আসছিলেন বোধহয় নীলকাকুর মা। বেঁটেখাটো, একটু মোটাসোটা খুব ফর্সা বয়স্কা মহিলা। বয়সের কারণে চলতে একটু অসুবিধে হয় বোঝা যায়, হাঁটুতে ব্যথা পান নিশ্চয়ই। আমরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে দরজার সামনে দাঁড়াতে উনি নিজেই বললেন, ‘আমি নীলুর মা, আমাকে মাসিমা বলতে পারো, মা। এসো মা এসো। মায়ের বাড়ি এক মেয়ে এসেছে ছেলেমেয়েকে নিয়ে, কিন্তু সঙ্গে জামাই আসে নি। আর তুমি এলে, সঙ্গে জামাই নিয়ে, ছেলে নিয়ে, ঘর পূর্ণ হয়ে গেল, মা। এসো এসো, মা, ভেতরে এসো’। মা সিঁড়ি দিয়ে চাতালে উঠে নিচু হয়ে প্রণাম করতে গেলেন নীলুকাকুর মাকে, কিন্তু মায়ের হাত ধরে ফেলে নীলুকাকুর মা বললেন, ‘ছি, ছি। ও কি করছো মা, তুমি বামুনের মেয়ে, বামুনের বৌ, আমার পাপ হবে, মা’।     
    ‘বাঃ রে। মেয়ে হয়ে মায়ের পায়ে প্রণাম করতে পারব না? মায়ের কাছে মেয়ের আবার জাত হয় বুঝি’? মা প্রণাম করলেন। প্রণাম করে উঠতে নীলকাকুর মা মায়ের চিবুক ছুঁয়ে চুমো খেলেন এবং আশীর্বাদ করে বললেন, ‘সাবিত্রীস্বরূপিনী হও মা, এবার এসো, ভেতরে চলো’। 
     


    দুপুরে খাওয়ার পর মায়ের ঘুমোনোর অব্যেস নেই, বাবা আর আমি অবিশ্যি সুযোগ পেলে ছাড়ি না। কিন্তু আজ আমরা সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কারণ গতকাল শুতে শুতে আমাদের অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল আর আজ আবার ভোর ভোর বেরোতেও হয়েছিল। কাজেই বকেয়া ঘুমটা এসেই গেল সপ্তমীর খিচুড়ি ভোগ, ছোট্ট ছোট্ট ভাজাবড়ি, ঝিরঝিরে আলুভাজা, কুমড়োফুলের বড়া আর টোম্যাটোর চাটনি খেয়ে।
    পৌনে পাঁচটা নাগাদ আমি মায়ের ডাকে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়লাম, বাবা আবার পাশ ফিরে শুলেন। মা বললেন, ‘শুনছ, এখুনি হয়তো চা নিয়ে আসবে, আর মাসিমারাও চলে আসবেন। উঠে পড়ো’। মা বাবাকে ডেকে মুখটুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে নিলেন, তারপর বারান্দায় বের হলেন, বাইরে থেকে আমাকে ডাকলেন,
    ‘ভুটকু, বাইরে আয়, দেখে যা শরতের বিকেল’। মায়ের ডাকে আমি বের হলাম।

    আমাদের সামনে নিচে এই বাড়ির বাগান, তার দুধারে লাল মুরাম বিছানো রাস্তা, বাউণ্ডারি ওয়াল বরাবর ভিতরের দিকে সারি দেওয়া বড় বড় বটল পাম গাছ, আর দুধারে সুপুরি গাছের সারি। বাউণ্ডারির বাইরে গা ঘেঁষে সরু পিচের রাস্তাটা চলে গেছে বাঁদিকে, গ্রামের দিকে। আর সামনে সোজা দক্ষিণে রাস্তাটা অলস শুয়ে আছে। এই রাস্তা ধরেই আমরা সকালে এসেছি। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডানদিকে সূর্যডোবার দৃশ্যটা সত্যি দুর্ধর্ষ দেখাচ্ছিল। সামনে বিস্তীর্ণ ধানের সবুজ ক্ষেত। সবে শীষ এসেছে। ধান গাছের আধখানা পর্যন্ত জল দাঁড়িয়ে আছে। মেঠো আলের আঁকিবুঁকি নিয়ে বিছিয়ে থাকা এই সবুজ ক্যানভাসটার বহুদূরে ঘন গাছপালার বর্ডার আর তার ঠিক ওপরে মস্ত বড় গোলাপি সূর্য, অস্ত যাবার আগে অবিশ্বাস্য সব রঙের ওড়না উড়িয়ে দিয়েছেন আকাশময়। গোটা পশ্চিম আকাশটা মেতে উঠেছে সেই রঙে। মিনিট পনেরর মধ্যেই দিগন্তের আড়ালে নেমে পড়লেন সূর্যদেব। তবু আকাশে রয়ে গেল অজস্র রঙের উচ্ছ্বাস। এক ঝাঁক টিয়াপাখি সবুজ রঙ ছিটিয়ে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল, স্কুলফেরা বাচ্চাদের মতো কিচিরমিচির করতে করতে। ধান ক্ষেতের আড়ালে চড়তে থাকা সাদা বকের সারি উড়াল দিল, একদম সোজা অস্তে যাওয়া সূর্যের দিকে। সমস্ত প্রকৃতির ওপর হাল্কা চাদরের মতো অন্ধকার ছড়িয়ে আসছিল, আর ধানক্ষেতের থেকে উঠে আসছিল হাল্কা কুয়াশা ভরা নিশ্বাস। ভাল লাগছিল, ভীষণ ভাল লাগছিল।

    আমি মাকে হঠাৎ জিগ্যেস করলাম, ‘সাবিত্রীস্বরূপিনী কি মা’?
    মা হাসলেন, ‘ও, সকালে মাসিমার কথাটা মনে করে রেখে দিয়েছিস। ওটা বিবাহিতা মেয়েদেরকে আশীর্বাদ করার একটা পুরোনো প্রথা। আজকাল আর কেউ ওসব বলে না, বললে হাসবে। সাবিত্রী-সত্যবানের গল্পটা মনে আছে তোর, ছোটবেলায় আমি শুনিয়েছি, তোর দিদিমাও শুনিয়েছেন তোকে’।
    ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই যে রাজ্যহারানো অন্ধরাজা দ্যুমতসেনের ছেলে সত্যবান মারা গেল, আর তার স্ত্রী সাবিত্রী যমরাজের থেকে চার-চারটি বর আদায় করে নিয়ে সত্যবানের জীবন ফিরিয়ে নিয়েছিলেন’।
    ‘গুড, ওই রকমটা মহাভারতে আছে, আমরা কিন্তু ছোটবেলায় একটু অন্যরকম শুনতাম। যমরাজ নাকি একটি মাত্র বর দিতে চেয়েছিলেন, বলেছিলেন, “স্বামীর জীবন ছাড়া, যা চাও তা পেতে পারো”। দারুণ বুদ্ধিমতী সাবিত্রী বর চেয়েছিলেন “আমার শ্বশুর যেন, নাতি-নাতনীদের মুখ দেখতে দেখতে সোনার থালায় রাজঅন্ন ভোগ করতে পারেন।” যমরাজ দেখলেন, এই বরে কোথাও সত্যবানের জীবন ভিক্ষার কথা নেই, কাজেই তিনি নিশ্চিন্তে অ্যাপ্রুভাল দিয়ে বললেন, “তথাস্তু”। এই এক বরে সাবিত্রীর অন্ধ শ্বশুর দ্যুমতসেন, হারানো রাজ্য ফিরে পেলেন। নাতি নাতনীদের মুখ দেখার জন্যে দৃষ্টি ফিরে পেলেন। কিন্তু মাত্র একবছর আগে বিয়ে হওয়া সাবিত্রী-সত্যবান তখনও পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন, কাজেই সত্যবানের মৃত্যু হলে রাজা দ্যুমতসেন নাতি নাতনী পাবেন কি করে? কাজেই যমরাজ সাবিত্রীর বুদ্ধিতে পরাস্ত হয়ে শেষমেষ সত্যবানের জীবন ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। সেই থেকে এই কথাটা চালু হয়ে গেল, সাবিত্রীস্বরূপিনী। মানে যে বিবাহিতা মেয়ে তার স্বামীপুত্রসহ শ্বশুরকূলের পক্ষে একান্ত মঙ্গলদায়িনী’।
    আমি খুব গম্ভীরভাবে বললাম, ‘হুঁ। তোমার মাসিমা তার মানে ঠিকই বলেছেন’।
    আমার এ কথায় মা রাগ দেখাতে গিয়েও হেসে ফেললেন, বললেন, ‘ডেঁপোমি হচ্ছে, একটি গাঁট্টায়...’। মার কথা শেষ হওয়ার আগেই নীলকাকুর মা এসে গেলেন।
    ‘ওই দ্যাক, মা ছেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তোকে বললাম না, ও মেয়ে সাঁঝবিকেলে ঘুমিয়ে থাকার মেয়েই নয়। ওকে আমি ঠিক চিনে নিয়েছি’। এক মুখ হাসি নিয়ে নীলকাকুর মা হেঁটে আসছিলেন, সঙ্গে নীলকাকু। ওঁনাদের দেখে মা এগিয়ে গেলেন, আমি ঘরের ভেতর উঁকি মেরে দেখলাম, বাবাও উঠে বাথরুমে গেছেন।

    ঘরে ঢুকে নীলকাকুর মা বিছানায় পা ছড়িয়ে বসলেন, বললেন, ‘আমি বাপু চেয়ার টেয়ারে বসতে পারি না, বাতে ধরা হাঁটুর জ্বালায়। এই বিছানাই আমার বেশ। তুইও আমার কাছে এসে বোস, মা’। আমরা তিনজনে চেয়ারে বসলাম, মা বসলেন নীলকাকুর মায়ের পাশে। বসার পর নীলকাকু বললেন ‘চা আসছে, সমরেশদা। বৌদি চায়ের সঙ্গে কি খাবেন, নোনতা কিছু – চিপস, চানাচুর’?
    ‘না, না, আমার কিছু লাগবে না। তবে...’। মা থেমে গেলেন, মায়ের মুখে লাজুক হাসি। নীলকাকুর মা আর নীলকাকু খুব অবাক হয়ে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন, তারপর নীলকাকুর মা বললেন, ‘কিসের কথা বলছিলি শোভা মা, বল না’।
    ‘আপনাদের বাড়িতে চালভাজা নেই? বহুদিন খাই নি’।
    ‘দ্যাকো কাণ্ড, সামান্য চালভাজার জন্যে এতো আক্ষেপ? ও কি আবার যেচেপড়ে খেতে দেবার জিনিষ নাকি? তোরা সব কলকাতার লোক। নীল্টু বৌমাকে বলে দে না, হারুকে দিয়ে আমতেল মেখে চালভাজা পাঠিয়ে দিক। সঙ্গে নারকেলও কুচিয়ে দিতে বলবি’।
    নীলকাকুর মা মায়ের পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘তোর সাধের চালভাজা মাখা আসছে, কিন্তু যে জন্যে তোর কাছে আসা সেটা এই বেলা বলে নিই, তা নইলে ওদিকে আবার আরতির সময় হয়ে যাবে। মায়ের আরতি দেখবি তো’?
    মা বললেন, ‘মায়ের পুজো আরতি দেখতেই তো আসা – আপনি বলুন মাসিমা। কি কথা’।
    নীলকাকু মোবাইলে কাকীমাকে চালভাজা পাঠিয়ে দেবার কথা বলে দিলেন, তারপর অফ করে বললেন, ‘শুরুটা আমি বলে নিই, মা। তারপরে না হয় তুমি বোলো।’
    ‘সেই ভালো। তুইই শুরু কর’।
    নীলকাকু নিজেকে একটু যেন গুছিয়ে নিলেন, তারপর শুরু করলেন, ‘আমাদের এই দত্ত পরিবারের উত্থানের শুরু আমার ঠাকুরদাদা - নরনারায়ণ দত্তর হাত ধরে। তার আগে আমরা এই গ্রামে স্বচ্ছল এবং সম্পন্ন এক পরিবার ছিলাম মাত্র, কিন্তু বাড়বাড়ন্ত আমার দাদু নরনারায়ণ দত্তর সময়েই। প্রথমেই বলে রাখি আমরা কিন্তু কোনদিন কোনভাবেই নীল রক্তযুক্ত জমিদার – টমিদার নই। দাদু ছিলেন অসাধারণ মেধাবি। গ্রামের পাঠশালা আর প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পার করেও তাঁর লেখাপড়ার তীব্র আগ্রহ দেখে দাদুর বাবা - আমার প্রপিতামহ শিবনারায়ণ ছেলেকে বর্ধমানে পাঠান এবং সেখানেই বোর্ডিংয়ে থেকে তিনি হাইস্কুলের পাঠ শেষ করেন। শিবনারায়ণের মুখ উজ্জ্বল করে আমার দাদু ভীষণ ভাল রেজাল্ট করলেন এবং তারপর তিনি বর্ধমান ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে লেখাপড়া শুরু করলেন। কিন্তু সেখানেও শেষ হল না, কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পড়া সাঙ্গ করে তিনি চলে গেলেন, কালাপানি পার হয়ে বিলেতে। লন্ডন থেকে এম আর সি পি করে ফিরে এলেন দেশে’।
    নীলুকাকুকে এসময় থামতে হল কারণ চালভাজা আর চা নিয়ে হারুকাকু ঘরে ঢুকল। আমি চা খাই না। কিন্তু চালভাজার বাটি হাতে নিয়ে একমুঠি মুখে পুরে নতুন আস্বাদে মুখটা ভরে উঠল। মুড়ির মতোই, শুধু হলুদমাখা, সঙ্গে আছে দুএকটা ছোলা মটর ভাজা, কুমড়োর বীজ ভাজা আর কুসুমবীজ ভাজা। আমতেল মাখানোতে আমের গন্ধ আর সামান্য টক টক স্বাদ। তারসঙ্গে দু এক কুচি নারকেলের টুকরো। ঘরে বসে এমন চটজলদি মশলা মুড়ি বানিয়ে ফেলা যায়? ভাবা যায় না। চালভাজা শেষ করে নীলকাকু চায়ের কাপ তুলে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে বললেন, ‘বাঃ, বৌদি এই চালভাজার প্রস্তাবটা রিয়েলি দারুণ জমে গেল কিন্তু। দেশের বাড়িতে আসি যাই, কিন্তু আমিও অনেকদিন খাইনি। ছোটবেলায় খুব খেতাম, বলো, মা? যাই হোক যা বলছিলাম সে কথায় আবার ফিরে আসি। আমার দাদু নরনারায়ণ বিলেত ফেরত ডাক্তার হয়ে ফিরলেন, কিন্তু গ্রামে এসে তিনি খুব বিপদে পড়ে গেলেন। গ্রামের লোকেরা দাদুর জন্যে আমাদের পরিবারকে একঘরে করার হুমকি দিল’।
    ‘একঘরে মানে’? আমি জিগ্যেস করলাম।
    ‘আগেকার দিনে সাগর পার হয়ে কেউ বিলেত গেলে হিন্দুদের সমাজে তাকে পতিত বলে মনে করা হত, পতিত মানে তার মধ্যে আর হিন্দুত্ব নেই। সে সায়েবদের দেশে গিয়ে, তাদের সঙ্গে মেলামেশা, ওঠাবসা, খাওয়াদাওয়া করার জন্যে, তার জাত চলে গেছে ধরা হত। গ্রামের লোক তার সঙ্গে কোন কথা বলবে না, তার বাড়িতে কোন কাজের লোককে, বামুন, ধোপা, নাপিত, কাউকে কাজ করতে দেওয়া হবে না। বিয়ে, পৈতে, শ্রাদ্ধ কোনরকম কাজকর্মে, বিপদে আপদে – কেউ ডাকবেও না, আসবেও না কেউ। মানে সামাজিকভাবে বয়কট করে তাকে আলাদা করে দেওয়া হত।  তুই এখন থাম, পরে তোকে আরো বুঝিয়ে বলব, এখন নীলকাকুকে বলতে দে’। মা বললেন।
     ‘হ্যাঁ। একঘরে করে দেবার হুমকি দিল। আর বিধান দিল দাদুকে হিন্দু শাস্ত্রমতে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। দাদু রাজি হলেন না। তিনি গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন, কলকাতায় গিয়ে শুরু করলেন প্র্যাকটিস। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি দারুণ পসার জমিয়ে প্রচুর অর্থ ও খ্যাতি অর্জন করে গ্রামে এই বাড়ি বানিয়েছিলেন এবং এই বাড়িতেই তিনি তুলে এনেছিলেন তাঁর বাবা-মা ও সমস্ত পরিবারকে। তাঁর অর্জিত বিপুল প্রভাব প্রতিপত্তির ভয়ে গ্রামের লোকেরা তখন আর সাহস করে নি দাদুর বিরুদ্ধে যাওয়ার। বরং এই বাড়িতে তিনি যখন দুর্গাপুজো চালু করলেন, গ্রামের সমস্ত লোক নির্দ্বিধায় আমাদের এই বাড়িতে এসেছিল এবং পুজোর প্রসাদ পেয়েছিল’। নীলকাকু আবার একটু থামলেন। 

    কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নীলকাকু আবার শুরু করলেন, ‘এই বাড়িতে গৃহপ্রবেশ হয়েছিল অক্ষয় তৃতীয়ার দিন আজ থেকে সাতাত্তর বছর আগে, আর এই বাড়ির পুজোও চলছে ওই সাতাত্তর বছর ধরেই সাবেকি নিয়ম মেনে। কিন্তু আমাদের পক্ষে যতদিন যাচ্ছে, এই বাড়ি মেনটেন করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। বাবা থাকতেই আমাদের কাছে এই বাড়ি বিক্রির অফার আসছিল বারবার, আমরা মনস্থির করতে পারছিলাম না। কিন্তু দিনদিন যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছি এই বাড়ি বিক্রি করে দেবার। এক প্রমোটার বেশ ভাল অফার দিয়েছে, মোটামুটি মাস তিন চারের মধ্যেই এই বাড়ি হস্তান্তর হয়ে যাবে। এই বাড়ি শুনেছি রিসর্ট হিসেবে ব্যবহার হবে, পিকনিক, পার্টি, গেট টুগেদার, হয়তো সিরিয়াল বা সিনেমার শুটিং...এইসব হবে আর কি। সে সব তো যা হবার হবে, এ বাড়ি বিক্রি করতে আমাদের যে মানসিক অবস্থা তাতো বুঝতেই পারছেন। কিন্তু এসব ছাড়াও আমাদের আরেকটা বড়ো দুশ্চিন্তা রয়েছে, যেটার জন্যেই আপনার সাহায্য চাইছি আমরা। আমি সমরেশদার মুখে শুনেছি, আর আপনাকে বেশ কয়েকবার অফিসের গেট টুগেদারে দেখেছি, আপনার দারুণ অবজারভেসন পাওয়ার; আপনি অনায়াসে গোয়েন্দা হতে পারেন। আমাদের সমস্যাটা সল্‌ভ করে দিলে, আমরা ভীষণ নিশ্চিন্ত হই। আমাদের মুশকিলটা কি, আমাদের ব্যাপারটা সকলকে বলা যাবে না। খুব চেনা জানা, নিজের জন ছাড়া বিশ্বাস করে একথা বললে বিপদ আছে। এবার যা বলার মা বলবেন, কারণ আমার চেয়ে মা অনেক বেশী জানেন’।
    নীলকাকু থামলেন। মা আর বাবা মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। আমার তো ফাটাফাটি লাগছিল, কলকাতার বাইরে পুজো দেখতে এসে, মা যদি একটা রহস্য ভেদ করে ফেলতে পারে! ওফ্‌, তার চেয়ে মজা আর কী হতে পারে?
    নীলকাকুর মা একটু পরে গলাটা সাফ করে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘আমি এ বাড়িতে বৌ হয়ে এসেছিলাম আজ থেকে বাহান্ন বছর আগে। আমার বয়েস তখন সতের। বিয়ের পর বৌভাতের পরের দিন আমার ঘরে শ্বশুরমশাই, শ্বাশুড়িমা আর ওর বাবা এসেছিলেন। আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটা সোনার কাজললতা। খুব সুন্দর, ছোট্ট একটা সোনার মাছ। তার দুচোখে দুটো লাল রঙের পাথর বসান। মাছের পিঠে চাপ দিলে লেজের দিক থেকে খুলে যেত – ভেতরটা ফাঁকা - কাজল জমানোর জায়গা। মাথার দিকটা বাঁধা ছিল একটা ছোট্ট সোনার পিন দিয়ে – সেটাতেই ঘুরে যেত মাছের দুটো পিঠ। মাছের মাথায় একটা ছোট্ট সোনার হাতল ছিল ধরার সুবিধের জন্যে। নীলুর দাদু আমার হাতে ওই সোনার মাছ তুলে দিয়ে বলেছিলেন, “তুমি মা, আমাদের ঘরে এসেছ মালক্ষ্মী হয়ে। তোমার জেনে রাখা ভালো, এই সোনার কাজললতা - এই সোনার মাছ, আমাদের এই পরিবারের কাছে ভীষণ শুভ একটা সম্পদ। এর শুধু যে অনেক দাম তাই নয় – আমাদের এই পরিবারের সমৃদ্ধির পিছনে এই মৎস্যরূপী কাজললতার বিপুল অবদান। আমাদের বিশ্বাস আমাদের পরিবারে এই মাছের উপস্থিতি আমাদের সকল অমঙ্গল ও অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত রেখেছে এবং উন্নতির শুভপথে আমাদের এগিয়ে দিয়েছে। কাজেই, এর মর্যাদা যেন কোন মতেই ক্ষুণ্ণ না হয়, সেটা দেখা আমাদের কর্তব্য। তুমি ছেলেমানুষ, এখনই তোমার ছোট্ট কাঁধে এর গুরু দায়িত্ব আমরা দেব না, মা। কিন্তু এই পরিবারের শুভাশুভের দায়িত্ব যখন তোমার কাঁধে চলে আসবে, তখন এরও দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। আর এর কথা খুব কাছের লোক ছাড়া কেউ যেন না জানতে পারে – কারণ এর অর্থমূল্যের লোভে অনেকেই লোভী হয়ে উঠতে পারে, সেটা আমাদের পক্ষে আদৌ মঙ্গলের হবে না”। একটু থেমে নীলকাকুর মা আবার বলতে শুরু করলেন,
    ‘সেদিন আমি সেই কাজললতাটি মাথায় ঠেকিয়ে মায়ের, মানে নীলুর ঠাকুমার হাতে ফেরত দিয়েছিলাম, আর তিনজনকেই প্রণাম করেছিলাম। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে, সেই সোনার মাছটি আমি আর একবার মাত্র দেখেছিলাম, নীলুর বিয়ের পর। নীলু আর রত্নার বিয়ের বৌভাতের পরদিন ওদের হাতেও ওর বাবা আর আমি মাছটা তুলে দিয়েছিলাম এবং রত্নাও যথারীতি আমাদের প্রণাম করে সোনার মাছটি ওর বাবার হাতে ফেরৎ দিয়েছিল। ব্যস, তারপরে আমি সোনার মাছটিকে আর দেখিনি। বহুদিন নীলুর দাদু মারা গেছেন, ঠাকুমাও মারা গেছেন অনেকদিন। নীলুর বাবাকে একবার জিগ্যেস করেছিলাম এই কাজললতাটির কথা, উনি বলেছিলেন ওঁনার কাছেই আছে, কিন্তু কোথায় রেখেছেন বলেন নি। গতবছর নীলুর বাবা যখন চলে গেলেন, আমি তখন নীলুর নিউআলিপুরের বাড়িতে ছিলাম। বৌমার শরীর খারাপ বলে দেখতে গিয়েছিলাম। ওই সময়ে নীলুও কলকাতায় ছিল না, তাই। ওর বাবার হঠাৎ শরীর খারাপের সংবাদ পেয়ে আমরা যখন এখানে এসে পৌঁছলাম, ততক্ষণে সব শেষ’। নীলকাকুর মায়ের গলাটা বেশ কেঁপে গেল। তিনি কেঁদে ফেললেন। মা নীলকাকুর মায়ের কাঁধে সান্ত্বনার হাত রাখলেন।
    মায়ের মানসিক অবস্থা বুঝে, নীলকাকু বলতে শুরু করলেন, ‘বাবা চলে যাবার পর, বাবার পড়ার ঘর আর মা-বাবার শোবার ঘর, সর্বত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আমরা কিন্তু ওই কাজললতার হদিস আজও পাই নি। সেইজন্যে আমাদের এখন সবচেয়ে দুশ্চিন্তা হল, এই বাড়ি বিক্রি হয়ে গেলে, এই বাড়ির সঙ্গে ওই অমূল্য কাজললতাটাও না হাতছাড়া হয়ে যায়। অথবা বাবার মৃত্যু আর আমাদের এসে পৌঁছোনোর মধ্যে যে সময়টা ছিল, সেই সময়ে কেউ সেটা চুরি করে নিল কিনা, এটা জানা ভীষণ জরুরি’। নীলকাকুর মা এতক্ষনে সামলে উঠেছিলেন, তিনি বললেন, ‘আমার দৃঢ বিশ্বাস, ওই কাজললতা চুরি হয় নি, হতে পারে না। এই বাড়িতেই আছে। লুকোনো আছে কোথাও। সেটাই তোমাকে খুঁজে দিতে হবে, শোভা মা। কাল যখনই তুমি আসছ শুনলাম, নীলুকে বললাম এ ঈশ্বরের আশীর্বাদ। নীলুর মুখে তো তোমার দারুণ বুদ্ধির কথা শুনেছি, আমি নিশ্চিত, পারলে তুমিই পারবে’।
    নীলকাকুর মা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন মায়ের উত্তর শোনার জন্যে। মা বললেন, ‘মাসিমা, জানিনা আমি পারবো কিনা। তবে আমি নিশ্চই চেষ্টা করব। আমি বুঝতে পারছি আপনাদের পরিবারের কাছে এই সোনার কাজললতা কতখানি মূল্যবান’। একটু ভেবে নিয়ে মা আবার বললেন, ‘আজকে তো আর সম্ভব নয়, কাল সকালে কিন্তু আমি ওই ঘর দুটো দেখতে চাই। মেসোমশাইয়ের পড়ার ঘর আর আপনাদের শোবার ঘর, দুটোই’।
    ‘একশ বার দেখবে মা। তোমাকে তো দেখাতেই হবে। এখন চলো, আরতির সময় হয়ে এল, সবাই নীচেয় চলো’।
           


    অষ্টমীর দিন ঢাকের বাদ্যিতে ঘুম ভেঙে গেল। নীচের ঠাকুরদালান থেকে চাপা আওয়াজ আসছে, ঢাক, সানাই আর কাঁসর ঘন্টার। ঘুম ভেঙে দেখলাম বিছানায় মা নেই। বাবা ওপাশের বিছানায় শুয়ে আছেন – মনে হচ্ছে ঘুমোচ্ছেন। জানালার কাচের মধ্যে দিয়ে ঘরে খুব আবছা আলো আসছে। মনে হচ্ছে ভোর। মাথা তুলে দেখলাম ঘরের দরজা ভেতর থেকেই বন্ধ,  তার মানে মা বাথরুমে গেছেন। আমি উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে। অকারণে এত ভোরে কস্মিন কালেও উঠিনি, এক ট্রেন ধরার জন্যে বা দূরে কোথাও বেড়াতে যাবার সময় ছাড়া। দরজা খুলে বাইরে এলাম। যদিও আমার গায়ে পাজামা পাঞ্জাবি ছিল তাও শরীরে শিরশিরে একটু ঠাণ্ডা অনুভব হল । বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁদিকে তাকাতেই চোখে পড়ল আকাশে নানান রঙের আস্তর। ওপাশেই গ্রামের বসত। ঘন গাছপালার মধ্যেও অনেক ঘরবাড়ি চোখে পড়ে, ইঁটের দালান কোঠা, খড়ের, টিনের চাল দেওয়া একতলা দোতলা বাড়ি। ওই গ্রামেই নীলকাকুদের অরিজিন্যাল বাড়ি ছিল, যেখানে নীলকাকুর দাদুকে একঘরে করেছিল গাঁয়ের লোকেরা। ওই গ্রামের ওপরের আকাশটা এখন নানা রঙের খেলায় রঙিন। কিন্তু ডানদিকে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের ওপর কুয়াশার মিহিন এক চাদর ভেসে আছে মাটি থেকে কয়েক হাত ওপরে।
    ‘বাঃ, উঠে পড়েছিস। এত লক্ষ্মী কবে থেকে হলি, ভুটকু’? মা বারান্দায় এলেন, ভেজা কাপড় শুকোতে দিলেন বারান্দার রেলিঙে। মায়ের চান হয়ে গেছে। চান সেরে মা পড়েছেন মেরুন পাড় বাসন্তী রঙের শাড়ী। টাঙ্গাইল তাঁত, মায়ের মুখে শুনেছি। মায়ের ভেজা খোলাচুল থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ছে জল। ভোরের রঙিন আলোয় আর বাসন্তী শাড়ীর আভায় মাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল, ঠিক যেন নীচেয় ঠাকুরদালানে প্রতিষ্ঠিতা মা দুগগা।
    ‘কখন উঠেছ তুমি, এই ভোরে চান করে ফেললে’? আমি জিগ্যেস করলাম।
    ‘বেড়াতে এসে বেলা অব্দি ঘুমোনোর কোন মানে হয়? ছুটির দিনে বেলা অব্দি ঘুমোনো কলকাতার অব্যেস – এখানে ও জিনিষ চলবে না। কতদিন পরে এমন একটা জায়গায় এলাম, এমন পরিবেশ ছাড়া যায়? শোন, বাথরুমে গিজার চালু আছে, তুইও চটপট চান সেরে নে, বাগানে যাব, পুজোর যোগাড়ে হাত লাগাব, ভীষণ, ভীষণ ভাল লাগবে...দেখিস’। মা যেন ছোট্ট মেয়ের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।
    ‘প্লিজ মা, সানরাইজটা দেখতে দাও’।
    ‘ও, তুই সানরাইজ দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে আছিস? ভেরি গুড। এই না হলে তুই আমার ছেলে? পুরীতে দেখেছিস, টাইগার হিলে দেখেছিস, এখানে অন্যরকম । ঠিক আছে, আমিও তাহলে একটু দাঁড়াই’।

    দিগন্তের পাঁচিল ডিঙিয়ে উঁকি মারার মতো আস্তে আস্তে উদয় হলেন সূর্যদেব। টকটকে লাল তাঁর নিজের রঙ - আর উড়িয়ে দিয়েছেন সমস্ত নীল আকাশ জুড়ে নানান উজ্জ্বল রঙের অজস্র পতাকা। পরিবেশটা কোনভাবেই যেন ক্ষুণ্ণ না হয়ে যায়, এমনই চাপা স্বরে মা বললেন, ‘“ওঁ জবা কুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম, ধ্ব্যান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোস্মি দিবাকরম”। এই সূর্যের কি নাম জানিস? বালার্ক, বাল মানে শিশু আর অর্ক মানে সূর্য। ভারতবর্ষ আর সংস্কৃতভাষা ছাড়া গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে, এমন রোমান্টিকতা আর কোথাও পাবি বলে মনে হয় না’। আমার শরীরে আর একবার শিরশিরে এক অনুভূতি হল, যে অনুভব কলকাতায় সত্যি কোনদিন হয়নি।
    সকাল থেকে উপবাসী থেকে আমরা অষ্টমীর পুজো দেখলাম, অঞ্জলি দিলাম এবং প্রসাদ পেয়ে উপবাস ভাঙলাম। তারপর নীলকাকু আর নীলকাকুর মা আমাদেরকে নিয়ে গেলেন নীলকাকুর বাবার পড়ার ঘরে। দরজায় মস্ত তালা দেওয়া ছিল, নীলকাকুর মা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন, আমরা ছিলাম তাঁর পিছনে। বদ্ধ ঘরে ঢুকতে পুরোনো পুরোনো একটা গন্ধ পেলাম, বহুদিনের পুরোনো বই থাকা লাইব্রেরিতে ঢুকলে যেমন পাওয়া যায়। ঘরে ঢুকে নীলকাকু ঘরের লাইট, পাখা চালিয়ে দিলেন, খুলে দিলেন দুটো জানালা। ঘরটা অনেকটা আলোকিত হতে দেখলাম, ঘরের উত্তর আর দক্ষিণের দুটো দেওয়াল বরাবর বই ভর্তি আলমারি, জানালার জায়গাটুকু ছাড়া। আর পুবদিকের দেওয়ালে জানালার সামনে মস্ত টেবিল আর চেয়ার, টেবিলের ওপাশের চেয়ারটা জানালার দিকে পিঠ করে রাখা আর টেবিলের এ পাশে আরো চারটে চেয়ার। জানালার ওপরে উইন্ডো এসি। উল্টোদিকের দেওয়ালে পাশাপাশি দুটো বেশ বড়ো তেল রঙ ছবি, সুন্দর ফ্রেমে বাঁধানো। একজন পুরুষ, আরেকজন মহিলা। মা জিগ্যেস করাতে নীলকাকু বললেন ওঁনারাই নীলকাকুর দাদু আর ঠাকুমা।
    ‘শোভা মা, এই হচ্ছে, নীলুর বাবার পড়ার ঘর। উনি চলে যাবার পর এই ঘর আমরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছি কিন্তু কোথাও সেই সোনার কাজললতা পাওয়া যায় নি’। নীলকাকুর মা একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন। মা, বাবা আর আমি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম বইয়ের আলমারিগুলো। মোটামুটি সবকটা আলমারি দেখা হয়ে গেলে মা বললেন,
    ‘এই বইগুলি কি সবই মেসোমশাইয়ের? মাসিমা, মেসোমশাইও ডাক্তার ছিলেন না’?
    ‘হুঁ। ডাক্তার ছিলেন, কিন্তু ওঁনার নেশা ছিল বই পড়ার। অবসর পেলেই বই মুখে নিয়ে বসে থাকতেন, রিটায়ারমেন্টের পর তো আর কথাই নেই’।  নীলকাকুর মা উত্তর দিলেন। নীলকাকু বললেন, ‘গতকাল আপনাদের দাদুর সম্বন্ধে বললাম, বাবাকে নিয়ে প্রায় কিছুই বলিনি। আমার বাবা ডাক্তার ছিলেন, কিন্তু বাবা মনে প্রাণে কোনদিনই মনে হয় ডাক্তার হতে চান নি। উনি কোনদিন বলেন নি, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, জেনারেল লাইনটাই ওঁনার পছন্দের ছিল। ভালই স্টুডেন্ট ছিলেন, দাদুর চাপে পড়ে ডাক্তার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। এম.ডি পাশ করার পর দাদুর কলকাতার চেম্বারে উনি বছর খানেক প্র্যাকটিস করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পরে সে সব ছেড়েছুড়ে উনি এলাহাবাদ চলে যান মেডিকেল কলেজে প্রফেসরের চাকরি নিয়ে। সেখানে প্রায় বছর চারেক ছিলেন, তারপর দাদুর প্রভাবেই হোক বা অন্য কোন যোগাযোগেই হোক উনি কলকাতায় চলে আসেন, সারাটা জীবন তিনি বিভিন্ন কলেজে পড়িয়েই এসেছেন, কিন্তু সেভাবে জমিয়ে প্র্যাকটিস করেননি কোনদিনই। আর ওই মা যা বললেন, বিভিন্ন বিষয়ে, ওঁনার প্রফেসনের পক্ষে একান্তই কোন কাজের নয়, সেই সব বই পড়ার দিকেই ওঁর ঝোঁক ছিল বেশি। লেখাপড়া ব্যাপারটাই ওঁনার খুব পছন্দের ছিল, খুব আরাম অনুভব করতেন বইয়ের রাজ্যে। আমি জয়েন্ট এন্ট্রান্সে মেডিকেল-ইঞ্জিনীয়ারিং দুটোতেই চান্স পেয়ে, ইঞ্জিনীয়ারিং নিয়ে পড়ব বলেছিলাম, বাবা একবারের জন্যেও ডাক্তারি পড়তে বলেন নি। জেনারেলি, এমন হয় না, ডাক্তার বাবারা ছেলেকেও ডাক্তার করতে চান, বাবা চান নি। তাই আমার মনে হয় বাবা ডাক্তারি ব্যাপারটা ঠিক ভালোবাসতেন না’।
    নীলকাকুর কথা শুনতে শুনতে মা নীলকাকুর বাবার টেবিলে রাখা ডাইরিগুলো উলটে পালটে দেখছিলেন। নীলকাকুর কথা শেষ হতে মা বললেন, ‘মাসিমা, এই ডাইরিগুলো পড়ে দেখতে পারি? আপনাদের যদি কোন আপত্তি না থাকে’।
    ‘ওতে বৌদি, কি দেখবেন? আমি পড়েছিলাম। একটাতে বেশ কিছু পেশেন্টের নাম, ঠিকানা, বয়েস আর বোধ হয় তাদের অসুখের মেডিকেল টার্ম লেখা আছে। বাকিগুলোতে নানান সময়ে খেয়াল খুশি যা মনে এসেছে তাই লিখে রেখে দিয়েছেন। পড়ে দেখতে চান পড়ে দেখুন, কিন্তু তেমন ইন্টারেস্টিং কিচ্ছু পাবেন না’। নীলকাকু বললেন।
    ‘পড়ে দেখতে চাস, দেখ না, রেখে দে তোর কাছে। কিন্তু তুই এই ঘরে একবার খুঁজে দেখবি না’? নীলকাকুর মা বললেন।
    ‘মাসিমা, আপনারা বলছেন, তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু পান নি, সেখানে আমি একদিন এসে কি খুঁজে দেখব বলুন তো? এই ঘরে নেই, আপনার শোবার ঘরেও নেই। আমি নিশ্চিত। আমায় হদিস দিতে পারে এই ডাইরিগুলিই, এগুলো আমি রাখলাম। যাবার আগে ফেরৎ দিয়ে যাব, দেখি কতদূর কি করতে পারি’।

    নীলকাকু আর নীলকাকুর মা দুজনেই খুব হতাশ ও অবাক হলেন, আমিও। আমি ভেবেছিলাম, মা নির্ঘাৎ কিছু একটা বুদ্ধি করে অসম্ভব কোন জায়গা থেকে জিনিষটা বের করে ফেলবেন। আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছিল, বললাম, ‘মা, এমনও তো হতে পারে, এই এতো মোটা মোটা বইয়ের মধ্যে কোথাও লুকোনো আছে’?
    ‘ফেলুদার “বোম্বাইয়ের বোম্বেটে”? নাঃ। সে হতেই পারে না। মেসোমশাই পড়তে ভালোবাসতেন, বই ভালোবাসতেন, তাঁর পক্ষে কোন বইয়ের প্রায় সব পাতাই কেটে নষ্ট করে এই কাজ করা সম্ভব নয়। ও কাজ ভিলেনরাই করতে পারে, যাদের বই সম্পর্কে কোন অনুভূতিই নেই’। মা খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন।
    ‘মেডিকেলের বইগুলো? ওগুলো তো ওঁনার পছন্দের ছিল না, আর বইগুলো বিশাল মোটা মোটাও হয়’। আমি তাও তর্ক করলাম।
    ‘বৌদি ঠিকই বলেছেন। জ্যোতি, আমিও তোমার মতো চিন্তা করেই অলমোস্ট সমস্ত বই খুলে খুলে দেখেছি – পাইনি। কিন্তু বৌদি আপনি কি করে শিওর হচ্ছেন এই ঘরে নেই, তাহলে কি শোবার ঘরে আছে’? নীলকাকু বললেন।
    ‘না। কারণ, আপনারা গত এক বছরে চেষ্টার কসুর করেন নি। না, শোবার ঘরেও নেই। থাকলে পেয়ে যেতেন’।
     
    স্পষ্টতঃই হতাশ নীলকাকুর মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, চেয়ার থেকে উঠে দরজার দিকে যেতে যেতে বললেন –
    ‘চলো, সবাই নীচেয় চলো, বেলা অনেক হয়েছে। যাই, খাবার যোগাড় করতে বলি’।
    আমরা সকলেই ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় এলাম, নীলকাকু দরজায় তালা দিয়ে তাঁর মায়ের হাতে চাবি দিলেন, নীলকাকুর মা চাবি নিয়ে আঁচলে বেঁধে বারান্দা দিয়ে হেঁটে চললেন নীচেয় যাবার জন্যে। নীলকাকু বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আসুন সমরেশদা, বৌদি আসুন, জ্যোতি এক কাজ করো না, মায়ের হাতের ডাইরিগুলো তোমাদের ঘরে রেখে নীচেয় চলে এসো। চট করে আসবে কিন্তু...’।                  

    কোণাগুলো দুমড়ে যাওয়া বহু পুরোনো ডাইরিগুলো মায়ের হাত থেকে নিয়ে আমি ঘরের দিকে চললাম। আজ সকালটা যেভাবে সুন্দর শুরু হয়েছিল, ততটাই খারাপ লাগছে এখন। মা শেষ অব্দি হাল ছেড়ে দিয়ে এই ডাইরিগুলোকেই সম্বল করল? নীলকাকু তো বলেই দিলেন, ডাইরিতে কাজের জিনিষ কিছু নেই, তবুও মা পড়তে চাইছেন কেন? মা কি দেখলেন এই ডাইরিগুলোতে? কে জানে?



    ‘যেও না রজনী আজি লয়ে তারা দলে। গেলে তুমি দয়াময়ী, এ পরাণ যাবে। ভুটকু উঠে পড়, সানরাইজ দেখবি না’?
    কাল রাত প্রায় সাড়ে বারোটায় সন্ধিপুজো দেখে এসে আমাদের শুতে শুতে প্রায় একটা বেজে গিয়েছিল। মা অবিশ্যি ফিরে এসে আবার টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে ডাইরি মুখে নিয়ে বসে পড়েছিলেন, আমাদের ঘরের টেবিলে। বাবা একবার বলেছিলেন ‘শুয়ে পড়ো, অনেক রাত হয়েছে’। মা উত্তরে বলেছিলেন, ‘হুঁ’। ওই উত্তর শুনে আমি চুপচাপ শুয়ে পড়েছিলাম, বুঝে গিয়েছিলাম মা এখন গভীর চিন্তায় ডুবে রয়েছেন, বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না। কাজেই মায়ের ডাকে আজকে যখন ঘুম ভাঙল, আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না, মা কখনই বা শুতে এলেন আর কখনই বা উঠে পড়ে চান টান সেরে ফেললেন। আমি উঠে বসে বললাম, ‘এর মধ্যে তোমার চান হয়ে গেল’?
    ‘তবে? তোর আর তোর বাবার মতো নাকি? বেড়াতে এসে ভোঁস ভোঁসিয়ে খালি ঘুম’?
    ‘বারে ঘুমোলাম কোথায়? কাল তো শুতে শুতেই একটা বেজে গেল। তুমি কখন শুলে’?
    ‘শোয়াই হয় নি আমার। ডাইরি পড়া শেষ করে ঘড়িতে দেখি সাড়ে চারটে বাজে। ব্যস। চানটা সেরে ফেললাম। নে নে চটপট রেডি হয়ে নে’।
    আমি উঠে ব্রাশে পেস্ট নিয়ে ব্রাশ করতে করতে বললাম,
    ‘কাজললতার কোন হদিশ পেলে, ডাইরিতে’?
    ‘মনে হচ্ছে, পেয়ে গেছি। এখন দরকার শুধু একটা কনফারমেসান, ব্যস’।
    ‘পেয়ে গেছ? বলো কি, সত্যি’? আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম, বাবার হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে। তার মানে বাবারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, চুপটি করে শুয়ে শুয়ে আমাদের কথা শুনছিলেন।
    ‘বাবা, তুমি জেগে? আমরা তো ভেবেছিলাম অঘোরে ঘুমোচ্ছ’? আমি বললাম
    ‘তোরা মা ছেলেতে যা শুরু করেছিস মাঝরাত থেকে, ছুটির দিনে যে একটু ঘুমোবো মজাসে, সে উপায়ও নেই। যাকগে’, বাবা উঠে বসলেন, কোলে মাথার বালিশটা নিয়ে বললেন, ‘হদিশ পেয়ে গেছ? কোথায় আছে মাছটা’।
    ‘সিয়োর করে বলার সময় এখনো আসেনি, তার আগে আমার একটা খবর জানা দরকার, খবরটা সঠিক দিতে পারবেন একমাত্র মাসিমা’।  মা বললেন। বাবা খুব কৌতূহল নিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কিসের খবর বলো তো’?
    ‘উঁহু, এখন নয়। যথা সময়ে সব zআনতি পারবে, এখন আমরা বেরোব, ভুটকু, তোর হলো’?   



    সূর্যোদয় দেখে গতকালের মতো আজও আমরা নীচের বাগানে গেলাম। ঘাসের উপর হাঁটতে গিয়ে শীতল শিশিরে স্যান্ডেল, পা ভিজে গেল। শিউলি তলায় ঝরে আছে শিউলি ফুল। কমলাবোঁটা - সাদাপাপড়ি টাটকা ফুলগুলি ঘন সবুজ শিশির ভেজা ঘাসের ওপর বিছিয়ে আছে অজস্র নক্ষত্রের মতো।  ফুলগুলি কুড়িয়ে মায়ের সাদা রুমালের মধ্যে জমা করতে লাগলাম আমরা। স্বচ্ছ সুন্দর সকালের আলো, বাতাসে হাল্কা শীত শীত আমেজ, তার সঙ্গে শিউলি ফুল আর সতেজ ঘাসের অদ্ভুত সুঘ্রাণ। মন ভাল না হয়ে উপায় নেই।
    আমরা দুজনে যখন ফুল তুলছি, নীলকাকুর মার গলা পেলাম একতলার বারান্দা থেকে, ‘দ্যাকো কাণ্ড, নীল দেখে যা, কলকাতা থেকে দুই ফুলচোর, মা আর ছেলে, কেমন ফুল তুলছে বাগানে। শোভা মা আমাদের বাগানের কেমন শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে দেখে যা’।
    ঠাকুমার গলা পেয়ে নীলকাকুর দুই মেয়ে ইতি আর উতি দৌড়ে বেরিয়ে এল বারান্দায়, আমাদের বাগানে দেখে তারাও চিৎকার করতে লাগল, ‘আমরাও যাবো, আমরাও যাবো। ও জেঠিমা, আসছি আমরা’ ।
    ‘মাকে জিগ্যেস করে এসো, আর এলে জুতো পড়ে আসতে হবে। এখানে শিশিরে পা ভিজে গেলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে কিন্তু’। মা চেঁচিয়ে বললেন ইতি আর উতিকে। ওরা জুতো পড়তে ঘরে ঢুকল, আর জুতো পড়তে পড়তেই চেঁচিয়ে পাশের ঘরে মাকে জিগ্যেস করল –
    ‘বাগানে যাই মা, জেঠিমা আছে, জ্যোতিদাদা আছে’।
    ‘যাও, কিন্তু জেঠিমা কি বলল শুনেছ? জুতো পড়ে যাবে কিন্তু’। ঘরের থেকে কাকীমা বললেন।
    ‘জুতো পড়েছি, মা। বোনকেও পড়িয়ে দিয়েছি, তবে যাই’? ইতি আবার জিগ্যেস করে।
    ‘বেশ, যাও, দুষ্টুমি করবে না কিন্তু’। ইতি আর উতি উড়ন্ত প্রজাপতির মতো দৌড়ে আসতে লাগল বাগানের দিকে। নীলকাকুর মা বললেন, ‘তবে, আমিও আসছি দাঁড়া শোভা মা, কিন্তু আমার তো আবার আকাচা কাপড়, চানও করিনি, ফুল তুলতে পারবো না তো’। নীলকাকুর মা আস্তে আস্তে হাঁটুর ব্যথা সামলে আসতে লাগলেন বাগানের দিকে।
    ‘এ বাগান তো আপনারই, মাসিমা। আপনাকে আর ফুলচোর হতে হবে না, ফুলচোর হবার অনেক মজা, সেটা জানেন কি’? মা হেসে বললেন।
    ‘সে কি আর জানিনা বাছা, আমার বাপের বাড়ি ছিল বাগনানের দিকে। আঁকশি নিয়ে ভোরবেলা বেড়িয়ে পড়তাম প্রতিবেশীদের বাগানে, সকাল হতে হতে সাজি ভরে ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরে পড়তাম। কতই বা বয়েস ছিল তখন, ওই ইতিদিদুর বয়সীই হব হয়তো’।
    বাগানে এসে ইতি আর উতি দৌড়ে বেড়াতে লাগল। এ গাছ থেকে সে গাছ। টগর, দোপাটি, রঙ্গন, গন্ধরাজ..., ফুল তোলার জন্যে চঞ্চল হয়ে উঠল,  মা বললেন, ‘ওই সব ফুল তুলো না, ইতু সোনা – ও সব ফুল একটা দুটো নাও, অঞ্জলি দেওয়ার জন্যে’
    ‘এই ফুলে মালা গাঁথা হবে না?
    ‘না সোনা, ও ফুলে মালা গাঁথলে ফুলেরা কষ্ট পায়। আর গাছ থেকে ফুল ছিঁড়লে গাছেরাও কষ্ট পায়’।
    ‘বারে, শিউলি ফুলের বুঝি কষ্ট হয় না’?
    ‘উঁহু, হয় না। এখানে এসে দ্যাখো, এই ফুল মালার জন্যেই ভগবান বানিয়েছেন, ইতি আর উতি মায়ের হাতে রাখা শিউলি ফুল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, দেখে বলল,
    ‘আর, গাছের কষ্ট হবে না – শিউলি ফুল তুললে’।
    ‘শিউলি ফুল তুলতে হয় না তো, ইতু সোনা। শিউলি গাছ সারারাত চুপি চুপি অনেক অনেক ফুল বানিয়ে তোলে, আর রাত ভোর হলেই সব ঝরিয়ে দেয় মাটিতে, দেখছো না, আমরা ঘাস থেকে ফুল কুড়োচ্ছি’।
    বড়ো বড়ো অবাক চোখ মেলে ইতি শিউলি গাছের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, ‘এমন করে কেন’?
    ‘বারে, মা দুগগার পুজো না, তাই। দেখছো না ফুলগুলোর কি সুন্দর কমলা আর সাদা রঙ। কি মিষ্টি গন্ধ!’ ইতি আর কিছু বলল না, শিউলি তলায় ফুল কুড়োতে শুরু করে দিল। নীলকাকুর মা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘দিদিভাই, বাসি কাপড়ে ফুল তুলতে হয় না, জেঠিমা ওইগুলো দিয়ে পুজোর মালা গাঁথবে’। ইতি একটু থমকে যায় দ্বিধায়, মায়ের মুখের দিকে তাকায়।
    মা নীলকাকুর মায়ের দিকে হেসে বললেন, ‘মাসিমা, তুলুক না, শিশুর আবার বাসি-কাচা নিয়ে ভাববেন না। ওরাই তো এক একটা ফুল’। একথা শুনে দ্বিগুণ উৎসাহে ইতি ফুল কুড়োতে শুরু করে দিল। নীলকাকুর মাও ঘাড় নেড়ে হাসলেন, প্রশ্রয়ের হাসি। মা বললেন,
    ‘আমি আর পারছি না বাপু, তোরা তুলে দে মা, নিচু হয়ে হয়ে কোমর ধরে গেল, ইতু সোনা। ফুল তোলা হয়ে গেলে তুমি মাকে বলে চানু করে নেবে, তারপর নতুন জামা কাপড় পড়ে আমরা মালা গাঁথব, কেমন’?
    ‘বাঃ, মালা! আমি গাঁথতে পারব?’ আনন্দে আর উৎসাহে উজ্জ্বল চোখ মেলে জিগ্যেস করল ইতি।
    ‘নিশ্চই পারবে, না পারলে তোমার জেঠিমা তোমায় শিখিয়ে দেবে’? মা অবিকল ইতির সুরেই কথাটা বললেন। নীলকাকুর মা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখছিলেন আমাদের, এবার ঘাসে বসতে বসতে বললেন, ‘বেশ পারিস তুই, মা। কি সুন্দর তোর ন্যাওটা হয়ে গেছে মেয়ে দুটো’।
    ‘ঘাসে বসছেন, মাসিমা, শিশিরে শাড়ি ভিজে যাবে। এই বয়েসটা আমি খুব মিস করি, মাসিমা। অবাক হবার বয়েস, কৌতূহলের বয়েস, একটুকুতেই ভাললাগার বয়েস, এরপর আমরা যতো বড়ো হই সব কমে যেতে থাকে, আর বাড়তে থাকে সবজান্তা্ বয়েস আর অহংকারের বয়েস’।
    ‘বাঃ, বেশ বলেছিস তো - সহজ কথায়, বিরাট ভাব, নাঃ, তোকে যতো দেখছি ততই অবাক হচ্ছি’। মা হেসে নীলকাকুর মায়ের পাশে বসলেন, বললেন, ‘এখনই কি? আরো অবাক হবেন। মাসিমা, আপনার কাছে একটা চাবি আছে। অনেকদিন আগে মেসোমশাই আপনাকে চাবিটা দিয়েছিলেন, কতদিন আগে? তা ধরুন বছর দশেক তো হবেই। মনে পড়ে’?
    নীলকাকুর মা সত্যি অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ, মুখ দেখে মনে হল মনে করার চেষ্টা করছেন, কিছুক্ষণ পরে বললেন, ‘চাবি? হ্যাঁ, তুই বলাতে মনে পড়ছে বটে, একটা চাবি নীলুর বাবা আমাকে রাখতে দিয়েছিলেন, ওই রকমই হবে -প্রায় বছর দশেক - নীলুর বিয়ের কিছুদিন পরেই। হ্যাঁ, ওই অনুষ্ঠানের কদিন পরে, ওর বাবা, আমাকে একটা চাবি দিয়ে বলেছিলেন, খুব যত্ন করে রেখো। কিসের চাবি, তা বলেন নি, আমিও জিগ্যেস করিনি। রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করেই। কবে কে জানে ভুলেও গিয়েছিলাম। তুই বলাতে মনে পড়ল। চাবি, চাবি...’।
    ‘হ্যাঁ মাসিমা, চাবি। স্টিলের লম্বা, বড়সড় চাবি, সে চাবির গায়ে ১১৯ ছাপ দেওয়া আছে’।
    ‘জেঠিমা, আমরা মালা গাঁথতে কখন যাবো, দ্যাখ আমাদের ফুল কুড়োনো হয়ে গেছে’। ইতি এসে মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
    ‘তোমার ফুল তোলা হয়ে গেছে, সোনা? কি লক্ষ্মী মেয়ে গো! তাহলে তুমি ঘরে যাও, মামণিকে বলো চানু করিয়ে দিতে, তারপর আমরা যাব মালা গাঁথতে, কেমন?’ মা বললেন ইতিকে। ইতি তার আরো ছোট্ট বোন উতিকে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল, চেঁচাতে চেঁচাতে,
    ‘মা, মা, আমাকে চানু করিয়ে দাও, জেঠিমার সঙ্গে আমি মালা গাঁথবো’।
    নীলকাকুর মা খুব চিন্তিত মুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই চাবিটা কি খুব জরুরি’?
    ‘জরুরি’।
    ‘চাবিটা কিসের চাবি’?
    ‘ওই চাবি আর ওই নম্বর যদি মিলে যায়, আপনার “হেমকান্ত মীন” আপনি পেয়ে যাবেন’।
    ‘“হেমকান্ত মীন” - মানে’?
    ‘সোনারবরণ মাছ’।



    মা ঠাকুরদালানের বারান্দায় বসে শিউলিফুলের মালা গাঁথছিলেন। ইতি আর উতি মায়ের সামনে বসে একটা একটা করে ফুল তুলে দিচ্ছিল মায়ের হাতে। বৃদ্ধ পুরোহিত ভট্টাচার্যিমশাই আর তাঁর ছেলে নবমী পুজোর যোগাড় করছিলেন। রত্না কাকীমা ও পাঁচজন প্রতিবেশী মহিলা নৈবেদ্যের ফল কেটে সাজাচ্ছিলেন আর হাতে হাতে গুছিয়ে তুলছিলেন পুজোর প্রস্তুতি। সামনের বছর থেকে আর, এ বাড়িতে পুজো হবেনা। নীলকাকুরা এ বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে এখানকার সমস্ত পাট চুকিয়ে চলে যাবেন কলকাতার নিউআলিপুরের বাড়িতে, সেখানেও পুজো হবে, কিন্তু এমনটি তো আর হবে না! কাজেই সকলেরই নিজের নিজের মতো করে মন খারাপ। গ্রামের লোকেদের মনখারাপ, সামনের বছর থেকে গ্রামে আর কোন বাড়ির পুজো হবে না! আসছে বছর থেকে গ্রামে বারোয়ারি পুজো করার সিদ্ধান্ত পাড়ার লোকেরা অলরেডি ঠিকই করে ফেলেছে, কিন্তু সেও তো বারোয়ারি পুজোই, বাড়ির পুজো তো নয়। আর নীলকাকুদের আরও মন খারাপ, এই বাড়ি, এই পুজো এবং সবার ওপরে এই গ্রামই ছেড়েই দিতে হবে চিরকালের মতো। এই বাড়ির সঙ্গে হারিয়ে যাবে দত্ত পরিবারের ঐতিহ্য আর তার সামাজিক লড়াই জেতার ইতিহাস। এরপর এই বাড়ির ঠিকানা হবে অবসর বিনোদন ও ফূর্তির রিসর্ট!
    ময়লা ছোট ধুতি আর পিরান গায়ে দেওয়া খুবই শীর্ণ একজন লোক ঠাকুরদালানের সামনে এসে দাঁড়াল। তার সঙ্গে ময়লা শাড়ি পড়া এক মহিলা। তাদের কাঁধে ঝোলা আর লোকটির হাতে একতারা। ঝোলা দুটো আর একতারা সিঁড়ির শেষ ধাপে রেখে, গড় হয়ে প্রণাম করল মা দুগগাকে। তারপর চেঁচিয়ে হাঁক পাড়ল, ‘কই গো, মা ঠাকরেনরা, নওমীর পুজো আর কত দেরি, তা এট্টু বিলম্ব করাই ভাল – কি বলেন – আজ রাত পোয়ালেই তো কাল উমার বিদায় – ভাল, ভাল যত পারেন বিলম্ব করেন মা ঠাকরেনরা, ...উমারে আটকে রাখেন।’ এই বলে তারা দুজনে বসে পড়ল সিঁড়ির শেষ ধাপে। তারপর সেই মহিলা গান ধরল, লোকটি তার একতারায় তাল দিতে লাগল,   
    “যাও যাও গিরি, কৈলাসে যাও, আনো গো, মোর গৌরীমায়
    চাতকের প্রায় তৃষিত নয়ন, মোর নয়নমণিরে, দেখিতে চায়।
      
    জটাজুট শিরে, ভস্ম শরীরে, সর্পভূষণ দিগম্বর।
    কি জাদুতে বশ করিল শিব, কন্যা আমার হইল পর!
    জননীর হিদে কতখানি জ্বালা, বুঝিতে তাহার কি বা দায়?  
    ত্বরা করো গিরি, কৈলাসে যাও, আনো গো মোর গৌরীমায়।

    মিনতি করিয়ে বুঝায়ো জামাইয়ে, না করিহ অপমান
    পতিসোহাগিনী অবুঝ উমা, নাহি করে যেন অভিমান
    জননী তাহার বিনে দরশনে হইয়াছে বোলো কৃশকায়।
    দয়া করো গিরি, কৈলাসে যাও, আনো গো মোর গৌরীমায়”।

    গানের মধ্যেই নীলকাকুর মা স্নান সেরে কাচা কাপড় পড়ে পুজোর দালানে এলেন, মৃদু হেসে মায়ের পাশে বসলেন। কিছু বললেন না, খুব মন দিয়ে শুনতে লাগলেন মহিলার গান। আমরাও সব্বাই চুপচাপ শুনছিলাম। কোথাও কোন শব্দ নেই। উঠোনে কয়েকটা চড়াই আর শালিকের কিচিমিচি ছাড়া আর বেশ দূরের কোন গাছের থেকে আসছিল ঘুঘুর ডাক – ঘুঘুউউউঘু, ঘুঘুউউউঘু। এই সঙ্গে মহিলার খালি ও খোলা গলার গান অদ্ভূতভাবে মিশে একাকার হয়ে রইল অনেকক্ষণ। সুর--টুর আমি তেমন বুঝি না, মহিলার গলাও আহামরি কিছু মনে হল না। কিন্তু গানটি দুর্ধর্ষ উৎরে গেল ওঁর আবেগের জন্যে – গানটা উনি গেয়েছেন একদম অন্তর থেকে। ওঁদের দুজনের শীর্ণ শরীরের মলিন বসন দেখে বোঝার উপায় নেই ওঁদের অন্তরে আছে এত ভালোবাসা, এত আবেগ। আমার গলার কাছে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে থাকার অনুভূতি, মেয়েদের সকলের চোখই দেখলাম অশ্রুসিক্ত। গান শেষ হবার বেশ কিছুক্ষণ পর নীলকাকুর মা কথা বললেন,  ‘রথের দিনে সেই যে এলি, তারপর আর দেখা নেই কেন রে, নিতাই? শরীর ঠিক ছিল তো, বাবা’?
    শুনেছি রথের দিন মূর্তির কাঠামো পুজো করে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। নিতাই নীচু হয়ে জোড়হাতে প্রণাম করল নীলকাকুর মাকে, বলল, ‘আজ্ঞে, মাজননী, শরীর লয়, শরীর ঠিকই ছেল, বিগড়ে রয়েচে মনটা। চলে গে্চলাম নদের ঘোষপাড়ার দিকে, মনে লিয়েচিলোম, এদিকপানে আর আসব না এবার। তাই কি হয়, মাজননী, কাল সন্ধিপুজোর বাদ্যি শুনে মনটারে রাখতি পারলোম না। কুলুপ আঁটা মনের মাজেও বেজে উঠল গান। রাত থাকতি বেরয়ে পড়লোম, এসে পড়লোম আপনাদের আঙিনেতে। মনে গান যকন এসেই গেল জগজ্জননীর কেরপায়, শেষবারের মতো শোনায়ে দিয়ি যাই। খুব কষ্ট, জানেন মাজননী। এই বারটাই শেষ, আসচে বার এ বাড়িতে পুজো বন্দ’। মাথা নীচু করে চুপ করে গেল নিতাই, মহিলা তাকিয়ে রইলেন, সামনের করবী গাছের দিকে।

    এ বাড়ির সকলের মনের কথাটা বড়ো সহজ করে বলে দিল নিতাই। আমরা তো এ বাড়িতে প্রথমবার আসা অতিথি, কিন্তু আমরাও খুব গভীরভাবে টের পাচ্ছিলাম এই ব্যথাটা। সকলেই চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নিতাইয়ের কথায়। খুব বিষণ্ণ হয়ে গেল পরিবেশটা। একটু পরে পুরোহিতমশাই বললেন, পুজোর সময় হয়ে আসছে, ঢাকিদের বললেন ঢাক বাজাতে। ঢাকিরা রেডি হয়েইছিল বাজাতে শুরু করল, নবমী পুজোর বাদ্যি। গ্রামের লোকজন আসতে শুরু করল ঢাকের আওয়াজ শুনে। নীলকাকুর মা, নীলকাকু আর কাকিমা হাসিমুখে সকলকে আপ্যায়ন করছিলেন যার যেমন বয়েস, যার সঙ্গে যেমন সম্পর্ক, সেই অনুযায়ী।
    পুজো শুরু হয়ে যেতে নীলকাকুর মা আবার মায়ের পাশে এসে বসলেন, মাকে চুপিচুপি বললেন, ‘চাবিটা পেয়েছি। আমার আলমারির লকারেই আলাদা করে এক কোণে রাখা ছিল। যেমনটি বলেছিলি সেরকমই, চাবির গায়ে ১১৯ লেখা আছে’।
    মা কিছু বললেন না। মুচকি হাসলেন শুধু।
    ‘তুই কি হাত গুনতে জানিস নাকি, কি করে সব ঠিকঠাক বললি? এমনকি চাবির নম্বরটাও?’ উত্তরে মা হেসে বললেন,
    ‘মাসিমা, দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর আমরা সবাই আপনার ঘরে বসব, আপনার ঘরটাও দেখা হবে আর সব কথাও হবে। এই ভিড়ে এ সব কথা’।
    নীলকাকুর মা বললেন, ‘ঠিক বলেছিস - একদম ঠিক’।



    আজ দুপুরের খাওয়ার পর মা, বাবা আর আমি নীলকাকুর মায়ের ঘরে গেলাম। সেখানে নীলকাকুও ছিলেন। নীলকাকুর মা আর আমার মা বসলেন বিছানায় আর আমরা তিনজন চেয়ারে। একটু পরে রত্না কাকিমা ঘরে এলেন, বিছানায় মায়ের পাশে বসতে বসতে বললেন, ‘দিদিভাই, আমার মেয়েদুটি তোমার এমন ভক্ত হয়ে উঠেছে না, ঘুম পাড়াতে গেলাম, খালি বলছে, জ্যেঠিমার কাছে যাবো, ওফ, অনেক কষ্টে ভুলিয়ে তারপর ঘুমোলো, তোমরা কাল চলে গেলে কি করে যে আমি ওদের সামলাব’।
    ‘কাল যাবে মানে? কাল দুই মেয়ে একসঙ্গে বাড়ি ছাড়বে, এ হয় নাকি? গৌরীকে নাহয় শাস্ত্র মেনে যেতেই হবে, শিবের ঘরণী, তার কথার নড়চড় হবার জো নেই। তোমার তো মা তেমন নয়, তোমার সঙ্গে কত্তাও আছে, পুত্রও আছে, কাজেই তোমায় ছাড়ছি না’। নীলকাকুর মা বললেন।
    সেই শুনে নীলকাকু একদম চেপে ধরলেন, ‘এক্স্যাক্টলি, সমরেশদা, একাদশীর দিন দুপুরে মাংস ভাত খাইয়ে তবে ছাড়ব, বর্ধমানের কচি পাঁঠার স্বাদ, চেখে দেখুন, ভুলতে পারবেন না’। এসব শুনে মা বাবার দিকে তাকালেন, এ ব্যাপারে বাবার ডিসিশান জরুরি, কারণ তাঁকে অফিসে ফিরতে হবে লক্ষ্মীপুজোর পরদিন, আর কলকাতাতেও তাঁকে অনেক কাজ সেরে ফেলতে হবে এ কদিনের মধ্যে। কিন্তু বাবা একটু মুচকি হেসে বললেন, ‘হেমকান্ত মীন ছেড়ে বেচারা অজশিশুকে নিয়ে পড়লে কেন, ও কথা পরে ভেবে দেখা যাবে, এখন শোভা শুরু করো তোমার বৃত্তান্ত’। বাবা বললেন।
    ‘হ্যাঁ, তোরা সব চুপ কর, শোভা মার থেকে আগে শুনি কি করে এমন অসম্ভবকে সম্ভব করল, তাও একেবারে রাতারাতি’! নীলকাকুর মা বাবাকে সমর্থন করে বললেন। সকলে মায়ের দিকে তাকালেন, মা এখন কেন্দ্রবিন্দুতে, মা একটু চুপচাপ ভেবে নিলেন কিভাবে শুরু করবেন, তারপর বলতে শুরু করলেন,
    ‘আপনাদের, মানে মাসিমার আর নীলের কথা শুনে, মেসোমশাই আর ওঁনার বাবা সম্বন্ধে আমার যা ধারণা হয়েছে, সেটা আগে বলে নিই। কারণ তাতে মানুষ দুজনের, আচরণের পার্থক্যটা স্পষ্ট বোঝা যাবে।
     
    নীলের দাদু ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং আজীবন ভীষণ ফোকাস্‌ড এবং অ্যাম্বিশাস একজন মানুষ। মোটামুটি নিজের চেষ্টায় লন্ডন থেকে ডাক্তারি পড়ে এসেছেন। গ্রামে ফিরে গ্রামের লোকেদের ব্যবহারে তিনি মাথা নত করেন নি, উল্টে আরো বেশি ফোকাসড হয়েছেন নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে। তিনি তাঁর মেধা আর অধ্যবসায় দিয়ে সফলও হয়েছেন খুব তাড়াতাড়ি। প্রায় ম্যাজিকের মতো তিনি যশ, প্রতিপত্তি এবং সঙ্গে সঙ্গে অর্থও অর্জন করেছেন। কথায় বলে না, ভগবান অধ্যবসায়ী লোকদেরই সহায় হয়ে থাকেন? ওঁনার ক্ষেত্রে ব্যপারটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।
    কলকাতা মেডিকেল কলেজে এই সময়েই, একমাত্র কন্যার চিকিৎসার জন্যে আসেন রায়বাহাদুর মহারাজ শ্রী দীপেন্দ্রনারায়ণ পালচৌধুরি। তিনি আগে থেকেই মহারাজ ও চৌধুরি ছিলেন, ‘ইংরাজ সরকার বাহাদুরকে তৈলাক্ত’ করে রায়বাহাদুরও হয়েছিলেন। তাঁর নয়নের মণি একমাত্র বালিকা কন্যা কোন এক দুরারোগ্য অজানা ব্যাধিতে দীর্ঘদিন ভুগছিলেন। মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ব্রিটিশ ডাক্তার কেসটি রেফার করেন তাঁর প্রিয় ছাত্র নীলের দাদুর কাছে। আশ্চর্যজনকভাবে নীলের দাদু মেয়েটির অসুখের সিমটম দেখে সঠিক ডায়াগনোজ করতে পেরেছিলেন এবং তাঁর সুচিকিৎসায় খুব সহজেই মাস দুয়েকের মধ্যে মেয়েটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই রায়বাহাদুর মহারাজ দীপেন্দ্রনারায়ণ অর্থের ব্যাপারে কোন কার্পণ্য করেন নি, উপরন্তু তাঁর কন্যা আরোগ্য হবার খুশিতে তাঁর ডাক্তারকাকুকে নিজের হাতে উপহার দিয়েছিলেন এই সোনার কাজললতাটি – যেটি একটি হেমকান্ত মীন।                   
    এই ঘটনার পরে নীলের দাদুকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি কোনদিন, এরপর সাফল্য আর উন্নতির সকল সোপান তিনি খুব সহজেই পার হতে পেরেছিলেন। এই চিকিৎসার সাফল্য, পরিচিত মহলে তাঁকে রাতারাতি প্রায় লেজেন্ড বানিয়ে তুলেছিল এবং তাঁকে ‘ধন্বন্তরি’ বলে সবাই মেনেও নিয়েছিল বঙ্গসমাজে। এরপরই তিনি এই বাড়ি বানিয়েছিলেন, দুর্গাপুজা চালু করেছিলেন এবং সৃষ্টি করেছিলেন ইতিহাস’।   

    এই অব্দি বলার পর মা একটু থামলেন। সকলেই চুপচাপ ছিলেন, নীলকাকু কথা বললেন,
    ‘বৌদি, এসব কথা কি ওই ডাইরিগুলোতে লেখা আছে? আপনি এতসব কি করে জানলেন? সত্যি বলতে আমিও জানতাম না এত কাহিনী, মহারাজের মেয়ের চিকিৎসা এবং ওই সোনার কাজললতা পাওয়ার ইতিহাস। আনি ভেবেছিলাম দাদুই ওটা বানিয়েছিলেন। মা, তুমি জানতে’? নীলকাকু নিজের মাকে জিগ্যেস করলেন।
    ‘জানতাম। তোর বাবার মুখে শুনেছিলাম, তবে ওই নামটাম অত মনে ছিল না’। আবার সকলে চুপ করতে মা আবার শুরু করলেন,
    ‘যে কোন প্রখ্যাত প্রতিভাবান মানুষের ঘরে জন্মালে, ছেলে-মেয়েকে একটা বাড়তি চাপের মধ্যেই বড় হতে হয়। পাড়া-প্রতিবেশী, স্কুল-কলেজ, কাজে-কর্মে - যে কোন সাফল্য বা ব্যর্থতা সকলেই মেপে নেয় তার বাবা বা মায়ের নামে। ক্লাসে ফার্স্ট হলেও সকলে বলবে, ‘হবে না? কার ছেলে দেখতে হবে তো’? আবার ব্যর্থ হলে লোকে বলবে ‘অমন মায়ের মেয়ে হয়েও এমন হাল’? অর্থাৎ ভালো হোক মন্দ হোক বাবা বা মার নামের সঙ্গেই জুড়ে যায় ছেলেমেয়ের সব কাজের হিসেব। আর এখান থেকেই তৈরি হয়ে ওঠে আইডেনটিটি ক্রাইসিস। মেসোমশাইয়ের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
    লেখাপড়ায় ভালোই ছিলেন – কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ কোনদিন হয়ে উঠতে পারে নি। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন মেডিকেলে পড়ে, ডাক্তারি প্রফেসনে গেলে, এ সমস্যা  আরো বাড়বে – কারণ এই প্রফেসানে বাবার নাম তাঁকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। অন্য কোন লাইনে গেলে সেটা অনেকটাই কম হতে পারত। কিন্তু অন্য লাইনে যাবার ইচ্ছে হলেও, তিনি বাবাকে সাহস করে সেটা বলতেও পারলেন না। কাজেই তিনি ডাক্তারই হলেন। ভালো স্টুডেন্ট বলে উৎরেও গেলেন সব কটা ধাপ। কিন্তু তারপরে প্র্যাকটিস জমাতে পারলেন না, অথবা চাইলেন না। তিনি ঢুকে পড়লেন কলেজের অধ্যাপনায় আর ডুবে রইলেন বইয়ের রাজ্যে। এমনকি সংসারেও তাঁর বাবার ব্যক্তিত্ব এতই প্রকট ছিল, সেখানেও সারা জীবন তিনি বাবার সন্তান হয়েই রইলেন, অনেকটাই অনভিজ্ঞ, অতএব অনেকটাই নির্লিপ্ত’। মা আবার একটু থামলেন।
    মায়ের কথা থামানোর সুযোগে, নীলকাকুর মা বললেন, ‘তোকে তো যত দেখছি তত অবাক হচ্ছিরে, মা। এসবও কি ওই ডাইরিতে লেখা আছে’?
    ‘না, না তাই লেখেন নাকি কেউ? আপনাদের কথা শুনে, আর ডাইরির কিছু কিছু মন্তব্য থেকে এমন একটা ধারণা আমার তৈরি হয়েছে - জানি না ভুল না ঠিক’। মা বললেন।
    ‘ভুল মানে? কি বলছিস মা? এতদিন তার সঙ্গে ঘর করেও মানুষটাকে এমন অন্তর থেকে বুঝিনি রে, মা। সংসারের ছোটখাটো ব্যাপারে কতদিন কত মনোমালিন্য হয়েছে - এমন বুঝলে...’ নীলকাকুর মায়ের গলা ধরে এল, তিনি কান্না ভাঙা গলায় বললেন, ‘এমন বুঝলে মানুষটাকে আর একটু ধৈর্য নিয়ে...’ শেষ করতে পারলেন না তাঁর কথাটা, কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
    মা জড়িয়ে ধরলেন নীলকাকুর মাকে, বললেন, ‘মাসিমা, আপনি এভাবে ভাববেন না। আমি একজন তৃতীয় ব্যক্তি – নিরপেক্ষ চোখে আমি ওঁনার সম্পূর্ণ জীবনটাকে যেভাবে দেখলাম, সেটা আপনাকে বললাম। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েনে - সুখেদুঃখে, আনন্দে-কান্নায় আপনি যেভাবে তাঁকে দেখেছেন – সেভাবে কারোর পক্ষেই দেখা সম্ভব নয়। কাজেই, প্লিজ, আমার কথাটা একদম আক্ষরিক অর্থে নিলে, আমি বলব আমি আপনাদের ঠিক বোঝাতে পারিনি, ওঁনার মানসিক যন্ত্রণাটা। আমাদের জীবনের কোন কিছুই নিছক অংকের হিসেবে চলে না, মাসিমা। তাই আমরা মানুষ’।

    পরিবেশটা বেশ থমথমে হয়ে গেল। নীলকাকুর মা কিছুক্ষণ পরে একটু সামলে নিলেন। শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুছে নিলেন চোখ আর নাক। তাঁর মুখ বিষণ্ণ। মা নীলকাকুর মায়ের কোলে হাত রেখে, ছোট্ট মেয়ের মতো মুখ করে বললেন, ‘মাসিমা, আমার কিন্তু খুব খিদে পাচ্ছে, চালভাজার খিদে। তার সঙ্গে চা। নীল বলছে আপনি না বললে খাওয়াবে না, প্লিজ, মাসিমা’। মায়ের বলার ভঙ্গীতে আমরা সকলে তো বটেই, নীলকাকুর মাও হেসে ফেললেন, মায়ের কাঁধে হাল্কা চাপড় মেরে বললেন, ‘তুই দেখাচ্ছিস বটে, শোভা। তোর কথা রত্না আর নীলুর মুখে অনেক শুনেছি, কিন্তু সে বড় কম, দেখছি অনেক বেশি’।
    ‘এই তো, আপনিও স্বীকার করলেন তো? যে আমার সম্বন্ধে কম বলে, সে তার মানে কিরকম কিপটে’? মা হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন। এই কথায় সকলেই হেসে উঠল আবার। নীলকাকুর মাও মন খুলে হাসলেন খুব। তাঁর মনের বিষাদের মেঘ কেটে গেল মুখ থেকে। হাসতে হাসতে নীলকাকুর মা নীলকাকুকে বললেন,
    ‘এখনো খবর দিলি না, নীলু? বসে বসে নিজের বদনাম শুনছিস’? 
    ‘বৌদির কথায় কান দিও না মা, হারুদাকে অলরেডি আমার বলাই ছিল। মিসকল দিলেই, চালভাজা মাখা আর চা বানাতে। মিসকল দিয়েছি অন্ততঃ মিনিট পাঁচেক হয়ে গেল, এসে যাবে এক্ষুণি’। নীলকাকু হাসতে হাসতে বলল।



    চালভাজা মাখা শেষ করে, মা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘টাকা তিনি অনেক উপার্জন করেছেন, কিন্তু নীলের দাদুর কাছে এই সোনার কাজললতাটি ছিল তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ একটি ট্রফি। এই জিনিষটি তাঁকে আত্মতৃপ্তি দিত খুব। তাই এত দামি জিনিষটি বাড়িতে রাখা বিপজ্জনক বুঝেও তিনি কোনদিন নিজের কাছছাড়া করেন নি। আজীবন নিজের ঘরে সিন্দুকের মধ্যেই রেখেছিলেন তিনি, হয়তো মাঝে মাঝে দরজা বন্ধ করে, হাতে নিয়ে খুব সাবধানে দেখতেন জিনিষটা। তিনি মারা যাবার পর সোনার কাজললতাটি মেসোমশাইয়ের হাতে তুলে দেন তাঁর মা। এই কাজললতাটি মেসোমশাইয়ের কাছে কিন্তু হয়ে উঠল মস্ত বিড়ম্বনা। তিনি এটা হাতে পেয়ে খুব বিপন্ন বোধ করলেন। কোথায় এবং কিভাবে এটিকে নিরাপদে রাখা সম্ভব সেই চিন্তাতেই তাঁর রাতের ঘুম ছুটে গেল। অনেক ভেবে চিন্তে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এটিকে ব্যাংকের ভল্টে রাখার’।
    ‘ব্যাংকের ভল্টে’? নীলকাকু জিগ্যেস করলেন।
    ‘হ্যাঁ। ব্যাংকের ভল্টে। কলকাতায়। নিউআলিপুরের একটি ব্রাঞ্চে। প্রয়াগ ব্যাংক। আর তার চেয়েও আশ্চর্য ব্যাপার হল, এই খবরটা তিনি কাউকেই – এমনকি মাসিমাকেও স্পষ্ট করে বললেন না। এই গোপনীয়তার একটাই কারণ, তিনি ভীষণ বিপন্নবোধ করেছিলেন। কোনক্রমে যদি কোন উটকো লোকের কানে আসে এর অস্তিত্বের কথা, বিপদে পড়তে পারেন তিনি এবং তাঁর পুরো পরিবার। তাই এত গোপনীয়তা’!          
    ‘ঠিক বলেছিস, শোভা মা, নিউআলিপুরের আমাদের বাড়ির কাছেই বসুধা ব্যাংকে আমাদের একটা ভল্ট ছিলই, যেখানে আমার আর রত্না বৌমার গয়নাপত্র আজও আমরা রখি। কিন্তু যে ব্যাংক তুই বললি, সেখানে আমাকে সঙ্গে নিয়ে ওর বাবা আর একটা ভল্ট খুলিয়েছিল – জয়েন্টলি। ওর দাদু মারা যাবার কিছুদিন পরে। তুই বলাতে আমার মনে পড়ল। আমি জিগ্যেস করেছিলাম, “একটাতো রয়েইছে, আবার ভল্ট নিয়ে কি হবে”? আমাকে ওর বাবা বলেছিল, “এমনিই, আর একটা থাকা ভালো”। ওর বাবার নেহাত কোন খামখেয়াল ভেবে, আমিও আর তেমন মাথা ঘামাই নি’।
    ‘হ্যাঁ, মাসিমা। সে সময় আপনার হাতে উনি চাবিটাও দেন নি। চাবিটা দিয়েছিলেন, নীলের বিয়ের পর। আপনাদের পরিবারের পরম্পরা অনুযায়ী, রত্নার হাতে কাজললতাটি আনুষ্ঠানিক সমর্পণের পর, তিনি আবার ওটিকে ব্যাংকে রেখে আসেন এবং তারপর চাবিটি আপনাকে গচ্ছিত করেন’।
    ‘আচ্ছা বৌদি, এত মূল্যবান জিনিষটির ঠিক কত দাম, তার কোন হদিশ বলতে পারেন’?
    ‘হদিশই দিতে পারি, সঠিক বলা সম্ভব নয়। তোমার দাদার মোবাইলে গুগ্‌ল সার্চ করে যা দাম জানতে পারলাম তাতে আমার ধারণা মতো তিরিশ-চল্লিশের কম নয়’         
    ‘তিরিশ-চল্লিশ হাজার’? আমি বলে ফেললাম।
    ‘ধুর বোকা, লাখ’। মা মৃদু হেসে আমাকে বললেন।
    ‘তিরিশ-চল্লিশ লাখ’? নীলকাকু রীতিমতো চমকে উঠলেন।
    ‘তারও বেশীই হবে হয়তো। রূপোর বডির ওপর ১৬০ গ্রাম ১৮ ক্যারাট সোনার পাত দিয়ে মোড়া এই মাছের চোখে বসানো আছে দুটো রুবি, বর্মিজ রুবি – ৮.৫ বাই ৭.৫ মিলিমিটার তার সাইজ। গুগ্‌ল্‌ সার্চ করে আমি যা দাম পেলাম তাতে এই রুবি, সোনা আর রূপোর দাম আমি ধরেছি। কিন্তু এ ছাড়াও আছে জিনিষটার আর্ট ভ্যালু এবং অ্যান্টিক ভ্যালু। যেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়’।

    অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বললেন না। জিনিষটা দামি সকলেই জানতেন, কিন্তু এতটা দামি কেউ কল্পনাও করে উঠতে পারেন নি। সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে, মা আবার বললেন, ‘আপনারাও জানতেন না এই সোনার মাছের এতো দাম হতে পারে। মেসোমশাই জানতেন। তাই তিনি ঘরে রাখার কোন রিস্ক নেন নি, রেখেছিলেন ব্যাংকে। আর পাছে পাঁচকান হয়ে কোন বিপদ ঘটে যায়, এই ভয়ে কাউকেই খোলসা করে বলতেও পারেন নি। তবে তাঁর ডাইরিতে, সব লিখে রেখে গেছেন, সরাসরি নয় – সংকেতে’।
    ‘ওই ডাইরি পড়ে আপনি সব কথা জেনে গেলেন, আর আমি ভেবেছিলাম, ওগুলো রাবিশ! ভাগ্যিস আমরা কেউ ফেলে দিই নি, দিলে আজ এত সব খবর আমরা জানতেও পারতাম না। এঘর সেঘর খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে, আমরা একসময় ধরেই নিতাম, ওটা চুরি হয়ে গেছে! কিন্তু সংকেতগুলো কি বলুনতো, বৌদি’?
    ‘নীল, এখন আর নয়, চলো সন্ধে হতে চলল, আরতির সময় হয়ে যাবে, ঠাকুর দালানে যাই। আরতি সেরে আবার বসা যাবে’।
    নীলকাকুর মাও বললেন, ‘এঃ হে, ঠিক বলেছিস মা, তোর কথায় একদম বুঁদ হয়ে গেছিলাম, ছি ছি অনেক দেরি হয়ে গেল, চল আরতির যোগাড় করি, বৌমা, চলো চলো, আরতির পর আবার শুরু হবে শোভা মায়ের সভা’।

    ১০

    আরতি শেষে ঠাকুর প্রণাম করে আমরা যখন উঠতে যাবো, সকালের সেই নিতাই আবার নীলকাকুর মাকে ডাকল, ‘বসেন, বসেন, মা ঠাকরেন, বসেন। একখান গান বেঁদেচি, শোনেন। নবমীর পুজোও শেষ, আরতিও শেষ, আর তো কেবল রাতটুক। রাত পোয়ালেই কাল জগজ্জননীর বিদেয়কাল, সে নিয়ে মা মেনকার মনে খুব বিষেদ, তাঁর চোখে জলের ধারা, তিনি কন্যেরে জড়ায়ে ধরে কইচেন’, নিতাইয়ের এই কথার পরেই সেই মহিলা, গেয়ে উঠলেন,   

    “এই তো সেদিন এলি উমা, এরই মধ্যে ‘আসি’?
    তোর হাসিমুখের আসি কথায় অশ্রুধারে ভাসি।

    চুপটি করে বোস দেখি মা চুলগুলি দেই বেঁধে।
    কনক বরণ করলি কালি শিবের ঘরে রেঁধে -
    রাজার কন্যে ছিলি, হলি দিগম্বরের দাসী।
    এই তো সেদিন এলি উমা, এরই মধ্যে ‘আসি’?

    সত্যি করে বল দেখি মা লুকোসনে কো মোরে,
    শ্মশানবাসী শিব কি তোকে সত্যি সোহাগ করে?
    তবে থাকার কথায় কার ডরে, তোর, নেইকো মুখে হাসি -
    এই তো সেদিন এলি উমা, এরই মধ্যে ‘আসি’?

    আর কটা দিন থাক না উমা, কিই বা হবে ক্ষতি
    মান করে নয় মানিয়ে নিবি, রাগলে উমাপতি!
    আর কটা দিন দেখতে যে সাধ, তোর মুখশশী -
    এই তো সেদিন এলি উমা, এরই মধ্যে ‘আসি’?
    তোর হাসিমুখের আসি কথায় অশ্রুধারে ভাসি”।

    বাতাসে শিউলির গন্ধ, সামান্য হিমের পরশ লাগা বাতাস, শরতের পরিষ্কার আকাশে ঝকঝকে করছে নবমীর শশী, দূরে কোথাও গ্রামে দু একটা কুকুরের ডাক – আর কোন শব্দ নেই, এই পরিবেশে গানটা এমন নাড়া দিয়ে গেল, আমার চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা যেন সরে গেল। মন আকুল করা এমন অনুভূতি আগে কোনদিন আসে নি। যে প্রতিমা ঠাকুরদালানে আজ অধিষ্ঠিতা, সত্যিই তো কে বলেছে, তিনি কাঠ, খড়, মাটি আর রঙ মাখানো পুতুল? দুই ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে মা – আমাদের সকলের মা, বাপের বাড়ি এসেছেন সম্বৎসর পরে। নাঃ আর যাই হোক, কলকাতায় হাজার মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে তাজ্জব হয়ে গিয়েছি বারবার, কিন্তু এমন ব্যাকুল হই নি কোনদিন! মা ঠিকই বলেছিলেন, এ পুজো একদম অন্য পুজো।
    নিতাইয়ের গান শেষ হবার পরেও তার রেশ যেন রয়ে গেল, সর্বত্র। ধূপ ধুনোর গন্ধের মতো। দীপের স্নিগ্ধ আলোর মতো। শিউলির সুবাসের মতো। আমার চোখে জল যখন এসেই গেল, এত আশ্চর্য আমি কোনদিন হই নি। আমি যে এমন কাঁদতে পারি জানতামই না, আর তার চেয়েও বড়ো কথা, এই চোখের জলের জন্যে লজ্জাও লাগছে না এতটুকু! বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, খুব মৃদু স্বরে বললেন, ‘কিরে, কি হলো তোর? চোখে জল এসে গেল, না? এই হচ্ছে বাংলার মুখ, বংলার পুজো। অনুভবের, অণু ভাবের’।
    মা পাশেই ছিলেন, ঠিক শুনতে পেয়েছেন বাবার কথা, বললেন, ‘দেখেছিস, ভুট্‌কু, তোর বাবাও কম যায় না, আমরা বকবক করে হয়রান হই, আর তোর বাবা এক কথায় কি সুন্দর বুঝিয়ে দিল সম্পূর্ণ পরিবেশটা – অণু ভাব – ছোট্ট ছোট্ট ফিলিংস। ভুট্‌কু, এক কাজ করত, বাবা, আমার ডাইরিটা আমার মাথার বালিশের তলায় আছে, ওটা নিয়ে আয় না চট করে। এখনই তো মাসিমার ঘরে ডাক পড়বে সংকেতের হদিশ নিয়ে’।

    নীলকাকুর মায়ের ঘরে আবার আমরা জমায়েত হলাম পৌনে আটটা নাগাদ। বাড়িতে বানানো গরম গরম বেগুনি আর সঙ্গে চা। আমি চা খাই না, তবে বেশ অনেকগুলো বেগুনি খেয়ে ফেললাম। দিব্বি লাগল খেতে। চায়ে চুমুক দিয়ে, মা তাঁর ডাইরি খুললেন, অনেকগুলো পাতা উল্টে তিনি এক জায়গায় থামলেন, মুখ না তুলেই বললেন,
    ‘মেসোমশাইয়ের ডাইরিতে মোট ৮৬৭টা এন্ট্রি আছে, তার মধ্যে এই তিনটে নামে একটু বিশেষত্ব আছে-   
    ১. Hemkanta Meena, hearing plate, Village: Shashasthi, কে রাত ১৮.০০
    ২. Rupsa Majhi with red eyes – conjunctivitis (?)
    ৩. Chunilal Verma: age 75-85, Zero Point DI-GRAM - প্রাকৃতিক ও  চিকিৎসাই হয় নি।

    মেসোমশাই সমস্ত নাম, অসুখের নাম অথবা যাই কিছু লিখেছেন এই ডাইরিতে সমস্তই ইংরিজিতে। কিন্তু এর মধ্যে দুজনের ক্ষেত্রে তিনি বাংলা ব্যবহার করেছেন, আর রূপসা মাঝির চোখ লাল হয়েছে – কনজাংটিভাইটিস লিখেও তিনি দ্বিধায় রয়েছেন। কেন? আর আমরা ডাক্তার না হয়েও বুঝতে পারছি অসুখগুলো কেমন যেন, মোটেই বিশ্বাসযোগ্য কোন অসুখ নয়।  
    প্রথমেই বলি হেমকান্ত মীনা – রাজস্থানী নাম। তাঁর হিয়ারিং প্লেট হয়েছে? সে আবার কি অসুখ? কিন্তু এটাকে বাংলা করলে দাঁড়াবে শোনার প্লেট, শোনার পাত, সোনার পাত। তালব্য শ টাকে দন্ত্য স ভাবলে কিন্তু আমরা সূত্রটা বেশ পেয়ে যাচ্ছি। এরপরে চট করে ধরে ফেলতে অসুবিধে হয় না, আ কার বাদ দিলে রাজস্থানী ভদ্রলোক আসলে হেমকান্ত মীন মানে সোনার বরণ মাছ – সোনার পাত। এরপরে আসছে ভিলেজ মানে গ্রাম। গ্রামের নাম শাষষ্ঠী। গ্রামের এমন নাম হতে পারে? কে জানে হতেও পারে, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি। কিন্তু শষষ্ঠী মানে ১৬০ হলেও তো হতে পারে। আর গ্রাম যদি ধরি ওয়েটের ইউনিট, তাহলে কি দাঁড়াল – সোনার বরণ মাছ, সোনার পাত, গ্রাম ১৬০, এই অব্দি বুঝে ফেললে বাকিটা নিয়ে ভাবতেই হয় না – কারণ বাঙালিরা অন্ততঃ ১৮.০০ মানে, সন্ধে ছ’টাকে খামোকা রাত বলবে না। আসলে ওটা ক্যারাট ১৮, সোনার মধ্যে খাদের পরিমাণ।
    প্রথমটা বুঝে নেওয়ার পর, পরেরটা বেশ সহজ হয়ে যায়, রূপসা মাঝি লাল চোখের কোন মেয়ে নয় মোটেই, রূপো মাঝে – মানে মাঝখানে রূপো যেটা সোনার পাতে মোড়া আর তার চোখটা লাল। কনজাংটিভাইটিস থেকে লাল নয়। তিন নম্বরের ভার্মাসায়েব ইউপি বা বিহারের কোন ভদ্রলোক নন, তিনি বরং বিদেশী – মায়ানমার, যার পুরোনো নাম ছিল বার্মা, আজও সেরা চুনির উৎস হিসেবে বার্মার নামই বলা হয়, বার্মিজ রুবি। কাজেই চুনিলাল ভার্মা আসলে, বার্মিজ চুনি, যার রঙ লাল। এরপরে একটু কনফিউসান ছিল, এজ ৭৫-৮৫, মানে কি অত বছরের পুরোনো? জিরো পয়েন্ট ডাই-গ্রামটাই বা কি ব্যাপার? প্রাকৃতিক মানে নেচারাল, আর চিকিৎসা হয় নি মানে তো আনট্রিটেড। তার মানে চুনিটা ন্যাচারাল আর আনট্রিটেড, কিন্তু মাঝের শব্দ গুলো কি বোঝা যাচ্ছে না। নীল, তোমার দাদার মোবাইলে গুগ্‌ল্‌ ঘেঁটে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হল, age আসলে age নয়, ওটা আসলে edge, মানে চুনির সাইজ ৭.৫ বাই ৮.৫ মিলিমিটার। ওজন জিরো পয়েন্ট দ্বি গ্রাম মানে ০.২ গ্রাম। ব্যাস আর সমস্যা নেই। পুরো ব্যাপারটা এবারে সবটা মিলে হল, সোনার বরণ মাছ, মাঝখানে রূপো, ১৮ ক্যারাট - ১৬০ গ্রাম সোনার পাতে মোড়া, চোখদুটো লাল - বার্মিজ চুনি, আয়তাকার সাইজ ৭.৫ বাই ৮.৫ মিলিমিটার, প্রত্যেকটার ওজন ০.২ গ্রাম। ন্যাচারাল এন্ড আনট্রিটেড। আসলে প্রেশাস স্টোনের ব্যাপার স্যাপারগুলো তেমন কিছুই জানতাম না, তাই এই জায়গায়টায় বেশ চিন্তায় পড়ে গেছিলাম’।
    ‘না, বৌদি, এ ধাঁধাঁর সমাধান, আমার বাবা এলেও করতে পারতেন না’। নীলকাকুর এ কথায় বাবা খুব জোরে হেসে উঠলেন, বললেন, ‘কি বলছো তুমি, নীল। তোমার বাবাই তো এই ধাঁধাঁটা বানিয়েছিলেন’। বাবার এই কথায় সকলেই এবার হাসলেন, নীলকাকুর মাও খুব মজা পেলেন কথাটায়। নীল কাকু একটু অপ্রস্তুত হয়ে, মাথা চুলকে হেসে বললেন,  ‘তাও তো বটে। ঠিকই বলেছেন, সমরেশদা। তবে, যাই বলুন বৌদির জবাব নেই। এবারে ব্যাংকের চাবির ব্যাপারটা, বৌদি’?
    ‘হ্যাঁ। বলছি, ভাই। বলার আগে, আমি মেসোমসাইয়ের অন্য একটি ডাইরির এই অংশটি আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি, একটু ভাবলে আপনারাও বুঝে যাবেন ইঙ্গিতটা’। দরকারি অংশটুকু মা নিজের ডাইরিতে কপি করে নিয়েছিলেন, সেটা পড়া শুরু করলেন,
    “কলেজে অধ্যাপনার জন্য চার বছর সাড়ে তিনমাস এলাহাবাদবাসী হইয়াছিলাম। বহুদিনের সাধও ছিল, এলাহাবাদের সঙ্গম চাক্ষুষ করিবার, যেস্থানে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর তিন স্রোতধারার মিলন ঘটিয়াছে সেস্থানে অবগাহন করিয়া পুণ্যসঞ্চয় করিবার। সে সাধ পূরণ হইল, অধিকন্তু অবসর পাইলে সঙ্গমতীরে অলস সময় কাটাইতেও বেশ লাগিত। পুস্তকে পড়িয়া, লোকমুখে শুনিয়া যাহা কল্পনা করিয়াছিলাম, তাহা সবটাই যে পূরণ হইয়াছিল এমন নহে, তথাপি মনোবাসনা পূরণ হইল এমত বলিতেই পারি।
    সঙ্গমের তীরে দাঁড়াইয়া তাহার বিস্তার দেখিয়া যারপরনাই মুগ্ধ হইতাম। গঙ্গা ও যমুনা মৃদুমন্দ স্রোতে প্রবাহিতা। গঙ্গার গৈরিক প্রবাহ অপেক্ষা যমুনার প্রবাহ অনেকটাই স্বচ্ছ, তৎকারণবশতঃ যমুনার জল কিঞ্চিৎ নীলাভ দেখাইয়া থাকে। জানিনা ইহার পিছনে আজন্মলালিত নীল যমুনার রোমাণ্টিক রং অবচেতন মনে মিশিয়া রহিয়াছে কিনা – কারণ শ্রীমতীরাধারাণী ও গোপবালক শ্রীমানকানুর ভালোবাসায় বিধুর হইয়া এই যমুনা যুগ যুগান্ত হইতে প্রবাহমানা। ত্রিবেণীর দুই বেণী প্রত্যক্ষ করিলাম, অন্য বেণী সরস্বতী নদী বহুকাল পূর্বেই অন্তঃসলিলা হইয়া লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রবহমানা।   
    এই প্রসঙ্গে মনে পড়িল আমাদের হুগলীর ত্রিবেণী সঙ্গমেও সরস্বতী নাম্নী এক অন্তঃসলিলা নদীর কথা শুনিয়াছিলাম। সে কথা মনে স্মরণে আসিতে, এলাহাবাদের সঙ্গম তীরে দাঁড়াইয়া মনে হইল ইহার মধ্যে কোন গূঢ় অর্থ লুকাইয়া নাই তো?
    গঙ্গা আমাদের সমগ্র উত্তর ভারতের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং ভবিষ্যতও বটে। যমুনা আমাদের প্রেম ও ভক্তির ইতিহাসতো বটেই, কিন্তু ভবিষ্যত কিনা তাহা ভাবীকালই বলিতে পারিবে। কিন্তু বিদ্যাস্বরূপা সরস্বতী আমাদের সনাতন ভারতীয় জ্ঞান ও দর্শনের ইতিহাস হইলেও অধুনা অন্তঃসলিলা হইয়া বহমানা এবং তাহার ভবিষ্যত বড়ই অনিশ্চিত! এই তিনটি নদীর ত্রিধারার গর্ভে যেন সঞ্চিত হইয়া আছে আমাদের সনাতন ভারতের অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডার।
    এই সকল গভীর তত্ত্বকথা চিন্তা করিতে করিতে একটি কবিতা মনে আসিল, তাহা এইরূপঃ-
    এলাহাবাদের প্রয়াগতীরে             গঙ্গাযমুনা বহে চলে ধীরে
      গর্ভে তাহার সঞ্চিত বহুমূল্য ধন।
    রুদ্ধ কক্ষ খুলিবে কি কেহ            মনে জাগে মোর ঘোর সন্দেহ,
        চিন্তাবিকল হইতেছে মোর মন।
    হারাইয়া যদি যায় সেই চাবি    সাত সতেরং বসে বসে ভাবি।
       বড় ক্ষতি হবে, হায়, অপূরণ”।

    পড়া শেষ করে মা ডাইরি থেকে মুখ তুললেন। সকলেই একমনে মার পড়া শুনছিল, মা থামতে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মা বললেন, ‘নদীতীরের ইংরিজি ব্যাংক, রিভার ব্যাংক। প্রয়াগতীরে মানে – প্রয়াগ ব্যাংকে। “গর্ভে তাহার সঞ্চিত বহুমূল্য ধন” – এর আগে তিনটি নদীর প্রবাহর সঙ্গে ভারতের সনাতন জ্ঞান আর ঐতিহ্যের ভাণ্ডার হিসেবে যেন প্রয়াগগর্ভকে তুলনা করেছেন, সেটাও যেমন সত্যি, প্রয়াগ ব্যাংকের ভল্টে গচ্ছিত রাখা তাঁর সোনার কাজললতাটিও একই রকম বহুমূল্য ধন। সেই ভল্ট কে খুলবে, সেই চিন্তায় তিনি উতলা। যদি এই ভল্টের চাবিটি হারিয়ে যায় তাতেই বা কি হবে – এই নিয়ে তিনি সাত-পাঁচ বা সাত-সতেরো ভাবতে পারতেন। কিন্তু তিনি ওসব না ভেবে ‘সাত-সতেরং’ ভেবেছেন, কেন?  আমরা ছোটবেলায় নামতা পড়েছিলাম – সাতসতেরং একশো ঊণিশ, তাহলে ওটা কি চাবির নম্বর? মনে হচ্ছে তাই। মাসিমাও তাই বললেন, চাবির নম্বর ১১৯’।
    মায়ের কথা শেষ হতেই, রত্না কাকিমা বললেন, ‘দিদিভাই, আমার মাথা আজ এর বেশি আর নিতে পারবে না, আজ এই পর্যন্ত থাক। কাল কচি পাঁঠার ঝোলের সঙ্গে বাকিটা না হয় হবে। ওদিকে আমার কন্যাদুটিও টিভি দেখতে দেখতে নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে, ওদের ঘুম থেকে তুলে খাওয়াতে আমার ঘুম ছুটে যাবে। কাজেই আমি উঠলাম দিদিভাই’। একথা শুনে আমরা সকলেই সচকিত হলাম। আমরা সবাই উঠে পড়লাম, মা আমার হাতে ডাইরিটা দিয়ে বললেন, ‘ভুটকু, যা তো বাবা, ডাইরিটা রেখে দিয়ে আয়। রত্না, চলো আমিও যাই তোমার সঙ্গে, আমাদের খুব অন্যায় হয়ে গেছে। সত্যি মেয়েদুটো পুজো বাড়িতে এসে কোথায় মজা করবে, তা নয় বড়দের জ্বালায় টিভি দেখে সময় কাটাচ্ছে’।
    মা আর কাকিমা ইতি আর উতির ঘরের দিকে গেলেন, পিছনে নীলকাকুর মাও। আমি চললাম ওপরে মায়ের ডাইরি রাখতে, বাবা আর নীলকাকু ঘরে বসেই কথাবার্তা বলতে লাগলেন।
    মায়ের বালিশের নীচে ডাইরি রেখে আমি বারান্দায় দাঁড়ালাম, নবমীর চাঁদের ফালির স্নিগ্ধ আলোয়, বেশ দেখা যাচ্ছে চারপাশ, মাঠ ঘাট। বাগানে শিউলি গাছের মাথায় ফুটে থাকা অজস্র ফুলের ওপর চাঁদের আলো চিকমিক করছে, কাল সকালে সব ঝরে পড়বে ঘাসের ওপর – কাল থেকে আর মাল গাঁথা হবে না। গন্ধরাজ ফুলের সুবাস উঠে আসছে এই বারান্দা পর্যন্ত। এখন কলকাতা ভিড় আর কোলাহলে মত্ত, এখানে অন্ধকার মাঠের দিক থেকে আসছে ঝিঁঝিঁর ডাক, আর অনেক দূরে কোন রাতচরা পাখির টিট-টিটি, টিট-টিটি অবিরাম ডাক। আর কোন শব্দ নেই। ভাগ্যিস নেই, থাকলে পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যেত।  অদ্ভূত, অদ্ভূত লাগছিল এই সব।

    ১১

    নীলকাকুর মার একান্ত আন্তরিকতার জন্যেই হোক কিংবা বর্ধমানের বিখ্যাত কচি পাঁঠার মাংসের লোভেই হোক আমাদের ফেরাটা একদিন পিছিয়ে গেল। আজকে দশমীর পুজো চট করে হয়ে গেল। দেবীর ঘট নড়িয়ে, তিরকাঠির সুতোর বাঁধন ছিন্ন করে কৈলাসে ফেরার জন্যে দেবীকে মুক্ত করে দেওয়া হল। বিকেলে সিঁদুর খেলা, প্রতিমা বিদায় এবং বিসর্জন। নিতাইরা আজ সকালে চলে গেল, কোথায় যাবে জিগ্যেস করাতে অনির্দিষ্ট এক দিক নির্দেশ করে বলল ‘এ এক খ্যাপাখেপির দুনিয়া, পথেপথে চলতে থাকি, পথের ডাক শুনিয়া’ – মুখে তার অদ্ভূত হাসি। নীলকাকুর মা তাকে দুটো জামা দিলেন, মহিলাকে দিলেন শাড়ি আর দুজনকেই দিলেন একটা করে চাদর – সামনে শীত আসছে। বাবা তার হাতে পাঁচশো টাকা তুলে দিয়েছিলেন, সে ফেরত দিয়ে মাত্র কুড়িটি টাকা চেয়ে নিল। বললে, ‘আজকাল ট্রেনে বাসে বড্ড হায়রান করে, বাবু, নয়তো “ভবের হাটে অমনি মেলে, নাইকো দরাদরি – বাপটি আমার ভিক্ষে করে, মা যে দিগম্বরী”...’। যাবার সময় নীলকাকুর মাকে প্রণাম করল নীচু হয়ে, তারপর সকলকে নমস্কার করে সে চলে গেল, একবারের জন্যেও পিছন ফিরে তাকাল না। আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম তাদের চলে যাওয়া। বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আজকের এই ইঁদুর দৌড় যুগেও এমন জীবন দর্শন ভাবা যায় না। চোখে না দেখলে অবিশ্বাস্য’।

    পুজো শেষে আর কোন পিছুটান নেই। আমরা সকলে নীলকাকুর মায়ের ঘরে আবার জড়ো হলাম। মার ডাইরিটা আমি আগে থেকেই নিয়ে এসেছিলাম, মা বিছানায় নীলকাকুর মার পাশে বসতেই আমি ডাইরিটা মায়ের হাতে দিলাম। সবাই এসে প্রস্তুত হবার পর নীলকাকু বললেন,
    ‘সমরেশদা, বৌদি যেমন বললেন, এতদিন পরে আমরা গেলে, আমাদেরকে ব্যাংকের ভল্ট খুলতে অ্যালাউ করবে’?
    বাবা বললেন, ‘কেন দেবে না, নীল। মাসিমা তো জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট হোল্ডার। আগে মেসোমশাইয়ের ডেথ সার্টিফিকেটটা ব্যাংকে জমা করা দরকার। মাসিমা আর তুমি তোমাদের ফটো আইডেন্‌টিটি প্রুফ নিয়ে গেলে, আমার মনে হয় না কোন সমস্যা হবে। আর ব্যাংক যদি কোন সাক্‌সেসান ডিক্লারেসন চায় তখন নোটারি সার্টিফিকেট জমা করতে হবে, বা লোকাল কাউন্সিলার কিংবা তোমাদের এলাকার এমএলএর থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে তোমাকে জমা করতে হবে’। এসব নিয়মের কচকচানি আমার ভালো লাগছিল না, রত্নাকাকিমাও উসখুস করছিলেন, বাবার কথা শেষ হতেই বললেন, ‘দাদা, আপনাদের ওসব আইন কানুন আপনারা পরে আলোচনা করবেন, এখন দিদিভাইয়ের কথা শুনি। সেই যে কাল দিদিভাই, সোনার কাজললতাটি এ বাড়িতে আসার কথা বলছিলেন, সেট আগে শুনে নিই’।
    মা নিজের ডাইরির পাতা উল্টে, কপি করে নেওয়া অংশটুকু পড়তে শুরু করলেন, ‘“এক যে ছিল রাজা। যত না তাঁহার রাজ্য তাহা অপেক্ষাও ভারি ছিল তাঁহার নাম ও উপাধিসমূহ। সে নামের মধ্যে কত কি যে রহিয়াছে, তাহা ভাবিলে আশ্চর্য হইতে হয়।
    যেমন ধরা যাউক কাহারও নাম দীপু – বেশ নাম – দীপ মানে আলোক বর্তিকা, আদর করিয়া দীপু - ভালই নাম। কিন্তু এ নামে রাজা হওয়া চলিবে না। কাজেই দেবরাজ ইন্দ্রকে আনিতে হইবে, তাহাকে সেরা করিয়া তুলিবার নিমিত্ত। তাহা নাহয় হইল, কিন্তু তাহাতেও স্বস্তি নাই। সেরা আলোকবর্তিকাটিকে একেবারে ভগবানের সহিত জুড়িতে পারিলে কেমন হয়? বেশ হয় – তবে কোন ভগবান? ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর, ত্রিদেব থাকিতে অন্য ভগবানে যাই কেন? আবার ত্রিদেবের মধ্যে বিষ্ণু সর্বাপেক্ষা লীলাময়, তাঁহার বিশ্বরূপ, তিনি নয়বার অবতার রূপে অবতীর্ণ, আর এক বার তাঁহার আসিবার কথা শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। তবে আর কি বিষ্ণুভগবানকেই সাব্যস্ত করা যাউক। তবে তাঁহার অষ্টোত্তর শত নামের মধ্যে নারায়ণ নামটি সর্বত্র সুন্দরভাবে মানাইয়া যায়। সাধু প্রাতে গঙ্গাস্নান করিয়া ‘নারায়ণ’ নাম স্মরণ করিয়া থাকেন – সে সুন্দর, পাপী রাত্রে পাপকর্ম সমাধা করিয়া আনন্দে ‘নারায়ণ’ নাম সহযোগে হস্ত প্রক্ষালন করে, সেও বেশ। আর রাজার তো রজগুণ, কাজেই নারায়ণ নামটিই সুচারু হইবে। যাহা হউক নাম তো অবশেষে সাব্যস্ত হইল, ইহার পর আসিবে উপাধি। বঙ্গভাষায় উপাধি কি কম পড়িয়াছে? 
    রাজা যদি হইতে হয় তবে মহারাজ না হই কেন? প্রবাদও আছে ‘মারি তো গণ্ডার’। অতএব মহারাজ উপাধি প্রাপ্তিতে কোন বাধা নাই। এইবার প্রয়োজন পদবি। পদবিতে প্রাচীন বঙ্গ রাজ বংশের স্পর্শ থাকিলে জনসাধারণের সমীহ আদায় সহজ হয়। বঙ্গ রাজাদের মধ্যে পাল, সেন, আদিশূর, শশাঙ্ক কত রহিয়াছে। ইঁহাদিগের মধ্যে সমধিক প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন পাল রাজারা। তবে আর চিন্তা করিও না – ওই পালই সাব্যস্ত করিয়া লও আর সঙ্গে একখানি চৌধুরি জুড়িয়া দিলে দেখিবে নামখানি রাজ্যের ক্ষুদ্র সীমানা ছাড়াইয়া পররাজ্যেও হানা দিতেছে।
    সেই রাজা সুদীর্ঘ নামের ভার বহন করিয়া ক্ষান্ত হইলেন না। আরো বড়ো রাজা ইংরাজ সরকার বাহাদুরকে তৈলাক্ত করিয়া ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি হাসিল করিয়া বিস্তর বাহাদুরি দেখাইলেন। বলা বাহুল্য, এই বাহাদুরির নিমিত্ত তাঁহাকে যত সরিষার তৈল সিঞ্চন করিতে হইয়াছিল – ততই তাঁহার প্রজাদিগকে সরিষার ফুল দর্শন করিতে হইয়াছিল।
    এ হেন মহারাজার একমাত্র দুলালী অসুস্থা হইলে মহাভারত অশুদ্ধ হইয়া যায় বৈকি! রাজ্যের ব্রাহ্মণ বৈদ্য অথবা কবিরাজের উপরে কতদিন ভরসা করা যায়? আমপ্রজাগণ ইঁহাদিগের উপর ভরসা করিয়া বাঁচিতে হয় বাঁচুক, মরিতে হয় মরুক – তাহাতে কি এমন ইতর বিশেষ ঘটে  – কিন্তু রাজকন্যার জন্য রাজধানী কলকাতার সেরা সাহেব ডাক্তার না হইলে চলিতে পারে না। সাহেব ডাক্তারের কি মতি হইল বলিতে পারি না, তিনি দেশজ ডাক্তার নররূপী নারায়ণকে বড়ো ভরসা করিতেন বলিয়া, তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দিলেন চিকিৎসার জন্য।
    সাধারণ ডিসপেপ্‌সিয়া এক বালিকার পক্ষে তেমন কিছু দুরারোগ্য নহে। কিঞ্চিৎ বিশেষ পথ্য, নিয়মানুবর্তিতা আর সঙ্গে সাধারণ কিছু ঔষধ নিয়মিত সেবনেই কন্যার রোগমুক্তি ঘটিল। এই ঘটনায় মহারাজা ও তাঁহার নয়নমণি তনয়া যারপরনাই আহ্লাদিত ও চমৎকৃত হইয়াছিলেন সন্দেহ নাই। তাঁহারা নররূপী নারায়ণকে পূজা করিতে শুরু করিলেন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। নররূপী নারায়ণের মহিমা দিকে দিকে প্রচারিত হইতে থাকিল। মৎস্যাবতার হইয়া তিনি যেন জগৎকে প্রলয় বারিধি হইতে উদ্ধার করিতে আসিয়াছেন। সেই দাম্ভিক মহারাজা আপন অগ্রজের ন্যায় স্নেহশীল হইয়া উঠিলেন আর ভ্রাতুষ্পুত্রীসমা সেই বালিকা তাহার প্রিয় কনকাঞ্জনাধারটি ভক্তিতে অর্পণ করিয়া দিল – মৎস্যাবতারের করকমলে - মৎস্য আসিয়া ধরা পড়িল স্বেচ্ছায়”’। মা এতক্ষণ পড়ে চুপ করলেন। আমরা সকলেই এক মনে শুনছিলাম। নীলকাকু বললেন –
    ‘বাপরে, আমি ভেবেছিলাম এটা আজগুবি কোন রাজা-গজার গল্প, এর মধ্যে লুকিয়ে রেখে দিয়েছেন সোনার কাজললতার ইতিহাস’?
    ‘মা, ওই কনকা...কনকাঞ্জনাধার ব্যাপারটা কি, বুঝলাম না’। আমি জিগ্যেস করলাম মাকে।
    ‘কনক মানেও সোনা। অঞ্জন মানে কাজল বা কালি। আধার মানে পাত্র। স্কুলে পড়া সন্ধি-টন্ধি সব ভুলে মেরে দিয়েছিস, কনকাঞ্জনাধার মানে সোনারকাজললতা। সে যাকগে, এখানে কিন্তু একটা বিষয় খুব লক্ষ্য করার মতো, মেসোমশাই তাঁর বাবার কৃতিত্বকে এখানে মোটেই গুরুত্ব দেননি আর যেভাবে মহারাজকে বিদ্রূপ করেছেন, তাতে ওই রায়চৌধুরিদের ব্যাপার স্যাপার নিয়েও তাঁর ভক্তিছেদ্দার কোন বালাই ছিল না। বাবার ওপর কতখানি ক্ষোভ তাঁর মনে জমা হয়েছিল, এই লেখাটি থেকে খুব স্পষ্ট তার আঁচ পাওয়া যায়’। মা ডাইরি বন্ধ করে রাখলেন। একটু পরে আবার বললেন – ‘ব্যস আর আমার কিছু বলার নেই, এরপর যা করার তা করতে হবে তোমাদের – নীল আর মাসিমা আপনাকে’।
    একাদশীর দিন ভোরে আমরা রওনা হলাম কলকাতার দিকে। রাস্তায় আমরা কেউই তেমন কথাবার্তা বলিনি। আসলে আমরা সকলেই নিজের নিজের মতো করে ভাবছিলাম এই কটা দিনের কথা। পুজো। নিতাই ও তার সঙ্গিনীর গান। প্রকৃতি। সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত। নীলকাকুদের আপ্যায়ন। আর নিশ্চয়ই হেমকান্ত মীনের কথা। বাবা বর্ধমানে থেমে সেই একই মিষ্টির দোকান থেকে মিহিদানা আর সীতাভোগ নিয়ে এলেন। কলকাতায় নিয়ে যাবার জন্যে। বর্ধমান শহর ছাড়িয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়ে বাবা গাড়িতে যখন বেশ স্পিড তুললেন, আমি বাবাকে জিগ্যেস করলাম, ‘বাবা, গোয়েন্দারা তো শুনেছি, পারিশ্রমিক পান, মা পাবে না?
    ‘কি জানি। দিতেও পারে, নাও পারে, চেনাশোনার মধ্যে টাকা তো আর নেওয়া যায় না’। বাবা গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে মায়ের দিকে তাকালেন। মা কিছু বললেন না, একদম সামনে তাকিয়ে ছিলেন রাস্তার দিকে। অনেকক্ষণ পর মা বললেন, ‘আমার পারিশ্রমিক যথাস্থানে রাখা আছে’।
    ‘তার মানে? কোথায়’? বাবা খুব অবাক স্বরে জিগ্যেস করলেন। আমিও আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না।
    ‘প্রয়াগ ব্যাংকের ভল্টে’। মা খুব নিরুত্তাপ গলায় বললেন।
    ‘কি করে জানলে? ডাইরিতে লেখা আছে’? বাবা জিগ্যেস করলেন।
    ‘হুঁ’।
    ‘কি লেখা আছে’? আমি জিগ্যেস করলাম মাকে।
    ‘ধাঁধা’। মা গম্ভীর স্বরে বললেন।
    ‘বলো না, মা’ আমি মায়ের কাঁধে হাত রেখে বায়না করলাম।
    ‘ “পথের শেষে যে জন এসে খুলে দিবে রুদ্ধ দ্বার-
      আসুক সিদ্ধি, আসুক ঋদ্ধি গুণীর গুণে দু’ দু’ চার।
      আর কিছু থাক কিংবা না থাক বুদ্ধি আছে সাকুল্যে-
      আসল আদর, আসল কদর প্রাপ্য যে হয় কনকমূল্যে।
      ব্রাহ্মণ হোক, ক্ষত্রিয় হোক, হোক সে বৈশ্য, শূদ্রা
      করে সেলাম, রেখে দিলাম চারটি সোনার মুদ্রা”। বুঝলে কিছু? না বুঝলে এখন থাক, প্রয়াগ ব্যাংকের ভল্ট খুললে বুঝিয়ে দেব’।
    ‘বারে, এটা তুমি বললে না কেন, নীলকাকুদের’?
    ‘ছিঃ, নিজের কথা আগে থেকে ঢাক পিটিয়ে বলতে আছে? বলব যথাসময়ে সব বলব’।  
     
    ১২

    লক্ষীপুজো সেরে, দুদিন পরে নীলকাকুরা কলকাতায় ফিরলেন। ফিরেই প্রয়াগ ব্যাংকে দেখা করে কথাবার্তা বলে সব ঠিক করে ফেললেন। নীলকাকু আর নীলকাকুর মা ব্যাংকে গিয়ে ভল্ট খুলে নিয়ে এসেছেন দুটো বাক্স, একটা বড়ো আরেকটা ছোট। আর সঙ্গে একটা খামের মধ্যে সাদা কাগজে নীলকাকুর বাবার হাতে লেখা একটা কবিতা। বড়ো বাক্সে আছে সোনার কাজললতা। আর ছোট বাক্সে আছে চারটে সোনার কয়েন।
    বাবা শনিবারের আগে আসতে পারবেন না। কারণ বাবা সবে পুজোর ছুটিতে প্রায় সাত-আটদিন ছুটি নিয়েছিলেন, তার ওপর নীলকাকু এখনও অফিসে জয়েন করেনি, কাজেই ঠিক হল শনিবার সন্ধ্যেবেলা আমরা তিনজনে নীলকাকুদের নিউআলিপুরের বাড়ি যাব। সেখানে সোনার কাজললতা বা হেমকান্ত মীন আমাদের চাক্ষুষ করাও হবে, আর সেই সঙ্গে হবে সমস্ত রহস্যের যবনিকা পতন।
    শনিবার আমরা নীলকাকুর বাড়ি গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা, কারণ বাবার ফিরতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমরা পৌঁছতেই লেখাপড়া ছেড়ে ইতি আর উতি দৌড়ে এল। আমরা আসাতে ওরা খুব আনন্দ পেয়েছে। আমরা নীলকাকুর মায়ের ঘরে গিয়ে বসলাম। কাকিমা ইতি আর উতিকে নিয়ে অন্যঘরে চলে গেলেন ভুলিয়ে ভালিয়ে। নীলকাকু আমাদের সঙ্গেই ছিল। নীলকাকুর মা স্টিলের আলমারি খুলে লকার থেকে বের করলেন বাক্সদুটো- একটা বড় আর একটা ছোট। সঙ্গে একটা ছোট ব্রাউন রঙের খাম। সবকিছু নিয়ে নীলকাকুর মা বিছানায় বসলেন, মা বিছানাতেই বসে ছিলেন। আমার অবস্থা উত্তেজনায় টানটান। নীলকাকুর মা বড়ো বাক্সটা খুলে মায়ের হাতে তুলে দিলেন। নীল রঙের মখমলের নরম প্যাডের ওপর শোয়ানো রয়েছে মাছটা। সোনার মাছ। লাল রুবির চোখ। সারা গায়ে আঁশের নিখুঁত দাগ দাগ দেওয়া। লেজ আর পাখনাগুলিও খুব সুন্দর মানানসই। সব মিলিয়ে দুর্দান্ত সুন্দর জিনিষটা।
    বাবা হাতে নিয়ে দেখে বললেন, ‘মারভেলাস। ফ্যানটাসটিক। দামের কথা যদি ভুলেও যাই, অদ্ভূত সুন্দর, রিয়্যালি এ ক্র্যাফটওয়ার্ক। সত্যি আগেকার দিনের রাজা মহারাজারা সুন্দর জিনিষের কদর জানতেন’। আমিও দেখার পর নীলকাকুর মায়ের হাতে ফেরত দিলাম বাক্সটি। নীলকাকুর মা বাক্সটি বন্ধ করে আবার আলমারির লকারে রেখে এলেন। এরপর ব্রাউন খামটি খুলে, একটা সাদা কাগজ বের করে মাকে বললেন –
    ‘শোভা মা, নীলুর বাবা আবার একটা ধাঁধা তোমার জন্যে রেখে দিয়েছেন, আমি পড়ছি, শোনো,
    “পথের শেষে যে জন এসে খুলে দিবে রুদ্ধ দ্বার”... এই লাইনটা শুনেই মা বলতে শুরু করলেন,
    -‘“আসুক সিদ্ধি, আসুক ঋদ্ধি গুণীর গুণে দু’ দু’ চার।
      আর কিছু থাক কিংবা না থাক বুদ্ধি আছে সাকুল্যে-
      আসল আদর, আসল কদর প্রাপ্য যে হয় কনকমূল্যে।
      ব্রাহ্মণ হোক, ক্ষত্রিয় হোক, হোক সে বৈশ্য শূদ্রা
      করে সেলাম, রেখে দিলাম চারটি সোনার মুদ্রা” ’।
    ‘বৌদি, এটাও ওই ডাইরিতে ছিল? আপনি আগে বলেননি তো’! মা কোন উত্তর দিলেন না, শুধু হাসলেন একটু।
    ‘শোভা মা না বললেও আমি কিন্তু এটার মানে বুঝে ফেলেছি, তাই ছোট বাক্সটি আমি শোভা মায়ের হাতেই তুলে দিলাম’। নীলকাকুর মা এই কথা বলে মায়ের হাতে তুলে দিলেন ছোট বাক্সটি। মা দুহাতে বাক্সটি নিয়ে বললেন, ‘এ আমার প্রতি আপনার আর মেসোমশাইয়ের আশীর্বাদ’। তারপর রেখে নিলেন নিজের হাতেই।
    ‘খুলে দেখবেন না বৌদি, ভেতরে কি আছে’? নীলকাকু জিগ্যেস করল মাকে।
    ‘জানি। চারটে সোনার কয়েন - দুটো গনেশঠাকুরের আর দুটো মালক্ষ্মীর ছবি’। মা বললেন।
    ‘নাঃ আপনার সঙ্গে পারা অসম্ভব। চারটে কয়েন তো বুঝলেন – কিন্তু ঠাকুরের ছবিগুলো কি করে ধরে ফেললেন’?
    ‘সিদ্ধি দান করেন গণেশজি, ঋদ্ধি দান করেন মা লক্ষ্মী – তাঁরাই আছেন – দুজন করে’। মা উত্তর দিলেন।
    ‘আর কত গ্রামের কয়েন, সেটা’? নীলকাকু পরীক্ষা নেওয়ার মতো জিগ্যেস করল।
    ‘না, সেটা লেখা নেই, মেসোমশাইয়ের ডাইরিতে। আর তাছাড়া সে ব্যাপারে আমার খুব কৌতূহলও নেই। কারণ আমার কাছে মেসোমশাইয়ের আশীর্বাদের মূল্য অনেক বেশী’। মা খুব আবেগের সঙ্গে বললেন কথাগুলি।
    ‘সে আর তোকে বলতে হবে না, মা। সে আমি তোকে প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম। তবে ও চারটে কয়েন নীলুর বাবা দিয়েছেন, কিন্তু তুই আমাদেরকে যে কি চিন্তা মুক্ত করলি, মা, সে আমরাই জানি’। নীলকাকুর মা বললেন।
    ‘আর কি সহজ করে সবকিছু মিটিয়ে দিলেন – সেটা বলো, মা’ নীলকাকু বলল।
    ‘ঠিক কথা, কাজেই আমি, নীলু আর বৌমা মিলে একটা পঞ্চাশ হাজারের চেক তোর হাতে দিতে চাই’ এই বলে নীলকাকুর মা মায়ের হাতে সেই ব্রাউন খামটি তুলে দিলেন আর বললেন ‘এই খামে ওই চারটে সোনার কয়েনের সার্টিফিকেটটাও রাখা আছে – প্রয়াগ ব্যাংকের, রেখে দিস যত্ন করে’।

    সব কিছু মিটে যেতে, আমরা সেদিন নীলকাকুদের বাড়ি ডিনার সেরেই ফিরেছিলাম। ইতি আর উতির পরের দিন রবিবার স্কুল নেই বলে জেগে রইল অনেক রাত অব্দি। আর সোমবার দিন সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ নীলকাকুর মা ফোন করেছিলেন মাকে, ফোন রেখে মা আমাকে বললেন, "যাক বাবা, হেমকান্ত মীনামহাশয় আবার প্রয়াগতীরে নির্বিঘ্নে ঢুকে পড়েছেন’।

    --০--    
     
    ( মূল এই উপন্যাসের সঙ্গে আরও দুটি উপন্যাস নিয়ে  "তিন এক্কে তিন হেমকান্ত মীন" গ্রন্থটি সৃষ্টিসুখ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত।)
     
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৩৫৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • দীমু | 223.191.51.79 | ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৮:২৫527029
  • yes​​ 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন