• হরিদাস পাল  গপ্পো

  • তিনি ও রাধারাণী 

    তামিমৌ ত্রমি লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ৩০ আগস্ট ২০২১ | ১৩৩ বার পঠিত
  • তিনি ও রাধারাণী
    তামিমৌ ত্রমি

    অস্তমিত সূর্যদেব তখন আকাশ - বাটি ভরে পায়েস খাচ্ছেন, লাল, নীল, কমলা, হলুদ, গোলাপি, ফিরোজা.. তাতে হরেক রকমের সর। আজ 'তার' জন্মদিন। রাধারাণীর ঘরে 'ম' 'ম' করছে পরমান্নের গন্ধ। বাতাস আজ ক্ষীরের মতো নিগূঢ়। গাছেরা উথলে ওঠা ঘন।

    নীলাম্বরী রাধারাণী গেলেন নিকুঞ্জে। একাকী কুঞ্জবনের কেশ-লহরে খেলে যাচ্ছে বাতাস। পরমান্নের বাটিটা রাখলেন কদম গাছের তলায়। বসলেন হাঁটু মুড়ে। মাথা নত। পিঁপড়েরা তেমনই...
    সেই আগের মতো... মাটির গুঁড়ো গুঁড়ো পথ বেয়ে ডানদিকের গর্তখানা এড়িয়ে বাঁ দিক দিয়ে ঘাসের আড়ালে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তাদের বাসা আজও জানা হল না। বাসা বলে কী কিছু হয় এ সংসারে? সেই প্রাচীন ফড়িং একবার এই ঘাসে আরেক বার ঐ ঘাসে চুমু খেতে খেতে উড়ে যাচ্ছে দূরে.... আরও দূরে....

    ঠিক 'তার' মতো। কখনো সে, কখনো বা চন্দ্রাবলী, কখনো অন্য কোন গোপিনী, 'তাকে' পায়নি এমন কথা কে বলবে বৃন্দাবনে?

    রাধারাণী মুখ টিপে হাসলেন। তিনি এখন মাঝেমধ্যেই মুখ টিপে হাসেন। জল জমে জমে বরফ হয়ে যায়; কান্না জমে হাসি। এখন আর তিনি মনে করতে পারেন না কেন হাসেন। এই যে হাসিটা তিনি হাসলেন, সে কী ফড়িং এর তৃণ চুম্বন দেখেই না অন্য কারণে না অকারণে... সে তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। কোনকিছু নির্দিষ্ট করে ভাবতেও পারেন না.... যদি অনুভূতিগুলো শীতবস্ত্রের মতো রোদে শুকোতে দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো রাগ, অনুরাগ, অভিমান, শোক, উপেক্ষা, অপেক্ষা... প্রতিটি অনুভবের মধ্যে থেকে সংজ্ঞায়িত ভাপ ছড়াত।

    তা তো হবার নয়। বিনোদিনী এখন ভাস্কর্য হয়ে গেছেন। অপরূপ, কিন্তু হিমায়িত। তার চোখের দিকে চাইলে এখন শাশুড়ি, ননদিনী, এমনকী স্বামীও গালিগালাজ ভুলে নির্নিমেষ থম মেরে থাকে কিছুক্ষণ তারপর ঢোক গিলে চোখ নামিয়ে চলে যায়। রাত্রের বিছানায় দম্পতির মাঝখানে শিখিপাখা দিয়ে পদাবলী লেখে এক ময়ূর।

    কদম গাছটা এখনও 'তার' চুলের মতোই ঝাঁকড়া। কুলায় ফেরা পাখিদের কিচিরমিচিরের মতোই অবিন্যস্ত ছিল 'তার' কেশরাশি। রাধারাণীর সর্বাঙ্গ শিহরিত হয়ে দীর্ঘশ্বাস নির্গত হল। কদম গাছের একটা ডাল কি নুয়ে এল সে বাতাসের ছোঁয়ায়?

    আরও পড়ুন
    মালিক - Chayan Samaddar
    আরও পড়ুন
    প্লাবন - Anirban M


    রাধারাণীর এমনই মনে হল। রাধারাণীর এখন এমন অনেক কিছুই মনে হয়। কিই যে মনে হয়... মনে হওয়াগুলোকে যদি শীত বস্ত্রের মতো শুকোতে দেওয়া যেত...

    রাই উপর দিকে চোখ দুটোকে উড়িয়ে দিলেন, এর মধ্যে কখন যে দিনমণি পরমান্নের রামধনুতে শেষ চুমুক দিয়ে রাত্রির আঁচলে মুখ মুছে নিদ্রা দিতে গেছেন, তা খেয়াল করেন নি রাধারাণী। কদম গাছের মাথায় যেন অতর্কিতে আটকে গেছে চাঁদ, ময়ূর পেখম যেমন বিঁধে থাকত 'তার' কেশবন্ধনে।

    রাধারাণী হাসলেন। চোখ আর নিঃশ্বাস বন্ধ করে মাথা রাখলেন কদম গাছের বুকে। যেন নিজের বুকেই মাথা রাখলেন। 'শেষদিকে' 'তার' আঙুল আর নিজ আঙ্গুলে তফাৎ করতে পারতেন না রাধারাণী। এটাই তো মস্ত সান্ত্বনা। যাবার আগে 'তার' সমস্ত উজাড় সে দিয়ে গেছে রাধারাণীকে। তাই তো 'তার' যাওয়াই হয়ে ওঠেনি। বুকে মাথা রাখতেই গাছের হৃদয়ে বেজে উঠল 'তার' বাঁশি।! 'তার' সুর শোনার জন্য এখন আর রাধারাণীর রক্তমাংসের দুটি কান, রক্তমাংসের 'সে' বা বাঁশি' নামক কোন বাদ্যযন্ত্রের দরকার হয় না। সে সুর আপনি বাজে। দূরাগত যমুনার স্রোতের মতো। এই প্রকৃতির প্রাণ - স্পন্দনের থেকে আলাদা করা যাবে না সে মায়াব্যঞ্জনা। সেই অনাদিকাল থেকে এই সুর মাটির ঢেলা থেকে নিখিল বিশ্বে নিহিত হয়ে আছে; থাকবে।

    একটি সমর্পিতা সর্পিল লতার মতো রাধারাণী যেন পাকিয়ে আছেন গাছটা আর সুরে সুরে ভেসে যাচ্ছে ওই পিঁপড়েরা, ওই সবুজ ফড়িং, এই কদমগাছ, তার বাঁ দিকের শিমুল, তার পরেরটি, তার ডানদিকের আবছায়া ঝোপ, বাসায় নিঃঝুম পাখিরা... অন্ধকার 'তার' মতোই ঘিরে রেখেছে আকাশ বাতাস চরাচর আর রাধারাণীকে...

    পৃথিবী যেন এই দৃশ্যেই স্থির হয়ে গেল। তার আর আগামী নেই। ঘাসেরা পূর্ণচ্ছেদ টেনে জানিয়ে দিচ্ছে সেকথাই।

    এই দৃশ্যই পৃথিবীর শেষ দৃশ্য হতে পারত যদি না চন্দ্রদেব আরেকটু মুখ বাড়াতেন।আঁধারাঙ্গীর চোখে না পড়ত জ্যোৎস্নার মোটা সর। শুভ্র চাঁদের দিকে চাইতেই রাধারাণীর মনে পড়ল পরমান্নের বাটিটার কথা। রাধা ব্যগ্র হয়ে মাথা তুললেন 'তার' বুক থেকে। নিজের অন্তর থেকেই সমাহিত যেন উঠে বসলেন। কি জানি সেই পিঁপড়েরা এই বাটিতেই এতক্ষণে নিজেদের অস্থায়ী বাসা বাঁধল কিনা,

    না। কাঁসার ঝকঝকে বাটিতে পদ্মের মতো ফুটে আছে পরমান্ন।

    রাধারাণী ঝরে পড়া একটি কদমে প্রথমে পা ঠেকালেন। তারপর মাথা। 'তার' আদরটা রাধারাণীর পা থেকেই শুরু হোত কিনা। সে আদর যেন অবরোহ থেকে আরোহে ফেরার নির্ঝর - প্রয়াস। কাম থেকে স'মে স্থিত হওয়ার সাধনা। 'কদমতম'কে কোলে রেখে রাধারাণী পায়েসের বাটি হাতে নিলেন, বিনি ঠোঁটে বললেন, 'শুভ জন্মদিন'। ঠোঁট ডুবিয়ে দিলেন বাটিতে..

    পরমান্নে দিলেন প্রথম চুমুক। এই বাটি শেষ হতে হতে এক বিনোদিনী রমণী আনন্দিনী রাধাতত্ত্বে উপনীত হবেন।
  • বিভাগ : গপ্পো | ৩০ আগস্ট ২০২১ | ১৩৩ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন