ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নেই রাজ্যের নই বাসিন্দা

    Santasree Shome লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ জানুয়ারি ২০২২ | ৪০১ বার পঠিত
  • শহরের কোর্ট কম্পাউন্ড। পাশেই উপায়ুক্তের কার্যালয়। স্কুল পরিদর্শকের কার্যালয়। হেড পোস্ট অফিস। আরো দুয়েকটি অফিস। এককথায় সকাল ন'টা সাড়ে ন'টা থেকে জমজমাট অফিস পাড়া। এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমের ফ্লেভার নিয়ে ডিসি অফিসের সামনাটায় জনসমুদ্রে জোয়ার নামে রোজ। মানে উইক ডে'জ গুলোতে। কাছাড়ের কত কোণা থেকে কাজে, কেসে, কারণে, কেতায় কার না আগমন হয় এই মনিষ্যি মেলায়! এই অঘ্রাণের শেষে পৌষের মাঝদরিয়ায় গোলার ফসলের পানে চেয়ে তৃপ্ত মন তবু শহরমুখী হয়। কেন!!!! সে-ই যে ঠাকুরদাদার করা ভুলের মাশুল। বা কাকার কিয়ার চারেক‌ জমি ! কিংবা ‌সরকারি আদেশে হ্যানা কার্ড ত্যানা পত্রের প্রস্তুতি। কতসব লিস্টিতে নাম ঢোকানো! ‌আরো আছে। কোথায় কবে জন্মেছিলাম, কোন ইশকুলে পড়েছিলাম, কবে এদেশে এসেছিলাম, এসবের হিসেব ও কাগজ বার করতে করতেই জুতোর তলা খয়ে গেল।

    তবু আজকাল মনে একটা হালকা মিহি সুখ ঘুরে বেড়ায়। সেই মিজোরামের গা ঘেঁষা হাওয়াইথাং, ভাগা, ধলাই, কাবুগঞ্জ, নতুন বাজারের গাড়িগুলো.....! ওগুলো কি ওখানকার যাত্রীদের সঙ্গে গাড়ির চাকার বলয়ে, পেছনের ডিকির বহুবিধ মাল- লটবহরের সঙ্গে নিয়ে আসে না দু-চারটে বিরুণী ধানের শিস!! গন্ধী বিরুণের তাজা মো মো গন্ধ মাঝারি সাইজের টিফিন কৌটোয় ভরে ভাগা'র রহমৎ চাচা সকাল সকাল বাসে চেপেছেন। এই ভরদুপুরে ফরেস্ট অফিসের পুরনো বিল্ডিংটার পাশের বড় গাছটার আড়ালে গিয়ে একান্তে দুটো বিরুণ মুখে তুলছেন। ঘরে ফিরতে তো সেই রাত সাতটা আটটা।

    সোনাই, দর্মি, মতিনগর, সোনাবাড়িঘাট, সাবাসপুর, কচুদরম অঞ্চলের যাত্রীবোঝাই বাসগুলোর জানালার শার্সিতে লেপ্টে থাকে কি লাইপাতার কুচি! ধনেপাতা, শর্ষে শাক, মিষ্টি কুমড়োর ডাটা বোঝাই বুনো মোহমায়া কি ভেসে বেড়ায় না ঐদিককার দূরপাল্লার বাসগুলোতে! মেহুল বর্মণ, এইচ চন্দ্রকান্ত, সোরেন তাঁতি কাছাড়ি করতে বেরোয় সেই টুপটাপ শিশির ভেজা ভোরে। দু'কিলোমিটারের হাঁটা পথ। তারপর লাইনের গাড়ি। ভোর ভোর উঠে বৌ বেঁধে দিয়েছে রাতে করে রাখা শীতের দিনের নষ্ট না হওয়া ভাতে লাই পাতা সেদ্ধ। ধনেপাতার চাটনি।

    বাংলাদেশ সীমানার লাগোয়া মহাদেবপুর, জালালপুর, সরসপুর, কিন্নরখাল। এবার বানের টান কিছুটা কম। তাই মা এবার দু'হাত তুলে দিয়েছেন। আমন, রঞ্জিত, বুরো, শালি। পতন বৈষ্ণব, নলিন ভটচাজ, প্রেমেন্দ্র দাস ফার্স্ট ট্রিপে শিলচর আসছেন। বড় নাকওয়ালা বাস। নিজের হাতে গড়া দিশি প্রযুক্তির ধোঁয়াহীন মাটির চুলোয় রাত তিনটে তে উপরে লালচে চালের ভাত ও আগুনে বেগুন ছুঁড়ে দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছেন তাদের গিন্নিরা। টিফিন বাটিতে। সঙ্গে একফোঁটা তেল, নুন ও বাড়ির ক্ষেতের ধানি লঙ্কা। সীমা পেরিয়ে ইলিশের গন্ধ না-ই আসতে পারে ! তবে এই বেগুন পোড়ার সঙ্গে ঘরের দুয়েক চিমটি দুধের সর। গমগমে কোর্ট চত্বরে ঘিঞ্জি অসহনীয়তায় ওদের একা করে দেয় না।

    বিল হাওরের দেশ কাটিগড়া। আরো খানিকটা এগোলেই দিগরখাল, গুমড়া, নাতানপুর, পীরনগর, কালাইন, কাটিগড়া। বর্ষায় মাছের ছয়লাপ থাকা এই অঞ্চলে পৌষের মাঝআকাশে দেখবেন বড়াইলের মাথা ছুঁই ছুঁই ঢোলা বাঁশ। চোঙা পিঠার আদর্শ বাঁশ। সঙ্গে কত সাইজের লোকাল আলু। ছোট, মাঝারি। তাদের ঝুটি ছিঁড়ে আলু পাতা শাক। আলু পাতা শাককে বেজলাইন ধরে বাড়ির আনাচকানাচে ঘুরলেই ধামা ভরা শীত পাতা। এই বিচরা ঘোরা সংগ্রহ কড়ায় পড়তেই প্রস্তুত বারো পাতা শাক। সঙ্গে কচি লেবুপাতা। যাকে বলে লেবুর কুঁড়ি। আহা! রঞ্জিত চালের ঈষৎ আঠালো ভাতে গন্ধী লেবুর পাতার ছোঁয়া মেশানো বারো পাতা শাক মেখে বড় মেয়েটি পোঁটলায় বেঁধে দিয়েছে সরসপুরের সনাতন দাসকে। আধার না করলে নিরাধার হয়ে যাবেন বেচারা। পরিবারের রেশন কার্ড লিংক অর্থাৎ যোগসূত্রহীন হয়ে যাবে। সে কি কম চাপের বিষয়!!!! শুকনো মরিচ বাটার সঙ্গে ধনেপাতা ও রসুন বেটে ওপরে নুন ছড়িয়ে তাই দিয়ে চারটি ভাত বাটিতে ভরে দিয়েছে রসিক বৈষ্ণবের পুত্রবধূ সরস্বতী। রেডিও ইস্টিশানের কাছেই ঐ বাসগুলোর ডেরা। কত লাল লাল লংকা আর লালচে চালের রসালো খাবারের বাটি তাদের পেটে করে অগস্ত্য যাত্রা করে এই কাছাড়ির মাঠে!

    দু-দুটো বিরিজ হয়েছে সদরঘাটে। বড় সাইজের বাসের সংখ্যা কমিয়ে বেড়েছে অটো, ট্যাক্সি, ট্র্যাভেলার। মুঠিকয়েক লোক আসেন এক একটি গাড়ি চেপে। গাড়িগুলোর ছোট পেটে তেমন ধরে না মণিপুর রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা গাঁয়ের মনীন্দ্র দাস, সন্তোষ দেব, রালকাপপুং পুই, টি. খগেন, মোগলাই শাইফুল মিয়ার খাবারের কৌটো। ওসব ওদের ঝোলায় করেই পাড়ি দেয় দেশান্তরে। জিরিঘাট, ফুলেরতল, বিন্নাকান্দি, পয়লাপুল, চিরিপুল, বাঁশকান্দি, বনতারাপুর, কাশীপুর। এদিকে নদীর এপারের বাদ্রী। প্রায় সবার ক্ষেতেই এখন আক্ষরিক অর্থে 'কলাটা মূলোটা'! সার নেই সাদা মূলোয়। ইউরিয়া, সুপার ফসফেট, ক্ষার, খৈল দিয়ে চনমনে কপি ক্ষেত। বেগুন, সীম, পানিলাউ, টমেটো। সূয্যি ওঠার আগে একপ্রস্থ সার, জল দিয়ে তৈরি শাইফুল মিয়া। শীতের ঈষৎ রুক্ষতায় শালিধানের চিড়ের মত শাইল কলাগুলো ভেতরে ভেতরে খানিক আড়ষ্ট। গুটলি ধরে আছে। আঁখের রস জাল দিয়ে কিছুটা খাদ মিশিয়ে গুড় করেছে মনীন্দ্রর স্ত্রী। উন্নয়ন ভবনের সামনের গলির শেষ মাথায় গার্লস ইস্কুলের পেছনের গেটের কাছে বসে নিরিবিলিতে খুলেছেন চিড়ে কলা গুড়ের পুটুলি।

    আসলে বছরের শুরুতে বিশের বিষ আর একুশের ক্রুশ গলায় নিয়েও ভাবতে ভালো লাগছে আমাদের আজও অনেক কিছুই আছে। নেই রাজ্যের নই বাসিন্দা। আছে প্রকৃতির উজাড় করা ভালোবাসা। প্রকৃতির চিন্ময়ীরূপা জগজ্জননীরা আজও ভাড়ার ভরে রাখেন। উপুড় করে দেন। আগলে রাখেন। বেনোজলে ভাসমান নয়। বহমান সময়ের অবিরাম প্রবহমানতা শ্যাওলামোড়া পাথরে ধাক্কা খায়। আমরা হোঁচট খেতে খেতে সামলে নিই। কারণ............! আমাদের ত্রিবেণী সঙ্গমের আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ফেনিল উচ্ছ্বাস থেকে আগলে রাখতে, ঈশ্বরী পাটনীর দুমুঠো খাদ্যের সংস্থান করতে প্রকৃতি এখনও উদার। হৃদয় নিংড়ানো তার ভালোবাসার ডালি।

    একে গ্রহণ করতে শিখতে হবে। সামলে রাখতে, বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করতে হবে। তবেই বোধহয় সুস্থ পরিবেশ, সজীব সংসারে ঝিকমিক করবে কচি কচি ছানারা। ছানার তুলতুলে নরম মিষ্টি ভালোবাসাময় পৃথিবীর কামনায়!!!!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 68.184.245.97 | ০৫ জানুয়ারি ২০২২ ০৭:০১502494
  • খুব ভালো লাগলো পড়তে।
  • Bishnupada Das | ০৮ জানুয়ারি ২০২২ ২১:০৯502552
  • খুব ভালো লাগলো 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন