• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ  বুলবুলভাজা

  • রাজা বিশ্বাসের চেতনা

    মৌসুমী বিলকিস
    আলোচনা | বিবিধ | ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৭৩০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • রাজার ছিল রাজনীতি। এমনভাবেই শুরু হওয়া উচিত রাজা বিশ্বাসের কথা লেখা, হয়ত। রাজা কি ছিল? অতীতকালবাচক এই 'ছিল' ক্রিয়াপদ ব্যবহার বাস্তবোচিত বটে, কিন্তু স্বপ্নচালিত নয়। রাজার রাজনীতি ছিল স্বপ্নচালিত এক যৌক্তিকতার পথযাত্রার। গত ৩০ নভেম্বর অকালপ্রয়াণ হয়েছে রাজার। সংবাদকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, গণসাংস্কৃতিক কর্মী রাজা বিশ্বাস সর্বার্থে কর্মী হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন, নেতা নন। তাঁর প্রয়াণের পর আয়োজিত স্মরণসভায় মৌসুমী বিলকিস একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ভাষণ, স্মৃতিচারণ নয়। মৌসুমী, রাজার সহযোদ্ধা, কমরেড। মৌসুমী রাজার স্ত্রী-ও বটে। মৌসুমী বিলকিসের সেই ভাষণ অবিকল প্রকাশ করা প্রয়োজন মনে করছে গুরুচন্ডালি। রাজার জন্মদিন, ২৮ ডিসেম্বর সে প্রকাশের উপযুক্ততম দিন।

    ‘লেখক-সমাজ সম্পর্ক’ বিষয়ে আফ্রিকান সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবে একটি বক্তব্যে প্রথমেই বলেছিলেন ‘মৌখিক ঐতিহ্য থেকে সাহিত্য লিখিতরূপে বিবর্তিত হওয়ার অন্যতম একটি ফলাফল হল লেখার ওপর লেখকের স্বত্ব। আদিম কথক আগুনের চারপাশে বসে শ্রোতাদের যে গল্প শোনাত, মুখনিঃসৃত হবার পর সেই গল্পের ওপর তার আর কোনও অধিকার থাকত না। কিন্তু সেই কথকের উত্তরসূরী আজকের লেখক যখন টেবিলে বসে গল্প লেখেন তখন সেই গল্প হয়ে যায় তাঁরই ব্যক্তিগত সম্পত্তি।’

    চিনুয়া আচেবে দেখিয়েছিলেন লেখকের স্বত্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠছে। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই আকাঙ্ক্ষার মূল নিহিত রয়েছে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য চর্চার মধ্যে।’

    আফ্রিকার ইগবোল্যান্ড, যেখানে ইগবো সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষেরা বসবাস করেন, সেই ভূখণ্ডের কোনও কোনও অঞ্চলে ‘ওমবারি’ নামক এক শিল্পের কথা এই বক্তব্যেই চিনুয়া আচেবে উল্লেখ করেছেন। সাধারণত ভূমি দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত হয় এই শিল্প। মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর ধরে ওই গোষ্ঠীর নির্বাচিত কয়েকজন সদস্য নিভৃত এক স্থানে বসে চিত্রকলা ও ভাস্কর্য দিয়ে জমকালো এক শিল্প রচনা করেন। নির্বাচিত ওই কয়েকজন গোষ্ঠী সদস্য, যাঁদের বলা হয় ওনডিমবে, তাঁরা শিল্পকর্মটি নির্মাণের যাবতীয় কৃতিত্ব সচেতনভাবে অস্বীকার করতে থাকেন। তাঁরা ভয় পান যে মুখ ফস্কে বেরিয়ে না যায় ‘এই জিনিসটা আমি বানিয়েছি।’ বরং তাঁরা মনে করেন এই শিল্পকর্মটি দেবতার সম্পদ এবং এর ওপর অধিকার আছে শুধুমাত্র তাঁদের গোষ্ঠীর।

    যদিও ‘ওমবারি’ শিল্পের পিছনে থাকে দেবতার প্রতি ভয়-ভক্তি এবং যৌথ জীবনের প্রতি মানুষের দায়দায়িত্ব, কিন্তু নিজের নির্মাণ এইরকম সচেতনভাবে অস্বীকার করার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ করতে অনুরোধ করি।

    চিনুয়া আচেবের এই লেখা আমি রাজা বিশ্বাসকে শুনিয়েছি। শুনতে শুনতে ভীষণ আশ্চর্য হন রাজা এবং সম্পূর্ণ বইটি কপি করে নেন যাতে অন্যান্য লেখকের নানান বিষয়ে প্রবন্ধ আছে। অনেক বন্ধু হয়তো মনে করতে পারবেন এই বইটির আরও কপি করে রাজা অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে বন্ধুদের চিন্তা উস্কে দিতে চেয়েছেন।

    চিনুয়া আচেবের ‘লেখক-সমাজ সম্পর্ক’ বিষয়ে এই লেখাটির কথা এত বিস্তারিত বলার কারণ রাজা বিশ্বাস নিজের জীবনেও এই আদর্শ অনুসরণ করতে চেয়েছেন। এই ‘ওমবারি’ শিল্পের কথা রাজা যখন জানতে পারেন তখনও ‘জনগণমন’ গণ সাংস্কৃতিক মঞ্চ গড়ে ওঠেনি এবং পরে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম ‘জনগণমন’ মঞ্চ থেকে যে সব গান নির্মাণ হয়েছিল তার একটিতেও কোনও ব্যক্তির কৃতিত্ব তুলে ধরার চেষ্টা না করে প্রত্যেকটি গানের গড়ে ওঠার পিছনে গোষ্ঠীর কৃতিত্ব বজায় রাখা হয়েছে।

    পরে ‘জনগণমন’ গণ সাংস্কৃতিক মঞ্চের রাজার সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি এই মঞ্চের কাজকর্ম বিষয়ে ব্যক্তির কৃতিত্ব দাবি করার ক্ষেত্রে রাজার তীব্র অনীহার কথা।

    নিজের লেখা বা অন্যদের লেখা গান বা নাটক বিষয়ে এমনকি তাঁর অলিখিত বক্তব্যগুলোর বিষয়েও দেখা গেছে সমস্ত শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারার বিষয়ে রাজার আগ্রহ। এই সাংস্কৃতিক মঞ্চের আওতায় যত গান রচিত-সুরারোপিত ও নির্মিত হয়েছে তার সবগুলির কথা-সুর-যন্ত্রানুসঙ্গে জনগণের খুব কাছের হয়ে ওঠার বাসনা লক্ষ করা গেছে। গান নির্মাণের সময়গুলি জুড়ে রাজা বারে বারেই মনে করিয়েছেন গানের সুর বা কথা এমন হবে যাতে কায়িক পরিশ্রম করতে করতেও একজন মানুষ আনমনে গেয়ে উঠতে পারেন। সেকথা মাথায় রেখেই হয়তো অতি জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় গানের সুরের আদলে গড়ে উঠেছে ‘জনগণমন’-র গানগুলি।

    অর্থাৎ বলতে চাইছি ‘কলাকৈবল্যবাদ’ বা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ সৃষ্টির মধ্যে রাজা বিশ্বাস কখনও জনগণের মঙ্গল দেখেননি।

    আমরা এইসব আলোচনার মধ্যে ডুবে গিয়ে কখনও কখনও এই কূট প্রশ্নেও উপনীত হয়েছি যে মানুষের জীবনের প্রবল অনিশ্চয়তার মধ্যে তার মূলগত অধিকার বা দৈনন্দিন যাপনে শিল্পের কি আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে? তখনই ‘দ্য নেসেসিটি অফ আর্ট’ গ্রন্থের লেখক আর্নেস্ট ফিশার আমাদের মাঝখানে এসে মনে করিয়ে দিয়েছেন মানুষের জীবনের অন্যতম প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে বিনোদন অর্থাৎ শিল্প-সাহিত্য-গান-সিনেমা-নাটক। তখন মনে পড়েছে শ্রম সংগীতের কথা। ভীষণ ভারি ইলেকট্রিক পোল পুঁততে পুঁততে শ্রমিকেরা গেয়ে উঠেছেন গান। সে গানের ভাষা আমাদের মান্য সমাজের কানে খুবই অশ্লীল হতে বাধ্য। মনে পড়েছে মুসলিম মেয়েদের বেদনা, হই-হুল্লোড় আর মজার বিয়ের গান। মনে পড়েছে ‘কাহানি’ বা গল্প বলা ও শোনার অবসর খুঁজে নিত ও নেয় মানুষেরা। মনে পড়েছে, ‘কী জাদু বাংলা গানে/ গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে’। মনে পড়েছে শিকার ও আহার পর্ব শেষ করে আলতামিরার গুহায় ছবি আঁকার অবসর কেন খুঁজে নিয়েছিলেন আদিম মানুষেরা।





    আরও একটি বিষয় অবাক হয়ে লক্ষ করার মতো, রাজা বা তাঁর সতীর্থরা আধুনিক মানুষের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের কথা মাথায় রেখেও নিজেদের কাজের কোনও ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং করার দিকে এগোননি – এই বিষয়টি লোকশিল্পের মৌখিক চলমান ধারার ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। একথা সবাই জানেন যে লোক শিল্পে রচয়িতা-সুরকার-কাহিনিকার-ভাস্কর-চিত্রকর কারোরই কোনও নাম থাকে না নিজের সৃষ্টিতে। তবে চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী ইত্যাদিতে পদকর্তার নাম পাওয়া যায়। যদিও মনে রাখতে হবে এগুলি হাতে লেখা পুঁথি এবং এগুলির পিছনে একটা গোপন জীবন চর্চা, কাব্যধারা বা ভক্তি আন্দোলন ক্রিয়াশীল। গুরু, রাজা-বাদশার দরবারের কবি বা ধর্মীয় আন্দোলনের আওতায় ব্যক্তি মানুষও সম্ভবত নিজের স্বাক্ষর রেখে যেতে চাইছিলেন।

    যাই হোক, গানগুলি নির্মিত হওয়ার অন্তর্গত কাহিনি ‘জনগণমন’ গণ সাংস্কৃতিক মঞ্চের রাজা বিশ্বাসের সতীর্থরা আরও বিস্তারিত আলোকপাত করতে পারবেন।

    নিজেদের চিন্তা-চেতনা ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য অবশ্যই তাত্ত্বিক আলোচনাতেও তাঁর আগ্রহ দেখি, কিন্তু সেটা খুব সীমিত পরিসরে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে এবং আমার সঙ্গেই।

    রাজার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কবি নজরুল ইসলামের ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতাটির কাছে বার বার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। এই মঞ্চে সম্পূর্ণ কবিতাটি পড়ার মতো অবসর নেই। কিন্তু রাজার কাজ, নিপীড়িত জনগণের জন্য রাজার বেদনা বুঝতে চেয়ে কবিতাটির অংশ বিশেষ উল্লেখ করছি,

    ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো
    ভাত, একটু নুন,
    বেলা বয়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে
    তার জ্বলে আগুন।
    কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
    স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
    কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও
    আছ কি? কালি ও চুন
    কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায়
    এই শিশুর খুন?

    আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া
    বার্তাকু এনেছি খাস!
    কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
    এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
    টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
    মা’র বুক হতে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি,
    বাঘ, খাও হে ঘাস!
    হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে
    ঘরে ছেলের লাশ!

    বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা
    এই বুকে!
    দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা
    আসে কই মুখে।
    রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা, তাই লিখে যাই এ রক্ত লেখা,
    বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু,
    বড় দুখে!

    পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের
    হুজুগ কেটে গেলে,
    মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে
    সোনার শত ছেলে।
    প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ
    কোটি মুখের গ্রাস,
    যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!’

    অমর কাব্য লিখবেন রবীন্দ্রনাথ, লিখবেন বাংলার আরও সোনার ছেলেরা। অমর কাব্য কীভাবে লিখতে হয় জানেন নজরুল। কিন্তু ‘সইতে পারি না, বড় জ্বালা’- এই জ্বালা তিনি ধরে রাখতে চেয়েছেন তাঁর কাজের মধ্যে। জনগণের কাজে যেন লাগে সেরকম কাব্য লিখতে চেয়েছেন নজরুল। মানুষের ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছনোই ছিল কবির প্রধান উদ্দেশ্য। কবি কিন্তু নিজের শৈল্পিক কৃতিত্বের কথা ভাবছেন না।




    লক্ষ করার বিষয়, কবি নজরুলের এই মূল সুর রাজা বিশ্বাসের সমস্ত লেখার মধ্যে, সমস্ত কাজের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। ‘আমি’ নই, ‘আমরা’ নই, ‘অপর’-এই উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছেন রাজা, এই ‘আমি’, ‘আমরা’-সর্বস্ব আবহাওয়ায় ‘অপর’-এ পৌঁছতে পারাটা একেবারেই সহজ কথা নয়।

    এই প্রসঙ্গে আরও একবার মনে করিয়ে দিতে চাই, রাজা বিশ্বাস নিজের কাজকে নিজের বলে কখনও ভাবেন না চিনুয়া আচেবের সেই ‘ওমবারি’ শিল্পের ওনডিমবে শিল্পীদের মতোই, যারা নিজের সৃষ্টি থেকে সচেতনভাবে দূরত্ব বজায় রাখেন এবং নিজেদের ব্যক্তি ইগো সযত্নে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

    কিন্তু এই যৌথ চেতনায় পৌঁছনোর চেষ্টার পিছনেও কিছু কথা থেকেই যায়। আমাদের এই সমাজ-রাজনীতি ও অর্থনীতি কাঠামোর একজন সদস্য হয়ে ব্যক্তির অধিকার নিয়েও রাজা বিশ্বাস যথেষ্ট সচেতন। আদিম কৌম জীবন বা বর্তমানের এথনিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যৌথ চেতনা সমৃদ্ধ জীবন যতটা কার্যকর হতে পারে আমাদের সমাজ-অর্থনৈতিক কাঠামোয় এত স্বার্থান্বেষী মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ‘অপর’-এ পৌঁছনোর মহড়া কি আদৌ কার্যকর? এ বিষয়ে নানান উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি আমাদের দুজনের নিভৃত বা বন্ধুদের সঙ্গে যৌথ আলাপে। কিন্তু উত্তর সহজ নয়। কারণ সমাজের মূল কাঠামো বদলের সাধ থাকলেও সাধ্য অবধি পৌঁছানো একেবারেই সহজ নয়। প্রচলিত পচা ধ্যান ধারণা আর দুর্দণ্ড প্রতাপ ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের সাধ পূরণ করতে গেলে কী হতে পারে আমরা পদে পদে টের পাচ্ছি।

    ব্যক্তি ও যৌথ চেতনার অন্দরে ভীষণভাবে সক্রিয় লিঙ্গ ও ক্ষমতার বৈষম্য। যে কারণে অতি ডানপন্থী দল বা গোষ্ঠী যেসব আবেগ কাজে লাগিয়ে মানুষকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে সেই একই প্রচলিত পচা আবেগ ‘প্রগতিশীল’ বলে পরিচিত কিছু মানুষ বা গোষ্ঠী কখনও কখনও কাজে লাগায় এবং সমস্ত প্রচলিত চিন্তা-চেতনা, জীবন যাপনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নবীনদের সংগঠিত করার চেষ্টা করে, তখন সত্যি বড় বেদনা জাগে। তখন মনে হয় চে গেভারার মোটর সাইকেল কলকাতায় এসে একেবারে জং ধরে গেছে এবং সেই যানটির সচল হয়ে ওঠার আর কোনও সম্ভাবনাই নেই। এইসব মানুষগুলোকে আধমরা ভেবে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই বহু প্রচলিত চরণ চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে,
    ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা; আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’

    এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, সিমোন দ্য বোভেয়ার বা বেগম রোকেয়া বা হুমায়ুন আজাদের কথা। জীবনের প্রতি পদে আমরা এখনও বুঝতে পারি তাঁদের স্বপ্ন বা মাও সে তুঙের অর্ধেক আকাশ একটা ঘন অভেদ্য পর্দার আড়ালে চালান করে দেওয়ার চেষ্টা নিরন্তর হয়ে চলেছে। পাশাপাশি ‘এলজিবিটিকিউ’ কমিউনিটির সদস্যদের আজও আমরা সমাজের অংশ, সমান অধিকারের অংশ বলে মনে করতে পারছি না। এইসব লিঙ্গ বৈষম্যের পাশাপাশি জাতপাত, ধর্ম, অর্থনৈতিক শ্রেণি বৈষম্য এখনও আমাদের মজ্জায় গেড়ে বসে আছে।

    আমরা যখন কবিতায় পড়ি ‘কলম্বাসের মতোই বা কেউ পৌঁছে যাব নতুন দেশ’, তখন সেই নতুন দেশের আদি বাসিন্দাদের দুর্দশার কথা মনে রাখি না, যাদের রক্তে হাত রাঙিয়েছিলেন কলম্বাস নামের ব্যক্তি ও তাঁর সঙ্গের অভিযাত্রী দল। হাওয়ার্ড জিন যখন তাঁর প্রবন্ধে কলম্বাসকে ‘অন্য চোখে’ দেখিয়ে দেন তখন আমরা শিউরে উঠি। লাতিন আমেরিকার রক্তাক্ত ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কলম্বাসকে হিরো ভাবার অনুভূতিটি তখন বড় ম্লান হয়ে ওঠে।

    ‘পূর্ব কলিকাতা বিদূষক নাট্যমণ্ডলী’র প্রযোজনায় রাজা বিশ্বাসের লেখা শেষতম নাটক ‘কেন পল্টু জোরে ছোটে?’ –তে ষাটের দশকের খাদ্য আন্দোলন থেকে সাম্প্রতিক করোনাকালের কথা এসেছে। এই নাটকে তিনি দেখিয়েছেন ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’, অর্থাৎ রাজনৈতিক পট পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবন কী ভাবে প্রভাবিত করে অথচ নীচুতলার মানুষ থেকে যায় একই নিপীড়ন আর শোষণের চাপের মধ্যে।

    এই পর্যবেক্ষণের ভেতর এসে পড়েছে প্রতিটি দশকে, প্রতিটি সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা পরিবারের প্রয়োজনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজা বিশ্বাস এই নাটকে খেয়াল করতে ভোলেননি কী ভাবে সমাজ বা পরিবারের দুঃসময়ে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ সমস্ত জ্ঞানচর্চার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় তাকে। অথচ বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি বিশ্ব সুন্দরী হয়ে উঠবে স্বপ্ন দেখেন মা।
    এই নাটকে দেখছি, পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর প্রয়োজনে মেয়েদের কাজে লাগানো হচ্ছে যেখানে মেয়েটি নিজে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাচ্ছে না বা পাচ্ছে। কিন্তু তার পায়ের শেকলের নিয়ন্ত্রণ থাকছে পিতৃতন্ত্রের হাতে। আমরা যখন ‘তৃতীয় লিঙ্গ’-র কথাও আজ নানাভাবে জানার সুযোগ পাই তখনও পিতৃতন্ত্রের এই কাঠামোকেই দেখতে পাই।

    এ প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দিতে চাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইওরোপের কথা যখন ঘরে ঘরে পুরুষরা যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত বা যুদ্ধের অভিঘাতে শারীরিক কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, তখন বাধ্য হয়ে পরিবারের প্রয়োজনে দলে দলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে মহিলারা অর্থনৈতিক কাজে অংশ নিচ্ছেন। প্রত্যেক দেশে, প্রত্যেক কালের গভীর বেদনা এভাবেই ধারণ করে আছেন মেয়েরাই।

    অথচ সমসময়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে তৃতীয় বিশ্ব বা প্রথম বিশ্বের কোট আনকোট ‘প্রথম লিঙ্গ’-র সম সারিতে বৈষম্যহীন অধিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কি অন্যান্য লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষেরা?

    এইসব চেতনা রাজা বিশ্বাসের শেষতম নাটকে ছড়িয়ে আছে, লক্ষ করবেন বন্ধুরা।

    এই নাটকে রাজা বিশ্বাস খুব সচেতনভাবে চরিত্রগুলি নির্বাচন করেছেন। পল্টু, বশির, কুলবীর তিন ধর্মের তিন বন্ধুর জীবন কী ভাবে ছত্রখান হয়ে যেতে থাকে, কীভাবে তারা পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়ে উন্মত্ত জনতার সামনে বুক পেতে দেয়। নাটকের কাহিনির মধ্যে এসেছে বন্ধুত্বের সম্পর্কের পাশাপাশি বিবাহ সম্পর্ক ভিন্ন ধর্ম পরিচয়ের মানুষদের কত কাছে নিয়ে আসে। রাজা ব্যক্তি জীবনেও এই সত্য উপলব্ধি করেছেন। এই নাটকের ‘গুজরাট টেলার্স’ আমার গ্রামের এক দোকান যেখানে রাজাকে একাধিক বার নিয়ে গেছি এবং দোকানের মালিকের সত্যি গল্পটি তিনি নাটকে ব্যবহার করেছেন।
    এই নাটকের আরও অনেক প্রসঙ্গ বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু নাটকটির বিষয়ে সব কথা বলার অবসর এখানে নেই। শুধু বলতে চাই রাজার সারা জীবনের সঞ্চয় ও অভিজ্ঞতার ছাপ এই নাটকের প্রতিটি সংলাপে, প্রতিটি দৃশ্যে।

    ‘জনগণমন’-র প্রযোজনায় রাজার লেখা ‘ইঁদুরকল’ নাটকের কথাও বলতে ইচ্ছে করে। এই নাটকে তিনি দেখিয়েছেন প্রতিবেশীর পাশে বিপদের সময় না দাঁড়ালে নিজেকেও বিপদে পড়তে হয়। একটি লোকগল্প থেকে এই নাটকের উপাদান তিনি সংগ্রহ করেছেন। যতদূর জানি, এর আগেও অন্যান্য নাটকে লোকগল্পের উপাদান ব্যবহার করলেও লোকগল্প নির্ভর সম্পূর্ণ নাটক এই প্রথম তিনি লিখলেন।
    রাজার অন্যান্য নাটকের বিস্তারিত আলোচনা নিশ্চয় ‘বিদূষক নাট্যমণ্ডলী’ এবং অন্যান্য দলের রাজার নাট্য-বন্ধুরা করবেন। তাই এখানেই এ আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখলাম।

    এক সময় আমি গ্রাম থেকে কিছু লোকগল্প সংগ্রহ করি। তার কিছু গল্প আশ্চর্য ও মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। এই গল্পগুলো প্রথম শোনাই রাজাকেই। তার মধ্যে একটি গল্পে আছে প্রবল অত্যাচারী রাজাকে দুর্বল প্রজা কী ভাবে ইমাজিনেশন, ফ্যান্টাসি মিশিয়ে নন-ভায়োলেন্ট উপায়ে দমন করছে। এ গল্প তারপর আমরা বার বার শুনেছি বা পরস্পরকে আবার শুনিয়েছি। লোকগল্প সংগ্রহ পড়তে পড়তে বা অন্য রকম কিছু পেলেই পড়তে দিয়েছি বা শুনিয়েছি রাজাকে। রাজাও নতুন চিন্তা-ভাবনার কিছু পড়লে আমার জন্যও নিয়ে এসেছেন সেই বই বা প্রবন্ধ।

    আমরা হয়তো এভাবেই নিজেদের ও বন্ধুদের সঙ্গে নতুন চিন্তা ভাগ করে নিয়ে প্রয়োজনহীন কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় ‘উস্‌কাঠির’ মতো পরস্পরের যাপনে জড়িয়ে থেকেছি। আর আমাদের ছোট ছোট নানান বৃত্ত গড়ে উঠেছে। কখনও চাওয়ালা, কখনও সব্জিওয়ালী, কখনও গৃহকর্মী, কখনও আয়া, কখনও বা রিক্সা চালক, শিক্ষার্থী বা কর্পোরেট মানুষদের সঙ্গে। সে জন্যই বোধহয় মৃত রাজার চারপাশ ভদ্র সমাজের বন্ধুরা যখন ঘিরে থাকেন তখন এক প্রান্তিক মহিলা, যিনি মনে হল রাস্তা ঝাট দিতে দিতে ছুটে এসেছেন, তিনিও বড় বেদনা মাখিয়ে একটি ছোট্ট মালা বিছিয়ে দেন রাজার শরীরে, তারপর ভদ্র লোকদের ভীড়ের ওপারে হারিয়ে যান। আর সেই দৃশ্য আমরা কেউ কেউ দেখে ফেলি।

    এসব কথা এখন থাক। বরং আমাদের সমস্ত নবীন সতীর্থদের বলতে চাই, আপনারা সমস্ত কিছু নিয়ে প্রশ্ন করতে শিখুন। সঠিক প্রশ্ন করতে গেলেও প্রচলিত কাঠামোর বাইরে বেরিয়ে নিজেদের তৈরি করে নিতে হয়, নিরন্তর চালাতে হয় প্রশ্ন করার প্রস্তুতি পর্ব। রাজার কাজ, রাজার আদর্শ ইত্যাদি কথাগুলো অনর্থক, যদি না প্রতিদিনের যাপনের মধ্যে একটা সচেতন চিন্তার স্রোত আমরা বইয়ে দিতে পারি। কারণ রাজা বিশ্বাস কখনও নিজের আদর্শের কোনও ব্র্যান্ড তৈরি করতে চাননি। নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখতে চাননি। চায়লে তিনি নিজের লেখা নিজেই বা প্রকাশক বন্ধুদের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন। ব্যক্তিগত ইগো যা-ই থাক তাঁর সমষ্ঠী চেতনা থেকেই তিনি নিজের কাজ এককভাবে তুলে ধরতে কখনও আগ্রহী হননি।

    পরিশেষে আরও একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, রাজার ব্যক্তি জীবনে যা কিছু নায়কসুলভ থাক না কেন কাজের জায়গায় এই বিষয়টি রাজা সব সময় এড়িয়ে গেছেন। তাঁর এই প্রবণতার কথা মনে রেখে বন্ধুদের কাছে অনুরোধ, তাকে হিরো বানানোর চেষ্টা না করাই ভাল। তিনিও অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতোই দোষে-গুণে, আনন্দ-বেদনায় জারিত একজন মানুষ। তাঁর সম্পর্কে কিছু করার বা ভাবার আগে আশা করি এই দিকটি অবশ্যই খেয়াল রাখবেন বন্ধুরা।

    এই প্রসঙ্গে বলতে চাই, ‘প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা ২০১৯’-এ গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক-এর বক্তব্যের বিষয় ছিল ‘চিন্তার দুর্দশা’। এই বক্তব্যে তিনি প্রথমেই মন্তব্য করেছেন, ‘চিন্তার দুর্দশায় জগৎ আক্রান্ত আজ। এদিকে ওদিকে নিপাতন আছে অবশ্যই। কিন্তু তাদের সংখ্যা লঘু।’ আমাদের ‘চিন্তার ঝিমুনি’ কী ভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলার অন্তরায় হয়ে ওঠে উল্লেখ করেছেন তাও। তিনি ২০০৭ সালের ১৪ নভেম্বরে কলকাতার রাস্তায় নেতাবিহীন দীর্ঘ মিছিল উল্লেখ করে বলছেন, ‘…সামগ্রিক উচ্ছ্বাসে যে চিন্তার দুর্দশা দূর হয় না, তা আবার প্রমাণ হল। কিন্তু উচ্ছ্বাস ও ধিক্কারেরও ভূমিকা আছে দুর্দশা দূরের চিন্তায়।’ তিনি আরও বলছেন, ‘মানুষ এবং উচ্চস্তরের প্রাণি, প্রাচীন অর্থে প্রজা, যা দরকার তার থেকে বেশি তৈরি করতে পারে। এই আমাদের জীবগোষ্ঠীর বস্তুবাদী সংজ্ঞা- প্রয়োজন ও নির্মাণ-ক্ষমতার তফাৎ। সেই তফাৎ থেকে অনেককিছু বেরোয়, শিল্পকলা, প্রেম, মৃতের স্মৃতি পালন ইত্যাদি এবং পুঁজিও।’

    গায়ত্রীর এইসব বক্তব্য নিয়ে আমরাও মেতে উঠেছি আলোচনায়। মৃতের স্মৃতি পালনের ভেতর কি নেই ঈশ্বর বিশ্বাসের মতো প্রাচীন কোনও অনুভূতি? তাহলে এর বিকল্পটি ঠিক কি? বিকল্প কি থাকতেই হবে? গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক-এর এই লেখা রাজাকে পড়ে শোনাতে শোনাতে এরকম কত আলোচনায় সন্ধ্যা গড়িয়েছে গভীর রাতের দিকে।

    এসব কথা মনে পড়ছে খুব।

    মনে পড়ছে রাজার নিথর দেহ যেদিন তাঁর বাড়ির নীচে শায়িত সেদিনের আরেক ঘটনা। রাজার বড় ভাইপো রানা ও ভাইপো-বউ মুনমুনের ছোট্ট মেয়ে গিনি শোকাক্রান্ত মানুষজনের মধ্যে খেলার ছলে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। গিনির শরীরী ভঙ্গিতে শোকের চিহ্ন মাত্র নেই। ছোট্ট গিনির জীবনের খুব কাছের মানুষ যাকে সে রাজা বলেই ডাকে, তাঁর প্রথম মৃত্যু। ওর শরীরী ভঙ্গি দেখে খুব আশ্চর্য হলাম। কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। আমার মুখে মাস্ক থাকায় কিছুক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জানতে চাইলো,

    “কে? মৌসুমী?”
    মাথা নেড়ে সায় দিলাম। সান্ত্বনা দেওয়ার কণ্ঠে বললো,
    “তুমি কেঁদো না। রাজা কিন্তু ওপর থেকে সব দেখছে। খুব কষ্ট পাবে।”
    কথাগুলো বলেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আবার নাচতে নাচতে চলে গেল।
    এখনও গিনি বড়দের মতো বুঝতে শেখেনি। ওর মনে এখনও ছাপ ফেলেনি সমাজ-সংস্কৃতির কাঠামো। মৃতের জন্য শোক করতে হয়- এখনও শেখেনি সে। ও শুধু বড়দের কাছ থেকে জেনেছে মৃতেরা ওপর থেকে সব দেখে।

    এই প্রথম প্রবল আশ্চর্য হয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, মৃতের জন্য শোকও আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির গড়ে তোলা অনুভব নয় কি? গভীর শোকের মধ্যেও স্বতন্ত্র এক দৃষ্টান্ত হয়ে আমার ভেতর প্রশ্ন শানিয়ে দিল ছোট্ট গিনি।

    প্রিয় বন্ধুরা, সেই স্মৃতি চর্চায় ফিরে যেতে যেতে মনে করে নেওয়া ভাল, রাজা বিশ্বাস নতুন কোনও ভাবনা বা আদর্শ উদ্ভাবন করেননি। তিনি বহু যুগের ভিন্ন মত, ভিন্ন চর্চা ও জীবনবোধগুলো সঙ্গী করে সতীর্থদের সঙ্গে এবং ব্যক্তি জীবনেও সেসব অনুসরণ ও চর্চা করতে চেয়েছেন। নানান বাধা, নানান ত্রুটি। সংশোধন করতে করতে, সঠিক রাস্তা সন্ধান করতে করতে যৌথভাবে তিনি এগিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে সব সময় ক্ষমতাবানের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়েই সব কাজ করতে হয়। তিনি তা জানতেন, আপনার-আমার মতই।

    বন্ধুদের স্মরণ করতে বলব, কেন চার্বাক দর্শনের কোনও আসল নথিই আমাদের হাতে এসে পৌঁছায় না। কেনই বা আমাদের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায় প্রাচীন নগরী আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীনতম জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের সমস্ত পুঁথি, যাতে ছিল সাহিত্য-জ্যোতির্বিজ্ঞান-জ্যামিতি-অঙ্ক-চিকিৎসা শাস্ত্রের হাতে লেখা জড়ানো পুঁথি, পৃথিবীর প্রথম রিসার্চ ল্যাবরেটরিও। এই জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রে টলেমি-অ্যারিস্টটল-আর্কিমিডিস এইসব পণ্ডিত পুরুষদের মধ্যে ছিলেন একজন নারীও। নাম ছিল তাঁর হাইপেশিয়া (Hypatia)। তিনি অঙ্ক, দর্শন ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন পণ্ডিত। শেষ পর্যন্ত প্রবল পিতৃতন্ত্র ও ধর্মীয় গুরুরা নিজেদের নিয়ম রীতির আওতায় বাঁধতে ব্যর্থ হয়ে তাঁকে হত্যা করে। বিজ্ঞানী কার্ল সাগান তাঁর ‘কসমস’ গ্রন্থে আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন এই জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের কথা বলতে গিয়ে হাইপেশিয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু প্যাপিরাস পাতায় হাতে লেখা এইসব পটের মতো জড়ানো পুঁথির ভগ্নাংশ মাত্র আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। কার্ল সাগান আক্ষেপ করেছেন, এইসব গ্রন্থ ধ্বংস হওয়ার ফলে আমরা জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে গেছি।

    প্রশ্ন উঠতে পারে, রাজা বিশ্বাস প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এইসব কথা কেন উল্লেখ করছি? আমি মনে করি রাজা বিশ্বাস যুগের দাবি ছাড়া আলাদা কিছু নন।

    যদি চার্বাকের সব লেখা অবিকৃতভাবে আমাদের হাতে এসে পৌঁছত, যদি আলেকজান্দ্রিয়ার জ্ঞানচর্চার সমস্ত নথি ধ্বংস করা না হত, যদি হাইপেশিয়ার মতো পণ্ডিতকে নির্মমভাবে হত্যা করা না হত, যদি খনার জিভ আমরা কেটে না ফেলতাম, যদি রোহিত ভেমুলা আত্মহত্যা করতে বাধ্য না হতেন, যদি জামলো মকদম লঙ্কাখেতে কাজ করতে না গিয়ে ইশকুলে যেত, যদি ধ্বংস না হত বাবরি মসজিদ বা বামিয়ান বুদ্ধ, যদি দলিত-আদি জনজাতি-অরণ্যবাসী- সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষিত হত, যদি লিঙ্গবৈষম্য না থাকতো, যদি বাম-ডান সব পন্থীদেরই ভিন্ন মত শোনার পরিসর থাকতো, যদি সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য আকাশ-পাতাল না হত, তাহলে বিশ্বাস করুন বন্ধুরা, রাজা বিশ্বাসের আজকের এই স্মরণ সভা আয়োজন করার দরকার পড়ত না।

    কেননা উন্নত সমাজ ও পরিবার কাঠামোয় রাজা বিশ্বাসের অকালমৃত্যুর কোনও কারণই থাকত না বলে আমি বিশ্বাস করি এবং স্মরণ সভা নামক বিষয়টিকেও হয়তো আমরা অন্যভাবে দেখতে শিখতাম, এমনকি পরিবার নামক কাঠামোটি নিয়েও নতুন করে ভাবতে শিখতাম।

    তবে চোখ ধাঁধানো স্পট লাইটের নীচে রাজা বিশ্বাসকে না খোঁজাই ভাল। বরং খেয়াল করুন, ঝকঝকে শপিং মলের পিছনের বস্তিগুলোর অন্ধকার গলি। প্রথমে আমাদের শিখে নিতে হবে আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার পরও ঘন অন্ধকারে কীভাবে দেখতে হয়। আমরা ছোট থেকে বিজ্ঞানের বইয়ে পড়ে এসেছি কোনও বস্তুতে আলো পড়ে সেই আলো আমাদের চোখে আঘাত করলে তবেই আমরা নির্দিষ্ট বস্তুকে দেখতে পাই। এবার এই ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের ভেতর কী ভাবে দেখতে হয় – সেই প্র্যাকটিস করা যাক, বন্ধুরা।

    সমস্ত বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী, সহকর্মী, সহযোদ্ধাদের দুঃসময় ও সুসময়ে রাজা ও তাঁর পরিবারের পাশে থাকার জন্য রাজার পরিবারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাই।

    একেবারে শেষ লাইনে ফুট নোটের মতো জানিয়ে রাখি, আমি ও রাজা পরিবার বলতে বুঝেছি আমাদের জড়িয়ে থাকা সমস্ত মানুষকে। সেকথা এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবারও মনে পড়ে গেল।

  • বিভাগ : আলোচনা | ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৭৩০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Samarendra Biswas | ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:১৬101395
  • রাজা বিশ্বাস ও তার পৃথিবীর জন্যে রাখলাম চিরকালীন ভালোবাসা! 

  • aranya | 2601:84:4600:5410:db:f0c0:a2d9:4145 | ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:৩৭101398
  • মানুষের মত মানুষ 

  • Saikat Mistry | ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:৫৭101400
  • খুব দরকারী লেখাটি লিখেছেন। অভিনন্দন  

  • Ranjan Roy | ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ১০:৪৩101403
  • যন্ত্রণা, ভালোবাসা, প্রতিজ্ঞা।

  • Mehgebin Mohua | 37.111.216.250 | ২৯ ডিসেম্বর ২০২০ ০৮:৩৭101429
  • একজন জনদরদী ভালো মনের মানুষকে হারালাম আমরা

  • Sebanti Ghosh | 43.252.140.102 | ৩০ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:১৭101441
  • অসাধারণ একটি লেখা

  • শ্রীকুমার | 2409:4060:10d:6563::1f6e:f8ad | ৩০ ডিসেম্বর ২০২০ ১৮:৫৩101445
  • অসাধারণ বিশ্লেষণ

  • Somnath Roy | ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ ১১:২৬101448
  • খুব গুরুত্বপূর্ণ লেখা। ব্যক্তিগত শোকের জায়গা বাদ দিয়ে একটি সম্পূর্ণ জীবনের উপলব্ধিগুলি তুলে ধরা হয়েছে। এই লেখা পড়তে পড়তে রাজাবাবুর সঙ্গে পরিচিত না হতে পারার জন্য আফশোস যদিও হয়, তা স্বত্তেও তাঁর চিন্তাভাবনা ও কাজ সামগ্রিক ভাবে একটা সন্দর্ভ হয়ে ওঠে।


    কলাকৈবল্যবাদ এবং  রচনার উপর শিল্পীর স্বত্ব জাহির দুটোই যে পারস্পরিকভাবে জড়িয়ে থাকা, সেইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। আরও আলোচনা দাবি রাখে। কারণ এই জায়গা থেকে বেরোতে না পারলে আন্দোলনের উপকরণ হিসেবে শিল্পকে পাওয়া যায় না।
     লেখিকা খুব সুন্দরভাবে মৃতের জন্য শোকের অসারতা বুঝিয়েছেন। যা এই প্রবন্ধের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এপিকিউরিয়াস বলেছিলেন, যে নেই, তার দুঃখ কষ্টও নেই, তার জন্যে শোক কেন হবে? মৃতের জন্য শোক করা যাবে না, জীবিতের দুঃখ নিয়ে ভাবতে হবে, এইটা নোয়াখালিতে গান্ধিজিও বারবার বলেছিলেন। এই প্রসঙ্গ আমরা আজকাল বেশি আলোচনায় আনিনা। কিছুদিন আগে, গণ আন্দোলনের আরেক কর্মী, অভিষেক, কভিডে তাঁর মৃত্যুর আগে ফেসবুকে বারবার লিখছিলেন যে মৃত্যু তাঁর নিজের কাছেও শোকের নয়। মানুষ যেন তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর বেঁচে থাকার অর্জনগুলিকে উদযাপন করে, সেই আকাঙ্খা প্রকাশ করছিলেন। রাজা বাবুর জীবন দেখেও সেইটা মনে হল।


    আমরা এমন এক সময়ে আছি, যখন মৃত্যুভয়ে সকলে ঘরে দরজা এঁটে বসে থাকছি  আর জীবিত মানুষের বেঁচে থাকা আরও কঠিন করে তুলছে বাজার ও রাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে এইরকম কিছু জীবন নিয়ে আলোচনা খুব দরকারি।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন