• বুলবুলভাজা  আলোচনা  কৃষি  বুলবুলভাজা

  • কৃষি আইন: কংগ্রেস নেতা অভিষেক ব্যানার্জির সঙ্গে কথোপকথন

    বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত
    আলোচনা | কৃষি | ১৬ এপ্রিল ২০২১ | ৭১৪ বার পঠিত | ৩ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • (সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং এই লেখাটি প্রস্তুত করার সময় আমাদের জানা ছিলো না, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিধাননগর কেন্দ্রে জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাবেন। এখন জানতে পেরেছি, তাঁকে শুভেচ্ছা জানাই।)

    বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত: পাঠকদের অবগতির জন্য জানাই, তরুণ নেতা, কংগ্রেসের মুখপাত্র অভিষেক ব্যানার্জি প্রদেশ কংগ্রেসের সোস্যাল মিডিয়া সেলের চেয়ারম্যান। অভিষেক ব্যানার্জির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে কিছু পরিচয়ের সুযোগ ছিল। সেই সূত্রে আমরা তাঁকে রাজি করাতে পেরেছি মূলত কৃষক আন্দোলনের বিষয়ে কথা বলার জন্য।

    অভিষেক, আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই গুরুচন্ডালি ডট কম বলে যে ওয়েবসাইটটি রয়েছে, তার সম্পাদকদের কাছে আমরা এই প্রস্তাবটা নিয়ে গিয়েছিলাম যে কৃষক আন্দোলনের বিষয়ে একটা সাক্ষাৎকারের সিরিজ যদি করতে পারি। তাঁরা সাগ্রহে রাজি হয়েছেন।

    একটা বিষয় আমি জানি যে আপনার এ বিষয়ে পড়াশোনা আছে, আগ্রহ আছে, অভিজ্ঞতা আছে, যেটা আমাদের অনেকেরই নেই। রাজনীতির কারণে সরাসরি মানুষের মধ্যে মেশার অভিজ্ঞতা আছে, কৃষকের সঙ্গে মেশার অভিজ্ঞতা আছে যেটা আমার হয়তো নেই। রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটা আপনার জানা। মূলত সেইজন্যই আপনার সঙ্গে কথা বলা। আপনি যদি অনুমতি করেন শুরু করব।

    অভিষেক ব্যানার্জি: একদম, আমরা শুরু করব।

    বোধিসত্ত্ব: প্রথম কথা, কৃষি আইন এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার কৃষি আইন এনেছে। আইন আসার আগে যে আলোচনা হলে ভালো হত, সেই আলোচনা এখন চলছে।

    কৃষক একটা পক্ষ, সরকার আর-একটা পক্ষ। মানুষও এতে পক্ষ নিচ্ছেন আস্তে আস্তে, শুধুই যে কৃষকের সমস্যা এটা নয় এটা কেউ কেউ বুঝতে পারছেন, কেউ কেউ মনে করছেন — না, দূরত্ব বজায় রাখাই ভালো। কিন্তু তার আগে আমাকে বলুন আপনাদের অভিজ্ঞতায় সংসদীয় রাজনীতিতে আপনাদের এমন কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি না, যে এরকম ভাবে, বাস্তব অর্থে কোনো রকম আলোচনা না করে, কৃষি সংক্রান্ত, কৃষিজাত খাদ্যদ্রব্য বিপণন সংক্রান্ত, অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য সংক্রান্ত, বিদ্যুৎ আইন সংক্রান্ত এরকম বড়ো বড়ো বিলগুলিকে পার্লামেন্টে আনা হল, তাকে আইনে পরিণত করা হল, সেটা করতে গিয়ে আট জন সাংসদ বহিষ্কৃত হলেন, এই গোটা পদ্ধতিগত বিষয়টাকে আপনারা কংগ্রেস দল থেকে কীভাবে দেখছেন?

    অভিষেক ব্যানার্জি: আপনার প্রথম প্রশ্নটায় দুটো ভাগ, একটা একদম পদ্ধতিগত আর আর-একটা এটার উপজীব্যটা শুধুই কৃষকদের জন্য কি না, তো দ্বিতীয় প্রশ্নটা নিয়ে নিশ্চয়ই এর পরবর্তী আলোচনায় আসবে।

    বোধিসত্ত্ব: অবশ্যই।

    অভিষেক ব্যানার্জি: আমি এই মুহূর্তে পদ্ধতিগত দিকটার কথা বলি। আমাদের ভারতবর্ষের অনেক খামতির মধ্যেও যেটা অহংকারের জায়গা ছিল, সেটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্ক। এবং আমরা জানি আমাদের বলে দেওয়া হয়েছে সপ্তম সিডিউল অনুযায়ী রাজ্যের হাতে কোন‌টা, কেন্দ্রের হাতে কোনটা এবং কোনটা যৌথ তালিকার মধ্যে পড়ে। তো কৃষিটা হচ্ছে এমন একটা জিনিস যেটা রাজ্যের আওতায় ছিল। এবং প্রচুর বিতর্ক হলেও, নীতি সংক্রান্ত আলোচনার নানা পরিসর ছিল। এখন কি তার কিছু অবশিষ্ট দেখছেন? এটা আমি প্রথমেই উল্লেখ করে দিলাম। কেন করলাম, তার কারণ, আমি একটু আপনাকে সাল তামামিটা বলতে চাই।

    সরকার বার বার বলেছে — আমরা আলোচনা করেছি, কিন্তু সেই আলোচনার নথি দেখানোর কথা বলা হলে নথি দেখাতে পারেনি। ৫ জুন ২০২০, ওঁরা একটা অধ্যাদেশ জারি করেন। সময়টা মনে রাখবেন, ৫ জুন ২০২০, যখন সারা দেশে লকডাউন চলছে এবং সংসদ বন্ধ। তার পর ১৫ সেপ্টেম্বর লোকসভায় ধ্বনিভোটের মাধ্যমে এবং রাজ্যসভায় এটা পাস হয়। সেইদিন আমরা ভোটাভুটির দাবি করেছিলাম এবং সারা ভারতবর্ষ দেখেছিল। সংসদের সব চেয়ে বড়ো গরিমা হচ্ছে, সংসদ অনেক কিছুর সাক্ষী, আজ আমাদের রাজ্যের যিনি মুখ্যমন্ত্রী তিনি যখন সাংসদ ছিলেন, সংসদ তাঁর চাদর ছোড়ার সাক্ষী। আমরা সংসদের মধ্যে অনেক ন্যক্করজনক কাজ দেখেছি কিন্তু দিনের শেষে সংসদ আমাদের সবচেয়ে বড়ো আইনসভা। তার একটা গরিমা আছে। সেখানে এরকম গুরুত্বপূর্ণ আইন, ১৩০ কোটি মানুষ এর দ্বারা প্রভাবিত হবে, সেটা আলোচনার করার সময় আমরা পেলাম না, এত তাড়াহুড়ো? সংসদীয় রীতিনীতির কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি, গণতন্ত্রের সবথেকে লজ্জাজনক জিনিসগুলো যদি ভারতবর্ষের ইতিহাসে হয়ে থাকে তাহলে সেইদিন হয়েছিল যখন এই বিলটা পাস হয়। পদ্ধতিগতভাবে এরকম ঘটনা ভারতবর্ষের ইতিহাসে আসেনি। ভারতবর্ষের সংবিধান বলে— রাইট টু ডিসেন্ট। আমার সহমত না হওয়ার অধিকার আছে এবং সেটা আমার গণতন্ত্রের প্রাথমিক অধিকার এবং সেটা আমার সংসদেই সেই জিনিসটা আমি সুযোগ দিলাম না আমার জনপ্রতিনিধিদের। আর কী আমরা আশা করতে পারি?

    বোধিসত্ত্ব: আর-একটা বিষয় আমি আপনার কাছে আনছি সেটা হচ্ছে যে, সাধারণভাবে বলা হচ্ছে এটা কৃষকদের উপকার করার জন্য করা হচ্ছে। কৃষকদের একটা পুরোনো ব্যবস্থার থেকে নতুন ব্যবস্থায় নিয়ে আসার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। ইত্যাদি বলা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের পার্টি অফ গভর্নেন্স হিসেবে কংগ্রেস দল পরিচিত। সত্যি কথা বলতে কী ৮০-র দশকের একদম শেষের দিকে এসে এমনকি ৯০-র একদম মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রথম কংগ্রেসকে বুঝতে আরম্ভ করতে হয় যে নানা রকম শরিকি দলের সঙ্গে তাকে ফ্রন্ট তৈরি করে তাকে কাজ করতে হবে তার আগে তার বোঝার মতো পরিস্থিতি হয়নি।

    এই আইনগুলিকে যদি, কৃষিজাত শস্যের পণ্যের বিপণন ও পণ্যায়ন ইত্যাদির জন্য আইন হিসেবে ধরা হয় তাহলে এই বিষয়ে কিছু শাসক হিসেবে কংগ্রেসের অস্বস্তিকর প্রশাসনিক ভূমিকার ইতিহাস আছে এটা কি আমরা বলতে পারি? কংগ্রেস কৃষিজাত পণ্যের বাণিজ্যে বড় পুঁজিপতিদের অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে, বিশেষ করে বড় রিটেল ব্যবসাকে অনুমতি দেওয়া ব্যাপারে তো তাত্ত্বিক এবং ব্যাবহারিক দুই দিক থেকেই প্রস্তুত ছিল, ৯- এর দশকে বা নতুন শতাব্দীর শুরুর দশকে?

    সরকারি মনোভাবের এই পরিবর্তনের খানিকটা ঐতিহাসিক দায় দল হিসেবে কংগ্রেস অস্বীকার করতে পারে না।

    (কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আদিল বোপারাই এবং সালমান খুরশিদ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি নিবন্ধে, কৃষি আইন সম্পর্কে তাঁদের মূল আপত্তির কথাগুলি লিপিবদ্ধ করেছেন।https://indianexpress.com/article/opinion/columns/farmers-protest-agri-laws-apmc-msp-congress-bjp-7101450/) আমার যেটা আপনার কাছে প্রশ্ন ছিল সেটা হচ্ছে যে—মানে ধনতন্ত্র এবং ধান্ধা ধনতন্ত্রের মধ্যেকার গুরুত্ত্বপূর্ণ পার্থক্য ছাড়া কৃষি বিপণন প্রশ্নে এই মুহূর্তে কী কী পার্থক্য আছে কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে?

    অভিষেক ব্যানার্জি: অবস্থানগত পার্থক্যের আগে, আপনার একটা প্রশ্ন আমার ভালো লাগলো যে আপনি যখন বললেন যে কংগ্রেসের একটা ঐতিহাসিক দায় আছে, আমি একটা ইতিহাস দিয়ে শুরু করব।

    আমূল, ভারতের প্রথম সফল কোঅপারেটিভের যে ইতিহাস যার হাত দিয়ে শুরু, সেই কুরিয়েন ছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের আদর্শে উদ্‌বুদ্ধ একজন মানুষ। সেই মানুষটা প্রথম, রাষ্ট্রের সরাসরি সাহায্য ছাড়া উনি একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন, যে প্রতিষ্ঠান কিন্তু স্বাধীনভাবে গুজরাটের বিভিন্ন জায়গায় যারা দুগ্ধ উৎপাদন করেন এবং আমরা এই ব্যাপারে বোধহয় সবাই নিশ্চিত যে এসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্টের ভিতরে এটাও পড়ে, তো তাঁরা আনলেন, এবং মডেলটা সফল হল, এবং তাতে যেটা হল গুজরাটের গ্রামের মেয়েরা স্বনির্ভর হয়ে উঠল। ফলে কমোডিফিকেশন বা পণ্যায়ন যেটা আপনি বললেন সেটার ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনেক পুরোনো। সেখানে কংগ্রেস এটাকে ব্যাগেজ বলে না, কারণ কংগ্রেস একটা জিনিস খুব মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে সংস্কৃত যে শব্দটা আছে, সেই সংস্কার, সংস্কার মানে কিন্তু পরিবর্তন এবং আমরা জানি পরিবর্তনটাই শাশ্বত কিন্তু পরিবর্তনটা কার জন্য?

    যে কারণে আমি আমূলের উদাহরণটা দিলাম যে আমূল কিন্তু একটা পরিবর্তন এনেছিল প্রথমবার, একটা কোঅপারেটিভ সিস্টেম হয়েছিল, কিন্তু সেই পরিবর্তনটা মানুষের জন্য হয়েছিল। আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না, খাদ্য সুরক্ষার ব্যাপারে, গ্রামীণ রোজগারের ব্যাপারে, বিশ্বায়নের বছর বলে পরিচিত বছরগুলির আগে ও পরে, কংগ্রেসের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ইতিহাস রয়েছে। এপিএমসি, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ইত্যাদি, ১৯৬৫-র কৃষি পণ্য মূল্য কমিশনের কথা নিশ্চয় আপনি অস্বীকার করবেন না।

    একেবারে হালের কথা বলি। হ্যাঁ ২০১৯ এ লোকসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের যে প্রকাশিত নির্বাচনী ইশতেহার (https://manifesto.inc.in/pdf/english.pdf), তাতে অত্যাবকশকীয় পণ্য আইনকে পুরোনো যুগের প্রতীক বলা হয়েছিল এবং এপিএমসি র পরিবর্ত ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিলো। আমাদের সমালোচকরা এটুকু উল্লেখ করেই ক্ষান্ত দেন, আমি একটু বলি যে আমরা যেখানে ক্ষমতায় এসেছি, সেখানে ঋণ মকুব করেছি। মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান কংগ্রেস সরকারের কথা বলছি। এছাড়া আমি আপনাকে কতগুলো কথা মনে করিয়ে দেই, ঐ একই ইশ্তেহারে আমরা বলেছিলাম, একটি পৃথক কিসান বাজেট প্রস্তাবের কথা, ঋণ-মকুব থেকে ঋণমুক্তিতে উত্তরণের কথা, পুরোনো কৃষিচিন্তা প্রসার পরিষেবা (Agriculture Extension) কে ফিরিয়ে আনার কথা, ক্ষুদ্র চাষি এবং কৃষি মজুরদের জন্য পৃথক কমিশনের কথাও বলেছিলাম, ফসল বিমাগুলিতে নো প্রফিট নো লস ইত্যাদির কথা বলেছিলাম। অনেকেই কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে পার্থক্য দেখতে পান না, রাজনৈতিক কারণেই পান না, তাঁদের অবগতির জন্যেই বললাম। আর আরেকটা কথা বলতে পারি, আজকের রাজনীতিতে, যে কোনো নির্বাচনে যে ফলই হোক, কংগ্রেস আলোচনা না করে আইন প্রণয়নের দিকে যেত না।

    আমি যদি এখনকার আইনগুলিকে একটু ধরে ধরে বিশ্লেষণ করি তাহলে আপনারা পার্থক্যটা আরো বুঝতে পারবেন।

    প্রথম আমরা যেটা বলছি এই এসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্টের উদ্দেশ্য ছিল খাদ্য সুরক্ষা এবং সমবন্টন। এবার এসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্টে কী হল? ওষুধ বাদ দিয়ে আর-কোনো কিছুই এসেনশিয়াল কমোডিটির মধ্যে পড়ল না। যতক্ষণ না সংকটকাল কিছু উপস্থিত হচ্ছে, মানে ধরুন একটা মহামারী হয়েছে, ধরুন একটা যুদ্ধ লেগেছে অথবা অন্য কোনো কারণ। তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে সমস্যা কী কী হতে পারে? সমস্যা হতে পারে প্রয়োজনীয় খাদ্য না থাকার, দামের ওঠা পড়ার। মানুষ কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে খাদ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হল। সময়্টা আর স্বাভাবিক রইলো কি? এটা প্রাথমিক আপত্তি। কংগ্রেস যে বেসরকারিকরণের কথা বলেছে কখনোই কিন্তু এমন কথা বলেনি।

    বোধিসত্ত্ব: ২০২০ র আইনে বৃহৎ বিপণনকারীর স্বার্থেই জোর দেওয়া হয়েছে।

    অভিষেক ব্যানার্জি:
    না শুধু বিপণন না। আমি যদি একটা জিনিস তৈরি করি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিপণন লাগবে, যে কারণে আমূলের উদাহরণটা আমি দিলাম, আমূলের বিপণন কিন্তু সরকারিভাবে হয় না বেসরকারিভাবে হয় কিন্তু তার লাভের শেষ কড়িটা একজন শেষতম উপভোক্তা ও উৎপাদকের কাছেও পৌঁছায়। এখানে কেন পৌঁছচ্ছে না? কারণ সমবণ্টন থাকছে না। কারণ এখানে বলা হয়েছে ‘এটা বাজার অর্থনীতি অনুযায়ী হবে’। এবার আপনিও জানেন, আমিও জানি, আমাদের রাজনৈতিক পরিচিতি ছাড়াও আমাদের নিজস্ব একটা কর্মপরিচিতি আছে তার ভিত্তিতে বলতে পারি, যেই মুহূর্তে শুধু লাভের জন্য এই ব্যবস্থা আমরা পরিচালনা করতে যাব, এই মডেল টিকবে না। দ্বিতীয় খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সেটা হচ্ছে দামের ক্ষেত্রে। দামের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, রাজ্য সরকার বা কেন্দ্র সরকার কেউ দামে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না যতক্ষণ না কৃষিজাত শস্যের দাম ৫০% বাড়বে বা শাকসবজি মাছ মাংস ইত্যাদির দাম ১০০% বাড়বে।

    আমি আপনাকে একটা উদাহরণ দিই। জ্যোতি আলু, যেমন এই শীতকালটা জ্যোতি আলু আর চন্দ্রমুখী আলু নর্মালি কেজি প্রতি ৮ টাকা থেকে ১০ টাকা হয়। আমরা ৩২ টাকা দেখেছিলাম, এমনকী ৪৮ টাকায় অবধি দাম উঠে গিয়েছিল। কিন্তু কোনো সরকার, রাজ্য বলুন বা কেন্দ্র এই নতুন আইনের ফলে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বা করাটা একেবারেই খামখেয়ালির ভিত্তিতে চলবে। পারবে না। কেন ঢুকতে পারবে না? কারণ আইনে বলা আছে দানা-শস্য জাতীয় কৃষিজ জিনিস যেমন চাল ডাল গম ইত্যাদির দাম ৫০% বাড়লে আর আলু পেঁয়াজ অর্থাৎ কাঁচামালের দাম যদি ১০০% বাড়ে তাহলেই আমি ঢুকতে পারব। আপনি ভাবতে পারছেন? এটার সমস্যাটা কিন্তু একমাত্র কৃষকের থাকল না। আমার আপনার সমস্যাও হয়ে গেল।

    বোধিসত্ত্ব: আচ্ছা এইটা অনেকে বলছেন, অনেক জায়গায় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতায় শোনা যাচ্ছে কিন্তু কোনো অ্যাকাডেমিক কাজ আমি এ বিষয়ে পাইনি। সেটা হচ্ছে, এই যে বলা হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আইনের এই যে মৌলিক পরিবর্তন করা হল, তাতে তো মজুত করার উপরে কোনো নিয়ন্ত্রণ সরকার নিজে আর রাখতে চাইছে না, আবার অন্যদিকে বলা হচ্ছে, না, আমরা তো খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে তো কিছু বলিনি। যেটা অনেকেই বলছেন, যার ভিত্তিতে ধরুন ডিয়ারনেস অ্যালাউন্সের যে হিসেব হয় সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে, সেটাও প্রভাবিত হতে পারে এই আইনের দ্বারা। এই ব্যাপারে কি আপনাদের দলের কোনো বা আপনার কোনো অবস্থান আছে?

    অভিষেক ব্যানার্জি: আচ্ছা আপনি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুললেন, আমি একটু যেটা বলতে চাইছি, সেটা শেষ করে নেই। আমি হুবহু পড়ে শোনাচ্ছি আইনে কী লেখা আছে

    2. In section 3 of the Essential Commodities Act, 1955, after sub-section (1), the following
    sub-section shall be inserted, namely:—
    ‘(1A) Notwithstanding anything contained in sub-section (1),—
    (a) the supply of such foodstuffs, including cereals, pulses, potato,
    onions, edible oilseeds and oils, as the Central Government may, by notification
    in the Official Gazette, specify, may be regulated only under extraordinary
    circumstances which may include war, famine, extraordinary price rise and natural
    calamity of grave nature;
    (b) any action on imposing stock limit shall be based on price rise and an
    order for regulating stock limit of any agricultural produce may be issued under
    this Act only if there is—
    (i) hundred per cent. increase in the retail price of horticultural
    produce; or
    (ii) fifty per cent. increase in the retail price of non-perishable
    agricultural foodstuffs,
    over the price prevailing immediately preceding twelve months, or average retail
    price of last five years, whichever is lower:
    Provided that such order for regulating stock limit shall not apply to a processor
    or value chain participant of any agricultural produce, if the stock limit of such person
    does not exceed the overall ceiling of installed capacity of processing, or the demand
    for export in case of an exporter:

    এর মানেটা দাঁড়ায় হচ্ছে এটা যে ধরুন আপনার যদি একটা মজুত করার আধুনিক গুদাম থাকে তাহলে আপনি আপনার যতদূর মজুতের ক্ষমতা আছে ততদূর পর্যন্ত হোর্ড করতে পারবেন। এবার বাস্তবটা দেখুন। বাস্তবটা হচ্ছে, আমি যদি বৃহৎ পুঁজি ধরি, সেটা দেশি পুঁজি হতে পারে অথবা বিদেশি পুঁজি হতে পারে, আমি নাম করতে চাইছিলাম না কিন্তু নাম করলে আপনার হয়তো সুবিধা হবে, ধরে নিন ওয়ালমার্ট। ওয়ালমার্টের কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই সীমাহীন মজুত করার ক্ষমতা আছে। একটা যুক্তি সরকারের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে যেটা দিয়ে আপনি শুরু করলেন, যে সরকার মজুত রাখার বিষয়টা আর নিজের আওতায় রাখতে চাইছে না। আমি আপনাকে একটা পরিসংখ্যান দিয়ে দিই। যখন আমি আর আপনি আলোচনা করছি এটা ধরে নিয়ে আলোচনা করছি যে আইন পাস হওয়ার পর, যেহেতু লকডাউন ছিল, প্যানডেমিক ছিল তাই নতুন করে কোনো ওয়্যারহাউজ তৈরি করা যায়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবে। একজিস্টিং ওয়্যার হাউজের মালিকানা হচ্ছে বেসরকারি, বেশিটাই বেসরকারি, কিন্তু তারা একচেটিয়া নয়। আপনি যদি দিল্লি রোড ধরে যান বা হুগলির যে-কোনো প্রান্তে চলে যান বা আপনি যদি হাওড়া দিয়ে ধূলাগড় দিয়ে যান দু-দিকে যে ওয়্যার হাউজগুলো দেখবেন সেগুলো এফসিআই-র নয় কিন্তু। সেগুলো প্রত্যেকটাই হচ্ছে, হয় সেটা সিদ্ধেশ্বরী, বা হয় সেটা মা তারা, কিন্তু সেটা বৃহৎ পুঁজি নয়। আজ আপনি বৃহৎ পুঁজিকে এই স্বাধীনতা দিয়ে দিলেন যে তারা যত খুশি মজুত করতে পারবে।

    আর-একটা যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, যেটা আমাদের সবাইকে একটু বুঝতে হবে সেটা হচ্ছে চুক্তি চাষ, এখানে চুক্তি চাষটা কীরকম হয়ে যাচ্ছে? এরকম হয়ে যাচ্ছে যে—আমি আপনার সঙ্গে একটা চুক্তিতে, আমি ধরুন একজন কৃষক আপনি ধরুন একজন শিল্পপতি, আমি এসে দেখলাম আমার এখানে খাদ্য অনুযায়ী অর্থাৎ খাদ্যের ধর্ম অনুযায়ী যেমন চাল, ডাল, আলু ইত্যাদি আমার তৈরি করা পণ্যগুলির মধ্যে অগ্রাধিকার পাবে কিন্তু বিদেশে দেখা গেল আমি যেটা বিক্রি করতে পারব সেটা ধরুন যব বা ভুট্টা। কেন বলছি? আমি আপনাকে একটা উদাহরণ দিই। পূর্ব আফ্রিকা। অভিজাতরা যে মদ্য পান করেন, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আসছে ইস্ট আফ্রিকা থেকে। ইস্ট আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, দাদন দিয়ে একরের পর একর জুড়ে এই জিনিসটা তৈরি হয়। সেখানে লোকে খাবে কি, খাদ্য সুরক্ষা থাকবে কিনা, এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছেই না। অর্থাৎ যে জমি সব চেয়ে অর্থকরী জমি, সেই জমির মালিক আধপেটা খাচ্ছে। এটা সমস্যা। অতদূরও যেতে হবে না। আমাদের নীল চাষের ঐতিহাসিক সমস্যা ভাবলেই আমরা বুঝতে পারব, যখন আমাদের এখানে ধান উৎপন্ন হচ্ছে না তখন দাদন দিয়ে এখানে নীল তৈরি হচ্ছে। কেন? নীলটা বাণিজ্যিকভাবে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় ছিল তখন।

    অনেকে বলেন আলুতে চুক্তি চাষ করে তো লাভ হয়েছে, সে তো বাণিজ্যিক চিপস, ক্রিসপ ইত্যাদি আলুভাজা কোম্পানিরা বেচছে বলে একটা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের চাহিদা তৈরি হয়েছে, কিন্তু চাষি কি দাম পাচ্ছে, এই যে চাহিদা বাড়লো, এতে কি কৃষি শ্রমিকের রোজগার কিছু বাড়লো? আলুচাষের যে কোনো বেল্টে গেলে দেখবেন, শয়ে শয়ে ট্রাকটর আর অন্য ভাড়ার গাড়ির লাইন পড়েছে, মাঠ থেকে তোলা আলু বড় বড় কোল্ড স্টোরেজে ঢুকবে বলে, তো যাদের ক্ষেত থেকে আলু উঠলো, যিনি সে চাষে পরিশ্রম করলেন, যারা তুললেন, কোল্ড স্টোরেজে পৌছে দিলেন, তাদের রোজগার এই পণ্যায়নে
    সাংঘাতিক লাভবান হয়েছেন, এরকম কোন খবর আমার কাছে নেই। কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা, ধান চাল ব্যবসার কলের মালিকদের মত, এগ্রিগেটর হিসেবে হয়তো কিছুটা লাভবান হয়েছেন, তাও খুব বড় কোম্পানি না হলেই লাভে পরিমাণ বেশি হওয়ার কথা না, যা ব্যবস্থা চলছে। তার পরে তার অনুসারী হিসেবে জমির উর্বরতা চলে যাওয়া ইত্যাদি তো আছেই। এটা সমস্যার জায়গা। আমরা যেদিকে এগোচ্ছি, সেদিকে আমার যে এপিএমসি বা মান্ডিগুলোর গুরুত্ব কিন্তু কমে যাচ্ছে। কেন কমে যাচ্ছে? কারণ এখানে (The Farmers’ Produce Trade And Commerce (Promotion
    And Facilitation) Act, 2020) বলা হয়েছে খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা — একজন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য ভারতবর্ষের যে-কোনো জায়গায় অনলাইন বা অফলাইন বিক্রি করতে পারে।

    এবার আমি আপনাকে বাস্তব একটা উদাহরণ দিই। কুলতলিতে তৈরি হওয়া লঙ্কা বা হরিরামপুরে তৈরি হওয়া ফজলি আম আমি আমার গ্রামের ব্যবসায়ীর মান্ডিতে পর্যন্ত পৌঁছোতে যে গাড়ি ভাড়া লাগে আমি সব সময় তা করে উঠতে পারি না। তাহলে অন্য জায়গায় কীভাবে দেব? যদি না দিতে পারি, তাহলে কি আমার সেটা ঠিকঠাক স্টোর করার মতো ক্ষমতা আছে? তাহলে আমায় কী করতে হবে? কমদামে বিপন্ন বিক্রয় করতে হবে। অনলাইন বেচাকেনা করার মত পারদর্শিতা সবার আছে? ট্রেনিং কোর্স ইত্যাদি করার সুবিধা সবার আছে? বোঝাই যাচ্ছে সরকারের নীতির অভিমুখ হচ্ছে খাদ্য শস্যের ব্যবসায়ী কর্পোরেট হাউজগুলোর সুবিধের দিকে। আচ্ছা এই ফসলগুলিতে কিন্তু ন্যূনতম মূল্যের সহায়তা নেই, আমি কেবলমাত্র উদাহরণের জন্য বললাম।
    আমি আগের বিষয়্টা বলছিলাম, এবার আপনার ডিয়ারনেস রিলিফ বা ডিয়ারনেস আলাওয়ান্সের হিসেবের বিষয়্টায় ফিরি।

    সরকারি কর্মচারী বা পাবলিক সেক্টর কর্মচারীরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে মোকাবিলার সহয়াতায় একটা টাকা পান। তার হিসেবটা অল ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইস ইন্ডেক্স এর উপরে নির্ভর করে। এবার সাধারণত অত্যাবশ্যক দ্রব্যের যে তালিকা, তার যে বিক্রয়মূল্যের ওঠানামা তার ভিত্তিতে কনজিউমার প্রাইস ইন্ডেক্স হিসেব হওয়ার কথা। তো একটা প্রশ্ন অবশ্যই মানুষ করতে পারেন, কিছুই যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য হিসেবে পরিগণিত না হয়, তাহলেও কি প্রাইস বাসকেটটা একই থাকবে? নাকি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত মূল্য থাকার জন্য মূল্যের তারতম্য ও সামান্য নিয়ন্ত্রিত থাকার জন্যেই হয়তো ডিয়ারনেস অ্যালাওয়েন্স দেওয়া হয়, যখন তারতম্য সম্পূর্ণ বাজার নির্ভর হবে, সরকারের কোন ভূমিকার প্রশ্ন থাকবে না, তখন কি সেটাকে ডিয়ারনেস অ্যালাওয়েন্স এর বিষয়টাই বাতিল করার দিকে এগোবে। অবশ্য যে জমানায় সরকারি চাকরি ব্যাপারটাই উঠে যাওয়ার মুখে বা প্রবল সংকোচনের মুখে তখন মুন্ডু গেলে খাবোটা কী-র আলোচনাটা মুন্ডু ছাড়া বাঁচবো নাকি র পরে হওয়াই ভালো!

    বোধিসত্ত্ব: এটা ভালো বলেছেন। ফসল তোলার পরে রক্ষা, মজুত, নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচানো একটা বিশাল সমস্যা এবং বড়ো চ্যালেঞ্জ আর কী। বিশেষ করে ছোটো কৃষকদের সেটা সাংঘাতিক সমস্যা। এবং শিক্ষা জিনিসটা, প্রাযুক্তিক শিক্ষা জিনিসটা এমন জায়গায়, ক্ষুদ্র উৎপাদকের এই নতুন বিপণন ব্যবস্থায় ভীষণ ক্ষমতায়ন হবে, কল্পনা করাও কঠিন।

    অভিষেক ব্যানার্জি: এবং শুধু তাই নয়। উলটে এই অবস্থা থেকে বাঁচবার জন্য কোনো সুরাহা না দিয়ে কী করে মজুতদারদের সুবিধা দেওয়া হল সেটা আপনাকে বলি। আপনি যদি আইনটা পড়েন, আইনে লেখা আছে, এতদিন পর্যন্ত মজুত করাবার জন্য বা কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসায় ঢোকার জন্য আপনাকে একটা লাইসেন্স নিতে হত। অর্থাৎ আপনার কাছে যদি একটা ভ্যালিড প্যান কার্ড থাকে, অর্থাৎ আজকে আমি আপনি যখন আলোচনা করছি সেই সময় যদি আপনার কাছে একটু ইন্সেন্টিভের টাকা থাকে তাহলেই আপনি কৃষিজাত পণ্যের ব্যাবসায় ঢুকে যেতে পারেন। এবার ভাবুন এর মানেটা কী দাঁড়াল? যে-কোনো ফড়েকে আপনি প্রাতিষ্ঠানিক করে দিলেন। এখন সেই ফড়ে স্মল বাস্কেট হতে পারে, অ্যাগ্রিগেটর নাম নিয়ে সে আসতেই পারে কিন্তু আসলে সে ফড়ে। সে কিন্তু মধ্যস্বত্তভোগী। এই যে প্রাথমিক জায়গাগুলো, যেটা ভারতবর্ষের, দেখুন ভারতবর্ষ কিন্তু একটা কৃষিপ্রধান দেশ, আর সব কৃষক কিন্তু এক নয়। এখানে এমন কৃষক আছে, যার একরের পর একর জমি আছে আবার কিছু কৃষক আছে যারা কিন্তু ভাগচাষি। এই আইন এমন একটা আইন, এই আইনে একমাত্র শিল্পপতি ছাড়া, আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সব চেয়ে প্রিয় শিল্পপতি কারা, আর কারও কোনোরকম সুবিধা হয়নি। এমনকী আমার আপনার মতো যারা কৃষক না যারা শুধুমাত্র গ্রহীতা তাদেরও ব্যাপক সমস্যা। সব চেয়ে বড়ো সমস্যা যেটা হবে সেটা হল আগামীতে এটা ভারতীয় মোবাইল কোম্পানির মতো অলিগোপলি মার্কেট হয়ে যাবে যেখানে শুধু দুটো মাত্র কোম্পানি থাকবে। কেন থাকবে? কারণ আপনি প্রতিযোগিতায় আর পেরে উঠবেন না।

    বোধিসত্ত্ব: আমাকে এই জিনিসটা ভীষণ অবাক করেছে অভিষেক। আমি আসলে দুটো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একই কথা বলছি। আপনি শুনলে বুঝতে পারবেন। সেটা একটা অদ্ভুত বিষয় দেখা গেছে, পাঞ্জাব আর হরিয়ানায় এটা বিশেষ করে দেখা গেছে। দেখুন পাঞ্জাবের যে অংশের কৃষকরা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ও এই আইনের বিরোধিতা করছিলেন তাদের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের যেটা প্রচার ছিল সেটা হচ্ছে এরা বিশাল বড়ো বড়ো চাষি এবং পাশাপাশি সরকার পক্ষের সমর্থক একটা বিশাল অংশ মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমেও এই প্রচার ছিল যে এরা বিশাল বড়ো বড়ো চাষি এদের কোনো ক্ষতি নেই, যারা পিৎজা খায় আন্দোলনের সময় তাদের কোনো ক্ষতি হতে পারে না। বোকা বোকা কথা। সত্যি কথা বলতে কী, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, আমি কৃষক নই, কিন্তু লকডাউনের সময় ক্ষুদ্র কৃষক না হলেও সরকার অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের কীভাবে হেনস্থা করেছে সেটা সবাই দেখেছে। সুতরাং এ ব্যাপারে রসিকতার কোনো জায়গা নেই। ফলে তাদের নীতির অভিমুখ কী, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মানুষদের দৃষ্টিভংগী থেকে কী, সে নিয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী হিসেবে আমার অন্তত কোনো সন্দেহ নেই।

    কিন্তু আমি যেটা আপনাকে বলতে চাই, যেটা আমার একটু অদ্ভুত লেগেছে সেটা হল পাঞ্জাবে আর হরিয়ানাতে একটা ঘটনা ঘটেছে, সেটা হল বড়ো চাষিরা এবং ছোটো চাষিরা এক সঙ্গে প্রতিবাদে এসেছেন এবং সেটা কৃষকদের অনেকগুলো ফেডারেশনের মতো সংঠনগুলি, তাঁরা অনেকে চেষ্টা করেছেন যে নানা ধরনের কৃষির সাথে জড়িত পেশার মানুষকে তারা এই আন্দোলনটির মধ্যে এনেছেন, এমনকি কৃষিমজুরদেরও তাঁরা এই আন্দোলনের মধ্যে এনেছেন এবং আশ্চর্য ভাবে যেটা দেখা যাচ্ছে যে যারা আড়ৎদার বা আড়তিয়া তাঁরাও একসঙ্গে এসেছেন। এমনকি আমি দীনেশ অ্যাব্রোল এর বক্তৃতা শোনার সময়ে বা অনুলিখন করার সময়ে খানিকটা ইংগিত খেয়াল করেছি,আমার মনে হয়েছে, এমনকি কোন কোন নতুন কর্পোরেট এফ পি ও রাও লোকচক্ষুর আড়ালে, কৃষকদের প্রতি, ন্যায্য দামের দাবির প্রতি সমবেদন রাখেন, বিহারে মধ্যপ্রদেশে।

    গোটা সাপ্লাই চেনটা দখল করার যে আইন তৈরি হচ্ছে, আপনি যে অলিগোপলি শব্দটা ব্যবহার করলেন একটু আগে, সেই জায়গাটার বিপদটা বুঝে বড়ো চাষি, ছোটো চাষি, আড়তদার, তারা সবাই একজায়গায় অনেকে এসেছেন। যারা দিনের একটা সময় নিজেরা আবার কৃষকও। একটা জমিতে হয়তো চাষও করান।

    কিন্তু সেই একই ধরনের ঐক্য কিন্তু আমরা অন্যত্র দেখিনি। ধরুন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আমি যেটা বুঝতে অপারগ, আপনার কাছে যেটা আমি জানতে চাই, সেটা হচ্ছে এখানে সাধারণ ভাবে বামফ্রন্টের করা ভূমি সংস্কারের কারণে বড়ো কৃষকদের একটা বিতৃষ্ণা স্বাভাবিক কারণে ঐতিহাসিকভাবে বামফ্রন্টের উপর ছিল, ক্ষুদ্র চাষিদের উপরে ছিল। তার পরবর্তীতে কৃষি অর্থনীতি, গ্রামীণ কৃষি ব্যতিরেকে অর্থনীতির বৃদ্ধি এসব কারণে হয়তো সেই ব্যাপারটা অতটা কড়াভাবে ব্যক্তিগত আক্রোশ এর জায়্গায় হয়তো নেই।

    কিন্তু এখানে আমরা যেটা দেখিনি সেটা হচ্ছে, যাঁরা মজুত করেন বা যারা শস্য পণ্যের ব্যাবসার সাথে জড়িত তাঁরা আন্দোলনে নামলেন না কেন, সেই না আসাটার মূল কারণটা কি রাজনৈতিক সংগঠনের অভাব, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না যে এটা ঠিক বড়ো চাষি, ছোটো চাষি এবং কৃষিশ্রমিক, এমনকি ছোটো আড়ৎদার এদের যে ঐক্য অন্যত্র সম্ভব হয়েছে সেটা এখানে হচ্ছে না কেন? মানে এই আন্দোলনটা না করে তো তাদের কোনো লাভ হচ্ছে না।

    অভিষেক ব্যানার্জি: আচ্ছা, এক্ষেত্রে আপনার প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তবে এক্ষেত্রে আমি একটা ছোট্ট কারেকশন করে দিই সেটা হচ্ছে যে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ মানে পাঞ্জাব, হরিয়ানা বাদ দিয়েও উত্তরপ্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশেরও বেশ কিছু কৃষক কিন্তু আন্দোলনে ওখানে জড়িত এখানে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

    বোধিসত্ত্ব: ঠিকই বলেছেন এখানে আমার নামগুলো বলা উচিত ছিল এমনকি রাজস্থানের লোকেরাও এসেছেন সেটা সত্যিই ঠিক। আমায় মাপ করবেন।

    অভিষেক ব্যানার্জি: নানা সে ঠিক আছে। এইবার আমি যে পাঁচটা রাজ্যের নাম বললাম, সেই পাঁচটা রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থান যদি আপনি দেখেন, ইন্সিন্ডেন্টালি অর অ্যাক্সিডেন্টালি সেখান থেকে দিল্লির দূরত্ব কম বেশি ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা, এইটা একটা প্রাথমিক কারণ। দ্বিতীয় প্রাথমিক কারণটি যেটা আমাদের সকলকে বুঝতে হবে সেটা হচ্ছে এই সরকার, এই সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা অবশ্যই প্রশ্ন তুলতে পারি কিন্তু এদেরকে রাজনৈতিক চাতুর্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো বোকা আমি বা আপনি কেউ নই। লকডাউনের পর এই চারটি রাজ্যে আপনাকে যদি আন্দোলন করতে হয় আমি আপনি কোনো না কোনো সময় ছোটো বড়ো গণ-আন্দোলন করেছি এবং গতকাল আমাদের ব্রিগেড ছিল। আমরা জানি যে একটা আন্দোলন করার একটা ন্যূনতম খরচের প্রয়োজন হয়, আমার যদি নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো অবস্থা হয় তাহলে তাহলে আমি কিন্তু সদিচ্ছা থাকলেও অংশগ্রহণ করতে পারব না, আমি হয়তো নীরব সমর্থন করব। আমার এখানে যারা ভাগচাষি তাদেরকে যদি আমরা এই কথাটা বলি তাহলে তারা বলবে, হ্যাঁ, আমরা আপনার সঙ্গে সহমত। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ওখানে গিয়ে মাসের-পর-মাস ওখানে বসে থাকলে আমার বাড়ির লোক না খেতে পেয়ে মরে যাবে, এটা এক।

    কিন্তু তার পাশাপাশি আমি আপনাকে একটা শুধুমাত্র তথ্যের খাতিরেই তিনটে জিনিস একটু ধরিয়ে দেব, একটু আপনার সঙ্গে সহমত হয়েই, ২৩ জানুয়ারি ২০১১, আমাদের কলকাতাতে তিনদিনের একটা কৃষক আন্দোলন হয়েছিল, কৃষক অবস্থান হয়েছিল, বিক্ষিপ্তভাবে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বীরভূম এবং বর্ধমানে হয়েছিল। গোটা দশক জুড়েই নানা রকম ন্যায্যমূল্যের প্রশ্নে বামপন্থীরা কৃষক আন্দোলন করেছেন, কোথাও কৃষক রা রেগে গিয়ে হাইওয়ে তে ফসল নষ্ট করেছেন। কিন্তু হ্যাঁ, সেই আন্দোলনটা এই পরিমাণ হয়নি।

    আপনি যে প্রশ্নটা করলেন যে পলিটিক্যাল মোবিলাইজেশন, সেখানে আমি আপনাকে একটা অন্য রাজনৈতিক উত্তর দিই বরং যেটা অ্যাকচুয়ালি বাস্তব উত্তর সেটা হচ্ছে যে এইখানে অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই পশ্চিমবঙ্গে সবথেকে বড়ো সংগঠন যাদের, সেটা হচ্ছে রাজ্যের শাসক দল। এবার রাজ্যের শাসক দল কেন এটা করলেন না, তার কারণ রাজ্যের শাসকদলের অবস্থা হচ্ছে রাখাল বালকের মতো। আমফানের সময় আমি চাল চুরি করব বা আমি ২০১৪ সালে আমি একটা কৃষি বিপণন আইন পাস করব যেটা কমবেশি একই রকম তার পাশাপাশি আমি বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মঞ্চ কাঁপিয়ে একাধিক বক্তৃতা দিতে পারি। কিন্তু সেই বাস্তবতাটা কিন্তু কেউ বিশ্বাস করবে না, তার পাশাপাশি যে মজুতদারকে আমি আমার এখানে যে চাল বা আলুর বিক্রি করতে গিয়েই আমি তার কাছেই প্রতারিত হয়েছি, সে আজকে আমাকে ভালো কথা বলতে এলেও তাকে বিশ্বাস করব না, সেই রাখাল বালকের সমস্যাটা হয়ে গেছে।

    উলটোদিকে কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টে এখানে দাঁড়িয়ে আমাদের আর-একটা সমস্যা হয়েছে, যে আমাদের অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই যে ৭ শতাংশ এবং ৫ পার্সেন্ট ভোট নিয়ে আমাদের যতটা লড়াই করা উচিত ছিল, হ্যাঁ, বিক্ষিপ্ত ভাবে আমাদের যে কিষান কংগ্রেস বা বামফ্রন্টের যে কিষান মজদুর ইউনিয়ন রয়েছে তারা যেভাবে রাস্তায় নেমেছে কিন্তু সেটা সেভাবে সেটা দানা বাঁধে পারেনি পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু সেটার মানে এই নয় যে অসূয়াটা নেই, কিন্তু অসূয়াটা থাকা সত্ত্বেও দানা বাঁধেনি।

    বোধিসত্ত্ব: কিন্তু এটা তো রাজনৈতিক প্রচারের সমস্যা, বিশ্বাসযোগ্যতার সমস্যা বোঝা গেল, কিন্তু আমি বলছি, কিন্তু শস্যপণ্যের বিপণনে ব্যাবসার মধ্যে রয়েছেন বা অন্য মজুতদারি করেন বা অন্যধরনের কাজকর্ম করেন, যাঁরা বাজার চালান তাঁদের মধ্যে কি এই উপলব্ধির অভাব রয়েছে যে বড় রিটেলার, অ্যাগ্রিগেটর বাজার কব্জা করলে, ক্রেতা বাছার স্বাধীনতা কি আজকের ব্যাবসায়ীদের নাও থাকতে পারে?

    অভিষেক ব্যানার্জি: আমি আপনার সাথে সহমত। আমরা বোঝাতে পারিনি, এটা আমাদের অক্ষমতা, আমরা যারা রাজনীতি করি আমাদের কাজ এই ব্যাখ্যাগুলো বোঝানো যে, যোগানদার শুধু যে বড়ো কোম্পানিরা হচ্ছে তা নয়, এই সাপ্লায়াররা হচ্ছে aggregator। ঠিক যেরকম আজকের ক্যাব কোম্পানির কিন্তু একটাও নিজস্ব গাড়ি নেই বা ধরুন বিভিন্ন অনলাইন বাজার গুলো যেমন আপনাকে বলছে, আপনার দোকান আপনার ই থাকবে, অনলাইন বাজার টা আপনি ব্যবহার করুন। আসলে আপনি একটা বিরাট ব্যবসার যোগানদার হয়ে যাচ্ছেন মাত্র।
    তারপরে দেখুন দামের ওঠা পড়া দেখে হচ্ছে ফিউচারস অ্যান্ড অপশনস -এর খেলা। এটা সাধারণ মানুষ, কৃষির সঙ্গে জড়িত মানুষ, বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে বুঝে ওঠা কঠিন। এমনকি ধরুন, চালের বা খাদ্য শস্যের বহুদিনের ব্যাবসা যাদের, তাদের মধ্যে নতুন অর্থনীতির খবর রাখা, ক্যাপিটাল মার্কেট্স এর খবর রাখা ব্যাবসায়ী কোম্পানি কটা আছে বা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কজন আছে, পারিবারিক ব্যাবসা চালাচ্ছেন এই পর্যন্ত।

    একটা কথা আমি আপনাকে বলি, এই সরকারের আজ অবধি কোনো নীতি ছোটো কৃষকের জন্য হয়নি।

    আপনি জানেন যে নরেন্দ্র মোদী সরকার কৃষক সম্মাননিধি একটা প্রকল্প চালু করে, কৃষক সম্মাননিধি প্রকল্পটিতে প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে যে আপনার জমি থাকতে হবে কিন্তু ভাগচাষির তো জমি নেই, খুব বড়ো ব্যবসায়ী হলে বা আপনি যদি কোনো বড়ো সাংবিধানিক পোস্টে থাকেন এবং কৃষক থাকেন বা আপনি যদি পেনশন পান তবে এটা পাওয়ার যোগ্য আপনি নন, সব বুঝলাম কিন্তু আপনার যদি জমি না থাকে, অন্য লোকের জমিতে কাজ করেন, যেটা পশ্চিমবঙ্গের সিংহভাগ কৃষক, আপনি কিন্তু কৃষক সম্মাননিধি পাওয়ার জন্য যোগ্য নন। আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না, এটা কৃষক সম্মাননিধি প্রকল্পটার এর ভিতরেই রয়েছে। এবার ভারতবর্ষের ভিতর পশ্চিমবঙ্গ, বা উড়িষ্যা এবং ঝাড়খণ্ড এমন একটা ভূখণ্ড যেখানে কিন্তু জমির মালিক খুব কম কৃষক বা খুব ছোটো জমির মালিক কৃষক। বা যদি আমি জঙ্গলমহল চত্বরে যাই, আমি কিন্তু লোকের বাড়িতে বা জমিতে ধান বুনে আমার সংসার চলে, আমার পক্ষে এমএসপি বোঝা সম্ভব নয়। কারণ আমি তো কোনোদিন মান্ডিতে যাই না।

    বোধিসত্ত্ব: উৎপাদককে তো ট্রেডার করা সম্ভব না, এটা তো ঘটনা, এটা তো সত্যি।

    অভিষেক ব্যানার্জি: এবং সে উৎপাদকও না, সে একজন উৎপাদন শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে অন্য কিছু কাজ করছে, আবার ফসলের সময় ফেরত এসে চাষ করছে। এই যদি আমার বাংলার গড় পড়তা ভাগচাষির অর্থনৈতিক পরিচিতি হয়, যে বারো মাসের ভেতর পাঁচ মাস চাষ করে, বাকি সাত মাস কোনো একটা প্রমোটিং সাইটে ইট বালির শ্রমিক হিসেবে কাজ করে, তাকে আমার পক্ষে বোঝানো সম্ভব নয়, যে আপনার সমস্যাটা বুঝুন।

    এটা একমাত্র সেই লোকটাই বুঝতে পারে, যেটা হচ্ছে হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশের অর্থনৈতিক সংস্কৃতি যে কৃষক শুধুই কৃষক। যে এটা হতে তার একটা ছেলে আর্মিতে কাজ করে বা পোস্ট অফিসে কাজ করে কিন্তু তার বাড়ির প্রাথমিক অর্থনীতিটা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। বাংলায় শুধু কৃষির উপরে ভরসা করলে তার সংসার চলবে না। আমি একদম আপনাকে জেলা ধরে ধরে নাম করে করে বলে দিতে পারি। এটাই বাস্তব সে চার মাস পাঁচ মাস যখন ধান বোনা হয় তখন ধানের খেতে কাজ করে যেই ধানের মরশুম কারণ সব ফসলই তো দুই ফসলি তিন ফসলি নয়, সব ফসলে একইরকম কায়িক পরিশ্রম লাগে না। তখন আমি অত শ্রমিককে অবশ্যই রাখব না। তখন তাকে হয় হকারি করতে হচ্ছে বা তাকে কলকাতায় বা দুর্গাপুরে বা কাছাকাছি কোনো বড়ো শহরে কোনো একটা সাইটে ঠিকা শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে। এটা হচ্ছে বাংলার অর্থনৈতিক বাস্তব। তাহলে তাকে আমি কী করে বাঁচাব।

    বোধিসত্ত্ব: আর-একটা জায়গায় আমার কয়েকটা প্রশ্ন ছিল। সেটা হচ্ছে যে, যেটা বলা হচ্ছে আপনার এই এপিএমসি তো সব জায়গায় নেই। কিন্তু সরকার নিয়ন্ত্রিত ক্রয় রয়েছে পশ্চিমবঙ্গতে। আপনার অভিজ্ঞতাটা কী? মানে আপনারা রাজনীতি করেন, নানা জায়গায় নানারকম লোকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন তো পশ্চিমবঙ্গে হিসেব দেখলে হয়তো, কয়েক দিন আগে স্বাতী ভট্টাচার্যের লেখা বেরিয়েছিল আনন্দবাজারে, হয়তো আপনি পড়েছেন যে আপনার মানে সর্বমোট সরকারি শস্য ক্রয় যেটা সেটা বেড়েছে গত ১০ বছরে। কিন্তু এমনিতে পদ্ধতিগত যে পরিবর্তন আনা হয়েছে যেহেতু কো-অপারেটিভ আর ক্রয় সবাই করে না এবং মানে কতটা ক্রয় কোন্‌ ব্লকে কতটা করা হবে সেগুলোর ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ রেখেছে, সেই জন্য আমার যেটা মনে হচ্ছে যে, মানে কৃষকরা সরাসরি সরকারনিয়ন্ত্রিত বাজারে গিয়ে বিক্রি করতে পারছেন, এই সুযোগটা কিন্তু জনপ্রতি কমছে। যদিও সর্বমোট ক্রয় বাড়ছে তাতে তো আপনার সরকার নিয়ন্ত্রিত ক্রয়ের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে , তো এটা নিয়ে আপনাদের কোনো অভিজ্ঞতা রয়েছে? মানে নালিশ আসছে? কীভাবে দেখছেন এই বিষয়টা?

    অভিষেক ব্যানার্জি: আমি তো আপনাকে একটু আগেই বললাম যে পশ্চিমবঙ্গে ২০১৩-১৪ সালে বা ২০১৬, আমাকে সালটা একটু দেখে নিতে হবে, একটা কৃষি বিপণন আইন হয়েছিল যেখানে বেসরকারিকরণের একটা ব্যাপার হয়েছিল। এবার আমি আপনাকে যে উদাহরণটা দিচ্ছিলাম যে এই যে আলোর নিচে অন্ধকারটা যে পরিমাণগত ভাবে আপনি দেখছেন যে, আগে যদি দু-কেজি করতেন এখন পাঁচ কেজি সংগ্রহ করছেন, কিন্তু মাথাপিছু সংগ্রহটা কমছে। কেন কমছে? তার কারণ দিনের শেষে সংগ্রহের সূত্রটা হয়ে যাচ্ছে কোনো একটা মধ্যস্বত্বভোগী। কেন একটা মধ্যস্বত্বভোগী হয়ে যাচ্ছে? কারণ আমি যে উদাহরণটা দিলাম, ধরুন আপনি কুলতলিতে বা নামখানাতে কাঁচা লঙ্কা চাষ করে বা গন্ধরাজ লেবু চাষ করে সেটুকুই আপনি করেন আপনার পক্ষে সম্ভব নয় যে ওই ১০০ গ্রাম বা ১ কেজি ৫ কেজি বা ১০ কেজি লঙ্কা নিয়ে আপনার রাখবার কোনো জায়গা, নেই স্টোর করার ক্ষমতা নেই এবং ওইটুকু নিয়ে এসে আপনি কলকাতার কোলে মার্কেট, হোলসেল মার্কেট, কমবেশি সারা বাংলার শ্রেষ্ঠ মার্কেট, সেখানে এসে আপনি বিক্রি করলে আপনি পড়তায় পৌঁছাতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, আপনার সেই ঘাঁতঘোঁৎও জানা নেই। ফলে কী হচ্ছে লোকাল লেভেলে একজন আছেন, যিনি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। সে আপনার থেকে কিনে নিচ্ছে এবং এটাকে আপনি তাকে বিক্রি করতে বাধ্য। সেই কারণেই আপনি যদি দেখেন মনমোহন সিং-এর ইউপিএ ২ সরকারের সময় ২০১২-১৩ সালে একটা বিল পাস করা হয়েছিল যে বিলটাতে বলা হয়েছিল প্রত্যেকটা ব্লকে পিপিপি মডেলের মাধ্যমে সরকারি ব্যাবস্থাপনায় পরিকাঠামো তৈরি করা হবে যেমন এক ওয়্যারহাউস তৈরি করা হবে, হিমঘর তৈরি করা হবে এবং হিমঘরের সাথে সংযোগ থাকবে বাজারের। আপনি যদি ভেবে দেখেন, যেটা একটা সময় আমাদের রাজ্যে প্রত্যেকটা ব্লকে তৈরি হয়েছিল, যে কিষান মান্ডি, যেগুলো মমতা ব্যানার্জির হাত দিয়েই তৈরি হয়েছিল, সেই কিষান মান্ডিগুলো খন্ডহার হয়ে পড়ে রয়েছে। সন্ধ্যাবেলা সেখানে অসামাজিক কাজের ক্ষেত্র হয়ে পড়ে রয়েছে। আপনারা বাংলাতে মান্ডি তৈরি করা সত্ত্বেও সেখানে বছরের পর বছর কোনো কাজ হয় না। আমরা যারা রাস্তায় ঘুরি, আমরা জানি বা আপনারাও কোথাও বেড়াতে গেলে এগুলো খুব ভালো বুঝতে পারবেন, আপনারা যখন শান্তিনিকেতন ঘুরতে যান, যখন দিঘা ঘুরতে যান, বকখালি ঘুরতে যান, আপনারা দেখবেন যে টিনের চাল করা আছে, লোহার ফ্রেম করা আছে, চারটে থাম করা আছে, কিন্তু সেই মান্ডিতে যে বছরের পর বছর কোনো কাজ হয় না। সেটা ওখানে তৈরি হওয়া ঝোপ জঙ্গল থেকে আমি আপনি সহজেই বুঝতে পারব।

    বোধিসত্ত্ব: কেন্দ্রীয় সরকার একটা প্রস্তাব এনেছেন। দেখুন কোঅপারেটিভ মার্কেটিং বিষয়টাকে, অর্থাৎ কৃষিপণ্য বিপণনের বিষয়টাকে কোঅপারেটিভ মার্কেটিং এর মাধ্যমে করতে না পারাটা, বা একে সঠিক জায়গায় না নিয়ে যেতে পারাটা অনেক বামপন্থীরাও মনে করেন যে, এটা বামফ্রন্ট সরকারের একটা অন্যতম ব্যর্থতা। যদিও ক্রয় তারা ঠিকঠাক করতে পেরেছিলেন। গণভিত্তিটা খানিক বাড়াতে পেরেছিলেন, উপভোক্তাদের কাছে সেই জিনিসটা ঠিকঠাকভাবে পৌঁছে দেওয়া, যাতে বাজারের অন্যান্য স্তরগুলো কমতে পারে, সেটার একটা ভালোরকম সীমাবদ্ধতা তাদের ছিল। কিন্তু এটার একটা পরিবর্ত হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকার যেটা এনেছে, যেটা বিহারে ২০০৬ সালে শুরু হয়েছে ওডিশা, মধ্যপ্রদেশেও বোধহয় শুরু হয়েছে, সেটা হচ্ছে মেখলা কৃষ্ণমূর্তির লেখাটা আমি পড়েছি, সেগুলো হচ্ছে এফপিও, কিন্তু সেগুলো মূলত কর্পোরেট, লাভের লক্ষ্যে চলা ব্যবসা। মৌলিক ভাবে কো অপারেটিভ গঠনের থেকে আলাদা।

    কো অপারেটিভ বিশুদ্ধ সাধু লোকে ভরা ছিল, সেটা যেমন কেউ দাবি করছে না, তেমনি এই এফপিও যেগুলি তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাতে বলা হচ্ছে অবশ্য যে মধ্যসত্ত্বভোগীদের দুর্বল করা হচ্ছে। কিন্তু অন্তত লেখালেখি পড়ে মনে হয়েছে, যে সেটা আর কিছুই না একটা নতুন ধরনের মধ্যসত্ত্বভোগী তো পুরোপুরি কর্পোরেট, এবং পুঁজির স্বাভবিক নিয়মেই বৃহত্তর পুঁজির সংগে জড়িত। এর কি অন্যথা কিছু দেখছেন নাকি আমি সম্পূর্ণ ভুল বুঝছি?

    অভিষেক ব্যানার্জি: কোঅপারেটিভ এবং কর্পোরেটের মধ্যে তুলনা করতে গেলে আমরা দেখতে পাব এরা কিন্তু সামগ্রিকীকরণের মাধ্যমে কাজটা করে। সামগ্রিকীকরণ যখন হয় তখন কোঅপারেটিভের সাথে কর্পোরেটের পার্থক্য যেটা হয়ে যায়, সেটা হল—লভ্যাংশ টা ভাগাভাগি হয়। কো অপারেটিভ এর ক্ষেত্রে। কর্পোরেটের ক্ষেত্রে ব্যাপাটা সেরকম হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না? আর এই কৃষি আইনে একটা খুব অদ্ভুত কথা বলেছে। সেটা হচ্ছে, আপনার এফপিও-র ক্ষেত্রে আপনি ভেবে দেখুন। এনারা বলছেন, আগে আপনার কৃষিবাণিজ্য করতে গেলে আপনাক একটা লাইসেন্স নিতে হত। ২০১৯ সালের আগে আপনি যদি চাইতেন যে ওঠার মুখে কিছু আলু কিনে আপনি রেখে দেবেন, যাতে পরে দাম বাড়লে সেটা বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন, আপনার সেটা সম্ভব ছিল না, সেটা বেআইনি কাজ হত কিন্তু এখন আপনি করতে পারবেন কারণ আপনার কাছে একটা প্যান কার্ড আছে। অর্থাৎ আমি কিন্তু এটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলাম, অর্থাৎ আমি কিন্তু ফড়ে ব্যাপারটা প্রাতিষ্ঠানিক করে দিলাম। এটা হচ্ছে এক। দুই, এফপিও-র ক্ষেত্রে, এবার ভারতবর্ষের খুব দুর্ভাগ্যজনক একটা স্ট্রাকচার হচ্ছে, সমস্যা হচ্ছে যে আমি খাতায় কলমে বলতেই পারি যে এটা কৃষকদের সংগঠন। ঠিক কথা। কিন্তু সেই কৃষক এই সংগঠনের শীর্ষে পৌঁছে যাবে যে প্রভাবশালী। কোনো ভাগচাষি এফপিও-র শীর্ষে পৌঁছোতে পেরেছে সেটা আপনি দেখাতে পারবেন না। না বিহারে পাবেন, না রাজস্থানে পাবেন। এটা বাস্তব। এটা হতে বাধ্য। কেউ যদি অন্য কিছু বলেন তাহলে বুঝতে হবে সে ভাবের ঘরে চুরি করছে। এবার তাই যদি হয়ে যায়, ওনারা প্রথম যুক্তি যেটা দিয়েছিলেন যে এটাতে বড়ো কৃষকদের সমস্যা, কিন্তু ছোটো কৃষকদের অসুবিধে, সেক্ষেত্রে নিজেদের কথাটা তো নিজেরাই ভুল প্রমাণিত করছেন। এটা তো হতে পারে না। আমার কাছে যদি একরের পর একর জমি থাকে, আমি তো চাইব কন্ট্রোল করতে। যেই মুহূর্তে কন্ট্রোল করতে চাইব সেই মুহূর্তেই তো অলিগোপলি হয়ে যাবে।

    বোধিসত্ত্ব: আমি বুঝতে পেরেছি। আমি অনেকটা সময় নিয়েছি। আমি এবার একটু ইতিহাসের দিকে যাচ্ছি শেষ করার আগে। সেটা হচ্ছে সাধারণভাবে একটা সাধারণ সত্যের সামনে আমরা আছিই। প্রত্যেকবার এই কৃষক আন্দোলনের সময় এগুলো বোঝা যায়। বার বার এই ধরনের কৃষক আন্দোলন হয়। জমি অধিগ্রহণ আটকানোর জন্যও হতে পারে অন্য কোনো কারণেও হতে পারে। তাতে বরাবরই একটা কথা উঠে আসে যে স্বাধীনতার পর শিল্পায়নের ক্ষেত্রে যেরকম নেহরু সরকার বা তখনকার কংগ্রেস সরকার কতগুলি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যাতে তাঁরা মানুষের অংশগ্রহ ও মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের অংশগ্রহণ শিল্পক্ষেত্রে কিছুটা নিশ্চিত করেছিলেন। বা অন্যান্য বেশ কিছু ক্ষেত্র ছিল তাতে কিছুটা নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রে দেখা গেছে—উৎপাদন, বণ্টন বা বিপণন—এই তিন ক্ষেত্রেই সরকার একটু দেরিতে অংশগ্রহণ করেছে। তার নানা কারণ ছিল। পিডিএস খানিকটা খানিকটা তৈরি করেছে, বিপণনে তখনও সরকার সেভাবে অংশ নিতে চায়নি, তার পরে যখন খাদ্যাভাব তৈরি হয়েছে, ৫০-৬০-র দশকে নানা রকম সমস্যা তৈরি হয়েছে তখন তারা এই এমএসপি, হাই ইল্ড ভ্যারাইটি ইত্যাদির প্রচলন করেছে এবং তার পর থেকে সেটা চলেছে। এখন আপনার কাছে যেটা প্রশ্ন আমি সাংঘাতিক ইতিহাসের গলিতে ফিরতে চাই না কিন্তু দেখুন যদি পরিবেশের দিক থেকে দেখেন, তাহলে হাইইল্ড ভ্যারাইটি সাধারণ ভাবে দেখতে গেলে জলস্তরের একটা ক্ষতি করেছে এবং এক্ষেত্রে যে এমএসপি, ইন্সেন্টিভ আছে সেটা যতটাই কম বা ইনঅ্যাডিকুয়েট হোক না কেন সেটা একটা মোটামোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছে যেটা কোথাও পাওয়া যায় না। তাও সেটা চাষ করতে গিয়ে অন্যান্য পরিবেশগত ক্ষতি, দেশি খাদ্যশষ্যের দেশি ধানের জাত, দেশি গমের জাত হারিয়ে যাওয়ার একটা ক্ষতি হয়েছে। তো সেই ধরনের সচেতনতা যাদের আছে এবং তারা অনেক সময় যে-কোনো কারণেই হোক, কৃষক আন্দোলনের যে ব্যাপকতা এবং তীব্রতা তাতে বিরক্ত হয়েই হোক বা যে-কোনো কারণেই হোক, এমনকি যারা বিজেপির বা এখনকার ক্ষমতাশীল দলের সমর্থক, তাঁরা পরিবেশের দিক থেকে বলছেন যে এরকম ধরনের এমএসপি-কে ধীরে ধীরে দুর্বল করার একটা পরিবেশগত লজিক আছে। তাহলেই একমাত্র হাই ইল্ড ভ্যারাইটির চাষ কমবে এবং তাতে জলস্তরের অবস্থা একটু ভালো হবে এবং ওভার অল একটা ইকোলজিকাল ব্যালেন্স রিস্টোর হবে। এই লজিকটার সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে এগ্রি করা খুব কঠিন। কারণ যেখানে যেখানে শস্যে এমএসপি দেওয়া হয় না, সেখানে জলস্তর কমেনি তা নয়। সমস্যাটা অন্য। সমস্যাটা ইরিগেশনের সমস্যা। সরকার কেন অন্যান্য বিষয়ে যেটা আগে বিভিন্ন কংগ্রেস সরকার করেনি বলে এখনকার সরকার কেন বিভিন্ন পরিবেশের ব্যালেন্স রাখতে পারে এরকম চাষ যে সাংঘাতিক উৎসাহ দিয়ে শেষ করে দিচ্ছে এমনটাও নয়। তবুও নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ হিসাবে আপনি পরিবেশের বিষয় ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স নিয়েও সচেতন এবং খাদ্য সুরক্ষা, কৃষিশ্রমিক, ছোটো কৃষকের স্বার্থরক্ষা, কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্যের স্বার্থরক্ষা ও তার সঙ্গে পরিবেশ, কীভাবে ব্যালেন্স করে আপনাদের আগামি দিনের পলিসিতে ভাবেন?

    অভিষেক ব্যানার্জি: আপনি যখন এই কৃষিপণ্যের সঙ্গে পরিবেশটাকে যোগ করলেন, আমি তাহলে অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা প্রসঙ্গ তুলতে চাই, যেটাও এই লকডাউনের সময় হয়েছিল—এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অ্যাক্ট (ইআইএ)। এটা কৃষির সঙ্গে নয়, তবে জঙ্গলের অধিকারের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। তাই প্রথমেই বলি কেন্দ্রীয় সরকার যদি পরিবেশ সম্বন্ধে অসম্ভব রকমের সচেতন হয়ে থাকেন, উনি ফ্রান্সে গিয়ে বিশ্বউষ্ণায়ন সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিতে পারেন। কিন্তু আমরা তো ছোটোবেলায় শিখেছি প্র্যাকটিস হোয়াট ইউ প্রিচ, সেই ব্যাপারে আমরা দেখেছি অন্তত জঙ্গলের অধিকার সম্পর্কে ঝাড়খন্ডে মুখ থুবড়ে পড়লেন। আমি আপনি সবাই জানি জঙ্গল খুব ক্লাসিফায়েড জায়গা, সেখানে সবকিছু করা যায় না। কিন্তু আপনি যখন তাকে ডিক্লাসিফাই করে দিচ্ছেন এবং সেখানে যা খুশি করছেন। ইন্সিডেন্টালি বা অ্যাক্সিডেন্টালি হতে পারে যেখানে জঙ্গল সেখানেই খনিজের সম্ভার। কিন্তু তা হলেও কোথাও না কোথাও গিয়ে খনিজের জন্য জঙ্গলকে উৎপাটন করে দিতে পারি না। যাই হোক, প্রথম কথাটা আমি পরিষ্কার করে দিলাম যে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকৃতি বা পরিবেশ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনোরকম সহানুভূতি নেই। থাকলে বিলটি তারা পাস করতে পারে না। এবার আসা যাক আপনি পরিবেশ ও কৃষি নিয়ে যে প্রশ্নটা তুলেছেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এবং সত্যি বলতে কী, এটা নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা বলা যায়। এই যেমন একটা উদাহরণ দিই, যে ধান হল এমন একটা শস্য যে শস্যে একর প্রতি যে পরিমাণ জল লাগে আমাদের যব বা ভুট্টাতে সেই পরিমাণ জল লাগে না। এবার আপনি জল বাঁচাতে খাদ্যাভ্যাস প্রবর্তন করবেন কি না সেটা একটা অন্য তাত্ত্বিক আলোচনা। কিন্তু হ্যাঁ, এটা একটা সমস্যার জায়গা। তার পাশাপাশি আপনি যে কথাটা বললেন যে মনস্যান্টোর মতো কোম্পানি এসেছে, এ ছাড়া বিদেশি কোম্পানি, যারা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কাজকর্ম করে এবং হাই ইল্ড যে শস্যগুলো হয়, তাতে এমএসপিটা বেশি হয়। এবার সমস্যাটা হচ্ছে যে ধরুন তুলো। আমরা একদিকে বলছি যে সিন্থেটিক কমান, লিনেনের জামাকাপড় পরতে হবে। মানে আপনাকে দিনের শেষে সেই সুতোয় ফিরতে হবে। সুতো মানে কিন্তু সেই কার্পাসে ফিরতে হবে। তাহলে যদি তাই হয়, আপনি জানেন যে বিদর্ভ অঞ্চল জুড়ে যেখানে জলের সমস্যাটা অত্যন্ত প্রাচীন, সেই জায়গায় ছাড়া প্রাকৃতিক কারণেই চাষ সম্ভব না। কার্পাস উৎপাদন বা চা, আপনি জানেন, আমরা সেই সেভেন এইটের ভূগোলে লিখতাম যে চা উৎপন্ন করতে জল প্রচুর লাগে, কিন্তু জল ধরে রাখা যাবে না, তাহলে চায়ের গোড়া পচে যাবে। সেইখানে দাঁড়িয়ে আপনি যদি আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন যে এর ভারসাম্য এমএসপি দ্বারা হবে কি না—উত্তর না। শুধুমাত্র আমি অর্থ ইনসেন্টিভ দিচ্ছি বলেই এই ফসলগুলো উৎপন্ন হচ্ছে তা নয়। উত্তরটা হচ্ছে আমার মার্কেটে এর ডিমান্ড আছে বলে, আমার খাদ্যাভ্যাসে চাল, চা বা পরিধানের জন্য কার্পাসটা গুরুত্বপূর্ণ বলেই এটা তৈরি হচ্ছে।

    এমএসপি দিয়ে আমি বরঞ্চ কৃষকের হাতে আসা বিক্রয়মূল্যের ফ্লাকচুয়েশনটাকে কোনোভাবে আটকানোর চেষ্টা করছি। এগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক কুটকচালি। আপনি যদি বলেন আমি কালকে থেকেই লিনেনের জামা পরব না, আপনি যদি বলেন আমি কাল থেকে চাল খাব না, আমি আমার খাদ্যাভ্যাস চেঞ্জ করব বা বস্ত্রাভ্যাস চেঞ্জ করব বা পরিধানের অভ্যাস চেঞ্জ করব, তাহলে অন্য বিষয়। কিন্তু তাঁরা বলছেন যে এমএসপি দেওয়া হচ্ছে বলেই এই ফসলগুলো বেশি উৎপন্ন হচ্ছে, উত্তরটা তা নয়। এটা ছেলে-ভুলানো একটা কথা বা এটা একটা কুযুক্তি। এমএসপির সঙ্গে এটা গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে প্রকৃতিকে বাঁচাবার উপায়টা কী? আমরা অর্গানিক ফার্মিং করছি, আপনি যদি হিসেব করে দেখেন ২০০৫ সাল ইউপিএ ১-এর সময় প্রথমবার অর্গানিক ফার্মিং পলিসি বলে একটা পলিসি বেরোয় যেখানে বলা হয় হিমালয়ের পাদদেশে যে রাজ্যগুলো আছে সেই রাজ্যে কোনোরকম কেমিক্যাল ব্যবহার করা হবে না, না বীজে‌, না কীটনাশকে, না সারে এবং সিকিম হচ্ছে আমাদের প্রথম অর্গানিক ফার্মিং স্টেট, যেটা তকমা পেয়েছিল ২০১২ সালে। কিন্তু এটাও বুঝতে হবে আমাকে যে আমার ১৩৫ কোটির দেশ প্রতিদিন তার প্রত্যেকটা মানুষকে যদি দিনের শেষে দু-বেলা খাওয়াতে হয় তাহলে আমাকে কোথাও না কোথাও একটা ব্যালেন্স করতে হবে। যদি আপনি বলেন যে ব্যালেন্সটা কী হওয়া উচিত অভিষেক, সত্যি আমার কাছে তার কোনো উত্তর নেই। হয়তো অর্গানিক ফার্মিং একটা বিকল্প কিন্তু শুধু এই অর্গানিক ফার্মিং দিয়ে আমি ১৩৫ কোটি মানুষের মুখে অন্ন কালকেই জোগাতে পারব কি না আমার কাছে উত্তর নেই। তাই অবশ্যই আমাদের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে যারা হয়তো একটা ভালো ভবিষ্যৎ আমাদের উপহার দেবেন।

    আর কৃষির পদ্ধতির ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত অভ্যাসের ক্ষেত্রে আমাদের পরিবেশবিদ দের কথা শুনতেই হবে, কৃষককে ন্যায্যমূল্যদেওয়ার ব্যাপারে কুণ্ঠা করলে হবে না, সরকারকেও এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কৃষির থেকে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, খাদ্যভ্যাস থেকে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রিত হয়। পরিবেশের ভারসাম্যের ভাবনাকে আমরা সরকারি পরিকল্পনার প্রতিটি দিকেই আনতে চাই, সমস্ত ধরনের মানুষের কথা ভেবে।

    বোধিসত্ত্ব: আমি বুঝতে পেরেছি আপনাদের অবস্থানটা। আমাদের সময় প্রায় শেষ। অভিষেক, অনেক সময় দিলেন। অনেক ধন্যবাদ।

  • বিভাগ : আলোচনা | ১৬ এপ্রিল ২০২১ | ৭১৪ বার পঠিত | ৩ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Titi Ray | ২৫ এপ্রিল ২০২১ ১৩:৪৩105153
  • সাক্ষাৎকার টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রশ্ন, প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, এবং যেটা ভালো লেগেছে, এই তরুণ রাজনীতিবিদ কোনোটিই এড়িয়ে না গিয়ে যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে সেগুলির উত্তর দিয়েছেন। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকব।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়া দিন