ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (১২৩৬-১২৪২ খ্রিষ্টাব্দ) চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরিদের নেতৃত্বে মঙ্গোলরা যখন ইউরোপে আক্রমণ চালায়, তখন তার পেছনে কোনো একক কারণ ছিল না। এটি ছিল তাদের বিশ্বজয়ের পরিকল্পনা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং অর্থনৈতিক কৌশলের একটি জটিল মিশ্রণ।
মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খান বিশ্বাস করতেন যে, তেনগ্রি (আকাশের দেবতা) মঙ্গোলদের সমগ্র পৃথিবী শাসনের অধিকার দিয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সন্তানদের সাম্রাজ্য বিস্তারের যে নির্দেশ দিয়ে যান, তাতে "সূর্য যেখানে অস্ত যায়" (অর্থাৎ পশ্চিম দিক) সেই পর্যন্ত ভূখণ্ড জয় করার কথা বলা হয়েছিল। চেঙ্গিস খানের নাতি বাতু খান এবং সেনাপতি সুবুতাই মূলত এই আদেশ বাস্তবায়ন করতেই ইউরোপের দিকে অগ্রসর হন।
মঙ্গোলরা যখন মধ্য এশিয়া এবং রাশিয়ার স্তেপ (তৃণভূমি) অঞ্চল জয় করছিল, তখন যাযাবর কুমান (Cuman) উপজাতিরা মঙ্গোলদের কাছে পরাজিত হয়ে হাঙ্গেরিতে পালিয়ে যায় এবং সেখানে আশ্রয় নেয়।
মঙ্গোলদের যুদ্ধরীতি অনুযায়ী, তাদের শত্রুদের যারা আশ্রয় দেবে, তারাও মঙ্গোলদের শত্রু বলে গণ্য হবে। বাতু খান হাঙ্গেরির রাজা চতুর্থ বেলা-কে চিঠি দিয়ে কুমানদের সমর্পণ করার দাবি জানান। হাঙ্গেরি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে মঙ্গোলরা হাঙ্গেরি তথা ইউরোপ আক্রমণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
মঙ্গোল সেনাবাহিনী ছিল মূলত অশ্বারোহী নির্ভর। প্রতিটি মঙ্গোল যোদ্ধার সাথে একাধিক ঘোড়া থাকত। ফলে তাদের বিশাল ঘোড়ার পালের জন্য প্রচুর সবুজ ঘাসের বা চারণভূমির প্রয়োজন হতো। হাঙ্গেরির সমভূমি (Great Hungarian Plain) ছিল ঘোড়া চারণের জন্য আদর্শ জায়গা।
এছাড়া ইউরোপের সমৃদ্ধ শহরগুলো লুণ্ঠন করা এবং সেখান থেকে দাস ও কারিগর সংগ্রহ করাও মঙ্গোলদের অন্যতম অর্থনৈতিক লক্ষ্য ছিল।
মঙ্গোলদের চমৎকার গোয়েন্দা ব্যবস্থা ছিল। তারা আক্রমণের আগেই ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছিল। তারা জানতে পেরেছিল যে:
* ইউরোপের রাজ্যগুলো (যেমন- পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য) নিজেদের মধ্যে কোন্দলে লিপ্ত।
* পোপ এবং পবিত্র রোমান সম্রাটের মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছিল।
এই রাজনৈতিক বিভাজনকে মঙ্গোলরা বড় সুযোগ হিসেবে দেখে এবং বুঝতে পারে যে ইউরোপীয়রা তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে পারবে না।
মঙ্গোলরা ইতিমধ্যেই রাশিয়া (রুশ প্রিন্সিপালিটিগুলো) জয় করেছিল। রাশিয়ার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং পশ্চিম দিক থেকে যেন কোনো পাল্টা আক্রমণ না আসে, সেজন্য ইউরোপের শক্তিশালী রাজ্যগুলোকে (বিশেষ করে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি) গুঁড়িয়ে দেওয়া তাদের সামরিক কৌশলের অংশ ছিল।
১২৪১-১২৪২ সালের মধ্যে মঙ্গোলরা পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরিকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে ভিয়েনার দোড়গোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।
কিন্তু ১২৪১ সালের ডিসেম্বরে মঙ্গোলিয়ার প্রধান খাগান (সম্রাট) ওগেদাই খানের মৃত্যুর খবর পৌঁছালে, নতুন খাগান নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাতু খান আকস্মিকভাবে ইউরোপ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন।
ফলে পশ্চিম ইউরোপ এক প্রকার অলৌকিকভাবে মঙ্গোল ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যায়।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।