• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • নতুন ভারত, নিউ লাইন - লাভ জেহাদের একুশে আইন    

    Samir Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ২৮১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার

  • যা আশঙ্কা করা হচ্ছিল তা-ই সত্যি হল। লাভ জেহাদ রোখার নামে আইন করে ভিন ধর্মে বিয়ে (আরও ভাল করে বললে মুসলমানের সঙ্গে হিন্দুর) রোখার পথ পরিস্কার করে ফেলল উত্তরপ্রদেশ সরকার। অন্য ধর্মে বিয়ে রুখতে একেবারে বিবাহ বাসরে উপস্থিত হল যোগী রাজ্যের পুলিশ। আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ ৪ ডিসেম্বর ২০২০ লিখেছে যে ২ ডিসেম্বর লখনউয়ের পারা এলাকার দুদা কলোনীতে একটি বিয়ের সব আয়োজন সারা হয়েছিল। যেখানে হিন্দু পাত্রীর সঙ্গে মুসলিম পাত্রের বিয়ে হবে। কিন্তু আচার অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই বিবাহ বাসরে উপস্থিত হয় লখনউ-এর পুলিশ। বলা হয় দু-পক্ষকেই থানায় যেতে হবে। থানায় তাদের নতুন আইনের কথা শোনানো হয়। নথি ধরানো হয়। এই বিয়ে যে দুই পরিবারের সম্মতিতেই হচ্ছে তা পুলিশের কাছে প্রকাশ করে দুই পরিবার। অর্থাৎ জানানো হয় এর সঙ্গে ধর্মান্তরকরণের কোনও সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে দু’পক্ষই লিখিত সম্মতি জানায় থানায়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয় নি। পুলিশ জানায় নতুন আইন অনুসারে লখনউ জেলা শাসকের থেকে অনুমতি নেওয়ার পরই বিয়ের অনুষ্ঠান হতে পারে। লখনউয়ের পারা এলাকার ঘটনা ঠাঁই পেয়েছে দেশের প্রায় সব সংবাদপত্রেই।

    কথা হল তাহলে হাতে রইল কি? এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও একটা পাঁচিল খাড়া হয়ে গেল আড়াআড়িভাবে। ভারতবর্ষে এই দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিয়ের মধ্যে সামাজিক চোখ রাঙানি তো ছিলই,এবার তার সঙ্গে যোগ হল আইনি হাতিয়ার। নতুন ভারতে এ এক আশ্চর্য জাগরণ। শত শত বছর ধরে এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি থেকেছে,একই জল হাওয়ায় বড় হয়েছে,একই গুরুর কাছে গান শিখেছে,একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নামক শিক্ষা অর্জনের সার্টিফিকেট পেয়েছে,হিন্দু মায়ের রান্না করা পায়েস খেয়ে মুসলিম ছেলে বাঃ বলেছে,মুসলমানের ঘরে রান্না হওয়া বিরিয়ানির স্বাদে হিন্দু ঘরে আনন্দের বান ডেকেছে তবুও দুই ধর্মের রেষারেষি কাটল না। এ যেন সেই চিরাচরিত প্রবাদ অনুযায়ী তেলে জলে মিশল না। দুই ধর্মের দাদাগিরির আগুনে ক্ষতের প্রলেপ দিতে মাঝেমধ্যে কিছু মিডিয়া নিজ গুনে হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই সম্পর্কিত নানা খবর ছাপে। তাতে আকাশ বাতাস আলোকিত হয়। আমাদেরও আনন্দের সীমা থাকে না। কিন্তু বিশ্বাস বদল হয় না। দুই রক্তমাংসের শরীর ধর্ম নামক পাঁচিলের বাধা পেরিয়ে পারিবারিক সম্পর্কের বাঁধনে আবদ্ধ হতে গেলেই ওঠে প্রশ্ন। যেন সবকিছু রসাতলে যেতে বসেছে।

    এখন প্রশ্ন হল লাভ জেহাদ ব্যাপারটা কী? আসলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে এক শ্রেণির মুসলমান যুবক হিন্দু মেয়েদের কাছে প্রেমের অভিনয় করে। এরপর তারা ওই মহিলাকে বিয়ের মাধ্যমে ধর্ম পরিবর্তন করায়। তাদের কথায়,এইভাবেই প্রেমের মাধ্যমে ‘জেহাদ’ করা হচ্ছে । এই জন্যই তাকে বলে ‘লাভ জেহাদ’। যদিও এই রকম অভিযোগের স্বপক্ষে কোনও তথ্যমূলক যুক্তি নেই। এটা খুব পরিস্কার যে দুই সম্প্রদায়ের মেরুকরণের উদ্দেশ্যে এই ধরণের অপপ্রচার এবং বিদ্বেষকে হাতিয়ার বানানো হচ্ছে।

    অথচ যখন উত্তরপ্রদেশ সরকার লাভ জেহাদ নিয়ে অর্ডিন্যান্স আনার কথা ভাবছে ঠিক তার আগেই নভেম্বর মাসে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ( সালামত আনসারি ও প্রিয়াঙ্কা খারওয়ার (আলিয়া) মামলা ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। বলা হয় দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, তাঁরা যেই ধর্মেরই হোক না কেন, স্বেচ্ছায় নিজেদের সঙ্গী বেছে নিতে পারবে। সঙ্গী বেছে নেওয়ার জন্য তাঁদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। দুই ধর্মের মানুষের বিয়েতে হস্তক্ষেপ করতে নারাজ হাইকোর্ট।

    এই রকম ভাবেই সম্প্রতি কর্নাটকে একটি হিন্দু মেয়ে মুসলিম পরিবারের একটি ছেলেকে ভালবেসে বিয়ে করতে চাইলে(ওয়াজিদ ও রামিয়া মামলা) মেয়েটির পরিবার থেকে চরম বাধা দেওয়া হয়। বিষয়টি একটি এনজিওর হাত ধরে আদালতে পৌঁছোলে কেসের রায় হিসেবে কর্ণাটক হাইকোর্ট জানায় যে কেউ যে কোনও ব্যক্তিকে ভালবেসে নিজের স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ে করতে পারে। এক্ষেত্রে সেটা অপরাধযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। কেউ এই বিয়ে দুজনের সম্মতি ছাড়া আটকাতে পারে না। কিন্তু হাইকোর্ট ভারতের বহুত্ববাদের কথা মনে রেখে ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার কথা বললেও হিন্দুত্বের স্বঘোষিত রক্ষকেরা তা শুনবেন কেন?

    তবে শুধু উত্তরপ্রদেশই নয় লাভ জেহাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আইন প্রণয়নের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে হরিয়ানা এবং কর্নাটক। সেই রেশ ধরে দ্রুত নয়া বিল পেশ করতে চলেছে আরও এক রাজ্য মধ্যপ্রদেশ। ভোপালে সেরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্র জানিয়েছেন যে লাভ জিহাদের বিরুদ্ধে শীতকালীন অধিবেশনে ধর্ম স্বতন্ত্র বিল পেশ করা হবে। জোর করে দুই ধর্মের মধ্যে বিয়ে করলে বা ‘লাভ জেহাদ’-এর প্রচার করলে নয়া বিলে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে ।

    একটি জুয়েলারি সংস্থা তাদের বিজ্ঞাপনে মুসলিম পরিবারে বিয়ে হয়ে আসা এক হিন্দু তরুণীর সাধভক্ষণ ঘিরে ধর্মীয় ঐক্যের বার্তা দিয়েছিল। রে রে করে উঠেছেন একদল মানুষ। লাভ জেহাদে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় ভারত বিখ্যাত সংস্থাটি ক্রেতা হারানোর ভয়ে বিজ্ঞাপনটি বন্ধ করে দিয়েছে।

    সংবাদমাধ্যমের তথ্যই বলছে যে লখনউয়ের পারা এলাকার দুদা কলোনীতে যে বিয়ে হচ্ছিল সে পাত্র ছিল পেশায় ফার্মাসিস্ট। বয়স ২৪ বছর। প্রতিবেশী কনের বয়স ২২ বছর। কয়েক বছরের প্রেমের সম্পর্ক এদিন পরিণতি পাওয়ার কথা ছিল বিবাহে। পাত্রের কথায়, ধর্মান্তরণের কোনও প্রশ্নই নেই। পাত্রীর মা জানিয়েছেন আমরা যে কলোনিতে থাকি, সেখানে হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে থাকে। আমাদের বহু মুসলিম বন্ধুও রয়েছেন। তাহলে আমার মেয়ে কেন একজন মুসলিমকে বিয়ে করতে পারবেন না? নতুন আইন অনুযায়ী অনুমতি নেওয়ার কথা তারা জানতেন না বলে জানিয়েছেন পাত্রী নিজে।

    আজকের নবীন প্রজন্ম পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় জাতপাত ও ধর্মকে তোয়াক্কা না করে প্রেম করে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন স্বাধীনভাবে। নারী-পুরুষের ভালবাসার সম্পর্কে ধর্মের পাঁচিল মাথা তুলে দাঁড়াবে কেন? কিন্তু মেরুকরণের উদ্দেশ্যে লাভ জিহাদ প্রশ্ন তুলছে এই চ্যালেঞ্জটাকেই। এটাই আমাদের নতুন ভারতবর্ষ। ধর্ম পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠছে একজন নাগরিকের। আপনার আমার উপর প্রতিনিয়ত নজর রাখছে রাষ্ট্র। আপনি কী খাবেন,কী পরবেন, কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করবেন, এমনকি কাকে ভালবেসে বিয়ে করবেন সেটা ঠিক করে দেবে নীতি পুলিশ। আপনার কুঁড়েঘরে ভালবাসার রাজপ্রাসাদ বানানোর আগে দিতে হবে মুচলেকা। তাতে যদি কোনও মনোবিদকে মানসিক অবসাদে প্রেমিক-প্রেমিকার মৃত্যুর সার্টিফিকেট লিখতে হয় তবুও আচ্ছা - ধর্মটা তো বাঁচল।
  • বিভাগ : ব্লগ | ১৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ২৮১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Rajarshi Raychaudhuri | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ০৫:৫০101137
  • Appertheid কথাটার অর্থ শিখেছিলাম  apartness. বলপূর্বক আলাদা করে রাখা।


    ভারতবর্ষের এককালের গর্ব ছিল অ্যাপারথাইড বিরোধী আন্দোলন।


    সেই গর্বের জায়গাটা আর থাকলো না! 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট প্রতিক্রিয়া দিন