• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • করোনাকালীন ( দুই)

    Anuradha Kunda লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২১৫ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • #করোনাকালীন (দ্বিতীয়)
    ঝড়
    একটা টিলার মত উঁচু ভূমিখণ্ডের ওপর বসেছিল বশির, আমির এবং ওদের গোটা পরিবার। আম্মার গায়ে জ্বর, বেদনা। বশিরের ডান পা কেটে গেছে টিনে। রক্ত পড়ছিল দরদর করে। বশিরের দাদা আমিরের বউ গর্ভবতী। বড় তিনটে ছেলে। এবার একটি কন্যাসন্তান আশা করে আছে ফরিদা। শ্যামলা রঙে ভাসা ভাসা চোখ । সারা বিকেল , সন্ধ্যা ধরে দেখেছে বাড়িটা উড়ে গেল।ধাড়ার বেড়ার দেওয়াল ধ্বসে পড়ল আগে।উড়ে গেল মাথার ওপরের টিন। একটাই ঘর ছিল। মাঝে ছালা দিয়ে পার্টিশন করে একদিকে আমির, ফরিদার সংসার। অন্যদিকে আম্মা। নানী।বশির।সুহেল। মাঝে মাঝে সালমান থাকত ইদানিং ফিরে এসে। টিনের চাল উড়ে গেল তাসের মত।।
    শুধু বশিরদের ঘরের না।আশপাশের অনেক ঘর তখন পড়ে যাচ্ছে। নিচু জমির ওপর বাড়ি।ভদ্রলোকেরা বলে লো ল্যান্ড ।দেওয়াল পড়বেই। তবে ঐ বাঁশের বেড়ার ঘরে নতুন বউ হয়ে এসেছিল ফরিদা। আমির লম্বা, ছিপছিপে সুঠাম এক মৎসজীবী তখন। ফরিদার চোখভরা হাসি।আমির বশিরের বাপ , পরদাদাও মাছ ধরেছে। যারা মাছ ধরে তারা বলতে গেলে দিন আসে দিন খায়।যেদিন বেশি মাছ, সেদিন একটু ভালো খাওয়া দাওয়া ।যেদিন কম, সেদিন খাওয়াও কম।ওদের পরদাদা ছিল জালাল মাঝি। লোকে বলতো জালাল মাঝির নৌকা খালি ফিরত আসে না। জালাল মাঝি এলাকার নামজাদা মানুষ ছিল বটে।জালালের তিন নম্বর ছেলে সালাহউদ্দিন ওদের বাপ।সেও মাছ ধরেছে।আমির বংশের মধ্যে প্রথম ট্রলারের মাঝি হয়েছে।এটা পদোন্নতি তো বটেই ।এইসব দেখেশুনেই ফরিদার আব্বু আমিরের ঘরে মেয়ে দিয়েছিল।সেই ঘর ঝড়ে উড়ে গেল কোথায় ।শাদির সময় কয়েক ডজন মুরগি দিয়ে গেছিল ফরিদার আব্বু। ঐ একখানা ঘরের মধ্যেই পলোর নিচে রাখা ছিল মুরগিগুলো।টানা তিনচারদিন । সে কী আনন্দ!চালের রুটি বানিয়েছিল আম্মী।নিজে হাতে দশ বারো ঘর লোকের রান্না করেছে ঘরের সামনে ঐ মাটির চুলাতে। বাপের বাড়ি থেকে কয়েক হাড়ি পিঠা এসেছিল। শীতকালে বিয়া। কতদিন রেখে রেখে ঐ পিঠা খেয়েছে সবাই। ফরিদার ফুফুর হাতের পিঠা।কিছু থাকল না।কিছু না। ছানা বুকে চেপে ফরিদা দেখল টিনের বাক্স ভেসে চলে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে বিয়ার শাড়ি।পিঠার হাড়ি। আব্বুর দেওয়া ঘড়ি। বেগুনি রঙের জমির ওপর সলমা চুমকি বসানো শাড়িতে ফরিদা। গোসল সেরে নতুন পাঞ্জাবি পরে এসেছে আমির ।গায়ে আদরের গন্ধ, যাতে মাছের গন্ধ ঢেকে যায়।সব গন্ধ কোথায় যেন সব ভেসে যায়।একটা ফোটো তুলেছিল ফরিদা আর আমির। তখন ছেলেপুলে হয়নি। গোঁসাবার স্টুডিওতে রঙীন ছবি।দুজনেরই হাসি মুখ। একটা ফ্রেমে সেঁটে রেখেছিল। ছবিটা বুঝি গেল ভেসে। ও কী আর থাকে!
    শাড়ি জামা ভিজে সপসপ করছে। পুরনো একটা প্ল্যাস্টিক জড়িয়ে বাচ্চাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল ফরিদা। কোলের এবং পেটের। দুটোকেই বাঁচাতে চেয়েছিল। বড় দুটোকে ডানায় জাপটে বসেছিল আমির।তার বলিষ্ঠ দুটো বাহু দিয়ে কিলো কিলো মাছ সে জালে তোলে। কিন্তু সেদিন মনে হচ্ছিল যার হাতে কোনো জোর নেই।হালকা বাঁশের মত। প্যালপ্যাল করছে।ছেলেদুটো উড়ে যাবে যেকোনো সময়ে।
    নানী কেঁপে যাচ্ছে সমানে। আম্মীকে নিয়ে আঁকড়ে বসেছিল বশির।চোখের সামনে শুধু ধুলো আর অন্ধকার।শব্দে যেন কান ফেটে যায় । বাচ্চাগুলো চিৎকার করে কাঁদছে। তাদের থামানোর কোন উপায় তখন কারু জানা নেই।ঝড়ের শব্দে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল চিৎকার ও কান্না।একটানা গোঁ গোঁ আওয়াজ ঝড়ের।
    এখানে সব বাড়ির মাথাতে টিন বা অ্যাসবেসটস। খেলনার মত পড়ে যাচ্ছে এক এক করে। গাছের তলাতেও বসা যায় না। এলাকার বড় গাছ পড়ে যেতে শুরু করেছে সশব্দে। সুলেমান আলি ভিজতে ভিজতে বলল, আল্লা, রহেম করো।বাড়ির সকলে আতঙ্কে আছাড়িপিছাড়ি করছে। এইরকম ঝড় সে তার সত্তর বছর বয়সে দেখে নি। কেবল তার মেজ ছেলে সালমান, চোখে একরাশ সমুদ্রের ঢেউ নিয়ে পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকল ভাঙা বাড়ির দোরগোড়ায় ।

    ঝড়ের শব্দ ছাপিয়ে একবারই একটা কলরব উঠেছিল। একটা তীক্ষ্ম চিৎকার ।
    লিয়াকতের বাড়িতে কেউ নেই। বউ গেছে বাপের বাড়ি তিন বছরের ছেলে নিয়ে । ঝড়ের সময় ঘরে ফিরে তালা খুলতে গেছিল লিয়াকত।অ্যাসবেসটসের স্লিট এসে গলাতে বসে গেছিল তার। গলা কেটে রক্তপাত হয়ে মরে গেল উনত্রিশ বছরের লিয়াকত আলি।
    সারাদিন রোজা চলেছে।ইফতারের সময় পায়নি কেউ।ভয়ে খিদে চলে গেছে যেন।কেবল বাচ্চারা হাঁক পেড়ে কাঁদছে। মেয়েরাও।
    খানকা শরিফ ভেসে গেল বোধহয় । কে যেন চেঁচিয়ে বলল, গোপাল ঢালি জলের তোড়ে ভেসে গেছে। কারু মুখে আর কোনো কথা নাই। মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে মেয়ে মরদ সবাই। ডাইনোসর নাচছে তার আদিম নৃত্য । থপ থপ করে পা ফেলছে যেখানে ইচ্ছে সেখানে।লেজের ঝাপটে ছিটকে দিচ্ছে বাড়িঘর ।গাছ।
    সুহেল, সালমান, মজিল পুকুরের দিকে তাকিয়েছিল।হুড়মুড় করে নদীর জল ঢুকে পড়ছে পুকুরে। একটাও মাছ থাকবে না আর।একটাও না।সব নদীতে ভেসে চলে যাবে নয় মরে যাবে। জোয়ান ছেলেগুলো মুখ শুকনো করে উদোম ভিজছে।বহুকাল আর মাছ পাওয়া যাবে না।মরে যাবে মাছ। ভাবতেই মাথার মধ্যে খিদে মোচড় দিয়ে ওঠে আর তারপর পেটের মধ্যে নামতে থাকে। রোজার পর খাওয়া নাই। শরীর যেন শরীর না।হাওয়া ।
    সুলেমান , সালমান, মজিদ, গোপাল দাস ।এরা সবাই কোভিডের তাড়ায় বাড়ি ফিরেছে। ফেরার সময় গোপালের একহাত হয়ে গেছে মালিকের সঙ্গে । ফেরার খরচা পাতি কিছুই দিতে চায়নি মালিক। কোচিনে ওরা নৌকার শেয়ারিং পায়। প্রতি নৌকাতে ন'জন লোক থাকে।মাছের শেয়ার হয়ে জনপ্রতি পনেরো হাজার টাকা মাসিক আয়। নিজেদের জন্য হাজার পাঁচেক রেখে বাড়িতে দশ হাজার পাঠাতে পারে ওরা। মার্চ মাস থেকে সেই আয়টুকু বন্ধ । গোপাল দাস আর ফিরবে না কোচিনে।সুহেলও বলছে ফিরবে না।মালিকের সঙ্গে যা ঝগড়া হয়েছে! তবে সালমান ফিরবে। ওর চোখে সমুদ্রের নেশা আছে। মাঝসমুদূরের নিলাজ নীল মায়া লেগে আছে ওর চোখে। সাঁ সাঁ করে ট্রলার নিয়ে বেরিয়ে যাবার নেশা। সালমান আর কোনোদিন পুকুরে, নদীতে মাছ ধরতে পারবে না। ওর ঘিন আসে। ও সমন্দর যাবে।আবার।
    প্রবল ঝড় আর বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সালমান দেখতে পাচ্ছিল ও ট্রলারে যাচ্ছে মাঝ সমন্দরে। একা।
    আর ভিজে লাট হতে হতে ফরিদা দেখল, বাড়িঘর সব পড়ে গেছে।কিছু নাই ।কিছু নাই। শুধু ওর মাটির উনান ভাসে নাই। চেপ্টে গেছে
    কিছুটা। কিন্তু আছে। আখা জ্বলবে তাহলে আবার। ঠিক জ্বলবে একদিন, ঝড় থেমে গেলে।কিন্তু ছবিটা কী খুঁজে পাবে আর? কাদামাটিতে মিশে যাবে কখন!একখানই বটে ছবি ছিল ফরিদার আমিরের সঙ্গে ।

    টিভি থেকে যারা এসেছিল , তাদের সবার মুখে মাস্ক ।হাতে হাতজামা। ছেলে বেশি।মেয়ে কম।অনেকের মাথাতে প্ল্যাস্টিকের টুপি। কমবেশি একরকম কথাই জিজ্ঞেস করছিল ওরা। কতজন লোক গ্রামে।কতজন মারা গেছে। বাড়িঘর পড়ে গেছে কতজনের। জমির খবর নিচ্ছিল। ধান শেষ হয়ে গেছে সবটাই। ভেসে গেছে। পুকুর শুখা হয়ে যায় মাছের সিজন শেষে।তখন ঐ জমিতে ধান রোয়া দেয়। ভেসে গেছে সব।
    ওরা বলছিল সব দূরে দূরে থাকো। দূরে থাকার কথা কেন বলছে ওরা বুঝল না তেমন কেউ।ফরিদা ওড়না দিয়ে মুখ মাথা ঢেকে রেখেছে। বাকি মেয়েরাও তাই।।মুখবাঁধা কাপড় নিয়ে স্কুল বাড়িতে গিয়ে উঠল গোটা গ্রাম।সেখানে আলো নেই।জল নেই। মাথার ওপর ছাতটুকু আছে শুধু ।

    ত্রাণ ধরা একটা বড় কাজ।হ্যাঁ ।এটাই বলে ওরা।ত্রাণ ধরতে হবে।কে কীভাবে কী ধরবে, সেটা সেইই জানে।কোনো কোনো ত্রাণের পুঁটলিতে ছেঁড়া জামাকাপড় আসে।এত ছেঁড়া যা পরা যাবেই না। ন্যাতা কানির কাজে লাগবে। ওমনি করে বান্নিটোলার মণি দাস , বয়স ষাঠ ।একটা বস্তা পেয়েছিল।ছুঁড়ে দিয়েছিল ট্রাক থেকে। মণি টেনে নিয়ে গিয়ে দেখে এক বস্তা স্যানিটারি ন্যাপকিন।

    কুয়াশায় সব গাছ হলুদবর্ণ হয়ে গেছে।রিলিফে একধামা মুড়ি আর গুড় পেয়েছে জুমানি সর্দার। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স।আয়লাতে সব খেয়েছিল।চাষের জমি শেষ হয়েছিল নোণা জল ঢুকে।সব মাছ মরেছিল। অনেক কষ্টে একটা এন জি ও ধরে কাছাকাছি একটা পুকুরে মাছ চাষ করতে পেরেছিল এবার।ঝড়ে সব গেল। জুমানির চোখ দিয়ে জল পড়ে না আর।বর গেছে বাঘের পেটে।এই অঞ্চলে জুমানির মত মেয়েদের বলে বাঘ- বিধবা।সাতজেলিয়াতে একশোর বেশি বাঘ- বিধবা আছে।একটা গোটা পাড়াই তো আছে ।
    বিধবা- পাড়া।শিবা সর্দার দুটো বেটি নিয়ে বিধবা পাড়াতে থাকে।বরকে বাঘে টেনেছে।পোল্ট্রির কাজ তার।ঝড়ে শ'খানেক মুরগি আর আশিটা মত মুরগির ছানা মরে গেছে।একটা মেয়ে উনিশ বছরের। আরেকটা ক্লাস টেন।দুই মেয়ের কাঁধে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে শিবা। কোমরে চোট পেয়েছে ঝড়ের দিন পড়ে গিয়ে।মাসে পাঁচ ছয় হাজার টাকা আয় তো ছিল বটে।এখন কিছু নাই।
    টুপুর নিথর দাঁড়িয়েছিল। জাহির বা মেধার কাছে ত্রাণের কাজ কিছু নতুন ব্যাপার না । কোভিডের শুরু ।লকডাউনের শুরু থেকেই তারা একেকটা অঞ্চল ধরে কাজ করে যাচ্ছে।
    টুপুর একটা বদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে খোলা প্রান্তরে পড়েছে। তার পা ডুবে যাচ্ছে লবণাক্ত মৃত্তিকায়।এ জীবন সে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি আগে।

    শ্যামার সংসার
    এত ধূলা।এত অন্ধকার আর এত,বাতাস।কিছু দেখা যায় না।মাথার ওপর থেকে টিনের চাল যখন উড়ে যাচ্ছে , তখন শ্যামার মনে হচ্ছিল একটা টিন যদি ঘাড়ে এসে পড়ে? বাবলুকে বুকের মধ্যে সেঁটে নিয়ে চৌকি ধরে বসেছিল শ্যামা। শুধু শব্দ। বুঝতে পারছিল বাসনপত্র উড়ে যাচ্ছে। পড়ে যাচ্ছে ঝনঝন শব্দে ।কী কোথায় যাচ্ছে কোনো ঠিক নাই। শ্যামা হাউহাউ করে কাঁদে বাবলুকে জড়িয়ে ।টুসিবৌদির জানালা খুলে গেছে। মালতিদের টিনের চাল উড়ে গেল চোখের সামনে দিয়ে ।এত ভয়ংকর ঝড় কখনো চোখে দেখেনি শ্যামা ।সব যেন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। বস্তিতে অধিকাংশ ঘরে টিনের চাল। সুখনলাল বলছিল ছাত ঢালাই করবে করবে। সেই আজ করবে আর কাল করবে।মানুষটাই হাওয়া হয়ে গেল।তার দেওয়া চালটুকু ছিল মাথার উপর। সেও উড়ে গেলে শ্যামা বেকুব বনে গেল। ঝনঝন শব্দ করে ভেঙে পড়ছে বস্তির উল্টো দিকে শোরুমের কাঁচ।মদন আর শিবু দৌড়ে গেল ঘরের সামনে দিয়ে চিৎকার করতে করতে । কোথায় গেল কে জানে।দরজা জানালা খুলে যাচ্ছে মনে হয়। দিগ্বিদিক জ্ঞান নেই শ্যামার ।শুধু বাবলুর মাথায় কিছু ভেঙে না পড়ে। ঘরের যেটূকু অংশে চাল বেঁচে আছে, হামাগুড়ি দিয়ে ছেলেটাকে টানতে টানতে নিয়ে বসলো শ্যামা ।খালি চৌকির পাশে একফোঁটা জায়গা। ওপরের টিনটুকু লেগে আছে।না হলে ভিজে শেষ হবে। অনেকটা ভিজে গেছে।সময় কখন পার হবে সেই অপেক্ষায় দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে বসে থাকল দুটো প্রাণী। হাজার হাজার প্রাণী। উড়ে গেল লক্ষ লক্ষ ঘরের চাল।টিন।টালি ।অ্যাসবেসটস।বঙ্গোপসাগর কাঁপছে। মাথার ওপর ছাত নেই।ভেঙে পড়ছে ঘরের দেওয়াল আর ফসল ভেসে যাচ্ছে খড়কুটোর মত। শ্যামাসুন্দরী তার মধ্যে সিকিখানিক খড়কুটোও না।
    এত বাতাস কোথায় থাকে, কোথা থেকে এলো মাগো! তিল তিল করে জমানো সংসার উড়ে যাচ্ছে চোখের সামনে দিয়ে । ভিজে ন্যাতাকানি হয়ে যাচ্ছে যথাসর্বস্ব । টিভি আছড়ে পড়ে গিয়ে জলে ভাসে।কুকুরগুলো বাইরে কেঁদে যাচ্ছে সমানে।ভেসে গেল বোধহয় জলের তোড়ে। কারেন্ট কখন চলে গেছে। ভর বিকেলবেলা ঘুটঘুটে অন্ধকার ।শ্যামার মনে হচ্ছে আর রক্ষা নাই।আর বাঁচবার উপায় নাই।কিন্তু সে নিজে না বাঁচলে ছেলেটা বাঁচবে কেমন করে। সে যে এখনো বড় ছোট।তারপর মাথার ওপর বাপ নাই। সুখন চলে গিয়েছিল বটে কিন্তু শ্যামার সংসার কেড়ে নিতে পারেনি। শাশুড়ি , ছেলে, ঘরদোর, বাসনকোসন আনাজপাতি , বউদিদের বাড়ি সব নিয়ে জাঁকিয়ে সংসার করেছে শ্যামা । একটা মানুষ তাকে ফেলে গেছে তো কী হয়েছে। শ্যামাসুন্দরী অমন কমজোরি মেয়েমানুষ নয় যে স্বামী লাথি মারলে কাঁদতে বসবে। সে তো আর পালায়নি।যে ভেগেছে সে বুঝুক । সে ভুগুক। ধম্মের কল বাতাসে নড়ে।বলতো শাশুড়ি মা। তা কার ধম্মের কল কীভাবে নড়ে সেসব শ্যামা জানে না অত।কিন্তু নিজের সংসারের হাল সে ছাড়েনি। দশরথ , সুফলদের সঙ্গে মশকরা করেছে সুখনের ওপর রাগে।অপমানে। খানিক নিজের মন ভোলাতে।কিন্তু সংসার এদিক থেকে ওদিক হতে দেয়নি। এমনকি ঐ দুর্মুখ শাশুড়ির ছাড়া কাপড় দু'বেলা সাবান ঘষে ফর্সা করে কেচেছে আর টানটান করে মেলেছে একফালি পিছনের ঘাসজমিতে। কাচা কাপড় তুলে ভাঁজ করতে শিখিয়েছিল বউদি। আগে শ্যামা যেমন তেমন করে ভাঁজ করত। মাঝখানে একটা ভাঁজ।তারপর গোটানো। বউদি হাতে ধরে শিখিয়েছিল কী করে জামা পেতে দুই কাঁধ বরাবর পিছনে ভাঁজ করতে হয়। হাতাও। তারপর বুকের কাছে ভাঁজ। তোষকের তলায় রেখে দিলে একেবারে ইস্তিরি। সুখনের আর ছেলের শার্ট ঠিক এভাবে ভাঁজ করত শ্যামা । শাশুড়ির সঙ্গে চুটিয়ে ঝগড়া করতে করতে পাট পাট করে ভাঁজ করতো বুড়ির থান। সব কাচা কাপড় ভাঁজ করে খানিক আলনাতে , খানিক আলনার নিচের বাক্সর ওপর গুছিয়ে রেখে গামছাগুলো দরজার পিছনে ঝুলিয়ে রাখত পেরেকে। ওঘর থেকে শাশুড়ি চেঁচাত, আমার গামছা আলাদা রাখলি না? তোদের সগড়ির গামছার সঙ্গে রাখলি ক্যানে? শাশুড়ির গামছা , কাপড় আলাদা করে তুলে রাখতে হত। রোদ লাগা কাপড়ে যে কী মায়া মায়া গন্ধ থাকে!
    সেই সমস্ত সংসার উড়ে যাচ্ছে চোখের ওপর দিয়ে ।ভেসে যাচ্ছে।ভেঙে যাচ্ছে। শ্যামার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে ভিজে ।টুসিবৌদির চিৎকার আর কান্না শোনা যাচ্ছে। কিছুই থাকল না আর।কিচ্ছু থাকল না। কোভিড এলেও শ্যামা দমেনি।বউদির টাকাটা ছিল হাতে।মাস্ক বানিয়েছে হরপ্রীতের সঙ্গে ।এখনো বেশ কিছু কাপড় জমানো ছিল ঘরে।থৈ থৈ জলে ভাসছে।
    এইবার আর কিছু থাকল না। সুখনলাল পারেনি। কোভিড পারেনি । কোয়ারেন্টাইনেও শ্যামা ভেবেছে ফিরে ঘরদোর শুদ্ধ করবে। নতুন করে কাজ শুরু করবে মাস্ক আর স্যানিটাইজারের । কিন্তু সব ভাসছে। শ্যামার বোধবুদ্ধি নাই আর। ঘরের কোণে বসে আকাশে তাকাতে ভয় করে। শুধু অন্ধকার । চোখে ধূলা ঢুকে জ্বালা। হঠাৎ মনে হল বাবলু বোধহয় ভয়ে সাড়হীন হয়ে আছে।
    নিজের সমস্ত ভয়, জ্বালা যন্ত্রণা ঝেড়ে ফেলে শ্যামা বুকে চেপে ধরা ছেলেকে ঝাঁকালো।
    - উঠো ।বাবা। ভয় নাই।উঠো। মুখ তুলো। আমি আছি তো। তোমার মা আছি তো। সব ঠিক হয়ে যাবে।সব।
    শ্যামার গায়ে কী ভর করেছিল কে জানে। সব জিনিস পত্র ছত্রখান হয়ে পড়ে আছে। ঝড়ের তাড়ায় কিছু দেখা যায় না। ছেলে ভয়ে প্রায় বেহোশ।দাঁড়াতে গেলে পড়ে যাচ্ছে শ্যামা। পায়ের কাছে উপুর হয়ে বাসন কোসন। কাঁচের দু তিনটে কাপ গ্লাস ফাটছে।হাতড়ে হাতড়ে ধ্বংসসতূপ থেকে বাইরে আসার চেষ্টা করছিল শ্যামা। তখন না বেরোলে মাথার টিন ভেঙে পড়বে।আর উপায় নেই।এক হাতের মুঠিতে শক্ত করে ধরে ছেলের হাত।বেরোনোর সময় শ্যামার মনে হল তার বেড়াল মঞ্জুর কথা। সে কোথায় আছে এখন? মঞ্জু ঠিক আছে এই প্রচন্ড ঝড়জলে?বড় নেওটা ছিল যে সে তার!

    বস্তি প্রায় ধ্বসে গেছে।টালি আর টিনের ধ্বংসস্তূপ।কোথায় যাবে এতগুলো মানুষ কেউ বুঝতে পারছে না। কালু বুলন , যারা মাথা উঁচিয়ে মাস্তানি করে বেড়ায়, একেবারে চুপসে গেছে। পেট ব্যথাতে শুয়ে আছে কালু। পা কেটে ফুলে ঢোল নাকি ।ভোর হচ্ছে কিনা বোঝা যায় না। এত অন্ধকার।বেলি তার গর্ভাবস্থা নিয়ে হেঁচকি তুলে যাচ্ছে ।আপাতত কেউই কিছু করতে পারছে না তার জন্য।রেবা হাঁচোড়পাঁচোড় করে দু একটা জিনিস টেনে তোলার চেষ্টা করছে।কিন্তু পারছে না। শ্যামা কোনো জিনিসের কথা ভাবছে না।বাবলুকে বাঁচাতে হবে।আর নিজে বাঁচতে হবে।বস্তির সামনে পাকা দোকানের বারান্দাতে ছেলে নিয়ে বসে থাকল শ্যামা।সারারাত। ওরা বারো তেরোজন বারান্দাটাতে উঠতে পেরেছে।বাকিরা অন্য দালানবাড়ির বারান্দা খুঁজছে।
    ঠায় বসে।সারারাত।
    কিন্তু তারপর! তারপর কী হবে?ঘর বলে কিছু নেই।আর।কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে থাকার সময় বুকের মধ্যে একটা আশ ছিল।বন্ধ হোক যাই হোক।ঘর একখানা আছে।শাশুড়ি নেই, বর নেই।কিন্তু মাথার ওপর জাত আছে। একদিনের মধ্যে সে ঘর নেই হয়ে গেল।এবার তবে কোথায় যাবে শ্যামা!সারারাত জলে ভিজে ঝড় সয়ে ছেলেটা নেতিয়ে গেছে একেবারে। পেটে দানাপানি কিছু নেই। এরপর শ্যামা স্পষ্ট বুঝতে পারছে কালুদের দৌরাত্মি কতটা বাড়বে। ভয় পায় না শ্যামা। কিন্তু নিজেকে আরেকটু পোক্ত করতে হবে। আধার কার্ডের ঝামেলাটা মেটাতে হবে।মাথার ওপর একটা ছাত চাই।হরপ্রীত অত কিছু পেরে উঠবে না।নিজেই পরের বাড়িতে থাকে।

    আপাতত একটাই মুখ মনে পড়ল শ্যামার ।যার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলা যায়, একটু থাকতে দেবে?
    ফুঁসে ওঠা ডাইনোসর ফিরে যাচ্ছে নিজের আবর্তে। প্রকৃতি তার নিজের খেয়ালে ধ্বংস ছড়ায়। এইসব নগণ্য বাড়িঘর , গাছপালা, মানুষ , পশুপাখি কিচ্ছু না তার কাছে।কিচ্ছু না।

    পোস্ট আম্ফান
    মে মাসের তেরো তারিখ থেকেই একটা নিম্ন চাপ অঞ্চল তৈরি হচ্ছিল প্রায় তিনশো কিমি এলাকা জুড়ে ।কলম্বোর পূর্বদিকে। এই নিম্নচাপের অভিমুখ উত্তর পূর্বদিকে। অভিমুখ বোঝা যায় । কোনদিকে যাচ্ছে কোন জাতীয় ডিপ্রেশন। সব মাপা যায় ।আই এম ডি।ইন্ডিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট।এরা ট্র্যাক করছিলেন নিম্নচাপের গতিবিধি।তাঁদের ঘোষণা ছিল সতেরোই মে নিম্নচাপ তীব্র হবে।আঠারোই মে তীব্রতর।
    পূর্ব মেদিনীপুর ।উত্তর চব্বিশ পরগণা।দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা।কলকাতা।হাওড়া।হুগলি।ওড়িশা। আক্রান্ত হতে যাচ্ছে এইসব এলাকাগুলি।বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল এক হাজার কুড়ি কিমি বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বিশাখাপতনম পর্যন্ত ঘনীভূত নিম্নচাপ ।বাতাস জমছে ক্রমশ।

    নিম্নচাপকে ভরসা দিয়ে গেছে সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্নতা।উত্তাল হাওয়া। সব ঝড়ের, জন্যেই কিছু ফেভারেবল কন্ডিশন প্রয়োজন ।ওপরের দিকের বাতাস যত ফেভারেবল হয়েছে, নিম্নচাপ তত পরিপুষ্ট হয়েছে।সিস্টেম কনসলিডেটেড।লো প্রেশার। লো প্রেশার থেকে ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনে থেকে সাইক্লোন।একটা আমূল বিবর্তন। বঙ্গোপসাগরের হিংস্রতম, ভয়ঙ্করতম সাইক্লোন।সবকিছুর একটা গোড়াপত্তন থাকে। একটা শুরু ।একটা শেষ।আর তারপরে সবটাই রেশ।আম্ফান মানে আকাশ । রেশ রেখে গেল গোটা দক্ষিণবঙ্গ , ওড়িশা জুড়ে ।

    কালু প্রথমে একটা নিরীহ, মুখ গোমড়া বাচ্চা ছেলে ছিল। যার মা তার বাপের সঙ্গে থাকে না।মা ভেগে এসেছিল অন্য একটা লোকের সঙ্গে । তার নাম গনা। সবাই গনা বলে ডাকে। কালু কোনোদিন তাকে বাপ বলেনি।মা কাজে বেরোলে লোকটা তাকে বিছানায় ডাকতো। খুব ভয় পেত কালু প্রথমে। তারপর অভ্যেস হয়ে গেল। মা জানত না, এমন নয়। কিন্তু কিছু বলত না। গনা যে বাইরের মেয়েমানুষের কাছে না গিয়ে কালুকে ব্যবহার করে, এটা মা মেনে নিয়েছিল। কালুর মধ্যে একটা নিম্নচাপ ছিল।কৈশোরে সেটা ডিপ্রেশনে চলে গেল।কালু সেভেনে স্কুল ছেড়ে দিল। গনা একদিন টপ করে মরে গেল।কালু তখন পনেরো। হাত , পা, চোয়াল শক্ত হচ্ছে। পেছনে আছে মা। কালুর সব দোষ ঢেকে দেবার জন্য। কেউ কিছু বলতে এলে মেনকার মুখ তুবড়ির মত ছোটে। কালুর যাবতীয় ইচ্ছেগুলো ফুটতে শুরু করল।কেউ বাধা দেবার নেই।হাওয়া দেবার আছে।সঙ্গী জুটে গেল যারা , কালু তাদের লিডার। কারণ তার অভিজ্ঞতা বেশি। বাপ মা'কে ঠেঙাত। মা' বাপকে ঠেঙাত। মা গনার সঙ্গে ভেগে এসেও গনাকে ঠেঙাত।গনা মা আর ছেলেকে খিস্তি দিত।পেটাত না।তার বদলে গনা কালুকে বিছানায় তুলত। মা খদ্দেরের জন্য সেলাইঘরে ডিউটির পরে বাজারের পিছনে লাইনবাজারে দাঁড়াত, এই সবই কালুকে খুব দ্রুত পরিণত নিম্নচাপে পরিবর্তিত করে।পার্টির হাওয়া গায়ে লেগে যায় ।কালু খুব ফ্লেক্সিবল। এটা তার বড় গুণ। কালু তুমি কার? যখন যে পার্টি, তার।
    কাজেই যে কোনো আমলেই হোক, কালু অপ্রতিরোধ্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি এলাকার।
    আম্ফান তাকে সাড়ে বারো হাত বেশি সুবিধা দিয়ে দিল।
    ঝড়ের দিন কালু মদ এবং সঙ্গীসাথী নিয়ে সানিবৌদির ঘরে ছিল।তার নাম সানি নয়।কিন্তু সানি লিওনির অনুরক্তরা তার নামটি প্রবর্তন করেছে।অতিরিক্ত ভাজাভুজি খাওয়া কালুর বারণ। জন্ডিস পাঁচবার। লিভারের হাল খারাপ। ঝড়ের দিন কালু পেটব্যথাতে কেৎরে পড়েছিল।তাছাড়া বস্তির লিভারের এইসব সময় যা করা উচিত, সেসব কাজে তার মন বা মতি কিছুই নেই। বিশেষ কিছু করার ছিলও না ঝড়ের মুখে। আর দশজন বস্তিবাসীর মত কালুও একটা পাকা দালান ধরে পড়েছিল।পরদিন বিকেলে সে আস্তে আস্তে মাথা চাড়া দিল।
    ধ্বংসস্তূপের মধ্যে গরীব মানুষ আর কী করতে পারে। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে লাভ নেই। মুড়িটুকু কেনার উপায়ও নেই।সব দোকান বন্ধ তো বন্ধ, জল ঢুকে অর্ধেক জিনিস শেষ। খাবার নেই ।জামাকাপড়ও নেই বলতে গেলে। মাথার ওপর ছাত ও ঘরে দরজা নেই। এই তো শ্রেষ্ঠ সময় রোঁয়াব জমানোর। কালু হামাগুড়ি ছেড়ে উঠে পড়ল।
    সরকারি ত্রাণ এসে যাবে । লোকজনকে কব্জা করতে হবে ঠিকমত। ত্রাণ সামগ্রী বন্টন করবে কালু ।ফেসবুক ছবি উঠবে।এতসব কিছুর মধ্যেও শ্যামাবৌদির দিকে নজর রাখতে হবে তো!
    বেচারি একলা মেয়েমানুষ।বর নেই।শাশুড়ি নেই।কালুর বিবেচনাতে হাজার হোক মেয়েছেলের মাথার ওপর একটা গার্জেন থাকা দরকার।এই মুহূর্তে কালু নিজের চেয়ে ভালো গার্জেন আর কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না শ্যামার জন্য।
    সে তো বকলমে শ্যামার ভালোই চায়।মাথায় ছাতা ছাড়া মেয়েছেলে দেখলে তার ভীষণ দুর্বলতা জাগে। ঘর ঠিক করে দেবে। ত্রাণ এনে দেবে। তার বদলে কী সে কিছু চাইতে পারে না।কিন্তু মুশকিল হল, মেয়েছেলেটাকে খুঁজে পাচ্ছে না ঝড়ের পরে। প্যাংলা ছেলেটাকে নিয়ে সে গেল কোথায়? কালু মহা আতান্তরে পড়েছে।


    এইসব জমিতে শাহাজল চোদ্দ পনেরো বছর বয়স থেকে মাছ ধরেছে।এখন তার বয়স পঁয়ষট্টি হল।শাহাজল আতরাফ শ্রেণীভুক্ত ।তার ধারণা এইসব ঝড় ইবলিশের আমদানি।সে নিজে এখন ডিঙি নিয়ে বেরোয় না।এখন ব্যাটারা মাছ ধরে।শাহাজলের চার ব্যাটা ।দুই মাস লকডাউনে মাছের রপ্তানি একেবারে বন্ধ ছিল। তবে মাছ ধরা বন্ধ হয় নাই।অনেক কম দামে ভালো ভালো মাছ ছেড়ে দিতে হয়েছে।বাঁধ ভেঙে গিয়ে বিদ্যাধরী নদীর সমস্ত জল মাছের পুকুরে চলে এসেছে ।কিষানবিহারি মাঝি মাথায় হাত দিয়ে বাবুদের বলছিল ।প্রায় চল্লিশ বিঘা জমিতে পুকুর ভেসে গেছে।মাছের সিজন শেষ হলেই তো ধান বুনেছিল। ধান নাই।সব শেষ।সব।ধানের জমিতে পড়ে আছে ভাঙা টিন আর অ্যাসবেসটস।এ হল মিনাখাম অ্যাসেম্বলি কনস্টিটুয়েন্সি।আতাখামের
    আগে ওরা গেছিল পূর্বদারোগাপুর।সেখানেও নোণাপানি ঢুকে সর্বনাশ করে গেছে ধানের।পাথরপ্রতিমার দ্বীপগুলো সব অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিছু নাই। তারক ঘোষ চপচপে ভিজে মাঠ থেকে টেনে টেনে বিনষ্ট ধানগাছ তুলছিল।খররোদে ঘেমে ভিজে গেছে কালো শরীর।ওদের দিকে না তাকিয়েই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। মৌসুমী দ্বীপের দিকে যায়ে দ্যাখেন। কুয়াশাতে ঘিরি আসে। কিছু দ্যাখবার পাইবেন না।তারক বা লিয়াকত। শাহাজল বা আরিফ বা কানাই কারো মুখেই মাস্ক নেই।আপাতত বাইরের লোক দেখলে ওদের একটাই জিজ্ঞাস্য। রিলিফ আসবে কবে?চাল, ডাল দিবে না গভমেন্ট?ত্রিপল দিবে না? ঘরবাড়ি তো কিছু নাই। রিলিফ আসতে কিছুটা সময় লাগে।
    জাহির একটা শক্তপোক্ত টিম করেছে বারোজনের। কোভিডের জন্য ক্রাউড ফাউন্ডিং এবং কমিউনিটি কিচেন ওদের আগেই চলছিল।সোশ্যাল মিডিয়া খুব কাজে এসেছে। মিডিয়ার দিকটা মেধা দেখে। নিয়মিত ।দুদিন বাদে বাদে একটা করে আবেদন। জাহির প্রথমেই বলেছিল, এরিয়া বেছে নিতে হবে। সবদিকে ছড়িয়ে লাভ নেই। যখন দলে দলে পরিযায়ী শ্রমিকরা ফিরেছে , ওরা হাওড়া বেল্টে কিচেন চালিয়েছে।একটা ডিব্বাতে ভাত আর মুরগির ঝোল। ডালটালের ঝামেলার মধ্যে যায়নি। সোজা এবং পুষ্টিকর। যাতে ভাত আর আলু দিয়ে ডিমের ঝোল। কুড়ি টাকা।কমিউনিটি কিচেন খুব কাজে এসেছে।এখনো চলছে , আসলে একটা সিস্টেম তৈরি হয়ে গেছে।
    কিন্তু আম্ফানের পর সবকিছু ছিটকে গেলো। কিচেনের টিনের চাল যে শুধু ভেঙে গেছে তা নয়, তার ওপর উপুর হয়ে পড়ে গেছে পাশের বিশালাকৃতি নিমগাছটি।যারা রান্না করতো কিচেনে , তাদের মধ্যে দুজনের পক্ষে আসা সম্ভব নয়।ঘরদোর একেবারে ভেঙে গ্যাছে। বাকি দুজন এসে সাফসুতরোর কাজে লেগেছে।কবে থেকে কিচেনের কাজ আবার শুরু করা যাবে কিছুই বলা যাচ্ছে না।অথচ এইসময়টাতেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।অন্তত চারপাঁচদিন কম্যুনিটি কিচেন বন্ধ রাখতেই হচ্ছে। জাহির টুপুরকে বলেছিলো, তুই একটা বড় করে পোস্টার লিখে রাখিস। ছ' দিন বন্ধ ।তারপর মনে হয় আবার একটা সিস্টেমে ফিরে আসা যাবে।

    ওদের বেছে নেওয়া অঞ্চলটাতে জমির ধাঁচ ঐরকম। মাছের সময় মাছ। ধানের সময় ধান। ঝড়ের পর খেতে না পাওয়াটা নতুন কথা নয় এই এলাকায় লোকজনের কাছে। খেতে পাচ্ছিল না আগে থেকেই। এখন ঘর বলে যেটুকু ছিল তাও নেই। প্রায় শ'খানেক লোক আশ্রয় নিয়েছে মসজিদের ছাতে। স্কুলে যাবার কথা বলেছিল অঞ্চল প্রধান। কিন্তু সেলিমা খাতুন, বি এ পাশ মেয়ে ।সে আপত্তি করে। ইস্কুলবাড়িতে কোরাইন্টাইন সেন্টার। করোনারোগীর সঙ্গে থাকা যাবে না।
    যারা জিনিসপত্র দিতে এসেছে, তাদের ঘিরে একটা জমায়েত হয়। ছোট মোল্লাখালির এপারে কালিদাসপুর।ওপারে মরিচঝাঁপি ।টুপুর টের পাচ্ছে কেমন একটা নোণা গরম ঘিরে ধরছে তাকে।টপ টপ করে ঘাম ঝরছে। কড়া রোদে খুব করে কেউ যেন সেঁকে নিয়েছে তাকে। বাকিদের অবস্থাও একইরকম । টুপুর প্রথম বেরিয়েছে এদের সঙ্গে । আপাতত বাড়িতে তাকে না বলার মত অবস্থাতে কেউ নেই। তাছাড়া একটা অন্তত পজিটিভ ব্যাপার ঘটে গেছে। হ্যাঁ ।এটাকে পজিটিভই বলবে সে। ইন্স্পাইট অব অল দ্য ইভিলস দ্যাট হ্যাভ টেকন প্লেস।
    মালবিকা সামান্য নড়াচড়া করছে। ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের কেস সেরে উঠতে সময় নেয়। টুপুর মা' কে এভাবে দেখেনি কখনো। এত প্রাণহীন। এত নির্বাক। এত পাথরপ্রতিমা । রান্নাঘরে মালবিকাকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না খুব একটা।টুকটাক গেলেও ত্রিদিব আটকে দিচ্ছেন। ঈশান মজুমদার বললেন, অতটা ডিসকারেজ আবার করবেন না কিন্তু । কিছু কাজ করতে দেবেন। মেক হার ফিল অ্যাট ইজ।কোনোভাবেই প্রেশার দেবেন না।
    স্নানটানগুলো ফিরে এসেছে খানিকটা। আগের মত ইলাবোরেট না হলেও নিয়মিত হয়েছে। মালবিকার দীর্ঘ চুল অযত্নলালিত দেখতে ত্রিদিবের এখনো পীড়া হয়। কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি।টুপুর একদিন বলেছিল।মা, শ্যাম্পু করবে? এটা একটা নতুন ব্র্যান্ড। কন্ডিশনারটা ভালো। মালবিকা একমনে নখ কাটছিল।কোনো উত্তর দেয়নি।
    গভীর অভিমান জমাট বেঁধে আছে মুখচোখে।
    টুপুর ভাবে।কার ওপর অভিমান? দিদুন? বাবা? ফর বিনগ ইন টাচ উইদ রিনা যোশী?
    ড্যাম সিলি।
    ইদানীং বাইরে যেতে হচ্ছে ।টিকটিকির সঙ্গে সময় কাটছে না বিশেষ। মনমরা হয়ে বসে আছে নীল সবুজ ড্রাগনেরা।

    বেল বেজেছিল তখন। বেলা দশটা হবে। ও স্যালাড কাটছিল মন দিয়ে ।ছুরি দিয়ে কুচিকুচি করে শসা, পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম কাটতে বেশ লাগে।এইরকম কুচি কুচি করে সিস্টেমকে কাটতে ইচ্ছে করে ওর। এর মধ্যে আবার রক্তিম একদিন লং ড্রাইভে যাবার তাড়া দিয়েছে। ও দাঁতে দাঁত চাপে।মাই ফুট!
    ইদানিং বাড়িতে বেল বাজার পাট নেই। এমনকি মাছ বিক্রি করতে আমির বশিররাও আসে না ঝড়ের পরে। খবরের কাগজ বন্ধ । লোক সমাগম নেই। টুপুর নেমে দরজা খোলে।হাতে তখনো ছুরি এবং তারপরেই একটা জোরে চিৎকার দেয়, মা!
    এটা আনন্দের চিৎকার । জানে না কেন। কিন্তু ঝড়ের পাঁচ দিন পরে, তখনো ইলেকট্রিসিটি ফেরেনি। বাজার নেই। প্রচন্ড গরম। টুপুরের মনে হয়েছিল দিজ ইজ দ্য মোস্ট পজিটিভ থিংগ দ্যাট কুড হ্যাপেন টু দ্য হাউজহোল্ড অ্যাট দ্যাট পয়েন্ট অব টাইম।
    দরজার সামনে দাঁড়িয়ে । শুকিয়ে গেছে অনেক আগের চেয়ে । চোখ কোটরে। চুল অবিন্যস্ত । শ্যামা। শ্যামাদি। একহাতে ছেলের হাত। আরেক হাতে একটা পুঁটলি। দ্য মোস্ট পজিটিভ থিংগ দ্যাট হ্যাপেন্ড। টুপুর চেঁচিয়ে উঠেছিল।
    শ্যামা। রোগা।ক্লান্ত। কিছুটা অসুস্থ ।থপ করে বসেছিল বাড়ির সামনে।এইরকম একটা মানুষকে দেখেও যে মনের জোর পাওয়া যায়, ভাবতে পারেনি আগে। ত্রিদিব এসেও চমকে গেছেন।

    কী যেন খুব দরকার ছিল এই বাড়িতে ।ফাঁকা। শূন্য।গাছপালা ঝড়ে বিধ্বস্ত । শেষ হয়ে যাওয়া মাধবীলতার ঝাড়।হাত পায়ে ক্ষত নিয়ে বাবা আর মেয়ে । ভাঙা কাঁচ এখনো ইতস্তত পড়ে আছে।শুকনো গুমোট হাওয়া ঘুরে বেড়ায় ঘরে।

    শ্যামাদিইই বলে জড়িয়ে ধরেছিল। সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং ভুলে গেছে তখন। মানুষ খুঁজছে ওরা।মানুষ।যার হাত ধরা যায় ।যার কাঁধে মাথা রেখে হুহু করে কেঁদে ওঠা যায় । ভাইরাস দূরে সরে যাচ্ছে ।দূরে সরে যাচ্ছে গভীর অরণ্যে বাদুড়ের কলরব।
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২১৫ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন