• হরিদাস পাল  গপ্পো

  • আয়না

    ন্যাড়া লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ০৬ আগস্ট ২০২০ | ৮১৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • পাশের টেবিলে তিনজন বসে গল্প করছিল। আমি আড়ি পেতে শুনছিলাম। আড়ি পেতে ঠিক নয়, কানে আসছিল। অসমবয়েসী তিনজন। একজন বছর পঁচিশেকের, একজন বছর পঁয়তিরিশের, আর অন্যজন আমার বয়েসী হবে। বছর পঞ্চাশেক। পানভোজনের মাঝারি মানের রেস্তোঁরা। আমি অনেকদিন থেকে এখানে আসি। পান আর আহার দুইই ভাল। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাম যেমন বদলেছে, আমার রুচিও। এদেরও দেখলাম রুচির তফাত। ছোটজন নিয়েছে বিয়ার। মেজোজন রেড ওয়াইন। বড়জন শুনলাম সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি অর্ডার দিল। খাবারেও তিনজন ভিন্নপন্থী। ছোটজন অর্ডার করল ঝাল চিকেন উইংস। দ্বিতীয়জন চাইল নিউজিল্যান্ডের আমদানী ল্যাম্ব শ্যাংক। বুড়োজন নিল রেয়ার-মিডিয়াম ফিলে মিনিয়ন। আট আউন্সের। মানে খুবই ছোট।

    ছোটু বলছিল, "আমি তো ঠিক করেছি এক লাখ ডলার জমলেই দেশে ফিরে যাব।" মেজো বলল, "গিয়ে?"
    - গিয়ে টাকা ব্যাংকে রেখে আরামসে পায়ের ওপর পা তুলে আড্ডা মারব।
    - কদিন চাকরি শুরু করেছ?
    - দু'বছর হল।
    - আর দু'বছর যাক, বুঝবে এক লাখ ডলারে আজকাল কিসুই হয় না। বলুন দাদা?

    বুড়ো কিছু না বলে মৌরি হেসে ছোট একটা চুমুক দিল। মেজো ছোটকে বলল, "এক লাখ ডলার মানে ধর ৭০ লাখ টাকা। সে টাকা তুমি যদি ফিক্সড করে দাও ছ'-সাত পার্সেন্ট, মাস গেলে হাতে আসবে পঁচিশ-তিরিশ হাজার। কলকাতায় বাড়ি আছে?"
    ছোটু বলল, "সল্ট লেকে।"
    - ভাল। অন্ততঃ একটা মেজর খরচ বেঁচে গেল। নইলে বাড়ি ভাড়াতেই আদ্ধেক বেরিয়ে যেত।
    - তিরিশ হাজারে রাজার হালে থাকা যাবে।
    - না হে, যত রাজার হাল বলছ তত নয়। এনিওয়ে, করবে কি? দুদিনেই তো বোর হয়ে যাবে?
    - সেসব ঠিক করে রেখেছি। উল্টোডাঙায় একটা নাইট স্কুল জানি। ওখানে পড়াব।

    মেজ সার্কাস্টিক একটা হাসি দিয়ে বলল, "তুমিও?"
    - তুমিও মানে?
    - মানে আমারও ওরকম স্বপ্ন ছিল। বুড়োদা আপনার ছিল না?

    বুড়ো আবার মৌরি হাসি দিয়ে অল্প চুমুক দিয়ে বলল, "ছিল না আবার!"

    মেজ বলল, "আমার কত বন্ধুর যে এরকম সব স্বপ্ন ছিল। সব শালা অ্যামেরিকান ড্রিমে চাপা পড়ে গেছে।" মেজ টেবিলে রাখা ওয়ানের বোতল থেকে আরও ওয়াইন ঢেলে নেয় নিজের গবলেটে। "এক জনতা তো ভেবেছিল ফিরে গিয়ে পার্টির ফুল-টাইমার হয়ে যাবে। হা হা হা হা। সে এখন কী করে জান? হা হা। ওয়াল স্ট্রিটে ফান্ড ম্যানেজার। প্রতি বছর বোনাসই পায় কয়েক মিলিয়ন ডলার। হা হা।"

    ছোটু খুব বিরক্তির গলায় মেজকে বলল, "আপনার ফেরার কোন প্ল্যান নেই?" মেজ খুব মজার গলায় বলল, "কেন থাকবে না। আছে। স্বপ্নে। হা হা হা। স্রেফ টাইমপাস। দিব্যি আছি। যাব কেন? নিজের কাজ নিজে করছি। কারুর মুখাপেক্ষী নই। একেবারে প্রেডিক্টেবল দিন। দেশে গেলে রোজ কাজের লোকের চিন্তা, আজ এটা খারাপ হল, কাল বন্ধ - কে অত ঝামেলায় যাবে বাবা! এখানে রিটায়ারমেন্টের চিন্তা আছে ঠিকই, তবে এত স্টার্টাপে কাজ করছি, একটা-না-একটা ঠিকই লেগে যাবেনা? বেশি চাই না। কুড়ি বাইশ মিলিয়ন হলেই রিটায়ার করে ছ-মাস দেশে আর ছ-মাস এদেশে থাকব।"

    খাবার এসে গেল। ছোটু আর মেজ খাবারে মনোনিবেশ করল। ফাঁক পেয়ে বুড়ো গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, "একটা গল্প শোনাই।" আমি মনে মনে ভাবলাম - শালা কপিবুক বুড়ো। দু পেগ পেটে পড়লেই গল্প পেয়ে যায়। বুড়ো নাটকীয় একটা পজ দিয়ে বলল, "আমি কিন্তু ফিরে গেছিলাম।" ছোটু আর মেজ দুজনেই চমকে বুড়োর দিকে তাকাল। বুড়ো বলল, "হ্যাঁ হে। বছর দশেক আগে। লক-স্টক-অ্যান্ড-ব্যারেল। নাহ, ফিরে যাওয়ার কোন কারণ ছিল না। না নাইট স্কুলে পড়ানোরও বাসনা, না স্টার্টাপ লেগে যাওয়ায় মিলিয়নেরর তকমা। এমনিই গেছিলাম। ব্যাঙ্গালোরে।" বুড়ো থামল। খুব মন দিয়ে স্টেক কাটতে লাগল। মেজ আর ছোটু প্রায় একসঙ্গেই বলে উঠল, "তারপর"?

    - তারপর আর কি? বছর তিনেক পরে আবার চলে এলাম।
    - সে কি? কেন?
    - আমার যাওয়ারও কোন কারণ ছিলনা, ফেরারও নয়। তবে এখন ভাবি ব্যাঙ্গালোরে না গিয়ে যদি কলকাতায় যেতে পারতাম তাহলে গল্পর পরিণতি অন্যরকম হত কিনা।

    বুড়ো অন্যমনস্ক হয়ে ছুরি দিয়ে স্টেক কাটতে লাগল। আমি ভাবলাম, আরে! এ তো আমারও গল্প। আমিও তো ফিরে গেছিলাম। কিন্তু থেকে যেতে পারিনি। আবার নিজের পালিত দেশে ফিরে এসেছি। এর গল্প তো মনে হচ্ছে একেবারে এক। আমি ভাল করে বুড়োকে দেখতে গিয়ে চমকে উঠলাম। শুধু বুড়োকে নয়। তিনজনেকেই।

    দেখলাম তিনজন লোকই আসলে আমি। তিন ভিন্ন বয়েসের আমি। পঁচিশের আমি, পঁয়তিরিশের আমি আর এখনকার আমি। ইতিউতি চেয়ে খুঁজতে লাগলাম যদি পনেরো বছর পরের আমিকে দেখতে পাই! তাহলে গল্পটা একটা পরিণতি পেত।
  • বিভাগ : গপ্পো | ০৬ আগস্ট ২০২০ | ৮১৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
গল্প - moulik majumder
আরও পড়ুন
লকডাউন - Anirban M
আরও পড়ুন
একক - Debayan Chatterjee
আরও পড়ুন
পটলকুমার - Binary
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ০৬ আগস্ট ২০২০ ১৬:৩৪95969
  • দেশকে ভালবাসুন, বাস করুন বিদেশে  :/    

  • একলহমা | ০৭ আগস্ট ২০২০ ০৫:৫৪95973
  • হা হা। ঠিক আছে। শুধু শেষ বাক্যটি না থাকলে আরো ভালো লাগত।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন