বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  গান

  • ৯৯% বাঙালির হেমন্ত

    সম্বিৎ লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | গান | ১৬ জুলাই ২০২২ | ৬২৪ বার পঠিত
  • [লেখাটা কিঞ্চিৎ উদ্ধৃতি-কন্টকিত। উদ্ধৃতির বানান আর যতি যথাসম্ভব একই রেখেছি।]

    (পশ্চিম) বাংলা ও বাঙালির মান্য রুচি বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তা অনেকদিন ধরে একটু একটু করে তৈরি হয়েছে যেকোন অন্য জাতির মতই। সমাজনীতি, রাজনীতি আর বৃহত্তর অর্থে যাকে সংস্কৃতি বলা হয় - খাবারদাবার, পোশাক-আশাক, ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত ... - সবই অল্প অল্প করে এই মান্য রুচি তৈরিতে সাহায্য করেছে। তবে এও মনে রাখতে হবে মান্য রুচি কোন অজরামর জিনিস নয়। ক্রমাগত তা পাল্টেছে। যুদ্ধটুদ্ধ ধরনের বড়সড় সামাজিক বা রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ে রুচি পরিবর্তন ঘটেছে দ্রুত।

    সেই প্রেক্ষিতে বাংলাভাষার খুব কম গায়ক বা সুরকারই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতন বাঙালি সেন্সিবিলিটি নিয়ে এসেছেন। কম কেন, আমি বলব, শচীন দেব বর্মন ছাড়া আর কেউ আসেনইনি। এদিক দিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের মান্য রুচি তৈরিতে হেমন্তর অবদান কম নয়। হেমন্ত গান শুরু করেছেন এক যুগ সন্ধিক্ষণে। উনিশশো চল্লিশের দশকের মতন ওয়াটারশেড সময় (বাংলায় আজকাল যার আক্ষরিক অনুবাদ করা হয় 'জলবিভাজিকা সময়' বলে) আর কখনও এসেছে কি না বলা মুশকিল। রবীন্দ্রনাথ মারা গেলেন ১৯৪১ সালে, তারপর থেকে ক্রমশ বাঙালি মননে তাঁর প্রভাবে কমতে শুরু করবে এবং চলবে দু'দশক ধরে। বাঙালি মননে ও সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথের পুনরুত্থান ঘটবে আবার তাঁর জন্মশতবর্ষে, ১৯৬১ সালে। আর সেখান থেকে শুধুই উত্থান - ট্রাফিক লাইট অব্দি। এই দশকের শুরুতে প্রবল 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন। দলে দলে ছাত্রছাত্রী স্কুল-কলেজ ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। এখন যতই নস্ট্যালজিয়ায় আর জাতীয়তাবাদের রঙে এই ঘটনা মহান বলে প্রতিপন্ন হোক, তখনকার অনেক বাপ-মা'ই 'ছেলেমেয়ে উচ্ছন্নে গেল' বলে প্রমাদ গুনেছিলেন। এর ওপর প্রথম পাঁচ বছর বাঙালি শুনেছে দ্বিতীয় বিশ্বযদ্ধের দামামা। বাংলার মাটিতে যুদ্ধ না হলে মহারানী ও সরকার বাহাদুর যেখানে যুদ্ধে লিপ্ত সেখানে প্রজাকুলের ওপর তার প্রভাব পড়বে না সে কথা ভাবা ভুল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের দমন ও পরিসমাপ্তি। তার সঙ্গে জাপানি বোমার ভয়ে বাঙালির শহর কলকাতা ছেড়ে মফস্বলে, বিহারে আশ্রয় নেওয়া। এরই মাঝে সুভাষের পলায়ন ও, কিছুটা হলেও, ফৌজ নিয়ে প্রত্যাবর্তন, যার ফলে বাঙালি মননে প্রভুত আলোড়নের সৃষ্টি। ১৯৪৭ সালে দেশের স্বাধীনতা।

    এই বিরাট রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে বলা বাহুল্য চলছে সামাজিক পরিবর্তন। বামপন্থা অ্যান্টি-ফ্যাশিজম নাম নিয়ে এক বিরাট সাংস্কৃতিক আন্দোলন করছে। কে সামিল হননি সেই আন্দোলনে? বিষ্ণু দে থেকে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত থেকে রবিশংকর। আছেন হেমন্তও। যদিও হেমন্ত ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটারে (আইপিটিএ) যেমন আছেন, অন্যদিকে কিন্তু 'কথা কয়োনাকো শুধু শোনো'-তেও আছেন, আর ভীষণ ভাবে আছেন 'প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায়'-এ। ততদিনে হেমন্তর বেশ অনেক রেকর্ডই বেরিয়ে গেছে। শৈলেশ দত্তগুপ্তর সুরেই বেশি, কিন্তু তার সঙ্গে কমল দাশগুপ্তর সুরও আছে। আর আছে নিজের সুর। কথা লিখেছেন অজয় ভট্টাচার্য, অমিয় বাগচী, প্রণব রায় থেকে অলকা উকিল। এই সময়ে সলিল চৌধুরীর সুরে প্রথম গান "কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা"। এই প্রসঙ্গে মনে করা যাক এই গান রেকর্ড সম্বন্ধে হেমন্ত কী বলেছেন -

    "আমাদের বাড়িতে এসে অনেকগুলো গান শোনালো সলিল। সবই প্রোগ্রেসিভ গান। কোরাস ভাল হয়। কিন্তু সোলো রেকর্ড করা মুশকিল। চলবে না। সলিলকে সেই কথাই বললাম।
    সলিল শুনে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপরে উঠে পড়লো। বললে, 'তাহলে আজ আসি।'
    দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এলো সলিল। বললে, 'হেমন্তদা, একটা অন্য ধরণের গানেরও সুর করেছি। আমারই লেখা। অবশ্য এখনও পুরোটা লেখা হয়নি। তা যেটুকু হয়েছে শোনাবো?'
    বললাম, 'হ্যাঁ, শোনাও।'
    সলিল শোনালো-'কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো, রূপকথা নয় সে নয়।'
    শুনলাম। ভালোও লাগল। বললাম, এটা হতে পারে। তবে গানটা আরও বাড়াতে হবে। কাহিনি-সংগীত যখন, 'রেকর্ডের দুপিঠের মতো কথা বাড়াও। তাহলে খুব ভালো হবে।'
    আমার কথায় উৎসাহ পেলো সলিল। বাড়িয়ে ফেললো গানটাকে। দু'দিন পরে এসে আবার শোনালো। মন দিয়ে শুনলাম। শুনে বললাম, 'হয়েছে। খুব ভালো হয়েছে। আমি রেকর্ড করবো।'
    ... সলিলের গানটা গ্রামাফোন কোম্পানির কাছে পেশ করলাম। ওরা তো এককথায় রাজি। অতএব 'গাঁয়ের বধূ' রেকর্ড হয়ে গেল।
    রেকর্ড বাজারে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে গেল। আশাতীত সাফল্য...।"
    [আনন্দধারা - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়]

    এই 'আশাতীত সাফল্য' কথার কথা নয়। সেই সময়ে সত্যিই 'গাঁয়ের বধূ' বাংলা আধুনিক গানের জগতে সম্পূর্ণ নতুন স্বাদ এনেছিল। এসব কথা তো ডকুমেন্টেড। যেমন, অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায় বলেছেন, "... 'গাঁয়ের বধূ' স্বর্ণযুগের উদ্বোধনী সংগীত।"

    কিন্তু এর আরেকদিক দেখা যাক। কমলকুমার মজুমদার সেই সময়ে লিখছেন -

    "হেমন্তকুমারের অনেক গানের অর্থ পাওয়া ভার। যথা, 'গাঁয়ের বধূ' যেন 'স্বাধীনতা'র সম্পাদকীয় [স্বাধীনতা তৎকালীন সংবাদপত্র - স.ব.] । যেমন তার সুর। তেমনই তার বাক্যচয়ন। তাছাড়া রেডিও মারফৎ দুয়েকটী গান গেয়েছিলেন তার ভাব ভাষা বিয়ের পদ্য। রেডিওতে বাঙলা দেশের কালচারের গর্ব্ব চলে রোজ - যদি আপনি দয়া করে গানগুলি শোনেন বুঝবেন - বাঙলা দেশে যে সাহিত্যরুচি আছে তা আপনার মনেই হবে না।" [প্রবন্ধ সংগ্রহ - কমলকুমার মজুমদার]

    কমলকুমার বঙ্গ সংস্কৃতির হাই প্রিস্ট। নিজের বৈদগ্ধ্য, জ্ঞান আর রুচির ছটায় মুগ্ধ করে রাখেন সত্যজিৎ রায়, উৎপল দত্ত থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে। শুধু কমলকুমারই নয়, বাংলা সাহিত্যের আর এক হাই প্রিস্ট বুদ্ধদেব বসুও ওই একই সময়ে নাম না করে তৎকালীন বাংলা গান নিয়ে প্রায় একইরকম আক্ষেপ করেছেন। দেখা যাচ্ছে উচ্চ সংস্কৃতির গর্ভগৃহে হেমন্তকুমারের ঠাঁই নেই।

    এখানেই হেমন্ত সংস্কৃতির ১%-কে পেছনে ফেলে ৯৯% শতাংশের সঙ্গে পথ চলতে থাকেন। 'গাঁয়ের বধূ'র পরে করেছেন অনুপম ঘটকের সুরে আর গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় 'আকাশ মাটি ওই ঘুমলো', সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে আর পবিত্র মিত্রর কথা 'শুধু অবহেলা দিয়ে', সুকান্তর কবিতায় আবার সলিল চৌধুরীর সুরে 'অবাক পৃথিবী', নিজের সুরে আর গৌরীপ্রন্নর কথায় 'এই তো এলে'। 'গাঁয়ের বধূ'র মতন না হলেও, এ সব গানও ৯৯% খুবই পছন্দ করল। এটা কিন্তু ঘোলা জলে গা ভাসানো নয়। আগেই দেখেছি হেমন্ত সলিলের গান শুনে বলছেন 'চলবে না'। নিজের সহজাত বোধ দিয়ে বুঝে নিচ্ছেন ৯৯%-এর রুচির স্রোত। এবং তা বুঝেও সেই স্রোতের কোনাকুনি সাঁতার কাটতে ইতস্তত করছেন না। সলিল চৌধুরী এই প্রসঙ্গে লিখছেন -

    "হেমন্তদা একবার কলকাতায় এসেই আমার খোঁজ করলেন। 'পাল্কীর গান'-এর সুরটা তখন করেই রেখেছিলাম। গানটা হেমন্তদাকে শোনালাম। এই গানের একটা 'ধুন' হিসেবে 'হুন্‌হুন্‌না' যোগ করলাম। হেমন্তদা গানটা শুনে বেজায় খুশি। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন রেকর্ড করার জন্য। এখানে একটা কথা বলার প্রয়োজন। হেমন্তদার একটা বিশেষ গুণ ছিল, যা অন্য কারো মধ্যে খুব কমই দেখা যায় সেটা হচ্ছে নতুন কিছুকে গ্রহণ করার ক্ষমতা, তাকে উপলব্ধি করার মতো বোধ। মানে, কোন পরীক্ষামূলক ব্যাপারকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার সাহস হেমন্তদার ছিল। তাই 'পাল্কীর গান'টা শুনেই তিনি লাফিয়ে উঠেছিলেন। নতুন ধরনের একটা 'এক্সপেরিমেন্ট' কী হবে, না হবে, সেই ঝুঁকি নিয়েও তিনি নতুনকে গ্রহণ করতেন। এ ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল।'
    [হেমন্তর কী মন্তর - সুভাষ মুখোপাধ্যায়]

    এই পাল্কির গান নিয়ে সঙ্গীত জগতের আরেক ১% রাজ্যেশ্বর মিত্র কী বলছেন? রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি গানের প্রসঙ্গে বলছেন -

    "অতি আধুনিক সুরকার হলে এই গানের পটভূমিকায় ঘন ঘন মেঘের ডাকের আয়োজন করতেন এবং সম্ভবত 'শ্যামল দুটি গাই'-এর হাম্বা রবও ঐ-সঙ্গে জুড়ে দিতেন, যেমন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'পাল্কী চলে' কবিতার অদৃষ্টে জুটেছে। উক্ত কবিতাটি বাস্তব সংগীতে পরিণত করতে কত পরিশ্রমই না করতে হয়েছে। পাল্কী বেহারার ঘন ঘন 'হুম্‌ হুম্‌' আর 'হেঁইয়া হেঁইয়া' প্রভৃতি আওয়াজ, আরো কতরকম পরিবেশ সৃষ্টি। এতে নাটকীয় ভাবটি খাসা হয়েছে কিন্তু সুরের দিক থেকে একটা স্বতঃস্ফূর্ত সরল বৈচিত্র্য সৃষ্টির যে দক্ষতা তার পরিচয় অল্প।" [প্রসঙ্গ বাংলা গান - শ্রীরাজ্যেশ্বর মিত্রা]

    ঠিকই যে এখানে হেমন্তর গায়নের নয় গানের সুরের সমালোচনা করা হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে গানেরই বিরূপ সমালোচনা। মোটের ওপর আধুনিক গানে ১% হেমন্তর গান পছন্দ করছেন না। অথচ হেমন্ত তখন ৯৯%-এর মধ্যে ক্রমশ জনপ্রিয়তর হয়ে উঠছেন। পরবর্তীতে বাংলা গানে প্রায় যে একচ্ছত্র সাম্রাজ্য বিস্তার করবেন, জনপ্রিয়তার সেই উচ্চতায় তখনও উঠতে পারেননি। সতীনাথ মুখোপাধ্যায় হয়ত জনপ্রিয়তায় আরও এগিয়ে। আছেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, অখিলবন্ধু ঘোষেরা। এখানে হেমন্তর গান নির্বাচনে মূলত দুটি জিনিস কাজ করেছে। এক, তৎকালীন বাঙালি রুচিতে গান সাধারণ শ্রোতার পছন্দ হবে কিনা, আর দুই, সেই গান নিজের মানসিকতা আর স্টাইলের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে কিনা। এই দীর্ঘ পথ চলতে এই দ্বিতীয় বোধ - যে স্বধর্মে নিধনও শ্রেয় - খুব কাজে দিয়েছে। যাঁরা সেটা করতে পারেননি তাঁদের কেরিয়ার টলে গেছে। (সুরকার, নাট্যকর্মী, নাটক-ও-সঙ্গীত সমালোচক) দেবাশিস দাশগুপ্ত লিখেছেন -

    'একজন নামী শিল্পী আমার কাছে স্বীকার করেছেন - "গাঁয়ের বধু হিট হওয়ার পরে একটু হিংসে হ'ল। আমিও একটা চটুল জমাটি গান করলাম। গানটা গাঁয়ের বধুর মত সুপারহিট না হলেও লোকের মুখে মুখে ফিরত। ভাবলাম জিতে গেছি। কিছুদিন পরে দেখলাম আমার আসনটি নড়বড়ে হয়ে গেছে, এইখানেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নির্বাচন বৈশিষ্ট্য।"' [হেমন্তর কী মন্তর - সুভাষ মুখোপাধ্যায়]
    অন্যত্র দেবাশিস দাশগুপ্ত জানিয়েছেন এই শিল্পী হলেন অখিলবন্ধু ঘোষ।

    শুধু যে গানের নির্বাচন নিজের মেজাজের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো তাই-ই নয়, নিজের গলার খামতি বুঝে সেইমতন গান বাছাও ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বৈশিষ্ট্য। সুরকার অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায় জানাচ্ছেন,

    "দমদমে প্লেন থেকে নেমে সোজা শ্যামবাজারে নচিকেতা ঘোষের বাড়ি হাজির। বন্ধু ছবির গান শিখবেন। শেখা হল 'মউ বনে আজ'। নচিদা দ্বিতীয় গান 'মালতী ভ্রমরের' যেই শুনিয়েছেন, তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন - বাবা এই গান আমি গাইতে পারব না, আপনি মানবকে খবর দিন। [বাংলা গানের পথচলা - অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায়]
    মানব মানে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যাঁর গলার তৈয়ারি ছিল সুবিদিত। যদিও নাছোড়বান্দা নচিকেতা ঘোষ হেমন্তবাবুকে দিয়েই সেই গান গাইয়েছিলেন, এবং এখনও লোকে সে গান শোনে, দেখার মতন বিষয় হল নিজের কম্ফর্ট জোনের বাইরের যে গান সেখানে তিনি গাইতে চাননি। গানটা ভাল হবে না বলে। শঙ্করলাল ভট্টাচার্যকে এ সম্বন্ধে যা বলেছিলেন বলেছিলেন যে কোন স্তরের গায়ক-গায়িকাই তার সঙ্গে একাত্ম বোধ করবেন -

    "... এছাড়া আমার গলার কতখানি কী ক্ষমতা সেটা বিবেচনা করে সেটুকুই দেবার চেষ্টা করি। এবং অনেক সময় অসুবিধে হয়েছে কোনও মিউজিক ডিরেকটরের কাছে। তিনি হয়ত একটু গোলমেলে কাজ দেওয়াতে চাইছেন আমাকে দিয়ে। তা আমি তাঁকে বললুম, এই যে একটা কাজ, এইটা দিতে গেলে এটার কথা ভেবে ভেবেই আমার গান নষ্ট হবে। কারণ আমাকে তো ভাবতে হচ্ছে ওই লাইনটা আসছে ... ওখানে একটা কাজ আছে, যেটা আমার গলা থেকে চট করে বেরোবে না। আর ওই ভাবতে ভাবতেই আমার গানটা নষ্ট হয়ে যাবে।" [আমার গানের স্বরলিপি - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়]
    সেইখানেই বলেছেন,

    "সলিলকেও বলি। তুমি ভাই ভেবো না যে আমার গলা লতার মতন, যা দেবে গেয়ে দেবো। আমাকে বুঝে আমার গান দাও। ও-ও সেটা জানে। বলে, না হেমন্তদা, সে আমি জানি। আপনাকে আমি ঠিক আপনার গলার মতন গানই দেবো। তা সলিল আমার এক্সপ্রেশনটার দিকেই বেশি নজর দেয়। আমি জানি যে আমাকে এমন গলা ঈশ্বর দিয়েছেন যাতে এ রকম কিছু এক্সপ্রেশন আমি দিতে পারি। আমি সে রকম এক্সপ্রেশনই দিতে ভালবাসি। আর সে রকমই দিই।" [আমার গানের স্বরলিপি - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়]

    এইখানেই চলে আসে বাঙালি রুচি আর বাঙালি সেন্সিবিলিটির মূল কথা - এক্সপ্রেশন। এক্সপ্রেশনই হেমন্তর মুক্তি, এক্সপ্রেশনই হেমন্তর ফাঁস। যদিও এই এক্সপ্রেশনে হেমন্তর মৌরসী পাট্টা ছিল, একথা ভাবলে ভুল হবে। আশির দশক অব্দি আমি স্বকর্ণে হেমন্ত-ক্যাম্প ও সতীনাথ-ক্যাম্পের লড়াই শুনেছি। সতীনাথ-ক্যাম্পের বক্তব্য ছিল, 'নেহাত ভগবানদত্ত গলার আওয়াজে হেমন্ত মুখুজ্জে বেরিয়ে গেলেন। নইলে গানে কোন এক্সপ্রেশনই নেই, সব ফ্ল্যাট। এক্সপ্রেশন দেখতে হয় সতীনাথবাবুর।' আশির দশকেই এই, তাহলে পঞ্চাশের দশকে যখন সতীনাথবাবুর জনপ্রিয়তা হেমন্ত-ধনঞ্জয় ছাড়িয়ে, তখন এক্সপ্রেশনের লড়াই কীরকম হত ভাবুন। তার ওপর সতীনাথ মুখোপাধ্যায় সুধীরলাল চক্রবর্তীর ছাত্র, গলা চলে মাখনের মতন। তবে এ কথার কথা। চল্লিশ-পঞ্চাশের দশক থেকেই বাংলা কাব্যসঙ্গীত নামের জগৎটিকে হেমন্তবাবু কব্জা করার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

    এর সঙ্গে আরেকটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা উচিত। পঞ্চাশের দশকের দ্বিতীয়ভাগে, চলচ্চিত্র উত্তমকুমারের উত্থান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাম্রাজ্য-বিস্তারে খুবই সাহায্য করেছিল। অ্যান্ড ভাইসি-ভার্সা। উত্তমের গলার টিম্বার ও উচ্চারণের ধরনের সঙ্গে হেমন্তর গলার টিম্বার ও উচ্চারণের ধরনের মিল থাকায় হেমন্ত উত্তমকুমারের ডি-ফ্যাক্টো প্লে-ব্যাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময়ে উত্তম-সুচিত্রার ঘোরতর বাঙালি রোম্যান্টিক ছবিতে ঠিক যে ধরনের অভিব্যক্তির প্রয়োজন ছিল, হেমন্ত তা জুগিয়ে যেতে পেরেছিলেন যে তাই-ই নয়, যোগ্য গীতিকার আর সুরকারদের সহায়তায় সেইসব ছবির সাফল্যের কিছুটা দাবিদারও হতে পেরেছিলেন। নচিকেতা ঘোষ হেমন্তকে দিয়ে গাওয়াচ্ছেন 'মৌ বনে আজ মৌ জমেছে', 'সূর্য ডোবার পালা', 'নীড় ছোট ক্ষতি নেই'। নিজের সুরে গাইছেন 'সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা'। শুধু রোম্যান্টিক গানই নয়, নচিকেতা ঘোষ প্রেমেন্দ্র মিত্রর কথায় 'হাত বাড়ালেই বন্ধু' ছবিতে গাওয়াচ্ছেন 'শরীরখানা গড়ো' যেখানে কথার গুরুত্ব সাধারণ রোম্যান্টিক গানের থেকে বেশি। সুধীন দাশগুপ্ত নচিকেতা ঘোষের মতন অত গান হেমন্তবাবুকে দিয়ে না গাওয়ালেও প্রেমেন্দ্র মিত্রর বিখ্যাত কবিতা 'সাগর থেকে ফেরা' যখন গান করছেন, তখন কিন্তু ডাক পড়ছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়েরই। কিন্তু নচিকেতা ঘোষ যখন পরের দিকে উত্তমের গলায় মজলিশি গান দিচ্ছেন, তখন কিন্তু আর হেমন্ত নন - ডাক পড়ছে মান্না দে-র। 'স্ত্রী'-তে হেমন্ত গাইছেন সেকেন্ড লীড সৌমিত্রর প্লে-ব্যাক হিসেবে। 'সন্ন্যাসী রাজা'তেও অত গানে পাচ্ছেন একটিমাত্র গান। এই ইকুয়েশনে অবশ্য হেমন্ত-উত্তমের সম্পর্কের অবনতিও অনেকটাই কাজ করেছে।

    নামজাদা নায়ক-গায়ক রবীন মজুমদার শরীরের ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার করে একসময়ে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। শেষে সুরকার নচিকেতা ঘোষের বাড়িতে, তাঁর তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন। নচিবাবু বন্ধু গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করেন যে সুস্থ হয়ে ওঠা রবীনবাবুকে আবার ইন্ডাস্ট্রিতে রি-এন্ট্রি করাতে দুই বন্ধু এক মারকাটারি গান তৈরি করবেন আর রবীন মজুমদার সেইটা গাইবেন। গান তৈরি হল - "আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে"। রবীন মজুমদার শুনে বললেন, এ গানের জাস্টিস করতে পারেন শুধু হেমন্তর এক্সপ্রেশন।

    (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের যে গানগুলোর উল্লেখ লেখায় আছে সেগুলো এই লিংকে পাওয়া যাবে - https://www.youtube.com/playlist?list=PLZLDwmmIJ9xegA-4eqDd7LgrirtHfdL-Z)
     
  • আলোচনা | ১৬ জুলাই ২০২২ | ৬২৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • anandaB | 50.35.124.228 | ১৬ জুলাই ২০২২ ০৬:১৩509918
  • বাঃ 
  • অর্করূপ গঙ্গোপাধ্যায় | 45.64.227.226 | ১৬ জুলাই ২০২২ ০৭:০০509919
  • ভালো লেখা।
     
  • Abhyu | 97.81.101.181 | ১৬ জুলাই ২০২২ ০৭:১৪509920
  • সুন্দর লেখা। সিগনেচার ন্যাড়াদা। শেষ করেছে আমার গানের স্বরলিপি দিয়ে। আগামী পৃথিবী, কান পেতে তুমি শোনো।
  • Bratin Das | ১৭ জুলাই ২০২২ ০৭:২৯509960
  • খুব ভালো লাগলো ন‍্যাড়া দা।
     
     আচ্ছা ওই গান টা কোন টা  যেন? যেটা সলিল বাবু লতা কে দিয়ে গাওয়া তে গেলে লতা মোটামুটি  কান্নাকাটি করছিলেন তারপরে তাকে বলা হল এই গান অলরেডি  বাঙলার এই শিল্পী  গেয়েছেন। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে  থাকা লতা কে জানানো হ য় সেই শিল্পী র নাম মানবেন্দ্র......
  • | ১৭ জুলাই ২০২২ ১০:১৭509965
  • একেবারেই সিগনেচার ন্যাড়াদা। 

    বাকী দুটো পর্বও ঝটপট আসুক। 
  • Ranjan Roy | ১৭ জুলাই ২০২২ ১৯:৪২509982
  • কোন কথা হবে  না!
  • Bratin Das | ১৭ জুলাই ২০২২ ২১:০৯509985
  • প্রচুর কথা হবে smiley
  • সুকি | 49.207.217.69 | ১৭ জুলাই ২০২২ ২১:৩৩509986
  • ন্যাড়াদার লেখাতেই এদিক ওদিক পড়েছিলাম, আবার পড়লাম। ভালো লাগলো 
  • সম্বিৎ | ১৮ জুলাই ২০২২ ২৩:০২510016
  • ব্রতীন, গানটা হল 'আমি পারিনি বুঝিতে পারিনি'। যদিও এই আলোচনার সঙ্গে সম্পর্করহিত।
  • Bratin Das | ১৯ জুলাই ২০২২ ০৩:২৪510021
  • ঠিক ঠিক ন‍্যাড়া দা। 
  • অনিন্দিতা | ২৪ জুলাই ২০২২ ২০:৫৭510246
  • পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। অনুমান করতে চেষ্টা করছি বিষয়। রবীন্দ্র সংগীতে হেমন্ত। হিন্দী ছবির গানে হেমন্ত। তাই কি!
  • Debasish Sengupta | ২৪ জুলাই ২০২২ ২১:০৬510248
  • খুব ভালো লাগলো। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মানে বাংলা সংগীত জগতের ধ্রুবতারা। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন