• হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

    Share
  • মোরগ খেলা ও মানুষ খেলা

    ধীমান মন্ডল লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা : বিবিধ | ১২ এপ্রিল ২০২০ | ৫০৫ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • অজ পাড়া-গাঁ বলতে যা বোঝায় সুন্দরবনের সেরকমই একটা প্রত‍্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। এখনও হাটবারে সারি বেঁধে হাটুরেরা হাটে যায়,এখনও পুকুরের জলে বৃষ্টির ফোটা টুপটাপ সেতার বাজায়,এখনও জোনাক জ্বলে, শুধু বিদ‍্যুতের আলোয় চোখে পড়ে না।তিন-চার বছর আগেও অধিকাংশ রাস্তায় ন‍্যুনতম ইট টুকুও ছিল না। কলেজ শেষ করার পর আমার এক বন্ধু আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসে বলেছিল "যতদিন না পাকা রাস্তা হয় ততদিন আমি তোদের বাড়িতে আর আসব না।"অভ‍্যাস না থাকলে এক হাঁটু কাদায় হাঁটার অভিজ্ঞতার ফসল আর কি।২০০ মিটার রাস্তা যেতে আধ ঘন্টার বেশী লাগলে বলাটা অস্বাভাবিক নয়।বর্তমানে যদিও অনেক রাস্তায় ইট পড়েছে,ঢালাই হয়েছে, মোবাইলের টাওয়ার বসেছে। চুইয়ে-চুইয়ে শহর ঢুকে পড়ছে গ্রামের অলিতে-গলিতে ।শহরের বড়দিন-কেক, ভ‍্যালেনটাইনস ডে,Womans day,Fathers day, চকোলেট ডে আরও কত কি সব Day, ছেঁড়া জিন্স এইসব শুধু একটা নদী পেরিয়ে বা মোবাইলের মাধ‍্যমে ঢুকে পড়ছে অনায়াসে।আর একটা ব্রীজ হলেই কলকাতা আমাদের উঠোনে হাজির হবে।বাহ‍্যিক পরিবর্তন অনেক হলেও আর্থ-সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা, সংস্কৃতির দিক দিয়ে আমরা বাসের পেছন দিকে এগিয়ে চলেছি।
    এসব আমার আজকের লেখার বিষয় নয়,আজ অন‍্য কথা বলতে চাই। গলি থেকে আমার মুল আলোচনার মেন রোডের দিকে আমি এগোতে চাই।

    আমার এলাকায় একটা খেলা খুব চলে। ভারতবর্ষের আরও কিছু জায়গাতেও চলে।মোরগ খেলা। বর্ষা শেষ হতেই মোটামুটি নানা জায়গায় শুরু হয়ে যায়, চলে মোটামুটি পরের বছর বর্ষাঋতু শুরুর আগে পর্যন্ত। এ এক অন‍্য খেলা, অদ্ভুত খেলা,অন‍্য উত্তেজনা,অন‍্য উন্মাদনা,বীভৎস আনন্দ ।মোটামুটি সমান সাইজের দুটি মোরগের পায়ে অস্ত্র বেঁধে দেওয়া হয়। দু'জন দুজনের উপর ঝাপটাতে থাকে, সঙ্গে পায়ের অস্ত্র চলতে থাকে।দুজনের কেউই বোঝেনা এ খেলায় তাদের কোন লাভ নেই।দুজনেই রক্তাক্ত হয়,কারও সরাসরি বুকে অস্ত্র ঢোকে,কারও নাড়ি বেরিয়ে আসছে তো কারও মাথা এফোড় ওফোড় হচ্ছে। কেউ পালায়,কেউ জীবন দেওয়ার আগে পর্যন্ত হার মানে না। যে হেরে যায় সে হয়ে যায় পাউড়,আর যে জেতে তাকে বলা হয় জিতকার।এক আসরের জিতকার অনায়াসে অন‍্য আসরের পাউড় হতেই পারে।মোরগের পায়ে অস্ত্র বাঁধে এবং মোরগ ঝুঁকিয়ে যে ছাড়ে তাকে বলা হয় কাঁত্দার। সারা বছর মোরগের কি যত্ন,কত আদর -আলাদা ঘর,খাওয়া-দাওয়ার দারুন ব‍্যবস্থা,ওষুধ, পরিচর্যার কোন খামতি নেই,সোনামাণিক বলে কথা।ছোট বড়, মাষ্টার - ডাক্তার, শিক্ষিত -নিরক্ষর, গরীব- ধনী,হিন্দু-মুসলিম, সব ধরনের, সব ধর্মের মানুষকে সগর্বে মোরগ কোলে করে আসরে যেতে দেখা যায়। সারা বছর যে যেখানে থাকুক এই সময়টায় ঠিক উপস্থিত থাকতেই হবে। কর্মসূত্রে বাইরে থাকে কিন্তু এই সময়ে যেভাবেই হোক অন্তত একটা বা দুটো আসরে হাজিরা দিতেই হবে,সরকারি চাকরি করলেও। বিভিন্ন বাজারে প্রতি সপ্তাহে আসর বসে। না এ আসর সে আসর নয়,এ মোরগ খেলার আসর। বছরের বিশেষ কয়েকটা দিনে বিশেষ কয়েকটা জায়গায় বসে বিশেষ আসর।যেমন পৌষ সংক্রান্তি, পঞ্চমী। রীতিমতো মেলার আকার নেয়। কয়ক লক্ষ মানুষ জড়ো হয়। অনেক দূর দূর থেকে ভক্তেরা আসে আনন্দ সুধায় হাবুডুবু খেতে। ভুটভুটির সারি জমে নদীর কুলে,সাইকেল-বাইকের বড়-বড় গ‍্যারেজ তৈরী হয়। কত রঙের,কত সাইজের,কত জাতের মোরগে ভরে যায় আসর। ভোর থেকে আসরের কাছাকাছির সমস্ত রাস্তায় শুধু মানুষের মিছিল। প্রাত‍্যহিক ব‍্যবহার্য সবকিছুই পাওয়া যায় মেলায়, একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে হাঁড়িয়ার দোকান। খেলা চলে সকাল থেকে সন্ধ‍্যা পর্যন্ত। যার মোরগ জেতে তার চোখে -মুখে,চলায়-বলায় সাম্রাজ্য জয়ের আনন্দ, আর যে বেচারা হারে তার তখন সব হারিয়ে ভিখারি দশা। কি আর করে আরও দু বাটি হাঁড়িয়া পান করে আসরের পূণ‍্য ভূমিতে গাড়াগড়ি দেয়,সারা গায়ে আলিঙ্গন করে আসরের পবিত্র ধূলি, লুঙ্গি -প‍্যান্টও কথা শোনে না খুলে যায় তাতে কুছ পরোয়া নেহি,মুখে ধ্বনি দেয় "কি হয়েছে লাড়া একটা ডিম গেল"। এখন খেলার চরিত্র বদলেছে অনেকটা। গন্ডীর ভেতরের লড়াইটা একই রকম থাকলেও মাঠের বাইরের খেলাটা সময়ের সঙ্গে এগিয়ে গেছে। এক একটা মোরগের পেছনে লাগানো হয় হাজার -হাজার টাকা। আমি একজনকে জানি যার মোরগ খেলার বাৎসরিক বাজেট অন্তত দশ লাখ টাকা।

    না আরও কিছুটা দূরে এগোতে চাই আমি। আরও কিছু বলার জন‍্যই এ লেখা। এই মোরগ খেলার সাথে হুবহু মিল খুঁজে পাই সারা রাজ‍্য জুড়ে, দেশ জুড়ে আমরা মানুষেরা অর্থাৎ সাধারণ জনগনেরা যে লড়াই করি তার। আমাদের পায়েও কখনও ধর্মের,কখনও রাজনীতির, কখনও দেশের নামে,কখনও জাতপাতের বা নাগরিকত্বের নামে নানা ধরনের অস্ত্র বেঁধে দেওয়া হয়েছে,হচ্ছে। মোরগের মত আমরাও লড়ছি, রক্তাক্ত হচ্ছি, আমাদের বুক পেট এফোঁড়- ওফোঁড় হচ্ছে,ঘাড় থেকে মুন্ডু আলাদা হচ্ছে,জীবন দিচ্ছি। তবুও নিরন্তর লড়াই জারি রেখেছি,রক্ত ঝরছে তাতে কি আমাকে জিততেই হবে, প্রতিপক্ষ মোরগকে হারাতেই হবে। কারন আমাদের মালিক(নিজেরা ভাবে) অর্থাৎ নেতা,ধর্মগুরু বা শিল্প পতিরা আমাদেরকে সারা বছর মদ দেয়, খোরাকি দেয়, "আমার মোরগ"বলে স্টেজে পরিচয় করায়, গায়ে-মাথায় হাত বোলায়। আমাদের লড়াইয়েরও ছোট বড় নানা আসর বসে। কখনও ধর্মের নামে,কখনও ভোটের নামে,কখনও দেশের নামে,নাগরিকত্বের নামে । পঞ্চায়েত-পৌরসভা, উপ-নির্বাচন,সমবায়,নানা কমিটির ভোট, বিধানসভা, লোকসভা কত রকমের ভোট,পাড়ার মন্দির- মসজিদ,রাজ‍্যের -দেশের মন্দির -মসজিদ, ছোট জাত বড় জাত, সীমান্ত রক্ষা কত রকমের ছোট বড় আসর। আমি তফাৎ বুঝিনা বসিরহাট-ধূলাগড়ের দাঙ্গা আর জাফরাবাদ-গুরাটের দাঙ্গার মধ‍্যে। পঞ্চায়েত-লোকসভা,পুলওয়ামা,সবজায়গাতেই এই জনতা- জনার্দন লড়েছি,লড়ছি,প্রাণ দিয়েছি,দিচ্ছি। আমাদের কারও মায়ের বুক ফাঁকা হয়,কারও স্বামী, কারও ভাই হারিয়ে যায় চিরদিনের মত। আমাদের মালিকদের কিছু ক্ষতি হয়েছে! হয়নি, হয়না।ওরা আসরের পেছন কোটি-কোটি টাকার খেলা খেলে।ওদের লাভ হয় কারও ছেলে BCCI এর সচিব হয়,কারও ভাইপো কোটিকোটি টাকার মালিক হয়,কারও ছেলে মুখ‍্যমন্ত্রীর আসনে বসে, কেউ ভারতের সেরা ধনী হয়,মন্দির -মসজিদ গুলোতে হাজার-হাজার কোটি টাকা আয় বাড়ে,কেউ আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পালায়। ওরা শুধু অপেক্ষায় থাকে আমাদের লড়াইয়ের। ওরা সারা বছর মন্দির-মসজিদ-চার্চে-গুরুদুয়ারায়,পার্টি অফিসে আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করায় লড়াইয়ের জন‍্য। আমাদের পায়ে অস্ত্র বাঁধার জন‍্যও আছে পাড়ার নেতা,গ্রামের ধর্মগুরু -কাঁত্দার। অপেক্ষায় থাকে আমাদের লড়াইয়ের মরসুমের। নতুন আসর বানাতে থাকে।
    ওরা মজা লোটে, ঠান্ডা ঘরে বসে মদ খায় আর মস্তি করে। কোটি -কোটি টাকা গোনে।ওদের আর কি ওদের কাছে তো "লাড়া একটা ডিম গেল ", এতো শুধুই খেলা! এ খেলাই চলছে, কিন্তু আর কতদিন!
  • বিভাগ : আলোচনা | ১২ এপ্রিল ২০২০ | ৫০৫ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Abhibhusan Majumdar | 162.158.167.17 | ১৩ এপ্রিল ২০২০ ১৩:৩৬92264
  • সহমত। সহজ এবং নির্মম বাস্তবতা।

  • Chandan chor | 141.101.69.18 | ২০ এপ্রিল ২০২০ ০০:২৯92549
  • চন্দ্রবিন্দু জ্যোতি বসুর পুত্র কুখ্যাত শিল্পপতি চন্দন বসু র কথা আমরা সকলে জানতাম। আরেক সিপি(আই)এম মুখ্যমন্ত্রীর সন্তান যে শিল্পপতী আমরা কি জানতাম ? কেরালার মুখ্যমন্ত্রী বিজয়নের কন্যারত্নটি যে শিল্পপতি এটা ডাটা স্ক্যামের আগে আমরা কজন জানতাম। জ্যোতিবাবুর ব্যাটা মাটি পাচার করে শিল্পপতি হয়েছিল। বিজায়ানের বেটি তথ্য পাচার করে শিল্পপতি হয়েছে।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত