• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • আমার কালীপুজো

    জারিফা জাহান লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ৪০৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • আমি বারাসতের মেয়ে। তাই প্রতিবার কালীপুজো আসলেই, হপ্তা দুয়েক আগে থেকেই নিজেকে অঘোষিত সরাইখানার মালিক মনে হয়। চেনা জানা লোকজনের কান মাথা চেবাতে থাকি, বারাসতের গুণগান শুরু হয় বহাল তবিয়তে আর ন্যানোতোম উৎসাহে ভাঁটা না পড়া আমার 'আসুন-বসুন-এলাকা ঘুরুন' মোড অন।

    ব্রহ্মযামল তন্ত্রমতে, দেবী কালী হলেন বাংলার অধিষ্ঠাত্রী। তবে বাংলার বাকি জায়গাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই অঞ্চলে কালীপুজোর এমন রমরমার আসল কারণ হিসেবে বরাবরই খিল্লি করি, 'বারাসত আদতে ডাকাতের জায়গা'।

    বারাসতের প্রথম বিখ্যাত মন্দির হল করুনাময়ী কালীমন্দির। মোগল সম্রাট আকবরের রাজপুত সেনাপতি মানসিংহ বারাসাতের আমডাঙায় সূক্ষ্মাবতী নদীর তীরে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের প্রথম পুরোহিত ছিলেন, রামানন্দ গিরি গোস্বামী যাঁর নামানুসারে জায়গাটার নাম হয় 'রামডাঙা'। পরে অবশ্য রামডাঙা লোকমুখে চালু হয় 'আমডাঙা' নামে। তবে আমডাঙা-জাগুলিয়া পেরোলেই যে নদীয়া, সেখানকার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সৌজন্যে শুরু হওয়া কালীপুজো ধীরে ধীরে এই অঞ্চলেও প্রভাব বিস্তার করে। অবশ্য বাড়ি বাড়ি শক্তির আরাধ্যা কীভাবে ক্লাবথিমের মোড়কে পর্যুদস্ত; সে ইতিহাস নিয়ে মতভেদ আছে। এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন পুজো রেজিমেন্ট ক্লাবের। কিছু ট্রাক ড্রাইভার মিলে ছোট্ট একটা ঘরে যে পুজোর শুরুয়াৎ করেছিল অনাড়ম্বর, মূলত দূরপাল্লার যাতায়াতে যেকোন অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে, সে অবশ্য এখন ব্যারাকপুর-কলোনী মোড় চত্বর, হরিতলা-বাজার ছাড়িয়ে চাঁপাডালিতেও হুড়মুড়িয়ে এসে পৌঁছেছে।

    মনে আছে, ছোটবেলায়, এসব গল্প শুনতাম খুব উৎসাহ নিয়ে, কোনটা হয়ত লোকমুখে প্রচলিত, কোনটা হয়ত সত্যি। নিজের এলাকা যে এত পুরোনো, হঠাৎ হঠাৎ গল্প-উপন্যাসের বইয়ের পাতায় বারাসত নামটা দেখলে আলগা যে আনন্দ-জাফরি আঁকিবুঁকি কাটত মনে, এও যেন সে আহ্লাদী দোসর।

    প্রাক-টিউশন পর্বে অবশ্য আমাদের, মানে আমি, আব্বু আর আম্মির দৌড় ছিল চাঁপাডালি অব্দি। পরে পরিধি বেড়ে হল বাজার; তবে লাইটিং দেখেই ফেরত আসতাম। পুজোর দিনের লম্বা ভিড় আর আমার গোঁড়া দাদুর 'কালীপুজোর ঠাকুর দেখা'র মত ঘোর না-পাক কাজ করার জবাবদিহির ভয়ে আব্বুর আর প্যান্ডেলে ঢোকার মত সাহস হয়নি কখনও। এরপরে এল আমার টিউশনকাল। কালীপুজোর দিন সব ক্লাসই ছুটি থাকত। অতএব পরের দিন থেকে ভাই-ফোঁটা অব্দি ফিরতি পথে চলত আমাদের টো-টো সফর। তবে সমস্যা হল, বারাসত আজও যে কারণে বি(?)খ্যাত, উন্নয়নের মত যেখানে সেখানে দাঁড়ানো মাতাল আর কন্যাশ্রী হারে উড়ে আসা ইভটিজিং, এসবের কল্যাণে মায়ের টেনশন এবং সে চক্করে রাতে প্যান্ডেল ঘোরা প্ল্যান ছিল এক্কেরে নট অ্যালাউড। অতএব আগে যা ছিল লাইটিং দেখা - প্যান্ডেল নয়, এখন ব্যাপারটা ঠেকল প্যান্ডেল দেখা - লাইটিং নয়। তবে কলেজে পদার্পণ হলে পরে আমার পুজো দেখার এমন কাটাকুটি খেলার প্রমোশন হয়; প্যান্ডেল-লাইটিং দু'টোরই দর্শন হয়, কিন্তু শো-টাইমের গন্ডি ছিল রাত ৯ টার ঘন্টা।

    প্রথম কালীমূর্তি দেখার কথা বলতে মনে পড়ে, চাঁপাডালির বড় মা কালী মন্দিরের কথা। ওমন হাত-দশেক লম্বা মিশমিশে কালো রঙের মধ্যে টকটকে জবা রঙের এক হাত লম্বা জিভ, সত্যি বলতে কি মূর্তির বদলে সেটাকে ওই বয়সে স্ট্যাচু ভেবেছিলাম (তখন থেকেই স্ট্যাচুর ওপর আমার অকার্পণ‍্য পক্ষপাতিত্ব এবং বহুল দূরদর্শিতার জন্য সরকার তো আমাজে 'স্ট্যাচু অফ প্রুডেন্স' ও ঘোষণা করতে পারে;))। পরে দেখেছি নীল-কালো সবই দেবীর রং; যেভাবে এ উপমহাদেশে 'মেম' রঙের বাইরে সব মেয়ের গায়ের রংই কোনও না কোনও ভাবে কালো, সবাই কম বেশি সে সূত্রে 'কালী'। আজন্ম ফেয়ার এন্ড লাভলি না মাখা, আর জন্মের আগে থেকে মা হলুদ-দুধ না খাওয়াতেই যে আমার এ ঘোর দুর্ভাগ্য, সেসব শুনেই আমার বড় হওয়া। মা কালীকে হয়ত ঠিক এই কারণেই কখনও 'ভয়ঙ্কর' ভাবে গ্রহণ করতে পারিনি।

    ছোট থেকে গান শিখতাম। একদিন মনে আছে, হারমোনিয়ামের আলাপী সুর, আমি গাইছি-

    "শ্যামা মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন...।"

    পরেরদিন মসজিদে আব্বুর তলব, ইমাম সাহেবের। একে তো 'মুসলমান' ঘরের মেয়ে, তার ওপর 'মেয়ে'দের গান 'শেরেক', এসব ছাপিয়েও আমি কিনা গেছি আরও এক কাঠি ওপরে, 'শ্যমাসঙ্গীত'এর বিষফোঁড়া! এলাকার সমস্ত 'নাম-ইজ্জত' তো এক নিমেষেই গুঁড়িয়ে যেতে যথেষ্ট।

    আদতে পোড়া মানসিকতার দেশে 'কালী'রা বরাবরই অচ্ছুৎ। তাদের লুকিয়ে-বাঁচিয়ে রাখতে হয় যাতে বছরের একটা সময় 'কালো জগতের আলো' মার্কা বিপ্লবী ঝড় ওঠানো যায়। পুরাণ এবং ইতিহাস বাদ দিলেও, থিমের হুজুগে আদিখ্যেতা দেখানো পুজোকে একালেও খিল্লির অজুহাতে 'ডাকাত-ড্রাইভারের পুজো' বলার মধ্যে যে অস্পৃশ্য-উন্নাসিকতার শ্লেষ মিশে থাকে, তাহাই 'উন্নতি'র পরিচায়ক; সেই উন্নতি যাতে ১৮৯৮ সালে কাশ্মীরে একটি সাত-আট বছরের মুসলমান মাঝি-কন্যাকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করেছিলেন সাধক স্বামী বিবেকানন্দ, সেই উন্নতি যাতে একইদেশ ২০১৮ য় আমরা-ওরা-ফর্সা-কালো-সুজাত-বেজাতের গেরোয় হাঁসফাঁস।

  • বিভাগ : আলোচনা | ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ৪০৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • prativa | 340123.163.123423.153 (*) | ১৩ নভেম্বর ২০১৮ ০৩:২৭83921
  • সেই কাশ্মীর , সেই শক্তিসাধনার নামে ঘোর অনাচার। কাঠুয়া আর কাঠুয়া - কন্যা !
  • টুপু | 785612.40.2378.168 (*) | ১৩ নভেম্বর ২০১৮ ০৩:৪৪83922
  • মানসিংহ রাজপুত,তিনি বাংলার দেবী কালির বন্দনা আরম্ভ করলেন এটি আর ট্রাক চালকরা কোনোদিন বাঙালি ছিল বা বাঙালিদের আধিপত্য ছিল? লেখিকার উল্লিখিত জায়গায় এলাকার একমাত্র গুরুদ্বার অবস্থিত।
  • dd | 90045.207.8945.100 (*) | ১৪ নভেম্বর ২০১৮ ০৩:১৫83923
  • হ্যাঁ হ্যাঁ, রাজস্থানের কোন দুর্গে জানি? যশোরের কালী মুর্ত্তি রয়েছে আর তার পূজারীরা না কি বংশানুক্রমে বাঙালি। কি জানি, সত্যি না মিথ্যে।

    বারোয়ারি পুজোর শ্রেণীভাগ তো আছেই, বিশ্বকর্মা শ্রমিক ভায়েদের। দুর্গাপুজার পাড়ার মাতব্বরদের। সরস্বতী উঠ্তি ছেলে ছোকরাদের। কালী হচ্ছেন মস্তানদের। লক্ষী হচ্ছেন ঘরের মা লক্ষীদের।

    কালীঠাকুরেরও রেটিং,আছে। আমার এক বন্ধু ,খুব কালী ভক্ত, কলকাতার সব কালীর খোঁজ রাখতো। কোনো কালীর কথা উঠলেই ভক্তিগদ্গদ স্বরে বলতো ,"খুব জাগ্রতো,খুব" আর অন্য কোনো মন্দিরের কালী নিয়ে ঠোঁট উল্টে বলতো"এক্কেবারে ফালতু, কিসসু কাজের না"।
  • | 670112.193.892312.245 (*) | ১৪ নভেম্বর ২০১৮ ০৩:২০83924
  • রাজস্থানের অম্বর ফোর্টএ আছে যশোরেশ্বরী কালী।
  • শক্তি | 238912.66.6734.213 (*) | ১৪ নভেম্বর ২০১৮ ০৪:২৪83925
  • লেখিকা তাঁর চোখ দিয়ে কালীপুজো দেখালেন খুব অন্যরকম ।কলমের জোর মনে রাখার মতো
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন