• বুলবুলভাজা  কাব্য

  • আজকের কবিতার পক্ষে বারোটি পাল্টা প্রশ্ন/ কবির স্থানাঙ্ক বিষয়ক দুই চারিটি কথা - দ্বিতীয় পর্ব

    কুশান গুপ্ত লেখকের গ্রাহক হোন
    কাব্য | ১২ জানুয়ারি ২০১৯ | ১২৫৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • প্রথম পর্ব
    কবিতার উপযোগিতা নিয়ে বারোটি পাল্টা প্রশ্ন

    অনেকে একথা বলছেন যে আজকের জীবনে কবিতার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। অনেকে বলছেন কবিতার কোনো ভূমিকাই নেই আর, কবিতা আজ সম্পূর্ণই অপ্রাসঙ্গিক। কেউ বা অভিযোগ করেন সমসময়ের সঠিক চেহারা কবিতাতে নেই। আজকের কবিতা ও কবিরা, সেহেতু, ব্যর্থ। কিন্তু, প্রশ্ন এসে গেল, কবিতার কি কোনো সামাজিক দরকার নেই? কবিতার সামাজিক উপযোগিতা নিয়ে লিখতে আমি সার্বিকভাবে অক্ষম হলেও দু-চারটি জরুরী প্রশ্ন উত্থাপন করি। এর উত্তর দেওয়ার দায় কারুর খুব একটা নাই থাকতে পারে, এইসব প্রসঙ্গ চাইলে ফেলেও দিতে পারেন, তবু লিখছি:

    ১) কি কারণে একটি কবিতা লিখেই জীবনানন্দ চাকরি খোয়ালেন? কি এমন বিস্ফোরক বস্তু ছিল তাতে যে একজন ছাপোষা মধ্যবিত্ত চাকরি হারাতে পারেন? তিনি তো ততদিন অবধি খুব একটা কেউকেটা কবি ছিলেন না।
    ২) কি কারণে হাংরির তদ্যবধি নাম না জানা কবিদের পেছনে রাষ্ট্র পুলিশ লেলিয়ে দেয়? ব্যাপার মামলা ও কোর্ট অবধি গড়ায়। সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গিন্সবার্গ আবু সাইদ আয়ুবকে চিঠি লিখে জানান, আপনারা প্রতিবাদ করুন।
    ৩)কেনই বা আজকের জনপ্রিয় এক কবির একটি কবিতা নিয়ে তাঁর বিরূদ্ধেও মামলা হয়, হামলার ভয় দেখায় উগ্র ও অন্ধ সাম্প্ৰদায়িক লোকজন? ফেসবুক উত্তাল হয়ে ওঠে? ব্যাপার এতদূর গড়ায় যে মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
    ৪) কেন একটি নকশালপ্রভাবিত ছাত্র সংগঠন লেনিন দিবসে সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামক এক কবির কোটেশন তাদের পোস্টারে দেয়? মনে রাখতে হবে ইউনিয়নে থাকার কমপালশন এবং ভোট পাওয়ার দায় তাদের রয়েছে। উক্ত কবির বিরুদ্ধে জয়দেব বসু ‘ঘেন্না’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
    ৫) কেন আমরা বই না দেখে জনপ্রিয় গদ্যও কোট করতে পারিনা, অথচ, এমনকি অনেক আধুনিক কবিতা নির্ভুল গড়গড় করে অনেকেই বলে যেতে থাকেন?
    ৬) মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা ব্যানারে কেন জীবনানন্দের একটি অরাজনৈতিক কবিতা, যার তেমন এক রাজনৈতিক ঝাঁঝ নেই, শ্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত করেছিল?রূপসী বাংলার উক্ত ব্যবহৃত কবিতাটি:
    'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি...'
    ৭) কিভাবে বেস্ট সেলার 'মাধুকরী' উপন্যাসে জনপ্রিয় সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ এতগুলি সমকালীন বাংলা কবিতার অংশ তুলে ধরলেন? যদি সমকালীন বাংলা কবিতা সম্পর্কে পাঠক এতই বিমুখ তাহলে এই বই বাজারে কাটলো কি করে? মার্কেট রিস্ক ছিল না?
    ৮) কেন ‘ফিরে এসো চাকা’র ‘একটি উজ্জ্বল মাছ’ সৃজিত তাঁর একটি থ্রিলারধর্মী ছবিতে ব্যবহার করলেন? ওই ছবি কি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল?
    ৯) 'দেখতে ভালো মাখতে খারাপ' একটি সাবানের বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন। এই লাইন কতটা গদ্য, কতটা কবিতা?
    ১০) পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না' গদ্যের না কবিতার, কিসের কাছাকাছি?
    ১১) চন্দ্রবিন্দুর গান প্রসঙ্গেও একই প্রশ্ন। এগুলি বিক্রয়যোগ্য সঙ্গীত হলেও কিছু উত্তরাধুনিক কবিতার এলিমেন্ট কি নেই?
    ১২) নীহার রঞ্জন রায়ের আকরগ্রন্থ 'বাঙালির ইতিহাসে' কি কোনো কবিতা বা কবির উল্লেখ নেই?

    এইসব প্রশ্নগুলির উত্তর নিয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলেও নিজের আবছা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি। কিন্তু, প্রশ্নগুলিতে কবি ও কবিতার ব্যবহারিক ও বাস্তবসম্মত দিকগুলিই রাখলাম।সংবিগ্ন পাঠককূল, সম্ভাব্য উত্তরগুলি নিয়ে একটু ভাবুন। সামাজিক জীবনে কবিতার উপযোগিতা ও প্রাসঙ্গিকতা হিসেবে হয়তো এগুলি বিবেচিত হতে পারে।

    ~~~~~~

    চর্যা কি আজও প্রাসঙ্গিক? স্থানাঙ্ক যদি হয়, কালাঙ্ক বলে কিছু হয় না?

    প্রথমে যে প্রসঙ্গ তুলেছিলাম সেই প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কি উপায়ে কবিতা তৈরী হয় কেউ কি আদৌ জানে? মনে পড়ছে, সত্তরের কোন এক সালে, সম্ভবত ১৯৭৮(ভুল হতে পারে), 'অমৃত' নামক পত্রিকায়, সমকালীন দশ বারোজন কবিকে কবিতাসংক্রান্ত বেশ কিছু প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। কয়েকটা প্রশ্ন স্মৃতি থেকেই লিখছি।
    ১) কেন লেখেন?
    ২) কবিতায় শব্দের গুরুত্ব কি?
    ৩) কিভাবে লেখেন?
    ৪) সমকালীন কোন কোন কবি আপনাকে প্রভাবিত করেন?
    ৫) আপনি কি সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ?

    বলাই বাহুল্য, বিভিন্ন কবির উত্তর বিভিন্ন ধরনের ছিল। এটাই স্বাভাবিক, কেননা শিল্প বা সাহিত্যে কোনোদিনই স্থির সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল ও অনুচিত। তাছাড়া ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির উত্তর এমনকি পদার্থবিদ্যার সামান্য উত্তরপত্রে যদি আলাদা হয়, তাহলে কবিতাতে আরো বেশি হওয়ারই কথা।কবির তালিকায় জয় গোস্বামী, রণজিৎ দাশ, বীতশোক ভট্টাচার্য, অনন্য রায়, তুষার চৌধুরী প্রমুখ ছিলেন। এটুকু মনে আছে যে জয় গোস্বামী ও বীতশোকের উত্তরগুলি ছিল বেশ দীর্ঘ। রণজিৎ দাশের উত্তর ছিল এতটাই সংক্ষিপ্ত যে মনে হবে যেন অবজেক্টিভ প্রশ্নের উত্তর লিখছেন। মনে পড়ছে রনজিতের 'কেন লেখেন' এর জবাবে লেখেন এই ধরণের এক লাইনের উত্তর:'আমার লিখনপ্রতিভা ও লিখনঅভ্যাস আছে তাই লিখি।' রণজিৎ জীবনানন্দ হলে 'হৃদয়ের মধ্যে রয়েছে এক বোধ, তারে আমি পারিনা এড়াতে'-হয়তো বা বলতেন। কিন্তু, পাঠক, ভেবে দেখুন, রণজিতের কথা ও জীবনানন্দের কথা কি এক নয়?

    'সমকালীন কোন কোন কবি আপনাকে প্রভাবিত করেন?' এই প্রশ্নের উত্তরে বীতশোক সম্ভবত উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি কালের বিভাজন মানেন না এবং চর্যার কবিরা তাঁকে খুবই প্রভাবিত করেন। প্রসঙ্গত, বীতশোকের তরুণ বয়সের এক দুঃসাহসিক কাজ ছিল, 'হাজার বছরের বাংলা কবিতা' বলে এক সম্পাদিত গ্রন্থ, যা সম্ভবত অধুনালুপ্ত। এখানে একটি তথ্য দিয়ে রাখি। তরুণ কবি সোমনাথ রায়ের ২০১২ তে প্রকাশিত 'ঘেন্নাপিত্তি'তে ও চর্যার কবিতাপ্রয়াস পাচ্ছি। লক্ষ্য করুন সোমনাথের এই প্রয়াস:
    মূল পদঃ কাহ্নুপাদানাম্
    চর্যাপদ-১০ (রাগ দেশাখ)

    নগরবাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ।
    ছোই ছোই জাহ সো বাহ্মনাড়িয়া॥
    আলো ডোম্বি তোএ সম করিব মা সাঙ্গ।
    নিঘিন কাহ্ন কাপালি জোই লাংগ॥
    এক সো পদুমা চৌষঠ্‌ঠী পাখুড়ী।
    তহিঁ চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী॥
    হা লো ডোম্বি তো পুছমি সদভাবে।
    আইসসি জাসি ডোম্বি কাহরি নাবেঁ॥
    তান্তি বিকণঅ ডোম্বি অবরনা চাংগেড়া।
    তোহোর অন্তরে ছাড়ি নড়পেড়া॥
    তু লো ডোম্বী হাঁউ কপালী।
    তোহোর অন্তরে মোএ ঘেণিলি হাড়ের মালী॥
    সরবর ভাঞ্জিঅ ডোম্বী খাঅ মোলাণ।
    মারমি ডোম্বি লেমি পরাণ॥

    প্রেম (কাহ্নপার পদ থেকে)

    প্রেমের আশ্চর্য বাড়ি সব হিসেবের থেকে দূরে
    জাতিভেদে বিত্তভেদে সবাই কখনও আসে ঘুরে
    এইবারে, দ্যাখ প্রেম আমিও দেখতে যাব তোকে
    ঘৃণাজয়ী যোগী আমি, লজ্জা ছেড়েছি নির্মোকে-
    সৃষ্টির রহস্যমূলে রতিকলা কামনার ঘোর
    সেইখানে লীলাময়ী প্রেম তোর নাচের আসর
    আমিও মোহিত হই, বিনম্রে রাখি জিজ্ঞাসা
    অজানার কোন পথে আশ্চর্য এই যাওয়া-আসা?
    যে সুতোয় বেঁধে দিস অদৃশ্য আলোর উজানে
    রঙের নেশায় মজে ভুলে গেছি বাকি সব মানে
    সেই পথে পথ হেঁটে পথ ভুলে আমি কাপালিক
    কামনাও হারিয়েছে এই শব, হাড়ের অধিক-
    শুকায় করুণাধারা, খায় প্রেম জীবনের সার
    সেই প্রেম খাব আমি সৃষ্টিচক্র করে ছারখার।

    কাহ্নু আজ বেঁচে থাকলে এই দেখে খুশি হতেন যে হাজার বছর পরে তাঁর কবিতা কিভাবে, কোন এক আশ্চর্য শুশ্রূষায় বেঁচে আছে। হরপ্রসাদও হয়ত অখুশি হতেন না।রবীন্দ্রনাথের 'আজি হতে শতবর্ষ পরে' এই কবিতা কি কোনো আশাবাদ না কি এক ধরণের অমরত্বের প্রত্যাশা? এই সেই অমরত্বের প্রত্যাশা যাকে সুনীল কবিতার তাচ্ছিল্য দিয়েই নেগেট করেন।কবীর সুমন 'মুখে মুখে ফেরা গানে', বেহুলার ইমেজ দিয়ে জানান যে বৈধব্য বাংলার রীতিই নয়। মনে প্রশ্ন ও সংশয় আসে, লখিন্দর কেন 'কালকেউটের' ছোবলে মারা গেলেন।লখিন্দরের মৃত্যু তো কালনাগিনীর কামড় বলেই তো ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি। প্ৰশ্ন পায়, উত্তরও তো জানাই, তবু, মাঝে মাঝে মনে হয় একটু স্তব্ধতার গান শুনি। সুমনের গান কি গান না কবিতা? পল সাইমন কি গায়ক না কবি? ববি ডিলান কি নোবেল পেলেন কবিতার কারণে? তাহলে সুমনকে আমাদের দেশ, আমাদের বাংলা কেন সাহিত্যে পুরস্কার দিতে পারে না।

    কিন্তু, চর্যার স্রষ্টারা কি আজকের সোমনাথের এই ভাষা বুঝে ফেলতেন? হালকা আন্দাজে বলছি, তাঁরা কি জানতেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক এক দেশ রয়েছে, যেখানে বসে হয়তো এই কবিতা লিখছেন এক গবেষক তরুণ কবি সোমনাথ।

    হাজার বছর আগের কবিরা এমনকি আজকের ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট দেওয়া কবিদের সঙ্গেই যেন কিভাবে এক অলীক আত্মীয়তায় রয়েছেন। তাই , কাহ্নু, কৃত্তিবাস, জয়, বিনয় , সুনীল, মৃদুল, জয়দেব(বসু), সোমনাথ যেন নিরবচ্ছিন্ন কালপ্রবাহে একই সূত্রে বাঁধা, কিন্তু তাদের দেশ একই।সে আমাদের বাংলাদেশ, আমাদেরই বাংলা রে।মনে পড়ে গেল সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের এই কবিতায় সত্যজিৎ রায়ের কথা। মনে পড়ে গেল বিভূতি ভূষণ। অপুর হাতে ধরা গ্লোব, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের এই কবিতা আবৃত্তি করে অপু এই পুরস্কার জিতেছিল। সুদুরের পিয়াসী, কৌতূহলী, অপু এই গ্লোব সবসময় হাতে রাখত, সত্যজিতের ‘অপরাজিত’ সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু এও মনে পড়ে গেল সত্যেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের অভিযোগ: ' সত্যেন করতেন কিছু/যদি না ছুটতেন ছন্দের পিছু পিছু'।

    ভাষার ধরণ ভিন্ন কবিতে কবিতে, স্থানে আর কালে। যদি স্থানাঙ্ক বলে কিছু হয়, কালাঙ্ক বলে কি কিছু হয়? চর্যার প্রসঙ্গ আবার উত্থাপন করে বলি বীতশোক তাঁর একটি নিবন্ধে লিখেছেন যে চর্যার যুগে কবি বলে কোনো আলাদা পেশাদার ছিলেন না। চর্যার কবিরা জাল বুনতেন, চাষ করতেন, শিকার টিকার করতেন, এমনকি ফাঁসিও দিতেন।এই নিবন্ধ লেখা হয়েছিল আনুমানিক আশির দশকে। বীতশোকের পরবর্তী যুক্তি, আজকের আশির দশকে একই রকম প্রবণতা। অর্থাৎ, কবি বলে এখন আলাদা কেউ নেই। অধ্যাপক কবি, ব্যবসায়ীও কবি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্ৰমুখও কবি। যদি এই হাইপোথিসিসে কিছু সারবত্তা থাকে, তাহলে কি ২০১৮ এ একথা সত্য নয়? ২০০০ সন থেকে কি বিশ্বে, ভারতে, তথা বাংলায় কোনো গুণগত উল্লমফন হয়নি ভাবনায়, ভাষায়, ভঙ্গিতে?আজকের কবিতার ভাষা বোঝাতে বেছে নিলাম আপাতত একটি নাম, সায়ন কর ভৌমিক, তুলছি কবিতার অংশ, যেখান থেকে ব্যক্তি সায়নকে খুঁজুন, দেখুন স্থান ও কালকেও:
    'আজকাল সব ছন্নছাড়া হয়ে গেছে, রক্তচাপ, ক্ষুধামান্দ্য, সংসার, এমনকী যৌন সততা পর্যন্ত, রাতে ঘুম নাই, বাটামের ভয় আছে না?
    কিন্তু সে যাই হোক; এইসব শূন্য দশক, একের শতক এইসবই কিন্তু গাপ হয়ে ছিল নব্বইয়ের ভাঁজে।
    দহরম মহরম ছিল বাপু, তাহাদের সাথে। সাতে পাঁচেই ছিল সব, নয়ে ছয়ে, বাহান্ন তিপান্নতেও ছিল সব বাইপাসের ধারে ভুট্টাপোড়ার সাথে দুইটি ছিলিম।'

    যদি পড়তে পড়তে অনভ্যস্ত পাঠক অবিরত ধাক্কা খান, তবে পড়ুন পরের অংশটি:
    'টরেটক্কা সংকেত পাঠাই, পদ্য লিখি এখানে ওখানে
    ইউক্যালিপটাসের পাতা, ভেজাল দিই, এদিক ওদিক, একপাতায় ছাপিয়ে দিই টরেটক্কা,
    ক্যাপ্টেন স্পার্ক হলে ধরে ফেলতো ঠিক, বুঝে নিত সন্ধে নামার ঝোঁকে
    জনবহুল সাইকেলরিক্সাসঙ্কুল পথের কোনাখামচি ঘেঁষা
    ভুলভাল কোড।'

    এখানে পড়তে পড়তে প্রশ্ন আসতে পারে যৌন সততা আবার কি জিনিস? বাইপাস এই শব্দটি কবে থেকে কলকাতায় ঢুকে পড়ল তা ধরতে নির্ণায়ক কি এই কবিতা? 'ছিলিম', 'বাটামের ভয়', 'ভুলভাল' এগুলি তো চালু আড্ডার শব্দ যা আমরাও বলেছি। কিন্তু এই কবিতার প্যাটার্ন কি শক্তি, জয়, মৃদুল, জয়দেব থেকে কি অন্যরকম নয়?
    কোড বললে তা কতটা সফটওয়ার কোড? মনে পড়তে পারে কি ড্যান ব্রাউন? তাছাড়া সেমিওটিক্স বা চিহ্নবিদ্যা দিয়ে তৈরি 'মিনিং মেকিং' প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে? কি এখানে 'কোড'? মনে পড়তে পারে 'অথর ইজ ডেড' র প্রকল্প? ব্যানাল এই শব্দটি কবিতায় লেখা সঙ্গত? পাঠক কি কবির কবিতা ধরতে পারছে না? ধরার জন্য কি ক্যাপ্টেন স্পার্ক হতে হয়? কবি কি শক্তির পুরনো কিসসা আনলেন : পাঠককে এগিয়ে আসতে হয়, হৃদয় দিয়ে, দরদ দিয়ে, মগজ দিয়ে?কবি-পাঠকের সহাবস্থান কি এইসব কথায় রয়েছে? তাছাড়া শূন্য দশকের নির্মাণে কি নব্বইয়ের ভূমিকা ছিল?

    ~~~~~~

    কামিনী রায়ের কবিতা কি রবি ঠাকুর লিখতে পারতেন? যশোধরার কবিতা কি পুরুষ কবি লিখতে সক্ষম?

    ফেমিনিজমের অতিচর্চিত পুরনো কচকচানিতে না গিয়ে বলি সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন দেশ তথা ভারত, বাংলা আসলে ব্রিটিশ ভারত বা ব্রিটিশ বাংলা, ততদিন থেকে কামিনী রায় সহ একাধিক কবি তাঁদের কবিতা লিখছেন। এবং কামিনী রায়ের, 'পাছে লোকে কিছু বলে' আজও সমান প্রাসঙ্গিক না হলে এক ধরণের দ্বিধাগ্রস্ততা আজও কেন মহিলা কবির গলায়? পুরুষ বা নারী বিভাজন যদি নাই থাকে তাহলে কিভাবে তৃতীয় লিঙ্গ বলে একটা ব্যাপার থাকবে?
    তবুও মেয়েদের ঋতুকালীন প্রসঙ্গ আজ অনেক অকপট। তাই তাঁরা সেদিনের দ্রৌপদীর রূপা গাঙ্গুলির মত মেক আপ চড়িয়ে বস্ত্রহরণের সময় কনফিউজড স্বামীর হঠকারিতার জন্য কৃষ্ণকে বা নীতিশ ভরদ্বাজকে ডাকবেন না। কালকের দ্রৌপদী আজকের মহাশ্বেতার রক্তাক্ত দোপদী মেঝেন হয়ে এগিয়ে বলছেন: কাউন্টার কর, কাউন্টার কর। আজকের মহিলাদের কবিতার সুর বরং লিরিকস্বভাব হারিয়ে ফেলছে, আবার পুরুষ কোনো কবি ছন্দের ঝোঁক এত বেশি লিরিক লিখছেন যে তাতে যেন ধার ও ভার কমে যাচ্ছে।
    আজকের মেয়েদের দায়িত্ব নিতে অনেক বেশি হয়, অথচ তারা পুরোনো ট্রাডিশনের সিঁদুর মুছে ফেলছেন, কেমন একটা ছন্নছাড়া ভাব যেন তাদের, এমন এক পুরুষতান্ত্রিক অভিযোগ বাড়ছে। কেমন হয় তাঁদের কবিতা, যারা ফর্ম ফিলাপে বাধ্যত বা স্বতঃস্ফূর্ত কিনা জানিনা, জেন্ডারের জায়গায় F এ টিক দেন ?
    'মায়ামমতায় ভরা এ সংসারে এসে
    তুমি তো করেছ শুধু তুমুল অশান্তি, মাগো, বাড়ি যাও, বাড়ি যাও,
    আমাকে বলেছে সব প্রতিবেশী, পাড়াপড়শি , এমনকি নিজের ছেলেটিও।
    আমাকে বলেছে আমি অলক্ষ্মী পিচেশ।
    কেন বা বলবে না বল, আমি তো খেয়েছি সিগারেট আর আমি তো সন্ধে পার করে
    বাড়িতে ফিরেছি, কোন সন্ধেবাতি, হুলুধ্বনি, শঙ্খের বাতাস
    আমাদের বাড়িতে বহেনি।
    তারপর এসেছে বন্ধু, কবিদের দল, মধ্যরাতে আড্ডা দিতে
    ছেলে অন্য ঘরে বসে পড়া করছে, দোর দিয়ে, সেও তো জেনেছে
    তার মা অদ্ভুত, খাপছাড়া, কোন সাধারণ সতীলক্ষ্মী নয়।
    সবাই বলেছে তুমি বাড়ি যাও বাড়ি যাও, তার জন্য ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছি নিজের।
    শুধু যেই নিজের আনন্দ আমি রাখতে গেলাম সেই ঘটে
    ঘটটি গড়িয়ে পড়ল।
    স্বামী ও সংসার কোন কথাই বলল না। ছেলেও এবার চুপচাপ।
    আমি কি আমার সুখ নিজে নিজে রচনা করব , গো?
    আমি কি আমার ফ্ল্যাট একা একা সাজিয়ে ফেলেছি?
    আমার উনুনে আজ একজনের রান্না হবে নাকি?
    এই দুঃখে এই কষ্টে, আমি ঘট গুঁড়িয়ে ভেঙেছি...
    তারপর অলক্ষ্মী মায়ের মত একা একা ফিরে এসে ঘরে
    আমি সন্ধ্যা অবদি ঘুমাই, আর চুল খুলে বেপাড়ায় ঘুরি...
    অশান্তি বানাই আমি, মুখে মুখে ছড়া কাটি সমস্ত বিকেল...
    আর, আমি সারা পথ নিজের এ পদচিহ্ন ছড়িয়ে এসেছি... মনোদোষে।
    নিজের শরীর খান খান করে আমি আজ রোগজীর্ণ একজোড়া জ্বরতপ্ত চোখ...
    তৃতীয় নয়ন কই, সে তো ছিল, কুলুঙ্গিতে তোলা, আজ নামিয়ে পরে নি?'

    যশোধরা রায়চৌধুরী লিখছেন এই কবিতা। ফেসবুকে শেয়ার করলেন অপর এক কবি, যিনিও নারী। শেয়ারের দিন হলো এ বছরের লক্ষীপুজো। এর বেশি কিছু বলা এক ধরনের অর্বাচীনতা হয়ে যেতে পারে। পাঠক, পড়ুন। আপনিও পড়ুন, হে পাঠিকা।
    শুধু বলি এই কবিতায় কতটা রক্তক্ষরণ, দ্বিধায় দীর্নতাই বা কতটা? সনাক্ত করুন। কামিনী রায়ের 'পাছে লোকে কিছু বলে' কবিতার কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি। কামিনী রায়ের সংশয়- প্রকল্পের চেয়ে কি যশোধরার সংশয়ের ধরণ কিছু আলাদা? কোথায় বা তা ভিন্ন? পাঠক, পড়ুন, সনাক্ত করুন। অল্পই তুলে দিচ্ছি কামিনী রায়:
    'করিতে পারি না কাজ
    সদা ভয় সদা লাজ
    সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,
    আড়ালে আড়ালে থাকি নীরবে আপনা ঢাকি
    সম্মুখে চরণ নাহি চলে
    কাঁদে প্রাণ যবে, আঁখি-সযতনে শুষ্ক রাখি
    নির্মল নয়নের জলে
    পাছে লোকে কিছু বলে'

    এই দুটি কবিতা থেকে কান্না সনাক্ত করা যায় , ধরা যায় দুই সময়ের দুই কবির সংশয় ও সমস্যার যন্ত্রণা, যা প্রসূত কবিতায়। নারীর নিজস্ব অধিকার নিয়ে সমাজ কতদূর এগিয়েছে, এই প্রশ্নও এসে যেতে পারে।

    এবারে মিতুল দত্তের কবিতায় চোখ রাখি, পেয়ে যেতে পারি অন্য এক ঝোঁক:

    'সন্ধিবয়সের দিকে মুখ ছিল, করুণার দিকে
    কাকলির দিকে আর ক্ষুধিত পাষাণে লেখা আলোর অপেরা, আলো
    মিছরির ছুরির মতো আলো তার স্বভাবে ঢুকেছে
    শরীরের খানাখন্দে, যুবক, জ্বালানি আর গান
    উনুনে দিয়েছি আমি, তালপাতা খোঁপায় পরে শুয়ে আছি
    পিঁড়িতে সাজিয়ে সাদা, হে সাদা, হে শ্বেতপত্র, আমি তার রবিবাসরের
    সম্রাজ্ঞী-কেচ্ছার পাশে পাত্র চাই পাত্রী চাই ভরিয়ে তুলেছি
    আমি সেই চৈতন্যহারানো বিষ্ণুপ্রিয়া হতে চেয়ে
    হয়ে গেছি সূর্পনখা, নাক কেটে গুরুদন্ডবৎ
    মিশেছি তোমার খুরে, গোক্ষুর আমার
    তোমার মাথায় চড়ে ত্রিকাল দেখাব ভাবি আর
    ত্রিকাল আমাকে দেখে, আমি যেন সঙ, দর্জিপাড়া
    মর্জিনা নাচিয়ে যেন ঝুমঝুমি বাজাব'

    এখানে ‘ক্ষুধিত পাষাণে’র উল্লেখ কি সেই নারীচরিত্রের ওপর পুরুষ কর্তৃত্বের আভাস? সূর্পনখা, বিষ্ণুপ্রিয়া, মর্জিনা সবকটি নারীর উল্লেখের মধ্যে কি কোনো মিল আছে, যেগুলি এক ধরনের কষ্ট ও বঞ্চনার ইঙ্গিত দেয়? কাকলী ও করুণাও তো কোনো নারীরই নাম। নির্মাণ কৌশলে হয়ত বা মনে পড়তে পারে ইউরোপিয়ান বা ভারতীয় চলচ্চিত্র, যেখানে সমস্ত চরিত্রই নারী। তাছাড়া দর্জিপাড়া সমকালীন প্রান্তিক নারীর দিকেই যেন দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই কবিতার সঙ্গে নাটকের কোনো যোগ আছে? সন্ধিবয়েস কি বয়ঃসন্ধি নাকি তা আড়ি-ভাবের কবিতা। পুরুষচরিত্র-বিবর্জিত এই কবিতা কি এক সচেতন নির্মাণ নয়?

    ~~~~~~

    কবিতায় ধরা পড়ে সমকাল, ইতিহাস, প্রযুক্তি, অর্থনীতিও
    কবিতা থেকে কবিকে চেনা যায়,সমকাল অদ্ভূত ধরা পড়ে। একটি সাম্প্রতিক কবিতা পড়ুন:
    'অবশেষে বোতামের অক্ষরে অক্ষরে উপগ্রহ যোগ যদি যায় খুলে
    আমরা পৌঁছতে চেয়েছি চাঁদে-মধ্যরাত্রির সিকি ভাগ মাশুলে।
    নিতান্ত মামুলি কথা, তবু অনর্থক নয়, সীমিত সামর্থটুকু
    নিঙড়ে বরাতমাফিক কথার ক্ষরিত সুখ সামান্য আশয়
    পার করে দেয় তার পরদিন থেকে আরও কিছু চন্দ্রহীন তট।
    কেউ বুঝি আড়ি পেতেছিল সেইখানে? কেউ বুঝি লিখেছিল পট?
    সে-ই বুঝি পথ জুড়েছিল, বটঝুরি দোল দিয়ে দেওয়াল গেঁথেছে?'
    সুমন মান্নার ‘ফোনঘর’ এই কবিতায় যেন ফিরে আসছে ফেলে আসা এসটিডি যুগ, যা এখন গল্পের ও কবিতার বিষয়। উপগ্রহ যোগ আসলে স্যাটেলাইট মনে হয়, যা আজকের যোগাযোগের এক আবশ্যিক শর্ত। সিকি ভাগ মাশুল বললে মনে পড়ে কোনো এক রাত এগারোটার পরের তড়িৎদার বুথ, যেখানে উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রেমিক ও প্রেমিকা। এখানে উল্লেখ্য, প্রেম করতে রাষ্ট্রীয় মাশুল লাগে, কবি জানিয়ে দিলেন। উদ্বিগ্ন প্রেমিক- প্রেমিকাকূল, উদ্বেগের কারণ লম্বা কিউ এবং সমস্ত লাইন ব্যস্ত। মনে পড়ে অল লাইনস আর বিজি, যা আজকের দিনেও মাঝে মাঝে শোনা যায়। সুমন যেন এক অজানা বান্ধবীর কথা বলছেন। সেই বান্ধবীর জন্য যেন মন খারাপ। তাই শেষ লাইনটি এরকম বিষণ্ণ : ' মাঝে মাঝে তাকে মনে পড়ে'। সুমন এক মারাত্মক কথা জানাচ্ছেন : ' নিতান্ত মামুলি কথা, তবু তা সাধারণ নয়'। মনে পড়ে বুদ্ধদেব বসুর লাইন: যা কিছু ব্যক্তিগত, তাই পবিত্র।


    ক্রমশঃ
    প্রথম পর্ব | তৃতীয় পর্ব
  • বিভাগ : কাব্য | ১২ জানুয়ারি ২০১৯ | ১২৫৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
আরও পড়ুন
আঁধি - Jahar Kanungo
আরও পড়ুন
রাজা - Tapas Das
আরও পড়ুন
ভগীরথ - Vikram Pakrashi
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Tim | 013412.126.562323.237 (*) | ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ ০৯:২৬79597
  • নতুন কোন "ডাউট" পেলাম না। জীবনানন্দ লিখেছেন যেসব "কড়ার" এর কথা সেগুলোর উৎস কী? দ্বিতীয়তঃ, উনি নিজেই খুব একটা আগ্রহী বলেও মনে হচ্ছেনা। খুবই ধোঁয়াটে কেস। বাকি যাঁদের চাকরি গেছিলো তাঁদেরও কারো কারো নিশ্চয়ই কলেজ কর্তৃপক্ষের সম্পর্কে কোন না কোন কনস্পিরেসি থিওরি ছিলো। তাতে কিছুই প্রমাণিত হয়না।

    কিন্তু এই হলেও হতে পারে ঘটনাটি সত্যি বা মিথ্যে যাই হোক কিছুই এসে যায়না। জীবনানন্দকে বাদ দিলেও ২ ও ৩ এর উদাহরণগুলো পড়ে থাকে, আরো কিছু লেখকের নামও সহজেই আনা যাবে যাঁদের লেখা অশ্লীল বলে অভিযোগ উঠেছে, এবং তার জন্য মামলা মোকদ্দমা হয়েছে। এই সেদিন মান্টো নিয়েই তো কত কথা হলো। মান্টো তো গল্প লিখে এই সমস্যায় পড়েছিলেন। তাহলে আপনি এগুলোকে কবিতা ফর্মটির স্পেসিফিক কেন বলছেন?
  • Atoz | 125612.141.4589.119 (*) | ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ ১২:০০79581
  • এত গোল গোল ঘোরার কী আছে? আমার প্রশ্ন অতি সিম্পল।
    মূল পোস্টের এই বক্তব্যটার কি মীমাংসা হল
    "১) কি কারণে একটি কবিতা লিখেই জীবনানন্দ চাকরি খোয়ালেন? কি এমন বিস্ফোরক বস্তু ছিল তাতে যে একজন ছাপোষা মধ্যবিত্ত চাকরি হারাতে পারেন? তিনি তো ততদিন অবধি খুব একটা কেউকেটা কবি ছিলেন না।
    "
    ?????
    এই "একটি কবিতা" টি কোন্‌ কবিতা? তার মধ্যে কী বিস্ফোরক বস্তু ছিল?

    এতসব লেখা বা কোট বা তথ্যের মধ্যে কোথাও নিশ্চিতরূপে এই "একটি কবিতা" পাচ্ছি না। তার বিস্ফোরক তো পরের কথা।
  • কুশান | 342323.176.1267.88 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০২:১২79605
  • @সুকি

    সুকির তোলা একটি মূল প্রশ্ন:

    সুকির একটা প্রশ্ন নির্দিষ্ট আলোচনার অভিমুখ পাল্টাতে হারিয়ে গেছে। পুলক বন্দো প্রসঙ্গ। এই প্রশ্ন তিনি রেখেছিলেন যে এটা আমার নিবন্ধে ব্যবহৃত হয়েছে তা প্রাসঙ্গিক না জাস্ট চমক বা স্টান্ট কিনা।

    এটা চমক বা স্টান্ট নয়। মূল ছড়াটি দেব সাহিত্য কুটিরের সংকলনে ছোটবেলায় পড়া, যেটি মিঠুরাম মান্না নামে বেরিয়েছিল। পুরো ছড়াটি তুলে দিয়েছি, সরসতা ও কাব্যিকতা বোঝাতে।

    ছড়া বা সরসতায় কাব্যিক এলিমেন্ট থাকে? যদি থাকে, তবে সিরিয়াস আলোচনায় স্থান দিতে দ্বিধা কেন থাকবে?
    আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি আবু সাইদ আয়ুব এবং বুদ্ধদেব বসু তাঁদের 'আধুনিক বাংলা কবিতা' র সংকলনে সুকুমার রায়কে স্থান দিয়েছেন। স্থান পেয়েছেন অন্নদাশঙ্কর, যিনি ছড়াকার। স্থান পেয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, যিনি গীতিকার।

    দেখুন, ছড়ার মধ্যে কাব্যিকতা না থাকলে কী করে এরা ঠাঁই পেত? সুকি বলেছেন, ভলিউম বাড়ানোর জন্য। এ-যুক্তি ধোপে টেকে না। অনেক কবি ঠাঁই পান নি। বই এর কলেবর তেমন কিছু না। ক্ষীণ বললে অত্যুক্তি হয় না।

    বু.ব এর সংকলনে রবীন্দ্র, নজরুল, সুকান্ত, জসিম উদ্দিন, সুকান্ত, সুভাষ থেকে শক্তি সুনীল অবধি ছিল।

    বীতশোক ভট্টাচার্য আশির দশকে 'হাজার বছরের বাংলা কবিতা' নামে একটি সংকলন সম্পাদনা করেন। প্রকাশক বাণীশিল্প। বইটি অধুনালুপ্ত। শুনেছি
    'হাজার বছরের বাংলা কবিতা' এই ধরনের সংকলন পরে আরো কেউ কেউ বের করেছেন, তবে প্রথম কৃতিত্ব সম্ভবত বীতশোকেরই। বীতশোকও সুকুমার রায় কে রেখেছিলেন।

    এতে সিরিয়াসনেস ক্ষুণ্ণ হয় আমি মনে করি না। শঙ্খ ঘোষ সম্পাদিত রবীন্দ্র কাব্যের সংকলনে তিনি এমন কবিতা রেখেছেন:

    "আদর ক'রে মেয়ের নাম রেখেছে ক্যালিফর্নিয়া,
    গরম হল বিয়ের হাট ওই মেয়েরই দর নিয়া।

    মহেশদাদা খুঁজিয়া গ্রামে গ্রামে
    পেয়েছে ছেলে ম্যাসাচুসেটস্ নামে,
    শাশুড়ি বুড়ি ভীষণ খুশি নামজাদা সে বর নিয়া
    ভাটের দল চেঁচিয়ে মরে নামের গুণ বর্ণিয়া।"

    রবীন্দ্রনাথ মানে কি শুধু 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ'? শুধু ' সোনার তরী', 'নিমন্ত্রণ'? একটা রোমান্টিক যুগের ব্রাহ্ম ভাবধারায় সিক্ত বাংলার ঊনবিংশ শতক?

    নাকি অন্য দিক, সরস দিক, আপাতলঘু দিকও রয়েছে? তা কাব্যিকতায় নতুন মাত্রা দেয়? শঙ্খবাবু কেন রাখলেন?

    একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি। সম্ভবত 2012 সাল বা 2011, কবীর সুমন কলামন্দিরে অনুষ্ঠান করছেন। হিমাংশু দত্তের একটি গান গেয়ে কথা বলতে বলতে সুধীন দত্ত আবৃত্তি করলেন এবং বললেন হিমাংশুর লিরিক্স এ কাব্যিকতার বোধ ছিল। অনেকক্ষন এই পয়েন্টে বললেন।

    আমি এই পয়েন্ট নিয়ে ভেবেছি। সলিল চৌধুরী, জটিলেশ্বর এবং অন্যান্য জনপ্রিয় গীতিকার, এরা কেউ কবি নয়, গীতিকার, তবুও কখনো যেন এদের গান কবিতা হয়ে ওঠে।

    সুমন, মহীন, চন্দ্রবিন্দু, অনুপম এইসবের মধ্যে কাব্যিকতা ও সূক্ষতার ভাব অনেক বেশি মাত্রায় পরিশীলিত। সুকি অবশ্য নিজেই একথা স্বীকার করেছেন।

    আর ছড়ার আপাতলঘু ফরম্যাট কে না ব্যবহার করেছেন? নীরেন্দ্রনাথ, সুভাষ, শক্তি, শঙ্খ, কত নাম বলবো?
  • rabaahuta | 342323.226.7889.160 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০২:৫০79606
  • আমাকে তো আপনারা কল্কে দিলেনন না, তাই নিজের প্রচার নিজেকেই করতে হয়। লঘু কবিতা প্রসঙ্গে আমার সেলিব্রিটি সিরিজ থেকে একটি কবিতা উদ্ধৃত করি-

    ~~~~~
    La Belle Dame Sans Merci
    ~~~~~~

    কটিতটে শিফনের ধটি
    সোফাসেটে মিঠে খুনসুটি
    ভেসে গেল একুল ওকুল
    দুকুলে ঢেকেছে সুতানুটি।

    ডুবুডুবু কলিকাতা সারা
    বাতাসিয়া লুপে একা ট্রেন
    খুঁজেছে তাহার ঠিকানা
    আধো আধো মুনমুন সেন!

    একটু দেরীতে ফেরে বাড়ি
    লোকেদের নাই তাড়াহুড়া
    ঝুঁঝকো আঁধারে পিপাসিত
    পেটরোগা মহীনের ঘোড়া।

    অবরে সবরে লুডো ঘুঁটি
    তিনদানে রজনী সফেন
    অবনীল আধোজাগরনে
    এলোমেলো মুনমুন সেন।
  • সৈকত | 340112.99.675612.98 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৩:২০79598
  • বোঝো, ~ কে দিলাম কমলকুমারের জন্য, বেরিয়ে এল জে দাস-র চিঠি, আমি নিজেই ভুলে গেছিলাম !!

    কুশানকে,

    বাস্তবের ফাঁক ভরাতে গদ্যের ব্যবহার নিয়ে আমার বক্তব্য ছিল, যে আরও গদ্যের ব্যবহার করলে, আপনি যেভাবে করছেন সেরকম হলে দেবীপ্রসাদের স্থির সিদ্ধান্ত একটু নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে, সে তিনি এইসব লেখাগুলো পড়ে থাকুন বা না থাকুন। অন্যদিকে, শৈলই যে জীবনানন্দ, এরকম হয়ত আপনি সরাসরি বলছেন না, শুধু অজানা তথ্যগুলো বার করে আনার চেষ্টা করছেন, সেটা করাই যায় কিন্তু তার ফলে উপন্যাসের যে স্বরাট অস্তিত্ব, সেটা একটু টাল খেয়ে যেতে পারে, নিছকই তথ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়ে যেতে পারে, আমার কিছু আপত্তি সেইখানে। অবশ্য, সেসব আলাদা লেখা/আলোচনার বিষয়।
  • কুশান | 342323.176.6756.136 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৩:৩৯79599
  • @Tim

    1. সন্দেহের অবকাশ থেকে যাচ্ছে, কারণ চিঠিটি প্রামাণ্য একটি ডকুমেন্ট হিসেবে ধরব। এই চিঠির রেফারেন্স এ যে যে পয়েন্ট ব্যবহৃত হয়েছে, সেই সেই পয়েন্ট আমার উদ্ধৃত উপন্যাসের অংশের সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যাচ্ছে।
    2. আমার বক্তব্যের যৌক্তিক বয়ন এবং মণীন্দ্র গুপ্তের বক্তব্য ও শ্রী রায় চৌধুরী র বক্তব্য, জীবনানন্দের গদ্য মিলিয়ে দেখলে, স্বচ্ছ ভাবে সত্য দেখা র ক্ষেত্রে ভিত্তি।

    3. 'কনসপিরেসি থিওরি' এই শব্দবন্ধ আপনার। আমার নিবন্ধে বা অন্যান্য বক্তব্যে এমন কোনো থিওরির কথা, ঝোঁক নেই। আমিও অবজেক্টিভ সত্য খোঁজার পক্ষপাতী।

    4. সৈকত জানিয়েছেন ভূমেনবাবু, যিনি জীবনানন্দ গবেষকদের অন্যতম একজন, তিনি জীবনানন্দের পক্ষে কিছুটা দাঁড়িয়েছেন। সিটি কলেজ সংক্রান্ত তত্ত্ব সব টা মানেননি। শেষের চিঠির বক্তব্য ও টিকা এ ধারনাকেই আরো দৃঢ় করে।

    5. জীবনানন্দ যে "কড়ার" এর কথা বলেছেন তার উৎস আমিও জানি না। এই "কড়ার " এর কথা আত্মজৈবনিক উপন্যাসের অংশে আমিও দেখিয়েছি।তবে সাধারণত চিঠি লেখার সময় কেউ উৎস জানাতে ততটা আগ্রহী হন না। চেপে ধরলে বলতে পারেন।

    6."কিন্তু এই হলেও হতে পারে ঘটনাটি সত্যি বা মিথ্যে যাই হোক কিছুই এসে যায়না।" আপনার এই বক্তব্যের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করি। কারণ, পাল্টা সন্দেহের অবকাশ তোলার জন্য কোনো একটি রেফারেন্স আমি দিই নি। আবার বলছি সন্দেহের অবকাশ থাকা আর " কনসপিরেসি থিওরি" দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। সন্দেহ, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানের অন্তর্গত এক স্বাভাবিক এলিমেন্ট যা সহজে উপসংহারে আসতে দেয় না। আরো গভীরে যেতে প্ররোচিত করে।

    7. সিটি কলেজের ঘটনা আমি অস্বীকার একবারও করিনি। সেটাই হয়ত অবজেক্টিভ কারণ। কিন্তু যে কজন বাদ পড়েন, যে দলে জীবনানন্দ ছিলেন, তার সাবজেক্টিভ কারণ কি ছিল? এলেবেলের দেওয়া আগের রেফারেন্স থেকে জানতে পারছি, যে ক'জন ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতি শীল ছিলেন, তাঁরা বাদ পড়েন। তাহলে যে কেউ বাদ পড়তে পারত, অতএব জীবনানন্দ তার দলে থাকলেন, সবই তো অর্থনৈতিক, বলাটা যথেষ্ট নয়। আমিও উপন্যাস কোট করে দেখিয়েছি যে জীবনানন্দও লিখছেন, আরো কেউ কেউ বাদ যায়। সবার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কারণ কি দর্শিয়েছিল, এটা কতটা ন্যায়সঙ্গত ছিল, এগুলি জানতে চাওয়া কি ' কনসপিরেসি থিওরি'র অবতারণা নাকি সত্য ও ন্যায় বিচারের অন্বেষণ? যাদের ভোগান্তি হয়েছে, যারা চাকরি হারালেন, তাদের হয়েও তো জীবনানন্দ কলম ধরলেন কিছুটা। শুধু নিজের কথাই বললে ব্যাপারটা বরং একপেশে হত।

    8. অন্যরা যদি বেশ কিছু রেফারেন্স তাঁদের পয়েন্ট জোরালো করে দেন, আমিও বেশ কিছু রেফারেন্স দিয়েছি। চাইলে প্রতিটি রেফারেন্স আমি স্ক্যান করেও দিতে পারি। এবং, আমার দেওয়ার মত আরো অংশ এখনো আছে, তা অপ্রাসঙ্গিক নয়।

    9. আপনি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্র নৈতিক যে কারণগুলো দেখাচ্ছেন সেগুলি অবজেক্টিভ, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। ব্রিটিশ রা ভারতে থাকার সময় অর্থনৈতিক শোষণ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন করত এ কারুর অজানা নয়। তাই বলে ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম বা অজস্র ফাঁসির মঞ্চে যাওয়া মানুষের কাহিনী তো নিরর্থক হয়না। আপনি আপনার পয়েন্টে মান্টোর কথা বলেছেন। কবিতা ও কবির ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। লেখকের জেনারেল সেটের সাবসেটে কবি ও কার্টুনিস্ট কে ফেলছেন। তাহলে তো নেহরু, গান্ধী, ভগৎ সিং, সুভাষ বোস, সাভারকর সকলকে এক ব্র্যাকেটে ফেলতে হয়। সব কারণ ই তো অবজেক্টিভ ব্রিটিশ নিপীড়নের ফল।

    10. আপনার শেষ প্রশ্নের উত্তরে বলি 1, 2, 3 কে আপনি এক ব্রাকেটে ফেলে দেখলেও আমার পয়েন্ট অন্য।সাধারণ গদ্য।লেখকের তুলনায় কবিদের ভালনারেবিলিটি বেশি। এই পয়েন্টে অনেক কথা বলা যায়। জীবনানন্দ, মলয় রায় চৌধুরী, উৎপল বসু থেকে আজকের শ্রীজাত, এঁরা একজন গদ্যকারের চেয়ে বেশি ভালনারেবল । কারণ, একটি গদ্যের কন্টেক্সট-এ লেখককে কাঠগড়ায় তোলা অনেক বেশি কঠিন। ডি এল রায় রবীন্দ্রনাথকে 'সোনার তরী' লেখার জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন। এখানে বলি, 'গোরা' লেখার জন্য অভিযোগ তোলা বেশি কঠিন। কারণ গদ্যে টেক্সটের কন্টেক্সট নিরূপণ তুলনামূলক সোজা। একইভাবে 'ক্যাম্পে' ও সজনীকান্তের অভিযোগ। কবিতায় টেক্সটের কন্টেক্সট সুবিধামত ইন্টারপ্প্রিট করে জীবনানন্দকে অভিযুক্ত করেছেন। মলয়ের 'অদৃশ্য বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতা থেকেও মলয়কে শুনেছি পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া হয়। এই কারণ নিছক রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বলে উড়িয়ে দিলে, আবার বলছি, সাবজেক্টিভ কারণ টি অবহেলা করা হয়। একই ভাবে শ্রীজাতে র কবিতায় অকস্মাৎ ত্রিশূল ও কন্ডোম পেয়ে তাকে অভিযুক্ত করা চলে।

    কবিরা এভাবে, অনেক বেশি ভালনারেবল। তাঁদের কন্টেক্সট না বুঝে দ্রুত একটি কবিতায় কিছু শব্দ তুলে এনে অশ্লীল, বিপজজনক, ও অন্যান্য অভিযোগে অভিযুক্ত করা সোজা।

    কবিদের ভুল বোঝা, সঙ্কেত, শব্দ ও মেটাফর কে নিজের সুবিধার্থে দ্রুত ব্যবহার করার সাবজেক্টিভ কারণ টি বললাম। আপনি তো কবিতার চর্চা করেন। আপনি মানবেন না একথা?

    সৈকত, আপনার বক্তব্যের সঙ্গে আমি আংশিক কেন, অনেকটাই সহমত, কিন্তু সে বিষয়ে আলাদা আর্টিকল লিখতে হয়। অন্য অনেক রেফারেন্স আসবে। আত্মজৈবনিক উপন্যাস প্রসঙ্গে। আপনি নিশ্চয় আমার পয়েন্টটুকু বুঝেছেন, মণীন্দ্র গুপ্তও একটা সাবধানবাণী দিয়ে(আপনি যে স্বরাট অস্তিত্বের কথা বলেছেন)তারপরে হেম ও জীবনানন্দ প্রসঙ্গ এনেছেন। আমিও শ্রীগুপ্তের মেথড ফলো করেছি মাত্র। শৈল ও জীবনানন্দ।
  • কুশান | 342323.176.1267.208 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৪:৪৮79607
  • রবাহুত, কল্কে কে দেয়নি আপনাকে? এমন কথা বলতে আছে?

    বেশ লাগল। সিরিজের লিংক পাওয়া যাবে?

    Tim আপনাকে কিছু কথা বলার ছিল। সময় পেলে বলব।
  • Tim | 89900.253.8956.205 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৪:৫৬79600
  • ভালনারেবল সবাই। গদ্য লেখকের ভালনারেবলিটি কি কম? বরং আমি যদি বলি কনটেক্সট নিয়ে ধাঁধা না থাকার জন্য তাঁদের অভিযুক্ত করা সহজ? কবিরা তো অন্তত বলতে পারেন যে অন্তর্নিহিত অন্য অর্থ ছিলো, গদ্যকারের সে সুযোগ নাও থাকতে পারে। এবং গদ্যকারেরা চাপ খান নি তাও নয়। নিজস্ব বক্তব্য থাকলে, এবং সম সময়ের থেকে এগিয়ে থাকলে অনেকসময় এইরকম চাপ আসে। কবিরাও অন্যদের মতই রক্তমাংসের মানুষ, তাঁদেরও ভালনারেবিলিটি অবশ্যই আছে, তবে বক্তব্যের ইন্টারপ্রিটেশন সংক্রান্ত জায়গায় তাদের আলাদা করে কোন ভালনারেবিলিটি দেখিনা। (অন্য একটি ক্ষেত্রে আছে, যার সাথে এই প্রবন্ধ এবং সন্নিহিত আলোচনার কোন সম্পর্ক নেই, তাই সেকথা এখানে বলছিনা)।

    এবার ১,২,৩ নিয়ে। তিনজন কবি তিনটি আলাদা সময়ে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখলেন। রাষ্ট্র তাঁদের প্রসিকিউট করতে চাইলো। এত মিল সত্ত্বেও তাঁদের এক ব্র্যাকেটে রাখা নিয়ে আপত্তি কিসের? আর এক ব্র্যাকেটে রাখলে তাঁদের ওপর হওয়া অবিচারগুলো লঘু হয়ে যায় বলে আপনি মনে করেন?

    পরিশেষে রাষ্ট্রীয় নীপিড়ন খুব সিরিয়াস ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় নীপিড়ন বলে কোন জিনিসকে "উড়িয়ে" দেওয়া যায়না।
  • Tim | 89900.253.8956.205 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৫:১৪79601
  • "৯। আপনি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্র নৈতিক যে কারণগুলো দেখাচ্ছেন সেগুলি অবজেক্টিভ, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। ব্রিটিশ রা ভারতে থাকার সময় অর্থনৈতিক শোষণ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন করত এ কারুর অজানা নয়। তাই বলে ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম বা অজস্র ফাঁসির মঞ্চে যাওয়া মানুষের কাহিনী তো নিরর্থক হয়না। আপনি আপনার পয়েন্টে মান্টোর কথা বলেছেন। কবিতা ও কবির ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। লেখকের জেনারেল সেটের সাবসেটে কবি ও কার্টুনিস্ট কে ফেলছেন। তাহলে তো নেহরু, গান্ধী, ভগৎ সিং, সুভাষ বোস, সাভারকর সকলকে এক ব্র্যাকেটে ফেলতে হয়। সব কারণ ই তো অবজেক্টিভ ব্রিটিশ নিপীড়নের ফল।"

    আমি একবারও বলিনি যে কবিদের ওপর রাষ্ট্রীয় নীপিড়নের কাহিনী "নিরর্থক"। তা ইতিহাসের অংশ। সে বিষয় নিয়ে গবেষণা হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মূলগতভাবে কবির ওপর রাষ্ট্রের নীপিড়ন আর ঔপন্যাসিকের ওপর রাষ্ট্রের নীপিড়ন আলাদা নয়। রাষ্ট্রের নীপিড়ন ফর্মের ওপর কতটা নির্ভর করে সন্দেহ, সম্ভবত রাষ্ট্র কতটা সমস্যায় পড়েছে তার ওপর নীপিড়নের তীব্রতা নির্ভর করে।
  • কুশান | 342323.176.8956.16 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৫:৫৮79602
  • @Tim
    "ভালনারেবল সবাই। গদ্য লেখকের ভালনারেবলিটি কি কম? বরং আমি যদি বলি কনটেক্সট নিয়ে ধাঁধা না থাকার জন্য তাঁদের অভিযুক্ত করা সহজ? কবিরা তো অন্তত বলতে পারেন যে অন্তর্নিহিত অন্য অর্থ ছিলো, গদ্যকারের সে সুযোগ নাও থাকতে পারে। এবং গদ্যকারেরা চাপ খান নি তাও নয়। নিজস্ব বক্তব্য থাকলে, এবং সম সময়ের থেকে এগিয়ে থাকলে অনেকসময় এইরকম চাপ আসে।" 

    আমি ভিন্ন মত পোষণ করি। ভালনারেবল সবাই, কিন্তু একমাত্রায় নয়। সমস্ত কবিও একমাত্রায় ভালনারেবল নয়। আমি আগে ও পরে দেখানোর চেষ্টা করেছি যে জীবনানন্দ সমসময়ে 'মোস্ট ডেঞ্জারাস মিসাইল'। ভাবনায়, চিন্তায় সমসময়ের তুলনায় এগিয়ে থাকা লোক রাষ্ট্রের চোখে বেশি ভালনারেবল হয়। বাংলার কন্টেক্সটে আমি অনেকগুলি কবিতা ও কবির উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি যে তারা কেন আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। কৃত্তিবাসের সমকালীন কবির মধ্যেও মলয় সহ মলয়ের সঙ্গীরা, হাংরির কবিরা সমকালীন ভাবনায় আঘাত হেনেছিলেন বলেই তারা ' সমাজের চোখে' বেশি ভালনারেবল।

    "কবিরা তো অন্তত বলতে পারেন যে অন্তর্নিহিত অন্য অর্থ ছিলো, গদ্যকারের সে সুযোগ নাও থাকতে পারে।"

    আপনার কথা মেনে নিয়েই বলি। আমার বক্তব্য গদ্যকারের সুযোগ বেশি। কারণ তাঁকে ডিফেন্ড করা সোজা। তাঁর সেল্ফ ডিফেন্স এর সুযোগ বেশি। তাঁর পক্ষে ওকালতি করাও সহজ, কারণ তাঁর টেক্সট তুলনায় বেশি বোধগম্য। কবির ক্ষেত্রে এটা মুশকিল। এর জন্য মেধা লাগে। ক্যাম্পের জন্য জীবনানন্দকে নিজের কবিতা ইন্টারপ্রিট করতে হয়েছিল। তাতেও অবশ্য অপবাদ ঘোচেনি। স্টিগমা লেগেই ছিল আজীবন।

    "এত মিল সত্ত্বেও তাঁদের এক ব্র্যাকেটে রাখা নিয়ে আপত্তি কিসের? আর এক ব্র্যাকেটে রাখলে তাঁদের ওপর হওয়া অবিচারগুলো লঘু হয়ে যায় বলে আপনি মনে করেন?"

    না, আপত্তি খুব একটা জোরালো নয়। আপনার সঙ্গে প্রায় সহমত। লিখতে লিখতেই ওটা টানা এসে গেছে। এতে বেশি গুরুত্ব দেবেন না।

    "পরিশেষে রাষ্ট্রীয় নীপিড়ন খুব সিরিয়াস ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় নীপিড়ন বলে কোন জিনিসকে "উড়িয়ে" দেওয়া যায়না।"

    আমার কোন বক্তব্য থেকে আপনার মনে হল আমি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন উড়িয়ে দিয়েছি বা এটা লঘু ব্যাপার? আপনি এটাতে বেশি জোর দিচ্ছেন, সাবজেকটিভ কারণকে প্রায় উপেক্ষা করছেন, আমি ভালনারেবিলিটির প্রশ্নে সাবজেক্টিভ অংশকে গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতিহাস দেখতে হলে রাষ্ট্র ও ব্যক্তি, দুটোকেই দেখা হোক, আমার এটাই বক্তব্য।
  • Tim | 89900.253.8956.205 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৬:১৯79603
  • কুশান, মনে হচ্ছে ভালনারেবিলিটির কথায় যে দ্বিমত তা আসলে দ্বিমত নয়, কারণ দেখুন নীপিড়নের প্রশ্নে আমি লিখেইছি যে যার থেকে রাষ্ট্র বেশি সমস্যা আশংকা করে, তার প্রতি নীপিড়ন তত তীব্র।

    এবার সাবজেক্টিভিটির প্রশ্নে বলি, হ্যাঁ প্রত্যেকটি মানুষ, তাঁদের ভাবনা নিয়ে আলাদা। কেস বাই কেস তাঁদের ভালনারেইবিলিটিও আলাদাই সেই অর্থে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মিলও আছে।

    আরেকটা কথা যেটা আগের পোস্টে বলিনি ইচ্ছে করেই, তাহলো কবিতা লেখার একটা অতিরিক্ত সমস্যা আছে বলে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে। এর আগে সেই বিষয়ে কথা হয়নি বলে।

    আপনি পাঠকের "মেধা"র উল্লেখ করেছেন। এই প্রসঙ্গে ঃ কবিতা লেখার একটা বড়ো সমস্যা, তাতে নিজের আবেগ নিয়ে পরীক্ষা করতে হয়, তাতে ফাঁকি রাখা চলেনা। ব্যক্তিগত ক্ষতস্থান লুকিয়ে প্রলেপ দিয়ে ঢেকেঢুকে রেখে ভালো কবিতা লেখা যায় কিনা সন্দেহ। যেহেতু ভালো কবিতা আরো অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে তাই অনেক সময়েই এতে শ্যাম-কুল দুইই যায়। আরামের ব্যক্তিগত স্পেসও গেল, কী বলতে চাওয়া হয়েছে পাঠকের কাছেও পৌঁছলো না - উপরন্তু হয়ত বা ঠাট্টাই জুটে গেল। এই সমস্যা সম্ভবত কবি ছাড়া আর নন লিনিয়ার গদ্য লেখককেই বইতে হয়। এবং সেই গদ্যকেও আমরা যেহেতু "কবিতার মত" বলি তাই এটি মূলত কবিতার সমস্যা বলে আমার মনে হয়েছে।
  • কুশান | 342323.176.90056.40 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৬:৪২79608
  • সুকি, আপনার পাঠানো লিংকের কবিতাবিষয়ক নিবন্ধে বিজ্ঞান ও কবিতার যোগ এই অংশটি আকর্ষণীয়। এই লিংকটা দেখুন, প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

    https://www.brainpickings.org/2018/05/09/a-brave-and-startling-truth-maya-angelou/
  • কুশান | 561212.187.1256.138 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৭:৫৯79609
  • রবাহুত, আপনার এই কবিতায় জীবনানন্দ ছাড়া, অবধারিত, মনে পড়ল কবীর সুমন।

    সুমনের একটি গানের অংশঃ

    এক পায়ে দাঁড়িয়ে সময়
    বকধার্মিক হয়ে বোঝে
    এইখানে শিকার বোধহয়
    বসে আছে শিকারির খোঁজে।
    **********************************
    তারপরের অংশ কি এরকম?

    সব পাখি নীড়ে ফিরেছে কি ঘরে
    ফুরলো নদীর লেনদেন
    মুখোমুখি বসে কাজ নেই
    বুঝেছেন বনলতা সেন।

    স্মৃতি থেকে বললাম। পুরোটা মনেও নেই।

    অবশ্য বনলতা সেন নয়। আপনার মুনমুন সেন। তবু ছন্দদ্বয়ে বেশ মিল। তবে দুটি মেজাজে এক নয়।
  • কুশান | 342323.176.0167.88 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৮:৩৯79604
  • Tim
    সমূহ কূট তর্ক আপাতত স্থগিত রাখলাম।

    একদম মনের কথা, প্রাণের কথা, উপলব্ধির কথা বলেছেন।

    শেষের অংশটা নিয়ে কত কী বলার আছে।

    কিন্তু, আপাতত সময় নেই। হাতে কিছু জরুরী কাজ।

    ভাল থাকুন।
  • rabaahuta | 342323.226.7889.160 (*) | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ০৯:২২79610
  • হাহা, মানে সিরিজটা ঠিক লেখা হয়ে ওঠেনি সেরকমভাবে, তবে অনুমতি যখন দিলেনই এইটা খুঁজে পেলাম পুরনো ভাটে-

    হেন শুষ্ক দুপুর
    তাতে গ্রীষ্মাবকাশ
    নাই শূণ্যে নয়ন
    আর ধেয়ানে আলোক
    রেখা উৎসবে রত
    ভোগে শেখর সুমন
    এই সব ভাবনারা
    ভাসে পীড়ের প্রকোপে
    মাধুরির ধুকপুক
    আজি পুরাতন বলে
    থাকে আধেক আঁখির
    কোণে শ্রীমতি লিওন।

    আর হচ্ছেই যখন তো এটাও থাক, এখানেও একটু সেলিব্রিটি আছে দ্বিতীয় পাতায়

    http://www.guruchandali.com/amaderkatha/guruchandali.Controller?portletId=8&porletPage=2&contentType=content&uri=content1285356776580&contentPageNum=1
  • কুশান | 342323.176.2367.88 (*) | ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ ০৪:৫৭79611
  • অপূর্ব। তুলে রাখলাম। ভাবছি শেয়ার করব লিংকটা বন্ধুদের।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন