• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • তোমার পূজার ছলে

    কুশান গুপ্ত
    বিভাগ : ব্লগ | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩৮ বার পঠিত
  • বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না প্রাণভরে বেশ খারাপ খারাপ কথা উচ্চারণ করতে মন চায়? আপনি কি কিশোর বয়সে, তরুণ বয়সে একটিও খারাপ উচ্চারণ-অযোগ্য অসাংবিধানিক অমার্জিত শব্দ বলেন নি? ঠাট্টাছলেও বলেন নি? বেশ, যদি একদমই না বলে থাকেন তাহলে তো আপনি প্রায় বোধি গাছের তলায় বসে আছেন, চরাচর আপনার সামনে আপাতত নতজানু। সুজাতা পায়েসের বাটি নিয়ে এলেন বলে। অতঃপর ভুবন ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ুন।সুললিত বাণী প্রচার করুন, একদিন দেখবেন আপনার মুকুটেই উঠবে বিশ্ববিশ্রুত কাঁটা। তারপর আপনার ঠোঁট উচ্চারণ করুক: তারা বলে গেল ক্ষমা করো সবে, বলে গেল ভালোবাসো/ অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো।

    এই যে রবীন্দ্রনাথ থেকে বললাম, কেননা বলতেই হয়, না বললে জাত যায়, আমার মধ্যে বাঙালি জিন আছে কি নেই সেই অকাট্য প্রশ্ন এসে যায়। অবধারিত। একবার স্কুলে রবীন্দ্র জয়ন্তী হচ্ছে, ফি বছরের মতো, অষ্টম শ্রেণীর সুকমল দে দালাল, সবে 'সবারে করি আহ্বান' ধরেছে, চোখ দুটি আকাশ-উন্মুখ, আপ্রাণ রবীন্দ্রনাথে নিবেদিত, শীতলবাবু মাথা নেড়ে বললেন, স্কেল ভুল হলো। সঙ্গে সঙ্গে মাতব্বরেরা মাথা নাড়তে শুরু করলেন, যার অর্থ-- হয় নি হয় নি। এক্কেবারে ডাহা ফেল। একটি ক্লাস এইটের ছেলে গান গাইছে, স্কেল ভুল কী ঠিক নিজেও জানেনা, বেচারা গানের শেষে অপরাধীর মতো মুখ করে বসে থাকল। গানের শিক্ষক মৃগাঙ্কবাবু বললেন, রবীন্দ্রনাথের গান, রবীন্দ্র জয়ন্তীতে এইভাবে ভুল গাইলে? চরমতম অপমান। কেননা রবীন্দ্র-অপমান অর্থ স্কুলের অপমান, বাঙালির অপমান, জাতির অপমান। হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছো অপমান, অপমানে হতে হবে...এই দেখুন লিখতে লিখতে কেমন রবীন্দ্রনাথ এসে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের রক্ত ও মজ্জায়, আত্মায়, মস্তিষ্কে, প্রতিটি নিউরন, হিমোগ্লোবিন থেকে শুরু করে ইওসিনোফিলে ও গলগি বডিতে এইভাবে অবধারিত। বিষয়টা হলো, নজরুল গীতি, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল, পান্নালাল, জগন্ময়, সলিল, হেমন্ত, আরডি বর্মন তথা কুমার শানু ভুলভাবে গেয়ে পার পাওয়া যেতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, হিমাংশু দত্ত রবিবাবুর কিয়দংশে সমকালীন, কিন্তু ' তোমারি পথপানে চাহি' ভুল সুরে কী ঠিক সুরে গাইলেন কেউ কিছু মনে করা তো দূর, পাত্তাও দেবে না। আপনি গাইবেন। লোকে হাই তুলবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় পান থেকে চুন খসার জো নেই। সুনীল গাঙ্গুলির লেখায় পড়েছিলাম, একবার ষাটের দশকে একটি অনুষ্ঠানে সুনীল তার কিছু বেয়াড়া বন্ধুবান্ধবসহ রবীন্দ্র-সঙ্গীত গাইছিলেন। হঠাৎ ইঁট বৃষ্টি শুরু হলো। দু একজন গায়ক জখম-টখম হলেন। গান মাথায় উঠল। প্রাণ বাঁচানো দায়। কী ব্যাপার? গায়কেরা কেন শার্ট প্যান্ট পরে রবীন্দ্র সংগীত গাইছেন? রবীন্দ্র-সংগীতের অলিখিত ড্রেস কোড নাকি সাদা ধুতি পাঞ্জাবি। এই দুর্বিনীত নেশাখোর তরুণেরা এসব তোয়াক্কা না করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে, এ তো এক ধরণের স্যাক্রিলেজ ! রবীন্দ্র-প্রেম উদ্বেলিত হয়ে উঠলো, ইঁট পাথর বর্ষণ স্বাভাবিক এক পবিত্র ক্ষোভের সমবেত ও স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। ব্যাপারটা অনেকটা সদর স্ট্রিটের কেস। আজি এ প্রভাতে রবির কর অর্থাৎ ট্যাক্স ধার্য হইল, সুতরাং নির্ঝরের এহেন স্বপ্নভঙ্গ তো অনিবার্য। ওরে উথলি উঠেছে বারি, ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি। জনগণ এই প্রাণের আবেগ সামলাতে পারে নি। তথাপি, তারা কনসিডারেট। হালকা টুকরো ইঁট ছুঁড়েছে রবীন্দ্র স্মরণে। পারলে থান ইঁট ছুঁড়ত এই অরাবীন্দ্রিক বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে।

    আরেকবার, মনে পড়ছে, স্কুলের আরেক রবীন্দ্র জয়ন্তীতে পলাশ নন্দ ফাটিয়ে ' হে মোর চিত্ত পুণ্যতীর্থে' আবৃত্তি করলো। দৃপ্ত দাঁড়ানোর ভঙ্গি। তেমনই জুৎসই গলা ও উচ্চারণ। আবৃত্তির মধ্যেও যথেষ্ট মৌলিকতা ছিলো। আবৃত্তির শেষে প্রবল হাততালি পড়লো। কিন্তু, সকলকে অবাক করে আমাদের হেডস্যার থমথমে মুখে ডায়াস অধিকার করলেন। দ্রুত মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে কঠিন ও কঠোর মুখ করে বললেন, 'এটা তোমরা কী করলে?'

    সমবেত ছাত্রবৃন্দ হতবাক। কী রে বাবা ! কেউ তো কিছু করেনি। সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। আবার প্রধান শিক্ষকের রাগী কন্ঠস্বর, ' ছাত্ররা, তোমাদেরই বলছি, এটা ঠিক করোনি' অতঃপর, গলা খাঁকারি দিয়ে, 'তোমরা কি জানো, কবি হাততালি একদম পছন্দ করতেন না? রবীন্দ্রনাথকে জানো, বোঝো।'

    এরপরে অ্যাসবেস্টস শেডের নীচে নেমে এসেছিল এক অনির্বচনীয় রাবীন্দ্রিক নীরবতা।
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩৮ বার পঠিত
আরও পড়ুন
বলি! - Tridibesh Das
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • | 237812.68.674512.43 (*) | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৪:৫৯50950
  • | 237812.68.674512.43 (*) | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৪:৫৯50951
  • র২হ | 237812.68.454512.210 (*) | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৬:৪৩50952
  • আগরতলায় ঐ কারনে নানা জায়গায় হাততালি নিষিদ্ধ ছিল। আমাদের স্কুল সহ আরো কিছু স্কুলে, রবীন্দ্রভবনে।

    এখন যখন দেখি চারদিকে উৎকট কুনাট্য রঙ্গ, হিন্দি মেশানো বাংলা, মোড়ের মাথায় গনেশ পুজো, ধনতেরাসের ভিড়, মনে হয় ভালোই ছিল। মুগ্ধ জননী মানুষ করেনি, একজন গার্জেন দরকার।

    অবশ্য রোদ্দুর রায়ের বিরুদ্ধে যারা মিছিল করে তারা নিতান্ত আজব এবং অন্ধ। ব্যক্তিগত মত আরকি। প্রাণে গান নাই।
  • রঞ্জন | 236712.158.895612.176 (*) | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৬:৪৯50953
  • হাত্তালির বদলে সাধু সাধু বলার প্রচলন ছিল ? এমনটা শুনেছিলাম।
  • Rouhin Banerjee | 236712.158.786712.147 (*) | ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৭:০৭50954
  • সাধু সাধু টা শান্তিনিকেতনে। আগরতলায় ছিল কি না জানিনা।

    আর রোদ্দুর রায় সেদিন বলেছেন ফেক থেকে নিজেকে খিস্তি দিয়ে একটা থ্রেড নামাবেন
  • শঙ্খ | 237812.68.45900.87 (*) | ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৪:৪৪50955
  • উফ গিজগিজ করছে বলে করছে! এই নিয়ে সামান্য খিল্লি করে ভার্চুয়াল বন্ধুবিচ্ছেদ অবধি হয়ে গেল! আরো কিছু লেখা যায়, হাত নিশপিশ করে, কিন্তু তাহলে আরো কিছু রবীন্দ্র মাফিয়া খেপচুরিয়াস হয়ে যাবেন।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • গুরুর মোবাইল অ্যাপ চান? খুব সহজ, অ্যাপ ডাউনলোড/ইনস্টল কিস্যু করার দরকার নেই । ফোনের ব্রাউজারে সাইট খুলুন, Add to Home Screen করুন, ইন্সট্রাকশন ফলো করুন, অ্যাপ-এর আইকন তৈরী হবে । খেয়াল রাখবেন, গুরুর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে গুরুতে লগইন করা বাঞ্ছনীয়।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত