• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ..... যেন হেঁটে যেতে পারি...

    শিবাংশু লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ | ৩৪৬ বার পঠিত
  • ".... আমি তো সুড়ঙ্গের পথ বেয়ে
    কুবেরের চূড়োয় সিঁদ কাটতে চাইনি
    কেবল ঘাস ফুলের শিশিরে জাজিমে
    এক চিলতে আকাশের বুক ছুঁতে চেয়েছিলাম..."

    বাবা'র কথা কীভাবে লিখতে হয়? নাহ, সে মডেল তো এদেশে অনেক আছে। কিন্তু সে সব কথা তো সবার আলাদা। তাঁরা কেমন হ'ন? ঠাকুরদাস, মহর্ষি, রাজনারায়ণ দত্ত, বিশ্বনাথ দত্ত, উপেন্দ্রকিশোর, তাঁরা তো সব বিখ্যাত মানুষ। নয়তো একজন হরিহর বাঁড়ুজ্যে বা সেই একজন বাবা, যিনি ছেলের কাঁধ ছুঁয়ে বলেন, দেখিস, আমরাও একদিন....

    ছেলে'দের বাবা আর মেয়ে'দের বাবা কি কখনও এক রকম হন ? বোধ হয় সেটা হওয়া যায়না। মেয়ে'রা বাবা'র কথা যতোটা স্বতোৎসার লিখতে পারে, ছেলেরাও পারে কি? জানিনা....
    -----------------------------------

    ",.... হেমন্তের ঘাসে ঘাসে শিশিরের শব্দ মৃত হলে
    ফেরারি পাখির ডানা স্মৃতিস্পন্দে ভারী হয়ে আসে
    নাভিপদ্মে পুণ্যতোয়া সৃষ্টির সৌরভে
    স্মৃতি নামে কোনো নারী মুখ ঢাকে উদ্বেল আশ্লেষে..."

    আমার বাবা ছিলেন একজন অতি সুদর্শন ভদ্র বাঙালি। প্রায় ফুট ছয়েক দীর্ঘ, নয়নাভিরাম তাঁর উপস্থিতির আবহ। অনেক সম্পদ ছিলো তাঁর, বিমূর্ত। কিন্তু ধনপতি কুবের কখনও তাঁকে কেয়ার করেননি। মধ্যস্তরের বাঙালি যেমন টানাটানি করে নৈমিত্তিক হাল সামলায়, সেরকম একজন। অবশ্য বাবা'কে কবে আর হাল সামলাতে হয়েছে? তার জন্য তো একজন অতন্দ্র সঙ্গিনী তাঁর জুটে গিয়েছিলো। বেঁচে থাকার মলিন কাদাজলের ছিটে থেকে বাবা'কে সতত আড়াল করে রেখেছিলো তাঁর ছড়িয়ে রাখা আঁচল, পুরো সাঁইত্রিশ বছর। তিনি কিন্তু শেষ পর্যন্ত কথা রাখেননি। একাকী চলে গেলেন, অসময়ে। সকল লোকের মাঝে বসে, মানুষ কীভাবে একা, আলাদা হয়ে যায়, বাবা'কে দেখেছি শেষ তিন বছর। সেই বাবা, সবসময় যাঁকে আমার মনে হতো তিনি মাটির পৃথিবীতে থাকেন না। লেখালেখি, বইপত্র, অধ্যয়ন-অধ্যাপনার কোনও এক নৈর্ব্যক্তিক জগতে সতত অন্যমন হয়ে বিচরণ করে যাচ্ছেন। তিনি মাটিতে নেমে এলেন, কিন্তু কোন মাটি? যে মাটিতে মিশে যাবার জন্য আমাদের ইহজগতের এই সব প্রস্তুতিপার্বণ?
    ------------------

    ".....যেখানে সিংহাসনে উড়ন্ত সম্রাট
    পায়ের তলায় পৃথিবীকে দেখেও দেখেনা
    সে আকাশে ছাড়পত্রের আবেদন করিনি

    আমি বৃক্ষের নীচেই ভালো আছি...."

    শুনেছি, বাবা'র যেদিন বিয়ে হয়েছিলো, সেদিন তিনি ছিলেন একেবারে বেকার। বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারের মেজোছেলে। বিয়ের দিন কোনও এক রাখিপূর্ণিমার সন্ধেবেলা, তিনি কী ভাবছিলেন, জানতে ইচ্ছে করে। জীবনের এই নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করার মূহুর্তে তাঁর কোনও নিজস্ব রোজগার নেই। ১৯৫৫ সালের পক্ষেও এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিলো তাঁর আগামী দিনগুলি। জামশেদপুরের লোক হয়েও ইঞ্জিনিয়র না হবার জন্য তাঁর যুদ্ধ। পিতামহ নিজে সেকালের পাস দেওয়া ইঞ্জিনিয়র। চেয়েছিলেন তাঁর এই ধীমান পুত্রটি পিতার পেশা নিক। বাবা আইএসসি পড়লেন, কিন্তু দাস ফার, নো ফার্দার। কারিগরি বৃত্তিতে তাঁর অনীহা। বেলুড় ছেড়ে সেন্ট পলস। অধ্যাপক নিশীথরঞ্জন রায়ের প্রিয় ছাত্র। পড়াশোনা তো সে এক রকম। যতোরকম সাহিত্যসংস্কৃতি জাতীয় কাজকারবার হতে পারে, সবেতেই ফুলটাইম। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে যতো অনুষ্ঠান, কম্পিটিশন, খালি হাতে ফেরা নয়। সেই সময়ে তাঁর পুরস্কারে পাওয়া রাশিরাশি বইগুলি বাড়িতে দেখেছি, ছোটোবেলা থেকে। কিন্তু লক্ষ্মী আর সরস্বতীর রেশারেশি, সেখানেই তো ক্যাচ।
    ----------------------------------
    "..... কোনো নিষ্ঠুরতার বদলে আমার জয় আমি চাইনি
    কাচঘরের কানা গলিতে শংখচূড়ের বন্দীবাস নয়
    কঠিন জ্যোতিষ্কের কাছে মুঠির উত্তাপ চেয়েছিলাম..."

    তাঁর চিরকাল স্বপ্ন। পেশা বলতে শিক্ষকতা। জামশেদপুর থেকে বাংলাসাহিত্যের প্রথম পি-এইচ-ডি, সেই কোনকালে। নেশা কবিতা। আনুগত্য বলতে শুধু একজন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এমন মানুষ আর কোথা থেকে লক্ষ্মীর প্রসাদ পাবেন? প্রথমে পড়াতেন ইশকুলে। তার পর কলেজে। ছাত্রদের অপার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। কিন্তু অন্নচিন্তা চমৎকারা।তার চেয়েও বেশি তিনি ছিলেন একজন আদ্যন্ত শিক্ষক, শিক্ষাজীবী একেবারে ন'ন। শিক্ষাবেচার পেশায় নিযুক্ত বিষয়ী লোকেদের পাটিগণিতটি কখনও বুঝতে পারেননি। এভাবে কি টেকা যায়? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর চাকরি পেয়ে একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর স্বপ্নের বৃত্তি। কিছুদিন পড়ালেনও। কিন্তু টিকে থাকার অঙ্কটি কোনওদিন শিখলেন না। চিরকাল কাজ করে গেলেন টাটার একটি সংস্থায়। তা বলে পড়ানোর নেশায় কোনও দিন ছেদ পড়েনি। অগণিত ছাত্রছাত্রী চারদিকে। বাংলা ও বাঙালিয়ানা, প্রবাসে বাঙালির যাবতীয় যাপনে তিনি আমন্ত্রিত, আদৃত, আশ্বস্ত।
    ------------------------------------------------------

    ".... তবুও সপ্তরথী দুর্মর পাহারা
    মুক্তির ঘ্রাণ আসে পাছে

    অভিমন্যু ফিরে এসো এখনো সময়
    অভিমানী আত্মার কাছে...."

    আমাদের লোহার শহরে এক সময় 'কবি' বলতে বাঙালিরা বাবা'কেই চিনতো। সে হয়তো আমার অতি শৈশবে অথবা বাল্যে, কিম্বা আরো পরে। বাবা'র ভ্রাতৃপ্রতিম সেই সব কবিরা, স্বদেশ সেন,বারীন ঘোষাল, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের কাছে তো সেরকমই শুনেছি। বেশ কিছুদিন আগে, আমি তখন হায়দরাবাদে, বন্ধুবর অলক ( প্রাবন্ধিক অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী) আমাকে ডাকে একটি পত্রিকা পাঠালো। উত্তরবঙ্গ থেকে প্রকাশিত, যেখানে বারীন'দার স্মৃতিচারণ রয়েছে। সেখানে দেখি তিনি লিখছেন এসব কথা।আমি সেসব দিন দেখিনি, তাঁরা দেখেছেন। আরো অনেকের কাছে শোনা ও নিজে দেখা জামশেদপুরের বাংলা সারস্বতসাধনার সঙ্গে তিনি কী পর্যায়ে বিজড়িত ছিলেন। চলন্তিকা থেকে রবীন্দ্র সংসদ, কৌরব থেকে কালিমাটি ( কাজল তাঁর স্নেহধন্য ছাত্র), টেগোর সোসাইটি থেকে তুলসিভবন, কোথায় তিনি নেই?
    ---------------------------------------------------

    "..... আমাদের মন্ত্রবীজ অবিরাম কাজ করে
    মাটির গভীরে
    একদিন রাত ভেঙে সূর্য হবে বলে....."

    জামশেদপুরে তাঁর সুহৃদসতীর্থরা মিলে তৈরি করেছিলেন বাংলার মূলস্রোত থেকে একটু দূরে আরেকটি বাংলা উপনিবেশ।একাধিক প্রজন্মের শিকড়ে চারিয়ে গিয়েছিলো সেই রস। আমার বিবাহের কিছুদিন পর আমার নববিবাহিতা স্ত্রী একটি গল্প বললেন। তিনি গিয়েছিলেন রাজেন্দ্রনগরে, তাঁর মামাবাড়ি। সেখানে দেখা করতে আসেন ঘনিষ্ট পরিচিত তাঁর কিছু আত্মীয়ারা। তাঁদের বিনিময়টি ছিলো এরকম,
    -তুই তো সত্যেন'দাকে রোজ দেখিস, তোর কী রকম লাগে?
    -কেমন আর লাগবে, বাবার মতন...
    -না তুই রোজ ওঁর সাথে কথা বলিস, কাছে কাছে থাকিস, তোর কী ভাগ্য...
    -বাহ, এতে ভাগ্যের কী আছে?
    -এখন বুঝবি না, পরে বুঝবি, ধীরে ধীরে। ওঁর সঙ্গে থাকলে কতো কী পাওয়া যায়...
    একুশ বছরের সদ্যোবিবাহিতা কন্যাটি তখনও বোঝেননি এই অনুভূতির মর্ম। আমিই কী আর বুঝে ছিলুম? 'অনাত্মীয়'রা যেভাবে বুঝতে পারতেন, তাঁকে।
    ------------------------------------------
    ".... যতোবার বৃত্ত ভেঙে সূর্যগন্ধা আকাশের মুখ
    দুহাতে ছুঁয়েছি
    পায়ে পায়ে বিস্ফোরণ
    রক্তগঙ্গা ঝড়..."

    মায়ের চলে যাবার পর হয়তো বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিলো তাঁর। সঙ্গ চাইতেন শুধু চারজন শিশু নাতনির। এই পাঁচজন নিজেদের একটা নিজস্ব বৃত্তের মধ্যে বেঁধে রেখে দিয়েছিলো। এর মধ্যে চাকরিতে আমার একটি বদলি'র আদেশ এলো, দূরে। তাঁকে বিচলিত হতে দেখলুম। এই শহর, এই অগণিত পরিজন সান্নিধ্য, চারদিকে ছড়িয়ে থাকা চলে যাওয়া সঙ্গিনীর স্মৃতিচিহ্ন। "তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো" বলার মতো আত্মবিশ্বাস তখন তাঁর আর ছিলোনা। চিরকালই 'নেই' হয়ে থাকা তাঁর নিজের সংসারে। তাঁর জন্য যেন কারো কখনও কোনও 'অসুবিধে' না হয়, সেটাই তাঁর একমাত্র সচেতন উদ্যম। একদিন ভোররাতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বুঝলুম হৃদযন্ত্র আর টানতে চাইছে না। সে যাত্রা হাসপাতাল থেকে ফিরে এলেন। কিন্তু শরীরের সাইরেন নীরবে বেজেই যাচ্ছিলো বোধ হয়। আমাকে যেতে হলো শহরান্তরে। ভাইয়ের থেকে ফোনে খবর পাই। আর পাই বাবার অনিন্দ্যসুন্দর হাতের লেখায় অন্তর্দেশী পত্র। ঠিক হলো, পুজোর সময় বাড়ি গিয়ে বাবা'কে পাটনায় নিয়ে আসবো। তার পর একবার দিল্লি গিয়ে তাঁর স্বাস্থ্যের বিশদ পরীক্ষা দরকার। জামশেদপুরে চিকিৎসার সুবিধে খুবই সীমাবদ্ধ। চৌঠা সেপ্টেম্বর অফিস থেকে ফিরে তাঁর চিঠি পেলুম। তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েছেন পাটনায় এসে থাকার জন্য। আমার সারা শরীরে যেন একটা স্বস্তির প্রলেপ ছড়িয়ে গেলো। এভাবে বাবার থেকে দূরে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সেদিন আবার আমার ভাইঝির জন্মদিন। বাড়িতে উৎসব উদযাপন চলছে। সন্ধে থেকে পাটনায় অসম্ভব বেগে অঝোর প্রপাতের মতো বৃষ্টি। তখনও আমার পাট্নার বাড়িতে ফোনের কানেকশন লাগেনি। দুই কন্যাসহ ভিজতে ভিজতে আমরা চারজন গেলুম একটি এসটিডি বুথে, বাড়িতে কথা বলার জন্য। বাবা'র সঙ্গে কথা হলো তাঁর নাতনিদের, তাঁর বৌমার সঙ্গে অনেকক্ষণ। কিন্তু আরো কিছু মানুষ অপেক্ষা করছিলেন ফোন বুথে। তাঁদের কথা ভেবে আমি আর সংলাপ প্রলম্বিত করলুম না। আমার সঙ্গে আর কথা হলোনা বাবা'র। কাল নিশ্চিত ফোন করবো।
    ---------------------------------------
    ".... হাতে হাতে ছুঁয়ে থাকো
    বিস্ফোরণ সময় হয়েছে
    তার ঢেউ কেড়ে নেবো রক্তের গভীরে
    তার পর শেষ রাতে ঝোড়ো হাওয়া মিছিলের মুখে
    বর্ণমালার ফাঁদে ফেরারি প্রভুর তাঁবু

    ছাড়পত্র পেয়ে যাবো
    মৃত্যু মহাদেশে..."

    পরদিন ভোরবেলা যে ঘরটিতে বাবা এলে থাকবেন সে ঘরটিতে বসে আমরা প্ল্যান করছি কীভাবে সেটিকে সাজাতে হবে। অবিন্যস্ত থাকা তাঁকে কষ্ট দেয়। উপরতলার প্রতিবেশীর ছেলে এসে জানালো আমার ফোন এসেছে। এ রকম সময়ে ফোন, বাড়ির থেকে? একেবারে অপ্রত্যাশিত। ছুটে উপরে যাই। রিসিভারটি তুলে বলি হ্যালো...
    ওপাশে ভাইয়ের সাড়া পাচ্ছি, কিন্তু সে কোনও কথা বলতে পারছেনা...
    -কী হলো রে? বল...
    বহুদূর প্রতিধ্বনির মতো তার রুদ্ধ স্বর..
    -দাদা, বাবা চলে গেলো...
    -কী বলছিস... তুই...
    ভগ্নীপতি ফোনটা ধরে বলে, আমি শুনতেও পাই,
    -দাদা, বাবা আর নেই, আজ ভোররাতে...ঘুমের মধ্যেই...

    সেদিন শিক্ষকদিবস। বাবার বয়স হয়েছিলো পঁয়ষট্টি, মাত্র। আমি সময়ে বাড়ি পৌঁছোতে পারবোনা প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের কারণে। আর আমার জন্য বাবা'কে যেন বরফ-ট্রে'র অসম্মান সইতে না হয়। এ ছাড়া সেই মূহুর্তে আমার আর কোনও প্রার্থনা নেই।
    ------------------------------------------------
    "....পথে নেমে পায়ে পায়ে পিছুটান ভালো নয়
    সামনে তাকাও মাঠঘাটে তামাটে রোদ্দুর

    আকাশ নেমেছে বেতবনে......"

    বাবা একটি ইচ্ছাপত্র লিখে রেখে গেছেন। তাঁর যেন কোনও পারলৌকিক কৃত্য না করা হয়। মুখাগ্নি যেন না করা হয়। প্রথাটা অসুন্দর। কেউ যেন কোন অশৌচ পালন না করে। কোন লোকাচারভিত্তিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান নৈব নৈব চ। যদি ইচ্ছে হয়, তবে একদিন আত্মজনেরা একটি স্মরণ সভার আয়োজন করবে। সেখানে তাঁর একটি প্রতিকৃতি যেন শুধু রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো হয়। একটি গানের আর একটি কবিতার সূচি। ছেলে, মেয়ে, আত্মীয়, বন্ধু, প্রত্যেকের নামে নামে। স্মরণসভায় শুধু যেন সেগুলিই নিবেদিত হয়।

    তাঁর ইচ্ছা প্রতিপালিত হয়েছিলো। বহু পরিচিত মানুষ তাঁর পুত্রদের নিন্দা করেছিলো যথোচিতভাবে পিতৃদায় পালন না করার জন্য। আমাদের সবার থেকে যেসব গান তিনি শুনতে চেয়েছিলেন, আমরা গেয়েছিলুম। যে কবিতা শুনতে চেয়েছিলেন, তা আবৃত্ত হয়েছিলো। তাঁর স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করা নিজের আর অন্য কবিদের কবিতা বাজছিলো। "যাবার সময় হলো বিহঙ্গের", " দু এক মূহুর্ত শুধু রৌদ্রের সিন্ধুর কোলে", " সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ", " এই যে জানু পেতে বসেছি পশ্চিম, " হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান" , মনে আছে। তাঁর কণ্ঠে আরো বাজছিলো একজন ঘনিষ্টতম সহোদরপ্রতিম কবিবন্ধুর তরুণবয়সে লেখা একটি কবিতা, যেটি আমার মায়েরও খুব প্রিয় ছিলো, " আনিনি মাথায় বয়ে, মা, তোমার সোনার কাঁকই।" কবিতাটি বাজার সময় কবি নিজে দু'হাতে চোখ ঢেকে, মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিলেন শ্রোতাদের মধ্যে। শোকতপ্ত মানুষ একজন, জয়নাল আবেদিনের ব্রাশস্ট্রোক থেকে উঠে আসা ছবি যেন। কবির নাম স্বদেশ সেন।
    -------------------------------

    জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার। আজ শিক্ষকদিবস। তাঁর চলে যাওয়া ঠিক কুড়ি বছর হলো। স্থানীয় সংবাদপত্রে সেদিন যেমন লেখা হয়েছিলো, " মূর্ধণ্য শিক্ষক ডঃ সত্যেন্দ্র দে শিক্ষকদিবস কে অবসর পর হি চল বসেঁ।" তিনি চলে গিয়েছিলেন এমনিই এক বৃষ্টিমুখর দিনে। কী অচেনা কুসুমের গন্ধে, কী গোপন আপন আনন্দে, কোন পথিকের কোন গানে.....কখন কে জানে....

    ".... সব আলো মরে গেলে অন্ধকারে মুখ দ্যাখে
    দলছুট দু একটা তারা
    আর কেউ থাকেনা সেখানে

    সব গান ঝরে গেলে বাতাসে ঘুমিয়ে থাকে
    কিছু ভাঙা সুর, অন্য শব্দ জাগে না সেখানে

    সব মৃত্যু, শোক হেনে থেমে থেমে যায়
    দু একটা স্বর থামেনা কখনও...."

    (ঊদ্ধৃত কবিতাংশগুলি বাবা'র বিভিন্ন কবিতা থেকে নেওয়া)

     

  • বিভাগ : ব্লগ | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ | ৩৪৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • শিবাংশু | 11.39.32.245 (*) | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৮:১০65761
  • kichhu balaar nei . tumi Je onaarai prtichchhabi, chokh bandh kare balate paari
  • Sumit Roy | 77.242.134.14 (*) | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৮:২৯65762
  • শিবাংশু:
    "স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি, ভারমুক্ত সে এখানে নাই।" এই আমাদের ভবিতব্য।
    রচনাটি বুদ্ধিগ্রাহ্য ও মর্মস্পর্শী, তোমার কাছ থেকে আমরা যা পেয়ে থাকি। সাধু! তোমার সঙ্গে আমরাও আমাদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। বসুন্ধরা রত্নগর্ভা, এরকম মানুষদের জন্ম দেবেন বলেই। সুমিতদা
  • Nina | 83.193.157.237 (*) | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৯:৪৭65763
  • কিছু কিছু লেখা সময়কে থামিয়ে দেয়--ভাষা যায় হারিয়ে --সমস্ত অন্তর শুধু এক পরিপূর্ণ ভাললাগায় শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে----মনের ভাব জানাতে থাকে শুধু একরাশ চুপকথা------তাই দিয়ে প্রাণাম ও ভাললাগা যথাযোগ্য স্থানে জানালাম--------
  • শিবাংশু | 127.200.87.247 (*) | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ১১:৩২65764
  • কিছু মানুষ কিছু স্মৃতি যা কখনওই মলিন হয়না।
  • Anita Biswas | 127.200.87.247 (*) | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ১২:০৯65765
  • শিবাজীদার স্মৃতিচারন আমায় কাঁদালো আমার বাবার কথা মনে করে আমাদের বুদ্ধি চিন্তা কেন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে না? এত সুন্দর করে বাবার উদ্দেশে লেখা!!
  • utpal | 212.191.212.178 (*) | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৯:১১65766
  • অতুলনীয়
  • নীতা বিশ্বাস। | 127.242.169.204 (*) | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৩:৫৩65767
  • যে লেখা থেকে এতখানি ভালোবাসা ঝরে পড়ে তাকে কি নামে ডাকি! এর থেকে আরো আন্তরিক সুন্দর করে শ্রদ্ধা জানানো যায় কি! আজ অনেক কথা মনে করালো শিবাংশু'র এই লেখাটি। এই অধম আমিও শ্রদ্ধেয় সত্যেন দা'র স্নেহ পেয়েছি। আমাকে লেখা তাঁর কয়েকটি চিঠি আছে, যেগুলি আমায় ধন্য করেছে। বিশেষ করে অঞ্জলি দি মারা যাবার পর যে চিঠিটি তিনি আমায় লিখেছিলেন, বুঝতে পেরেছলুম, কতখানি নিঃস্বতা ও অসহায়তা তাঁর মনে তখন বিরাজ করছিলো। অসম্ভব ভেঙেপড়া এক মানুষ কে দেখতে পেয়েছিলুম।
    আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। সত্যেনদার আদেশে বেশ কিছু লেখা লিখি সেই সময় আমাকে একটি সাহিত্য সংস্থার জন্যে করতে হয়েছে। উনি আমাকে বিষয় পাঠিয়ে দিতেন। আমি নিজেকে ওজন করে ভীষণ ভয় পেতুম। লেখবার আগে শতবার মুছতুম লেখাটি। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ে কেঁপেছিলুম সেইদিন, যেদিন তিনি ও শ্রদ্ধেয় মাস্টার মশাই প্রভাত রঞ্জন রায় এর সঙ্গে এক মঞ্চে সাহিত্য অনুষ্ঠানে বসেছিলুম। ঘোরের মধ্যে আমি সেদিন স্টেজে কি বলেছি মনে নেই। অনুষ্ঠান শেষে এই দুই শ্রদ্ধেয় জন আমাকে যে সাহস দিয়েছিলেন তা আমি কোনো দিন ভুলবো না। তাঁরা দুজনেই আমাদের ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। কিন্তু এখনও যেকোনো কথায় তাঁদের নামটি উচ্চারণ করি আর স্নেহ নেমে আসে...স্নেহ তো নিম্নগামীই...
    নীতা বিশ্বাস।
  • Ranjan Roy | 192.69.11.236 (*) | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৫:৩৫65768
  • অভিমন্যু ফিরে এসো এখনো সময়
    অভিমানী আত্মার কাছে।।।।"

    --শিবাংশু,
    আমি সবিনয়ে জানতে চাইছি কবি ( ডঃ )সত্যেন্দ্রনাথ দে, ওঁর কবিতার কোন প্রকাশিত সংগ্রহ আপনার কাছে আছে? আমি পড়তে চাই। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখতে চাই।
    ওঁর কবিতার উদ্ধৃত টুকরো ক'টি পড়ে মুগ্ধ বললে কম বলা হবে।
    আপনি ওঁর পুত্র, এটা আমাদের উপরি পাওনা।
  • শিবাংশু | 127.197.237.29 (*) | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৫:৫৮65769
  • @ রঞ্জন,

    পরের বার যখন দেখা হবে... :-)
  • Rit | 213.110.242.21 (*) | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৬:১৮65770
  • ঋদ্ধ হলাম পড়ে।
  • Ranjan Roy | 192.69.11.236 (*) | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৬:৩১65771
  • ঠিক আছে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন