• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান...

    শিবাংশু
    আলোচনা : বিবিধ | ০৯ মার্চ ২০২০ | ৮৫৫ বার পঠিত



  • 'অমিল পয়ার ছন্দে রচিত বসন্তকাল শেষ হয়ে এলো।
    পথের উপর আজ দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম চারিপাশে মাঠ
    কালো কালো ধান গাছে ঢাকা আছে, এই সব সুমুদ্রিত ধানগাছগুলি
    আমার এ জীবনের বসন্তের অভিজ্ঞতা।
    .... আমার ভরসা এই প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে
    স্বভাবত কিছু রস ঝরে যাবে মাঝে মাঝে বসন্তসন্ধ্যায়।' (বিনয়)

    অমিলপয়ার ছন্দে ফাল্গুনের এক বসন্তসন্ধ্যা নেমে আসছিলো আমাদের গ্রামে। বেঙ্গল ক্লাবে সারা রাতের অনুষ্ঠান। বুধাদিত্য বাজাবেন সেদিন। তিনি তখন যুবক এবং অদ্ভুত চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী নবীন প্রতিভা। সন্ধে আটটা নাগাদ অনুষ্ঠানের শুরু। সামনের দিকে সাকচি হাইওয়ের তেলেভাজার দোকানের পাশে বাইকটি লাগিয়ে আমি আর সুগত হলের দিকে এগোচ্ছি। অন্ধকার থেকে গেটের হ্যালোজেন আলোয় আসতেই দেখি সামনে পর্ণা আর একটি মেয়ে। প্রথম গেটে কার্ড দেখাচ্ছে। ঠিক পিছনেই আমরা। ময়ূরপঙ্খি রঙের সিল্ক থেকে মৃদু খসখস শব্দ আর অচেনা কোনও সুরভির অস্পষ্ট ইশারা। চুপ করে দাঁড়িয়েই ছিলুম। মুখ ফেরাতে দেখতে পেলো।
    -আরে আপনি এখানে?
    -হুমম, একই কারণে...
    -সত্যিই, দারুণ...
    -দারুণ? কেন বলুন তো?
    এবার বোধ হয় একটু লজ্জা পায়। উচ্ছ্বাসের জন্য,
    -নাহ, ইয়ে, মনে হয় আজ অনুষ্ঠান খুব ভালো হবে...
    -তা ঠিক...সে রকমই তো আশা..



    সুগত পদ্য লেখে। কিন্তু ক্ল্যাসিকাল গান বোঝেনা। ওর বর্তমান ব্যথা সঙ্গীতপ্রভাকর থার্ড ইয়ার। সে আবার পদ্য পড়েনা। তাই পর্বতই মহম্মদের কাছে যেতে চাইছে। তখন তো ইউ-টিউবের জমানা ছিলোনা। মেহনত লাগতো। বহুবার বলেছি আমার কাছে কোনও মেড-ইজি নেই। অখিল ভারতীয় কার্যক্রম শোন। রাত জেগে। তার পর আসিস। দেখি যদি কিছু হেল্প করতে পারি। তার অধ্যবসায় 'ধন্যি ছেলে' টাইপ। এই অনুষ্ঠানটি রাতভর চলবে। খুব আঠা না থাকলে, শুধু আঁতেল সাজার জন্য আসা উচিত নয়। সাড়ে এগারোটা থেকে এক'টা পর্যন্ত ঢোলার সময়। তার পর অবশ্য ঘুম উড়ে যায়। কিন্তু এই দু'তিন ঘন্টা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ। যথাসাধ্য বুঝিয়েছি। কিন্তু ফল হয়নি। ওকে একটাই শর্ত দিয়েছি। আমি না বললে কোনও কথা বলবে না। বেরসিকের বকবক অসহ্য লাগে গান শুনতে শুনতে।
    ----------------------------------
    হলগেটের কাছে দেখি সমরদা টিকিট চেক করছে। পর্ণাদের পিছুপিছু আমাদের ঢুকতে দেখে আড়চোখে তাকালো। আমরা করিনি কোন দোষ, তবুও কেবলিই খবরের জন্ম হয়। আমাদের ছোটো গ্রাম। অমুক'দার ছেলে হওয়ার চাপ বড়ো বেশি। তাকাতে গেলে তো চারদিকেই চেনা লোক। চুলোয় যাক।
    -কোনদিকে বসবেন?
    যেন ঠিকই আছে আমরা একসঙ্গে বসবো।
    -বলুন?
    -একটু পিছনে, কোনার দিকে যাওয়া যায়?
    -যায়...
    এগোতে এগোতে চোখে পড়ে সুগত'র ব্যথা তার গলায় কম্ফর্টার, গেরুয়া খদ্দরশোভিত গুরুজির সঙ্গে সদলে বসে আছে। তাহলে এটাই কেস।
    -আবে, ওখানে গিয়ে বোস..
    -হবেনা..
    -কেন?
    -শালা বুড়োটা হেভি খ্যাঁচা...
    -ঠিক বা... তবে আমার দিমাগ চাটিস না। বুঝতে না পারলে চুপ থাকিস। পরে বুঝিয়ে দেবো। দু'চারটে সলিড পয়েন্ট দিয়ে দেবো। কাল গিয়ে ঝেড়ে দিস। কুড়ি ফঁস জায়গি। গ্র্যান্টি...
    -মাইরি গুরু, পার লগাদে ইস বার...
    -------------------------------
    মেয়েটার খুব সাহস তো। লক্ষ্য করছি চারদিক থেকে অনেক জোড়া চোখ নজর রাখছে। কিন্তু স্টেডিলি আগে আগে হেঁটে গিয়ে জায়গা খুঁজে নিলো। বেঙ্গল ক্লাবের সেই জংধরা টিনের চেয়ার। সারারাত এতে বসার কথা ভাবলেই রস শুকিয়ে যায়। কিন্তু আজ অন্যরকম। 'চাহিয়া দেখো, রসের স্রোতে রঙের খেলাখানি/ চেয়োনা চেয়োনা তারে নিকটে নিতে টানি।" পাশের চেয়ারে এমন রঙের খেলা থাকলে রসের স্রোতে তো ভরাকোটাল।
    - আজ প্রথমে কে গাইবেন?
    -সম্ভবত ফরিদুদ্দিন ডাগর..
    -আপনার ধ্রুপদ ভালো লাগে?
    -ধ্রুপদের আর ভালো-মন্দ কী? ওটা শোনার অভ্যেস না থাকলে তো কিছুই বোঝা যায়না...
    -তাই? আমি কিন্তু ধ্রুপদ কখনো সামনে বসে শুনিনি..
    -আজ শুনুন...
    -একটু গাইড করে দেবেন?
    কিছু বলিনা। এতোক্ষণের মধ্যে প্রথমবার শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি। ফিকে হাসি না আগ্রহ? বোঝা দায় হে।
    -----------------------
    উস্তাদজির গলা সেদিন তন্দুরস্ত। ষড়জে পর্দা মিলিয়ে একটা পুকার। রাগ য়মন। নোমতোম আসতে আসতে লোকজন স্তব্ধ হয়ে শুনছে।
    -গলার কী ডেপথ... তাই না?
    -ঠিক। ধ্রুপদে এটা জরুরি...
    সুগত আড়চোখে তাকায়। ওকে চুপ থাকতে বলা হয়েছে। ধ্রুপদ শেষ হবার পর অলকা কানুনগো'র ওড়িশি। ওঁর অনুষ্ঠান আগে কখনও দেখিনি। পর্ণার বন্ধু দেখি মাঝে মাঝেই উঠে কোথায় যেন যায়। একবার সপ্রশ্নচোখে তাকিয়ে দেখি। অযাচিতভাবে মন্তব্য শুনি,
    -একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে....
    -ও...

    -এটা চলবে?
    দেখি দুটো লবঙ্গ এগিয়ে দিচ্ছে।
    -একশোবার... আজ আনতে ভুলে গেছি...

    ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজছে। একটা বড়ো বিরতি। সুগতকে বলি, যা বে খেটে খা।
    -আবে বুঢ্ঢা বহুত হা...
    -বিনা মতলব কা গালি দিচ্ছিস। অতোগুলো কাশ্মীর কি কলি'কে নিয়ে এসেছে। টেনশন তো থাকবেই। ওদের সামনে দিয়ে হেঁটে বাইরে দাঁড়া। পৌঁছে যাবে....
    -চল গুরু...
    পর্ণার বন্ধুও যথারীতি গায়েব। দুজনে মুখোমুখি। তবে গভীর সুখে সুখি কি না, জানিনা। আমাকে বলে, চা খাবেন?
    -আমি তো খাইনা, চলুন সঙ্গ দেবো...
    হল থেকে বাইরে আসতেই ফাল্গুনের মধ্যরাতের হাওয়া ওডিকলোনের মতো ঝাপটা মেরে স্নিগ্ধ করে দিলো সারা শরীর। শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ মাঝ আকাশে।
    - কী দারুণ না?
    -আপনি কি এই দারুণটার কথাই বলছিলেন তখন?
    -ধ্যাৎ... আপনি খুব লেগে থাকতে পারেন। ঐতো কফি পাওয়া যাচ্ছে। এটা তো খেতে পারেন...
    মনে মনে বলি, টিক টোয়েন্টি দিলেও খেয়ে নেবো মধুময়।

    কফিটা ভালো'ই বানিয়েছে। চুপ করে এক চুমুক। চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে চাইছে। তাকিয়ে থাকি।
    -একটা কথা বলবো?
    -বলুন...
    -আর কতোক্ষণ আপনি করে কথা বলবেন?
    -আরে আমি তো ওতেই স্বস্তি পাই...
    -খুব স্বস্তি খোঁজেন, না..., সো বোরিং
    -নাহ, ঠিক তা নয়। নিজে থেকে সম্বোধন বদলাই না। প্রাইভেসিতে আক্রমণ মনে হয়....
    -অনুগ্রহ করে বদলাতে পারবেন কি?
    -হয়তো পারি। কিন্তু সেটা তো রেসিপ্রোক্যাল হওয়া দরকার...

    এতোক্ষণে সে সত্যিকারের হেসে ওঠে। ঠোঁটের কোনের মাপা ভঙ্গিমা নয়। বসন্তপঞ্চমীর রাতে ঝিরঝির বৃষ্টির মতো ভাসিয়ে দেওয়া জলের শব্দ আসে।
    ----------------------------------
    মধ্যরাতে আড়াইটা তিনটে নাগাদ তিনি বসলেন। সেনী ঘরানাদার উঁচু সপ্তকে বাঁধা যন্ত্র তাঁর । জোয়ারির শব্দ ঝর্ণার মতো, ভাসিয়ে দিয়ে যায়। রাগের নাম বললেন না। বন্দীশ শুনে কখনও মনে হলো আহির ভৈরব, না না এতো জোগিয়ার মতো লাগছে। উদ্গ্রীব হয়ে কান পেতে থাকা, ধরতে চাওয়া লক্ষণগুলিকে। ভৈরব না বসন্ত, কার ছোঁয়া বেশি লাগছে, চোখ বুজে শুনি। অওচার আলাপ শেষ করে বুধাদিত্য ঘোষণা করলেন তিনি রাগ বসন্তমুখারি বাজাচ্ছেন। বসন্তমুখারি, সেই কর্নাটকী রাগ বকুলভরণম I পারস্যের রাগ হিজাজের ছাঁচে এই রাগটিকে নিজের শরীর দিয়েছিলেন পন্ডিত রতনজনকার। । ততোদিন শুধু শোনা ছিলো উস্তাদ আমির খানের গায়নে বসন্তমুখারি। আর পণ্ডিত রবিশংকরের সেতারে দৈবী ছাব্বিশ মিনিট। সঙ্গে স্বপন চৌধুরী, তিন তাল। কিন্তু বুধাদিত্য বাজালেন এক সম্মোহক নেশাগ্রস্ততায় মত্ত সুরের বৃষ্টি। যেন বকুলপারা মেঘ আকাশ ভেঙে ঝরে পড়লো বসন্তের ঝোঁকে। রাগের মুখটি যেন ছুঁতে পারছিলুম আমি। নিমীলিত কাজলের মতো কোমল ঋষভ, নিখুঁত কোমল ধৈবতের মতো নাকের ডৌল আর কোমল নিষাদের মতো কম্পমান ওষ্ঠাধর। অপেক্ষায়। জানালার বাইরে শুদ্ধ গান্ধারের অঝোর বৃষ্টিধারা। শংকর-জয়কিশনজির স্টুডিওফ্লোর থেকে লতাজির সেই আর্তিভরা পুকার " ও বসন্তি পবন পাগল, আজা রে আজা রোকো কো'ই"I বুনোফুলের মধুর মতো মেলোডি, সেতারের তার বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়িয়ে পড়ছিলো স্পিকারের বাক্সো থেকে। এই শিহরণ সুর ছাড়া আর কে'ই বা দিতে পারে?আজানুসমর্পণে দুহাত বাড়িয়ে ভিজে গেলুম সেই শেষ রাতের অন্ধকারে। নিশ্চুপ। নিরাবলম্ব।

    "... এবং আশ্চর্য এই-- বৃষ্টি হলে শব্দ হয় শব্দ হতে থাকে।
    সমস্ত সৃষ্টির জন্য এই নভোচর বারি প্রয়োজন। আমি
    দেখছি অনেক বৃষ্টি হচ্ছে, তা সত্ত্বেও শাশ্বতকালের
    তুলনায় বৃষ্টি হচ্ছে কয়েক মূহুর্তমাত্র-এই সত্য বুঝি। " (বিনয়)



    "... এই হল আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য তাকে দেখেছি অনেকদিন থেকে,
    কী করে কিশোরী থেকে ক্রমশ যুবতী হল তা দেখেছি আমি।
    অনেক সৌন্দর্য আছে পৃথিবীতে, আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য অন্য বহু
    সৌন্দর্যের সঙ্গে কথা বলছিল..." (বিনয়)

    বসন্তমুখারির রাতের আগে পর্যন্ত পর্ণার সঙ্গে পরিচয়টি ছিলো নেহাত ফর্ম্যাল। নোয়ামুন্ডির মুর্গামহাদেওতে আলাপ হয়েছিলো। আমি থাকতুম চাইবাসা। আর সে কলকাতায় পড়াশোনা করতো। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে দেখা হয়ে যেতো আমাদের ছোটোশহরের ইতিউতি। কবিতাসন্ধ্যা বা গানের জলসায়। তখনও আমাদের গ্রামে যেটা চলতো, পরবর্তীকালে সেটাই তালিবানরা আফঘানিস্তানে আমদানি করে। পেটরোগা, চশমাপরা স্বনিয়োজিত মর‌্যাল কাকাজ্যাঠাদের প্রতাপ ঐ সব সাতফুটিয়া কাবুলিওয়ালাদের থেকে কিছু কম ছিলোনা। রেজাল্ট, মোটামুটি সব কেসই 'আমার অনাগত, আমার অনাহত' হয়েই থেকে যেতো। তোমার বীণাতারে আর তারা বাজার স্কোপ ছিলোনা। তবু তার মধ্যেই খুঁজে নেওয়া নিজস্ব হাহাকার, আজি যে রজনী যায়...... I কোথাও কোনও তন্ত্রীর হার্মনি হয়তো বাঁধা হয়ে গিয়েছিলো। হয়তো জানতুম। হয়তো জানতুম না। লেকিন কুছ বাত তো থি মোহতরমা আপ মেঁ। বেশক থি।

    বুধাদিত্য শেষে বাজিয়েছিলেন, না ভৈরবী গত নয়, ললিতে একটা ছোট্টো বিস্তার মধ্যলয়ে। সারারাত নেশা করে ভোরের অবসন্নতা কেমন হয়, যাঁরা নেশা করেন তাঁরা জানেন। সুরের নেশার কাছে কোথায় লাগে সিঙ্গল মল্ট, কোথায়ই বা ভাঙের সরবত? তখনও আলো ফোটার সময় অসেনি। বাইরে এসে দাঁড়াই।
    -কীভাবে যাবে?
    -চলে যাবো দুজনে ...
    -এগিয়ে দেবো?
    -তোমার তো বাইক আছে...
    আমি সুগতকে বলি, তুই গাড়িটা নিয়ে পাইপলাইনের লালবাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাক। আমি এদের নিয়ে আসছি । সুগত হেভি খুশ। ব্যথা তাকে নাকি বলেছে যে সে জানতো না সুগত ক্ল্যাসিকাল গান এতো পছন্দ করে। মানুষের কতোরকম কষ্ট যে থাকে। কজনই বা জানে সেকথা?

    যেতে যেতে বিশেষ কথা হয়না। ওদের বাড়ির সামনে ছেড়ে দিই। খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট স্বরে শুনতে পাই,
    - হোলির দিন কদমা ওয়াই ফ্ল্যাটে অপালাদের বাড়িতে থাকবো আমি...
    আর কিছু নয়। বোকারা ভাবে অন্যরকম। কিন্তু মেয়েরাই ক্যাপ্টেন থেকে যায় শেষ পর্যন্ত। জীবনের সব খেলায়।
    --------------------------------
    হোলির আগের দিন রাতে আমাদের বন্ধুদের স্ট্যাগপার্টিটা পুরোনো দস্তুর। সারা বছর যে যেখানেই থাকুক না কেন, দোলপূর্ণিমার সন্ধেবেলা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যেতে হবে। ঠিকানাটা সচরাচর কোনও ব্যাচেলর বন্ধুর ফ্ল্যাটেই থাকতো। এবারও ব্যতিক্রম হলোনা। ছোটোবেলার বন্ধুসব। শ-কার ব-কারের চূড়ান্ত অক্টেভে আলাপ চলে সেখানে। রাত বারোটার মধ্যে সব কনফেশন মোডে চলে যায়। এবার সবার আগে আউট হলো সুমন্ত। আমাকে বেশ কিছু নির্বাচিত গালাগাল দিয়ে বললো,
    -শালা কটা নৌকোয় পা দিয়ে কাটাবি তুই?
    -আমার কোনও নৌকোটৌকো নেই। তোর পানসি তুইই চালা...
    -সুধীর বিশ্বাস তোকে একদিন জমিয়ে পটকাবে...
    -আবে, সুধীর বিশ্বাসের অ্যায়সি কি ত্যায়সি, আমি কী করবো?
    -স্বাতী তোকে ছাড়বে না....
    -তো?
    -সুধীর বিশ্বাস জানতে পারলে ওর একমাত্র মেয়ের মেহবুবাকে লাথিয়ে বেন্দাবন পাঠিয়ে দেবে। শালা ঠিকাদার মাফিয়া। হত্তড় সে ফেঁসে যাবি...
    -আবে, স্বাতীকে নিয়ে আমি কী করবো? এতোবার ফুটিয়ে দিলুম, তবু কমলি নহি ছোড়তি...
    -শালা রোমিওর বাচ্চা... গান করিস, ড়বিন্দো করিস, ব্যাংকে চাকরি করিস, ইস্মার্ট জওয়ান , তোকে ছাড়বে কেন বে?
    -শোননা তুই গিয়ে লাইন কর। আমাকে ছাড়...
    -আবে আমি যা চাকরি করি তাতে স্বাতী বিশ্বাসের লিপস্টিকের খরচা উঠবে না...
    -আরে আমারও সেই অবস্থা। সুধীর বিশ্বাসের জামাই হয়ে যা। ওর ব্যবসা সামলা...
    -আবে, সুধীর বিশ্বাস আমাকে ওর মুন্সি করে রাখতে পারে। জামাই নয়। তুই লটকে যা। আমাদের একটা সলিড বৌদি লাভ হয়ে যাবে...
    -শালা তুই হদ লাতখোর ...
    -তুই পরশুদিন বেঙ্গল ক্লাবে কার সঙ্গে ফোকাস করছিলি বে রাতভর...
    -তোকে কে বললো..
    -আবে সবাই জানে...
    -তবু?
    -আমাকে স্বাতী বলেছে। কাল। কান্নাকাটি করছিলো...
    -বাপরে, এতো দূর?
    -হুমম, সে জন্যই বলছি। সাবধান থাকবি....
    -ছাড়তো, দিমাগ কিরকিরা করিস না...

    বিনা মতলব কা ফ্যাসাদ। যাকগে। ধীরে ধীরে সব পাবলিকই নেশার ঘোরে এদিক ওদিক শুয়ে পড়ে। আমি জানালা দিয়ে চাঁদ দেখি। কাল সকালে আর রাম খাবোনা। অনেকদূর যেতে হবে । কদমা।

    ".... তবে সবই ঠিক আছে, ঘুমোবার আগে মনে পড়ে সারা দিনের ঘটনা।
    মাঝরাতে বিছানায় চাঁদের জ্যোৎস্না এসে পড়ে দূর থেকে।
    শুধু চাঁদ দেখবার জন্য আমি বিছানায় উঠে বসি, চাঁদ আছে বলে
    ঘুমোতে বিলম্ব হয়। আমি তাড়াতাড়ি ফের যাব।" (বিনয়)



    ".... দেবতারা বাস করে টিনের ঘরের মধ্যে ইষ্টকনির্মিত সৌধে, খড়ের ঘরেও;
    দেবতারা চাল সিদ্ধ করে সেই ভাত খায়, রুটি খায়, মাছমাংস খায়;
    দেখেছি যে দেবতারা পূজা করে নানাবিধ মাটির মূর্তিকে, আমি ধন্য হয়ে গেছি।" (বিনয়)

    আমাদের শহরে হোলি শুরু হয় একটু বেলায়। অন্তত এগারোটা বাজলে নড়াচড়া শুরু। দোলযাত্রার ঠিক নয়, প্রাক-হোলির খোঁয়ারি কাটতে সবারই সময় লাগে। বিহারে সকালে গিলা, বিকেলে সুখা। যারা বিলিতি খায়না, তারা ভাঙের রসিক। অনেকে অবশ্য দুটো'ই চালিয়ে যায়। বেসিক্যালি তো ব্যাকান্যালিয়ার উৎসব। পরবর্তীকালে ঠাকুরদেবতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া স্যানিটি রাখতে। তাও মুখরক্ষা হয় কোথায়? বছরের এই একটা দিনই 'ধর্মভীরু' জনতা দিনের বেলা দশরথপুত্র সেবন করে, বৌকে কেয়ার না করে। আর যাদের বৌ নেই, তাদের তো শখের প্রাণ, গড়ের মাঠ। পাপীদের ঘুম ভাঙতে ভাঙতে আমি কেটে যাই। বাড়ি গিয়ে জমিয়ে স্নান করতে হবে। তার পর?

    তার আর পর নেই.....
    ----------------------------
    একটা হাওয়া দেয় এইসময়। উত্তপ্ত ফিলামেন্টের মতো রোদ। ঝলসে দেওয়া চমক তার। কিন্তু হাওয়াটা শরীরে লেগে ফিরে যায়না। পাগলা ঘূর্ণির মতো ঘিরে থাকে । আমার চারিপাশে, মাথার চারিপাশে। কদমা ওয়াই ফ্ল্যাট অন্তত দশ-বারো কিলোমিটার এখান থেকে। তবে হোলির দিন রাস্তা ফাঁকা। দঙ্গলবাজদের জত্থা কাটাতে পারলে আধঘন্টা লাগা উচিত। অপালার বাড়ি কোথায় জানিনা। তবে ওখানে আমার বন্ধু থাকে, বিলু, খোঁজ পেয়েই যাবো। সে সব তো মোবাইলের জমানা নয়। কিছু আড়াল, কিছু ভরম থাকতো মানুষের মধ্যে। মানুষের সব ব্যথা, কথা নেটের খাদ্য হয়ে জায়নি। একটু থেমে মানুষের চোখের দিকে তাকাবার জন্য কিছু সময় থাকতো আমাদের কাছে। সব কিছু যে জেনে ফেলতেই হবে, এমন কোনও তাড়নাও ছিলোনা। ভালো ছিলো? কে জানে?

    হোলির সকালে বিলু আমাকে দেখে উল্লসিত।
    -কী বে? তোর গ্যাংকে কাটিয়ে আসতে পারলি?
    -ভাবলুম এবারে তোদের এখানেই হোলি কাটাই। তোদের ঐ সিন্ধি ভাবিকে রংটং চড়াতে হবে তো....
    -এবার বুঝেছি। কিন্তু বরখুরদ্দার, ভাবি এবার ভেগে গেছে ...
    -সে কী রে, কোথায়?
    -বাপের বাড়ি, বম্বে... বোধ হয় খবর পেয়েছিলো তুই আসছিস...
    -মাইরি, তুই শালা ফুল ভোঁকচন্দর,...
    -চল চল তোর দুঃখ কাটিয়ে দিচ্ছি। এটা একটু মেরে নে...
    একটা কোকের বোতল এগিয়ে দেয়। এক চুমুক দিয়েই বুঝি ছদ্মবেশী রাম।
    -নাহ, আজ আর বেশি খাবোনা। বাইকে এসেছি...
    -তুই আবার কবে থেকে এসব নখড়া করছিস রে?
    -নাহ, সিরিয়স। আচ্ছা তোদের এখানে অপালা কোথায় থাকে বলতো?
    বিলুর চোখ সরু হয়ে যায়।
    -আবে কেসটা কী? অপালাকে তুই চিনলি কী করে?
    -চিনিনা তো, একটু কাজ আছে ওর সঙ্গে....
    -গুরু, উধর হাথ মত মারো। মেরি জান চলি জায়গি...
    -আবে আমি হাথ-টাথ মারছি না। ওদের বাড়িতে একটা মেয়ে এসেছে। তার সঙ্গে কাজ আছে।
    -পর্ণা? তুই চিনিস?
    -হুমম... স্লাইট স্লাইট
    -অব চিজ সমঝ মেঁ আয়া। গুরু এক পুরিয়া পায়ের ধুলো দিবি...
    -দেবো দেবো, আপাতত আমার কাজটা করে দে...
    -চল, যাবো ওদের বাড়ি...
    -শোন, বাড়িটাড়ি যাবোনা। ওদের ডেকে আন নীচে...
    --------------------------

    এই ফ্ল্যাটগুলো একটা ক্যাম্পাসের মধ্যে। সেখানে বাচ্চাদের রং বালতি, ভূতুড়ে পেন্ট নিয়ে দাপাদাপি শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বড়োরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কখন বেরোনো হবে। বিলুদের ফ্ল্যাটের পিছনদিকে একটা ছায়াময় কদমগাছ। সেখান থেকে একটু দূরেই অপালাদের বাড়ি। আমি সেই ছায়াতেই দাঁড়াই। পাতা ঝরে একাকার চারদিক। ঘাসগুলো ছিটে ছিটে হলুদ হয়ে আসছে। হাওয়ায় দূর থেকে ফাগুয়া-চইতার নেভা নেভা সিমফনি ঢেউয়ের মতন। উদ্দণ্ড কোরাস, উচ্চকিত ঝাঁঝ আর ঢোলক। পাতার উপর পায়ের আওয়াজ। বিলু ফিরে এসেছে। একা।

    -কী হলো রে?
    -ওদের বাড়িতে চ...
    -আরে বললুম তো, চিনিশুনি না কাউকে.. হঠাৎ করে .. এভাবে
    -আবে কাকুকাকিমা কালীবাড়ি গেছে, গুরুদেবের হোলিমিলন...
    -বোঝো...
    -কী বুঝদার মানুষ বল... সেটিং দ্য স্টেজ ফর আওয়র হোলিমিলন...চল চল, বহুত উতাওলে ইন্তেজার মেঁ হ্যাঁয় দোনো পঞ্ছি...

    অপালা দরজা খুলে দেয়। বাড়িটা বেশ সাজানো। আমার বিহারি বন্ধুরা যেমন বলে থাকে। দাদালোগোঁকে ঘর হমেশা সঁওয়ারা হুয়া রহতা হ্যাঁয়।ভালো লাগে। তবু তো এক আধটা কমপ্লিমেন্ট বাঙালিরা পায় এখনও।
    -আসুন আসুন... তখন থেকে আপনার গল্প শুনছি....
    -সে কী ? হিরো এতো কম পড়িয়াছে?
    -আরে হাবুডুবু মানুষের হিরো'ই বা কী, জিরো'ই বা কী?
    -দমকল ডাকুন, আমার দ্বারা হবেনা...

    বিলু বলে ওঠে, অপালা, কাকুর স্টক কিছু আছে নাকি বাইরে?
    -আছে তো, কিন্তু আজ ছাড়ো না ঐসব...
    -আরে, হোলির দিন পাপ করা ছেড়ে দিলে চিত্রগুপ্ত নরকে হান্টারপেটা করবে...
    -করুক। আজ ঐসব মতলব থাকলে আমি হান্টারপেটা করবো...
    -লো, অওরতজাত সুধরেগি নহি...

    হয়তো একটু প্রগলভা লাগে। কিন্তু অপালা বেশ স্মার্ট মেয়ে। বিলুর পছন্দ ভালো।

    এতোক্ষণ পর্ণা কোনও কথা বলেনি।
    ---------------------------
    সবে জমিয়ে বসেছি, দরজায় ঘন্টার আওয়াজ। বিলু বলে, কাকুকাকিমা রিটার্নড।
    -আরে না, বাবা-মা'র বিকেল হয়ে যাবে আসতে...
    -তবে?

    খুলতেই দরজার বাইরে গোটা কুড়ি লোকজন। কাউকেই চেনা যাচ্ছেনা। বড়োদের হোলি শুরু হয়ে গেছে। প্রচুর কলরব করে আমাদের বাইরে ডাকছে ওরা। ঘরের ভিতর কেউ আবির দেয়না। মেঝে ময়লা হয়। অপালা আর বিলুকে যেতেই হবে। ওদের জায়গা। গণহোলি এড়ানো সম্ভব নয়।

    -তোরা একটু ওয়েট কর, আমরা দু'চারটে বাড়ি ঘুরে ফিরে আসছি। অবশ্য আমাদের যতো দেরি হয়, তোদের ততো পুলক...
    -হুমম, রাজা পুলকেশিন...
    -এক্জাক্টলি...

    দুদ্দাড় করে তারা বেরিয়ে যায়। ঘরের মধ্যে শুধু পাখা চলার আওয়াজ। পরিবেশটা প্রায় বুদ্ধগুহের ছোটোগল্পের মতো। সেই ছোটোবেলায় পড়া 'খেলা যখন'।

    "... এই সব মনে পড়ে, স্বভাবত আরো মনে পড়ে বহু নক্ষত্রের কথা
    আমার চাঁদের কথা মনে পড়ে, মনোযোগ দিয়ে আমি ভাবি।
    পৃথিবীতে তারকার আলোক আসার পথপাশে
    চাঁদ থাকলেই সেই তারকার আলো যায় বেঁকে
    চাঁদের আকর্ষণেই; তারকাদিগের খোপা, ভুরু, দুই হাত
    মনোযোগ দিয়ে দেখি, তারকাদিগের সঙ্গে কথাবার্তা বলি।" (বিনয়)
    --------------------------------


    "... তার কাছ থেকে কোনো জ্যোৎস্না ভিক্ষা করে পাবে কিনা।
    সে কী ফল ভালোবাসে, কে জানে সবুজ কিংবা লাল,
    কিছুই জানো না তুমি; তবু দীর্ঘ আলোড়ন আছে,
    অনাদি বেদনা আছে, অক্ষত চর্মের অন্তরালে
    আহত মাংসের মতো গোপন বা গোপনীয় হয়ে।" (বিনয়)

    -কী হলো? ডেকে এনে মৌনব্রত...
    -ডাকিনি তো আমি...
    -তবে ? অতাপতা জানিয়ে কনফিউজ করলে কেন?
    -আমি করিনি। তুমি করেছো...
    -যাহ বাবা, আমি কী করলুম?
    -স্বাতী বিশ্বাস কে?
    -মাই গড... তুমি তাকে চিনলে কী করে?
    -চিনিনা তো, তাই জিগ্যেস করছি..
    -একটা মেয়ে, কিন্তু তুমি... মানে তোমাকে কে ওর কথা বলেছে?
    -যেই বলুক, কথাটা তার মানে সত্যি...
    -কোন কথাটা?
    -আর কী কথা হতে পারে? আমি আর এসবের মধ্যে নেই...
    -বোঝো? তুমি যা ভাবছো, ঘটনাটা একেবারেই তা নয়...
    -সব ছেলেরাই একথা বলে। অ্যাট লিস্ট তোমার থেকে এইটুকু অনেস্টি আশা করতে পারি...
    -নিশ্চয় পারো। কিন্তু শুধু এইটুকু বলো তোমার সঙ্গে ওর যোগাযোগ কীভাবে হলো গত দুদিনের মধ্যে?
    -ডায়রেক্ট হয়নি। আমার এক বন্ধু, স্বাতীকে চেনে, বললো, ও যখন শুনেছে আমরা বেঙ্গল ক্লাবে সারারাত একসঙ্গে বসে গান শুনেছি... শী বিকেম হিস্টেরিক। আমার ডিটেলস খুঁজে বার করে আমার বন্ধুকে বলেছে, ইউ অ্যান্ড শী আর ইন আ সিরিয়স রিলেশনশিপ.... আর বাকি কী থাকলো?
    -আমাকে বিশ্বাস করবে?
    -সত্যি বললে করবো...
    -স্বাতী আমাকে অনেকদিন থেকে চেনে। ভালো মেয়ে। মানে যা কিছু 'ভালো' হওয়ার লক্ষণ সব আছে ওর। দর্শনধারী, স্মার্ট, বড়োলোক বাপের মেয়ে। সমস্যা হচ্ছে সারা জীবন ধরে যা চেয়েছে, পেয়েছে। কিছুদিন ধরে দেখছি আমার প্রতি খুব পজেসিভ হয়ে পড়েছে। যেভাবে হোক আমাকে অধিকার করতে চাইছে। অনেক বুঝিয়েছি .. অ্যায়াম নট হার কাইন্ড... কিছুতেই শুনতে চায়না। জানিনা কীকরে দিনে দিনে এতো অধিকারপ্রবণ হয়ে পড়েছে ও... সত্যি বলছি ওর এই ভালনারেবিলিটি আমাকে কষ্ট দেয়... মেয়েটা আদুরে, কিন্তু মনটা খুব ভালো...কী করবো বুঝতে পারছি না? আমি হেল্পলেস... শী ইজ সো ডেসপ্যারেট, বিশ্বাস করছো?
    -তুমি কি সত্যি বলছো?
    -এ নিয়ে আমি আর কোনও কথা বলবো না...
    -আমি কাল সারারাত একবিন্দু ঘুমোতে পারিনি...
    -আশ্চর্য তো, কেন? তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় বা যোগাযোগ বা ঘনিষ্টতা, কতোটুকু, ক'দিনের? এতো অল্প সময়ের মধ্যে তুমিও পজেসিভ হয়ে পড়লে? কী জন্য তোমার রাতের ঘুম নষ্ট হয়? অবশ্য প্রশ্নগুলো পার্সোন্যাল মনে হলে উত্তর দেবার দরকার নেই। আমি বুঝে নেবো...
    -আমি জানিনা, কিস্যু জানিনা....

    ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে, শোবার ঘরের দিকে। আমি চুপ করে বসে থাকি। পাখার আওয়াজ, ঘড়ির আওয়াজ, শ্বাসের শব্দ, পর্দাফাটানো নীরবতার মতো ঘিরে ধরতে থাকে। আমাকে। এবার বোধ হয় আমার বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কেউ এসে পড়লে চূড়ান্ত বিড়ম্বনা। উঠে পড়ি। মনে হলো যাবার আগে একবার বলে যাই, আমি অসৎ নই। ঘরের দরজা খোলা। পর্দা দুলছে পাখার হাওয়ায়। ভিতরে উঁকি দেওয়া বোধ হয় অন্যায় হবে। কিন্তু কীই বা আসে যায়। আর তো দেখা হচ্ছে না। আমার কথাটা বাকি রেখে কী লাভ? পর্দাটা একটু সরিয়ে দেখি বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মতো বালিশে মুখ গুঁজে আধশোয়া। অনাত্মীয় একজন মহিলাকে এভাবে দেখা উচিত নয়। পর্দা ছেড়ে দিই।
    -আমি আসছি, দরজাটা বন্ধ করে দাও...
    বাইরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছোবার আগেই পিছু ডাক,
    -একটু দাঁড়াও... একটা কথা আছে
    -বলো...
    একটু এগিয়ে এলো, ধীরে কিন্তু অবিচলিত পায়ে,
    -আমি তোমায় বিশ্বাস করেছি...
    তাকিয়ে থাকি,
    -কী দেখছো?
    -তোমার চোখ কী বলছে, দেখতে চাইছি...
    -একই কথা বলছে...
    -প্রমাণ?
    -কীসের প্রমাণ?
    -যা বলছো, তার....
    -কাছে এসে দেখো...
    ভূতগ্রস্ত মহাকাশচারীর মতো এগিয়ে যাই I হাতটি বাড়িয়ে দেয় সে। এর পর আর কীই বা করার থাকে ? দুহাতে তার মুখটি তুলে ধরি। শুকনো জলের রেখা দুচোখে। কপালে একটা নীল টিপ। আধখোলা ওষ্ঠাধর। আমি তো শশিডাক্তার নই। এ কুসুম শুধু শরীর নয়, শুধু রক্তমাংস নয়। এ যেন শংকরভাষ্যের বোবা নিয়তি । তার নাম জানিনা। ঠিকানা রাখিনা। শরীর, শরীর। তুমি কোথায় থাকো? কোন দেশে? সব সত্ত্বা ঝাপটমারা বৃষ্টির জলে উইন্ডস্ক্রিনের কাচের মতো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অসহায় দেখি এই চোখ বুজে থাকা কলিঙ্গভাস্কর্যের নায়িকার স্পন্দিত ছবি । সে অপেক্ষা করছে, করে যাচ্ছে। বিস্রস্ত আবেগ হয়ে ডুবে যাচ্ছি কোমল নিষাদের মতো পাটলবর্ণ তার ওষ্ঠাধরে। মাথায় ছলকে ওঠেন নাজিম হিকমত। "তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান, কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর আমি শুনতে পেলাম না।" ঐ সুশ্বেত দন্তমালা, বাকদেবতার পূত জিহ্বা, ঐ গোপন সাবান থেকে ছড়িয়ে যাওয়া জলজ গায়ের গন্ধ, ঐ শ্বেতপাথরের মতো নিষ্পাপ কপোলের ক্যানভাসে আমার হোলির নিলাজ রঙের পাগলামি হুসেনের তুলির মতো আছড়ে পড়ে। এই তো আমার সেই বসন্তমুখারির নিঃসীম বিধুমুখ, আমার নির্লজ্জ নেমেসিস। অপেক্ষায় ছিলাম কতো কাল। সে বড়ো সুখের সময় নয়...

    "...রাত্র ফিকে হয়ে গেছে, বকুল, বকুল ফুল, শুনছ কি, আজ আমি যাই..."
    ---------------------------------------
    ঘড়ি থেমে কতোক্ষণ, মনে নেই। জ্বরগ্রস্ত যক্ষিণীর আঁকড়ে থাকা বাহুদুটিতে যেন প্রাণ ফিরে আসে। গোলকোণ্ডার পাথরের মতো নিজেই ঠেলে সরিয়ে দেয় তার অবাক নির্ভরতা। অবসন্ন গলায় স্বগতোক্তির মতো কয়েকটা শব্দ তার...
    -তুমি আমার সর্বনেশে নেশা...কারুকে ছেড়ে দেবোনা তোমায়, কখনও না...
    -দিওনা... যতোদিন পারো...
    -কোনওদিন না... এক মূহুর্তের জন্যও...
    এবার হেসে ফেলি...
    -কুল ডাউন... প্রিয়ে । তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর হইলো...
    -'প্রার্থনা'? হোয়াট প্রার্থনা? আই ক্লেম ইউ.... আআই ক্লে এ এম ইউউ....

    আবিরের গুঁড়ো সব রাখা ছিলো। লাল, মেরুন, হলুদ, সবুজ। দৃশ্যের জন্ম হবে বলেই তো তাদের অনন্ত অপেক্ষা। একমুঠো তুলে নিই হাতে। আবির, তুমি কার? যে মাখে, না যে মাখায়? জানিনা, জানিনা বলে উড়ে যায় তারা। বাসবদত্তার রজনীর মতো, খাজুরাহোর প্রোষিতভর্তৃকার মতো, কোণারকের পূর্ণিমার মতো, আমার সকল গান, আমার সকল দৃশ্য, আমার উত্তপ্ত ফাগুয়ার দিন, সমস্ত তোমারে লক্ষ্য করে।

    -বারান্দায় চলো, ঘরে আবির পড়বে....

    "... নেই কোনো দৃশ্য নেই, আকাশের সুদূরতা ছাড়া।
    সূর্যপরিক্রমারত জ্যোতিষ্কগুলির মধ্যে শুধু
    ধূমকেতু প্রকৃতই অগ্নিময়ী; তোমার প্রতিভা
    স্বাভাবিকতায় নীল, নর্তকীর অঙ্গসঞ্চালন
    ক্লান্তিকর নয় বলে নৃত্য হয় যেমন তেমনি।
    সুমহান আকর্ষণে যেভাবে বৃষ্টির জল জ'মে
    বিন্দু হয়, সেইভাবে আমিও একাগ্র হয়ে আছি।
    তবু কোনো দৃশ্য নেই আকাশের সুদূরতা ছাড়া।....." (বিনয়)



    (সৌজন্যঃ বাংলা আড্ডা)
  • বিভাগ : আলোচনা | ০৯ মার্চ ২০২০ | ৮৫৫ বার পঠিত
আরও পড়ুন
খোপ - রৌহিন
আরও পড়ুন
#আমি - Jinat Rehena Islam
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • একলহমা | 108.162.238.118 | ০৯ মার্চ ২০২০ ১১:২৫91335
  • এই লেখা পড়ার আবিষ্টতাকে নষ্ট করবে বলে গানগুলি এখন শুনলাম না। একাধিকবার এই লেখাটির কথা ভেবে এটা যখন মাথায় বসে যাবে তখন ইচ্ছে হলে কখনো শুনে নেব। আপনার সৃষ্টিকে আপনার মত করে পূর্ণাঙ্গে নিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। আমার মত করে আমি যেভাবে নিলাম আমার জন্য এটাই পূর্ণ, অপূর্ব।
  • প্রতিভা | 162.158.167.183 | ০৯ মার্চ ২০২০ ১২:১০91336
  • লেখা আর সঙ্গীতের মেলবন্ধনে এটি করোনাভাইরাসের কালে হোলির শ্রেষ্ঠ উপহার !
  • | 172.69.135.147 | ০৯ মার্চ ২০২০ ১৭:১৮91350
  • হা হা হা হা এটা দিব্বি মন ভাল করা লেখা।
  • শিবাংশু | 162.158.227.55 | ১০ মার্চ ২০২০ ১৯:২০91374
  • ধন্যবাদ, সবাইকে ...
  • বিপ্লব রহমান | 172.69.134.56 | ১১ মার্চ ২০২০ ২৩:০১91408
  • উরি বাপ্র! লেখা, কবিতা গান পড়তে পড়তে, শুনতে শুনতে সত্যিই ভীষণ আবিষ্ট হয়ে  ছিলাম। 

    এইরকম লেখার জন্যই গুরুতে আসি। উড়ুক 

  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত