• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • গল্প: দ্বিখন্ডিত

    Nahar Trina
    ব্লগ | ২৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৮৯ বার পঠিত

  • ১.

    কাল থেকেই আমার মালিকের মেজাজে আগুন। আমাকে দেখলেই কেমন উস্কে উঠছে সেটা। আমি তাই আড়ালে আছি আপাতত। দু'জনারই নাওয়া খাওয়া হয়নি কাল দুপুরের পর থেকে। অফিসের কাজ শেষে ফিরতে ফিরতে মালিকের সন্ধ্যে গড়িয়ে যায়। আমি তখন একাই থাকি বাড়িতে। সকালে অফিসে বের হবার আগে আমার দুপুরের খাবার বন্দোবস্ত করে তবেই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন মালিক।

    গতকালও রুটিন মাফিক দুপুরের ব্যবস্হা সেরে, আমাকে বিদায় কালীন স্নেহটুকু দিয়ে শান্তমুখে অফিসে গিয়েছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা পার করে বাড়ি ফেরার পর থেকেই কোনো এক অজানা কারণে মেজাজ খারাপ করে আছেন। অথচ দুদিন আগেও মালিকের যাবতীয় সুখ দুঃখের ভাগীদার ছিলাম আমি। অফিস থেকে আসবার পর, রাতের খাবারের তোড়জোড় করতে করতে মালিক আমার সাথে কত কথা বলে যেতেন এক নাগাড়ে। এমন কী জেরিন ম্যাডামের সাথে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কতটুকু অগ্রগতি হলো সেটাও বাদ পড়তো না। মালিক আর জেরিন ম্যাডাম খুব শীঘ্রই পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হবেন। এটা নিয়ে আমার খানিকটা অস্বস্তি থাকলেও মালিকের খুশিতে নিজের আনন্দটা জানান দিতে ভুলিনা।

    আমার বড় দুর্দিনে আমি এ বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলাম। পথে পথে প্রায় না খেয়েই ঘুরছিলাম। একদিন অফিস ফেরতা এই মানুষটার পেছন পেছন বাড়ি পর্যন্ত চলে আসি। আমাকে তিনিও লক্ষ্য করেছিলেন। অন্যরা যেভাবে চোখ পাকিয়ে কিংবা অদৃশ্য ঢিল দেখিয়ে ভয় দেখায় পেছন ছাড়াবার কৌশল হিসেবে, তিনি এর কিছুই করেননি। বরং বাড়িতে ঢুকবার মুখে আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার? খাওয়া হয়নি বুঝি আজ? আমার মাথায় তার হাতের স্পর্শই জানান দিয়েছিল, মানুষটা ভীষণ দয়ালু।

    সেই থেকেই আছি এ বাড়িতে। আমার সেভাবে মনে পড়ছেনা মালিক আমার উপর কখনো রূষ্ট হয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে আজকের সকাল পর্যন্ত কী এমন সমস্যা সৃষ্টি যেটা তিনি নিজের মধ্যে নিয়ে একা একাই কষ্ট পাচ্ছেন? আড়ালে বসে তাকে লক্ষ্য করেছি। কী এক অব্যক্ত বেদনায় মালিকের মুখটা ছেয়ে আছে। রাতে ভালো ঘুমও হয়নি তার। আমি তার সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী, কিন্তু এখন দূরে থাকতে হচ্ছে অজানা কারণে।

    ২.

    আড়াল থেকে শেরখাঁ যে আমাকে লক্ষ্য করছে সে আমি দিব্যি আন্দাজ করতে পারছি। আমার মেজাজ কেন বিগড়ালো, কী হয়েছে ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন ওর বোবা চোখে। সে আমি ওকে না দেখেই বলে দিতে পারি। প্রায় তিন বছর শেরখাঁ আমার ছায়াসঙ্গী হয়ে আছে। আমরা একে অন্যের এই ব্যাপার গুলো বুঝে নিতে পারি। একটা অপার্থিব মায়ার বাঁধনে আমাদের সম্পর্কটা বাঁধা পড়েছে।

    অথচ জেরিনের একটাই চাওয়া, এবাড়িতে সে কিছুতেই একটা কুকুরের সাথে বসবাস করতে পারবে না। শেরখাঁকে বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে। নইলে জেরিনের পক্ষে একই ছাদের নীচে বসবাসের স্বপ্ন সার্থক করা সম্ভব না। গতকালই সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে জেরিন একথা। সেই থেকে আমার মাথায় আগুন। একটা অসহায় জন্তু, কার কী ক্ষতি করছে যে তাকে তাড়াতে হবে! আর তা ছাড়া, শেরখাঁকে আমি কুকুর হিসেবে দেখিনি। আমার নিঃসঙ্গ জীবনে এতদিন সেই ছিলো একমাত্র নিঃস্বার্থ সঙ্গী।

    জেরিনকে সে কথা কিছুতেই বোঝানো গেলো না। মানুষ হয়ে সে আমার এই অনুভূতি বুঝলো না। সে একগুঁয়ের মত বার বারই বলেছে হয় শেরখাঁ, নয় আমি। কাকে চাও তুমি?

    আমি দু'জনকেই চাই। একথা শোনা মাত্রই সাপের মত ফোঁসফোঁস করে উঠেছিলো জেরিন। আমার সাথে তুমি একটা কুকুরের তুলনা করলে! বিস্মিত হবার ভাষা খুঁজে পাইনি আমি। ভীষণ অসহায় বোধ করছি সেই থেকে। কাল সকালেই জানাতে হবে জেরিনকে আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা।

    সারারাতই ভেবেছি কী করা যায় সেসব নিয়ে। একবার নিষ্ঠুরের মত এটাও ভেবেছি, খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে শেরখাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দেই চিরদিনের মত। ভেতরের আমিটা ভীষণ ভাবে বিরোধিতা করেছে। অনেক ভেবে শেষে এক জায়গাতে ফোন করে যাবতীয় কথাবার্তা সেরেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিটি কর্পোরেশনের লোকেরা এসে নিয়ে যাবে শেরখাঁকে।

    এছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিলো না। একটা দীর্ঘ সময় একা থাকতে থাকতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। এখন আমার ভেতরটা কাঙ্গালের মত গৃহী হতে চায়। প্রিয়জনের উষ্ণ ছোঁয়া পাবার আকাঙ্ক্ষায় অধীর যেন। মরুভূমির শুষ্ক প্রান্তর পানির জন্য যেমন খাঁ খাঁ করে আমারও তেমন দশা। জেরিন আমার সে আশা পূরণের সুখপাখি। ওর জন্য একটা বোবা প্রাণীর আশ্রয় হারানোটা কি খুব বেশি মূল্যাবান?

    এ প্রশ্নের উত্তর দেবার সাহস আমার আপাতত নাই। এখন আমি র্নিমমভাবেই একজন স্বার্থপর মানুষ। আর মানুষের অসাধ্য কিছু নাই। এসব জটিল ভাবনা আমাকে আরো বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলছে। রাগটা আমার হচ্ছে নিজের উপরেই। নিজের অক্ষমতা ঢাকতেই মেজাজ খারাপের বাহানা।
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৮৯ বার পঠিত
আরও পড়ুন
আয়না - ন্যাড়া
আরও পড়ুন
খোপ - রৌহিন
আরও পড়ুন
খোপ - রৌহিন
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • Nahar Trina | 89900.227.90012.5 (*) | ২৯ নভেম্বর ২০১৮ ০৩:০১62848
  • জ্বী, সচলায়তনে এটা প্রকাশিত হয়েছিল।
  • Atoz | 125612.141.5689.8 (*) | ২৯ নভেম্বর ২০১৮ ০৩:১৫62849
  • তাই তো বলি! কোথায় পড়েছি কোথায় পড়েছি! ঃ-)
  • কুশান | 561212.187.1256.39 (*) | ২৯ নভেম্বর ২০১৮ ০৪:১১62850
  • সুন্দর লিখেছেন।

    আরেকটু বড় করলে ভাল হতো না?

    তবে, সব গল্পের শেষ না থাকাই ভাল।
  • Atoz | 125612.141.5689.8 (*) | ২৯ নভেম্বর ২০১৮ ১২:১৫62847
  • গল্পটা খুব চেনা লাগছে। আগে কি কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল?
  • তৃণা | 89900.227.90012.5 (*) | ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ ০১:০২62851
  • আপনার স্মরণ শক্তিরে জাঝা Atoz(ভাই/বোন)! লেখাটা বেশ পুরনো। আপনি মনে রেখেছেন। আপনার সচল নিকখানা জানা গেলে মন্দ হতো না। :) আন্তরিক ধন্যবাদ জানবেন Atoz।

    ***
    কুশানদা, খুব ভালো হতো হয়ত বা। কিন্তু আমার এটুকুনই যে পছন্দ! একদম, এ গল্পেও শেষ বলে কিছু না থাকাটা থাকুক বরং। আপনার সহৃদয় মন্তব্যের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ কুশানদা। :)
  • Du | 7845.184.8912.41 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০২:১২62852
  • সুন্দর গল্প।
  • Nahar Trina | 89900.227.90012.5 (*) | ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ০১:৩৪62853
  • গল্প পাঠের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ Du.
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত