
১৯৯৮ সাল থেকে সুশান্ত চৌধুরির ক্ষমতা বাড়ে, তার দলে আরও কিছু দুষ্কৃতীদের দল যুক্ত হয়। দুই গুণ্ডা মিলেই তাদের তোলাবাজির কারবার জমিয়ে তোলে, স্থানীয় ব্যবসায়ী, দোকানদার এবং বাসিন্দা এদের কাছ থেকে এরা নিয়মিত তোলা আদায় করত এদের স্থানীয়ভাবে ব্যবসা করতে দেবার বিনিময়ে। দুজনেই বাইরের লোক হলেও অবিলম্বে এরা সুটিয়ায় জমিয়ে বসে, এবং নিজেদের দলে স্থানীয় হতাশ, কাজ-না-পাওয়া ছেলেপুলেদের ভেড়াতে শুরু করে। এই স্থানীয় ছেলেদের বেশির ভাগই এই সব দলের "ইনফর্মার" হিসেবে কাজ করত। দেখতে দেখতে ছোটখাটো তোলাবাজির ঘটনা বাড়তে বাড়তে ২০০০ সাল নাগাদ এই সব বড় আকার ধারণ করে, এবং এর সাথে যুক্ত হয় গণধর্ষণের মত ঘটনাবলী। এর মূলে ছিল এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চালুন্দি নদীর বন্যায় সুটিয়া এবং আশপাশের গ্রামের বহু মানুষ সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়েন। বেশ কয়েকটি গ্রাম হতশ্রী হয়ে পড়ে। এই সময়ে সরকারি এবং বেসরকারি ত্রাণসাহায্য এসে পৌঁছয় এবং সেইসব বিলিব্যবস্থার কাজে লাগে স্থানীয় ছেলেরা। এর পরে যা হয়, ধীরে ধীরে তারা নিজেরাই সেই সব রিলিফের মাল সরাতে থাকে, এবং সুশান্ত আর বীরেশ্বরের সহায়তায় তাদের গুণ্ডাবাহিনি এই সব গ্রামে তাদের দৌরাত্ম্য শুরু করে। গুন্ডাবাহিনি রিলিফের দখল নেয় এবং তারাই স্থানীয় স্কুল পালানো, কর্মহীন, হতাশ কমবয়েসী ছেলেদের নিজেদের দলে নিয়োগ করতে শুরু করে, ক্রমে সুটিয়া এবং আশপাশের সমস্ত গ্রামের রিলিফ সেন্টারের দখল তারা নিয়ে নেয়, এবং তাদের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয় পুরো এলাকায়। নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে তারা তোলাবাজি আর অত্যাচার চালাত, লোকাল ইনফর্মারদের সাহায্যে তারা স্থানীয় পরিবারগুলো সম্বন্ধে খবর জোগাড় করত, তারপরে বাইকবাহিনী নিয়ে চড়াও হত সেই পরিবারের ওপর, মহিলাদের অত্যাচার এবং ধর্ষণ করত, তারপরে টাকা দাবি করত। কখনও দাবির কম টাকা নিয়েই তারা খুশি হয়ে যেত, কখনও কখনও তারা বাধ্য করত পরিবারটিকে নিজেদের আংশিক জমিজিরেত বেচে টাকা তুলে দেবার জন্য। পুলিশে খবর দিলে মেরে ফেলার হুমকি দিত তারা। কখনও তারা লাগাতার কয়েক দিন ধরে কোনও একটি বাড়িকে ঘিরে থাকত, কাউকে বেরোতে দিত না যতক্ষণ না তাদের দাবি মানা হত। সবাই জানত, স্থানীয় পুলিশের সাথে তাদের যথেষ্ট বোঝাপড়া ছিল এবং দুই গুণ্ডাবাহিনির নেতাই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় পুষ্ট ছিল, তাদের ধরা সোজা ছিল না। মেয়েদের তারা ধরে নিয়ে যেত নাগবাড়ি এলাকায় একটা ছোট পরিত্যক্ত ঘরে, তারপরে সেখানে তার ওপর অত্যাচার চালাত। একটিমাত্র কেসে আমি জনৈক সারভাইভারের নিজের মুখ থেকে শুনেছি সেই অত্যাচারের কাহিনি, বাকি কেসগুলো আমি শুনেছি অন্যদের মুখ থেকে এবং লোকাল থানার এফআইআর থেকে। আমি আবার সুটিয়া যাব আরও বিস্তারিত জানতে। ... ...

বর্ণ গন্ধ ধ্বনির এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রেক্ষাপটটা জরুরি। না হলে সব উন্নয়ন বিতর্কই শেষ পর্যন্ত মাথা কোটে অসার নাগরিক তাত্ত্বিকতার আবর্তে, “কিছু পেতে গেলে কিছু হারাতেই হয়” জাতীয় বুলিতে। যারা পাচ্ছে, তাদের যে কিছুই হারাতে হচ্ছে না, আর যারা হারাচ্ছে তারা যে পাচ্ছে না কিছুই – আবহমান এই নির্মম সত্যিটা খোদাই হয়ে থাকে একটি যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে, একটি নীরব চোখের ভাষায়, একটি ঠোঁটের কুঞ্চনে। তেমন এক মুখের সামনে এসে মুখোমুখি বসতে হয়। ঠিক তেমনই একটি পাহাড়ের মাথায় এক স্বচ্ছ শীত অপরাহ্ণে, মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বনটিয়ার ঝাঁক আর কাঠঠোকরার ঠক ঠক শব্দে, আর্দ্র বনজ গন্ধে তিরতিরে ঝর্নার ধ্বনিতে, প্রতিভাত হয় ধর্মস্থানের সংজ্ঞা। পুরাণকথার নায়কের আঁতুড়ঘরের হালহদিশ নিয়ে যখন দেশ পোড়ে, সাম্প্রদায়িকতার দাঁতনখ শানিয়ে ওঠে, তখন এক কন্ধ রমণীর বাচন – “ তুমো মন্দির ইটা বালি রে তিয়ারি, আমো মন্দির গাছা লতা পাথরো ঝরনা জন্তু রে!” - ঝোড়ো হাওয়ার মতো আমাদের সনাতন দেবালয়ের পোড়ো দরজাটা সমূলে নাড়িয়ে দেয়। ... ...

এর দুইদিন পরে। আমি বসে আছি উপ-কমিশনারের রুমে। বড় হেফাজতিটাকে নিয়ে আসা হলো। আমাকে দেখিয়ে বলা হলো, এই লোকটা কেমন? মানে মানুষ কেমন? হেফাজতিটা বললো, সে মানুষ হিসেবে ভাল। মনটা ভাল আছে, লোক খারাপ না, কিন্তু সমস্যা হইলো নাস্তিক। নাস্তিক না হইলে তারে খুব ভাল মানুষই বলা যাইতো। ... ...

তাই এই ভীষণ চেনা মানুষগুলোর ভালোমন্দ দুরু দুরু বুকে দেখতে দেখতে একটা গোটা বড়োসড়ো সিনেমা পুরো উপভোগ করে ফেলি। আমার মনে মালগুডি ডেজ, চাঁদমামায় দেখা জাতকের গল্প ও ছবি, প্রিয় বান্ধবীর অ্যাকসেন্ট, প্রিয় বন্ধুর অর্থপিশাচ হয়ে যাওয়া, তিনটি মহাদেশ ও তার মানুষের ভালোমন্দের ছাপ, দারিদ্র্য, দারিদ্র্যকে ছাপিয়ে উঠে মানুষ হওয়া ও না হতে পারার অসহায়তা, আর এ যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির ডিভিডি সংগ্রহের সমস্ত প্রিয় অপ্রিয় স্বল্পপ্রিয় চরিত্র জট পাকিয়ে যায়। যে দ্বন্দ্ব নিয়ে এই সিনেমা তৈরী, আমি সেই দ্বন্দ্বেরই শিকার হই। সিনেমাটা দেখার পরের আমি সিনেমাটা দেখার আগের আমিই আছি কিনা বুঝতে পারিনা। এর উত্তর জানা অবশ্য ততটা জরুরি কিনা জানিনা। ... ...

সাধারণভাবে আমরা জানি পদার্থের স্ট্যাটাস বা অবস্থা তিন প্রকার। কঠিন তরল এবং বায়বীয়। কিন্তু মানুষের স্ট্যাটাসের সংখ্যা অসংখ্য। এই বিচিত্র দুনিয়ায় বিচিত্র স্ট্যাটাসের উৎপত্তি হচ্ছে প্রতিদিন। ফেসবুকের কল্যাণে সেই স্ট্যটাসগুলো মনের কৃষ্ণগহবর থেকে বেরিয়েআসছে নির্দ্বিধায়। এই ফেসবুক স্ট্যটাস নিয়ে একটি গবেষণা করা যাক। কথায় আছে যার স্ট্যাটাস নাই তার কিছুই নাই। আবার বাংলা ছবির ডায়লগের মত ডায়লগ আছে, চৌধুরী সাহেব আমার ঘর নাই,বাড়ি নাই, কিন্তু স্ট্যাটাস আছে। এখন আপনার মেয়ে বিয়ে দিবেন কি না বলেন? ... ...

"এর পর আমি এক নীল রঙের ইন্ডিকা গাড়ি, নম্বর MH-02-JA-4786, দেখতে পাই রাস্তার ডিভাইডারের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির কাছে পুলিশ কনস্টেবল মহম্মদ সফি দাঁড়িয়ে ছিলেন। জিজ্ঞেস করাতে কনস্টেবল সফি জানান, ওই ইন্ডিকা গাড়ি তিনিই চালিয়ে এনে রেখেছেন। সেই সময় শ্রী এন কে আমিন, শ্রী জে জি পারমার আর কম্যান্ডো পুলিশ কনস্টেবল শ্রী মোহন নানজি মেনত সেখানে উপস্থিত ছিলেন। শ্রী আমিনের গাড়ি ইন্ডিকা গাড়িটার পেছনে রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। এর পরে সাদা রঙের একটা এসইউভি গাড়ি সেখানে আসে এবং রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায়। তখন আমি দেখলাম যে, কনস্টেবল মোতি তালাজা দেসাই একজনকে সেই গাড়ি থেকে বের করল। এই লোকটিকেই কুড়ি দিন আগে গোটা সার্কেল থেকে ধরা হয়েছিল। তখনই আমার মনে হল কিছু একটা গড়বড় হতে চলেছে। ... ...

তখন তিনি পুনশ্চের কবিতাগুলি লিখছিলেন। একটু পরে সম্বিত ফিরে পেলে 'পুকুরধারে' নামে কবিতাটি লেখা হলো। পরদিন শান্তিনিকেতন ফিরে গেলেন। তখন সেখানে বর্ষামঙ্গল উৎসবের আয়োজন চলেছে। কবির এই শোকসংবাদে বিচলিত আশ্রমিকেরা উৎসব বন্ধ রাখার প্রস্তাব করলেন। কিন্তু কবি রাজি হলেন না। নিজেও উৎসবে পূর্ণতঃ অংশগ্রহণ করলেন। মীরাদেবীকে লিখলেন, '' ... নীতুকে খুব ভালোবাসতুম, তাছাড়া তোর কথা ভেবে প্রকান্ড দুঃখ চেপে বসেছিলো বুকের মধ্যে। কিন্তু সর্বলোকের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করতে লজ্জা করে। ক্ষুদ্র হয় যখন সেই শোক, সহজ জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।, .... অনেকে বললে এবারে বর্ষামঙ্গল বন্ধ থাক আমার শোকের খাতিরে। আমি বললুম সে হতেই পারেনা। আমার শোকের দায় আমিই নেবো। ... আমার সব কাজকর্মই আমি সহজভাবে করে গেছি। ...'' ... ...

মৃত্যুরাখালের তো গর্বের শেষ নেই। যে জীবন নিয়ে মানুষের এতো অহমিকা, স্বজন-পরিজন সংসারের তৃপ্ত আবহ, অর্থ-কীর্তি-সচ্ছলতার উত্তুঙ্গ মিনার, তা'কে এক ফুঁয়ে সে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। তার সামনে নত হয়ে থাকে রাজার রাজা, ভিখারির ভিখারি, সম্মান-অসম্মানের ভিতে গড়া অনন্ত নক্ষত্রবীথি, পাবকের পবিত্র অগ্নি থেকে মৃত্যুরাখাল কাউকে রেহাই দেয়না। সে তো ভাবতেই পারেনা একটা রক্তমাংসের মানুষ সদানন্দ হয়ে নিজেকে ঘিরে রেখেছে আনন্দের সমুদ্রে। রাখাল তার নাগাল কখনো পাবেনা। তার কিন্তু চেষ্টার কমতি নেই। সদানন্দের আশি বছরের দীর্ঘ জীবন জুড়ে বারম্বার হননপ্রয়াস চালিয়ে গেছে সে। কিন্তু ঐ সমুদ্রটা কখনও পেরোতে পারেনি। সে হেরে যায় সদানন্দের কছে। জগৎসংসার জানে সে হলো জীবনের শেষ কথা, সদানন্দ বলে সে হলো অনন্ত সম্ভাবনার দ্বার। ... ...

-দুনিয়ার সেরা ইঞ্জিনিয়ারেরা বসে এমন একটা জায়গা বানিয়ে দিতে পারবে? এখানে যে জড়িবুটি হয়, তাই খেয়ে আমাদের বাপদাদা পরদাদারা বেঁচেছে, আমরা বাঁচছি, আমাদের ছেলেপুলে নাতিপুতি বাঁচবে। কিন্তুই খাদান হলে? যা বক্সাইট আছে সেটা তুলে ফেলতে নাকি পঁচিশ বছর লাগবে। তারপরে কী হবে? পঁচিশ বছরের জন্য কশো বছর বন্ধক রাখব আমি? কুমুটি মাঝির গলায় ছিল অনাগত প্রজন্মের ভার। অস্ত সূর্যের আলো এসে পড়েছিল তাঁর মুখে। পায়ের কাছে গর্তগুলো চেয়েছিল অক্ষিবিহীন কোটরের মতো। বনে কোথাও একটা কাঠঠোকরা ঠক ঠক করে শব্দ করছিল। আপাতত ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখতে হবে না কুমুটি মাঝিদের। তবে, "তারপর তারা সুখে শান্তিতে বাস করিতে লাগিল" - রূপকথার এই শেষ লাইন লেখার সময় আসেনি এখনও। নিয়মগিরি পাহাড়ের নীচে লাঞ্জিগড়ে রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার রিফাইনারি, তার জঠরে খিদে, পাহাড়ের গা বেয়ে কনভেয়ার বেল্ট করিডোর পড়ে আছে অজগরের মতো। ... ...

ইতিহাসে তার আগ্রহ নেই। থাকলে সে জানত এই স্টেশন আর এই রেল লাইন ভারতের ইতিহাসের এক বিচিত্র খেলার সাক্ষী। ভারতের আর কোনো রেল স্টেশনের বা লাইনের এমন ইতিহাস নেই। প্রিন্স দ্বারকানাথ কয়লা খনির কয়লা পরিবহণ সমস্যা সমাধান নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বিলেত গেছিলেন। তদ্দিনে রাজমহল আর রায়গঞ্জের অনেকগুলো খনি কেনা হয়ে গিয়েছে তাঁর। ১৮৪২-এ যখন বিলেতে গিয়ে ট্রেনে চড়লেন তখনি মাথায় খেলে গেল সমাধানের সম্ভাবনা। ১৮৪৩-এ কলকাতা ফিরে বানালেন কার এণ্ড টেগোর কোম্পানি। বিলেতে ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনসন বানিয়ে বসেছে ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি। দ্বারকানাথ চাইলেন বর্ধমান ও আসানসোলের জন্য লাইন। বর্ধমান কৃষি ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। অশেষ বাণিজ্য সম্ভাবনা রেলের। দ্বারকানাথ এই লাইনের জন্য এক-তৃতীয়াশ মূলধন সংগ্রহের প্রস্তাবও দিলেন স্টিফেনসনকে। প্রত্যাখ্যাত হয়ে বানালেন গ্রেট ওয়েস্টার্ণ বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি। আবার বিলেত গেলেন অনুমতি পেতে কোম্পানির বোর্ডের। ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কোম্পানির ম্যানেজার স্টিফেনসন আর চেয়ারম্যান লার্পেন্ট বোর্ডে তাদের প্রভাব খাটালো। নেটিভ ম্যানেজমেন্ট-এর হাতে এমন গুরুত্বপূর্ণ লাইন তুলে দেওয়া যায় না এই ছিল তাদের বক্তব্য। দ্বারকানাথের ১৮৪৫-এর এই যাত্রা বিফল হল। দ্বারকানাথের মৃত্যু হল কিছুদিনের মধ্যেই। কার এণ্ড টেগোর উঠল নিলামে। কিছুদিনের মধ্যেই গ্রেট ওয়েস্টার্ণ বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি আর ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কোম্পানি মিশে গেল। গড়ে উঠল ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে’ এবং ১৮৫৫ তে হয়েও গেল বর্ধমান-কলকাতা লাইন। ... ...

হাইকোর্টের রায় বহাল থাকলে এটি অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর পর জামাতের জন্য এটি একটি বড়ো ধরণের চপেটাঘাত। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনও বিএনপি-জামাত-হেফাজত ইশকে মহব্বতি চক্রেই ঘুরপাক খাবে, এটি বলাই বাহুল্য। তবে জামাতিরা চাইবে আরো এক ধাপ এগিয়ে থাকতে। বিএনপি’র ধানের শীষ বা হেফাজতের হাত পাখা নিয়ে নির্বাচন করলেও যেসব আসনে তাদের ভোটে জেতার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত, সেখানে জামাত স্বতন্ত্র প্রার্থীকে জয়ী করানোর মরিয়া চেষ্টা করবে নিজেদের হিম্মত প্রমাণের জন্য। সেক্ষেত্রেও বিএনপি- হেফাজত তাদের ব্যক-আপ হিসেবে থাকতে পারে। অর্থাৎ ছুপা রুস্তমী রাজনীতিতে জামাতের যাত্রা শুরু এখান থেকেই। অবশ্য এরই মধ্যে রাজনীতির খবর ভিন্ন। অদূর ভবিষ্যতে জামাত বাদে নতুন দলের নামে নিবন্ধন আদায়ে এখন থেকেই পেয়ারে পাকি দলটি তোরজোড় শুরু করেছে বলে রাজনীতির বাজারে জোর গুজব রয়েছে। ... ...

যুবকরা যত্রতত্র বাজে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করবেন না। যুবক বয়স হল খাটনির সময়। হাতের মুঠোয় ধরা জলের মতো যৌবনকে গলে যেতে দেবেন না। রাজ্য প্রগতির পথে গড়গড়িয়ে এগোচ্ছে, রথের রশিতে হাত লাগান। ঘাম ঝরান। যুবকরা স্বামী বিবেকানন্দের পথ অবলম্বন করে ফুটবল খেলুন, যুবনেতাদের অনুসরণ করে প্রোমোটারি করুন, মেয়ে দেখলে সিটি দিন, পাড়ার ক্লাবে তাস পেটান, চোর পেলে পিটিয়ে মারুন, যা খুশি করুন। কেবল আলস্য অভ্যাস করবেন না। গপ্পো থেকেই আসে গুজব। গুজবের সঙ্গে অপপ্রচার, আর অপপ্রচার মানেই চক্রান্ত। অলস মস্তিষ্ক হল মাওবাদীদের কারখানা। হীরকরাজ্যে আলস্য ও চক্রান্ত দুইই নিষিদ্ধ। যুবকরা নিজেরা নিজের মূল্য না বুঝে অকারণ রাজনীতি ও চক্রান্তে জড়িয়ে পড়লে তাদের চোখে আঙুল্ দিয়ে বোঝানো হবে। অলস যুবক দেখলেই নাগরিক কমিটি গড়া হবে। শোধরানোর চেষ্টা করা হবে। তাতেও কাজ না হলে থানায় গিয়ে কড়কে দেওয়া হবে। এর নাম বেলঘরিয়া পদ্ধতি। এর হাত থেকে বাঁচতে হলে পাড়ার ক্লাবে নাম লেখান, নাগরিক কমিটির হয়ে মাতব্বরি করুন, বাড়িতে বসে গীতা পাঠ করুন। মোট কথা গঠনমূলক কাজে ঘাম ঝরান, কারণ কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। ... ...

হ্যাঁ, তারা সকলেই নাস্তিক এবং ধর্ম সম্পর্কে তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নিজ নিজ চিন্তা ভাবনা, বিচার বিশ্লেষণ রয়েছে। তারা কেউ খুন করে নি, ডাকাতি করেনি, গাড়ি পোড়ায় নি, মসজিদে আগুন দেয় নি, কোরআন পোড়ায় নি। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের গ্রেফতারের সময় একটি প্রশ্নই করেছিল, "আপনারা কী নাস্তিক?" উত্তরটা হ্যাঁ হবার সাথে সাথেই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। আর এই গ্রেফতার হয়েছিল হেফাজতে ইসলামের চাপের কারণে। অর্থাৎ নাস্তিক হওয়া বাঙলাদেশে একটি অপরাধ বলেই গণ্য হচ্ছে! তাদের ভাল পুরষ্কারই দেয়া হল। ... ...

বইয়ের বাজারে মন্দা লেগেছে কিছুদিন, এবারের হিসেবে তো সারা বাজার যোগ করলে বইয়ের দোকান পুরো একটাও হবে না, বারোআনা হতে পারে। তার মধ্যে নজরে পড়ার ব্যাপার হচ্ছে অনেক ইংরেজী বই-- অবশ্যই প্রায় সবই বাংলা বইয়ের অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ তো আছেই, "শ্রাদ্ধবার্ষিকীতে" দাড়ি মুচড়ে যতোটা উপায় করে নেওয়া যায়, কিন্তু সুনীল গাঙুলী বা শীর্ষেন্দু মুখুজ্জের উপন্যাস, এমন কী "পদিপিসির বর্মিবাক্স"? বাংলা সাহিত্যের এসব অমূল্য সম্পদ কি আমরা আমাদের বাংলাভাষা-অভাষী ছেলেপুলেদের হাতে পৌঁছে দিতে চাইছি? মধ্যে আমরা, আমাদের অভিবাসী সমাজের বেবী বুমাররা (সত্তরের বা তার আগের দশকে যাঁরা এসেছেন) যখন অবসর নেবার কাছাকাছি আসছি তখন কোলকাতার বহুতল বাড়ীর দালালেরা সদলে এসে অনেক ঝাঁপ খুলতেন আর চেঁচামেচি করে খদ্দের ডাকতেন। তা এখন অনেকেই কেনার থেকে বেচার কথা ভাবছেন, কাজেই সে বাজারটি মন্দা, দোকানীরাও অদৃশ্য। দুটি দোকান টিম্টিম্ করছে। তবে নজরে না পড়েই পারে না যেটি সেটি হোলো এক জ্যোতিষীর দোকান, সেখানে জ্যোতিষসম্রাট স্বয়ং দোকান আলো করে বসে আছেন। ইনি বেশ যশস্বী মনে হোলো, এঁর সচিত্র বিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখা যায় কাগজপত্রে, যাঁরা পরশুরামের সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড মনে করতে পারেন, তাঁরা শ্যামানন্দ ব্রহ্মচারীর মূর্তিটি ভেবে নিন। গোড়ায় লোকজন হচ্ছিলো না, বোধ্হয় লোকে ভয়ে দূরে ছিলো, মেলা শেষের কালে দেখি বেশ ভীড়। এইটি যোগ হতেই মেলা একেবার খাঁটি মেলায় দাঁড়ালো। কেন, এদেশী কার্নিভালে স্ফটিক গোলক্ধারিণীদের দেখেননি? যাক, জ্যোতিষী আবার আসুন, বাতের ব্যথাটা চাগাড় দিচ্ছে, একটা পাথর-টাথর ধারণ করার দরকার হয়ে পড়ছে। ... ...

তাহলে কি আমি অপেক্ষা করে থাকব কবে সেনাবাহিনির জওয়ান আমার মেয়েকেই টেনে নিয়ে যাবে, কবে আমারই ছেলেকে পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে (পড়ুন বিনাবিচারে) নাশকতার অভিযোগে খুন হয়ে যেতে হবে, আমারই টাকা লোপাট হয়ে যাবে, আমারই ভাইয়ের আঁকা ছবি কেউ কিছু না বুঝেই সাম্প্রদায়িক লেবেল সেঁটে দেবে বা আমার বোনের লেখাকে ‘উস্কানিমূলক’ বলে প্রচার করে তাকে দেশছাড়া করবে, আমার ভাষাকে, সাহিত্যকে, শিল্পকে প্রান্তিক বলে ঠেলে দেবে......। নাকি যে কোন বিষয় সামনে এলে মতামত দেওয়া এমন কি না দেওয়ার আগেও (মতামত না দেওয়াও একটা মতামত) একটু ভাববো কেন এমন হল! ওদের কথাও একটু মন দিয়ে শুনবো আর নিজেকে ওই ‘ওদের’ জায়গাটায় বসিয়ে দেখব এই ঘটনা আমার সঙ্গে হলে, আমার বাবা-মা-ভাই-বোন-ছেলে-মেয়ে-র সঙ্গে হলে কী করতাম, কী ভাবতাম! এই স্টেপটা সবচেয়ে কঠিন, কেবলই মনে হবে আমার সঙ্গে কক্ষনো এমন হত না, আমার এতসব ভাবার কী দরকার ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু এই স্টেপটা ‘জাম্প’ করে যাওয়া যাবে না। ... ...

সত্যি কথা বলতে কি, এটাই আমার বস্টনে প্রকৃত কামিং আউট। কেন না আগের দুটো ঘটনাকে কামিং আউট না বলে ক্যাচ আউট আর বোল্ড আউট বললে বোধ হয়, ঠিক বলা হয়। কিন্তু ল্যাবের কামিং আউটটা একেবারে স্টেজে দাঁড়িয়ে, মাইক হাতে নিয়ে ঘোষণা। আর তার সঙ্গে একটা মজার ঘটনা জড়িত, সেটা বুদ্ধদেবকে নিয়ে। বুদ্ধদেব আমার ল্যাবের বাঙালি সহকর্মী। আমার থেকে একটু বড়, বিবাহিত, একটি বেশ মিষ্টি দু বছরের ছোট্ট ছেলে রয়েছে। বুদ্ধদেব দেখলাম দারুণ মিশুকে, প্রথম দিনেই আমাকে বাড়ি নিয়ে চলে গেল, তারপর যা হয়, গপ্পো, আড্ডা, কফি। প্রথম দু-একদিন খারাপ লাগে নি, কিন্তু তারপর বুঝলাম, ওর জীবনের ফিলসফি হল, এই দুনিয়ার সব কিছুই খারাপ। কালোরা খারাপ, মুসলিমরা খারাপ, মিডল ইস্ট খারাপ, মেক্সিকানরা খারাপ, ডেমোক্র্যাট খারাপ, ইন্ডিয়া খারাপ তো বটেই, কলকাতা আরো খারাপ। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝলাম, এর সাথে বেশিক্ষণ সময় কাটালে নির্ঘাত ডিপ্রেসড হয়ে যাব। অতএব, বুদ্ধং শরণং থেকে আমাকে পালাতে হবে। কিছুদিন অল্পবিস্তর এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলাম, তাতে দেখলাম ও ভারি দুঃখ পেয়ে গেল। কী করি, কী করি ভাবছি, টুরিং পথ দেখালেন। ... ...

এখন, প্রশ্ন উঠতেই পারে, এফআইআরে যদি নাম আছেই, তা হলে আর তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করার জন্য সিবিআইকে ১৭৯জন সাক্ষীর ব্যবস্থা কেন করতে হল! সিবিআইয়ের বর্তমান চার্জশীটে এই এনকাউন্টারকে আইবি আর গুজরাত পুলিশের যৌথ অপারেশন বলে বিবৃত করা হয়েছে, এবং এতে রাজিন্দর কুমার সমেত চারজন আইবি অফিসারের নামও দেওয়া রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবেই কোনও আইবি অফিসারকেই হত্যার ষড়যন্ত্র, অপহরণ ইত্যাদি সম্ভাব্য কোনও ধারাতেই অভিযুক্ত করা হয় নি। এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডটি ঘটাবার পেছনে এতগুলো পুলিশ অফিসার এবং আইবি অফিসারদের আসল উদ্দেশ্য, বা মোটিভ কী ছিল, এই সম্বন্ধে কোনও কথাই বলা হয় নি। এটাও ব্যাখ্যা করা হয় নি কেন এই চারজনকে তিনটে আলাদা আলাদা জায়গা থেকে তুলে আনা হল আর কেনই বা তাদের আমেদাবাদের একটা রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে মেরে ফেলা হল। চার্জশীটে যা লেখা আছে, তার থেকে অনেক বেশি কিছু লেখা নেই। ... ...

বঙ্গ সম্মেলনের তেত্রিশ বছরের ইতিহাস দেখলে আমাদের এখানকার অভিবাসী জীবন বিবর্তনের একটা চলচ্চিত্র পাওয়া যাবে, যেমন হওয়া উচিত। আমাদের সমাজ বেড়েছে, সমাজের সঙ্গতি বেড়েছে, সম্মেলনও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। গোড়ার দিকের বোল ছিলো আমাদের সংস্কৃতির ধারা এখানে বহমান রাখা, তা সে আমরা নিজেরাই করতাম, দেশ থেকে গুণীদের এনে করবার রেস্ত ছিল না। মধ্যে ধুয়ো উঠলো আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মকে এই সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী করে যেতে হবে। সে ভবীরা এসব ছেঁদো কথায ভোলবার নয়, তারা এ সম্মেলনের ধারে কাছেও ঘেঁষলো না। তবে আমরাও হতাশ হবার পাত্র নয়, আমরা আস্তে আস্তে দেশ থেকে নামকরা শিল্পীদের আনতে আরম্ভ করলাম, প্রথমে রবীন্দ্রসঙ্গীত, তারপর নাটকের দল, আধুনিক গাইয়ে-- তারপর আস্তে আস্তে বাউল, পল্লীগীতি এমনকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতও ঢুকে গেলো কখন ফুড়ুত্ করে। বছর দশেক বা পনেরো আগে থেকে আমাদের সমাজে অনেক নতুন ধরণের মানুষ আসতে শুরু করলেন আর সম্মেলনের আর্থিক ব্যাপারটাতেও বেশ ঘোরতর পরিবর্তন এলো। সেটা কী, তা নিয়ে আরেকদিন আলোচনা করা যাবে, কিন্তু ফলং আমরা ওই দ্বিতীয় প্রজন্ম-টজন্মের ছেঁদো কথা বাদ দিলাম, সম্মেলন হোলো "সন্মেলন" (এই সম্মেলনের ছাপা নির্ঘণ্ট পশ্য) আর সংস্কৃতির ফোকর দিয়ে বলিউডি নাচগানধামাকা ঢুকে গেলো। আমজনতা ভারি খুশি, এবং এই সব মেলার সেইটেই আসল কথা। ... ...

উপদ্রুত এলাকা।ভোট এলেই খুন জখম শুরু হয়ে যায়।কুপিল্যা সমেত কিছু জায়গাতে বোমা তৈরী কুটির শিল্প হিসেবে পরিগণিত হয়।এলাকায় অশিক্ষা,বেকারত্ব প্রবল।তা নিয়ে নেতাদের মাথাব্যথা নেই।রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি মানুষের অন্ধ আনুগত্য আছে।সাগরপাড়া,জলঙ্গী’র দিকে উদ্বাস্তু মানুষের বাস।সেখানে বিজেপি’র ভোট ব্যাঙ্ক বাড়ছে।ইসলামপুর,ডোমকলে জায়গা খুঁজছে সংখ্যালঘু ধর্মভিত্তিক দলগুলো।অবাধে অস্ত্র আমদানি হচ্ছে।প্রশাসন নির্বিকার।পানীয় জলের সমস্যা আছে।আর্সেনিক দূষণ বেড়েই চলেছে।সব আছে,গণতন্ত্রের জয়পতাকা আছে,শুধু মানুষের জন্য ভাবনা নেই। ... ...

গাড়ি থেকে যখন নামানো হল, তখন আমরা সংখ্যায় পরিণত হয়েছিলাম। গরু বাছুরের মত আমাদের বারবার গোনা হচ্ছিল, এরপরে একটা অন্ধকার করিডোরে নিয়ে যাওয়া হল। আমরা চারজন একজনার পিছনে আরেকজন ঢুকছি, আমাদের সামনে পিছনে চারজন কারা প্রহরী। সবার আগে রাসেল ভাই, তারপরে শুভ, তারপরে আমি, সবশেষে বিপ্লব ভাই। আমাদের ১৪ সেলে নিয়ে গেল। ১৪ সেলের দরজা দিয়ে ঢোকার সাথে সাথেই চারদিক থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল, তাদের টিনের বাসন দিয়ে শব্দ করে কান ঝালাপালা আবস্থা। তারা সবাই একসাথে স্লোগান দিতে লাগলো; বলতে লাগলো, "নাস্তিকমুক্ত জেলখানা চাই", "নাস্তিকদের আজই ফাঁসি চাই", "জেলখানায় নাস্তিক, মানি না মানবো না" ... ...