
লোকটা হাত নেড়ে বলে, বাতাস না, বাতাস না—ওসব হল গুহ্য কথা—বুঝলেন কিনা! কানের পাশ দিয়ে ফিসফিস করে বয় আর বলে যায়, সাবধান, সাবধান! লোকটা চোয়াল শক্ত করে বলে, হোমে দুটি ছেলে থাকে না? মাজু আর কেল্টু? হারামির হাড় একটা! এই তো সেদিন এদিকের পরিচিত পাগল, নিত্যকে পিটিয়ে মেরে দিল—কেউ কিছু করল না, জানল না, বুঝল না—মেরে খালের জলে ভাসিয়ে দিল দেহ—গুহ্যকথা, গুহ্যকথা! ... ...

প্রশ্ন করা যাক, এই সংস্কারে কাদের লাভ, কতখানি লাভ। ভারতে এখনও সত্তর শতাংশ বিদ্যুৎই তাপবিদ্যুৎ। সবচেয়ে বেশি কয়লা খরচ হয় তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজেই— ২০১৭-১৮ সালের হিসেব বলছে, ভারতে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৮৯৬.৩৪ মিলিয়ন টন কয়লা, তার মধ্যে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবহৃত হয়েছিল ৫৭৬.১৯ মিলিয়ন টন, অর্থাৎ ৬৪.৩%। কাজেই, কয়লাখনি বিক্রি হলে কাদের লাভ, সেই খোঁজ করতে গেলে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থার খোঁজ না নিয়ে উপায় নেই। ভারতে সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ সংস্থার নাম আদানি পাওয়ার লিমিটেড— মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১২,৪১০ মেগাওয়াট। আছে অনিল অম্বানির রিলায়েন্স পাওয়ার— উৎপাদন ক্ষমতা ছ’হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। সস্তায় কয়লার ব্যবস্থা হলে মন্দ কী? এ ছাড়াও লাভবান হবে টাটা পাওয়ার, জেএসডব্লিউ। প্রসঙ্গত, বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির জন্যও বিবিধ সুবিধার ব্যবস্থা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এটা অনুমান করার জন্য কোনও নম্বর নেই যে দেশের পয়লা নম্বর বিদ্যুৎ সরবরাহ সংস্থার মালিকের নামও গৌতম আদানি। ... ...

টাকলা অফিসার লাঠিটা নাচাতে নাচাতে রামকথা শুনছে। রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছছে। তার মানে বুঝছে। রামের কথকতার তোড় বেড়ে যায়। ও এবার মহল্লার নেতাদের সমান হয়ে উঠছে। ও বোঝাতে থাকেঃ এখন তো লোকতন্ত্রের জমানা। ভোটের সময় নিয়ম করে দলবেঁধে দেশে ফেরে ওরা। সরকার মাই-বাপ, সে তো ওরা জানে পরদাদার কাল থেকে। সত্ত্বাধারীদের সঙ্গে মানিয়ে চলাই ওদের অস্তিত্বের শর্ত। বিনিময়ে সরকার ওদের বিপদে-আপদে শরণ দেবে, এটাই প্রত্যাশা। তাছাড়া ও তো এটাও শুনেছে প্রধানমন্ত্রীও উঁচু জাতির নয়। গরীব চায়েওয়ালা ছিলেন। তপস্যার জোরে উপরে উঠে এসেছেন। তবে ওদের ভোট না পেলে তাঁর তপস্যা সফল হত কি? ... ...

বিরান ঘাটে সেই সময় নজর পড়লো ত্রপার ওপর। বুকের কাছে কয়েকটা বই, একটা লম্বা খাতা জড়ো করে দাড়িয়ে আছে। স্কুল ড্রেস পরণে ছিলো না। তাই অনুমান করা গেলো যে, কলেজ ছাত্রী। একবার ভেবেছিলাম, কথা শুরু করা যাক। কিন্তু সেটা বড্ড বেশী সিনেমাটিক হয়ে যেতো। তাই চুপ করে রইলাম। কথাটা শুরু হলো দূর্ঘটনাচক্রে। দূর্ঘটনা আমিই ঘটলাম। ... ...

সবকিছু শেষ হয়ে আসছে শ্যামলী জানে। সুবিমলের মাথার ভেতরের ঐ আলোআঁধারি জগত একদিন ওকে গিলে নেবে; আর ফিরতে দেবে না এই ক্ষয়াটে শহরের বাস্তবতায়। সুবিমল টের পায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বাসে উঠতে গিয়ে পা টলে যায়। ভুল রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আধঘন্টা পরে বুঝতে পারে ঠিকানা ভুলে গেছে। মাঝে মাঝে মাথার ভেতরটা ছিঁড়ে যায় যন্ত্রণায়। কোনোকিছুতে মন বসাতে পারে না। গভীর রাতে কী যেন অজানা ভয়ে জেগে উঠে শুনতে পায় সারা ঘরময় খুকির খেলনাগুলো, বাঁকুড়ার ঘোড়াগুলি ঠকঠক শব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে একলা হয়ে যাচ্ছে ও। ... ...

শেষটায় খকখক কাশত। দুদিন গায়ে জ্বর ছিল। কোত্থেকে একটা ছেঁড়া কানি খুঁজে মুখে বেঁধে রাখত। ঝুপড়ির বাসিন্দারা সব জেনে গিয়েছে গত তিন হপ্তাভর ঢিভি দেখে দেখে। কেউ কাজে যায় না। সরকার নাকি কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। কাজে বেরোলে মরণ। ঘরে সেই মরণ ঢুকে পড়বে চুপিসাড়ে। সবকে থেকে থেকে কামড়াবে। বুঢ্ঢা সারাদিন সারারাত নর্দমার ওপরে বসে থাকত। গত পরশু ভোরে উল্টে পড়ে শুয়ে ছিল ওখানেই। খাবার নাই। আধপেটা খেতে পেলে ভাগ্যি। এক বাটি খেচড়ি। ব্যস। শরীরে সাড় ছিল না। হাসপাতাল থেকে কিম্ভূত জামা পরা লোকজন এসে তুলে নিয়ে গেছে গাড়িতে। সে গাড়ি দেখবার মতো। চকচকে। কাচ ঢাকা। উঁই উঁই সাইরেন। আহা বুঢ্ঢার গতি হল বটে। ঝুপড়ির অধিবাসীগণ কপালে জোড়াহাত ঠেকিয়ে রাম রাম হরি হরি স্মরণ করেছিল। ... ...

উপন্যাসের ইতিহাস বা সাহিত্যের ইতিহাস মূলতঃ বাস্তব্তা অনুসন্ধানের ইতিহাস; যত সাহিত্য আন্দোলন বা লেখার রকমফের, রিয়ালিজম, ন্যাচারালিজম, সুররিয়ালিজম হয়ে ম্যাজিক রিয়ালিজম সবই শেষ পর্যন্ত যাপিত জীবন আর সমসাময়িকতাকে কীভাবে লেখার মাধ্যমে বইয়ের পাতায় বাস্তব করে তোলা যায় তার ইতিহাস। মনে করি দেবেশ রায়ের সব লেখাই বাস্তবতার ইতিবৃত্ত লেখার চেষ্টা, উপন্যাসের ফর্ম নিয়ে চিন্তাভাবনা সেই জায়গা থেকেই। ... ...

ইরফানের মৃত্যুর পরে বিভিন্ন ভারতীয় পত্র পত্রিকায় তো বটেই, আন্তর্জাতিক খ্যাতির কারনে বিদেশী পত্রিকাতেও তাঁকে নিয়ে লেখাপত্র হয়েছে। সেখানে ইরফান সম্পর্কে এই বিষয়টিতে খুবই বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে যে, তিনি এমন একজন অভিনেতা যাঁর অভিনেতা হওয়ার কথা নয়। এবং তারপরেও তিনি শুধু যে একরকম নতুন স্টারডমের সংস্কৃতিই তৈরী করলেন তাই না, এমন বেশ কিছু ছবিতে খুবই সাবলীলভাবে কাজ করলেন যেখানে তাঁকে কেউ কেউ বিবেচনাই করতে চাইবেন না। এই কথায় সত্যতা আছে। এই কয়েক বছর আগের সাক্ষাৎকারেও ইরফান বলেছেন অভিনয় করতে চাওয়া তাঁর "ইনার কলিং" না, বরং "কাল্টিভেটেড ডিজায়ার"। ... ...

ভারত ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে হরি বাসুদেবনের গবেষণা গোটা পৃথিবীতেই এই সংক্রান্ত বিশিষ্ট কাজের উদাহরণ হিসেবে অত্যন্ত সমাদৃত। মৌলানা আবুল কালাম আজাদের ওপর রুশ বিপ্লব কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিল, তাই নিয়ে ২০১৪ সালে ইন্ডিয়ান হিস্টোরিক্যাল রিভিউতে তাঁর লেখা প্রবন্ধ বেশ আলোড়ন তুলেছিল। রাশিয়ার পাশাপাশি চিন সংক্রান্ত চর্চাতেও তিনি ছিলেন এক বিশিষ্ট পণ্ডিত। ২০১৫ সাল থেকে আমৃত্যু কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিনা সেন্টারের ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। ছিলেন কোলকাতার ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের বর্তমান সভাপতিও। ... ...

এই আপতকালীন সময়ে মানুষের নির্বুদ্ধিতার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। ফেসবুকে এক কবিতা ঘুরছে, কখনো সেই কবিতার নাম শঙ্খচিল, কখনো তার নাম ‘মহামারী’। কখনো তা জীবনানন্দের কবিতা, কখনো তা শঙ্খ ঘোষের, কোভিড-১৯ এর মতো সে মিউটেট করেই যাচ্ছে। প্রতিপাদ্য হলো ‘ আমাদের দেখা হোক মহামারী শেষে...আমাদের দেখা হোক জিতে ফিরে এসে...আমাদের দেখা হোক বীজানু ঘুমালে---ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর কন্যা শ্রাবন্তী ভৌমিক জানালেন, এই কবিতা তাঁর বাবার নয়। বাবার নামে যা ঘুরছে তা কে লিখেছে কেউ জানে না। ঘরে বসে যে যা পারছে করছে। এত ভিডিও, এত কার্টুন, এত সব ভুয়ো সংবাদ আসার বিরাম নেই। সংবাদ ভুয়ো হয় জানি। গুজব রটিয়ে এক এক গোষ্ঠী এক একরকম স্বার্থ সাধন করে। কিন্তু কবিতার গুজব এই জাতিই পারে। ... ...

খোঁজ করা দরকার, কোভিড-১৯ কৃষিক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলল? উৎপাদনের পরিমাণ কমেনি, বরং গত অর্থবর্ষে তুলনায় এই বছর দেশে রবি ফসলের উৎপাদন বেড়েছে আড়াই শতাংশের মতো। খবরে প্রকাশ, এফসিআই-এর গুদামেও প্রয়োজনের তিন গুণ খাদ্যশস্য মজুত আছে। ফলে, কোভিড-১৯’এর ধাক্কায় খাবারের জোগান কমে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। কৃষিক্ষেত্রে সমস্যা অন্য অনেকগুলো। এক, অভিবাসী শ্রমিকরা ঘরে ফিরে যাওয়ায় রবি শস্য তুলতে বিপুল সমস্যা হয়েছে; দুই, নতুন ফসল বোনার সময় যে জিনিসগুলো লাগে, অর্থাৎ বীজ, ট্রাক্টর, চারার ওষুধ— বাজারে কোনওটারই যথেষ্ট জোগান নেই; তিন, লকডাউনের ফলে ফসলকে বাজারজাত করার সমস্যা— চাহিদার সমস্যা; চার, রফতানির বাজার বন্ধ। এমনই অবস্থা যে কিছু দিন আগে পি সাইনাথ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, যে কৃষকরা ক্যাশক্রপ বা পণ্যশস্য উৎপাদন করেন, তাঁরা ঘোর বিপাকের মুখে পড়বেন। ... ...

কোভিড-১৯ মহামারীর সামগ্রিক প্রভাব বুঝতে গেলে, শুধুমাত্র কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, এই রোগের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা, কোভিড-১৯ কেস সনাক্ত করতে পরীক্ষার সংখ্যা- এই সূচকগুলোর ওপর জোর দিলে হবে না। এপিডেমিওলজিক্যাল মডেলগুলোর পূর্বাভাসও একটি অসম্পূর্ণ চিত্রই প্রকাশ করে, কারণ মডেলগুলো বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন বয়েসের এবং পেশার মানুষ- মহিলা ও পুরুষ- কিভাবে সামাজিক ভাবে মেলামেশা করে সেই জটিল ব্যাপারটাকে একত্রিত করতে পারে না কারণ ডেটা নেই। আবার মহামারীটির প্রভাবের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে মডেলগুলো শুধুমাত্র উপরোক্ত সূচকের কথাই বিবেচনা করে- ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এপিডেমিওলজিক্যাল মডেলগুলো বলে যে দু-সপ্তাহ লকডাউনের থেকে চার-সপ্তাহ লকডাউন ভালো, চারের থেকে আট ভালো ইত্যাদি। কিন্তু সার্বিক বিচারে সেটা ঠিক নাও হতে পারে, দেখা যাক আমাদের সার্ভে কি বলে। ... ...

পরিষেবায় যেহেতু কারখানা লাগে না, তার পুঁজির দাবিও কম। অন্য ভাবে বললে, দশ কোটি টাকা লগ্নি করে যত বড় পণ্য উৎপাদনের ব্যবসা ফাঁদা যায়, সেই একই লগ্নিতে পরিষেবার ব্যবসার মাপ অনেক বড় হবে। অর্থাৎ, পণ্য আর পরিষেবার মধ্যে ফারাক মুছে দেওয়ার ফলে পরিষেবা ক্ষেত্রে আরও অনেক বড় ব্যবসা চলে আসবে এমএসএমই-র সংজ্ঞার ভিতরে। গ্রামের অতিক্ষুদ্র শিল্প আর শহরের মাঝারি পরিষেবা উদ্যোগের মধ্যে ঠিক ততটাই ফারাক, ভারত আর ইন্ডিয়ায় যতখানি। নির্মলা সীতারামন আজ জানিয়ে দিলেন, তিনি কোন দলের হয়ে খেলছেন। আসলে শুধু তিনি নন, গোটা সরকারই খেলছে একটা দলের হয়ে। অন্নচিন্তায় দীর্ণ, বেকারত্বের গ্নানিতে ম্লান ভারতের কেউ সেই দলে নেই। ... ...

সেনাপতি লকডাউনে কী করছে? জানতে চাইলে বলে, “বনধের সময় বসে আছি। আমার এমনিতে কোথাও যাওয়া হয়না এখন সকলেই যেতে পারছে না। আমার কষ্টটা ভালো করে সবাই বুঝছে।” সিনাপতির মা আঁচলে চোখ মুছে বলে, “গরিব মানুষ আমরা। গেল মাসে চাষের মাঠে একবার কাজ পেয়েছিলাম। এখন তো কাজের কোনও আশা নেই। মেয়েটার লেখা-পড়া হয়নি। আবার বিয়েও হবে না। পেটে না খেলে তো লোক জানতে পারে না! বিয়ে দিতে না পারলে তো বিপদে পড়ে যাব।” চাল বা আলু কি পেয়েছেন? জিজ্ঞাসা করতেই সিনাপতির মা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে, “কত লোক এল। লিস্ট করে নিয়ে গেল। বলল চাল-ডাল দেবে। কেউ আসেনি। কেউ কিছু দিল না। ... ...

পশ্চিমবঙ্গের করোনা মোকাবিলার হালহকিকৎ নিয়ে অনেক কিছু ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছু হোয়াটস্যাপে, কিছু সংবাদপত্রে। তার সত্যতা যাচাই করার জন্য এই লেখা নয়। এই লেখার উদ্দেশ্য নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া। ... ...

এই লকডাউন ভারতবর্ষ তথা সারা পৃথিবীর অর্থনীতিকে কি সাংঘাতিকভাবে আহত করেছে এবং করে চলেছে, সে সম্পর্কে খবর প্রায়ই পাচ্ছি। কিন্তু যে দেশে প্রতিবন্ধকতা দারিদ্র্যের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলে, যে দেশে প্রতিবন্ধী মানুষদের একটা বড় অংশ অ-সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন, সে দেশের আর্থিক বিপর্যয়ের বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবন্ধী মানুষদের কথা সেভাবে উঠে আসছে কই? ভাতা ও রেশনের চালের কিছু ব্যবস্থা করা হলেও ব্যক্তিগত যোগাযোগের সূত্রে জানতে পারছি যে আমাদের চারপাশের বহু প্রতিবন্ধী মানুষই হয় তার আওতায় পড়েন না, অথবা সেসব ন্যায্য পাওনা এখনও তাঁদের হাত অব্দি এসে পৌঁছয় নি। তবে এইসব বড় কথা থাক। আমার মত সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড়িয়ে প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্যের আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে কথা বলা বা ভারতবর্ষের প্রতিবন্ধী মানুষদের গোটা সমাজের প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা চূড়ান্ত ধৃষ্টতা বই কি! ... ...

ব্যাঙ্কসি কে, বা তাঁকে কেমন দেখতে, তিনি শ্বেতাঙ্গ নাকি তাঁর গাত্রবর্ণ গাঢ় - সেকথা কেউ জানেন না। অথচ, তিনি ভুবনবিখ্যাত। ক্যামেরার সামনে নিজের মুখটিকে অষ্টপ্রহর ভাসিয়ে রাখার এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টার যুগে, তিনি নিজেকে আড়ালে রাখেন - এবং, অনেকে বলেন, এই আড়ালে রাখার সচেতন প্রয়াসই, সম্ভবত, তাঁর বিপণন-কৌশল - আর, সেটাকে যদি কৌশল বলে মেনেই নেন, মেনে নিতেই হয়, সে কৌশল অসম্ভব কার্যকরীও বটে। তিনি পথশিল্পী - রাস্তার ধারের দেওয়ালে তিনি ফুটিয়ে তোলেন নিজের শিল্প - তিনি গ্রাফিত্তি-শিল্পী - এক নিজস্ব ধাঁচের স্টেনসিলে দেওয়ালে আঁকেন সময়ের ধারাভাষ্য। গ্যালারিতে নিয়মিত শো না করেও তিনি বিশ্ববিখ্যাত। ... ...

ইতিহাস বলে, সংকট মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, সমাধানের পথ বাৎলে দেয়। করোনাভাইরাস থমকে দিয়েছে উন্মত্ত পৃথিবীর অর্থহীন দৌড়, হয়ত সাময়িকভাবেই। অভূতপূর্ব এই বিশ্বজোড়া মানুষের এতটা দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা, নিজের ঘরের চৌহদ্দিতে। এই পড়ে-পাওয়া সময় হয়ত প্রকৃতির দান, কিম্বা প্রকৃতির পাঠানো কোনো সংকেত -- অন্তর্দর্শনের ডাক। আরও অনেক বড় বড় সঙ্কটের সূচনায় করোনা হয়ত এক ছোট্ট যতিচিহ্নের মতো। ... ...

ভারত সরকারের কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু ভাইরাসকে পরাজিত করা নয়, একই সাথে চিরদিনের মত ভারতের মুসলমান সমাজকেও আবদ্ধ করা। ব্রাহ্মণ্যবাদের পবিত্র সংক্রমণ এর মুক্ত প্রসারের জন্য এই দুই শয়তানকেই চিরতরে বন্দী করা হিন্দু রাষ্ট্রের চোখে একই রকম প্রয়োজনীয়। সুতরাং অতিমারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালীনই একই সাথে মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ এনে তাদের গ্রেপ্তার করা মোটেই অবাক করার মতো কোন বিষয় নয়। এবং কোভিড-১৯ কে সীমিত রাখার প্রয়াস যত ব্যর্থ হয়েছে, সেই ব্যর্থতার হতাশা ক্রমশই বাড়িয়ে তুলেছে মুসলিম সমাজের প্রতি ঘৃণা এবং দ্বেষ। ভক্তেরা দেখতে চায় রাষ্ট্র তাদের জন্য কতটা ভাবিত - তাদের তা দেখানো রাষ্ট্রের প্রয়োজন। ফর্মুলা খুব সহজ এবং পরিষ্কার - কোভিড-১ যদি না প্রতিহত করতে পারো, মুসলিমদের করো। সে যুদ্ধ করোনা যুদ্ধের চেয়ে সর্ব অর্থেই বেশী লাভজনক। ... ...

দ্বিমেরু বিশ্বে যে ধারণা জনমানসে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলো একটা সময়ে তা হল আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-জাপান এতদিন ধরে (প্রায় ২০০ বছর) সার্বজনীন শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জনস্বাস্থ্য-কাজের অধিকার-খাদ্যের অধিকার-বাসস্থানের অধিকার নিয়ে যে পথে চলে এসেছে তার বিকল্প আরেকটা রাস্তা আছে। এ রাস্তায় কার্টেলের (কর্পোরেটদের পিতৃপুরুষ) বদলে সমবায়ের ভাবনা আছে। এ রাস্তায় ব্যক্তির লাভালাভ একমাত্র বিষয় না হয়ে সমাজ ও সমষ্টির প্রাধান্য আছে। রবীন্দ্রনাথের বলা (যদিও একুশ শতকের পৃথিবীতে তার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক এবং মতদ্বৈধ প্রত্যাশিত) গ্রামসভার কথা, গ্রামের সমূহকে ব্যবহার করে গ্রামে পুকুর খোঁড়া, গ্রামকে পরিচ্ছন্ন রাখা, গ্রামের সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে গ্রামে নেওয়া (প্রসঙ্গত সমধর্মী ধারণা গান্ধীজিরও ছিলো) এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানুষের বোধে জারিত হতে শুরু করেছিলো। ... ...