• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

    Share
  • অতিমারির করোনা - আমাদের অস্তিত্ব, মেডিসিন এবং পুঁজির এক দিকবদল?

    ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্য লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা : বিবিধ | ১১ মে ২০২০ | ৪৪২২ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • করোনা ভাইরাসের বায়োলজি এবং বৈশিষ্ট্য

    ভারত সহ সমগ্র পৃথিবী জুড়ে করোনার মৃত্যুমিছিল চলছে। আমরা অসহায় চোখে চাক্ষুষ করছি। এটা বন্যা, ঝড় বা আগুন লাগার মতো কোন দুর্বিপাক নয় যে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো যাবে। বরঞ্চ উল্টোটা – যে যত দূরত্ব রক্ষা করবে তার নিরাপদ থাকার সম্ভাবনা তত বেশি। আক্ষরিক অর্থেই সোশ্যাল/পার্সোনাল ডিস্ট্যান্সিং! নেচার পত্রিকায় (৭ মে, ২০২০) প্রকাশিত “Profile of a killer virus” গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে – যদি একজন প্রতিবেশির কাশি থেকে ১০টি ভাইরাস পার্টিকল বেরোয় তাহলে আমার গলায় ইনফেকশন হবার সম্ভাবনা আছে। আবার যদি প্রতিবেশি আরও কাছে চলে আসে বা কম দূরত্বে থাকে তাহলে তার কাশিতে বেরনো ১০০টি ভাইরাস পার্টিকল সরাসরি গলা থেকে ফুসুফুসে চলে যাবে (A neighbour’s cough that sends ten viral particles your way might be enough to start an infection in your throat, but the hair-like cilia found there are likely to do their job and clear the invaders. If the neighbour is closer and coughs 100 particles towards you, the virus might be able get all the way down to the lungs)। অর্থাৎ, সোশ্যাল/পার্সোনাল ডিস্ট্যান্সিং-এর বাস্তব ভিত্তি আরেকটু বেশি পরিষ্কার হল। কিন্তু এরপরেই সমস্যার শুরু। কিভাবে গলা বা শ্বাসনালী থেকে কিংবা সরাসরি আক্রান্তের ফুসফুসে এ ভাইরাস পৌঁছয় শুধু সেটুকু নিয়ে ২০০ বছরে প্রাচীন, ঋদ্ধ নেচার পত্রিকা মন্তব্য করছে – it might work its way down to the lungs and debilitate that organ. How it gets down there, whether it moves cell by cell or somehow gets washed down, is not known”। এই হচ্ছে আপাতত করোনাভাইরাস নিয়ে সাম্প্রতিকতম জ্ঞান। এ প্রসঙ্গে করোনা ভাইরাসকে নিয়ে আরও দু-একটা কথা বলে নিই। 

    করোনা ভাইরাস আসলে একটি জেনেটিক “ইন্সট্রাকশন”-কে (যে “ইন্সট্রাকশন” ভাইরাসের নিজের লক্ষ লক্ষ কপি তৈরি করতে পারে) ঘিরে থাকা তৈলাক্ত পর্দা। একটি আরএনএ থ্রেডে মাত্র ৩০,০০০ “letters” (a, c, g and u) দিয়ে তৈরি হয় “ইন্সট্রাকশন”, যেখানে মানুষের জেনোমের ক্ষেত্রে ৩০০ কোটি লেটার থাকে। একটি আক্রান্ত কোষ এই “ইন্সট্রাকশন” পড়ে ফেলে এবং সে নির্দেশ অনুযায়ী অনেক রকমের ভাইরাস প্রোটিন তৈরি হয়। শুরু হয় করোনার খেলা – কোষের ইমিউনিটির প্রতিক্রিয়াকে অবদমন করা থেকে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ তৈরি করা।

    ভাইরাসটির বৈশিষ্ট্য হল এর শরীরের ওপরে এক বিশেষ চরিত্রের “স্পাইক প্রোটিন” থাকে। এই প্রোটিনের সাহায্যে মানুষের কোষের রিসেপ্টরের ওপরে ভালোভাবে গেঁথে গুছিয়ে বসতে পারে। এবং ভাইরাসটি এর নিজের ইচ্ছেমতো কোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে যার ফলে যে যে উপসর্গ মানুষের শরীরে দেখা যায় (জ্বর, শুকনো কাশি, গলা এবং শরীরে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি) সেগুলো তৈরি হয়। সেলুলার অ্যন্ড মলিক্যুলার ইমিউনোলজি জার্নালে প্রকাশিত (৩১.০৩.২০২০) “COVID-19: a new challenge for human beings” গবেষণাপত্র অনুযায়ী করোনাভাইরাস ৮০* সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কয়েকবছর স্টোর করে রাখা যায়। নিষ্ক্রিয় হয় ৫৬* সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। নেচার মেডিসিন পত্রিকায় (১৫.০৪.২০২০) প্রকাশিত “Temporal dynamics in viral shedding and transmissibility of COVID-19” গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে যে একজন রোগীর শরীরে সবচেয়ে বেশি “viral load” দেখা গেছে যখন উপসর্গ শুরু হয়। এ পর্যবেক্ষণ থেকে এদের অভিমত –infectiousness peaked on or before symptom onset। এও আরেক বিপত্তির কথা। উপসর্গ শুরু হবার আগে আক্রান্ত মানুষটি আরও অনেক মানুষকে সংক্রামিত করে ফেললো। আমেরিকার Proceedings of the National Academy of Sciences (৩০.০৩২০২০) “Phylogenetic network analysis of SARS-COV-2 genomes” শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। এতে ভাইরাসটির ১৬০টি জেনোম বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে অ্যামাইনো অ্যাসিডের অবস্থানের ভিন্নতার জন্য A, B এবং C টাইপে এদের ভাগ করা যায়। A এবং C টাইপ দেখা যাচ্ছে ইউরোপ এবং আমেরিকাতে। B টাইপ চিন এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এর এপিডেমিওলজিকাল ফলাফল নির্ধারিত হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।



    (করোনা ভাইরাসের জেনোম)


    চিনে প্রথম আক্রান্তের শরীরে যে জেনোম পাওয়া গিয়েছিল পরবর্তী আক্রান্তের শরীরে ১৮৬তম স্থানে u letter-এর পরিবর্তে c হয়ে যায়। এভাবে মিউটেশন ঘটে। ইউরোপ এবং আমেরিকায় গিয়ে এ মিউটেশন নতুন নতুন করে হয়, এমনকি একজন মানুষের শরীরে প্রবেশের পরেও মিউটেশন ঘটতে থাকে। শ্বাসনালী থেকে ফুসফুসে পৌঁছনোর পথেও মিউটেশন ঘটে। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর (৬.০৫২০২০) “New Coronavirus Spread Swiftly Around World From Late 2019, Study Finds” প্রতিবেদন অনুযায়ী ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জেনেটিক্স ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন – “almost 200 recurrent genetic mutations of the new coronavirus - SARS-CoV-2 - which the UCL researchers said showed how it is adapting to its human hosts as it spreads”। এর সাথে এটাও মন্তব্য করা হয়েছে – “All the evidence is entirely consistent with an origin towards the end of last year, and there's no reason to question that in any way”। ট্রাম্প কথিত হাস্যকর চিনা-ভাইরাস কল্পকাহিনীর সারবত্তা বিনাশ করার পথে এটি সাম্প্রতিক্তম সংযোজন – প্রথম গবেষণাপত্র বেরিয়েছিল নেচার পত্রিকায় প্রায় দু’মাস আগে “The proximal origin of SARS-CoV-2” শিরোনামে (১৭.০৩.২০২০)। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জেনেটিক্স ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এটাও লক্ষ্য করেছেন তাঁরা যে করোনা ভাইরাস জেনোম নিয়ে কাজ করেছেন সেখানে প্রায় ২০০টি জেনেটিক পরিবর্তন বা মিউটেশন দেখা গেছে।

    একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র জানাচ্ছে মোট ১১টি বিভিন্ন ধরন রয়েছে এই ভাইরাসের – O, A2, A2a, A3, B, B1  ইত্যাদি। এর মধ্যে A2a ধরনটি মানব শরীরের ফুসফুসের কোষে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দক্ষ এবং দ্রুত ছড়ায়। 

    একইসাথে রোগের উপসর্গও পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আন্তর্জাতিক মান্য সংস্থা CDC এবং WHO জ্বর, কাশি এবং শ্বাসকষ্টকে অধিক গুরত্ব দিয়ে দেখছিল। পরে CDC একে সংশোধন করে আরও কয়েকটি উপসর্গকে যুক্ত করে – (১) কাঁপুনি দিয়ে ঠাণ্ডা লাগা, (২) মাঝেমাঝেই কাঁপুনি এবং শীত করা, (৩) মাথাব্যথা, (৪) ঘ্রাণের অনুভূতি হারিয়ে ফেলা, (৫) মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়া, (৬) গলা ব্যথা এবং গলা খুসখুস বা বসে যাওয়া। কিন্তু গত সপ্তাহ দুয়েক বা তার কিছু বেশি সময় ধরে এমন কিছু নতুন উপসর্গ বিজ্ঞানীরা দেখছেন যা চিন্তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়ে ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে স্ট্রোক বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে (২৮.০৪,২০২০) প্রকাশিত হয়েছে “Large-Vessel Stroke as a Presenting Feature of Covid-19 in the Young” শীর্ষক গবেষণাপত্র। এতে বলা হচ্ছে যে অতিমারির সময়ে হাসপাতালে যাবার অনীহা এদের মৃত্যুকে ত্বরাণ্বিত করেছে – Social distancing, isolation, and reluctance to present to the hospital may contribute to poor outcomes. Two patients in our series delayed calling an ambulance because they were concerned about going to a hospital during the pandemic. নিউ ইংল্যান্ডেই (৮.০৫.২০২০) আরেকটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছে - Collateral Effect of Covid-19 on Stroke Evaluation in the United States। সেজন্য এখন রক্তজমাট বাঁধার ওষুধ বা ব্লাড থিনার এখন চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। জার্নাল অব আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির প্রাক-প্রকাশ একটি গবেষণাপত্রের শিরোনাম “Association of Treatment Dose Anticoagulation with In-Hospital Survival Among Hospitalized Patients with COVID-19”। অ্যানালস অব ইন্টার্নাল মেডিসিনে (৬.0৫.২০২০) প্রকাশিত গবেষণাপত্র “Autopsy Findings and Venous Thromboembolism in Patients With COVID-19: A Prospective Cohort Study” থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে – “The high incidence of thromboembolic events suggests an important role of COVID-19–induced coagulopathy.”

    এছাড়াও পেট খারাপ বা ডায়ারিয়া আরেকটি নজর করার মতো উপসর্গ হিসেবে দেখা দিচ্ছে, এমনকি কিছু কিছু মানসিক উপসর্গও। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানকে ধন্দে ফেলার মতো উপসর্গ হল রক্তের এ ভাইরাস হিমোগ্লোবিনেকে ভেঙ্গে দেয়, রক্ত আর অক্সিজেন বহন করতে পারেনা – কিন্তু রোগী শ্বাসকষ্টের উপসর্গের কথা বলেনা। এছাড়া রয়েছে দুটি মারাত্মক পরিণতি – (১) cytokine storm – যখন শরীরে সমগ্র ইমিউন সিস্টেম ঝড়ের মতো আচরণ করে এবং শরীর একে সামলাতে পারেনা, এবং (২) fulminant myocarditis – আমাদের হার্ট আ্র স্বাভবিক আচরণ  করতে পারেনা এবং ফেইল করে যাকে সামলানো প্রায় দুঃসাধ্য। মোট কথা হল মাত্র ৫ মাসের মধ্যে একের পরে এক নিত্যনতুন উপসর্গ এবং প্যাথোফিজিওলজির পরিবর্তন আমাদের হদিশে আসছে। আমরা আরেকবার বুঝতে পারছি যে ভাইরাসটি সম্বন্ধে আমরা এখনো খুব সামান্য জানি – আমাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের ধারণা সত্ত্বেও। 

    যাহোক, অন্য প্রসঙ্গে যাই। 

    worrldometer-এর নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী (১০.০৫.২০২০ অবধি) পৃথিবীতে মোট আক্রান্ত – ৪,১২৬,৭৬৩৯; মৃত – ২৮০,৯৭৪। এর মধ্যে কেবলমাত্র আমেরিকায় মৃত – ৮০,০৪৪ (ভিয়েতনাম যুদ্ধে সরকারিভাবে মৃতের চেয়ে বেশি), আক্রান্ত ১,৩৪৭,৪১১। ইংল্যান্ডে মৃত – ৩১,৫৮৭, আক্রান্ত – ২১৫,২৬০। ভারতে মৃত – ২,১০৯, আক্রান্ত – ৬২,৯৩৯। এবং অদূর ভবিষ্যতে এ মৃত্যুমিছিল জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করবে এমন কোন লক্ষণ আমাদের দৃষ্টিপথে নেই। আজকের করোনা সংক্রমণ, সমাজতত্ত্বের বিচারে, ভীষণভাবে দৃশ্যমান এবং বোধ্য (visible and discernible)। এর সাথে মাথায় রাখতে হবে মাত্র ৪ মাসের মধ্যে পৃথিবীর ২০০-র বেশি দেশে ছড়িয়েছে এবং একদিকে, পৃথিবী জুড়ে এত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু (যদিও এ ভাইরাসের যে পরিমাণ সংক্রমণ ক্ষমতা মৃত্যুহার ততটা নয়, কিন্তু পরিস্থিতি সাপেক্ষে মৃত্যুহারও অনেক সময়েই যথেষ্ট বেশি) আর, অন্যদিকে, এ ভাইরাসের চরিত্রের বেশিরভাগ অংশই বিজ্ঞানীদের এবং চিকিৎসকদের কাছে অজানা হবার জন্য নিত্যনতুন উপসর্গ নিয়ে ভাইরাস সংক্রমণ। উপসর্গ দেখার পরে আমরা খানিকটা অনুমান ও ব্যাখ্যা করতে পারছি। সর্বোপরি, এর কোন চিকিৎসা নেই। যদিও এ বছরে আমেরিকার ভোটের বাজারে ট্রাম্প স্বভাবসিদ্ধভাবে ধূর্ত অথচ অর্ধশিক্ষিত ব্যবসায়ীর মতো হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এবং অ্যজিথ্রোমাইসিনকে “game changers” বা খেলা ঘুরিয়ে দেবার মতো ওষুধ বলে হুল্লোড়ের জন্ম দিয়েছিলেন সমস্ত নির্ভরযোগ্য জার্নালের ট্রায়াল রিপোর্ট একে হার্টের পক্ষে ক্ষতিকারক এবং ব্যবহার না করার পক্ষে একবাক্যে রায় দেবার পরে আর কোন উচ্চবাচ্য করেন নি। ভারতেও হুল্লোড় স্তিমিত হয়েছে। আরেকটি নতুন ওষুধ – রেমডেসিভির যা একটি কৃত্রিম নিউক্লিওসাইড এবং করোনাভাইরাসের পলিমারেজ চেইন তৈরিকে আটকে দিয়ে কাজ করে – নিয়ে ভারি শোরগোল  পড়েছে। এটা নিয়ে পরে কথা বলছি। তার আগে আরও কয়েকটি প্রয়োজনীয় কথা বলে নিই। 

    worrldometer-এর তথ্য অনুযায়ী (১০.০৫.২০২০) প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যায় করোনা সংক্রমণ বোঝার জন্য টেস্টের সংখ্যা ১৮টি দেশে পরপর এরকম – আমেরিকাঃ ২৬,৯৪৩; ইংল্যান্ডঃ ২৫,৪৬১; ইটালিঃ ৪১,৫৮৪; জার্মানিঃ ৩২,৮৯১; ফ্রান্সঃ ২১,২১৩; ডেনমার্কঃ ৫৪,৮৭৩; ইরানঃ ৬,৯৮৫; নিউজিল্যান্ডঃ ৩৯,৪৬৮; অস্ট্রেলিয়াঃ ৩২,৪৬৬; ভিয়েতনামঃ ২,৬৮১; থাইল্যান্ডঃ ৩,২৬৪; সিঙ্গাপুরঃ ৩০,০১৬; দক্ষিণ কোরিয়াঃ ১২,৯৪৯; ইজরায়েলঃ ৫২,৫৯৮; পাকিস্তানঃ ১,২৮৪, শ্রী লঙ্কাঃ ১,৬৫০; ভারতঃ ১,১৬৬; এবং বাংলাদেশঃ ৭৪৫। এ পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার হবে কতসংখ্যক মানুষের টেস্ট করা হয়েছে, আর কি বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মতো জনঘনত্বের দেশে “সুপ্ত সংক্রামক” হিসেবে লুকিয়ে থাকবে। পরিণতিতে, লকডাউন পরবর্তী সময়ে আমাদের হয়তো সবচেয়ে খারাপ সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখানে গল্পকথার কোন স্থান নেই, কঠোর পরিসংখ্যান যা দেখাচ্ছে আমরা সেটুকুই বিচার করবো। 

    এখন বিশেষ করে যে বিষয়টি চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীদের ভাবাচ্ছে তা হল উপসর্গহীন pre-symptomatic এবং asymptomatic আক্রান্তের সংখ্যা এবং বিশিষ্টতা। এদের রোগের উপসর্গ নেই, অথচ ক্রমাগত ভাইরাসটি ছড়িয়ে যাচ্ছে সবার মাঝে – যারাই এর সংস্পর্শে আসবে সবার মাঝে। দু-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জার্নালের গবেষণাপত্র থেকে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যায়। নেচার মেডিসিন (১৫.০৪.২০২০)-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র “Temporal dynamics in viral shedding and transmissibility of COVID-19” থেকে জানা যায় – “We observed the highest viral load in throat swabs at the time of symptom onset, and inferred that infectiousness peaked on or before symptom onset. We estimated that 44% (95% confidence interval, 25–69%) of secondary cases were infected during the index cases’ presymptomatic stage, in settings with substantial household clustering, active case finding and quarantine outside the home. Disease control measures should be adjusted to account for probable substantial presymptomatic transmission.” অর্থাৎ, এই পেপার অনুযায়ী ৪৪% পর্যন্ত বা তার বেশি প্রি-সিম্পটোম্যাটিক বাহক হতে পারে। নেচার-এ প্রকাশিত (২০.০৩.২০২০) আরেকটি গবেষণাপত্র “Covert coronavirus infections could be seeding new outbreaks”-তে বলা হচ্ছে – As coronavirus outbreaks surge worldwide, research teams are racing to understand a crucial epidemiological puzzle — what proportion of infected people have mild or no symptoms and might be passing the virus on to others. Some of the first detailed estimates of these covert cases suggest that they could represent some 60% of all infections. এখানকার হিসেবে সুপ্ত সংক্রামকের সংখ্যা ৬০% অবধি হওয়া সম্ভব। আরও সাম্প্রতিক সময়ে নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে প্রকাশিত (২৭.০৪২০২০) “Asymptomatic Transmission, the Achilles’ Heel of Current Strategies to Control Covid-19” সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে – “Quantitative SARS-CoV-2 viral loads were similarly high in the four symptom groups (residents with typical symptoms, those with atypical symptoms, those who were presymptomatic, and those who remained asymptomatic). It is notable that 17 of 24 specimens (71%) from presymptomatic persons had viable virus by culture 1 to 6 days before the development of symptoms. Finally, the mortality from Covid-19 in this facility was high; of 57 residents who tested positive, 15 (26%) died.” অস্যার্থ, বিভিন্ন গ্রুপের এবং চরিত্রের যে প্রাক-উপসর্গ বা উপসর্গহীন রোগীদের পাওয়া যাচ্ছে তাদের সংখ্যা ৭১% পর্যন্ত হতে পারে এবং মৃত্যুহার ২৬%-এর মতো বিপজ্জনক স্তরে থাকতে পারে। 

    মোদ্দা কথা হল, যদি টেস্ট কম হয় তাহলে এরা সামাজিকভাবে সুপ্ত থাকবে এবং লকডাউন উঠে গেলে সংক্রমণের চেহারা কি হবে (যেহেতু নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো testing, contact tracing, isolation and treatment যথেষ্ট পরিমাণে করা যায়নি বিভিন্ন কারণে) তা অনুমানের বাইরে।

      এখানে আমাদের ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার কিভাবে সংক্রমণ ছড়ায়? ভাইরাসের প্রজনন সংখ্যা (রিপ্রোডাকশন নাম্বার) দিয়ে এর গতিপ্রকৃতি এবং সংক্রামিত করার ক্ষমতা মাপা হয়। একে বলা হয় R0 – যা দিয়ে বোঝা যায় একজন সংক্রমিত মানুষ ক’জনের মাঝে এই ভাইরাসকে পৌঁছে দিতে পারে। সংক্রমণের সময় সাধারণভাবে এ সংখ্যা ২-২.৫ বা ৩। চিনের য়ুহানে একসময়ে এটা ৪ অব্দি পৌঁছেছিল। এখন এ সংখ্যা ০.৩২-এ এসে পৌঁছেছে। এপিডেমিওলোজির ভাষায় সংখ্যাটি ১-এর নীচে গেলে সংক্রমণমুক্ত বলা যেতে পারে। এখানে আরো পরিষ্কার করে বলা দরকার – এপিডেমিওলোজির ভাষায় সংখ্যাটি ১-এর নীচে গেলে সংক্রমণমুক্ত বলা যেতে পারে না। আমাদের বুঝতে হবে সংখ্যাটি ১ এর নিচে গেলে সংক্রমণ হয়ে মহামারীর আকার ধারণ করার ক্ষমতা আর থাকে না।  ১ এর নিচে গেলে নতুন সংক্রমণের সম্ভাবনা কমে যায়, নতুন ক্লাস্টার হবার সম্ভাবনা কমে যায়। একে সঠিক অর্থে সংক্রমণ মুক্ত বলা যায় না। Effective Reproduction Number 0.30 মানে আগে যদি R = 2 হয়ে থাকে  যেখানে একজন মানুষ দুজনকে সংক্রমণ করছিলো (R = 2 ), এখন উল্টোটা, তিনজন সংক্রমিত ও আক্রান্ত লোক লাগবে একজনকে রোগ ধরাতে গেলে, অর্থাৎ, খুব বড়  ক্লাস্টার ছাড়া আর রোগ টিকবে না। সংক্রমণমুক্ত ঠিক নয়। ক্লাস্টারগুলো খুলে গেলে আবার ছোট বড়  মহামারী হতে পারে, যেমনটা চিনে কিংবা সিঙ্গাপুরে হচ্ছে।  ঠিক এখানেই বিপদ কম পরিমাণে টেস্ট বা কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং হলে আমরা কার্যত “আগ্নেয়গিরি শিখরে পিকনিক” করছি। ভারতের জনঘনত্ব এবং জনতার আর্থ-সামাজিক বিপুল বৈষম্য বেশি পরিমাণ টেস্ট বা কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং-এর ক্ষেত্রে বাস্তবিক অসুবিধের কোন সন্দেহ নেই। সাধারণ মানুষ –রাস্ট্র-শ্রেণী বৈষম্য এরকম সংকটের সময়ে নজরে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সাধারণ মানুষের তরফে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনেতাদের ওপরে ট্রাস্ট বা বিশ্বাস। এবং এই বিশ্বাসের ভিত্তি হয় সরকারের তরফে স্বচ্ছতাকে নিশ্চিত করা। ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডের মতো দেশে এটা বিশেষভাবে কাজ করেছে। আমাদের এখানে কর্মহীন, ভিটেছাড়া, স্থানান্তরী (migratory-র বাংলা “পরিযায়ী” শব্দটিতে আমি অস্বস্তি বোধ করি। মানুষ আর পাখীকে এক করে দেখতে চাইছিনা।) অসংগঠিত শ্রমিকদের কয়েক’শ মাইল অবধি খিধে-মোচড়ানো পেটে শিশুকে কাঁধে নিয়ে অন্তহীন হেঁটে চলা। আশ্রয় দেবার জন্য সরকার বা রাষ্ট্র নেই। অত্যন্ত নিদারুণভাবে ট্রেনে কাটা পরে ১৬ জন বা তার বেশি শ্রমিক মারা যাবার পরে এ নিরাপত্তাহীনতা আরো বেশি করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। দেখিয়ে দিল রাষ্ট্রের তরফে এদের জন্য চরম ঔদাসিন্য এবং এ “অব”-মানুষগুলোর রাষ্ট্রের প্রতি ট্রাস্ট না থাকা। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের সদ্য অবসর নেওয়া বিচারপতি বিচারক দীপক গুপ্ত এই মানুষগুলোর ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের ঔদাসিন্যের যে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন তা খুব শ্লাঘার বিষয় নয়। কি হয়নি এই স্থানান্তরী অসংগঠিত শ্রমিক এবং এদের পরিবারের ওপরে? কয়েক’শ মাইল রাস্তা হেঁটেছে, কোন খাদ্যের কিংবা যানবাহনের ব্যবস্থা সরকারের তরফে করা হয়নি (অসরকারি বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন সময়ে তাদের সাধ্যমতো খাদ্যের জোগান দিয়েছে), পুলিশের লাঠিচার্জ হয়েছে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে স্রেফ মরে গেছে, স্যানিটাইজার দিয়ে রাষ্ট্রের তরফে “পরিশুদ্ধ” করে নেওয়া হয়েছে, খোলা আকাশের নীচে রোদে পুড়েছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে। আর কত মনোরম সংবর্ধনা ভাবা সম্ভব সাধারণ মেধা নিয়ে জন্মানো একজন মানুষের পক্ষে? 

    আমেরিকাতেও ভিন্নভাবে, অন্য চরিত্রের, কিন্তু সমধর্মী সমস্যা আছে। আমেরিকার তথ্য হাতে আছে বলে সহজে কথা বলা যায়। পরপর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার শিরোনাম উল্লেখ করি। টাইম পত্রিকায় (৭.০৫.২০২০) একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম – “No Income. Major Medical Bills. What Life Is Like for Millions of Americans Facing Financial Ruin Because of the Pandemic”। সায়ান্স ডেইলি-র শিরোনাম – “COVID-19 has unmasked significant health disparities in the U.S.”। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর (২৯.০৪.২০২০) এর একটি প্রতিবেদন – ‘A Terrible Price’: Deadly Racial Disparities of Covid-19। একই সংবাদপত্রের ৭.০৫.২০২০ তারিখের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম – “For Latinos and Covid-19, Doctors are Seeing an ‘Alarming’ Disparity”। ওয়াশিংটন পোস্টেও সমধর্মী লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। নিউজ উইক-এ (৭.০৪.২০২০) প্রকাশিত প্রবন্ধ – “Coronavirus Disease Discriminates. Our Health Care Doesn’t Have To”। আমাদের এখানে এভাবে স্বাস্থ্য ও সামাজিক অসাম্য নিয়ে এ পরিমাণ লেখা এখনো চোখে পড়েনা।

     এবার মান্য মেডিক্যাল জার্নালগুলোতে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় এবং গবেষণাপত্রগুলো নজর করি। ল্যান্সেট-এ (১৮.০৪.২০২০) প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনের শিরোনাম – “COVID-19 exacerbating inequalities in the US”। লেখাটিতে মন্তব্য করা হয়েছে – “the pre-existing racial and health inequalities already present in US society are being exacerbated by the pandemic.” অর্থাৎ, আমেরিকার সমাজে আগে থেকেই স্বাস্থ্য এবং জাতের (race) ক্ষত্রে যে বৈষম্য তাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। এমনকি এ মন্তব্যও করা হয়েছে যে অতিমারি অতিক্রম করলে – “what is needed afterward is a renewed focus to ensure that health is not a byproduct of privilege.” অর্থাৎ, স্বাস্থ্য রাষ্ট্রের দেওয়া কোন প্রিভিলেজ বা সুযোগ নয়। এর পরের বাক্যটিইই হবার কথা ছিল – স্বাস্থ্য আমার অধিকার! ঠিক একই কথা প্রযোজ্য মানুষ হিসেবে সম্মান, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান হারানো স্থানান্তরী অসংগঠিত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। এদেরকে আমরা দয়া করছিনা। ট্যাক্সদাতা নাগরিক হিসবে সুষম সংস্থান পাওয়া এদের অধিকার। JAMA (Journal of American Medical Association)-র শিরোনাম (১৫.০৪.২০২০) – “COVID-19 and African Americans”। এখানে বলা হচ্ছে – “Low socioeconomic status alone is a risk factor for total mortality independent of any other risk factors.”


    নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে (৬.০৫.২০২০) প্রকাশিত “Racial Health Disparities and Covid-19 — Caution and Context” প্রবন্ধে এ সমস্যাকে আরও গভীরভাবে সামাজিক প্রেক্ষিত থেকে দেখা হয়েছে। প্রবন্ধের বক্তব্য – “Racial disparities have become central in the national conversation about Covid-19.” বলা হয়েছে কোভিড-১৯-জনিত যে বৈষম্য এখন প্রকট হচ্ছে তাকে বাস্তব জগতে  আর্থ-সামাজিক এবং কাজের সুযোগের বৈষম্যের ফলে তৈরি হওয়া সম্পদহীনতার প্রেক্ষিতে দেখতে হবে। সর্বোপরি, “unemployment, food insecurity and unstable or substandard housing conditions may further perpetuate disparities in health outcomes for people infected by the coronavirus, most specifically among low-income communities of color.” আমদের এখানকার মতোই ওখানেও খাদ্যের অনিশ্চয়তা, বাসস্থানের নিম্নমান এবং মজুরির বৈষম্য বিষময় ফল দিচ্ছে। করোনার অভিঘাতে নগ্ন হয়ে যাচ্ছে আপাত জৌলুষ। 


    রোগের “শ্রেণীবীভাজন”

    WHO-এর হিসেব অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৯০ লক্ষ থেকে ১.১ কোটি মানুষ টিবি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। বছরে ১২ লক্ষ অর্থাৎ মাসে ১ লক্ষ মানুষ মারা যায় এই রোগে। এর সাথে যোগ করতে হবে এইচআইভি-আক্রান্ত রোগীদের টিবিতে মারা যাবার সংখ্যা ২,৫১,০০০।

    ২০১৮-তে ২ কোটি ২৮ লক্ষ মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ৪,০৫,০০০ জন মারা যায়। অথচ আমরা জানি ম্যালেরিয়া নির্মূল প্রোগ্রাম বিপুল উদ্যমে শুরু হয়ে দানবীয় বহুজাতিক কোম্পানির ডিডিটি বিক্রী হয়েছে কয়েক হাজার বা লক্ষ কোটি টাকার। ডিডিটি-র ব্যাপক ব্যবহার প্রকৃতি-জীব জগৎ-মানুষের ভারসাম্য বিনষ্ট করেছে, বসন্ত ঋতুকে স্তব্ধ করে দিয়েছে (র‍্যাচেল কারসনের সাড়া জাগানো পুস্তক Silent Spring দ্রষ্টব্য)। ৫ বছরের কম বয়সের শিশুরা ম্যালেরিয়ায় সবচেয়ে আক্রান্ত হয় এবং ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর ৬৭% শিশু মৃত্যু। এর মধ্যে সাদা মানুষদের বোঝা কালো ও হতদরিদ্র আফ্রিকা অঞ্চলে পৃথিবীর মোট ম্যালেরিয়া সংক্রমণের ৯৩% ঘটে, মৃত্যু ঘটে ৯৪% আক্রান্তের।

    ৫ বছরের কমবয়সী ৫,২৫,০০০ শিশু প্রতিবছর ডায়ারিয়ার মতো রোগে মারা যায়। প্রায় ২০০ বছর হয়ে গেল শুধুমাত্র পরিশুদ্ধ পানীয় জলের পরিচ্ছন্ন সরবরাহ করে ডায়ারিয়ার মতো অসুখ প্রথম বিশ্ব থেকে বিদায় নিয়েছে। কেবলমাত্র নিরাপদ ও সংক্রমণ-মুক্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন ও হাইজিনের ব্যবস্থা করে এ রোগ ঠেকানো সম্ভব। সমগ্র বিশ্বে শিশুদের ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হবার সংখ্যা ১৭০ কোটি।

    কিন্তু এ রোগগুলো ক্রনিক এবং দারিদ্র্যের অসুখ। ক্যান্সারের মতো “disease of modernity” নয় (সিদ্ধার্থ মুখার্জির Emperor of All Maladies দ্রষ্টব্য) কিংবা হার্টের বা স্থুলতার মতো হাই-টেক, আকাশছোঁয়া মুনাফা দেবার মতো রোগতো একেবারেই নয়। এজন্য এ অসুখগুলো সাধারণভাবে invisible and indiscernible – দৃশ্যমানতা এবং বোধগম্যতার বাইরে। এদের চিকিৎসার ভাষায় একটা নামই হয়ে গেছে “tropical neglected diseases”।

    কিন্তু এসব সত্ত্বেও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এবং এ রোগগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রথমত, রোগের ছড়িয়ে পড়ার দ্রুততা, সংক্রমণের ক্ষমতা এবং ব্যাপ্তি। ৫ মাসের মধ্যে ২০০-র বেশি দেশে এরা ছড়ায়নি। দ্বিতীয়ত, উপরের সবকটা রোগেরই চিকিৎসা আছে, করোনার চিকিৎসা নেই। রাষ্ট্রিক অবহেলা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙ্গেচুড়ে দিয়ে কর্পোরেট পুঁজি নিয়ন্ত্রিত রোগ-কেন্দ্রিক (ভার্টিকাল প্রোগ্রাম) পাঁচতারা হাসপাতাল যেখানে উচ্চমূল্যে হাই-টেক স্বাস্থ্য পরিষেবা (স্বাস্থ্য নয়) বিক্রী করার সমস্ত ব্যবস্থা করার ফলে এ রোগগুলো লক্ষ কোটি মানুষের প্রাণ নিয়ে নেয় প্রতিবছর। তৃতীয়ত, ইংরেজিতে বললে এই ভাইরাসের আক্রমণ বিশ্বজুড়ে যে violence of uncertainty – অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগজনিত যে স্ট্রেস তৈরি করেছে তা একেবারে অভাবিতপূর্ব, অভূতপূর্ব। এ রোগ একইসাথে অবদমিত আতঙ্ক (suppressed panic) এবং প্রবল মৃত্যুভয়ের আশঙ্কা (anticipatory dread) তৈরি করেছে।

    এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি কথা বলে নেওয়া যায়। এই ভাইরাসের সংক্রমণ পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক মানচিত্রে সম্ভবত কিছু সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনতে চলেছে।

    প্রথম, সোভিয়েত শক্তির পতনের পরে একমেরু বিশ্বের অধীশ্বর হবার যে দর্প এবং ঔদ্ধত্য আমেরিকা এতদিন দেখিয়েছে সেখানে বোধহয় একটু চিড় ধরেছে। এমনকি ইয়ুভাল হারারির মতো রাষ্ট্রপন্থী লেখক তথা ইতিহাসকারও তাঁর টাইম পত্রিকায় প্রকাশিত (১৫.০৩.২০২০) প্রবন্ধের শিরোনাম লিখছেন – In the Battle Against Coronavirus, Humanity Lacks Leadership. এর কদিন বাদেই (২০.০৩.২০২০) ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় আরেকটি বহু আলোচিত প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল – The World After Coronavirus. এখানে তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানালেন – In previous global crises – such as the 2008 financial crisis and the 2014 Ebola epidemic – the US assumed the role of global leader. But the current US administration has abdicated the job of leader. সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিবও একই কথা বলেছেন – বর্তমান সংকটের সময়ে বিশ্বনেতৃত্বের শূণ্যতা, অভাব।

    দ্বিতীয়, বিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রের মধ্যে এমন নিবিড় ও নির্লজ্জ সখ্য (যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ছাড়া) যেখানে আন্তর্জাতিক স্তরে বিজ্ঞানীরা বরণ করে নিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতাদের এমনটা খুব সুলভ ঘটনা ছিলনা। অতি ধুরন্ধর ব্যবসায়ী এবং রাজনীতির পাকা খেলোয়ার ট্রাম্পের হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে হৈচৈ বাঁধানো “game changer” বলে এবং পত্রপাঠ FDA এবং NIH (National Institute of Health)-এর মতো মান্য, স্বশাসিত সংস্থার পত্রপাঠ একে অনুমোদন দিয়ে ট্রায়াল শুরু করে দেওয়ার চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কি আছে? স্বাস্থ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, শ্রেণীবৈষম্য, মেডিক্যাল-ইন্ডাস্ট্রিয়াল-স্টেট-পলিটিক্স কমপ্লেক্স – সবকিছু একসাথে জুড়ে গেল

    ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬১ সালে আমেরিকার ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার তাঁর বিদায়ী ভাষণে দেশবাসীকে সতর্ক করেছিলেন “military-industrial complex”-এর ব্যাপারে। মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রির জোট এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে এরা ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করবে। ২৩ অক্টোবর, ১৯৮০-তে তৎকালীন নিউ ইংল্যান্ড জার্নালের সম্পাদক আর্নল্ড রেলম্যান ঐ পত্রিকায় একটি বিশেষ নিবন্ধ লিখলেন “The New Medical-Industrial Complex” শিরোনামে। এখন আমরা নতুন করে দেখছি state-medicine-politics-industrial complex। আমরা রেলম্যানের প্রবন্ধ লেখার বছরটি খেয়াল করবো। ১৯৭৮-এ আলোমা-আটায় গৃহীত comprehensive primary health care-এর ধারণা ১৯৭৯ সালে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে selective primary health care দিয়ে। জোরদার হয়ে উঠছে “New Medical-Industrial Complex”-এর সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী উপস্থিতি। এ বিষয়ে আমি গুরুচণ্ডালীর পাতাতেই এর আগে আলোচনা করেছি। আর এখনতো আরও একধাপ এগিয়ে state-medicine-politics-industrial complex-এর যুগ শুরু হল।

    করোনা ভাইরাসের আক্রমণ চিকিৎসার অভিমুখকে আবার অনিবার্যভাবে ওষুধ, ভ্যাক্সিন এবং হাই-টেক চিকিৎসা (ভেন্টিলেটর, ECMO, মনোক্লোনাল অ্যন্টিবডি, ইন্টারফেরন ইত্যাদি) অর্থাৎ রোগ-কেন্দ্রিক ভার্টিকাল প্রোগ্রামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তে selective primary care-কে চালকের আসনে বসানোর বাস্তব বৌদ্ধিক ও ব্যবহারিক জমি তৈরি করছে। এই অর্থে করোনা ভাইরাস বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক জলবিভাজিকা হয়ে উঠবে হয়তো।

    সায়ান্স জার্নাল-এর সম্পাদকীয়তে (৮.০৫.২০২০) এরকম এক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে শুধুমাত্র কিছু ব্যবহারিক ওষুধ তৈরির পরিবর্তে আমাদের গবেষণার অভিমুখ হওয়া উচিৎ - asking “why” questions (for example, basic research into the pathophysiology of the disease) and not simply from “shovel ready” drug development projects. আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ হল – COVID-19 presents the world with a brutal choice between economic and public health. পৃথিবীর আগামী যাত্রাপথে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবলমাত্র একটি অধরা আশা হয়ে পড়ে থাকবে হয়তো আমাদের সবার কাছে। 

    তৃতীয়, চিন যাতে কোনভাবেই বিশ্বের সামরিক এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বে ভাগ বসাতে না পারে সেজন্যও করোনা ভাইরাস একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

    এবং, চতুর্থ, এই ভাইরাসের উৎস যে কর্পোরেট পুঁজির মুনাফা এবং প্রকৃতির উপরে প্রভুত্বের উদগ্র লালসা যেখানে মানুষ থেকে জীবজগৎ, বনাঞ্চল থেকে প্রতিটি প্রাকৃতিক সম্ভার কেবলমাত্র পণ্য হিসেবে গণ্য হয় – এ সত্যকে আড়াল করার হাতিয়ারও বর্তমান সময়ের এই ভাইরাস। ২০০২-৩-এ সার্স-কোভ-১-এর অতিমারির পরে ২০০৯ সালে Predict Project বলে একটি প্রোজেক্ট তৈরি করা হয় প্রাণী জগৎ থেকে কি পরিমাণ নতুন ভাইরাস মানুষের দেহে এবং বসবাসের অঞ্চলে প্রবেশ করছে সেটা দেখার জন্য। মানুষ-প্রকৃতি-জীব জগৎ এই স্বাভাবিক ভারসাম্য অপূরণীয়ভাবে ভেঙ্গে যাবার ফলাফল হচ্ছে এই ভাইরাসদের মনুষ্য জগতে প্রবেশ। কিন্তু লস এঞ্জেলস টাইমস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী (২.০৪.২০২০) এই প্রোজেক্ট ট্রাম্প প্রশাসন বন্ধ করে দেয় – Trump administration ended pandemic early-warning programs to detect coronaviruses। য়ুহানে করোনার ভয়াবহতা শুরু হবার মুখে “the Trump administration ended a $200-million pandemic early-warning program aimed at training scientists in China and other countries to detect and respond to such a threat.” বন্ধ করে দেবার আগে USAID-এর সাহায্যপুষ্ট এই প্রোগ্রাম ১,২০০ বিভিন্ন ভাইরাসকে চিহ্নিত করে যার মধ্যে ১৬০টি নোভেল করোনাভাইরাস ছিল। য়ুহান সহ পৃথিবীর ৬০টি ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী এবং টেকনিশিয়ানদের ট্রেইনিং দেওয়াও শুরু করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন “শিব ঠাকুরের আপন দেশে / আইন কানুন সর্বনেশে”-র মতো কলমের এক আঁচড়ে এরকম একটি মূল্যবান প্রোজেক্ট বন্ধ করে দিল। বিজ্ঞানের ক্ষতি হল, ক্ষতি হল মানুষের।

    ২০১৪ সালে কয়েকজন গবেষক EcoHealth জার্নালে (২৩.০৫.২০১৪) এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন “Anthropogenic Land Use Change and Infectious Diseases: A Review of the Evidence” শিরোনামে। এখানে দেখানো হয়েছে – “Land use change has the potential to impact disease dynamics directly and indirectly by changing the abundance, demography, behavior, movement, immune response, and contact between host species and vectors, as well as altering host community composition.” জমির ব্যবহারে পরিবর্তন (ল্যান্ড ইউজ চেঞ্জ) কারা করলো? কি উদ্দেশ্যে? যে উদ্দেশ্যে (খনিজ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্পদের জন্য) ব্রাজিলের রেন ফরেস্টের ২৫% পুড়িয়ে দেওয়া হয় সে উদ্দেশ্যে। প্রকৃতির উপরে প্রভুত্ব এবং পুঁজির প্রয়োজনে যথেচ্ছ ব্যবহারের বিষময় ফল আমরা ভোগ করছি। নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে প্রকাশিত (২.০৪.২০২০) “Escaping Pandora’s Box — Another Novel Coronavirus” প্রবন্ধে স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে – We have reached this point because of continuing increases in the human population, crowding, human movement, environmental alteration, and ecosystemic complexity related to human activities and creations. 

    প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় বিশযুদ্ধেরও আগের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার মুখে ১৯১৭ সালে এক নতুন ধরনের দেশ তৈরি হল – রাজনৈতিক চরিত্রে, অর্থনৈতিক পরিচালনায়, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে, নারীর মানুষ হিসেবে উন্মেষে, এবং, সর্বোপরি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জনস্বাস্থ্য-গণবন্টন ব্যবস্থায়। বিশ্বে এই নতুন জায়মান দেশের পরিচিতি ছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্র হিসেবে। কিন্তু আমাদের আলোচনায় শুধু এটুকু বুঝতে চাইবো – Another World is Possible. হ্যাঁ, অন্য এক পৃথিবীর স্বপ্নসম্ভব জীবনের মহাকাব্য রচনা হচ্ছিল মানুষের স্বপ্নে, বুদ্ধিজৈবিক সৃষ্টিতে। এসব ইতিহাস আমরা সবাই জানি – কেউ মানি, কেউ মানিনা। এরপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে হিটলারের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত হবার পরে আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-জাপানের অর্থনৈতিক মডেলের বাইরে, সাংস্কৃতিক চেতনার বাইরে যে আরেকভাবে পৃথিবীকে দেখা যায়, পৃথিবীতে বিচরণ করা সম্ভব সেটা মূর্ত হয়ে উঠলো। ১৯৪৯-এ আরেকটি বিশাল দেশ চিন একই ধরনের রাজনৈতিক পরিচালনা, একই ধরনের মতাদর্শগত বিশ্বাস নিয়ে মুক্ত হল। আরেকবার এক গভীর প্রত্যয় সমাজের উচ্চকোটি বুদ্ধিজীবী সমাজ থেকে মধ্যবিত্ত, গ্রামের চাষাভুসো মানুষ থেকে কারখানার মজুর সবার মাঝে উপ্ত হল, সামাজিক বাস্তব হল – Another World is Possible. অর্থাৎ, বিশ্ব তখন আজকের মতো একমেরু নয়। সেদিন পৃথিবীতে ছিল দ্বিমেরু বিশ্বের শক্তিময় উপস্থিতি। আর এর ফলে বিশ্বের দুর্বল দেশগুলোর দর কষাকষি করার ক্ষমতা বেশি ছিল।

    স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা গেল - এক বড়ো সংখ্যক দেশে নীতি হিসেবে গৃহীত হল কমিউনিটি-কেন্দ্রিক বা horizontal programs। এর বিপরীতে ইন্সিউরেন্স কোম্পানি এবং কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে প্রয়োজন রোগ-কেন্দ্রিক বা vertical programs। করোনা অতিমারি আজ একমেরু বিশ্বে দানবীয় ফার্মা কোম্পানি এবং নিওলিবারাল পুঁজির বাহক রাষ্ট্রগুলোর সামনে নতুন করে রোগ-কেন্দ্রিক বা vertical programs-কে একমাত্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রোগ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বাস্তবায়িত করার সুবর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে। মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্য চুলোয় যাক। চাই আইসিইউ আর ভেন্টিলেটর। পরবর্তীতে এই হাই-টেক চিকিৎসার ধরন আরও বেশি জনগ্রাহ্যতা অর্জন করার সম্ভাবনা রইলো। স্বাস্থ্য-র সংজ্ঞা রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে (আরও বেশি করে যাবে) বহুমুল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবাতে। সাধারণ মানুষের কাছে দুটোই একরম মনে হবে – ম্যাকডোনাল্ড বা কেএফসি-র মতো।

    দ্বিমেরু বিশ্বে যে ধারণা জনমানসে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলো একটা সময়ে তা হল আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-জাপান এতদিন ধরে (প্রায় ২০০ বছর) সার্বজনীন শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জনস্বাস্থ্য-কাজের অধিকার-খাদ্যের অধিকার-বাসস্থানের অধিকার নিয়ে যে পথে চলে এসেছে তার বিকল্প আরেকটা রাস্তা আছে। এ রাস্তায় কার্টেলের (কর্পোরেটদের পিতৃপুরুষ) বদলে সমবায়ের ভাবনা আছে। এ রাস্তায় ব্যক্তির লাভালাভ একমাত্র বিষয় না হয়ে সমাজ ও সমষ্টির প্রাধান্য আছে। রবীন্দ্রনাথের বলা (যদিও একুশ শতকের পৃথিবীতে তার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক এবং মতদ্বৈধ প্রত্যাশিত) গ্রামসভার কথা, গ্রামের সমূহকে ব্যবহার করে গ্রামে পুকুর খোঁড়া, গ্রামকে পরিচ্ছন্ন রাখা, গ্রামের সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে গ্রামে নেওয়া (প্রসঙ্গত সমধর্মী ধারণা গান্ধীজিরও ছিলো) এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানুষের বোধে জারিত হতে শুরু করেছিলো। অন্য একটা প্রসঙ্গও যারা ভাবনাচিন্তা করে তাদের চিন্তায় এল – জনস্বাস্থ্যের (পাবলিক হেলথ) এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের (ক্লিনিক্যাল হেলথ) মধ্যেকার সম্পর্ক কি হবে? কিভাবেই বা এ’দুয়ের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও টানাপোড়েন মেটানো হবে? স্থানীয় উদ্যোগকে কিভাবে সংগঠিত করা হবে? রাষ্ট্রের পরিকল্পনার সাথে একে সম্পর্কযুক্ত করা হবে কি পদ্ধতিতে? আমরা চিকিৎসক-চিকিৎসাকর্মী এবং চিকিৎসাপ্রার্থী সাধারণ মানুষ যদি রাষ্ট্রের শেখানো, কর্পোরেটদের বোঝানো আর পুঁজি-অনুগামী মিডিয়া উৎপাদিত তথ্যকেই (জ্ঞানও কি?) একমাত্র ও অভ্রান্ত বলে ধরে না নিই তাহলে আমাদের বড়ো প্রিয়, আমাদের একান্ত আশ্রয় এই পৃথিবীতে অন্য কি কি সম্ভাবনা খুলেছিল সেগুলো আমাদের আরেকবার বুঝে নেওয়া দরকার – Overton window-র বাইরে এসে।

    এ ব্যাপারে উন্নত পুঁজিবাদী তথা সাম্রাজ্যগর্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ড সবচেয়ে বেশি সমাজবদ্ধতা দেখিয়েছিল। আমেরিকান পরিভাষায় “সমাজতান্ত্রিক” কাঠামো চালু করেছিল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এড্যুইন চ্যাডুইক, জন স্নো এবং সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের সক্রিয় অংশগ্রহণে ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডে পরিচ্ছন্ন পানীয় জলের সরবরাহ কলেরা প্রতিরোধ এবং সাধারণ জলবাহিত অসুখের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। এরপরের ইতিহাস এখন আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য খুব প্রয়োজনীয় নয়। শুধু এটুকু উল্লেখ করি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই ইংল্যান্ডে National Health Service (NHS) তৈরি হল। উল্লেখ করার মতো হল ১৯৪৮-এর জুন মাসে প্রতিটি বাড়িতে একটি লিফলেট বিলি করা হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল – It will provide you with all medical, dental and nursing care. Everyone- rich and poor, man, woman or child – can use it or any part of it. There are no charges, except for a few special items. There are no insurance qualifications. But it is not a “charity”. You are all paying for it, mainly as tax payers, will relieve your money worries in time of illness.

    করোনাকে যুঝবার হাতিয়ার

    কি আছে আমাদের হাতে? ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা (যেমন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা), মুখে মাস্ক ব্যবহার করা, পারস্পরিক দূরত্ব রক্ষা করে চলা এবং হাঁচি-কাশির “এটিকেট” রক্ষা করা। এর মধ্যে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট কাপড়ের তৈরি ফেস মাস্ক ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করছে। জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এ “Pharmacologic Treatments for Coronavirus Disease 2019 (COVID-19) - A Review” (১৩.০৪.২০২০) গবেষণাপত্রে বলা হচ্ছে – “Currently, there is no evidence from randomized clinical trials (RCTs) that any potential therapy improves outcomes in patients with either suspected or confirmed COVID-19. There are no clinical trial data supporting any prophylactic therapy. More than 300 active clinical treatment trials are underway.” 

    MedicalXpress-এ প্রকাশিত (১৮.০৪.২০২০) রিপোর্ট অনুযায়ী ভাইরাস সংক্রমণের চূড়ান্ত অবস্থায় cytokine storm বলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়  তাতে শরীরের ইমিউন সিস্টেম পূর্ণত এলোপাথারি আচরণ করতে শুরু করে এবং রোগীর মৃত্যু হয়। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা এক ধরনের বিশেষ প্রোটিন তৈরির চেষ্টা করছেন যেগুলি সাইটোকাইনের সাথে জোড় বেঁধে cytokine storm হওয়া আটকে দেবে। এটাও আরেকটা আশার কথা। এছাড়াও আরও অনেকধরনের ওষুধ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে “antiviral medication lopinavir–ritonavir, interferon-1β, the RNA polymerase inhibitor remdesivir, chloroquine, and a variety of traditional Chinese medicine products.” 

    এ মুহূর্তে যে অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি হৈচৈ হচ্ছে তার নাম রেমডেসিভির – সবার জানা। আর করোনা ভ্যাক্সিন নিয়ে বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা তুঙ্গে। এছাড়াও সংক্রমণমুক্ত রোগীদের রক্তের প্লাজমা দিয়ে চিকিৎসার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ট্রায়ালও হচ্ছে।

    রেমডেসিভির নিয়ে প্রথম নির্ভরযোগ্য ট্রায়াল প্রকাশিত হয়েছিল নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে (১০.০৪.২০২০) “Compassionate Use of Remdesivir for Patients with Severe Covid-19” শিরোনামে। এরপরে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র বেরোয় ল্যান্সেটে (২৯.০৪.২০২০) “Remdesivir in adults with severe COVID-19: a randomized, double-blind, placebo-controlled, multicentre trial” শিরোনামে। লক্ষ্য করার বিষয় এ ট্রায়ালটি “randomized, double-blind, placebo-controlled, multicentre” চরিত্রের – যেমনটা সঠিক বৈজ্ঞানিক ট্রায়ালের ক্ষেত্রে হবার কথা। স্বাভাবিকভাবেই রেমডেসিভির-এর বর্তমান আবিষ্কর্তা Gilead Sciences কোম্পানি এবং NIH এই ওষুধের ট্রায়াল দিয়েছে। কিন্তু এদের ট্রায়ালগুলো open-label, double-blind নয়। ফলে বিজ্ঞানের বিচারে বিশ্বাসযোগ্যতা কম। ল্যান্সেটের গবেষণার মূল বক্তব্য ছিল – In this study of adult patients admitted to hospital for severe COVID-19, remdesivir was not associated with statistically significant clinical benefits. However, the numerical reduction in time to clinical improvement in those treated earlier requires confirmation in larger studies. হাসপাতালে থাকার সময় ১৫ দিনের পরিবর্তে ১১ দিন হয়েছে। এই ৪ দিনের হিসেবকে (৩১%) কতটা উল্লেখযোগ্য বলা যাবে তা বিবেচনার বিষয়। তবে এই ওষুধ Veklury (remdesivir) আবিষ্কারের ঘোষণার পরের দিন (৩০.০৪.২০২০) Gilead-এর শেয়ারের মূল্য ৮.১% বেড়ে যায়। 

    এর মধ্যেই ওষুধটি আমেরিকার হাসপাতালগুলোতে এবং জাপানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু Gilead-এর নিজের ওয়েবসাইটে (৭.০৫.২০২০) জানানো হচ্ছে – Due to the current public health emergency, the U.S. Food and Drug Administration (FDA) has issued an Emergency Use Authorization for remdesivir for the treatment of COVID-19. In the United States, remdesivir is an investigational drug that has not been approved by the FDA for any use, and the safety and efficacy of remdesivir for the treatment of COVID-19 has not been established. The distribution of remdesivir in the United States has been authorized only for the treatment of hospitalized patients with severe COVID-19 ... Remdesivir is not yet licensed or approved outside of Japan and ongoing clinical trials continue to evaluate its safety and efficacy. মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। 

    Gilead-এর পূর্বতন ইতিহাস খুব উজ্জ্বল নয়। ২০০৫-এ অ্যান্টিফ্লু ড্রাগ ট্যামিফ্লু (জেনেরিক নাম – ওসেল্টামিভির) নিয়ে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে (BMJ) বিস্তর লেখালেখি হয়েছিল। এ ওষুধটি কয়েক বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছিল। কিন্তু ওসেল্টামিভির-এর সমর্থনে যে তথ্যগুলো দিয়েছিল সেগুলো সবই কোম্পানির দেওয়া তথ্য – “eight of the 10 randomised controlled trials on which effectiveness claims were based were never published, the evidence could not be relied on. Also, the two published studies were funded by Roche and authored by Roche employees and external experts paid by Roche (“Tamiflu: the battle for secret drug data” – 29.10.2012, BMJ). ওসেল্টামিভির আবিষ্কার করেছিল Gilead, Roche-কে বিপণনের দায়িত্ব দেয়। BMJ-তে পরবর্তী সময়ে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল – The missing data that cost $20bn (10.04.2014)। অর্থাৎ, উপযুক্ত ট্রায়াল ছাড়াই একটি ওষুধ ২০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে নিয়েছিল। এজন রেমডেসিভিরের ক্ষেত্রেও সাধু সাবধান!

    রেমডেসিভির ট্রাম্পের America First নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে (১.০৫.২০২০) একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম – Remdesivir Affirms the American Way. এনপিআর (npr) নিউজ এজেন্সি-তে প্রকাশিত খবর (২.০৫.২০২) – Gilead Lobbying Rose As Interest in COVID-19 Treatment Climbed। এই প্রতিবেদনে বলা হল যে Gilead আমেরিকান কংগ্রেসের সাথে লবি করার জন্য ২০২০-র প্রথম তিন মাসে সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে – The pharmaceutical company spent $2.45 million on lobbying in the first three months of the year, a 32% increase over the $1.86 million it spent in the first quarter of 2019. এর প্রত্যক্ষ্য ফল হল এপ্রিলের শেষে রেমডেসিভিরের বাজারে আসা এবং আমেরিকার হাসপাতালগুলোতে ব্যবহারের অনুমোদন।

    POGO (Project on Government Oversight)-তে দু কিস্তিতে FDA নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথমটি – FDA Depends on Industry Funding; Money Comes with “Strings Attached” (১.১২.২০১৬) এবং দ্বিতীয়টি – DRUG MONEY: In FDA Meetings, ‘Voice’ of the Patient Often Funded by Drug Companies। মোদ্দা বিষয় হল, FDA-এর মাঝেও যে বিভিন্ন ধরনের স্বার্থ কাজ করে এবং দানবীয় ফার্মা কোম্পানিরা বিভিন্ন গাইডলাইনকে নির্ধারণ করে সে বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের গোচরের বাইরে রয়ে যায়।


    ভ্যাক্সিন

    ভ্যাক্সিনের গবেষণা ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে নেচারে “The Race for Coronavirus Vaccine” (৩০.০৪.২০২০) শিরোনামে। বলা হচ্ছে – More than 90 vaccines are being developed against SARS-CoV-2 by research teams in companies and universities across the world – পৃথিবীতে ৯০টির বেশি ওষুধ কোম্পানি এবং বিশ্ববিদ্যালয় সার্স-কোভ-২ ভ্যাক্সিন তৈরির দৌড়ে রয়েছে। “At least six groups have already begun injecting formulations into volunteers in safety trials; others have started testing in animals – অন্তত ৬টি গ্রুপ মানুষের ওপরে এবং অন্যরা প্রাণীদেহে পরীক্ষা শুরু করেছে। কতভাবে ভ্যাক্সিনের বিভিন্ন পদ্ধতি ভাবা হচ্ছে তার একটা রূপরেখা নেচার-এর এই চিত্র থেকে পাওয়া যাবে। 


    এখন যে মাইক্রোনিডল অ্যারে (MRA) ভ্যাক্সিন নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা হচ্ছে, চর্চা হচ্ছে তার একটা রূপরেখা নেচারের ছবি থেকে পাওয়া যায়। 



    নেচার-এর আরেকটি রিপোর্ট (৩০.০৪.২০২০) “COVID-19 vaccines: breaking record times to first-in-human trials” বলছে – “The twenty-first century has come with a new era in vaccinology, in which recombinant genetic technology has contributed to setting an unprecedented fast pace in vaccine development, clearly demonstrated during the recent COVID-19 pandemic.” হ্যাঁ, এটাই বাস্তব। নেচারে প্রকাশিত এই গ্রাফটি এটা বুঝতে সাহায্য করবে।



    ভ্যাক্সিন নিয়ে পরীক্ষা শুরুর একেবারে গোড়ার দিকে নেচারে (১৮.০৩.২০২০) “Coronavirus vaccines: five key questions as trials begin” প্রবন্ধে মৌলিক কতগুলো প্রশ্ন রাখা হয়েছিল ভ্যাক্সিন ট্রায়াল নিয়ে – (১) মানুষের কি ইমিউনিটি তৈরি হয়? (এখানে বলার যে WHO পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে কোন “ইমিউনিটি পাসপোর্ট” নেই। একবার আক্রান্ত হলে একজন ব্যক্তি যে আবার আক্রান্ত হবেনা এরকম কোন নিশ্চয়তা নেই।) (২) যদি ইমিউনিটি তৈরি হয় তাহলে সেটা কতদিন অব্দি থাকবে? (উপরের প্রশ্নে এর উত্তর আছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় সেরে ওঠার পরে আবার সংক্রমিত হবার ঘটনা দেখা যাচ্ছে।) (৩) যারা ভ্যাক্সিন তৈরি করছে তারা কি ধরনের ইমিউন প্রতিক্রিয়া আশা করে? (৪) আমরা কি করে জানবো যে একটি ভ্যাক্সিন ঠিকভাবে কাজ করবে? (৫)ভ্যাক্সিনটি কি নিরাপদ হবে? এ প্রশ্নগুলো মাথায় রেখে ভ্যাক্সিন তৈরির কাজ চলছে।

    বিভিন্ন দেশের মডেল – আমাদের সামনে উদাহরণ

    এ মুহূর্তে অন্তত ৩টি দেশকে আমাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে রাখতে পারি – (১) নিউজিল্যান্ড, যেখানে গত কয়েকদিনে আর কোন মৃত্যুর খবর নেই, (২) ভিয়েতনাম, যেখানে করোনা সংক্রমণে একটিও মৃত্যু ঘটেনি, এবং (৩) অস্ট্রেলিয়া, যেখানে নতুন কোন মৃত্যু এবং সংক্রমণের খবর নেই।

    নিউজিল্যান্ড – নিউজিল্যান্ড মেডিক্যাল জার্নালের সম্পাদকীয়তে (৩.০৪.২০২০) লেখা হয়েছিল – “A poorly controlled pandemic will greatly increase health inequalities.” এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্বাস্থ্যের বৈষম্যকে ঠেকানোর জন্য অতিমারিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ শিক্ষা আমাদের দেশে নিলে আমজনতা এবং স্থানান্তরী শ্রমিকেরা উপকৃত হবে, দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। এ লক্ষ্যে কাজ করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল – “we will ned to make maximum use of many science disciplines and technologies we have available to inform and guide our response in innovative way.” এর আগে ২০.০৩.২০২০-তে ওদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য মন্ত্রকের জন্য একটি প্রস্তাব তৈরি করেছিলেন –  Potential Preventive Interventions for the “Stamp it out” and “Manage It” Phase of the Covid-19 Pandemic in New Zealand: Commissioned Report for the New Zealand Ministry of Health। এ রিপোর্টে ৩১টি প্রিভেন্টিভ হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল। দুটি বিষয়ে প্রাথমিকভাবে জোর দেওয়া হয়েছিল – “stamp it out” and “manage it”। শেষ অবধি নিউজিল্যান্ড সফল হয়েছে। বিবিসি নিউজে (২০.০৪.২০২০) বলা হল বিজ্ঞান এবং সহমর্মিতার যৌগপদ্যে এবং মেলবন্ধনে নিউজিল্যান্ড সাফল্য পেয়েছে। এদের কর্মসূচীর মধ্যে ছিল “health before economy”। আমরা কি শিক্ষা নেবো?

    ভিয়েতনাম – গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত (১.০৫.২০২০) একটি খবর কৌতুহলদ্দীপক - Aggressive testing and pop songs: how Vietnam contained the coronavirus। এ খবরে রয়টার্স সংবাদ সংস্থাকে উদ্ধৃত করে বলা হল এখনো অবধি ভিয়েতনামে একটি সংক্রমণের ক্ষেত্রে ৮০০ জনের টেস্ট করা হয়েছে। ২৪ জানুয়ারিতে ওদেশে যখন ২টি মাত্র কেস পাওয়া গেছে তখনই সরকার একে আটকানোর জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেয় যার মধ্যে একটি ছিল আন্তর্জাতিক উড়ান বন্ধ। সেসময় হু-ও এ নির্দেশিকা দেয়নি। ৪টি পর্যায়ে এরা টেস্টিং এবং কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করেছে। নিশ্চিত করোনা এবং এর সংস্পর্শে থাকা মানুষ – লেভেল ১ – হাসপাতালে আইসোলেশন এবং চিকিৎসা। লেভেল ১-এর সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ – লেভেল ২ – কোয়ারেন্টাইন। লেভেল ২-র সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ – লেভেল ৩ – বাড়িতে কোয়ারেন্টাইন। যেখানে রোগী থাকে সে অঞ্চলে লকডাউন – লেভেল ৪। রাষ্ট্রের তরফে সমগ্র প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা দেখানো হয়েছে, রাষ্ট্র অর্জন করেছে নাগরিকের ট্রাস্ট বা বিশ্বাস/আস্থা। পরিণতিতে ভিয়েতনামের চিনের সাথে ১১০০ কিমি ল্যান্ড বর্ডার থাকলেও মৃত্যু শূণ্য (০)।

    অস্ট্রেলিয়া – অস্ট্রেলিয়ার সরকারের স্বাস্থ্যদপ্তরের তরফে ৮.০৫.২০২০-তে একটি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে জুলাইয়ের মধ্যে স্কুল কলেজ এবং অন্যান্য কাজকর্ম স্বাভাবিক করে তোলা হবে কারণ এখন প্রতিদিন ২০টির কম মৃত্যুর খবর আছে। তিনটি ধাপে এ কাজগুলো করা হবে। “In the first stage, restaurants and cafes will be allowed to reopen, but with a maximum of 10 customers at a time. Schools and playgrounds will also reopen.” এরপরে দ্বিতীয় ধাপে “f no major outbreaks are recorded, Australia will move to the second phase. Gyms, cinemas and galleries will reopen, but with only 20 customers at a time.” এবং তৃতীয় ধাপে “Stage three will allow gatherings of up to 100 people, and see workers return to their offices.  Travel within Australia will resume, along with some limited international travel, including flights between Australia and New Zealand.” কিভাবে সম্ভব হল এগুলো? “Australia has tested widely for the disease, closed its international borders and imposed strict social distancing protocols to curb its spread. “ অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী গ্রেগ হান্ট বলেছেন – “Great hand hygiene and cough etiquette will need to keep going, because we won't have a vaccine. So, whilst some restrictions may be lifted, the way we behave has to stay the same.”

    এখানে উল্লেখ করার হু যেমনটা বলেছিল আমাদের কোন “ইমিউনিটি পাসপোর্ট” নেই সেটাই দেখা যাচ্ছে সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ায়। সেরে ওঠা সংক্রমিতরা আবার সংক্রামিত হচ্ছে।


    আমরা কোথায়?

    হয়তো কতকগুলো চিরস্থায়ী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে সামাজিক জগতে, চিকিৎসার দুনিয়ায় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিদ্যমান অবস্থায়। 

    পার্সোনাল/সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং এরপরে জীবনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হবে। সমাজবদ্ধ জীবন হয়তো ভেঙ্গে যাবে। 

    রোগী দেখার ক্ষেত্রে টেলিমেডিসিন প্রাধান্যকারী জায়গায় যাবার সম্ভাবনা আছে। রোগীকে স্পর্শ করে স্টেথোস্কোপ দিয়ে দেখা হয়তো কম প্রাধান্য পাবে।

    একইসাথে করোনাকে কেন্দ্র করে রোগ-কেন্দ্রিক ভার্টিকাল প্রোগ্রাম সামনের সারিতে থাকবে, একেবারে পেছনে চলে যাবে হয়তো সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারণা। হাই-টেক মেডিসিন কর্পোরেট পুঁজির নতুন এক লীলাক্ষেত্রের জন্ম দেবে। 

    বর্তমান সংকটে নেতৃত্ব দেবার ভূমিকায় কোন দেশ ছিলনা। ফলে আশ্চর্য হবোনা যদি এক-মেরু বিশ্ব ভেঙ্গে গিয়ে একাধিক মেরু তৈরি হয়। তাহলে দুর্বল দেশগুলোর দর কষাকষি করার ক্ষমতা বাড়বে। এতে বিশ্ববাসীর উপকার হবার সম্ভাবনা। 

    এগুলো কতকগুলো যৌক্তিক অনুমান। তার আগে মানুষকে বাঁচতে হবে। অঙ্গুলিমেয় কিছু বিলিয়নেয়ারের মুনাফার উদগ্র লালসা এবং প্রভুত্বের ধর্ষকাম মানসিকতা মানুষ এবং জীবজগৎ ও প্রকৃতির মধ্যেকার ভারসাম্য চিরদিনের জন্য বিলীন করে দিয়েছে। আরও অনেক বিপজ্জনক ভাইরাস ও অণুজীবের আক্রমণের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে। জানিনা নতুন শিশুরা কিভাবে আত্মরক্ষা করবে।

    তবে ভাইরাসকে নিয়ে সহবাস করা আমাদের ভবিষ্যৎ পরিণতি হতে যাচ্ছে একথা বলার জন্য পণ্ডিত হবার প্রয়োজন নেই।


    (আমার এই প্রবন্ধের কিছু প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য আমি নিউজিল্যান্ডবাসী চিকিৎসক ডঃ অরিন্দম বসুর কাছে ঋণী)

    গ্রাফিক্সঃ স্মিতা দাশগুপ্ত
  • বিভাগ : আলোচনা | ১১ মে ২০২০ | ৪৪২২ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিশু ভট্টাচার্য্য | 162.158.50.241 | ১১ মে ২০২০ ২১:০০93188
  • একদমে পড়ে ফেললাম, অনেক তথ্য পেলাম.......এর শেষ কোথায়........

  • তন্ময় হক | 172.68.146.133 | ১২ মে ২০২০ ০৩:৩৫93196
  • একশ্বাসে পড়লাম, ভীষণ তথ্যমূলক

  • ar | 108.162.219.53 | ১২ মে ২০২০ ০৩:৪৮93197
  • টাইপোঃ

    " They can be stored for several years at −80 °C and inactivated at 56 °C for 30 min.
  • Somnath Roy | 162.158.50.254 | ১২ মে ২০২০ ০৮:১৯93198
  • খুব ভালো লেখা। এত তথ্য একজায়গায় এনে সংহত করে লেখা খুবই দুরূহ কাজ ছিল মনে হয়।
    একটা জিনিস লক্ষ্য করবার মতন যে সভ্যতার কাছে করোনা-পর্যায় একটা সুযোগ দিয়েছিল ঘুরে দাঁড়ানোর। কিন্তু, তার উল্টোটাই হবে মনে হচ্ছে।

    ভারতবর্ষে তো খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতে পারত, জানুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক বিমান কেন বন্ধ করা হল না? সেইটার বদলে আরও অনেক বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে যখন দেশকে পড়তেই হল। এবং এর পর থেকে আন্তর্জাতিক পণ্য, পুঁজি ও শ্রমের চলাচল নিয়ে বিধিনিষেধের কথা বলতে পারত। কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয় সমাজে এই দাবিটা উঠেই আসছে না!
     

    এটাও একটা ফ্যাক্টর হয়ত যে লকডাউন ফেজে সামাজিক দূরত্ব এবং গৃহবন্দি থাকার নীতি সামাজিক আন্দোলনগুলোকেও ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে সোশাল মিডিয়া যে আন্দোলনের আধার হতে পারে না তাও প্রমাণীত হয়।

  • পরমেশ গোস্বামী | 162.158.165.67 | ১২ মে ২০২০ ০৯:১৪93199
  • খুব পরিষ্কার লেখা। ফ‍্যাক্টকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে আবেগ উচ্ছ্বাস আর তত্ত্বকথা আমদানির যান্ত্রিকতা না থাাকায় লেখাটা পড়ে উপকার পেলাম।

  • পাঠক | 162.158.50.241 | ১৩ মে ২০২০ ১৪:২৮93285
  • খুব ভাল তথ্য ও বিশ্লেষণমূলক লেখা।

    আমেরিকায় কোভিডের চিকিতসা বিনামূল্যে হবার কথা ছিল না, কী হচ্ছে? এত খরচ?

    দেশে তো সরকারি হাসপাতালে হচ্ছে, তার মানে প্রায় ফ্রি।
    এনিয়ে আরেকটু লিখুন।
  • জয়ন্ত ভট্টাচার্য | 162.158.50.254 | ১৩ মে ২০২০ ১৫:৩৮93286
  • সব মতামত এবং প্রতিক্রিয়া মাথায় রাখলাম। পরের লেখায় আসবে।

  • Kanchan Mukherjee | 162.158.50.219 | ১৩ মে ২০২০ ২২:৫৭93292
  • রেখে দেবার মত লেখা। খুব উপকৃত হলাম।

    উন্নত, সুসংহত স্বাস্হ্য ব্যবস্থা থাকা স্বত্তেও কিছু পাশ্চাত্য দেশ করোনা নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ। এসম্পর্কে পরের লেখায় আলোকপাত চাই। 

  • দিব্যেন্দু | 162.158.198.189 | ১৪ মে ২০২০ ১৩:১৭93313
  • পড়লাম। কিছু বুঝলাম কিছু বুঝলাম না। তবে ভালো লাগল

  • শতদল রায় | 202.142.80.118 | ১৮ মে ২০২০ ১৩:১৮93436
  • এতো ভাল লেখা, পরিস্কার fact based, reference cited from major journals and papers, অনেক কিছু শিখতে পারলাম। লেখক কে অসংখ্য ধন্যবাদ।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত