• বুলবুলভাজা  আলোচনা  স্বাস্থ্য

  • অসমান করোনা সংক্রমণ - ভারতের অভিজ্ঞতায় ভেবে দেখা

    ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্য
    আলোচনা | স্বাস্থ্য | ২১ আগস্ট ২০২০ | ৪৮৮৬ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ভয়েস অফ আমেরিকা-র সংবাদে (৩১.০৭.২০২০) – Could Mumbai’s Slums Be Headed to Herd Immunity? – বলা হল যে একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা দেখিয়েছে মুম্বাইয়ের বস্তিতে ৫০%-এর বেশি মানুষের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯-এর প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছে।সিএনএনসংবাদ সংস্থার সংবাদে (১৩.০৮.২০২০) জানা যাচ্ছে মুম্বাইয়ের বস্তিবাসীদের ৫৭% করোনা পজিটিভ। আবার একইসাথে দেখা যাচ্ছে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত বস্তি ধারাভিতে মে মাসে (২০২০) যেখানে গড় সংক্রমণের হার ছিল ৪৩ সেটা আগস্টে নেমে এসেছে ৯-এ। বৃহত্তর মুম্বাইয়ে ক’দিন আগে অব্দি (১৯.০৮.২০২০২-র আগে) গড় সংক্রমিতের হার ছিল ১০০০-এর মতো। ধারাভিতে ৬ আগস্ট পর্যন্ত মোট সংক্রমিতের সংখ্যা ২,৫৯৭। কিন্তু মৃত্যুর হার সে তুলনায় অনেক কম। কেন? সে উত্তর খুঁজবো এ প্রবন্ধে।

    অথচ এ যেন এক মৃত্যুমিছিল চলছে – করোনার মৃত্যুমিছিল। ১৮.০৮.২০২০-তে worldometer-এর তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে আক্রান্তের সংখ্যা – ২২,১০২,৬৮১। মৃত্যু হয়েছে ৭৭৮,৩৭৬ জনের। সুস্থ হয়েছে – ১৪.৮৪০,৬৬৯ জন। পৃথিবীর সব দেশ এবং একটি দেশের সব অঞ্চল সমানভাবে আক্রান্ত হয়নি।

    ভারতে করোনা সংক্রমণের গ্রাফ এখনো ঊর্ধমুখী বা এক্সপোনেনশিয়াল বলা চলে। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস ঘটিত যে ভয়ঙ্কর সংক্রমণের সময় আমরা অতিবাহিত করছি সেটা একেবারেই অচেনা, আগন্তুক। মানুষের শরীরের সাথে এর কোন পূর্ব পরিচয় ছিলনা। আরএনএ ভাইরাস ঘটিত আগে যে মহামারি হয়েছে – যেমন, ২০০২-৩-এ সার্স-কোভ-১ বা ২০১২-তে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ মার্স (MERS) – সেগুলোর থেকে এর চরিত্র ভিন্ন। এর গায়ে থাকা স্পাইক প্রোটিনের ফলে সংক্রমণক্ষমতা অনেক বেশি। সাধারণ ফ্লু-র চেয়ে ১০ গুণ বেশি সংক্রমণ ক্ষমতা। যদি আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি তৈরি করতে পারে তাহলে স্থায়ী সমাধান হবে, যেমনটা হাম, পোলিও বা স্মল পক্সের ক্ষেত্রে হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় স্তরে টীকাকরণ কর্মসূচীকে সফল করে তোলার ফলে। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া এ রোগগুলো এখন পৃথিবী থেকে নির্মূল হয়ে গেছে। 

    ভারতের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি বস্তি অঞ্চলের চাইতে অপেক্ষকৃত স্বচ্ছল এবং সম্ভ্রান্ত অঞ্চলে সংক্রমণের মাত্রা বেশি। তাছাড়াও দেখা যাচ্ছে সংক্রমণের ক্ষেত্রেও দুটি মানুষের মাঝে পার্থক্য ঘটছে, সংক্রমণ হবার পরে কেউ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ছে, আবার কেউবা প্রায় কোন সমস্যা ছাড়া সুস্থ হয়ে উঠছে। জনসমষ্টির বিশেষ অংশ বেশি সংক্রমিত হচ্ছে, অন্য অংশ কম। কেন এরকম ঘটে? এ প্রশ্ন কি বিজ্ঞানীদের কি সাধারণ মানুষ ও চিকিৎসকদের গভীরভাবে ভাবাচ্ছে। এর কোন সরল একমাত্রিক উত্তর নেই। ২৭ মার্চ, ২০২০-তে বিখ্যাতসায়ান্স পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল “How sick will the coronavirus make you? The answer may be in your genes” শিরোনামে। সেখানে বলা হয়েছিল – “গবেষকেরা এখন ক্রমাগতভাবে রোগীদের জেনোমে ডিএনএ-র তারতম্য বোঝার জন্য তন্নতন্ন করে খোঁজার মাত্রা বাড়িয়ে চলেছেন যাতে এই রহস্যের সমাধান করা যায়।” জিনগত পার্থক্য এবং তারতম্য ছাড়াও এ প্রবন্ধে বলা হল – “variants of the ACE2 receptor, scientists want to see whether differences in the human leukocyte antigen genes, which influence the immune system’s response to viruses and bacteria, affect disease severity.” (এগুলোর বাংলা করা কষ্টকর এবং বাংলা করলে তার চেহারা কেমন দাঁড়াবে এরকম সংশয়ের জন্য বাংলা করা থেকে বিরত থাকছি)

    আরেকটি নামী বিজ্ঞানের জার্নাল “ইনফেকশন, জেনেটিক্স অ্যান্ড ইভোলিউশন”-এর জুলাই, ২০২০-র সংখ্যায় “Genetic diversity and evolution of SARS-CoV-2” শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে কয়েকটি বিষয় বলা হল। (১) “সার্স-কোভ-২-এর দুটি অঞ্চলেই – যেখানে জেনেটিক কোডিং হয় এবং যেখানে হয়না -  প্রচুর সংখ্যক মিউটেশন এবং ক্ষয়ে যাওয়া বা বাদ পড়ার ঘটনা দেখা গিয়েছে” এবং (২) “আমরা (পড়ুন গবেষকেরা) ৮৬টি পূর্ণ বা প্রায়-পূর্ণ জেনোমের জেনেটিক বিশ্লেষণ করেছি”। এর ফলাফল? এতে প্রকাশিত হল যে “manymutations and deletions on coding and non-coding regions” ঘটে। এই তথ্যগুলো দুটি বিষয়কে প্রমাণ করে। প্রথম, নভেল করোনা ভাইরাসের জিনগত বৈচিত্র্য বিপুল এবং, দ্বিতীয়, ভাইরাসটির দ্রুত বিবর্তন হচ্ছে। আরও সহজ করে বললে, একটি ডিএনএ-তে একইসাথে মিউটেশন এবং একটা অংশ খসে যাওয়া দুটোই ঘটছে। ফলে করোনাতে সংক্রমণের ক্ষেত্রে জিনের ভূমিকা বৈজ্ঞানিকভাবে ক্রমশ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

    দুভাবে আমরা করোনা সংক্রমণের বিরুদ্ধে স্থায়ীপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি গড়ে তোলার কথা ভাবতে পারি। এবং এ দুটোই একমাত্র পরীক্ষিত কার্যকরী পথ। 

    (১)সমষ্টিগত ইমিউনিটি বা হার্ড ইমিউনিটি – যদি ৭০% থেকে ৯০% জনসংখ্যার  সংক্রমণ ঘটে (১০.০৪.২০২০-তে জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাব্লিক হেলথের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী) তাহলে আমরা হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করেছি এমনটা ভাবতে পারি। এরকম একটা পরিসংখ্যান প্রায় অসম্ভব। নিউ ইয়র্কের মতো করোনা-বিধ্বস্ত শহরে যেখানে মৃত্যু হয়েছে ৩২,৪৩৫ জনের সেখানে শহরের সমগ্র জনসংখ্যার মাত্র ১২.৩ থেকে ১২.৭%-এর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। ফলে ওখানেও হার্ড ইমিউনিটির কোন ভরসা বৈজ্ঞানিকেরা দেখতে পাচ্ছেন না। 

    (২)টীকা বা ভ্যাক্সিন। আমি এ আলোচনায় ভ্যাক্সিন নিয়ে কিছু বলবোনা। এটা এখনো সময়ের অপেক্ষা। বরঞ্চ অন্য একটিনেচার জার্নালে প্রকাশিত (৩.০৬.২০২০) রিপোর্টের উল্লেখ করা যেতে পারে। রিপোর্টের শিরোনাম – “India expands use of controversial drug despite safety concerns”। এর দু’দিন বাদে ৫ জুন, ২০২০২-তে প্রকাশিত ইংল্যান্ডের বৃহৎ RECOVERY trial-এর ফলাফল প্রকাশিত হবার পরে এ ওষুধের ব্যবহার কার্যত আন্তর্জাতিকভাবে পরিত্যক্ত হয়।

    সমষ্টিগত ইমিউনিটি নিয়ে আরও সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র “হার্ড ইমিউনিটি”-কে আরেকটু ভিন্ন চোখে দেখছে।সায়ান্সজার্নালে (২৩.০৬.২০২০) একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল “A mathematical model reveals the influence of population heterogeneity on herd immunity to SARS-CoV-2” শিরোনামে। এখানে যা বলা হয়েছে তাকে বোধগম্য বাংলায় বললে দাঁড়ায় যে যদি কোন অঞ্চলে জনসমষ্টি বিভিন্ন ধরনের মিশ্রণে তৈরি হয় অর্থাৎ চরিত্রের দিক থেকেঅসমসত্ত্ব হয় এবং তাদের মধ্যে সংযোগ বা কনট্যাক্ট বেশি থাকে তাহলে সেখানে RO= 2.5 হলেও (RO ১-এর চেয়ে ২.৫ গুণ বেশি হলেও) এতদিন ধ্রুপদী এপিডেমিওলজিতেসমসত্ত্ব এবং কম সংযোগ বা কন্ট্যাক্ট-এর জনসমষ্টির হার্ড ইমিউনিটির ক্ষেত্রে ৬০%-এর যে মান এতদিন ধরে নেওয়া হয়েছে তার থেকে কমে -  ৪৩%-এ - এই ইমিউনিটি অর্জিত হবে। তাহলে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় যে দু-তিনটে বিষয় গবেষণায় গুরুত্ব পেলো – (১) জনসমষ্টির চরিত্র কেমন –সমসত্ত্ব কিংবাঅসমসত্ত্ব, (২) এদের মধ্যে কন্ট্যাক্টের চরিত্র কিরকম – বেশি হচ্ছে বা কম হচ্ছে, (৩) যদি কন্ট্যাক্টের হার বেশি হয় তাহলে হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হবার মান ধ্রুপদী ধারণার চেয়ে কম হবে – ৪৩% অব্দি এটা হতে পারে। 

    সহজ কথায় বললে, হার্ড ইমিউনিটি হল জনসমষ্টির ক্ষেত্রে সে ধরনের ইমিউনিটি যে স্তরে জনসমষ্টি পৌঁছুলে রোগের ছড়িয়ে পড়া ক্রমাগত নিম্নমুখী হবে, এমনকি সমস্ত ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেবার পরেও। গবেষণাপত্রের ভাষায় – “The classical herd immunity levelhC is defined ashC = 1 – 1/R0, whereR0 is the basic reproduction number, defined as the average number of new infections caused by a typical infected individual during the early stage of an outbreak in a fully susceptible population.” এভাবে ইংরেজিতে বলে দিলে বেশিরভাগ মানুষের কাছে কোন অর্থ নেই। আরেকটু ভেঙ্গে বলা যাক। এখানে হার্ড ইমিউনিটিকেhC দিয়ে বোঝানো হচ্ছে। এবার ধরা যাক কোন এক সময়েR0 হল ৪। R0হল কোন এক বিশেষ সময়ে সংক্রামক জীবাণু এবং জনসমষ্টিতে এর সংক্রমন কতোটা ছড়াচ্ছে এর পারস্পরিক সম্পর্ক। নিউজিল্যান্ড প্রবাসী আমার অনুজপ্রতিম এপিডেমিওলজিস্ট চিকিৎসক অরিন্দম বসু একে সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন –এপিডেমিওলোজির ভাষায় সংখ্যাটি ১-এর নীচে গেলে সম্পূর্ণ সংক্রমণমুক্ত বলা যেতে পারে না। যেটা হয় তাহ’ল সংখ্যাটি ১ এর নিচে গেলে নতুন করে সংক্রমণ হয়ে মহামারীর আকার ধারণ করার ক্ষমতা আর থাকে না।  ১ এর নিচে গেলে নতুন সংক্রমণের সম্ভাবনা কমে যায়, নতুন ক্লাস্টার হবার সম্ভাবনা কমে যায়। একে সঠিক অর্থে সংক্রমণ মুক্ত বলা যায় না। Effective Reproduction Number 0.২৫ মানে আগে যদি R = ২ হয়ে থাকে  যেখানে একজন মানুষ দুজনকে সংক্রমণ করছিলো (R = ২ ), এখন উল্টোটা, ৪ জন সংক্রমিত ও আক্রান্ত লোক লাগবে একজনকে রোগ ধরাতে গেলে, অর্থাৎ, খুব বড়  ক্লাস্টার ছাড়া আর রোগ টিকবে না। ফলে সংক্রমণ ছড়াতে প্রায় পারবেনা বললেই চলে। এটা ঠিক সংক্রমণমুক্ত নয়, তবে হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হয়েছে একথা বলা যায়। ক্লাস্টারগুলো খুলে গেলে আবার ছোট বড়  মহামারী হতে পারে, যেমনটা চিনে, মালয়েশিয়ায়, ভিয়েতনামে কিংবা সিঙ্গাপুরে হচ্ছে।  এবার ধরুন কোন এক সময়, কোন এক বিশেষ অঞ্চলে R0হল ৪। সেক্ষেত্রে হিসেবটা দাঁড়াবে ১-১/৪ = ০.৭৫। অর্থাৎ, ০.৭৫ হল ইমিউনিটি থ্রেশোল্ড (imunity threshold) বা হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য সেসময়ের সে অঞ্চলের জনসমষ্টির ৭৫% মানুষকে সংক্রমিত হতে হবে। যদি R0৩ হয় তাহলে সে সংখ্যা হবে ৬৭%। আবার যদি R0১.১৩-১.১৭ (যেটা ভারতের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তের সরকারি হিসেব) হয় তাহলে সে সংখ্যা আরো কমে যাবে। সুবিখ্যাত Cell জার্নালে (মে ১৯, ২০২০) “Herd Immunity: Understanding COVID-19” প্রবন্ধে বলা হয়েছে – “Thus a single pathogen will have multiple R0 values depending on the characteristics and transmission dynamics of the population experiencing the outbreak. This inherently implies that the herd immunity threshold will vary between populations, which is a well-documented occurrence.” অর্থাৎ, পরিস্থিতি সাপেক্ষে একটি নির্দিষ্ট জীবাণুর একাধিক R0মান থাকতে পারে এবং বিভিন্ন জনসমষ্টিতে ইমিউনিটি থ্রেশোল্ড পরিবর্তিত হবে জনসমষ্টির বিশিষ্ট চরিত্রের ওপরে নির্ভর করে।  এই অসমান অবস্থা খানিকটা বোঝা যাবে নীচের ডায়াগ্রাম থেকে।



    নীচের গ্রাফ দুটি থেকে এটা আরও অন্যভাবে বোঝা যাবে।



    (Plot of the overall fraction infected over time for the age and activity structured community withR0 = 2.5, for four different preventive levels inserted March 15 (day 30) and lifted June 30 (day 135). The blue, red, yellow and purple curves correspond to no, light, moderate, and severe preventive measures, respectively. –সায়ান্স জার্নালের প্রবন্ধটি থেকে গৃহীত।)

    (Plot of the cumulative fraction infected over time for the age and activity structured community andR0 = 2.5, for a four different preventive levels inserted March 15 and lifted June 30. The blue curve corresponds to no preventive measures, the red with light preventive measure, the yellow to moderate preventive measures and the purple corresponding to severe preventive measures.–সায়ান্স জার্নালের প্রবন্ধটি থেকে গৃহীত।)



    ইন্ডিয়া টুডে-র খবর অনুযায়ী (১৫.০৮.২০২০) মুম্বাইয়ের সেরোলজিকাল সার্ভে দেখিয়েছে বস্তিবাসীদের ৫৭% এবং বস্তিবাসী নয় এমন জনসমষ্টির ১৬%-এর সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।ডাউন টু আর্থ পত্রিকায় (১৪.০৮.২০২০) প্রকশিত হয়েছে “Did Dharavi model work? Is it herd immunity or plain luck?” শিরোনামে প্রবন্ধ। ধারাভি, আমরা সবাই জানি, এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো বস্তি। জনসংখ্যা ৫০ লক্ষ বা তার বেশি, এমন গলিও আছে যেখানে দু’জন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে পারেনা। ফলে এরকম জনসমষ্টিতে সংক্রমণ ছড়াবে যেমন দ্রুত আবার যদি জনসমষ্টির বেশিরভাগ যুবক বা কম বয়সী হয় তাহলে তাদের শরীরে অ্যান্টিবডিও তৈরি হবে। ফলে ঈপ্সিত হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে – যে হিসেব আমি প্রবন্ধের শুরুতে দিয়েছি সে হিসেব অনুসরণ করে। 

    এখানেবিবিসি-তে প্রকাশিত (২৯.০৭.২০২০) প্রতিবেদন “India coronavirus: 'More than half of Mumbai slum-dwellers had Covid-19'” উল্লেখ করার মতো। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে চেম্বুর, মাতুঙ্গা এবং দহিসর এই তিনটি বস্তি এলাকায় ৫৭% জনস্মষ্টির ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসের প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছে। এই সার্ভে চালিয়েছিল যৌথভাবে দুটি সংস্থা – ভারত সরকারের নীতি আয়োগ এবং টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চেস (TIFR)। বিজ্ঞানীদের অভিমত এই ফলাফল ও সমীক্ষা বৈজ্ঞানিকভাবে শক্তিশালী এবং প্রতিনিধিত্বকারী। এই স্টাডিতে দেখা গিয়েছে – “a large section of people had been infected and survived with no or little symptoms, leading to a low fatality rate in these areas - one in 1,000 to one in 2,000”। ধারাভি এবং বিবিসি-র প্রতিবেদন সবগুলোই আমার প্রবন্ধের গোড়ার দিকে উল্লেখিতসায়ান্সজার্নালে (২৩.০৬.২০২০) প্রকাশিত “A mathematical model reveals the influence of population heterogeneity on herd immunity to SARS-CoV-2” প্রতিবেদনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

    তবে এটাই একমাত্র কারণ সেটা ধারাভি বা কলকাতার বস্তিবাসীদের ক্ষেত্রে বলা যাবেনা। এর জন্য আরও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অঙ্ক কষা দরকার। তবে এটাতো একটা সম্ভাব্য কারণ বটেই। 

    ধারাভিতে যে মডেল কাজ করেছে সেটা এরকম – 



    এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল – ধারাভির সাধারণ মানুষ রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। এরা নিজেরাই কনটেইনমেন্ট জোন তৈরি করেছে, সংক্রমিতদের আলাদা করেছে এবং তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহের ক্ষেত্রে যা করার করেছে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত সরকারি তরফে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা পাওয়া যায়নি। স্থানীয় যে চিকিৎসকেরা ছিলেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা ছিলেন তারা এগিয়ে এসেছেন।

    এগুলো তো প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অঙ্গ। সেটা ভেঙ্গেচুড়ে গিয়েছে বলে মানুষ উদ্যোগ নিয়ে রোগ ঠেকাচ্ছে। এজন্য করোনা অতিমারির সময়েও মাথায় রাখতে হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, social determinants of health এবং Sustainable Development Goals-এর মতো অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে। এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে, সক্রিয় ও জীবন্ত রাখতে না পারলে আগামী অতিমারির সংক্রমণ কিছুতেই সফলভাবে ঠেকানো সম্ভব নয়।

    প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরে জোর দিয়েই নিউজিল্যান্ড এই মুহূর্তে করোনা মুক্ত। ইংল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে।

    এরকম সংকটের সময়ে নজরে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সাধারণ মানুষের তরফে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনেতাদের ওপরে ট্রাস্ট বাবিশ্বাস। এবং এই বিশ্বাসের ভিত্তি হয় সরকারের তরফেস্বচ্ছতাকে নিশ্চিত করা। এই মুহূর্তে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এবং ভারতবর্ষে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার একেবারে গোড়ার যে কাজগুলো সেগুলো বন্ধ হয়েছে বা থমকে আছে। এগুলোর মধ্যে পড়ে সার্বজনীন টীকাকরণ, যেগুলোকে “নেগলেকটেড ট্রপিকাল ডিজিজেজ” বা অবহেলিত গ্রীষ্মকালীন দেশের রোগ বলা হয়, যেমন ম্যালেরিয়া, টিবি বা শিশুদের ডায়ারিয়া এবং গর্ভবতী মায়েদের যত্ন নেবার জন্য যে সমস্ত প্রোগ্রাম আছে। নেচার-এর মতো পত্রিকায় (১৩.০৮.২০২০) বিশেষ প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে “এইডস, ম্যালেরিয়া অ্যন্ড টিউবারকিউলোসিস আর সার্জিং”, অর্থাৎ এইডস, ম্যালেরিয়া এবং টিউবারকিউলোসিস প্রবল গতিতে বাড়ছে। 

    পারস্পরিক এই বিশ্বাস, স্বচ্ছতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জীবন্ত ও বেগবান রাখার ফলে আরেকবার বলবো নিউজিল্যান্ড করোনা মুক্ত হতে পেরেছে।

    নেচার-এর আলোচিত প্রবন্ধের পর্যবেক্ষণে – “More than three months of lockdowns have prevented many people from accessing treatments for non-COVID infectious diseases; at the same time, new cases of these illnesses will have gone undetected.” এদের হিসেবে চিন, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা জুড়ে ২০২০ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে ২০০,০০০ অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটবে। আরেকটি হিসেব বলছে, সাব-সাহারা আফ্রিকায় ২০২০-তে ৭৭৯,০০০ জন মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে। এদেরকে কে বাঁচাবে? একমাত্র সক্রিয় ও জীবন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এদের বাঁচাতে পারে। যদি এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা না যায় তাহলে কোভিডে যত মৃত্যু হবে তার চেয়ে বেশি মৃত্যু হবে এ রোগগুলোর জন্য। ঐ প্রবন্ধের শেষে মন্তব্য করা হয়েছে – “কোভিড-১৯ সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দিয়েছে কয়েক বছরের জন্যতো বটেই, এমনকি কয়েক দশকও হতে পারে।” বলা হয়েছে – “একটি সংক্রামক ব্যাধির হাত থেকে (পড়ুন কোভিড) মানুষকে রক্ষা করতে গিয়ে আরেক সংক্রামক ব্যাধিতে মানুষ মারা যাচ্ছে সেটা হল এমন এক শেষ হিসেব যা মানুষ চায়না।”

    কে দেবে এর উত্তর? রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতারা কিংবা আক্রান্ত জনসাধারণ? সময় এবং ইতিহাস সেকথা বলবে।

  • বিভাগ : আলোচনা | ২১ আগস্ট ২০২০ | ৪৮৮৬ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • Gora dhar | 202.84.37.50 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১০:১৪96506
  • অসাধারন, খুবই  তথ্যসমৃদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ

    সবার কাছে পৌঁছে যাক

  • প্রবীর ঝা | 2401:4900:3a22:c543:e4a9:ddb4:4e6c:5ae2 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১০:৫৮96507
  •  অত্যন্ত যথাযথ লেখা। ভবিষ্যত সম্পর্কে অবহিত করার এক অনবদ্য প্রয়াস। 

  • আশিস সরকার | 2409:4061:11:2d6f::1f0e:e8a5 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১১:১২96508
  • প্রচুর তথ্য সমৃদ্ধ এই গবেষণা। বর্তমান এবং ভবিষ্যত গবেষকদের জন্য খুব কাজের এবং জরুরী ।এই লেখা গুলো মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হওয়া উচিত সেই সংরক্ষণ ও দরকার। আমার মত একদম অন্ত্যজ পাঠক ভাসা ভাসা কিছু বুঝলাম অনেকটাই না বোঝাা থাকল। তবে এটুুুকু বুুুঝেছি প্রচুর অধ্যবসায়েই এমন একটা লেখা সম্ভব হয়়েছ। লেখককে অনেেকধন্যবাদ।   

  • Koushiki Tinni | 117.227.64.122 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১১:৩৩96511
  • The issues of genetic relevance is quite interesting. It is a detailed account which I found to be quite informative. Thank you

  • বিশু | 2409:4061:404:a5e1:eb43:ba9d:7eee:3e4 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১২:০৫96514
  • হার্ড ইমিউনিটি ব্যাপারটা মাথার উপর দিয়ে গেল

  • Sumit Ghosh | 157.43.229.244 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১২:৪৭96516
  • Corona Viruses niye amaderke bachte hobe

  • Dr Pravin Nahar | 2001:8003:c4f1:9300:8d98:bdf4:955c:8329 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১৪:৪৭96521
  • Congartulations Jayanta for the resourceful article. You have raised 2 important determinants of health in the community. The first and foremost is the Primary healthcare and the other one is the trust of the community towards the healthcare policymakers and the healthcare workers. Without a robust primary care, the improvement in public health is going to be very slow as evident when we compare India or Africa with New Zealand.

    You have quite correctly raised your concerns regarding the rising morbidity and mortality related to non-Covid infectious diseases while the whole country is  focussing on Covid as if that is the only health problem at the present time.

  • sm | 42.110.164.24 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১৫:৫৪96524
  • অরিন ,দুটো জিনিষ খেয়াল করে আমার একটু অবাক লাগছে।

    প্রথমত,ভারতে সংক্রমণ শুরু হয়েছে মোটামুটি মার্চ থেকে।আপনি যেমন বলেছেন, সেরিলোজি টেস্টে আই জি জি আসতে তিন চার সপ্তাহ টাইম লাগে,তেমনি মাস তিনেক পর থেকে অনেক ক্ষেত্রে আন ডিটেককটেবল হয়ে যায়। এটা যদি সঠিক তথ্য হয়,তাহলে আই সি এম আর এর উচিত ছিলো,অন্তত মেট্রো গুলোতে মে মাস থেকে পর্যায় ক্রমে ব্যাপক হারে সেরো লজি টেষ্ট করে যাওয়া।মিনিমাম লাখ খানেক স্যাম্পল প্রতিটি মেট্রো থেকে।  মোদ্দা কথা মার্চ এপ্রিলে যাঁরা সংক্রমিত হয়ছেন,তাদের অনেকের সেরোলোজি নেগেটিভ হতে পারে জুলাই অগাষ্ট মাস নাগাদ। আপনি এপিডেমিওলজি স্টাডিতে এই কারেকশন কিভাবে করেন?

    দুই,মহামারীর ক্ষেত্রে সংক্রমণ যতো দ্রুত গতিতে বাড়বে,একটি সেরোলোজি টেস্টের ফলস পজিটি ভিটি ততো শতকরা হিসাবে কমে আসবে। এটাই বা কিভাবে কারেক্ট করা হয়?

  • অরুনিম শেঠ | 2409:4061:2d96:1163::c00b:ed13 | ২২ আগস্ট ২০২০ ১৮:৩৬96530
  • অসাধারণ একটা বহু তথ্য সমৃদ্ধ গবেষণা।  যা আমাদের সকলকে করোনা সম্বন্ধে আরও বিস্তারিত জানতে সাহায্য করছে। বহুকোটি ধন্যবাদ আপনাকে। 

  • Sk Mandal, Islampur, U/D | 2409:4061:2e12:1658:c6e:81b4:189b:da92 | ২২ আগস্ট ২০২০ ২১:১৩96539
  • Dr. J. Bhattachrya  ঠিকই বলেছেন আমাদের ভারতবর্ষের মতো দেশেধারাভি দৃষ্টান্ত ই  বোধহয় সঠিক। 

    1) জনসচেতনতা 

    2)প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও গণমুখী করা। 

    3) মহামারী মোকাবিলার উপযুক্ত হিসাবে ব্যাপক শিক্ষিত নাগরিক বাহিনী গড়ে তোলা। 

    4)এই মহামারী মোকাবিলায় সরকারের তরফ থেকে থাকছে খুবই নগণ্য অর্থনৈতিক সুবিধা সহ পুলিশ-প্রশাসন ও আইনি ব্যবস্থা। এর বিপরীতে থাকছে বিপুল বুভুক্ষু জনতার রুটি রুজির প্রশ্ন। এ দুয়ের সহাবস্থান কতদিন সম্ভব?

    4) গোটা বিশ্ব সহ আমারা যখন মহামারীর কবলে। মানব প্রজাতি যখন অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে লড়াইটা তখন আমাদের নিজেদের। 

    5)সুশৃঙ্খল মানব মনের এই মানবিক দিক গুলো উস্কে দেওয়া মতাদর্শের অভাব বোধ করছি ।

  • Sk Mandal, Islampur, U/D | 2409:4061:2e12:1658:c6e:81b4:189b:da92 | ২২ আগস্ট ২০২০ ২১:১৩96540
  • Dr. J. Bhattachrya  ঠিকই বলেছেন আমাদের ভারতবর্ষের মতো দেশেধারাভি দৃষ্টান্ত ই  বোধহয় সঠিক। 

    1) জনসচেতনতা 

    2)প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও গণমুখী করা। 

    3) মহামারী মোকাবিলার উপযুক্ত হিসাবে ব্যাপক শিক্ষিত নাগরিক বাহিনী গড়ে তোলা। 

    4)এই মহামারী মোকাবিলায় সরকারের তরফ থেকে থাকছে খুবই নগণ্য অর্থনৈতিক সুবিধা সহ পুলিশ-প্রশাসন ও আইনি ব্যবস্থা। এর বিপরীতে থাকছে বিপুল বুভুক্ষু জনতার রুটি রুজির প্রশ্ন। এ দুয়ের সহাবস্থান কতদিন সম্ভব?

    4) গোটা বিশ্ব সহ আমারা যখন মহামারীর কবলে। মানব প্রজাতি যখন অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে লড়াইটা তখন আমাদের নিজেদের। 

    5)সুশৃঙ্খল মানব মনের এই মানবিক দিক গুলো উস্কে দেওয়া মতাদর্শের অভাব বোধ করছি ।

  • শিবপ্রসাদ | 2600:1700:7c70:4920:38a7:aabc:ee8:d527 | ২৩ আগস্ট ২০২০ ০২:৩৫96552
  • Hats off to Dr. Jayanta Bhattacharjee.

    A wonderful authoritative article on "herd immunity" of COVID infection.
    We say natural herd immunity for a community comes through a hard way. Generally it takes to 2-3 years; which requires around 90% of the population to get infected. That's devastating specially for a virus like COVID.

    Here Jayanta has provided the current trends of herd immunity in India; obviously we as a nation are far behind. Jayant has rightly pointed that the solution will be an effective COVID vaccine.

    I am Jayanta's classmate and feeling very proud of him for his special contributions on herd immunity in this article.

    Dr. Siba Prasad Raychaudhuri 

    Professor, Dept of Medicine and Clinical Immunology, University of California, USA

  • রাজদীপ সেনশরমা | 158.144.108.96 | ২৪ আগস্ট ২০২০ ০০:০৫96585
  • ১) সেরো সার্ভে যেহেতু সারা দেশে হয়নি, তুলনা করা একটু কঠিন। অতিমারি চলার সময়ে প্রকৃত মৃত্যুহার গণনা করাও মুশকিল। চীনে প্রথম সংক্রমণের ধাক্কা শেষে ইনফেকশন ফ্যাটালিটি রেট (আই এফ আর) (সংক্রামিত লোকেদের মধ্যে মৃত্যুহার) ছিল ০.০৭ % অর্থাৎ দশ হাজারে সাত জন। এর সাথে কেস ফ্যাটালিটি রেট (সি এফ আর) অর্থাৎ যে কেস ধরা পড়ছে, তার মধ্যে মৃত্যুহার কে তুলনা করা যাবে না (মুম্বাই এ সি এফ আর ৫.৪৫ %)।  

    ২) ৫৭ % ইনফেকশন যদি সত্যি হয় তবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রুখতে ধারাভিতে খুব একটা সাফল্য নেই। সংক্রমিত মানুষদের খুঁজে বের করতেও খুব একটা সাফল্য নেই, কারণ কেসের সংখ্যা এর থেকে অনেক কম। এক্ষেত্রে সরকার বা লোকাল ডাক্তার কাউকেই দোষ দিয়ে লাভ নেই, ২.১ স্কোয়ার কি মি তে ১৫ লাখ লোকের বসবাস। 

    ৩) কোভিডের ক্ষেত্রে মরণশীলতার একটা বড় বিষয় বয়স। এক্ষেত্রে TIFR এর এই সার্ভের বয়সের ডিস্ট্রিবিউশন আমার মনে নেই, তবে ধারাভির বয়সের প্রোফাইল মুম্বাই এর থেকে তরুণদের দিকে বেশী ঝোঁকে কিনা সেটা জানা দরকার। 

    ৪) আমার যতদূর মনে আছে এই সার্ভে তে ডায়াবেটিকদের শতাংশ স্লাম ও নন-স্লাম ক্যাটেগরিতে একই ছিল (এটা সেলফ ডিকলারেশন, সুতরাং কতটা ভরসাযোগ্য জানি না) । তবে ধারাভিতে ডায়াবেটিস ইত্যাদি কো-মরবিডিটি মুম্বাইয়ের তুলনায় কম কিনা দেখা দরকার। মুম্বাই এ মৃত রোগীদের মধ্যে ৬০-৭০ শতাংশের কো মরবিডিটি ছিল। 

    ৫ ) মুম্বাই এ আরেকটা ট্রেনড দেখা গেছে। বেসরকারি নার্সিং হোম এ যারা ভর্তি হয়েছে তাদের মৃত্যুহার বেশ বেশী। যারা প্রথম থেকেই সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন, বা সরকারী কোয়ারানটিনের মধ্যে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার অনেক কম। মনে করা হচ্ছে যে কোভিডের ক্ষেত্রে অনেক সময় খুব অল্প সময়ের মধ্যে অবস্থার খুব দ্রুত অবনতি ঘটছে । এক্ষেত্রে সরকারী হাসপাতালে যেহেতু নানা রকম যন্ত্রপাতি ও স্পেশালিষ্ট এক জায়গায় আছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি সামলানো অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ । বেসরকারি নার্সিং হোম থেকে রোগীরা অনেক সময় একেবারে শেষ অবস্থায় সরকারী হাসপাতালে পৌঁছচ্ছেন। এইজন্য সম্প্রতি বেসরকারি নার্সিং হোমগুলিতে কোভিড রোগী নেওয়া সরকার বন্ধ করে দিয়েছে, এবং আরও সম্প্রতি ৫০ বছরের ওপর বয়স্ক লোকেদের সরকারী কোয়ারানটিনে যাওয়া বাধ্যত্মুলক করতে চাইছে (আগে এই বয়সের নিম্নসীমা ৬০ বছর ছিল)।  

    এক্ষেত্রে ধারাভি তে তিনটে জিনিস কাজ করেছে 

    (অ) লোকাল ডাক্তারদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে প্রচুর আর্লি স্ক্রিনিং হচ্ছে, ফলে সিম্পটোম্যাটিক রোগীরা অনেক আগে থেকে চিকিৎসা পাচ্ছেন। এতে মৃত্যুহার কমছে।

    (আ) ধারাভিতে প্রায় কাউকেই হোম কোয়ারানটিন করতে দেওয়া হচ্ছে না। রোগীরা অনেক আগে থেকে ফর্মাল চিকিৎসা ও মনিটরিং এর আওতায় আসছেন। এতেও মৃত্যুহার কমছে। বেশীর ভাগ লোক ই বেসরকারি নার্সিং হোম এর দিকে যাচ্ছেন না, ফলে সেদিক থেকেও মৃত্যুহার কম।  

    (ই) ধারাভির সংক্রমণ ছড়ানো আয়ত্তের মধ্যে আসে শ্রমিক স্পেশাল ট্রেন চালু হবার পর। অর্থাৎ ধারাভির জনঘনত্ব অনেকটা কমে যাবার পর। এটা কোইন্সিডেন্স হতে পারে, তবে খুব সম্ভবত নয়। 

    আমার লেখার উদ্যেশ্য এই নয় যে শুধু এই কারণগুলো দিয়ে ধারাভির মৃত্যুহারকে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে আলোচনার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার। বিশেষ করে সেরো সার্ভে থেকে মৃত্যুহার আর খুঁজে পাওয়া কেসের মধ্যে মৃত্যুহার অনেকটাই আলাদা (প্রায় ১০০ গুন আলাদা) , তাই তুলনা করার সময় এটা ভীষণ ভাবে মনে রাখা দরকার।

  • জয়ন্ত ভট্টাচার্য | 59.93.171.203 | ২৪ আগস্ট ২০২০ ১৫:১৭96613
  • সবাইকে ধন্যবাদ। মন দিয়ে, যত্ন নিয়ে লেখাটি পড়েছেন, ভেবেছেন, ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সমৃদ্ধ ব্যখ্যা রেখেছেন। এরপরে আমার আরেকবার ব্যাখ্যা রাখতে আমি কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত।

    সবাইকে আরেকবার আন্তরিক ধন্যবাদ।

  • মিথুন পোদ্দার | 112.79.118.175 | ২৪ আগস্ট ২০২০ ২০:৫৬96615
  • প্রচুর নতুন তথ্য পেলাম স্যার... অনেক ধন্যবাদ আপনাকে 

  • সাত্ত্বিক | 2409:4066:186:6af8:1021:2c68:263a:c356 | ২৭ আগস্ট ২০২০ ১৭:৪৪96702
  • খুব জরুরী একটি আলোচনা । বহুস্বরীয় এবং অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ । আজীবন প্রচন্ড দারিদ্র্য এবং নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা আপাত ভাল্ নারেবল্ 

  • সাত্ত্বিক | 2409:4066:186:6af8:1021:2c68:263a:c356 | ২৭ আগস্ট ২০২০ ১৭:৪৪96703
  • খুব জরুরী একটি আলোচনা । বহুস্বরীয় এবং অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ । আজীবন প্রচন্ড দারিদ্র্য এবং নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা আপাত ভাল্ নারেবল্ 

  • Hirak Jha | 2409:4061:2d82:d69e:9e0d:b150:cd9c:1534 | ৩১ আগস্ট ২০২০ ০৮:২৭96799
  • Herd immunity concept is very nicely explained.If primary health care is not taken seriously millions of lives will sweep away from other diseases.In India govt is not showing such determination and corporates are maligning the whole healthcare system.

  • Soumya | 42.110.155.181 | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৯:৫৩96945
  • Excellent sir

  • মিথুন পোদ্দার | 112.79.112.204 | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১০:২৪97197
  • ডাঃ ভট্টাচাৰ্য কে অশংখ্য ধন্যবাদ এই ধরণের একটি সময় উপযোগী লেখা আমাদের সাথে শেয়ার করবার জন্য I

    বিগত দুই দশক ধরে পেশাগত কারণে পরিচিতি হবার সুবাদে ডাঃ ভট্টাচাৰ্য র জনসেবামূলক কাজের পরিধি আমার পরিচিত...অর্থের বাইরে গিয়ে আর্তের সেবায় নিয়োজিত প্রাণ I

    ভালো থাকুন ডাক্তার বাবু.... চলুক কলম আর আমরা আরও সমৃদ্ধ হই I

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত