এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  বই

  • কী ঘর বানাইবা কন্যা শুন্যের মাঝার 

    লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বই | ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ৩৭৯ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • এপারে বাপের ঘর ওপারে শ্বশুরঘর তার মধ্যিখানে চর, সেই চরে বাস করে যতেক মাইয়্যামানুষ। শ্বশুরঘরে আসতে বাপের ঘর ত্যাগ করা লাগে তাদের,  কিন্তু সে ঘরেও তাদের  একেবারে নিজস্ব জায়গা কতটুকু? তাদের মতামতের ধার তো বাড়ির পুরুষরা এমনিতে খুব একটা ধারেই না, বড়সড় রাষ্ট্রবিপ্লবেও  তারা  পালাবে কিনা, কোথায় পালাবে কীভাবে পালাবে সেও নির্ধারণ করে সেই পুরুষই। তবুও মেয়েমানুষ টুনিমুনি নিয়ে নাড়ে চাড়ে, খেলে, কেউ আবার যেখানে যতটুকু পারে ধরে রাখার, দখলদারির চেষ্টা করে যায়। জীবনে দুর্যোগ নেমে  এসে সব ভেঙেচুরে তছনছ করে  ভাসিয়ে নিয়ে গেলে মেয়েমানুষ দেখে হাতের ধুলিমুঠি সবই আঙুলের ফাঁক গলে পড়ে গেছে, সে দাঁড়িয়ে আছে ধু ধু চরে। তার নিজের দেশও নাই, ঘরও নাই। এই সত্য আরো একবার উপলব্ধি হল  তৃষ্ণা বসাকের ‘চরের মানুষ’ পড়তে পড়তে।   

    টুনুর জন্ম আর দেশভাগ, স্বাধীনতা সমসাময়িক।  দেশভাগের হাত ধরে আসা সে স্বাধীনতাও সাতমাসে জন্মানো টুনুর মতই  অপরিপক্ক, কিছুটা এলোমেলোও। বইয়ের কাহিনীকাল দেশভাগের পর থেকে স্বাধীন  বাংলাদেশের জন্মের  সামান্য পর অবধি অর্থাৎ ‘পূর্ব পাকিস্তান’এর জীবৎকাল।  পাত্রপাত্রী মূলত সেইসব হিন্দু পরিবার যাঁরা ৪৭’এ দেশভাগের পরে ভারতে পালিয়ে আসেন নি, জন্মসূত্রে ‘দেশ’ বলে জেনে আসা ভূখন্ডেই থেকে গিয়েছিলেন।  সে থেকে যাওয়া অবশ্য অনেকসময়ই নিখাদ দেশপ্রেম নয় বরং অনেকটাই বাধ্যতা।  ময়মনসিংহে বাঁধা পশারের জন্য সুরেশ ডাক্তার থেকে যান, বড় ছেলের খুন হয়ে যাওয়াও তাঁকে নড়াতে পারে না ময়মনসিংহ থেকে। ছেলের খুন নিতান্ত কাকতালীয়, কোন ধর্মবিদ্বেষী হত্যা নয় একথা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, সর্বত্র বলেনও। পুত্রের মৃত্যুশোক  সয়েও ধর্মের বিভাজন অস্বীকার করার এমন দৃঢ় প্রত্যয়  সাম্প্রতিককালের আসানসোলের ইমামকে মনে করায়।

    ওদিকে টাঙ্গাইলের তারাচরণ,  শত প্ররোচনাতেও যিনি ইন্ডিয়া আসতে রাজী নন - ‘প্যাট থাকলে তবে তো ধর্ম, ও দ্যাশে প্যাটের কী উপায় হইব?’সুরেশ ডাক্তারের বৌ লক্ষ্মীরানির মতই তারাচরণের বৌ পারুলবালার মতামতের তোয়াক্কাও  করে নি তার স্বামী। পারুলবালার  ডাক্তারছেলে  অমর  আবার সেই ইস্কুলবেলা থেকেই ভেবে আসছে এই দেশটা মুসলমানের, হিন্দুর ছেলের  এখানে খুব বেশী সফল হওয়া মুশকিল, ইন্ডিয়াতেই  চলে যাবে সে। সেও পারুলের মত জানার প্রয়োজন বোধ করে না। এই উপন্যাস ভীষণভাবে নারীকেন্দ্রিক উপন্যাস। টুনু,  তার মেজোদিদি, লক্ষ্মীরানি, পারুলবালা, শোভনা, গুগি, শবনম, তারাসুন্দরী প্রতিটি চরিত্র অতি যত্নে গড়া। প্রতিটি চরিত্র তাদের দোষ গুণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে উজ্জ্বল।  এমনকি অতি স্বল্প উপস্থিতিতেও নজর কাড়ে পুঁটি, রাধারানি, ফুল বা বসাকবাড়ির ছোটতরফের শবনমের মা।

    পাঠক প্রায় পুরো উপন্যাস দেখেন অমর ও টুনুর চোখ দিয়ে। অমরের জীবনের কেন্দ্রের দুই নারী টুনু ও পারুলবালা, সহধর্মিনী ও  জননী।  ৪৭ পরবর্তী কোনও এক দাঙ্গায় ছোট ব্যবসায়ী তারাচরণের গদি জ্বালিয়ে দেওয়ায় সর্বস্বান্ত পরিবারটির হাল শক্ত হাতে ধরে রাখা পারুলবালা, ছোটছেলেকে দুর্ঘটনায়  হারিয়ে ভেঙে পড়েও আবার ঘুরে দাঁড়ায় অমরকে ডাক্তার বানাবার মরীয়া চেষ্টায়। আরো তিন ছেলে থাকলেও অমরই পারুলের বাজি। আর তাই  ফেলাছড়ার ঘরের  খেতে ভালবাসা টুনুকে খেতে না দিয়ে মুঠোয় পেষার আনন্দ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে পারুল। টুনু আর তার বড়জায়ের বাচ্চা হওয়ার পরে ‘মুখ দেখানি’ দেওয়া নিয়ে সাংসারিক জটিলতা এবং মা ও ছেলের  ক্ষমতার টানাপোড়েনের ছবি  আলতো টানে এঁকে গেছেন লেখিকা। পারুল সফল রোজগেরে অমরকে হাতের মুঠো থেকে বেরোতে দিতে রাজী নয়, দুর্ভোগ তাই বেড়েই চলে  বেচারি  কিঞ্চিৎ হাবা টুনুর।

    এই উপন্যাসে গার্হস্থ্য হিংসার নানারূপ এসেছে অনাড়ম্বর কিন্তু অনিবার্যরূপে। দেশভাগ বা মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন যৌনহিংসার কাহিনী আমরা পড়েছি যথেষ্ট, কিন্তু সে সবই এসেছে  ধর্মীয় বিভাজনের হাত ধরে, অপর ধর্মাবলম্বীকে শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে।  তৃষ্ণার মুন্সীয়ানা এখানেই যে তিনি একেবারে  পরিবারের  ভিতরে ঘটে যাওয়া যৌন  হিংসার কাহিনীগুলো তুলে এনেছেন খোলাখুলি, কোনও  অজুহাত ছাড়াই। মেয়েরা যার যার নিজস্ব ধু ধু চরে দাঁড়িয়ে  একাকিনী  সয়ে যায় দেওর বা জামাইবাবুর দ্বারা শরীর খাবলানো, পণ ঠিকমতো না পাওয়া  পর্যন্ত  স্বামী সহবাসে অনধিকার,  দুধের ভারে বুক ফেটে গেলেও বাচ্চাকে  কোলে নিতে না পারার মত হিংস্রতা। আরেকটি তীক্ষ্ণ ছবি  ঢাকার বসাকবাড়ি, ফুলের শ্বশুরবাড়ির; যেখানে বসাকরা বসতবাড়ির সামনের অংশে  গ্রাম থেকে তুলে গরীব দুঃস্থ আত্মীয়বন্ধুদের বাস করায়  যাতে দাঙ্গা লাগলে মুসলমানদের আক্রমণের হাত থেকে  বেঁচে খিড়কি দিয়ে পালিয়ে যাবার মত যথেষ্ট সময় পায় তারা। অথচ সেই বসাকদেরই কোন এক আদিপুরুষ নাকি পূর্ববঙ্গের প্রথম যুগের কমিউনিস্ট ছিল! শ্রেণীস্বার্থের এই ছবিও আঁকা সুক্ষ্ম তুলির টানে।

    চমৎকার এই উপন্যাসের দুই একটা অস্বস্তির জায়গাও বলি। ২৫শে  মার্চ রাতে ডঃ গোবিন্দ দেবের হত্যা দিয়ে শুরু হলেও বুদ্ধিজীবি হত্যার অন্ধকারতম দিন ১৪ই ডিসেম্বর। পুঁটির কথায় যে আবহ গড়ে ওঠে মার্চে সেটির  শুরু মাত্র। গল্পের সময়কালের প্রয়োজনেও  ১৪ই ডিসেম্বরের অনুপস্থিতি ঠিক মনে হয় নি। আরেকটা অসঙ্গতি হল ময়মনসিংহের ভাষার আঞ্চলিক রূপের সাথে প্রমিত বাংলা মিশে গেছে বারেবারে, ঐতিহাসিক তথ্য পুনরাবৃত্ত হয়েছে কয়েকবার। তবে এটুকু উপেক্ষা করাই যায়। সব মিলিয়ে এ বই নানাদিক থেকে উল্লেখযোগ্য এবং প্রশংসনীয়।

    বই – চরের মানুষ
    লেখক – তৃষ্ণা বসাক
    প্রকাশক – ধানসিঁড়ি
     
    #লেখাটি 'এই সময়' পত্রিকায় প্রকাশিত।   
     
     
  • আলোচনা | ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ৩৭৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    থ: ! - Bitan Polley
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ ২২:১৪514376
  • এই আলোচনা বইটি পড়ার আগ্রহ জাগানিয়া। আলাদা করে উল্লেখ করতে ইচ্ছা হল প্রথম অনুচ্ছেদের কথা - খুব ভালো।
  • | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১৯:৩০514401
  • একগোছা ধইন্যাপাতা একলহমা। smiley
  • স্বাতী রায় | 117.194.34.174 | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ২২:১৯514402
  • খুব ভাল লিখেছিলে। সঠিক মূল্যায়ন। এই বইটা আমারও ভারি পছন্দের বই। 
  • S | 95.214.55.43 | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ২২:৫২514403
  • একে বলে রিভিউ। দারুন হয়েছে।
  • Ranjan Roy | ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ২৩:০১514404
  • হক কথা। এটা পড়েই নোট করলাম--বই মেলায় কিনে ফেলতে হবে। 
  • | ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:৩৬514417
  • বড়েস, রঞ্জনদা, ধন্যবাদ। 
    স্বাতী, তোমার সাথে বইটা নিয়ে টুকটাক আলোচনাও হয়েছিল। ধন্যবাদ আর আলাদা করে দিলাম না। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন