এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য – ( পর্ব - ২১ ) 

    Goutam Dutt লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১২ জুলাই ২০২২ | ৪২২ বার পঠিত
  •  
     
    এবারে বলতে ইচ্ছে করছে আমার এক সহকর্মীর ছেলের কথা।

    লিখতে গিয়েই চোখের কোন চিক্‌চিক্‌ করে উঠছে। ভাগ্যিস সময়মতো ঠিক জায়গায় ছেলেকে নিয়ে পৌঁছে গেছিল ও, নাহলে আজ যে কি হতো ভাবতেও পারিনা।

    দুহাজার চোদ্দ সালের কথা। আমার অবসর নিতে তখনো দেরি আছে। আমার পূর্বতন এক শাখা অফিসের এক কলিগ – আমার থেকে অনেক জুনিয়র, তার ছেলেকে নিয়ে এই গল্প।

    ধরা যাক আমার বন্ধুটির নাম অলোক। তার একমাত্র ছেলে পড়ে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে। স্বাভাবিকভাবেই হোস্টেলে থাকে ছেলেটি। অলোক থাকে বারুইপুর-সোনারপুর অঞ্চলে। একমাত্র ছেলে ওর। তখন ক্লাস নাইন এর শেষ।

    পুরুলিয়া মিশন থেকে মাঝে সাঝেই খবর আসে যে ছেলেটির জ্বর হয়েছে। ডাক্তার দেখানো হয়েছে। তারপরে জ্বর কমেছে। দিন যায়। অলোকও যায় মাঝে মধ্যে। কিন্তু সেতো একদিনের যাওয়া। ও ভাবে তেমন কিছু নয়। ছেলেটিকে খাওয়া দাওয়ার ভালই ব্যবস্থা করেন মিশন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু জ্বর আসতেই থাকে এক মাস দেড় মাস অন্তর অন্তর।

    এমন হতে হতে যখন খবর আসে যে ছেলেকে ওখানকার দেবেন্দ্র মাহাতো হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। খবর পেয়ে দৌড়োয় অলোক। পুরুলিয়া পৌঁছে দেখে ছেলেকে। মিশনের মহারাজেরা ছেলেটিকে নিয়ে যা কিছু পুরুলিয়ায় করা সম্ভব তাই করেন। হাসপাতালেও বিভিন্ন রকম পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এসব চলতে চলতেই ছেলেটির ক্লাস টেনের প্রায় শেষদিক চলে আসে। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ছেলেটি বাবার সাথে বাড়ি ফেরে।

    তখন ছেলেটি প্রস্তুত হচ্ছে নরেন্দ্রপুরে ভর্তি হবে বলে। সেসবের জন্যে এখানে ওর কোচিং ক্লাস শুরু হয়। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন অলোক দেখে যে ছেলে কোচিং থেকে আগেভাগেই বাড়ি চলে আসে জ্বর আর হাত-পায়ে ব্যথার কারণে। হাত আর পা ফুলে ওঠায় স্থানীয় ডাক্তারবাবুদের শরণাপন্ন হতেই হয়। দুতিনবার ডাক্তার দেখানোর পরেও জ্বর আর কমে না ছেলের। ফোলাটাও বাড়তেই থাকে। এরমধ্যে রাজপুর অঞ্চলের এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি দেখেবুঝে স্টেরয়েড দিতে শুরু করেন।

    তাতেও ছেলেটির উন্নতি কিছুই হয়না। বরং আরো দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এর মধ্যে অন্য একজন ডাক্তারবাবুকে দেখানো হয় যিনি দক্ষিণ কলকাতার এক বিখ্যাত দাতব্য হাসপাতালের সাথে যুক্ত। সেই ডাক্তারবাবুর চেষ্টায় ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেল অলোকের ছেলে।

    ছাব্বিশটা দিন-রাত্তির কাটলো ওখানে। অলোকের কথায় ‘রোজই ছেলেটার শরীর থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি রক্ত চুষে নিত ওরা’। বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য। ওরা রোজ এইসব পরীক্ষা আর বিভিন্ন ফর্দ দিতে লাগলেন। ওদিকে ছেলের শরীর আরো খারাপ হতে শুরু করলো তাই শুধু নয়, হাত আর পায়ের আঙুলগুলো এবারে বেঁকে যেতে শুরু করলো। রোজ রোজ এতো রক্ত টেনে নেবার ফলে ছেলেটির শরীর রক্তশূন্য হয়ে ফ্যাকাসে-হলুদ হতে থাকলো। আর শুধু এই ডাক্তার থেকে অন্য ডাক্তারের কাছে রেফার হতে হতে চিকিৎসার কিছু তো হলই না উলটে ছেলেটির আরো ব্যপক ক্ষতিই হলো তা পরে বোঝা গিয়েছিল।

    সেই সময় আমাদেরই এক কলিগ অলোককে জানায় যে – ব্যাপারটা তারও ভালো মনে হচ্ছে না। অলোক যদি পারে তাহলে দক্ষিণ ভারতের কোথাও যেন ছেলেকে নিয়ে চলে যায় আর সময় নষ্ট না করেই।

    ইতিমধ্যে অলোকের এক আত্মীয় যিনি আবার ওই অঞ্চলের একজন, যিনি প্রায়শই বিভিন্ন রোগীদের নিয়ে দক্ষিণ ভারতে যান তাঁকে ধরে ওরা মোট চারজন ট্রেন ধরে ব্যাঙ্গালোরের। হাসপাতাল থেকে ছেলেকে ছাড়াতে অবশ্যই দিতে হয় ‘বণ্ড’।

    ব্যাঙ্গালোরে পৌঁছেই ওরা প্রথমেই যায় বড় এক হাসপাতালে (সম্ভবত জহরলাল বা রাজীব গান্ধী মেমোরীয়াল নামক সরকারি কোনো সংস্থা)। সেখানে ওরা কলকাতার চিকিৎসাকেই ঠিক আছে বলে সাব্যস্ত করে। সারাটা দিন ধরে সিমেন্টের ওপর শুইয়ে রেখে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার পরে বিকেলে জানায় যে সব ঠিকই আছে। ওষুধও দিয়ে দেয় ওরা।

    ছেলেকে নিয়ে হোটেলে ফিরে আসে ওরা। মন-মেজাজ খুবই খারাপ। ইতিমধ্যে অলোকের সেই আত্মীয় ব্যাঙ্গালোরের আরেক বাঙালিকে (রায় বাবু) রাত বারোটা নাগাদ জাপ্টে ধরে হোটেলে নিয়ে আসেন। সেই রায়বাবু নামক বাঙালি ভদ্রলোক এই সব করে বেড়ান আর দিনরাত ডুবে থাকেন কারণের বোতলে। রায়গঞ্জের এক জমিদার বাড়ির ছেলে ওই রায়বাবু বাংলা প্রায় বলেনই না। ইংরেজির খই ফোটে সর্বদা তাঁর মুখে। এই লেখা লিখতে গিয়ে জানলাম তিনি আজ আর বেঁচে নেই।
     
    ওই অত রাতেই শুরু হলো রায়বাবুর ফোন করা। পরের পর ফোন করেই যাচ্ছেন – কোথায় চিকিৎসা ভাল হতে পারে সেই সব কথাই বলে যাচ্ছিলেন অবিরত খই ফোটানো ইংরেজিতে। এখানে নিউরো ভাল, ওখানে কিডনি ভাল, সেখানে নিউরো ভাল এই সব শুনতে শুনতে ঠিক করে ফেললেন কোথায় নিয়ে যাবেন ছেলেটিকে।

    ওই রাতে ওখানেই কাটিয়ে পরেরদিন সকাল হতেই ওরা পৌঁছে গেলেন ‘সাকরা ওয়ার্ল্ড হাসপাতালে’ (Sakra World Hospital)। জাপানি কোলাবরেশনে তৈরি এই হাসপাতাল। ওই রায়বাবুই আউটডোরে বিজ্ঞাপিত বড় বড় টিভির স্ক্রিনে চলা ডাক্তারদের পরিচয় দেখে দেখে খুঁজে নিলেন এক রিউম্যাটোলজিস্ট ডাক্তার ম্যাডামকে। রায়বাবুই ছেলেটির সব কিছু সিম্পটম দেখেশুনেই ঠিক করলেন এই রিউম্যাটোলজিস্ট শাখার এই ডাক্তারকে। অর্থাৎ অভিজ্ঞতার সুবাদে ডাক্তারি স্পেশালাইজেশনের শাখা অব্দি ঠিক করে দিলেন এক্কেবারে নিঁখুত যা ওরা সেদিনই বুঝে গেছিলো।

    প্রায় তিনঘণ্টা ধরে ম্যাডামের দেখা পর্ব চললো। এর মধ্যেই বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর, কলকাতার সব রিপোর্ট ইত্যাদি দেখা হলো। এরি মাঝে একটা ইঞ্জেকশনও দিয়ে দিলেন ছেলেকে।  

    রাতে হোটেলে ফিরে ছেলে অলোককে বলে যে – বাবা, দেখো আমার আঙুলগুলোকে যেন একটু বেঁকানো যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পায়ের ফোলাটা যেন একটু কম।

    পরেরদিন রিপোর্টিং-এর কথা। অলোকেরা আবার পৌঁছে গেল ম্যাডামের চেম্বারে। ইতিমধ্যে রিপোর্টগুলো এসে গেছে। ডায়াগোনিসিস হল ‘টিউবারকুলোসিস’। এর পর তিন মাস শুধু ট্যাবলেট খেয়েই ঠিক হয়ে গেল অলোকের ছেলে। মাঝে দুবার যেতে হয়েছিল অলোককে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর।

    ……চলবে……পরের পর্বে…
    #
    ©গৌতমদত্ত
     
  • ধারাবাহিক | ১২ জুলাই ২০২২ | ৪২২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Amit Sengupta | 142.120.2.112 | ১৩ জুলাই ২০২২ ০০:৫২509820
  • SAKRA আমার পাড়ার হাসপাতাল। আমাদের সব চিকিৎসা ওই হাসপাতালে। মনে হচ্ছে বোধহয় Dr. Shweta র কথা বলছেন। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন