ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য – ( পর্ব - ১২ ) 

    Goutam Dutt লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১২ মে ২০২২ | ১৬১ বার পঠিত
  •  
    কতো কি দেখছিলাম বসে বসে। ঘড়ি আট’টার যতো কাছাকাছি হচ্ছিল ততই বাড়ছিল হাসপাতালের ব্যস্ততা। আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটা বায়োডাটা শিট। যা ফিলাপ করে আটটা নাগাদ দাঁড়ালাম ক্যাশ কাউন্টারে। আমার ফাইল তৈরি হতে দেখলাম। পরে বুঝেছি যে ওই ফাইল ছাড়া এ হাসপাতাল অন্ধ। এখন অবশ্য সমস্তকিছুই কম্প্যুটারের হার্ড ড্রাইভে যা সারা ভারতের যে কোনো সেন্টার থেকেই ডাক্তারবাবুরা দেখতে পারেন। এখন সব কিছুই এন্ট্রি করা হয় কম্প্যুটারেই।

    আমার রেজিস্ট্রেশন নাম্বার পড়ে গেল সে ফাইলে। আর ফাইলের ওপরে মোটা কালো স্কেচ পেন দিয়ে লেখা হ’ল ‘Allergic to ……” সালফার। এই মামুলি অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন এর আগে আর কোথাও এত গুরুত্ব দিতে দেখিই নি। আর এই এ্যালার্জির কারণেই দেখি কতো পেশেন্টের কতো রকমের সমস্যা হ’তে।

    ঠিক আটটায় আমার ডাক এল অপ্ট্রোমেটিস্ট এর চেম্বারে। তিনি আমার সমস্ত ডিটেল জেনে লিখতে থাকলেন। আমার ফাইলে আস্তে আস্তে কাগজ জমা হ’তে থাকলো। সমস্ত কিছু লেখা হবার পরে আমার পাওয়ার টেস্ট করে অন্য একটা ঘরের সামনে গিয়ে বসতে বলা হ’ল। চোখের ডাক্তার রমা রাজগোপাল দেখবেন এরপর।

    চারদিকে ব্যস্ততা তুমুল। ডাক্তার সিস্টার সেক্রেটারি সাফাই কর্মচারী প্রত্যেককে আলাদা করা যায় তাদের পরিধানে। যেন মেশিনের মতো কাজ হয়েই চলেছে সবদিকে।

    ডাক এল ডাক্তার রমা রাজাগোপাল এর সেক্রেটারির কাছ হ’তে। যে ঘরে যেতে বলা হ’ল সেই ঘরে গিয়ে বসলাম দুজনে। ডাক্তার রমা অল্পবয়সী। টগবগ করছেন উৎসাহে। আমার সেই ফাইল এখন ওনার সামনে খোলা। দ্রুত দেখে নিচ্ছেন সকাল থেকে এতক্ষণের সব পরিণাম। এবারে আমায় বললেন একটা চোখের মেশিনের সামনে বসতে। সেই মেশিনে থুঁতনি রেখে বসা গেল। উল্টোদিকে ডাক্তার রমা।

     


    প্রথম দেখলাম সেই মেশিন যা এখন কলকাতাতেও জলভাত। কিন্তু সেই আটানব্বই সনে আমরা সেই টর্চে চোখ ঠেকিয়ে ডাক্তারবাবুদের দেখতেই অভ্যস্ত ছিলাম মহারাণীর শহরে। দুটো চোখে জোরালো আলো ফেলে ডাক্তার রমা দেখলেন আমায়। তারপরে একটা বেগনী আলো প্রায় চোখের মণিতে এসে দাঁড়িয়ে গেল। পরে জেনেছি ওটা দিয়ে চোখের প্রেশার মাপা হয়।

    বেশ অনেকক্ষণ ধরেই দেখলেন আমায়। ওই মেশিনে দেখা শেষ হলে আমাকে নিয়ে ডাক্তার রমা চললেন আরেকটি ঘরে। সেখানে সেই দাঁতের ডাক্তারখানার চেয়ারের মতো একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলেন আমায়। তারপরে সুইচ টিপে-টাপে আমাকে প্রায় শুইয়েই ফেললেন সেই চেয়ারটায়। এর পরে ডাক্তার মাথায় লাগালেন সেই কয়লাখনির মিস্ত্রিদের মাথায় জ্বলা লাইটের মতো একটা কালো ব্যাণ্ড। যার সামনে দিয়ে জোরালো আলো ঠিক্‌রে বেরিয়ে - চোখের রেটিনার ভেতর দেখতে সাহায্য করে। আমি তো অবাক হয়েই যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। সেই ভোর থেকেই। শঙ্কর নেত্রালয়ের মশলা দোসার কল্যাণে পেট ভর্তি।

    চোখের ওপরে সেই জোরালো আলো আর সাথে একটা পেরেকের মত বস্তু হাতে নিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে চোখ টিপে টিপে দেখা সাঙ্গ হ’ল ডাক্তার ম্যাডামের।

    রায় বেরুলো সাথে সাথেই। ডান চোখে ছানি এসেছে। তাই ওই রামধনুচ্ছটা !

    এরপর ?  বললেন ইচ্ছে হলে ছানি কেটে বের করে দিতে হবে। আমার জ্ঞানে তো ছানি পাকার গল্প ভর্তি। তাই উজাড় করলাম আধা ভাঙা ইংরেজিতেই। প্রথাগত ধারণা অনুযায়ী জিজ্ঞেস করলাম, কাঁচা ছানি অপারেশন করবেন ? উনি বললেন – হ্যাঁ করব। এই কাঁচা ছানিটাই বার করে সেখানে একটা ছোট্ট লেন্স বসিয়ে দেওয়া হবে। আপনি সার্জিকাল ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ঠিক করে নিন কবে ডেট পাওয়া যাবে আর কে আপনার অপারেশন করবেন। অপারেশনের ব্যাপারে আর একটু তথ্য চাওয়ায় উনি বললেন যে আজকাল প্রথাগত অপারেশন ছাড়াও ওনারা “ফেকো” বলে একটা যন্ত্রের মাধ্যমে অপারেশন করছেন, তাতে সেরে ওঠার সময়টাও কম আর অপারেশনের ধকল কিছুই প্রায় থাকে না। সার্জিক্যাল ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ডেট পাওয়া গেল। ডাক্তার ঠিক হলেন ডাঃ রবিশঙ্কর। অপারেশনটা ডে কেয়ার সিস্টেমে হবে ওদেরই আর একটা অন্য ইউনিটে।

    এরপরে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম ডাক্তার রমা নিজে উঠে নিজের চেম্বারের দরজা খুলে আমাদের বিদায় জানালেন। তার মধ্যে আমার মত আনাড়ির কতো রকম প্রশ্নের যে জবাব দিয়েছেন পরম সহিষ্ণুতায় তাও অনুভব করলাম। এখনো কলকাতার বিশিষ্ঠ ডাক্তারবাবুদের কিছু জিজ্ঞেস করলেই শুনতে হয় – “আপনি ডাক্তারির কি বুঝবেন !!” তবে এখন আমি অন্ততঃ সপাটে ব্যাট চালাই। মুখের ওপরে বলেই দিই আপনি বোঝালেই সব বুঝবো। অনেক পালটেছে ইদানীং এ শহর। তবে এ শহরের ডাক্তারবাবুদের সময় বড্ড কম। যা চেন্নাইতে অকল্পনীয়। 

    বোঝো কাণ্ড !!  তার মানে চোখে ছানি কাটানোর পরে আর সেই কাঁচের গ্লাসের তলার অংশের মত মোটা লেন্সের চশমা চশমা পড়তে হবে না আর !!  এর আগে ঠাকমা আর ছোটোকাকাকে দেখেছি ছানি কাটিয়ে প্রায় মাসখানেক চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকতে। আর তারপরে চোখের কাটা অংশ শুকোলে সেই মোটা কাঁচের চশমা। তাহলে ? সত্যি ঠিক বলছেন তো ডাক্তার রমা !!

    দুগ্‌গা নাম নিয়ে মাস তিনেক পরের একটা অপারেশনের ডেট নেওয়াও হয়ে গেল। দুতিন দিন বাদে কলকাতা ফিরলাম একরাশ উদ্বেগ আর চিন্তা নিয়ে।

    তখন কোথায় গুগুল মামা আর কোথায়ই বা হাতের মুঠোফোন। কিছুদিন আগে রাজীব গান্ধী স্যাম পিত্রোদা’কে এনে পালটে দিয়েছেন সেই ট্রাঙ্ক কল ইত্যাদির ধ্যান ধারণা। শহরে শহরে অজস্র “এসটিডি/আইএসডি” বুথ। পয়সা ফেললেই যোগাযোগ কলকাতা থেকে ভারতের সব শহরেই।

    এক বস্তা চিন্তা নিয়েই পৌঁছে গেলাম আমার সেই পূর্বকথিত চোখের ডাক্তারবাবুর কাছে। বললাম সব কথা। “ফেকো”-র কথা শুনে উনি বললেন যে ওই মেশিন দিয়ে চোখের মধ্যে নাকি একটা নিড্‌ল ঢুকিয়ে ছানিটাকে ছোট ছোট টুকরো করে বার করা হবে। বেশ একটা ভয় দেখিয়ে দিলেন। সেসময় উনি কিন্তু বরানগরের বুকে বেস্ট আই সার্জেন। দিনপ্রতি তিন-চারখানা ছানি অপারেশন ওনার কাছে জলভাত। তা সেই তিনি বললেন – এই সব কথা। মোটকথা তিনি আমার ব্যাপারটাকে আমলই দিলেন না।

    বেশ ভড়কেই গেলাম।
     
    .

    ……চলবে……পরের পর্বে…
    #
    ©গৌতমদত্ত

     
  • | বিভাগ : ধারাবাহিক | ১২ মে ২০২২ | ১৬১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Nandita Sen | ১৭ মে ২০২২ ১৩:০৬507763
  • খুব ভালো লাগলো। আমার বাবা-মা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন... অনেক ডাক্তারের কাছে তাদের নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছি.... শেষজীবনে বাড়িতেই ছিলেন...
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন