ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য – ( পর্ব – ২ ) 

    Goutam Dutt লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১৯ মার্চ ২০২২ | ৪৭২ বার পঠিত

  •  
    এর পরের ঘটনা যা স্মৃতিতে আটকে আছে এখনো — তা ১৯৭২ এর। আমার তখন ক্লাস টেন। ছোটকাকার বিয়ে। ঠিক তার দিন পনেরো আগে ঠাকুর্দা এমনই অসুস্থ হলেন, যে বিয়ে প্রায় পণ্ড হয় হয় আর কি !  ঠাকুর্দা ছিলেন এ্যাকিউট হাঁপানি রুগী। তো সেদিন আমাদের পারিবারিক ডাক্তারবাবু ডাঃ কে পি বসাক (এল.এম.এফ.) এসে দেখে গেছেন। এবং বলে গেছেন যে বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার আর. এন. চ্যাটার্জিকে একবার দেখিয়ে নিতে। সে সময় ডাঃ আর. এন. চ্যাটার্জি কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে খ্যাতির চূড়োয়। আর জি কর হাসপাতালের কার্ডিওলজির হেড ছিলেন। এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে সেসময়ও পাঁচ বছর এক্সটেনশন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ ৬৫ বছর অব্দি চাকরি করেছেন সে যুগেও।

    তিনি এলেন। সন্ধ্যেবেলায়। একটা কালো রঙের এ্যামবাসাডর চেপে। তিনি থাকতেন আমাদের উত্তর শহরতলীর বেলঘরিয়ায়। ফোনে শুনেছিলেন যে, একটা বিয়ে প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে।

    আমি যখন তাঁর এ্যামবাসাডারের পেছনের দরজাখানা খুলে দিলাম তিনি বিড়বিড় করে বলতে বলতে বাড়ি ঢুকছেন – বিয়ে কেন বন্ধ হবে, বিয়ে কেন বন্ধ হবে !!  

    ঠাকুর্দার খাটের পাশে বসলেন একটা চেয়ারে। শুনলেন। তারপর স্টেথোখানা বার করে দেখতে শুরু করলেন। আমি দেখলাম যে ঠাকুর্দার বুকের ওপরে একটা হাত রেখে নিচু হয়ে নিজের কানটা রাখলেন সেই বুকে রাখা হাতের ওপরে। আমি দেখছিলাম শুধু।

    পরে জেনেছি উনি বুকের স্পন্দন গুনছিলেন। তখন কোথায় পোর্টেবল ইসিজি ? ওই ভাবেই তিনি শুনতে পেতেন হৃদযন্ত্রের লাবডুগ শব্দ। আর তা শুনেই বুঝতে পারতেন রুগীর হৃদয়ের ছন্দপতন।
     
    বলতে ভুলেছি, ওই সময় ডাক্তার বসাকও এসে গেছেন, উনি এসেছেন খবর পেয়েই। ডাক্তার বসাকের প্রেসক্রিপশনে চোখ বুলিয়ে ডাক্তার চ্যাটার্জি জানালেন, একদম পারফেক্ট। ওই ওষুধেই ঠিক হয়ে যাবেন আমার ঠাকুর্দা। আর বিয়ে বন্ধ করার প্রয়োজন নেই !

    এত বড় একজন ডাক্তারের কাছে পাড়ার একজন এল.এম.এফ. ডাক্তার এর চেয়ে বেশি আর কিই বা আশা করেন ?

    এই ছিলেন আমার দেখা এক জ্যান্ত ভগবান !

    “ যাহা হউক, সৎকার করিয়া পরদিন সকালে ফিরিয়া আসিয়া দেখা গেল প্রত্যেকেরই বাটীর কবাট বন্ধ হইয়া গিয়াছে। শুনিতে পাওয়া গেল গতরাত্রি এগারোটা পর্যন্ত হারিকেন–লণ্ঠনহাতে সমাজপতিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন,এবং স্থির করিয়া দিয়াছেন যে এই অত্যন্ত শাস্ত্রবিরুদ্ধ অপকর্ম(দাহ) করার জন্য এই কুলাঙ্গারদিগকে কেশচ্ছেদ করিতে হইবে,’ঘাট' মানিতে হইবে,এবং এমন একটা বস্তু সর্বসমক্ষে ভোজন করিতে হইবে,যাহা সুপবিত্র হইলেও খাদ্য নয়! তাঁহারা স্পষ্ট করিয়া প্রতি বাড়িতেই বলিয়া দিয়াছেন যে ইহাতে তাঁহাদের কোনই হাত নাই ;কারণ জীবিত থাকিতে তাঁহারা অশাস্ত্রীয় কাজ সমাজের মধ্যে কিছুতেই ঘটিতে দিতে পারিবেন না। আমরা অনন্যোপায় হইয়া ডাক্তারবাবুর শরণাপন্ন হইলাম। তিনিই তখন শহরের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক এবং বিনা দক্ষিণায় বাঙ্গালীর বাটীতে চিকিৎসা করিতেন।

    আমাদের কাহিনী শুনিয়া ডাক্তারবাবু ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিয়া প্রকাশ করিলেন,যাঁহারা এইরূপ নির্যাতন করিতেছেন তাঁহাদের বাটীর কেহ চোখের সম্মুখে বিনা চিকিৎসায় মরিয়া গেলেও তিনি সেদিকে আর চাহিয়া দেখিবেন না। কে এই কথা তাঁহাদের গোচর করিল,জানি না। দিবা অবসান না হইতেই শুনিলাম, কেশচ্ছেদের আবশ্যকতা নাই, শুধু ‘ঘাট' মানিয়া সেই সুপবিত্র পদার্থটা ভক্ষণ করিলেই হইবে। আমরা স্বীকার না করায় পরদিন প্রাতঃকালে শুনিলাম,’ঘাট' মানিলেই হইবে — ওটা না হয় নাই খাইলাম। ইহাও অস্বীকার করায় শোনা গেল,আমাদের এই প্রথম অপরাধ বলিয়া তাঁহারা এমনিই মার্জনা করিয়াছেন — প্রায়শ্চিত্ত করিবার আবশ্যকতা নাই। কিন্তু ডাক্তারবাবু কহিলেন, প্রায়শ্চিত্তের আবশ্যকতা নাই বটে, কিন্তু তাঁহারা যে এই দুটা দিন ইহাদিগকে ক্লেশ দিয়াছেন সেইজন্য যদি প্রত্যেকে আসিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া না যান, তাহা হইলে তাঁহার যে কথা সেই কাজ; অর্থাৎ কাহারও বাটীতে যাইবেন না।

    তারপর সেই সন্ধ্যাবেলাতেই ডাক্তারবাবুর বাটীতে একে একে বৃদ্ধ সমাজপতিদিগের শুভাগমন হইয়াছিল। আশীর্বাদ করিয়া তাঁহারা কি কি বলিয়াছিলেন,তাহা অবশ্য শুনিতে পাই নাই ; কিন্তু পরদিন ডাক্তারবাবুর আর ক্রোধ ছিল না, আমাদিগকে তো প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়ই নাই।” ( - শ্রীকান্ত (১) – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।)

    ছোটোবেলা থেকে এমনই ছবি হৃদয়ে গেঁথে বড় হয়েছি। শুধু উপন্যাসে নয় !  বাস্তবে ! তাই আজ সেই স্মৃতি রোমন্থনেই বেলা কেটে যায়। আর আজ ? রোজ খবরের কাগজে একটা না একটা খবর থাকবেই – ডাক্তার রুগী সংঘর্ষ !

    ডাক্তার রুগী নিয়ে আগেও লিখেছি। কলকাতায় ডাক্তার রুগীর মধ্যে কেন এতো প্রাণঘাতী সমস্যা ভবিষ্যতে নিশ্চই থিসিস লেখা হবে। আজকাল ডাক্তারবাবুরা বলছেন যে অন্য প্রফেশনের মতো এটাও যেহেতু একটা প্রফেশন,তাই অন্য সুযোগসুবিধেগুলো ও অন্য প্রফেশনের মতো পাওয়া উচিত। যেমন ছুটি,কাজের সময় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের ছোটবেলায় তো এসব বালাই ছিলই না। কেন ছিল না ? কোনো সদুত্তর নেই। হয়তো তাঁরা বোকা ছিলেন তাই তাঁরা তিনশ’ পয়ষট্টি দিনই রুগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকতেন। ডাক্তারি করার ফাঁকে ফাঁকে রুগীদের সাথে খোশগল্প করেই তাঁরা তাঁদের এনটারটেনমেন্ট পুষিয়ে নিতেন হয়তো।

    আমাদের ছেলেবেলায় প্রত্যেক পরিবারেরই একজন ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান ছিলেন। হতে পারে তিনি এল.এম.এফ. পাশ অথবা এম. বি. বি. এস.। বাড়ি এসে রুগী দেখে, হাতে সময় থাকলে এক কাপ চা অবলীলায় খেয়েদেয়ে সুখ দুঃখের গল্প করে বিদায় নিতেন। সম্মানে তাঁদের মধ্যে কোনো বিভেদ ছিল না। আমার চোখে বারংবার দেখেছি আমাদের বরানগরের ফ্যামিলি ফিজিসিয়নের চিকিৎসার পরেও যদি কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারবাবুকে আনতে হ’ত তাঁদের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ দেখিনি বরং সেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অক্লেশে এনডোর্স করতেন সেই এল. এম. এফ. পাশ করা ডাক্তারবাবুর প্রেসক্রিপশন। কোনো রকম ভনিতা তো চোখে পড়েনি কোনোদিন।

    ডাক্তার নারায়ণ রায় কে আমি দেখিনি। আমাদের কলকাতার পাড়ার মানে সিমলে অঞ্চলে ছিল তাঁর চিকিৎসার জগৎ। কিন্তু তাঁর দু’ই সুযোগ্য শিষ্য ডাক্তারদের আমি দীর্ঘদিন দেখেছি। তাঁদের কাছে চিকিৎসা নিয়েছি দীর্ঘদিন। সত্যিই তাঁরা বোকা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন আর নেই। আমি জানি যে তিনি বিশেষ কিছু অর্থ সঞ্চয় করে রেখে যেতে পারেন নি। এমনকি, শেষ দিকে যখন তিনি সেরিব্রাল স্ট্রোকে পঙ্গু তখন তাঁর হাইফাই চিকিৎসা করার মতো পয়সা ছিল না। কোনো রকমে একটা দোতলা বাড়ি করেছিলেন বাঙ্গুর অঞ্চলে। অথচ তিনি পি. জি. হাসপাতালের অধ্যাপক হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন। তাঁর নাম ডাক্তার বিষ্ণুপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কি অসম্ভব ধৈর্য্য নিয়ে রুগীদের দেখতেন। আরেকজন হলেন ডাক্তার অম্বিকা দত্ত। চোরবাগান দত্ত পরিবারের ছেলে। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাইপো। তিনি ছিলেন সাইক্রিয়াটিষ্ট। এঁরা সত্যিই বোকা ! কিন্তু মানুষ মনে রেখেছে এখনো তাঁদের। ডাক্তার অগ্নীশ্বর চ্যাটার্জী’রা বেঁচেই থাকবেন আমাদের অন্তরে।

    ……চলবে……পরের পর্বে…
    #

    ©গৌতমদত্ত

     
  • ধারাবাহিক | ১৯ মার্চ ২০২২ | ৪৭২ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নাইটো - একক
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন