এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য – ( পর্ব –  ১ ) 

    Goutam Dutt লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১৮ মার্চ ২০২২ | ৬৫৪ বার পঠিত | রেটিং ৪.৩ (৪ জন)



  • “বালস্তু খলু মোহাদ্বা প্রমদাদ্বা ন বুধ্যতে।
    উৎপদ্যমানং প্রথমং রোগং শত্রুমিবাবুধঃ॥
    অণুর্হি প্রথমং ভূত্বা রোগঃ পশ্চাদ্বিবর্দ্ধতে।
    স জাতমূলো মুষ্ণাতি বলমাযুশ্চ দুর্ম্মতেঃ॥”

    অবোধ বালকবুদ্ধি লোক মোহ বা প্রমাদবশতঃ প্রথম প্রথম উৎপন্ন রোগকে শত্রু বলিয়া বুঝিতে না পারিয়া অগ্রাহ্য করে। পরন্তু রোগ সকল প্রথমে অণুর ন্যায় উৎপন্ন হইয়া ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইতে থাকে। পরে বদ্ধমূল হইয়া পরিশেষে সেই নির্বোধের বল ও পরমায়ু অপহরণ করে।



    “ন মুঢ়ো লভতে সংজ্ঞাং তাবদ্‌ যাবন্ন পীড়্যতে।
    পীড়িতন্তু মতিং পশ্চাৎ কুরুতে ব্যাধিনিগ্রহে॥
    অথ পুত্রাংশ্চ দারাংশ্চ জ্ঞাতীংশ্চাহয় ভাষতে।
    সর্ব্বস্বেনাপি মে কশ্চিদ্‌ ভিষগানীরতামিতি॥
    তথাবিধঞ্চু কঃ শক্তো দুর্ব্বলং ব্যাধিপীড়িতম্‌।
    কৃশং ক্ষীণেন্দ্রিয়ং দীনং পরিত্রাতুং গতায়ুষম্‌॥
    স ত্রাতারমনাসাদ্য বালস্তস্তুতি জীবিতম্‌।
    গোধা লাঙ্গুলবদ্ধেবাকৃষ্যমাণা বলীয়সা॥”

    পীড়া যে পর্য্যন্ত না কঠিন হইয়া উঠে, সে পর্যন্ত মূর্খ লোকের চৈতন্য হয় না। রোগ কঠিন হইয়া দাঁড়াইলে, তখন সে রোগ প্রতীকারের চেষ্টা করে। তখন সে, স্ত্রী, পুত্র ও জ্ঞাতিদিগকে ডাকাইয়া কহে, যে আমায় যাহা কিছু আছে, সর্ব্বস্ব বিক্রয় করিয়াও কোন চিকিৎসককে আনাও। পরে তাহার সেই ব্যাধিপীড়িত, দুর্ব্বল, ক্ষীণেন্দ্রিয়, দীন ও গতায়ুপ্রায় অবস্থায় এমন কোন্ বৈদ্য আছে, যে তাহাকে পরিত্রাণ করিতে সক্ষম হয় ? গোসাপ স্বীয় লাঙ্গুলে আবদ্ধ হইলে বলবান্‌ কর্ত্তৃক কি আকৃষ্যমাণ ইয় যেরূপ প্রাণত্যাগ করে, দ্রুতপ সেই পীড়িত মুর্খব্যাক্তিকেও ত্রাতার অভাবে প্রাণত্যাগ করিতে হয়।  - ( - চরক-সংহিতা। সূত্র-স্থানম্‌। একাদশোহধ্যায়ঃ )

    কতো ভালো ভালো সিস্টেমই তো দেখেছি এই কলকাতাতেই…।

    কতই বা বয়স তখন আমার !  কেশব একাডেমি-র ক্লাস টু-র ছাত্র। মানে বছর ছয়েক। ১৯৬২। স্কুলের প্রথম বেঞ্চেই বসি। পেছন দিকে বসলে বোর্ডের লেখা অস্পষ্ট। এর মধ্যেই একদিন হাত পেতে ডালপুরি আর আলুর তরকারিটা নেওয়ার পরে পরেই শোনা গেল – আজ আমাদের ক্লাসের সব্বাইকেই চোখের ডাক্তারবাবু দেখবেন। ‘ব্রাহ্ম’ গুষ্টির স্কুল কেশব একাডেমি। তখন আমাদের মর্নিং স্কুল। তাই ছেলেদের উপোষ ভাঙত ওই টিফিনের ঘন্টা বাজার ঠিক আগের পিরিয়ডে হাত পেতে টিফিন নেওয়ার পরেই। ঘি চপচপে গরম গরম ডালপুরি বা রাধাবল্লভি ফটাফট হাতে রোল পাকিয়ে মুখে। ঘন্টা পড়ার অপেক্ষা। তারপরেই ওইটুকু ইঁট-বাঁধানো উঠোনে লেম-ম্যান খেলা। কচি কচি ছোটো ছোটো হাত দুটো কলের জলে ধুয়ে নিয়ে ওই জলেই হাত পেতে খেয়ে নিতে কি যে তৃপ্তি ছিল !  তখনো গার্জেনদের এতো হুঁশ হয়নি যে স্কুলের ট্যাঙ্ক অপরিষ্কার আছে কিনা তা জানার। টালা ট্যাঙ্কের জল মানেই এক্কেরে মিনারেল ওয়াটার। হয়তো এখনোও।

    ক্লাসের যে দেয়ালে আলো পড়ে ঠিক সেখানে লাগানো রয়েছে একটা লম্বা শক্ত বোর্ড। তার ওপরে লেখা ‘ই এফ পি টি ও জেড’ এমন সব নানান অক্ষর নানান মাপের। একদম ওপরেরটা সবচেয়ে বড়। আর একদম নিচেরটা কাছে না গেলে দেখাই যায় না। আমি মনে হয় শুধু ‘ই’ ছাড়া আর কিছুই পড়তে পারিনি সেদিন।

    যথারীতি গৌরবাবু’র (বাবা) কানে পৌঁছে গেল সে কথা। ‘আপনার ছেলের চোখ কোনো চোখের ডাক্তার’কে দেখিয়ে নেবেন’।

    বাবা’র তখন ইলেকট্রিক ওয়্যারিং রিপেয়ারিং ইতাদির ব্যবসা। সেই সূত্রে বাবার পরিচিত একজন খুব বড় চোখের ডাক্তারের কাছে আমায় নিয়ে যাওয়া স্থির হ’ল। ডাঃ কে এম মিত্র। নামটা মনে আছে এখনো কেমন অদ্ভুতভাবেই !

    চাঁদনীতে তাঁর চেম্বার। সুতরাং বড় ডাক্তার না হয়ে উপায় আর কি !  তো সেই আধোঅন্ধকার চেম্বারে বাবার সাথে ঢুকে পড়া গেল এক বৈকালিতে। আবার সেই ‘ই’।  তার নিচের গুলো সেই স্কুলের মতোই আবছা। তারপরে চোখ দেখা সেই টর্চ হাতে নিয়ে। সিদ্ধান্ত চোখ নাকি ঠিক আছে। বুঝুন অবস্থা। আমার নাকি শখ চোখে চশমা পরার।

    এইভাবেই কেটে যায় তিন তিনটে বছর। কলকাতার ছাতু বাবুর বাজারের কাছের পৈত্রিক বাড়ি ছেড়ে ঠাকুরদা সপরিবার উঠে এলেন বরানগরে। বি টি রোডের ওপরেই বাড়ি কিনে। টবিন রোডের কাছেই। স্কুলও পাল্টালো। কেশব একাডেমির ক্লাস ফাইভের ছাত্র আবার ভর্তি হল বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম স্কুলে। নো এডমিশন টেস্ট। ঠাকুরদার এক বন্ধু যিনি সাউথ সিঁথিতে থাকেন তাঁর পাশের বাড়ি স্কুলের এক মাস্টারমশাই এর। তাঁর সূত্র ধরে একদিন দুপুরে বাবার হাত ধরে হাজির হয়ে গেলাম সেসময়ের হেডস্যার শম্ভূদা’র ঘরে। হাই স্কুল বাড়ির মাঝামাঝি একতলার ঘরে শম্ভুদা বসতেন। ভর্তি হয়ে গেলাম। ক্লাস ফাইভ সি সেকশনে। সেই ক্লাস ফাইভের তিনটে সেকশনের অস্তিত্ব আর নেই বর্তমানে। সেখানে এখন অডিটোরিয়াম হয়ে গেছে।

    কলকাতার কেশব একাডেমির ক্লাস ঘরগুলোয় দিনের আলো ছিল অল্প। এখানে এসে আলো পেলাম ভরপুর। সামনেই বিশাল মাঠ অল্পবিস্তর ঘাসে ঢাকা। প্রকৃতিকে উজাড় করে চেটেপুটে নিতে থাকলাম। তবে নতুন ছাত্র হবার সুবাদে জায়গা জুটল লাস্ট বেঞ্চির আগের বেঞ্চে। কালো বোর্ডের ওপর সাদা খড়ির লেখা আমার কাছে অর্থহীন। জ্বলন্ত অভিজ্ঞতার প্রথম স্বাদ পাওয়া।

    বাড়ির চাপে বাবা বাসে করে নিয়ে গেল শ্যামবাজারের ‘ঘোষ অপ্টিক্যালস’-এ। এখন জনহীন হলে কি হবে, সে সময় উপছে পড়তো ভীড়। ওখানেই ডাক্তারবাবুকে দেখিয়ে চশমা বানাতে হ’ত। ডান চোখে মাইনাস তিন আর বাঁ চোখে মাইনাস দুই পাওয়ারের চশমাখানা যে সন্ধ্যেবেলায় চোখে লাগালাম, দোকানের আলোগুলো যা ছিল ঝাপসা তা ঝকঝকে হয়ে উঠলো একেবারে ম্যাজিকের মতো। ১৯৬৫। তখনো শ্যামবাজারের মোড়ে ঘোড়ায় চেপে উঠতে পারেন নি সুভাষ বোস। শুধুই ট্রামের তার পড়তো চোখে।

    পরের দিন ঘুম ভেঙে চশমা চোখে লাগাতেই দূরের প্রকৃতির কি অনাবিল স্পষ্ট ছবি। দূরের নারকেল গাছের পাতা যে কেমন ঝিরিঝিরি বাতাসে কাঁপে তা দেখলাম প্রথম। পুকুরের জলের ছোট ছোট ঢেউ দেখলাম, দূরের ডাকা পাখির অবয়ব কাছে এল সেদিনই। বুঝলাম আমার বাবা নিশ্চিত ভাবেই ডাঃ কে এম মিত্রর বাড়ির ইলেকট্রিকের কাজ ঠিক্ মতো করেনি। নাহলে জীবনের প্রথম পাওয়ার মাইনাস তিন থেমেছিল মাইনাস বারো’তে এসে।

    ©গৌতমদত্ত

    #

    *(আপনাদের ভালো লাগলে এই স্মৃতিভাণ্ডার উপুড় করবো আরো।)
     
     
     
  • ধারাবাহিক | ১৮ মার্চ ২০২২ | ৬৫৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    থ: ! - Bitan Polley
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • রঞ্জন রায় | 2405:201:4011:c808:7485:1260:ec8e:32da | ২০ মার্চ ২০২২ ২২:২৪505099
  • গৌতমবাবু
       ১৯৬৫ এ আমি বরানগর মিশনের ক্লাস টেন। শম্ভুবাবু স্যার চশমা চোখে সামান্য লম্বা চুল এবং সুদর্শন। তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডস্যার ছিলেন। ওঁর ডিগ্রি ছিল বিএ, বিএসসি,  বিএল। উনি নাইনে আমাদের অ্যালজেব্রার আঁক কষাতেন। চমৎকার ব্যবহার। আবার বার্ষিক অনুষ্ঠানের রিহার্সালে ওনাকে হার্মনিয়াম বাজাতেও দেখেছি। উনি জ্যোতিষ চর্চাও করতেন শুনেছিলাম। 
    অবশ্য আমি হোস্টেলে ছিলাম। এখন সেখানে ক্লাস রুম হয়েছে। মাঠে একটি মন্দির গড়ে উঠেছে। ছেলেরা বোধহয় আর খেলে না।
       খুব ভাল লাগছে আপনার লেখা। চলুক।
  • Goutam Dutt | ২০ মে ২০২২ ১৪:২৩507882
  • রঞ্জন রায় 
    ধন্যবাদ দাদা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন