ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য – ( পর্ব - ১৩ ) 

    Goutam Dutt লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১৯ মে ২০২২ | ৩৫৮ বার পঠিত

  • এ লেখা লিখতে গিয়ে গুগুল মামা’র সৌজন্যে জানা যাচ্ছে অনেককিছুই। আপনাদেরও একটু বিরক্তি ঘটাই— ।

    ভারতের বাণিজ্য শহর মুম্বাইতে ১৯৮৭ সালে চোখের ব্যাপার নিয়েই হয়েছিল একটা কনফারেন্স। সেই কনফারেন্সের কারণে এক ইতালিয়ান কোম্পানি অপ্টিকন (Opticon) নিয়ে এসেছিল এক phacoemulsification machine।

    মুম্বাইবাসী চোখের সার্জেন ডাঃ কেইকি আর মেহতা অনেক ব্যঙ্গ সয়েও কিনেছিলেন সেই ফেকোমালসিফিকেশন যন্ত্রটি। তিনি ছিলেন Mehta International Eye Institute and the Colaba Eye Hospital এর জনক। এক সাক্ষাৎকারে ডাঃ মেহতা বলেছেন যে সেসময়  আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো বেসিক থেকেই যা কিছু শুরু করবে এই ছিল ধারণা। কিন্তু সেই ধারণা পাল্টে তিনি কিনলেন এ মেশিন যাতে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্ব যেন এক্কেরে আধুনিকতম যন্ত্রের সাহায্য নিয়েই এগিয়ে যেতে পারে।

    প্রথম কেনা এই ফেকো মেশিনটি বসেছিল ডাক্তার মেহতার বাড়ির বৈঠকখানায়। মেশিন বসানোর পরে যখন ডাক্তার মেহতা এই মেশিনের একটা ম্যানুয়াল চাইলেন তখন তাদের কর্মকতা নাকি বলেছিলেন যে এ মেশিনে মাত্র চারখানা কানেকশন। তার জন্যে আবার ম্যানুয়াল কি হবে ?

    ১৯৮৮ তে তিনি উড়ে যান আমেরিকা যুক্তরাস্ট্রে ডাক্তার উইলিয়াম এফ ম্যালোনির কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করতে। তারপর থেকে আর পেছনে তাকাননি ডাক্তার মেহতা। ভারতও অর্জন করল এই নতুন মেশিনটার সুবিধে।

    https://wwwhealiocom/news/ophthalmology/20120325/father-of-indian-phaco-continues-to-build-on-legacy-of-innovation

    ১৯৭৬ সালে আত্মপ্রকাশ করা এই শঙ্কর নেত্রালয়ে এই ফেকো মেশিন এসেছিল কলকাতায় আসার অনেক আগেই। অন্তত আমার জ্ঞানমতো। সে সময়ে অবশ্য দুচার জন শঙ্কর নেত্রালয় থেকে মাস্টার্স করা চোখের ডাক্তারবাবুরা এ শহরে ছড়িয়ে পরেছেন এক নতুন দিশা দেখাতে।

    যদিও আমার বরানগরের ডাক্তারবাবু সেদিনও দেখেশুনে বলেন যে কিছুই হয়নি আমার। এসব মনের ভুল। কি আর বলি !

    মাস তিনেক বাদে আবার চেন্নাই। হয়ে গেল ছানি অপারেশন। “ডে কেয়ার প্রসেস” কথাটাও সেই প্রথম শোনা। একটু দূরের সদ্য স্থাপিত হওয়া অন্য একটি ইউনিটে অপারেশন করলেন ডাঃ রবিশঙ্কর। ঘণ্টা দুয়েক বাদেই ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে। ডান চোখে তুলোর গোল ব্যাণ্ডেজ।

    পরের দিন আবার যেতে হল সেখানেই। ডাক্তার যখন চোখের ব্যান্ডেজ খুলে দিলেন তখন যে কি এক অসাধারণ অনুভুতি হয়েছিল তা এতোদিন পরেও যেন অনুভবে আনতে পারি। চশমা ছাড়া ডান চোখে ঝকঝকে দৃষ্টি। অনেক আলো যেন ঝাঁপ দিয়ে চোখে ঢুকলো সেদিন আমার।

    মনে আছে একটা ছোট্ট আইওয়া টেপরেকর্ডার নিয়ে গেছিলাম আমি যদি ডাক্তারের পরামর্শ রেকর্ড করে রাখতে পারা যায়। অনুমতি চাইলাম। সস্নেহে দিলেন তা !  আজও খুঁজলে পাবো হয়তো সেই “TDK” ক্যাসেট যার মধ্যে ধরা আছে ডাক্তার রবিশঙ্করের আফটার অপারেশন এ্যাডভাইজ।

    *

    এরপরে আমার বাঁ-চোখ অপারেশন হয় দু’হাজার সালে।

    সেবারে অন্য ডাক্তার। আর অপারেশনের জন্য ওদের JKCN ইউনিটে এক রাত থাকতেও হয়েছিল। এ হাসপাতালটি কলেজ রোডের মূল হাসপাতালটি’র কিছুটা পেছন দিকে। সেটাও ছিল “ফেকো” সার্জারি। আমি তখন এই অপারেশনের পরের ব্যাপারগুলোয় বেশ রপ্ত।

    নির্দ্দিষ্ট দিনে যথারীতি অপারেশন হয়ে গেল। সম্ভবত দুপুরের পরে হয়েছিল এ অপারেশন। আমি একাই শুয়ে আছি। আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামল। রাত বাড়ল। তারপরে রাতের হালকাপুলকা খাবার খেয়ে একটানা ঘুম। ঘুমটা ভেঙে গেল ভোর চারটে সাড়ে চারটে নাগাদ। চোখে তখন হাল্কা ব্যথা। একটু অস্বস্তি। এরই মধ্যে সিস্টারের যাওয়া আসা। নিস্তব্ধ চারদিক। চেন্নাই এর এই অঞ্চলটা সত্যিই বেশ নির্জন। আর গাড়ির হর্ণ তো দূর-অস্ত্‌। আমাদের মেডিক্যাল কলেজের সামনে বা অন্যান্য চিকিৎসা-কেন্দ্রের বাইরে “নো-হর্ন” এর ছবি আঁকা গোল গোল বোর্ড বিভিন্ন জায়গায় লটকানো থাকলেও কে আর মনে রাখে তা !  কিন্তু চেন্নাই ব্যতিক্রম।

    ঘন্টাখানেক পার হ’ল। ঘড়ি তখন ভোর পাঁচটা আর সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই। চোখের ব্যথাটা অল্প বাড়ছে। একান্ত নিরুপায় হয়ে সিস্টার বেল-এ হাত দিলাম। বাইরের আওয়াজটা বেশ শোনা গেল। এরমধ্যেই খটখট হাল্কা শব্দে সিস্টারের পদধ্বনি। “গুড মর্নিং…ইয়েস…”

    ঋজু বেশ দীর্ঘাঙ্গী এক কেরালা-কন্যার আহ্বান। আমার সিস্টার। আমার দেবদূত। আমার ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। মধুর কণ্ঠে সেই গোল গোল শব্দের ইংরেজি অনর্গল। বললাম – সিস্টার আমার চোখটায় হাল্কা একটা ব্যথা হচ্ছে। গিভ মি সাম মেডিসিন…।

    হোমের আগুনে ঘি পড়ল যেন !  রোষায়িত নেত্রে কঠিন স্বরে প্রশ্ন ধেয়ে এল। কখন থেকে হচ্ছে এই ব্যথা ?  উত্তরে বললাম, এই ভোরে ঘুম ভাঙার পর থেকে।

    কে শোনে কার কথা !  শ্যামাঙ্গী তখন ক্রোধে আরক্ত। কতো যে অজানা অচেনা শব্দের কঠিন উচ্চারণ আমার কানের পর্দায় লহরীর পর লহরীর তুলিয়া বহে গেল সে কথা আর না বলাই উপাদেয়।

    সারাংশ যা বুঝলাম তা এই যে আমার এই চোখের ব্যথা কাল নাকি সারারাত্তির ধরেই ভোগ করেছি আমি। লজ্জায় তাঁকে ডাকিনি। বোঝানোর চেষ্টা জলেই গেল। গজগজ করতে করতে আমার ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল আমার ঘর ছাড়লেন দ্রুত পায়ে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম যেন। ব্যথা তখন কোন চোখে তা ভুলতে বসেছি।

    ওমা ! আবার খটখটিয়ে শ্যামাঙ্গীর আগমন। হাতে ট্যাবলেট। ক্রুদ্ধ ভাব বহাল তখনো। এক হাতে জলের গ্লাস আর ট্যাবলেট বাড়িয়ে ধরা অন্য হাত। বাধ্য শিশুর মতো হাত থেকে ট্যাবলেটখানা নিয়ে মুখে। আধাশোয়া আমি তখন। মুখে ঠেকলো জলের গ্লাস। ক্যোঁৎ করে গিলে নিলাম ব্যথার উপশম। চারদিক আবার নিস্তব্ধ। খটখটিয়ে আমার খাট সোজা করে দিয়ে আবার প্রস্থান কেরালীনি’র।


    নার্সকে পছন্দ হলে অর্ধেক অসুখ সেরে যায়
    শূন্যতা, ডেটলগন্ধ, ভাতে মাছি--সব ভালোলাগে

    পুরোপুরি সেরে উঠলে ডিসচার্জ--
    সেই ভয়ে ভয়ে
    বাকীটা জীবন তাই
    অর্ধেক অসুখ নিয়ে হাসপাতালে থেকে যেতে হয় ”  ( - ‘নার্স’ -  রণজিৎ দাশ।)

    ……চলবে……পরের পর্বে…
    #
    ©গৌতমদত্ত

     
  • ধারাবাহিক | ১৯ মে ২০২২ | ৩৫৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন