বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো  ইদের কড়চা

  • হৈমবতীর আমগাছ

    দময়ন্তী
    গপ্পো | ০৬ মে ২০২২ | ১৬২৮ বার পঠিত | রেটিং ৪.৮ (৪ জন)
  • তন্ময় ভট্টাচার্য | প্রতিভা সরকার | হেমন্ত দাস | শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় | মৃণাল শতপথী | কল্পর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় | দেবাশিস মল্লিক | মণিশংকর বিশ্বাস | সুকান্ত ঘোষ | সাদিক হোসেন | ডাঃ সেখ নূর মহাম্মদ | মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান শরীফ | সোমনাথ রায় | রুমা মোদক | জয় গোস্বামী | দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় | সুপর্ণা দেব | সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় | স্বাতী রায় | অনিন্দিতা গোস্বামী | ফারুক আব্দুল্লাহ | খান শামিমা হক | নীলু ইসলাম | সারিকা খাতুন | দময়ন্তী | সাদাত হোসাইন | গোলাম রাশিদ | মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায় | শারদা মণ্ডল | অমর মিত্র | হামিরউদ্দিন মিদ্যা | ইমানুল হক | নীলাঞ্জন দরিপা | চিরশ্রী দেবনাথ | সায়ন কর ভৌমিক | কৌশিক বাজারী | ঐন্দ্রিল ভৌমিক | চৈতালী চট্টোপাধ্যায় | যাজ্ঞসেনী গুপ্ত কৃষ্ণা | মোজাফ্‌ফর হোসেন | অনুরাধা কুন্ডা | মাজুল হাসান | জগন্নাথদেব মন্ডল | যশোধরা রায়চৌধুরী | কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায় | শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী | দীপেন ভট্টাচার্য | মৌ সেন | পায়েল দেব | তনুজ | রুখসানা কাজল | পার্থসারথি গিরি | ইদের কড়চা
    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক


    এক

    এই কালো বর্ডার দেয়া লাল চকচকে মেঝেগুলোর জন্য হৈমবতীর মনে বেশ একটু গর্ব আছে। ওঁর শ্বশুরের শখ ও বিশেষ আগ্রহের জন্যই ওদের দোতলার ঘরের মেঝেগুলোও লাল করা হয়েছিল। নাহলে দোতলা হবার সময় ভাইদের ইচ্ছে ছিল ফুল লতাপাতা আঁকা মোজাইক করে, একতলায় তো লাল মেঝে আছেই সবকটা ঘরে। একতলা শ্বশুরই বানিয়েছিলেন নিজের প্ল্যানে নিজের টাকায় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। তখন তিন ভাইই মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে, হৈমবতী সবে বিয়ে হয়ে এসেছেন, সামনের বছর মেজ দেওরের বিয়ে দেবার কথাবার্তা শুরু হয়েছে বাড়িতে। কিন্তু দোতলায় ঘর না তুললেই নয়। শ্বশুর তখনো চাকরিতে, শক্তপোক্তও আছেন দিব্বি। তিনি জোর দিয়ে বলায় ছেলেরাও আর আপত্তি করে নি। সেই মেঝে এই পঞ্চান্ন ছাপ্পান্ন বছর ধরে দুইবেলা মুছে মুছে এমন চকচকে হয়েছে যে খাটে বসে মুখ নীচু করলে নিজের মুখ দেখা যায়।

    শ্বশুর গেছেন আজ চল্লিশ বছর হল, শাশুড়িও কুড়ি বছর, ভাইয়েরা বাড়ি ছেড়েছে সব যে যার বিয়ের এক বছরের মাথায় মাথায়। এই এতগুলো বছর হৈমবতী একাই দেখভাল করেছেন গোটা বাড়ি। শাশুড়ি পড়ে ফিমার বোন ভেঙে শয্যাশায়ী হলে গোটা নিচের তলাটা দুই ভাগ করে ভাড়া দিয়ে দেন স্বামী, ওঁরা সেই থেকে দোতলায়। বুল্টি এসেছে। এখন হৈমকে তুলে কাপড় ছাড়িয়ে বাথরুমে নিয়ে পায়খানা স্নান করিয়ে এনে কাচা কাপড়জামা পরিয়ে ধরে ধরে নিয়ে ঠাকুরঘরের জলচৌকিতে বসিয়ে দিয়ে বিছানা পরিস্কার করতে যাবে। রেণু এসে বেতের সাজিতে ফুল তুলে চন্দন পিষে রেখে গেছে, সব কজন ঠাকুরকে এক এক করে ভেজা কাপড় দিয়ে মোছা, চন্দন পরানো জল বাতাসা দেওয়া – অনেক কাজ। ততক্ষণে বুল্টি বিছানার চাদর পালটে ঝেড়েঝুড়ে বালিশ থাপড়ে থাপড়ে ফুলিয়ে রাখবে।

    ঠাকুরঘরে বসে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যান হৈমবতী। বেশিরভাগ ঠাকুরই তাঁর শাশুড়ির বসিয়ে যাওয়া। তিনি শুধু তাঁর গুরুদেবের ছবিটা রেখেছেন। হৈমর মেয়েও এনে দু তিনটে ছবি বসিয়ে দিয়ে গেছে। বলেছিল বাবার ছবিও বসাবে, তিনি মৃদু আপত্তি করেছিলেন। মানুষকে ঠাকুরের আসনে বসাতে তাঁর মন সায় দেয় না। মেয়ে রেগে উঠে চেঁচামেচি করেছিল, পরে কেন যেন আর বসায় নি ছবিটা। ওই একটাই মেয়ে তাঁর, বাপ কাকাদের বড় আদরের মেয়ে ছিল। মুখের কথা খসাতে না খসাতে জামাটা রে খেলনাটা রে এনে হাজির করত তারা। দাদু ঠাকুমাও অগাধ প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন বরাবর, তা দাদু ঠাকুমা তো দেবেনই। তিনি নিজেও মেয়ের গায়ে কোনদিন হাত তোলেন নি, জোরে বকেন নি পর্যন্ত। এই যে এতবড় বাড়িটা, অতখানি বাগান, ব্যাঙ্কে অতগুলো টাকা রেখে গেছেন স্বামী, এর সব কিছুই মেয়ের নামে, কোনোটাই তাঁর দেওয়াথোওয়ার কোন অধিকার নেই। যতদিন বাঁচবেন শুধু ভোগ করতে পারবেন, ব্যাসস।

    রেণু চা আর মুড়ি নিয়ে এসে বাইরে থেকে তাড়া দেয়, জানলা দিয়ে অল্প রোদ্দুর আসছে। তার মানে এখনো নটা বাজে নি। বাঁ হাতে দরজার পাল্লাটা ঠেলে বন্ধ করে দেন হৈম, এই এত ঘড়ি ধরে চলা আর ভাল্লাগে না। বিয়ে হয়ে এলেন তখন বছর কুড়ি বয়স, স্বামী দেওররা সবাই সকাল সকাল অফিসে যায়, তার ভাত রে, টিফিন রে। শ্বশুর যাবেন স্থানীয় স্কুলে, তাঁর ভাতটা দশটার পরে হলেও চলবে। শাশুড়ি অনেকটাই সামাল দিতেন অবশ্য। তবু তাঁর পুজো সেরে নামতে নামতেই সকালের জলখাবার , টিফিন তৈরি করে রাখতে হত। নাহলে মুখে বলতেন না কিছুই কিন্তু ভুঁরু কুঁচকে থাকত সেই বিকেল পর্যন্ত। মেয়ের স্কুল আর তার দুই বছরের মাথায় গানের স্কুল শুরু হবার পর তো ব্যস্ততা বেড়ে গেল আরো। ভোর থেকে রাত অবধি ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা বারোটা বছর। সেসব চুকতে চুকতেই প্রথমে শ্বশুর, পরে শাশুড়ি পড়লেন বিছানায়, নাওয়ানো খাওয়ানো গু মুত সাফ সবই করেছেন দুহাতে।



    দুই

    ব্রিটিশশাসিত ভারতে যখন প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে সেই সময় টিবোর্ডের এক কর্মচারী রমেনের এক ছেলে এক মেয়ের কোলে জন্ম হল আরেকটি মেয়ের, রমেন অবশ্য আরেকটা ছেলেই চেয়েছিলেন, কিন্তু একে তো হল মেয়ে, তায় আবার জন্ম থেকেই রুগ্ন। অসম্ভব দুর্বল, রোগা রোগা হাত পা। মেয়েমানুষ সুস্থ সবল না হলে চলে কেমন করে? অনেকদিন পর্যন্ত মেয়ের কোনও নামই রাখা হয় নি, ওই পেঁচিটা কাল্টিটা এইসব বলেই ডাক হাঁক চলত। আজকাল একটু লেখাপড়া না জানলে বিয়ে হতে চায় না তাই বাধ্য হয়েই বাড়ির কাছের মহিলা শিক্ষা সমিতির পাঠশালায় ভর্তি করা। আর তাই করতে গিয়েই একটা নামও ঠিক করতে হয়। পাঠশালার হেডদিদিই বললেন এমন রোগা ক্ষয়াটে চেহারা, ওর নাম রাখুন অনিমা। সেই নামই রয়ে গেল পাকাপাকি। কদিন পরে ডাকনামও হল একটা, টুলি।

    পড়াশোনাটা অবশ্য তেমন আর হল না। হবেই বা কী করে, মাসে অন্তত বারো তেরো দিন মেয়ে ম্যালেরিয়া জ্বরে ভোগে। কাকামনি ডাক্তার, এসে বিশ্রি তেতো কুইনাইন মিক্সচার দিয়ে যায় আর মা মুখ টিপে হাঁ করিয়ে গিলিয়ে দিয়ে যায়। এমনিতে কাঁপুনি ধরলেই টুলি চুপি চুপি গিয়ে বিছানায় চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ততদিনে মায়ের কোলে আরেকটা ছোট ভাই এসেছে, তাকে ধরার জন্য মা টুলিকেই খোঁজে। আবার জ্বর এসেছে বুঝতে পারলেই ভীষণ রেগে মা প্রথমেই পিঠে হাতে কয়েক ঘা দুমদাম করে দেয়। একদিন কাঁপুনির মধ্যে মার খেয়ে দাঁতে জিভ বসে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড। সেবার কাকামণি এসে বাবাকে বেশ দু-কথা শুনিয়ে দিয়েছিল। একে রুগ্ন মেয়ে এরপরে খুঁতো হয়ে গেলে বিয়েটা হবে কী করে শুনি? তারপরে মাসখানেক মার একটু কম ছিল, মা তখন চুল ধরে টেনে মাথাটা ঝাঁকাত জোরে জোরে।

    “ধ্বনিল আহবান মধুর গম্ভীর প্রভাত অম্বর মাঝে।
    দিকে দিগন্তরে ভূবন মন্দিরে শান্তিসঙ্গীত বাজে।’’
    চোখ বুজে প্রাণ ঢেলে গাইছিল অনিমা, পাড়ায় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানে গাইবার জন্য দিলীপজ্যাঠা বাড়ি গিয়ে বাবা মায়ের মত করিয়ে এনেছে। ‘পড়াশোনায় ফেল্টুসমার্কা হলে কী হবে আমার ছোট মেয়ে গানটা গায় বড় ভাল’ বাবা সবাইকে বলে। ছোটক্লাসে যখন দুই একটা বিষয়ে ফেল করত, বাবা স্কুলে গেলে দিদিরা দুবার গানের কথা বলে ক্লাসে তুলে দিয়েছে। কিন্তু সেসব ক্লাস সিক্সের পর আর হয় নি। ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে এদ্দিনে প্রায় কুড়ি বছরে ম্যাট্রিকের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে। সেই নিয়ে ঘরে বাইরে গঞ্জনা তো লেগেই আছে, কিন্তু তানপুরায় একবার ‘সা’ ধরে নিলেই অনিমার আর কিচ্ছু মনে থাকে না। সরগম আলতো করে তুলে নেয় ওকে আলোর ঝাঁপির মধ্যে।

    টুলির মা’কে আড়ালে সবাই দারোগা বলে, তা কতকটা তাঁর বাজখাঁই গলার আওয়াজ আর লম্বা চওড়া চেহারার জন্য আর বাকিটা তাঁর অসম্ভব দাপুটে স্বভাবের জন্য। এই দাপটের জন্যই বামুনহাটে তাঁদের দখল হওয়া জমির কিছুটা ফেরত এসেছে, নতুন জমিও হয়েছে কিছু। টুলির কত্তাদাদা তাঁর এই বৌমাটিকে তাই যেমন ভালোও বাসেন তেমনি কিছুটা সমঝেও চলেন। সেই নিয়ে কত্তামার একটু ক্ষোভও আছে, তবে সে তেমন কিছু না। জমি টমি বাড়লে সংসারে সুসারই হয়। তাছাড়া টুলিরা থাকে শ্যামবাজারে, বছরে তিন চারবার আসে এদিকে। রোজের ঠোকাঠুকি লাগে না। তা সেই দাপুটে মা-ও টুলির দিদি বিয়ের কদিন পর থেকে কেমন যেন ঝিমিয়ে গেল। সেই যে দিদি অষ্টমঙ্গলায় এসে ঘরের দরজা আটকে মায়ের সাথে ঘন্টাখানিক কি ফুসুর ফুসুর করল, তারপরে দুজনেই বেরোল চোখ লাল করে, সেই থেকেই মানুষটা কেমন হয়ে গেল।



    তিন

    ঠাকুরঘরের জানলায় আমগাছের একটা ডাল একেবারে ঢুকে এসেছে প্রায়, আর ঠিক সেই জানলা লাগোয়া ডালের গাঁটটায় বাসা বেঁধেছে একজোড়া কাক। ডিম পাড়ার সময় হলে ঝাঁটার কাঠি, সরু তার আরো এটাসেটা এনে যেমন তেমন করে একটা বাসা বানায় আর অন্য সময়ে এমনিই সন্ধে হলে ডালের ওই জায়গাটায় এসে বসে দুজনে, অন্ধকার গাঢ় হলে ডানায় মাথা গুঁজে ঘুমোয়। আগে রাত্রে ঠাকুরঘরে আলো জ্বালালে দুজনেই কা কা করত। আজকাল আর ডাকে না। হৈম জিগ্যেস করেন কিরে আপেল খাবি? কাকিনী মুখ ফিরিয়ে আকাশের দিকে উদাস সুরে ডাকে ক-অ-অ-অ-অ। হৈম বলেন আরে খেয়েই দ্যাখ না, কাকিনী তুড়ুক করে একটু উপরের ডালে উঠে যায়। হৈম সরস্বতীর থালা থেকে কটা নকুলদানা তুলে জানলায় রাখেন। কাকটা বোধহয় সানশেডে বসে নজর রাখছিল, সাঁ করে নেমে এসে দুটো দানা তুলে নিয়ে যায়। কাকিনীকে দুপুরে আসিস কথা আছে বলে হৈম দরজা খুলে বারান্দায় এসে বসেন।

    লালটু এসে বসে আছে রক্ত নেবে। হৈম গুণগুণ করে আপত্তি করেন, শরীরে তেমন কোন সমস্যাও নেই আর আজ তেমন ভালও লাগছে না এসব ফৈজৎ। লালটু সিরিঞ্জ বের করে, একটা মোটা রবারের পাইপ, তুলো, গজ, কাচের টিউব ছয়টা। বুল্টি প্রেসক্রিপশান বের করে রেখেছে টেবলে, টেনে নিয়ে একঝলক দেখেই রবারের পাইপটা হৈমর বাঁ হাতের কনুইয়ের একটু উপরে বাঁধে, টেনেটুনে দেখে আরেকটু শক্ত করে গিঁট দেয়। ব্যথায় ককিয়ে ওঠেন, বুল্টি তাড়াতাড়ি হাতে ঘষে দেয় বাঁধনের নিচেটা। হৈম আবার আপত্তি করেন, এবার একটু জোরে। লাল্টু তুলোয় স্পিরিট ঢেলে কনুইয়ের ভাঁজে ঘষেই প্যাঁট করে সিরিঞ্জটা গেঁথে দেয়, পরপর ছ’টা টিউবে ভরে নেয় তাঁর রক্ত, কালচে লাল, কেমন ট্যালট্যালে মত। দেখতে দেখতে গা গুলিয়ে মাথাটা ঘুরে ওঠে হৈমর। চেয়ার থেকে হেলে ঠিক পড়ে যাবার মুহূর্তে চীৎকার দিয়ে ধরে নেয় রেণু। ধরে বিছানায় শুইয়ে দিতে দিতে লাল্টু জিগ্যেস করে মাসিমার নামটা যেন কী? ‘হৈমবতী চ...’ পুরোটা বলার আগেই বুল্টি মুখ টিপে হেসে প্রেসক্রিপশান বাড়িয়ে দেয়, দেখে নিয়ে নাম লিখতে লিখতে লাল্টুও ফিকফিক করে হাসে।

    শুয়ে শুয়ে ভাবেন আজ বোধহয় এরা আর খাওয়ার জন্য বিশেষ জোর করবে না। তাহলে ভালই, গলা দিয়ে কিছুই আর নামতে চায় না এখন। যতদিন বিয়ে হয় নি বাপের বাড়িতে খাওয়া নিয়ে বড় কষ্ট গেছে। খুব একটা অভাবের সংসার তাঁদের ছিল না, বাবার মোটামুটি রোজগার ছাড়াও গ্রামের বাড়ি থেকে চালটা তরকারিটা ফল পাকুড় শীতের দিনে গুড় আসত। কিন্তু মা ...। তবে বিয়ের পরে শাশুড়ি কোনোদিন খাওয়ার কষ্ট দেন নি, বরং প্রত্যেক গরমে অ্যলার্জিতে শরীর ফুলে ঢোল হয়ে গেলে ডালের জল, মাংসের স্ট্যু, নানারকম শরবত, দই ঘেঁটে ঘোল বানিয়ে ধরে ধরে যত্ন করে খাইয়েছেন। বাড়িশুদ্ধ সবাই চিকেন পক্সে পড়ল, হৈমর তো চোখে কানেও গুটি বেরিয়ে সর্বত্র অসহ্য যন্ত্রণা; শাশুড়ি একা হাতে সবার রান্না করেছেন, প্রয়োজনমত সেবাযত্ন। একবারও বলেন নি এগুলো করতে হবে, বরং সবাইকে বলেছেন বৌমা খুব অসুস্থ অরে কেউ ডাইক্যো না, যা লাগব আমারে বইল্যো।

    মেয়ে জামাই ফোন করবে ঘড়ি ধরে রাত আটটায়। একটাই মেয়ে, অনেক করে চেয়েছিলেন আরেকটা ছেলে কি মেয়ে হোক। স্বামী কিছুতেই রাজি হন নি। বয়সকালে রাগ হত, শরীর উথালপাথাল করত, রাগের চোটে একা বসলেই ননদ দেওরদের শাপ শাপান্ত করতেন। ওদের প্যালা দিতে গিয়েই স্বামী আরেকটা বাচ্চা নিতে চান না এই ধারণা এমন গেঁথে গেছিল মাথায় যে পাড়া প্রতিবেশী দু-একজনকেও বলেছেন। কথা চাপা থাকে নি, দেওররা বাড়ি ছাড়ার পর আর এসে রাত্রিবাস কেউ করেইনি প্রায়। দিনের দিন চলে যেত সব। তখন বুদ্ধিশুদ্ধি তেমন ছিল না, এখন এই শূন্য বাড়িতে অঢেল সময়, জীবনের রিলখানা বারেবারে চালিয়ে চালিয়ে দেখে বোঝেন স্বামী নিজেই চাননি। বিয়ে করেছেন, মেয়ে জন্মেছে ব্যসস। খাবারটা জলটা এগিয়ে দেওয়া, জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা, মেয়ের যত্ন, পড়াশোনা, গানের স্কুল সব টাইমে টাইমে টিফিন, বইখাতা গুছিয়ে দেওয়া এর জন্যই তাঁকে দরকার। স্কুলে টুলে পৌঁছে দেওয়া নিয়ে আসার জন্য পচুর মা আছে।



    চার

    টুলির নয়-দশ বছর বয়সকালে ওরা অনেকদিন বামুনহাটে ছিল, তা প্রায় আট নমাস হবে। সেই এক আগস্টমাসে শুক্রবার ঘোর বর্ষার মধ্যে কলকাতায় বেদম খুনোখুনি শুরু হল, টুলিরা কেউ সেদিন স্কুলে যায় নি, ছুটি ছিল। কদিন থেকেই নানারকম খবর শোনা যাচ্ছিল, ছোটদের বাইরে বেরোন বারণ হয়ে গেছিল শুধু নয় ছাদে, বারান্দায় দাঁড়ানও বারণ ছিল। বাবা অফিসে গেল, ডালহৌসি স্কোয়ার থেকে তিনদিন ফিরতে পারে নি, অফিসের ঘোষবাবুর বাড়ি শালকেতে কোনোমতে গিয়ে উঠেছিল কয়েকজন। এদিকে কাকামনি খবর আনে আর জি করের ওদিকটায় মুসুলমানেরা ঘিরে ধরে মেরেছে, দরজা ভেঙে বাড়ি ঢুকে মেরেছে, কেরাসিন ঢেলে পুড়িয়ে মেরেছে। মেয়েদের সর্বস্ব লুটে নিয়েছে। টুলি এই জায়গাটা ঠিক বোঝে না, চুপি চুপি দিদিকে জিগ্যেস করে সর্বস্ব মানে কি গয়না? মেয়েদের কাছে তো টাকা থাকে না, বড়জোর কয়েক আনা। দিদি বোঝায় মুসুলমানেরা মেয়েদের পেলে এমনি করে ল্যাংটা ছিঁড়ে নেয়; হাতের আঙুল বেঁকিয়ে নখ বের করে উরুর ফাঁকে ছেঁড়ার ভঙ্গি করে দেখায়। শুনে টুলি শক্ত কাঠের মত হয়ে যায়।

    এরপরের কয়েকদিনের কথা ওর আর তেমন মনে নেই, সেই যে দিদির সামনে দাঁড়িয়েছিল দিদি উঠে যাবার পরেও ইরকমই থেকে গেছিল যতক্ষণ না খেতে বসার জন্য খোঁজাখুঁজি হয়। বাবা ফেরেনি, কোনও খবরও পাওয়া যায় নি। খাবার মনও কারো তেমন ছিল না, ওই ভাতে ভাত ডালসিদ্ধ, আলু কাঁচকলাসিদ্ধ নুন দিয়ে খাওয়া। বাবা যেদিন ফিরল খবর আনল হিন্দুরাও মুসুলমানেদের পালটা মেরেছে, ওদের মতই পিটিয়ে পুড়িয়ে মেরে দিয়েছে। বলতে বলতে বাবার চোখ জ্বলজ্বল করে মোটা গোঁফ থিরথিরিয়ে নাচে, টুলির মনে হয় তাহলে কি হিন্দুরাও মেয়েদের পেলেই ... আর ভাবতে পারে না, আবার শক্ত কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মা এসে দুই গালে ঠোনা মেরে বলে ‘এই এক ন্যাকাষষ্ঠী মেয়ে দ্যাখ না দ্যাখ ভিরমি যাচ্ছে।’ দুদিন পরে ওরা বামুনহাটে চলে গেল, নাকি সেখানে মুসুলমানেরা সব প্রজা, কত্তাদাদার জুতোর নিচেই থাকে সব। ওদের রেখে বাবা আর কাকামনি আবার ফিরে এসেছিল, কলকাতায় অনেকদিন পর্যন্ত সমানেই গণ্ডগোল চলেছে এদিক সেদিক।

    কমাসের মধ্যেই স্বাধীনতার কথাবার্তা শুরু হল, শোনা গেল কুচবিহার নাকি ভারতেও যাবে না পাকিস্তানেও না এক্কেবারে স্বাধীন থাকবে। ত্তাদাদা কত্তামাকে নিয়ে বামুনহাটেই থেকে গেলেন। বললেন যা হয় হোক জমিজমা ছেড়ে সবার চলে যাওয়া ঠিক হবে না, টুলিরা ফিরে এলো কলকাতা। দুই তিন বছর আর কেউ বামুনহাটে যেতে পারে নি, কেউ আসেও নি, খেতের জিনিসও আসা বন্ধ হয়ে গেল। চারদিকে ডামাডোল, এর মধ্যেই কত্তাদাদার চিঠি এলো জমি সমানে দখল হয়ে যাচ্ছে, নতুনপাড়ার মিত্ররা লাঠিয়াল লাগিয়ে দখল করে নিয়েছে কুড়িবিঘের মত জমি। থানার দারোগা নাকি মুখ মচকে বলেছে মুসুলমানেরা ওইদিকে কেটেকুটে সব কেড়ে নিচ্ছে, মিত্ররা পালিয়ে এসেছে ওদেরও তো ছেলেপুলে নিয়ে বাঁচতে হবে। কত্তাদাদা বুড়ো হয়েছেন কদিনই বা বাঁচবেন, এখন আর জমি নিয়ে কাইজ্যা নাইবা করলেন। লাঠিয়ালদের ঠ্যাকাতে গিয়ে বজলুরের মাথা ফেটেছে। পুলিশ এসে দাঙ্গার অভিযোগে বজলুরকে গ্রেপ্তার করে হাজতে রেখেছে। ছেলেরা কেউ একবার গেলে ভাল হয়।

    টুলি যখন ফি ক্লাসে একবার দুবার করে ফেল করে ঘষটাচ্ছে তার মধ্যেই কুচবিহার পুরোপুরি ভারতের অংশ হয়ে গেল। আবার যাওয়া আসা স্বাভাবিক হল। টুলির মা গিয়ে বেশ কিছুদিন করে থেকে কিছুটা মামলা লড়ে আর কিছুটা বোঝাপড়া করে আট দশ বিঘে জমি উদ্ধারও করে ফেলল। মিত্রদের সাথে এখন আর তেমন ঝামেলা নেই, বিয়ে পৈতে মুখেভাতে কেউ কাউকে ডাকে না বটে তবে বামুনহাট কি নতুনপাড়ার দুর্গাপুজোয় দেখা হয়ে গেলে দু চারকথা বলে, মুখ ফিরিয়ে চলে যায় না কেউই। স্বাধীন দেশের প্রথম ভোটে দুই পক্ষই কংগ্রেসের হয়ে কথাও বলেছে। দিদির বিয়ে হল কলকাতায়, বর টালিগঞ্জ থানার ওসি। বাসরে গান গেয়েছিল টুলি, নতুন জামাইবাবু কত ভাল ভাল কথা বলছে ওকে, তখনই মা এসে টুলিকে ডেকে নিয়ে যায়, আর গাইতে দেয় নি সেদিন। ক্রমশ জানা যায় জামাইবাবু রোজ রাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে দিদিকে বেল্ট দিয়ে পেটায়। খাটে শুতে দেয় না, মেঝেতে শুয়ে থাকলে দিদির পিঠ পেটের উপর দিয়ে হেঁটে চলে যায়। শুধু বজলুর আর জেল থেকে ছাড়া পায় নি, ভাগাভাগির সময় কয়েদি বিনিময়ের অংশ হিসেবে ঢাকা না লাহোর কোথায় যেন চালান হয়ে গেছে।



    পাঁচ

    দুপুর আড়াইটে তিনটের দিকে বাড়িটা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যায়। রেণু সব সেরে বাড়ি যায়। বুল্টিও এই সময়টা ঘুমিয়ে নেয় খানিক। হৈম সাবধানে খাট থেকে নামেন, দেওয়াল ধরে পা টিপে টিপে গিয়ে ঠাকুরঘরের শেকলটা নামান আস্তে করে। বুল্টির ঘুম খুব গভীর যদিও, তবু যতটা সম্ভব নিঃশব্দেই চলাফেরা করেন, দুপুরের এই সময়টুকু তাঁর নিজস্ব। এখন আর কেন কী এত দশটা কৈফিয়ৎ দিতে ইচ্ছে করে না, সারাটা জীবন তো দিয়েই এলেন। ঠাকুরঘরের দরজাটা ভেতর থেকে চেপে বন্ধ করে জানালা খুলেই দেখলেন কাকিনী বসে আছে সামনের ডালটায়, পুঁতি চোখ টালুর মালুর। দুই সখীতে গপ্পো চলে – হৈমর বড় নাতবৌ ডিভোর্স চেয়েছে, মেয়ের দাপাদাপি, নাতবৌকে শিক্ষা দেবার প্রতিজ্ঞা, কাকিনী জিগ্যেস করে তা তোমার নাতি করেছিলটা কী? ওই তোমার দিদির বরের মত পেটাতো নাকি? হৈম গলা আরো নামিয়ে ফিসফিস করে বলেন বড়নাতি তো ঠিক মানুষ নয়, মেয়ের পোষা লড়ুয়ে মোরগ ও।

    হৈমর মেয়ে বাপ কাকাদের আদরের পুতুল, কিন্তু ওর মাথা তেমন পরিস্কার নয়, টেনেটুনে সেকেন্ড ডিভিশান। গান গায় সেও কুড়ি বচ্ছর সমানে দুবেলা রেওয়াজ করে মোটামুটি সুরেলা, আহামরি কিছু নয়। স্বামী বরাবর দুষে এলেন মেয়ে মায়ের মাথা পেয়েছে, ওঁরটা পেলে কাজ হত। হৈমর ভাইপোরা সব বোর্ডে স্ট্যান্ড করা, ভাইঝিরাও তুখোড়। মেয়ে আর মেয়ের বাপ বড় নাতিকে রেসের বাজি ধরে। সাড়ে তিন বছরের নাতি জেঠতুতো ভাইবোনেদের সাথে খেললে, হাসলে মেয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে বইয়ের সামনে বসায়। অতটুকু বাচ্চা খেলছে খেলুক বলায় স্বামী বলেছেন ‘নিজেও যেমন মুর্খ নাতিটাকেও ওইরকম মুর্খ বানাতে চাও? মা না ডাইনি তুমি?’ হৈম চুপ করে গেছেন। চুপ করেই দেখেছেন নাতি কেমন হাসতে খেলতে ভুলে গেল--- মা হাসলে হাসে মা গম্ভীর থাকলে সমানে ছটফট করে ---তিনবার আত্মহত্যার চেষ্টা করল ---প্রচুর বছর নষ্ট করে পাশ করে বেরোল।

    মেয়ের অনেক টাকা চাই, বড়নাতিকে পড়াতে প্রচুর ডোনেশান লাগে, জামাই বিদেশে গিয়ে থেকে গেল পনেরো কুড়ি তিরিশ বছর। মেয়ে একাহাতে সব সামলালো। হৈমরা বছরে ছয়মাস করে গিয়ে থেকে আসতেন, মূলত স্বামীই যেতেন মেয়ের কষ্ট হবে বলে। মুর্খ হৈম চুপচাপ সঙ্গে গেছেন, রেঁধেছেন বেড়েছেন খাবার গুছানো বাসনমাজা এইসব। এই ফাঁকে ছোটনাতি টকাটক বড় হয়ে, বোর্ড পরীক্ষায় কুড়িজনের একজন হয়ে একসময় স্কলারশিপ যোগাড় করে আমেরিকায় পড়তে চলে গেছে, সেখানেই চাকরি জুটিয়ে থেকেও গেছে। স্বামী মারা গেছেন আজ দশ বছর, তার আগেই ভাইদের কাউকে চল্লিশ কাউকে তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে ওদের থেকে বাড়ি আর জমির অংশ কিনে নিয়ে মেয়ের নামে করে গেছেন। শুধু ননদের নামে জমি শ্বশুড় থাকতেই লিখে দিয়ে গেছিলেন, ননদ সেখানে একটা ছোট্ট বাড়ি বানিয়েছে। তা সে ননদও মারা গেছে আজ দুই বছর হল। ননদ থাকতে ওর কাছে গিয়ে বসতেন দুটো কথা বলতেন। সেসবও ঘুচেছে। পাড়ার লোকও কেউ আর আসে না, বাগানের গাছে হাত দেওয়া নিয়ে আশেপাশের সব বাড়ির সাথেই খটাখটি হয়ে গেছে।

    কাকিনী বলে দিদি তুমি এখন কদিন একটু বেড়াতে গেলে পারো ত, তোমার না এত শখ পাহাড় দেখবার। হৈম বলেন পাহাড় তো দেখেছি রে, সেই যে শাশুড়িকে তীর্থ করাতে হরিদ্বার ঋষিকেশ সব ঘুরিয়ে আনল তোর দাদাবাবু তখনই দেখেছি। আমার শুধু দার্জিলিং যাবার বড় ইচ্ছে ছিল রে, বিয়ের পরে কতবার বলেছি, দূর দূর করে উড়িয়ে দিয়েছে। আর এখন তো ঘর থেকে ঠাকুরঘরে আসতেই দম শেষ, একেবারে ওপরে গিয়ে উড়ে উড়ে যাব। যমদুতকে বলব আমাকে দার্জিলিংটা একটু দেখিয়ে নিয়ে চল বাছা। কাকিনী কাহ কাহ করে হাসে, তুমিও যেমন! নিজের মানুষকেই কথা শোনাতে পারলে না আর ওই উনচুটে যমদুত শুনবে তোমার কথা? হৈম কিছু বলতে পারেন না। সত্যি তো স্বামী ব্যবস্থা করে গেছেন তাঁর মৃত্যুর পর সমস্ত টাকা মেয়ের নামে, সেখান থেকে মাসে দশ হাজার করে তুলে সে তাঁকে দেবে মাসের খরচ। এছাড়া নিচের ভাড়াটেদের ভাড়া আসবে তাঁর হাতে। দেওয়া থোয়ার অতিরিক্ত টাকা লাগলে মেয়েই তুলে দেবে। কি আশ্চর্য মেয়ে বা বাপ কারুরই মনে হয় নি দুহাজার কিলোমিটার ঠেঙিয়ে এসে তাঁকে টাকা দিয়ে যাওয়া মেয়ের পক্ষে প্রত্যেক মাসে সম্ভব নাও হতে পারে!



    ছয়

    স্বাধীনতাদিবসের অনুষ্ঠানে গান শুনে দিলীপজ্যাঠা আরো কয়েকজন জ্যেঠু কাকু ঠিক করেন এবারের বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে অনিমার একক গানের অনুষ্ঠান দেবেন। ওকে বলেন অন্তত পাঁচটা গান যেন তৈরি করে ফেলে। ওঁরাই বাড়ি গিয়ে বাবা মায়ের মত করিয়ে আসেন। দিদির বাসর থেকে টেনে তুলে আনবার পর থেকে টুলিকে অন্যের সামনে গাইতে দিতে মায়ের বেশ আপত্তি, তবে এত সব বয়োজ্যেষ্ঠরা বারেবারে অনুরোধ করায় আর না করতে পারে নি। বরং অনুষ্ঠানের দিন নিজের গরদশাড়ি, মকরমুখী বালা, মটরমালা আর কানপাশা দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানেই ভাগ্য খুলে গিয়েছিল অনিমার, অন্তত ওর মা তাই বলে। দর্শক শ্রোতাদের বারবার অনুরোধে সেদিন মোট আটখানা গান করতে হয়েছিল অনিমাকে, আর সেই গান শুনে, ওকে দেখে রাজেশ্বরীতলার অনিল চক্রবর্তীর জ্যাঠা তাঁর ভাইপোর জন্য বৌ হিসেবে নির্বাচন করে ফ্যালেন। ওদের পালটি ঘর, ঝপাঝপ কথা এগোয়, আগামী মাঘেই বিয়ের দিন পাকা হয়ে যায়।

    জামাই দেখতে রাজপুত্রের মত, মাস গেলে উপায় করে হাজার টাকা, ননদে দেওরে ভরা সংসার, নিজেদের বাড়ি রাজেশ্বরীতলায়, দুধেল গরু আছে খানদুই। ‘রুগ্ন কালো থপথপে মোটা কুড়ি বছরেও ম্যাট্রিক না পেরোন’ টুলির জন্য এমন পাত্র যেচে এসে নিয়ে যাবে এ ওর বাবা মা স্বপ্নেও কল্পনা করে নি। আনন্দ করে বিয়ে হয়ে যায়, টুলির আর ম্যাট্রিক দেওয়া হয় না, তবে শ্বশুরবাড়ি থেকে পরীক্ষা দেওয়াবে, গীতবিতানের কোর্সও আর একবছর বাকি আছে শেষ করাবে। বিয়ের আসরে শুধু বরের বন্ধুরা একবার মন্তব্য করেছিল ‘বাবা এ মেয়ে কোন রেশানের চাল খায় রে অনিল? এ তো তোকে ...’ ‘ব্যাসস চুপ আর একটাও অসভ্য কথা যেন না শুনি’ বরের জ্যাঠার ধমকে কথা শেষ করতে পারে নি বন্ধুরা। তা সত্যি ওর ম্যাট্রিকের জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে চেষ্টা করেছে। ননদ তখন বিএ পড়ে, তারও পরীক্ষা। তবু শাশুড়ি বিকেলের রান্না ননদকে দিয়ে করিয়ে ওকে পড়ার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন, সপ্তাহে দুদিন করে অনিল ওকে গীতবিতানে নিয়ে গেছে ক্লাস করাতে। কিন্তু নাহ, তিনবারের চেষ্টাতেও ম্যাট্রিক পাশ করতে পারল না, গানের ফাইনাল পরীক্ষাটাও আর দিতে ইচ্ছেই করল না।

    ননদ কামিনী ততদিনে বিএ পাশ করে স্থানীয় একটা স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিয়েছে। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি শ্বশুরের কাছে মেয়েকে শিক্ষিকা হিসাবে যোগ দেবার প্রস্তাব পাঠালে শাশুড়ি অবশ্য খুব আপত্তি করেছিলেন। তবে শশুর কান দেন নি। মাসের প্রথমে বেতন পেলে ননদে ভাজে কলকাতায় যায় কেনাকাটা করতে। কেনাকাটা মানে ওই একটা ব্লাউজ পিস, কটা ফুলতোলা রুমাল, কাশীর মশলা, বেঙ্গল পটারিজের পাতলা কাপপ্লেট এইসব টুকিটাকি। ননদ ভাজ দুজনেরই নিজেদের নাম নিয়ে একটু লজ্জা একটু দুঃখ আছে। দোতলা বাসের একদম সামনের জোড়া সিটে বসে এইসব দুঃখের কথা বলাবলি হয় --- ‘ দ্যাখ অনিমা আর কামিনী দুইটাই ঝিয়ের মত নাম। বাপেরা আর রাখার মত নাম পায় নাই’। অনিমা একবার ভাবে বলবে ওর একটা ভারি সুন্দর নামও আছে, ভজনকাকা দিয়েছে, তারপর ভাবে থাক আবার ভজনকাকার নাম উঠলে কি না কি অনর্থ হয়। এত বছর হয়ে গেল, ভজনকাকার কোন খবরই নেই। অশান্তি ডেকে এনে লাভ কি।

    দিদির ওপরে অত্যাচার আরো বেড়েছে, এখন দিনে দুপুরেই মদ খেয়ে এসে পেটায় জামাইবাবু। মা একদিন গিয়ে দিদির হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে সোজা শ্যামবাজার। দিদি আর ফেরত যায় নি, একটা প্রাইমারি স্কুলে কাজ নিয়েছে, প্রাইভেটে এমএ দিচ্ছে। এরমধ্যে অনিমার কোলজুড়ে সন্তান এসেছে, অনিমার চোখমুখ আর অনিলের সায়েবপানা রঙ পেয়েছে সে। কামিনীরও ভাল বিয়ে হয়ে গেছে, বিয়ের পরেই ননদাই ননদকে নিয়ে নৈনিতাল রানিখেত বেড়াতে গেল। অনিমা একবার অনিলকে বলে চল না গো আমরাও কোথাও বেড়াতে যাই। অনিল পাত্তা দেয় না, ‘ঘরের বৌ ঘরে মন টেঁকে না?’ অনিমা ভাবে গানের পরীক্ষাটা এবারে দিয়েই ফেলবে, আবার তানপুরা নিয়ে বসে, ‘সা’ ঠিক করে লাগে না কিছুতেই। আলোর ঝাঁপিটা হারিয়ে গেছে। অনিমার গা জ্বালা জ্বালা করে, প্রচণ্ড রাগ হয় সবার ওপর, সবকিছুর ওপর। কাউকে কিছু বলতে পারে না, শুধু বাগানের ফলটা ফুলটায় পাড়ার কাউকে হাত দিতে দেখলে মুখ ছোটায়, শান দেওয়া বঁটির মত কথাগুলো এফোঁড় ওফোঁড় করে কাটে বাচ্চা থেকে বুড়ো।



    সাত

    হৈম চোখ খুলে দেখেন ঘরে অনেক লোক, মেয়ে জামাই বড় নাতি নীচের দুইঘর ভাড়াটে বৌ আরো কারা সব। বুঝে উঠতে পারেন না কী ব্যপার, এত লোক কেন? এখন সময় কত? একটি অল্পবয়সি ঝকঝকে ছেলে, গলায় স্টেথো মানে ডাক্তার, মাস্কপরা মুখেই ঝুঁকে জিগ্যেস করে ‘কেমন লাগছে মাসিমা? চিনতে পারছেন আমায়?’ হৈম চুপ করে তাকিয়ে থাকেন, মুখ খুলে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। মেয়ে এগিয়ে আসে, কী যেন বলে, ডাক্তার ঘাড় নেড়ে হাতের ইশারায় অন্যদের বাইরে যেতে বলেন। ব্যাগ থেকে প্যাড বের করে কিসব লিখতে লিখতে আবার জিগ্যেস করেন ‘নাম কী আপনার? মনে আছে?’ বিরক্ত লাগে হৈমর, বলেন হৈমবতী, ডাক্তার লিখতে লিখতে থেমে গিয়ে অবাক হয়ে তাকান। মেয়ে জামাই একসাথে কিছু বলে ওঠে, ডাক্তার হাত তুলে থামান, নীচু হয়ে আস্তে আস্তে জিগ্যেস করেন ‘নামটা আরেকবার বলবেন মাসীমা, ঠিকমত শুনতে পাই নি সরি’। হৈ ম ব তী’ কেটে কেটে বলে পাশ ফেরেন। এই এক ঢঙের শব্দ হয়েছে এদের ‘সরি’, বললেই হয়ে গেল অমনি।

    কী যে হয়েছে হৈমর, একেবারে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। মেয়ে বলছে অসাড়ে পায়খানা পেচ্ছাপ হয়ে যায় নাকি। তিনি তো কিছু টের পান না, গন্ধও পান না। মুখ খুলতেই ইচ্ছে করে না, খেতেও না। আর কিছু না শুধু ঠাকুরঘরে যাওয়া হচ্ছে না, কাকিনীর সাথে গপ্পোগাছাও না। আমগাছটাই বা কেমন আছে কে জানে! এই আমগাছটা হৈমই লাগিয়েছিলেন স্বামী মারা যাবার পরে পরেই। দেখতে দেখতে কেমন তরতরিয়ে বাড়ল, ডালেপালায় হাত বুলিয়ে আদর করতে পারেন না আর। গত বছরও ঢেলে ফল দিয়েছে গাছটা। দেড় মাস ধরে দিনে দশটা বারোটা করে পড়ত খসে আর সপ্তাহে একবার করে গাছ ঝাড়া দিয়ে পাড়া হত, তাতেও প্রায় কুড়ি পঁচিশটার মত হত। নীচের ভাড়াটেরা ঝুড়ি করে তুলে রাখে। ননদের ছেলেমেয়েরা আছে, ওদের বাড়িও পাঠাতেন। তা সে ওরা বেশিরভাগ ফিরিয়ে দিত। ওঁদের উঠোনের গা লাগোয়া কোণাকুণি বাড়ির বৌটা সুযোগ পেলেই উঠোনে ঢুকে আম পাড়তে আসে। দেখলেই কটকট করে যা তা বলেন হৈম।

    তা সেই শ্বশুরের পরে এই বাগান তো তিনি একাই দেখভাল করে আসছেন। শাশুড়ি বা তাঁর ছেলে কারুরই বাগান নিয়ে কোন মাথাব্যথা ছিল না। শাশুড়ি হৈমকে এমনি খাইয়েছেন মাখিয়েছেন যত্ন করেছেন কিন্তু রাত সাড়ে দশটার আগে কোনোদিন নিজের ঘরে যেতে দেন নি, স্বামী অফিস থেকে এসে অনেকসময় ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকতেন, কিন্তু শাশুড়ি হৈমকে চা টুকু হাতে করেও যেতে দিতেন না। হয় অন্য কাউকে দিয়ে পাঠাতেন, নয়ত নিজেই নিয়ে যেতেন। পাশের জানালায় ঠুকঠুক আওয়াজ শুনে ঘাড় ফিরিয়ে অবাক হয়ে গেলেন হৈম, ওমা উত্তরের উঠোনের আমগাছ পুবের জানালার পাশে চলে এসেছে কী করে? আর ওই তো কাকিনী বসে, পুঁতিচোখ ঝিকমিক। ম্যাজিক হৈমদিদি, কাক বলে মোটা গলায়। হৈমর হঠাৎ মনে পড়ে বড়নাতি আর নাতবৌকে একসাথে ডাক্তার দেখাতে বলেছিলেন বলে মেয়ে জামাই এমন ব্যবহার করেছিল, এমন সব কথা বলেছিল যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। নাটক করছেন বলে বেরিয়ে গেছিল ওরা, নিচের এক ভাড়াটে ডাক্তার ডাকে, ওষুধ এনে খাইয়ে সুস্থ করে। কমাস হল যেন? নাকি এক বছর? মাথাটা ধোঁয়া ধোঁয়া লাগে।

    মেয়ে হলে ভেবেছিলেন মেয়েটা তো তাঁরই রক্তমাংসে তৈরি হয়ত তাঁর কথা বুঝবে শুনবে। তা সেও তার বাপের মতই হল, মাকে তার প্রয়োজন খাবার বানানো বিছানা গোছানো আর কাপড় ইস্তিরির জন্যই। কাকিনী ঠোঁট দিয়ে জানালার শিকে জোরে জোরে ঠকঠক করে – ‘আবার ওইসব বলছ? যখন বলার ছিল তখন মুখ বুজে রইলে এখন কী ছাইএর মাথা হবে বলে? দেখি হাতটা বাড়াও দেখি’। হাত বাড়ালেন। অমনি সেটা জানালা অবধি পৌঁছেও গেল। কী অবাক কাণ্ড সব হচ্ছে যে আজ! কাক আর কাকিনী হৈমর কড়ে আর বুড়ো আঙুলে আলতো আদরে ঠোকরাতে থাকে --- ভারি আরাম লাগে --- আরামে চোখ বন্ধ হয়ে আসে --- ‘চোখ খোলো গো’ কাকিনীর গলা --- আরে আরে আমপাতার ফাঁকে ফাঁকে সাদা সাদা ও কী? রোদ্দুর বুঝি? --- না তো ওই তো কাঞ্চনজঙ্ঘা, বরফচুড়ো --- কত্ত রঙ রে কাকিনী --- লাল হয়ে কমলা হয়ে গেরুয়া হয়ে সোনার মত ঝকঝক। ওই তো সব পাহাড়ের ঢালে ঢালে লাল টুকটুকে তিনকোণা ছাদের বাড়ি, চা বাগান, ঠিক যেমন ভাগ্নের অ্যালবামের ছবিতে ছিল --- আলোর ঝাঁপি উপুড় হয়ে পড়ে আলোয় ভাসিয়ে দিচ্ছে যেন বা!



    আট

    দোতলার পুব দক্ষিণ খোলা ঘরটায় বসেছে ওরা, মেয়ে জামাই আর বড় নাতি। দোতলাটা বন্ধ করে পরশু ফেরত যাবে, তার আগে আলমারির কাগজপত্র দেখে নেওয়া, গয়না কিছু আছে বের করে ব্যাঙ্কের লকারে জমা করা। ডেথ সার্টিফিকেটে নামটা পড়তে পড়তে নাতি একটু হেসে ফ্যালে ‘মা দিদুভাই কেমন কিছুতেই নিজের নাম বলত না’ – মেয়েও হেসে ফ্যালে ‘হ্যাঁ ওই এক অদ্ভুত অবসেশানের মত হয়ে গেছিল মা’র, নিজের নামটা স্বীকার করতে চাইত না।’ দুইখানা আলমারি খুলে মেয়ে একটা একটা করে জিনিস নামায়। ঘন্টাখানেক ধরে সব গোছগাছ করে গয়নাগুলো বের করে থলিতে ভরে আলমারি বন্ধ করার আগে লকারের ভেতরে একবার হাত বুলিয়ে দেখে নিতে গিয়ে একেবারে শেষ প্রান্তে কী যেন হাতে ঠ্যাকে। কোনোমতে হাত ঢুকিয়ে একটা চৌকো বাক্স বের করে আনে মেয়ে, কাশ্মীরি কাঠের কাজ করা বাক্স। দীর্ঘ অব্যবহারে বাক্সের কবজায় জং পড়ে আটকে গেছে। খানিকক্ষণ চেষ্টার পরে খুলল। ভেতরে কিছু পুরানো চিঠিপত্র, গীতবিতানের রসিদ কটা, ওর অন্নপ্রাশনের কার্ড। সবার নীচে একটা এয়ারমেলের খাম। মা-কে এয়ারমেলে কে চিঠি লিখেছিল? অবাক হয়ে খাম থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করে খুলে ধরে –

    স্নেহের হৈমবতী
    বহু বৎসর তোমাদিগের কোনওরূপ সংবাদ পাই না, পাইবার কোনও উপায়ও জানি না। তথাপি স্নেহদুর্বল মন আমার তোমাদিগের সংবাদ পাইবার উপায় খুঁজিয়া ফেরে। আশা করি সর্বকুশল তোমাদিগের। তুমি এতদিনে সম্ভবত বিদ্যালয় সমাপ্ত করিয়াছ, তোমার পিতাকে বলিয়া তোমার নিতান্ত অপছন্দের নামটি বদলাইয়া লইতে পারিয়াছ কি? আমার নিকটে তুমি হৈমবতীই, নিতান্ত তুচ্ছজ্ঞানে যে অনিমা নামটি তোমাজন্য নির্দিষ্ট হইয়াছিল উহা তোমার উপযুক্ত নহে কদাপি। স্বয়ং মাতা শ্রী সরস্বতী দেব্যা তোমার কণ্ঠে অধিষ্ঠান করেন, তোমার মনোকষ্টের কোনই কারণ নাই।
    অত্র সংবাদ এই যে আমি বর্তমানে রাজশাহী শহরে বাস করিতেছি। তোমার পিতামহ হয়তো এতদিনে গত হইয়াছেন, পরম করুণাময় তাঁহার সর্বশান্তি বিধান করুন। তিনিই আমাকে লিখিতে পড়িতে শিখাইয়াছিলেন, তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। সংবাদপত্রে দেখিয়া থাকিবে আমার এই দেশ অতি দুঃসময়ের মধ্য দিয়া গিয়াছে। অবশেষে স্বাধীন হইয়াছি আমরা এই এক সুখ। তোমাদের সকল ভ্রাতা ভগিনীকে দেখিতে বড় ইচ্ছা করে, বয়স হইয়াছে আর অন্য দেশে যাইবার উপায় সকলও বড় জটিল লাগে। এ জীবনে আর দেখা না হইলেও এই বৃদ্ধ সর্বদা তোমাদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী রহিবে।
    হৈম মা আমার, তোমার বিবাহের পরে স্বামীকে বলিও তোমাকে হৈম নামে ডাকিতে। বিশ্রী নামটি মুছিয়া ফেলিও। আমার অশেষ স্নেহাশীর্বাদ লইও সদা সুখী রহিও, তোমার কণ্ঠসুধায় পূর্ণ রাখিও সংসার।

    আশীর্বাদান্তে
    ইতি
    তোমাদের ভজনকাকা


    চিঠির কোথাও কোন তারিখ নেই, পোস্ট অফিসের ছাপও নেই, খামের পেছনদিকে খুব ছোট অক্ষরে লেখা ‘বজলুর এলাহি / রাজশাহী / বাংলাদেশ।’ তিনজনে এ ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বাইরে আমগাছে দুটো কাক একটানা ডেকে যাচ্ছে।

    তন্ময় ভট্টাচার্য | প্রতিভা সরকার | হেমন্ত দাস | শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় | মৃণাল শতপথী | কল্পর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় | দেবাশিস মল্লিক | মণিশংকর বিশ্বাস | সুকান্ত ঘোষ | সাদিক হোসেন | ডাঃ সেখ নূর মহাম্মদ | মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান শরীফ | সোমনাথ রায় | রুমা মোদক | জয় গোস্বামী | দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় | সুপর্ণা দেব | সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় | স্বাতী রায় | অনিন্দিতা গোস্বামী | ফারুক আব্দুল্লাহ | খান শামিমা হক | নীলু ইসলাম | সারিকা খাতুন | দময়ন্তী | সাদাত হোসাইন | গোলাম রাশিদ | মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায় | শারদা মণ্ডল | অমর মিত্র | হামিরউদ্দিন মিদ্যা | ইমানুল হক | নীলাঞ্জন দরিপা | চিরশ্রী দেবনাথ | সায়ন কর ভৌমিক | কৌশিক বাজারী | ঐন্দ্রিল ভৌমিক | চৈতালী চট্টোপাধ্যায় | যাজ্ঞসেনী গুপ্ত কৃষ্ণা | মোজাফ্‌ফর হোসেন | অনুরাধা কুন্ডা | মাজুল হাসান | জগন্নাথদেব মন্ডল | যশোধরা রায়চৌধুরী | কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায় | শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী | দীপেন ভট্টাচার্য | মৌ সেন | পায়েল দেব | তনুজ | রুখসানা কাজল | পার্থসারথি গিরি | ইদের কড়চা
  • গপ্পো | ০৬ মে ২০২২ | ১৬২৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    মন - Bitan Polley
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • শক্তি | 49.37.36.87 | ০৬ মে ২০২২ ১৭:১৭507313
  • খুব মন কেমন করানো গল্প---মর্মস্পর্শী যাকে বলে
  • নিনা গাঙ্গুলি | 2601:83:8001:5530:ddc1:91f1:42f9:5514 | ০৭ মে ২০২২ ০৩:৪৬507332
  • মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা - কি সুন্দর তোমার বুনন - একটির সঙ্গে একটি একটি করে মিলিয়ে অপূর্ব কাজ দমু! খুব ভাল লাগল। তোমার লেখার ধরণটি তোমার মতনই আপন রঙে উজ্জ্বল - ভালবাসি !
    আরও পড়ার সাধ রইল।
    নিনা
  • Mousumi Banerjee | ০৭ মে ২০২২ ১১:১৯507341
  • খুব ভালো লাগল। মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা। অনামিকা থেকে অণিমা থেকে হৈমবতী হয়ে চলার পথের কত কথা! 
  • Prativa Sarker | ০৭ মে ২০২২ ১২:১৩507342
  • সব মেয়েদের আর কিছু না হোক একটা করে কাকিনী তো জুটুক। 
    মন ভার হয়ে গেল। আত্মজরা কেউই বোধহয় ব্যতিক্রম হয় না। আমি নিজেই কি? বড় কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিলে লেখক! 
  • Mousumi Banerjee | ০৭ মে ২০২২ ১৩:৪১507349
  • @প্রতিভা সরকার 
     
    সত্যিই। একটা আমগাছও দরকার।
  • r2h | 134.238.18.211 | ০৭ মে ২০২২ ১৬:১০507351
  • দময়ন্তীদির গল্পগুলি, এটা হয়তো আমার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়াই, এত বাস্তব, অতর্কিত, আর ইনএভিটেবল, ধ্রুপদী ট্র‌্যাজেডির মত কিন্তু অনাড়ম্বর, যে হৈমবতীর গল্প পড়লে রুখু সুমুর মা, রুমামিস, বাবাই, মঙ্গলা সবার কথা মনে হয়, যেন একটা দময়ন্তীর ভুবন টাইপের ব্যাপার আছে, যেখানে চরিত্ররা কোথাও না কোথাও লতায় পাতায় জড়িয়ে।
  • π | ০৮ মে ২০২২ ১০:৩৩507393
  • হুতোর মন্তব্যের খেই ধরেই কিছু বলার ছিল, লিখবো একটু সময় করে। আপাতত এটুকুই লিখে গেলাম।
  • ইমানুল হক | 203.171.246.110 | ০৮ মে ২০২২ ১১:২৮507397
  • ভালো লেখা।
     
  • surya dipta Nag | ০৮ মে ২০২২ ১১:৩৯507400
  • অদ্ভুত সুন্দর এবং জলের মতো বয়ে যাওয়া ন্যারেটিভ। 
  • সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য | 110.226.238.121 | ০৮ মে ২০২২ ১৩:২৭507403
  • চোখ ভিজে এল।
    অসাধারণ 
  • Sangita Saha | 2405:8100:8000:5ca1::282:808 | ০৮ মে ২০২২ ২৩:২৮507427
  • আমার ঠাকমা এরম ছিল। কে একটা ফুলগাছের পাতায় হাত দিলেও কি ক্যাঁচ ক্যাঁচ করত বুড়ি। তার মনে দুখ ছিল কিনা ত জিজ্ঞাস করি নি কখনো। এই গল্পটা আমার কাছে রেখে দেব। 
  • kk | 2601:448:c400:9fe0:b5af:f49:49c3:b58f | ০৮ মে ২০২২ ২৩:৩৪507430
  • মনখারাপ করে দেওয়া গল্প। সত্যির গল্প। পড়ার পর কেন যেন লীলা মজুমদারের 'ঝাঁপতাল' গল্পের কথা মনে এলো। যদিও কোনো মিল নেই, তবু।
    হুতোর বক্তব্যের সাথে একমত।
  • রুখসানা কাজল | 103.217.111.25 | ১১ মে ২০২২ ১০:১৩507505
  • ভালো লাগার নকশীকাঁথা বুনে গেলে। ফুল পাতার  একেকটি ফোঁড় যেন একেকটি  রক্তাক্ত গল্প।  
  • | ১৪ মে ২০২২ ১৫:১৮507620
  • শক্তিমাসীমা, নীনা,  পড়েছেন, পড়েছ ধন্যবাদ। 
     
    মৌসুমী, হ্যাঁ নিজের একটা পছন্দসই নাম কজনই বা পায়। 
     
    প্রতিভা,  কাক শালিখ টিকটিকি কিছু একটা খুঁজে নিতে পারলে জমজমাট সঙ্গীহীন সংসারগুলো সহনীয় হয়ে ওঠে আর কি। 
     
    হুতো, মন্তব্যটা পড়ে রীতিমত চমকেছি। 
     
    পাই, লিখে ফ্যালো। অপেক্ষায় আছি। 
     
    ইমানুল, সূর্যদীপ্ত, সঙ্গীতা, ধন্যবাদ জানবেন। 
     
    কেকে, তুমি নিয়মিত পড়ো, কি আর বলি। খুশী। 
     
    কাজল,  আসলেই রক্তাক্ত গল্পেরা লুকিয়ে থাকে এদিক ওদিক।
  • পাঠক | 2405:8100:8000:5ca1::123:9a73 | ১৫ মে ২০২২ ১০:৪৯507652
  • চমৎকার ন্যারেশান।  অনেকগুলো ছোট ছোট গল্প উঁকি দিয়ে গেল। এটা উপন্যাসের দাবী রাখে।
  • অনুরাধা কুন্ডা | 2409:4061:20b:6b4c:8d94:597e:afd7:9c50 | ১৮ মে ২০২২ ১১:৩০507801
  • মুগ্ধ হলাম। 
  • মুস্তারী বেগম | 45.112.70.140 | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২০:৫৫511759
  • খুব ভালো
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন