• বুলবুলভাজা  গপ্পো  শরৎ ২০২১

  • ইনি আর উনির গপ্পো

    সুস্মিতা কুণ্ডু
    গপ্পো | ১৪ অক্টোবর ২০২১ | ৫৫১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৪ জন)
  • স্কেচ ৬ | পানুর মেটামরফোসিস | চালচিত্রের চালচলন | কেমন আছে ওরা? | চাও করুণানয়নে | পুত্রার্থে | সই | আপনি যেখানেই থাকুন | কিসসা গুলবদনী | জনৈক আবহ ও অন্যান্যরা | গুচ্ছ কবিতা | অমল রোদ্দুর হয়ে গেছে | ইনি আর উনির গপ্পো | দুগ্গি এল | দুর্গারূপে সীতা, ভিন্নরূপে সীতা | প্রিয় অসুখ | শল্লকী আর খলিলের আম্মার বৃত্তান্ত | রানার ছুটেছে তাই | বিসর্জনের চিত্রকলা | কল্পপ্রেম | লম্বা হাত খাটো হাত | কেন চেয়ে আছো গো মা, মুখ পানে! | ছোট্ট পরীর জন্মদিন | জাপানি পুতুল | আধাঁরে আলোঃ শারদ সাহিত্য | ইন্দুলেখার ইতিকথা | মুর্শিদাবাদ | এই দিনগুলি | জ্বিন | জোনাকি এবং ডোরেমিরা | বাসায় চুরি | বিশ্বকর্মার গুপ্তঘট | দুর্গাপূজা - দুটি প্রবন্ধকথা | টিউশন | ফেরা | মায়া | বন্দী | মেয়েদের কিছু একটা হয়েছে | কেল্লা নিজামত | সীতারাম | দড়াবাজি | মায়াফুলগাছ | যখন শ্যামের দ্বারে | কুয়াশা মানুষের লেখা | সময় হয়েছে নতুন খবর আনার | শরৎ ২০২১
    আঁকা - সুকান্ত মন্ডল



    ইনি আর উনি থাকে খেয়ালঝুরি জঙ্গলের ধারে, মধুমালতি মাসির বাঁশবাগানের পেছনের ওই গেরস্ত বাড়িটায়। ভাঁড়ারঘরের এক কোণের একটা ছোট্ট গর্তে ওদের বাসা। সংসারে রাজ্যের হাঁড়িকুড়ি ঢেয়োঢাকনার আড়ালের ওই গর্তটুকুনি কেউ বিশেষ নজর করেনি কখনও। ওইটিকেই সাজিয়েগুজিয়ে বাড়িয়েচাড়িয়ে বসবাসের যুগ্যি তয়ের করেছে দু’টিতে। একটা পুরনো ফেলে দেওয়া কাঠের বাক্সে কমলি গাইয়ের গোয়ালঘর থেকে কুড়িয়ে আনা খড়ের টুকরো বিছিয়ে হয়েছে তাদের পালঙ্ক। গেরস্তবাড়ির খুকিটার পুরনো নীল জামার টুকরো দিয়ে হয়েছে ইনির বালাপোশ আর খোকনের লাল জামা হয়েছে উনির লেপ। ইনির আবার একটা সাজগোজ করার আয়নার ভারি শখ। তাই একটা ভাঙা কাচের টুকরো আর কতকগুলো দেশলাইয়ের খোল দিয়ে ড্রয়ারওয়ালা বাহারি আয়না বানিয়ে দিয়েছে উনি। যতই হোক গিন্নির আবদার, সেটা কি আর কত্তা ফেলতে পারে? এদিকে আমাদের ইনিও কিন্তু ভারি গুছুনে স্বভাবের। সারাক্ষণ তার এই ছোট্ট গর্ত ঘরটিকে সাজাতেই ব্যস্ত। গেরস্তবাড়ির গিন্নিমায়ের সিল্কের শাড়ি গিয়ে গর্তের হেথাহোথা ফাটাফুটোয় পর্দা বানিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে ইনি। দুই ইঁদুর কত্তাগিন্নি মিলে দিব্বি আছে গেরস্তবাড়ির ভাঁড়ার ঘরের।

    দিব্বি আছে এটা বলা অবিশ্যি ভুলই হবে। কারণ জীবনে তো আর ঝামেলার অভাব নেই। সে তুমি ইয়াব্বড় হাতি হলে যেমন নানা সমস্যা আছে তেমনি একটা পুচকে ইঁদুর হলেও বিপদের শেষ নেই। ইনি আর উনির শান্তির জীবনে তেমনি একটা বালাইয়ের নাম হল বগাই। তার নজর এড়িয়ে কিচ্ছুটি করার জো আছে? সারাদিন ওই ভাঁড়ার ঘরের পুব কোণের গর্তটার সামনে ওঁৎ পেতে বসে থাকবে হতচ্ছাড়াটা। ইনি আর উনি যদি একবার গর্ত থেকে মাথা বার করে উঁকিঝুঁকি মেরেছে ওমনি খপাৎ, কপাৎ আর গপাৎ। কপাৎ করে ধরতে অবিশ্যি পারে না, গপাৎ করে গিলতেও পারে না তাই। কিন্তু খপাৎ করে বড় বড় নখওয়ালা থাবা মেরে বগাই শয়তানটা সেদিন উনির ল্যাজের ডগাটা ‘নেই’ করে দিচ্ছিল আরেকটু হলেই।

    বুঝলে না তো? রোসো তবে খুলেই বলি। বগাই হল একটা গাব্দাগোব্দা ছাইরঙা বেড়াল। ঝামরি ঝুমরি লেজ। একটা চোখ তার নীল আর একটা চোখ সবুজ। গেরস্তবাড়ির গিন্নিমার ভারি পেয়ারের বেড়াল সে। বিশেষ করে ওই নীল আর সবুজ চোখের জন্য বগাইয়ের ভারি গরব। হাজার বদমাইশি করলেও গিন্নিমা তাকে মোটেই বকাঝকা করেন না, শাস্তিও দেন না। সেই সুযোগ নিয়ে বগাই সব দোষ চাপায় ইনি আর উনির ঘাড়ে। বগাই এ বাড়িতে আসার পর থেকে ইনি আর উনির সুখের জীবনে কাঁটার মত গেঁথেই আছে। মাছের চুপড়ি থেকে ল্যাজাটা মুড়োটা তুলে নিয়ে থাবা চাটতে চাটতে ইনি আর উনির গর্তের দিকে চেয়ে মুখ তুলে ছলোছলো চোখ করে করুণ সুরে ডাকবে ‘মিয়াঁও’! ওমনি গিন্নিমা এসে দুষতে থাকবেন ‘উফ কী উৎপাতই না হয়েছে ইঁদুরের! আজ মাছ চুরি করেছে, সেদিন লেপতোষক ছিঁড়ে কুটিকুটি করেছিল! দাঁড়া আজই ইঁদুর ধরার কল কিনে আনব বাজার থেকে। দেখাচ্ছি মজা বজ্জাতগুলোকে! চল রে বগাই সোনা। তোকে দুধুভাতু দিই।’
    কী সাঙ্ঘাতিক অন্যায় তোমরাই ভাবো একবার। বগাই দোষ করেও পেল দুধভাত আর ইনি উনির কপালে জুটল ইঁদুর ধরার কল!

    তোষকটা নষ্ট করাটাও তো বগাইয়েরই কীর্তি! সেদিন গিন্নিমা ছাদে রোদ্দুরে দিয়েছিল রাজ্যের জিনিস। লেপ, বালিশ, তোষক, বেনারসি শাড়ি, ধান, আচারের বয়াম, আমসত্ত্ব, আরও কত্ত কী। বগাই একটা তোষকের ওপর দিব্বি আরামে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমচ্ছিল। সেই সুযোগে যেই না ইনি ছাদে গেছে শুকোতে দেওয়া ধান থেকে দু’চারটি খুঁটে আনবে বলে, ওমনি বগাই বজ্জাতটা ফ্যাঁসসস করে দাঁত নখ বার করে তেড়ে এল। আর সেই করতে গিয়েই তোষকে ওর ধারালো নখ বিঁধে ঘটল বিপত্তি। কাপড়টা ছিঁড়ে গিয়ে রাশি রাশি তুলো চারিদিকে উড়ল। কিন্তু সে কুকম্মের দায় চাপল গিয়ে ইনি আর উনির ঘাড়ে! বোঝো তবে অনাচারটা!


    নাহ! এভাবে তো আর দিনের পর দিন চলতে পারে না। কিছু একটা বিহিত তো করতেই হবে। সেই ভেবেই ইনি আর উনি গিয়েছিল মধুমালতি মাসির কাছে। গেরস্তবাড়ি আর খেয়ালঝুরি জঙ্গলের সীমানা বরাবর আছে একটা বিশাল বাঁশবাগান। সেই বাঁশের ফাঁকে ফাঁকেই জাল বুনে বাস করে মধুমালতি মাকড়শা। বহুদিনের বাস তার ওই তল্লাটে। সবাই মধুমালতি মাসি নামেই ডাকে ওকে। ইনি আর উনি তাই ঠিক করল মধুমাসির কাছেই যাবে। মধুমাসির বানানো জালের সুনাম এই খেয়ালঝুরি এলাকার সকলের মুখে মুখে। মধুমাসি যদি একটা শক্তপোক্ত জাল বুনে দেয়, তাহলে ব্যাটা বগাইটাকে জব্দ করা যায় বেশ। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। ইনি আর উনি দুই কত্তা গিন্নি খুরখুরিয়ে তুরতুরিয়ে লেজ দুলিয়ে ছুটল মধুমাসির কাছে। মধুমাসি তো তখন বাঁশবাগানের পাশের তেঁতুলগাছের কোটরের টিয়েপাখির ছানাদের জন্য মশারি বুনছিল। টিয়েছানাদের নাকি ভারি মশায় কামড়ায়। বেচারাদের গায়ে তো এখন পালক গজায়নি তাই দুষ্টু মশারা এসে প্যাঁক প্যাঁক করে হুল ফুটিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।

    ইনি আর উনিকে দেখে তো মধুমালতি মাসি খুব খুশি হল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গেরস্তবাড়ির সব খবর জানতে চায়। খুকি কেমন আছে, খোকন কেমন আছে, গিন্নিমায়ের গাঁটের ব্যাথা কমেছে কিনা, এইসব নানা কথা। আসলে এক কালে মধুমালতি মাসি ওই গেরস্ত বাড়ির ভাঁড়ার ঘরের কুলুঙ্গিতেই জাল বুনে থাকত কিনা। তারপর যখন গেরস্তবাড়ির মাটির দেওয়াল খড়ের চাল ভেঙ্গে নতুন ইটের গাঁথনি হল, ঢালাই ছাদ হল তখন আর ধুলোময়লা ঝুলের স্থান কোথায় সেথা। মধুমালতি তাই তার বহুদিনের বাস গুটিয়ে চলে এল এই বাড়ির পেছনে বনের ধারের বাঁশবাগানে। সেই থেকেই এখানে আছে। ভালোই দিন কাটে তেঁতুলগাছের টিয়ে পরিবার, বাঁশ বাগানের পাশের চাঁদনি দিঘির রুই মাছের পরিবারের সঙ্গে গল্পগাছায়। খেয়ালঝুরির জঙ্গল থেকে প্রায় এ উড়ে আসে টুইটুই টুনটুনি, বাবুই আরও কত্ত জনা। হংসবতীও আসে তার পাঁচ ছানাকে নিয়ে মাঝেমাঝে চাঁদনি দিঘির জলে গুগলি খেতে। আর আসে ইঁদুর দম্পতি ইনি আর উনি। ওদের থেকেই মধুমালতি মাসি তার পুরনো বাসার সব খবরাখবর পায়।

    ইনি আর উনির মুখে বগাই বিড়ালের অত্যাচারের কথা শুনে তো মধুমালতির আটটা চোখ উপচে জল বেরিয়ে আসার উপক্রম। গিন্নিমা তো চিরটাকালই ওরকম। কার দোষ সেটা ভালো করে দেখার আগেই নিদেণ দিয়ে দেবে। খুকি দোষ করলে কখন খোকন বকুনি খেত আবার কখন খোকনের দুষ্টুমির শাস্তি পেতে হত খুকিকে। তবে বগাইয়ের অত্যাচার যেন বড্ড বেড়ে গেছে, প্রায়ই নালিশ শোনে ওর নামে অনেকের থেকেই। ইনি আর উনিকে সাহায্য তো করতেই হবে। সে বেচারারা করুণ সুরে অনুরোধ করেছে মধু মাসিকে একটা জাল বুনে দেওয়ার জন্য। সেই জাল দিয়ে বগাই বেড়ালকে কব্জা করবে ওরা।

    মধুমালতি বলে,
    - “চিন্তা করিসনে বাছারা! আমি এইসান লোহার মত শক্ত আর গঁদের আঠার মত আঠালো জাল বুনে দেব যে বগাই বেড়াল আর পালাতে পথ পাবে না। তোরা বরং বাড়ি গিয়ে কী করে ফাঁদটা পাতবি সে ব্যবস্থা কর। আমি ক’টাদিনের ভেতরেই জাল তয়ের করে রাখছি।”

    যেমনি কথা তেমনি কাজ। ইনি আর উনি তো আনন্দে নাচতে নাচতে বাড়ির পথ ধরল। এবার বড় চিন্তা হল বগাইকে কী করে এমন বেকায়দায় ফেলা যায় যাতে ও মধুমাসির বুনে দেওয়া জালে এসে ধরা দেবে! ইনি বললে,
    - “তুমি কিচ্ছুটি ভেবো না উনিমশাই! আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে!”
    উনি আগ্রহ ভরে বলে,
    - “কী বুদ্ধি গো ইনিগিন্নি?”
    ইনি বলে,
    - “সে সময় হলেই ঠিক বুঝিয়ে বলব’খন।”
    ইনির মনে সেদিনের গিন্নিমার কথাগুলো ভাসতে থাকে। ভাঁড়ার ঘরের দরজার আড়ালে লুকিয়ে তক্কে তক্কে ছিল সেদিন ইনি। গিন্নিমা বাসি রুটিগুলো চৌকির ওপর রেখে কত্তাবাবুকে বাজারের থলি দিতে গেলেই, কয়েক টুকরো তুলে আনবে বলে। তখনই কানে এল গিন্নিমা বলছেন,
    - “সামনেই খুকি আর খোকনের জোড়া জন্মদিন। বাজারে সনাতন মাছওয়ালাকে বলে রেখো একটা বড় দেখে কাতলামাছ যেন পাই এবার। গেল’বারের মত ওই এক দু’সেরি হলে মোটেই নেব না, সেটা আগেভাগেই শুনিয়ে দিও।”

    কে না জানে বগাই বেড়াল কাতলা মাছের মুড়ো দেখলে জিভের জল ধরে রাখতে পারে না। ওই সুযোগটাকেই বুদ্ধি করে কাজে লাগাতে হবে। শুধু মাছ আসার আর জাল পাওয়ার অপেক্ষা।

    দেখতে দেখতে খুকি আর খোকন, দুই যমজ ভাইবোনের জন্মদিন এসেই গেল। সকাল থেকেই কত বাজার। কত তোড়জোড়। কত সাজগোজ। গিন্নিমা রান্না নিয়ে ব্যস্ত। ওদিকে খেন্তিপিসি ছাইয়ের গাদার ধারে বসে বিশাল কাতলামাছ কেটে কুটে ধুয়ে বেছে চুপড়িতে এনে রেখেছে হেঁশেলের সামনে। কত্তাবাবু ঘর সাজানোর তদারকিতে ব্যস্ত। খুকি আর খোকনের বন্ধুরা আসবে সব। কত মজা হবে, আনন্দ হবে, হইহুল্লোড় হবে।

    ওদিকে উনি সক্কাল সক্কালই গিয়েছিল বাঁশবাগানে মধুমালতি মাসির কাছে। কচুপাতায় মুড়ে এনেছে সেই বিশেষ জাল। বেকায়দায় খালি হাতে ধরলে নিজেরাই জড়িয়ে যাবে জালে। খুব সাবধান তাই। এবার বগাইকে একবার ফাঁদে ফেলতে পারলেই হয়।

    খুকি আর খোকন একটা লাল রিবন বেঁধে দিয়েছে বগাইয়ের গলায়। সেই নিয়ে কী গরব বগাইয়ের! নাক উঁচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইতিউতি। কিন্তু সেই নাকেই কাতলা মাছের মুড়োর আঁশটে গন্ধ সেঁধিয়েছে। আর রক্ষে আছে! উঠোনের মাছের চুপড়ির দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে তাকাচ্ছে। ইনি আর উনিও কচুপাতায় মোড়া জাল নিয়ে তক্কে তক্কে আছে। বগাই ওদিকে ঠিক সুযোগ বুঝে চুপড়ি থেকে ইয়াব্বড় মাছের মুড়োটা তুলে নিয়ে দৌড় দিল। একটু দূরেই গোয়ালঘরের পাশে কাটা খড় জমা করে রাখা ছিল কমলি ধবলী কালী সব গরুদের জন্য। বগাই সোজা গিয়ে গা ঢাকা দিল সেই খড়ের গাদার আড়ালে।

    ইনি ওমনি উনিকে বলল,
    - “উনিমশাই, তুমি শিগগির এই কচুপাতায় মোড়া জালটা নিয়ে বগাইয়ের পিছু ধাওয়া করো। তারপর ওই খড়ের গাদার ঠিক পাশে গোয়ালঘরের টিনের চালটার ওপর উঠে অপেক্ষা কর। আমি বাড়ির লোকেদের বগাই যেখানে লুকিয়ে আছে সেখানে নিয়ে আসছি। সবার আসার শব্দ পেলে বগাই যেই পালাতে চাইবে ওমনি এই জালটা তুমি চালের ওপর থেকে ওর গায়ে ফেলে দেবে। যেন বদমাইশটা কিছুতেই মাছটা ফেলে দিয়ে পালাতে না পারে। মাছশুদ্ধু ওকে বন্দী করতে পারলে তবেই গিন্নিমা বুঝবে যে আসল দোষী আমরা নই, বগাই বেড়াল। নাও নাও শিগগির যাও এবার।”
    উনি চিন্তিত গলায় বললে,
    - “ইনিগিন্নি যা করবে একটু সাবধানে কোরো!”

    তারপর উনি দৌড় দিল গোয়ালঘরের দিকে আর ইনি হেঁশেলের সামনের মাছের চুপড়িটার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে শুরু করল। একটু পরেই খেন্তিপিসি ইনিকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
    - “অ গিন্নিমা! কী সব্বনাশ হল গো! ইঁদুর এসে মাছের চুবড়িতে মুখ দিল যে গো! ওই ওই পালালো! ধর ধর!”
    ইনি ততক্ষণে দৌড় দিয়েছে গোয়ালঘরের দিকে। গিন্নিমাও খেন্তিপিসির হাঁকডাক শুনে পড়ি কী মরি করে ছুটে এলেন। ছুটে এলেন কত্তাবাবু। খেলা ফেলে দৌড়ে এল খোকন আর খুকি। সকলে মিলে ছুটল ইনির পিছু পিছু। সে এক দৃশ্য। একটা পুচকে নেংটি ইঁদুর ছুটছে, তার পিছনে সব্বার আগে ছুটছে খেন্তিপিসি, তার পিছনে খোকন আর খুকি, তাদের পেছনে কত্তাবাবু, আর সবার শেষে হাঁটুর ব্যথা সামলে গিন্নিমা।

    গোয়ালঘরের চাল থেকে এই দৃশ্য দেখামাত্রই উনি কচুপাতার মোড়কটা সাবধানে খুলে আঠালো চটচটে জালটা ফেলে দিল শয়তান বগাইয়ের ওপর। সে ব্যাটাচ্ছেলে তখন মহানন্দে মাছের মুড়োটা সাবাড় করার চেষ্টায় ছিল। এই মিছিলের শব্দে যেই না পালাতে যাবে মুড়োটা ফেলে ওমনি কিছু বোঝার আগেই একটা কীসে যেন জড়িয়ে গেল। যত টানাটানি করে ছেঁড়ার চেষ্টা করে তত জড়িয়ে যায় চিটিয়ে যায়। সরু সরু সুতোগুলো যেন লোহার মত শক্ত। এমন বিপদে বগাই আগে কক্ষণও পড়েনি।

    ইনি সব্বার আগে দৌড়ে এসে উঠে পড়ল গোয়ালঘরের টিনের চালের ওপর উনির ঠিক পাশটিতে।

    ওদিকে নিচে খড়ের গাদার আড়ালে ভিড় জমে গেছে। খেন্তিপিসি, খুকি, খোকন, কত্তাবাবু, গিন্নিমা সকলে এসে চোখ বড় বড় করে চেয়ে রয়েছে বগাই বেড়ালের দিকে। বগাইয়ের তখন দুরবস্থার একশেষ। জালে জড়িয়ে পাঁশুটে লোম সব জট পাকিয়ে গেছে, ঝামরি ঝুমরি লেজখানায় গিঁঠ পড়ে গেছে। গলার লাল রিবনখানা খুলে কান থেকে ঝুলছে। মাছের মুড়োর আধচেবান টুকরো মুখে। সব বদমাইশি ফাঁস হয়ে গেছে হতচ্ছাড়ার।

    খেন্তিপিসি আর গিন্নিমা সমস্বরে বলে উঠল,
    - “অ্যাদ্দিন তবে সব মাছের টুকরো তুই-ই খাচ্ছিলি বগাই! যত উৎপাত তুই-ই করছিলি! আমরা খামোখা ইঁদুরদের ঘাড়ে দোষ দিই!”
    কত্তাবাবু এসে জালশুদ্ধু বগাইকে তুলে ধরে নিয়ে বললেন,
    - “চল! আজ তোর হচ্ছে বগাই! কাল থেকে শুধু ডাল আর ভাতই জুটবে তোর কপালে। দুধ মাছ সব বন্ধ।”
    খুকি আর খোকন এমন সময় ওপর দিকে চেয়ে বলে উঠলো,
    - “ওই দেখো মা গোয়ালঘরের চালে দুটো ইঁদুর!”
    গিন্নিমা বললেন,
    - “থাক! ও বেচারাদের জ্বালাতন করিসনি, ওদের কোন দোষ নেই।”

    গোয়ালঘরের চাল থেকে ইনি আর উনি ফিসফিসিয়ে বলল,
    - “মধুমালতি মাসির সুতোর জাল কেয়াবাৎ”
    - “মধুমালতি মাসি জিন্দাবাদ!”

    তারপর?
    তারপর বগাইয়ের কপালে খোকন আর খুকির জন্মদিনের ভালো মন্দ খাবার তো কিছু জুটলই না! উল্টে আঠালো জাল ছাড়াতে গিয়ে খেন্তিপিসির মুখঝামটা জুটল বিস্তর। ওদিকে ইনি আর উনির বাসার সামনে মানে ভাঁড়ারঘরের পুব কোণের গর্তটার মুখে কে যেন ছোট্ট একটা কাঠের রেকাবে করে ভালো ভালো খাবার রেখে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট দুটো লাল আর নীল রিবন।



    ছবি : সুকান্ত মণ্ডল



  • স্কেচ ৬ | পানুর মেটামরফোসিস | চালচিত্রের চালচলন | কেমন আছে ওরা? | চাও করুণানয়নে | পুত্রার্থে | সই | আপনি যেখানেই থাকুন | কিসসা গুলবদনী | জনৈক আবহ ও অন্যান্যরা | গুচ্ছ কবিতা | অমল রোদ্দুর হয়ে গেছে | ইনি আর উনির গপ্পো | দুগ্গি এল | দুর্গারূপে সীতা, ভিন্নরূপে সীতা | প্রিয় অসুখ | শল্লকী আর খলিলের আম্মার বৃত্তান্ত | রানার ছুটেছে তাই | বিসর্জনের চিত্রকলা | কল্পপ্রেম | লম্বা হাত খাটো হাত | কেন চেয়ে আছো গো মা, মুখ পানে! | ছোট্ট পরীর জন্মদিন | জাপানি পুতুল | আধাঁরে আলোঃ শারদ সাহিত্য | ইন্দুলেখার ইতিকথা | মুর্শিদাবাদ | এই দিনগুলি | জ্বিন | জোনাকি এবং ডোরেমিরা | বাসায় চুরি | বিশ্বকর্মার গুপ্তঘট | দুর্গাপূজা - দুটি প্রবন্ধকথা | টিউশন | ফেরা | মায়া | বন্দী | মেয়েদের কিছু একটা হয়েছে | কেল্লা নিজামত | সীতারাম | দড়াবাজি | মায়াফুলগাছ | যখন শ্যামের দ্বারে | কুয়াশা মানুষের লেখা | সময় হয়েছে নতুন খবর আনার | শরৎ ২০২১
  • বিভাগ : গপ্পো | ১৪ অক্টোবর ২০২১ | ৫৫১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৪ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Saswata Saha | ১৪ অক্টোবর ২০২১ ১০:৫৬499570
  • খুবই মিষ্টি
  • Mousumi Banerjee | ১৪ অক্টোবর ২০২১ ২২:৫৫499586
  • মিষ্টি লেখা। আরোও লেখা চাই।
  • Piyali Das | ১৯ অক্টোবর ২০২১ ২৩:৫৯499846
  • ভালো ।বেশ , আরো লেখা চাই
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন