• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ইতি ও পুনশ্চ

    যদুবাবু লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৬০২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • বছর দুই হলো একতলার বাসা ছেড়ে দোতলায় উঠেছি, সামনে এখন কোনো উঁচু বাড়ি নেই, তাই দৃষ্টি অনেকদূর যায় বাধাহীন। তবে সেই দৃশ্যে শুধুই রুক্ষ, অযত্নে লালিত অনেকখানি জংলা জায়গা, যার একদিক থেকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে ছোট্ট, ছোট্ট নতুন দেশলাই বাক্সের মতন বাড়িঘর। আজ থেকে আর সপ্তাহ তিনেক পরেই যদি এসে ব্যালকনিতে বসেন একটা চেয়ার টেনে, হেমন্তের শেষ পাতার ফাঁক দিয়ে হুই দূরের একটা হাইওয়ের একটু আলো দেখা যাবে রাতে, আর ক্রমে ক্রমে কমে আসা জঙ্গলের যেদিকটায় আলো পড়ে না, সেইখান থেকে শোনা যাবে পাখির ডাক, ক্কচিৎ দুই-একটা খরগোশ কিংবা হরিণের আওয়াজ। কোত্থাও কোনো হর্ণ নেই, কোনো সাইরেন নেই, চারিদিকে তাকিয়ে দেখি, আর কোথাও কেউ ব্যালকনিতে শীতের রাতে একা-একা দাঁড়িয়ে নেই। 
     
    মনে হয় এই নিস্তব্ধতা এতোই গাঢ়, এতোই তরল, যেন চোখ বুজে কান পাতলেই বহু দূর থেকে চেনা স্বর এসে পৌঁছবে কানে। যেন এই ডানা-ঝটপটানো রাতে একদিন হঠাৎ-ই ফোন আসবে সেই ইচ্ছে করে সেভ না করা নম্বরটা থেকে, এবং সে জিগ্যেস করবে, 'জেগে আছিস?' 
     
    ***** 
    বাবার কাছে চিঠি আসতো প্রচুর। পুজোর ঠিক আগে আগে আমাদের ছোট্ট কাঠের ডাকবাক্স ভরে যেতো প্রায় প্রায়। কতোরকমের সে সব চিঠি ! মালদা থেকে শিবুকাকুদের চিঠি আসতো, দাদুর বয়ানে, 'কল্যাণীয়েষু জগন্নাথ'। আর বিজয়ার ঠিক পরে প্রত্যেক বছর নিয়ম করে অশ্বিনীকুমার কাকুর চিঠি, একটা গোটা ইনল্যান্ড লেটারের ভেতরে এক প্যারা খুদি খুদি করে লেখা, 'হোপ দিস লেটার ...'। উত্তর লিখে দিতাম আমি-ই, সুন্দর হাতের লেখায় যতোটা সম্ভব ছোটো করে একটা পোস্টকার্ডে এক মহাভারত ধরিয়ে ফেলতাম ডিকটেশন নিতে নিতে ... অবশ্য ডাক-ব্যবস্থাও ছিলো আরেক পরাবাস্তব দুনিয়া, মহালয়ার শুভেচ্ছা পেতে পেতে পেরিয়ে যেতো কালিপুজো, কালিপুজোর উত্তর যেতো নিউ ইয়ারের পরে।  
     
    তবে সব চিঠি-ই কি কেজো ছিলো? বাবা বলতেন বাবার নাকি অল্প বয়সে দারুণ দারুণ সব পেন-ফ্রেন্ড ছিলো - একজন ছিলেন নাকি ইজরায়েলের এক মহিলা, যাঁর সাথে আলাপ পাহাড় চড়তে গিয়ে। সুখিয়া-পোকরিতে পোস্টিং ছিলো বাবার, মাইনাস দশ ডিগ্রি, ওরে বাবা। তার মধ্যে বরফ কেটে পাহাড় চড়তে যেতেন বন্ধু জুটিয়ে। সেইখানেই আলাপ। 
     
    আর ছিলো বিখ্যাত সব লোকের উত্তর, তারাশঙ্করের চিঠি, উত্তমকুমারের নিজের হাতে সই করা ফটো। সব-ই, বাবা বলতেন, আছে আমাদের আলমারির ভেতরে দস্তাবেজের ভেতর চেপ্টে, কিংবা ট্রাঙ্কে হারিয়ে যাওয়া জমির দলিলের সাথে মারামারি করতে করতে। অ্যাশট্রে-তে ছাই ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বাবা বলতেন, 'সব-ই ছিলো, বুঝলি, আসলে গুছিয়ে রাখার কেউ নেই।'
    (এখানে বলে রাখা ভালো, পরে সেই তোরঙ্গ খুলে আমি প্রচুর হাঁটকেছি। দাদুর আমলের গাদা কাগজ আর ফালতু, রদ্দি জিনিষের মাঝে কোনো চিঠি-ই দেখিনি, খালি পেয়েছি একজোড়া কাঁসার ভারী বাসন, যার উপরে খোদাই করে লেখা ঠাকুমার নাম, 'চাঁপারাণী দত্ত'।)
     
    তবু হতোদ্যম হইনি, ছোটোবেলার কাগজে দেখতাম শ্রেনীবদ্ধ বিজ্ঞাপনের পাতা জুড়ে প্রেমে ব্যর্থ/বশীকরণ, জয়েন্টে সাফল্য আর নাম-বদলের এফিডেভিটের মাঝে একটা-দুটো টিমটিম করছে পত্রমিতালীর ডাক। কখনো নিঃসঙ্গ প্রৌঢ়, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সঙ্গ চাইছেন সমমনস্ক মানুষের, অথবা মাঝবয়েসী ব্যবসায়ী বা শিক্ষক চাইছেন নি-ছক বন্ধুতা। 
     
    আমিও প্রায়-ই পনেরো পয়সার পোস্টকার্ড নিয়ে গুছিয়ে চিঠি লিখতাম সেইসব বিজ্ঞাপনের উত্তরে, বলাই বাহুল্য তারা আর যাই চেয়ে থাকুন, আমার চিঠি চান নি। দু-একবার ভেবেছি জ্যোতিষ্ক-র জায়গায় জেসমিন নামে দু-এক পিস পাঠিয়ে দেখি কেমন উত্তর আসে, তারপর বাবার থাবার কথা ভেবে সে আশালতার মূলোচ্ছেদ স্বহস্তেই করেছি।
     
    নিজের চিঠি পাওয়ার আশায় তখন প্রায় জল ঢেলেই দিয়েছি, এই সময় বুঝলাম চিঠি লেখার সবথেকে ভালো উপায় দুমদাম প্রেমে পড়া - সত্যি বলতে তখন মনে হতো মানুষে প্রেমে পড়ে কেবলমাত্র চিঠি লেখার অজুহাত পাবে বলে। অতএব, উর্ধ্বমুখ মুগ্ধচোখে গর্তে দিলেম পা, শুরু হলো অভাগীর স্বর্গ কিংবা ককলিয়ার ২-৩/৪ প্যাঁচের নোটের মাঝে পাচার করা নিষিদ্ধ-গন্ধমাখা চিঠি। 
     
    কিন্তু বিধি বাম ! 
     
    অনেক ভেবেচিন্তে একজন, এবং তার অনতিকাল পরেই আরেকজনকেও চিঠি ধরালাম (কাজটা মোটেও ভালো করিনি, এরা দুইজন বুজুম ফেরেন্ড ছিলেন)। সেসব চিঠির মধ্যে বাছাই-করা কোটেশন, শুধু বাংলা তেমন স্মার্ট না লাগার রিস্ক নেবো না বলে জয়বাবু ও জন ডান একত্রে হাঁটু গেড়ে বসেছেন নীল রঙের খামে। তবুও, তবুও ... কথোপকথন আর হলো না ... প্রেম সেই কৈশোরে নিঃশব্দ চরণে এসেছিলো কিনা জানা নেই, তবে এসেই যে সে সশব্দ চরণে পালিয়েছিলো সে বিষয়ে আমি দৃঢ় নিশ্চিত। 
     
    অগত্যা আউটসোর্সিং ! বন্ধুরা বরাত দিতো, লম্বা চিঠির পারিশ্রমিক একটা আস্ত নেভি-কাট, বিফলে মূল্য ফেরত নাই, তবে সফল হলে আরো কিছু এগরোল-চাউমিন উপরি। লিখেওছি দেদার, যে যেমন চায় ঠিক তেমন - কারুর চিঠি সামান্য ভীতু, বেনামি, 'বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না', তলায় সই করা - স্বশিক্ষিত প্রেমিক হলে 'অমিত রায়', অশিক্ষিত ড্যাকরা হলে রাহুল/রাজ। কারুর চিঠিতে শাহ্রুখীয় সেন্টু কিংবা অঞ্জনের গান, আবার কারুর নচিদার স্টাইল, 'এই! তুমি কি আমায় ভালোবাসো?' 

  •  
    জীবনে কোনো আনন্দ-ই চিরস্থায়ী নয়, হলে জানবেন সেটা জীবন নয়, জি-বাংলা, অতএব এই কেরিয়ারের ইতিও অচিরে। দুই বন্ধুই যে লাবণ্যকে লিখতে বলেছে, সে যে একমেবাদ্বিতীয়ম একজনা-ই, এবং সে যে দুইটি চিঠির স্যাম্পল দেখেই বুঝে যাবেন নিবারণ চক্কোত্তি আর অমিত সব-ই আসলে দাদু ঠাকুর, সে কি আর আমি জানতাম? 
     
    সুন্দর লম্বা চিঠি লিখতো শুভ্রকান্তি, কখনো-সখনো শৌভিক, একবার-আধবার সন্দীপ । শুভ্র একদিন লিখলো ওদের দামোদরের জল শুকিয়ে চড়া পড়ে যায় গরমে, কোথাও কোথাও হেঁটে হেঁটে পেরোনো যায় দিব্যি। সে চিঠি যেদিন পৌঁছলো আমার বাড়িঘরময় তখন বন্যার জল থইথই, বাবা ইঁট পাতছেন গলির ভেতরে, আর মা সেই জলের মধ্যে হাঁটুর উপর কাপড় তুলে বালতি বালতি জল ঘরে তুলে রাখছে, আর গলায় তাঁর দীর্ঘদেহী ঈশ্বরের কোনো একটা বর্ষার গান। 
     

     
    এক বর্ষার দিনে শুধু বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখি সেই ইঁটগুলো আর নেই -- গলির মধ্যে জল পাড়িয়ে ঢুকতে গিয়ে কেডস ভিজে যাবে বলে এক শ্রাবণে ভিজে ভিজে বাবা যে ইঁটগুলো পেতে রেখেছিলেন আমার আজন্ম বর্ষাকালে ... সেই প্রকান্ড মহীরুহ তার ডালপালা, তার শেকড়, তার কোটরে বাস করা তক্ষক, তার বর্ষার জলে পাতা ইঁট – সব নিয়ে একদিন চলে গেছেন কোনো একটা দৃশ্যের ওপারে ... সেইখানে যেখানে আর কোনো চিঠি-ই পৌঁছয় না। 
     
    হাতে লেখা চিঠির-ও সেই শেষ বসন্ত। দিদির সাথে কাফেটেরিয়ায় গিয়ে ইমেল খুলছি, ইয়াহু আইডিতে নামধাম-জন্মসাল সব দেওয়া, বন্ধুদের সেই কাফে থেকেই ইমেল করলাম, বললাম, শোন এই হচ্ছে আমার ইউজারনেম আর এই হচ্ছে পাসওয়ার্ড, পত্রপাঠ উত্তর দিস প্লীজ। এক সপ্তাহ সে কী উত্তেজনা তারপর, ইনবক্স(১) দেখবো কি পরের বার? রোজ-ই সাইবার কাফের বাইরে চটির মেলা দেখি, পকেটে টাকা গুণে ফিরে আসি চুপচাপ, পরের দিন অফ-টাইমে যাবো, ভর দুপুর বেলা। 
     
    কতো বড়ো হলাম তারপর, কতো হাজার-লক্ষ ইমেল পেলাম, হারিয়ে ফেললাম আস্ত আস্ত ইমেলের বাক্স, নিজের নামের আই-ডি, নিজের আর সেই প্রথম প্রেমিকার নাম জুড়ে আইডি, আর ইনবক্স ভরা কতো ঝগড়া-অভিমান-কতো তুচ্ছ রাগ, হারিয়ে ফেলেছি সব-ই। কতো ইমেল লিখতে হবে কোনোদিন ভাবিনি, কতো ইমেল পেতে চাইনি কোনোদিন, এখন ভাবলে হাসি পায়, আর কেউ দেখার না থাকলে, অন্ধকার ব্যালকনিতে মাঝে মাঝে কান্না-ও। তবু, ইমেল তো, কুটি কুটি করে ছিঁড়ে জানলা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায়না হাওয়ায়, পুড়িয়ে দেওয়া যায়না অন্ধ রাগে, লুকোনো যায়না পেঙ্গুইনের পুরোনো পেপারব্যাকটার ঠিক মাঝখানে। একটা ব্যর্থ প্রেমের আবর্জনা পোড়াতে বসলে, একটা মাত্র ডিলিট-এর বোতাম টিপে সুখ হয়, বলুন?  
     
    জয় গোস্বামীর একটা কবিতার বই আছে আমার বইয়ের তাকে, তার ব্যাক কভারে লেখক-পরিচিত-র তলায় লেখা - "শখঃ পুরোনো চিঠি পড়া" ... ছোটোবেলায় পড়তে পড়তে ভাবতাম, কবে সেই বয়সে পৌঁছবো যখন আমার-ও পুরোনো চিঠি থাকবে ! 
     
    তাই এখন ধুলো ঘেঁটে ঘেঁটে বের করি পুরোনো সব হাতে-লেখা চিঠি ... মাঝে মাঝে সে চিঠিগুলো নিজে নিজেই জ্বলে উঠে ছাই হয়ে যায়, আবার মাঝে মাঝে দেখি সেই ছাই থেকে ফিনিক্সের মতন নতুন একটা কবিতা হয়তো জন্ম নিলো ... যদিও এখন দেখছি ছাই-ই বেশী, কবিতা কম ...  
     
    সেই সব হারিয়ে যাওয়া ছাইদের জন্যে এখনো একটু আফশোস রয়ে গেছে মনে মনে, অবশ্য এ-ও ঠিক যে সেসব উদ্ধার হলে যে সমূহ বিপদ একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই আশা ছেড়েই দিয়েছি। 
     
    খালি একজন লিখেছিলো, ‘তোকে উপায়হীন ভাবে ভালোবাসি আমি’ ... শুধু সেই চিঠিটা এখনো মাঝে মাঝে খুঁজি ... 

    --------
     
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৬০২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৫:৪৭498731
  • লেখা ও রেখা পছন্দ হল।
  • যদুবাবু | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৬:৪৩498732
  • @অভ্যুদাঃ :) 
  • aranya | 2601:84:4600:5410:b151:c09e:abdf:c77b | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১০:১৩498734
  • সুন্দর। পুরনো কিছু চিঠির কথা মনে পড়াল 
  • | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৫০498736
  • আমিও এককালে প্রচ্চুর চিঠি লিখতাম। প্রেমপত্রও লিখে দিয়েছি  কিন্তু সেসব এক্কেবারে ফিরিতে। পরে মনে হয়েছিল আহা চার আনা আট আনা নিলে হত। হজমী কারেন্ট নুন ইত্যাদি হয়ে যেত। 
  • | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৫১498737
  • ধুত আগেই এন্টার পড়ে গেল। আরে লেখাটা দিব্বি, ছবিটাও। 
  • dc | 122.164.35.69 | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৫৯498738
  • আমি কোনকালেও প্রেম পত্র লিখিনি। মানে একবার চান্স এসেছিল লেখার, কিন্তু আধা লাইন লিখেই এমন গুড়গুড়িয়ে হাসি পেতে লাগলো যে আর এগোতে পারিনি। আর পাইনি যে একটাও সে তো বলাই বাহুল্য। 
     
    তবে ছোটবেলায় আমার দাদু টিস্কোয় থাকতো আর মাঝে মাঝে আমায় চিঠি পাঠাতো, আমিও উত্তর লিখে পাঠাতাম। সেই চিঠিগুলো নেই, তবে দুয়েক লাইন আবছা মনে আছে। 
  • Nirmalya Nag | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৪:৩৯498745
  • সেই সব ভালবাসাময় চিঠির মধ্যে দু একটা থাকত রক্ত দিয়ে লেখা। ইলেভেনে পড়ার সময়ে এক বন্ধু লিখেছিল তার তখনকার ভালবাসার জনকে। তারা দুজনে দুই দেশে থাকে এখন, ভালবাসা ছেড়ে গেছে কলেযে যেতে না যেতেই। সেই পুরনো চিঠি এখন কোথায় কে জানে...
  • Ranjan Roy | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৭:৪৩498750
  • ক্লাস টেনের একটি ছেলে ক্লাস নাইনের আরেকজনকে লিখেছিল-- জানি, এই ভাললাগা ভালুকের জ্বরের মত স্বল্পস্থায়ী। এরপরে আমরা কলেজে ভর্তি হব, আলাদা কলেজে আলাদা স্ট্রীমে, হয়ত ভিন্ন শহরে। তখন আজকের এই চিঠির কথা মনে হলে হাসি পাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজকে যে জ্বর বা তার জ্বালা-যন্ত্রণা সেটাও সত্যি, তাকে অস্বীকার করি কী করে?
    সমস্যা হোল যাকে লিখেছিল সেও একটি ছেলে। তারপর কলেজ জীবনে গড়িয়া বাসস্ট্যান্ডের কাছে তাদের একবার দেখা হোল। বড় ছেলেটি একটু ভয় পাচ্ছিল।  অন্য ছেলেটি  তখন যদুপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট। দুজনে চায়ের দোকানে বসল।
    সে হাসিমুখে গল্প করল, তার কলেজের গল্প, নানান সমসাময়িক প্রসঙ্গ। কিন্তু সেই চিঠিটার কথা কেউ উল্লেখ করল না।
  • যদুবাবু | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৮:২৩498754
  • ঘুম থেকে উঠেই মন ভালো হয়ে গেলো। :) 

    @অরণ্যদাঃ থ্যাঙ্ক ইউ ! 

    @দ-দিঃ সেই যে ছোটোবেলায় পাপ করেছিলাম, এখন তার কর্মফল ভুগছি, লোকে খামকাজ করিয়ে টাকাও দেয় না, ক্রেডিট-ও না। :D অবশ্য তাদের কাছে নেভি কাট বা হজমি গুলি চেয়ে দেখিনি। হয়তো তাতে রাজি হয়ে যাবেন। 

    @dc: সেইটাই যদি লিখে দিতে মন্দ হতো না কিন্তু। ক্লাস নাইনে কেউ যদি 'গুড়গুড়িয়ে হাসি পাচ্ছে'-ও বলতো, মাক্কালিরদিব্বি জান কুরবান করে দিতাম। কিন্তু তা তো আর হয়নি, উলটে তাদের বাপমা আমায় বাটাম দিয়েছিলেন। একবার তো ভর্তি মেট্রোরেলের কামরায়। নেহাৎ ভেস্টিবিউল ছিলো বলে প্রাণ বেঁচেছে। 

    @নির্মাল্যবাবুঃ ওঃ সে সত্যি এক ট্রেণ্ড ছিলো সেই সময়, না? আমি তো এদিকে বাংলা কোচিঙ এর একজনকে 'স্মরগরলখণ্ডনং" লিখে পাঠিয়ে খুব কনফিডেন্টলি ঘুরছি। পরের দিন নিউ তরুণ সিনেমার গলিতে রঞ্জন (আমাদের রঞ্জন-দা নন) ধরে দেখালো, অন্যে অন্যে রক্তে লেখা খত ভেজেছে। বুঝলাম আমার ফুটুর অ্যাবসোলিউটলি ডুম। 

    @রঞ্জনদাঃ এইটুকু-ই একটা খুব মেলানকলিক, সুন্দর অণুগল্পের মত। চায়ের দোকানটা দেখতে পেলাম। সেই চিঠির-ও জবাব দেওয়ার দায় ছিলো না। কোনো এক দেরাজে রাখা আছে হয়তো বাতিল কাগজের নীচে। বা নেই। হারানো চিঠিদের হয়তো একটা অন্য পোর্টাল আছে। 

    আমাকে একদিন একজন হঠাৎ অনেকদিন পরে ফোন করে বলেছিলো তার বাড়িতে উই ধরে সব বইখাতা কেটে দিয়েছে, শুধু সেই দু-একটা নিষিদ্ধ, লুকোনো চিঠি ছাড়া। কি জবাব দেবো মাথায় আসেনি। 
  • Tim | 2603:6010:a920:3c00:a849:1d16:4045:86be | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২১:০৮498758
  • আমাকে কেউ কোনদিন ভরসা করে প্রেমপত্র লিখতে দ্যায় নি, সে আমার সাহিত্য প্রতিভা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হলেও দ্যায় নি। মনে হয় মর্বিড কিছু লিখে প্রেম চটকে দেব ভেবেছে, কিজানি।
    যদু বাবুর কলম, আঁকা আর লেখা, দুয়েই খুব ভালো। আলাদা করে সর্বত্র লেখা হয়েছে কিনা মনে নেই। ভালো লাগলো এই লেখাটাও। 
  • যদুবাবু | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২২:০৩498760
  • @টিমঃ সেই আমি কুত্রাপি ডাক্তারি পড়বো না শুনে বাবা বলেছিলেন মানবজাতি জানতেও পারলো না তুমি তাদের কী উপকার করলে। মনে পড়ে গেলো। আপনিও হয়তো না লিখেই  ... 

    তবে কি, সময় মোটেও চলে যায়নি, আর কবি বলেই গেছেন, "মেহেরবাঁ হোকে বুলা লো মুঝে চাহো জিস ওয়ক্ত, ম্যায় গ্যয়া ওয়ক্ত নহি হুঁ কি ফির আ না সকুঁ" ... মর্বিড প্রেমপত্র তো যে কোনো সময় লিখে ফ্যালা যায়। ইন ফ্যাক্ট, এই বয়সে পৌঁছে মনে হয় যাই লিখি একটু মর্বিডিটি চলেই আসবে। একটু মৃত্যুর অনুষঙ্গ না থাকলে সে প্রেম আর প্রেম কিসের? লিখে ফেলুন, না হয় সে চিঠি আর পোস্ট নাই করলেন। 

    আর থ্যাঙ্ক ইউ ! 
  • | 2601:247:4280:d10:b8e4:dbf8:140d:7a28 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৫:২৫498764
  • লেখাটা খুব ভালো হয়েছে যদুবাবু:-) 
    চিঠি বললেই মনকেমন করে ওঠে। খাতার ভাঁজে টানটান করে ভরে রাখা সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে যখন রোজ দেখা হলেও একটা চিঠি পেতে ভালো লাগতো।
    বন্ধুদের লেখা চিঠিদের কথা মনে পড়ে, লিখে দেওয়া চিঠিও মনে পড়ে। আমার নিজের বাংলা হাতের লেখা মনে পড়ে। চিঠির মধ্যে একটা ফেলে আসা সময় বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।ভাবতে ভাল্লাগে হয়তো আবার কোনওদিন মেলের নিকুচি করেছে বলে সবাই কাগজ পেনের কাছে ফিরে যাবে:-) 
     
  • Tim | 2603:6010:a920:3c00:5d09:d6ce:f3c2:8759 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৮:২৭498769
  • আহা অন্যের চিঠিই লিখিনি, তা বলে কি আর নিজেরগুলো না লিখে ছেড়েছি? মামুর কল ছিলো/আছে কী করতে  :-))
  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৯:৩০498770
  • চিঠি আমি নিয়মিত লিখতাম, কালি কলম মন দিয়ে। নিয়মিত। চিঠির উত্তরে ছোট্টো সুন্দর ইমেল আসত। শেষের দিকের চিঠিগুলোর উত্তর পেতাম না, তবু লিখতাম। গত ফেব্রুয়ারী থেকে বন্ধ হয়ে গেছে।
  • নিরমাল্লো | 220.158.144.34 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৪১498773
  • সেই তো রে জেডি, প্রেম আর প্রেমপত্র খুব ঝামেলার জিনিস। আমি প্রেমপত্র লিখি নি একবারও। একবার লেখার জন্যে খুব তোড়জোড় করে বসেছিলাম। এক পাতা লিখেওছিলাম, তারপরে কি হইল জানে শ্যামলাল - বাবা কি করে যেন সেই চিঠির খসড়া পড়ে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ছুঁড়ে মেরেছিল। তার পরে আর কক্ষনো লিখি নি। ইমেইলে হয়ে ইস্তক অনেক ড্রাফট হয়ে পড়ে ছিল - সেগুলো মাঝে মাঝে ঘাঁটি
  • নিরমাল্লো | 220.158.144.34 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৪৩498774
  • যাচ্চলে আদ্ধেক কমেন্ট হল কেন? এ আবার কি কল! এখানেও টিডিএস কাটছে নাকি?
  • যদুবাবু | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৯:৩৪498783
  • @মাল্লোঃ ই কি রে !! বাকিটা কিসে খেয়ে নিলো? আমার অবশ্য বাড়িতে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ছিলো না। একটা দামড়া মেটেরিয়া মেডিকা ছিলো, তবে হোমিওপ্যাথির বই তো, বোধহয় গোটা বই ছুঁড়ে মারা ভালো না একটা একটা পাতা খুলে এই ডিসাইড করতে করতে আমি ধেড়ে হয়ে গেছি। 

    @অভ্যুদাঃ :( 

    আমাকে একবার নবনীতা দেবসেন একটা ফ্যান-ইমেলের উত্তরে খুব সুন্দর করে এক পাতা উত্তর দিয়েছিলেন, তারপরে আরও একটা, আরও একটা। সেইগুলো জমানো আছে যত্নে। শেষ চিঠিটার উত্তর পাইনি, ভেবেছিলাম এই হয়তো একদিন আসবে, শেষে লেখা nds, এখন যখন জানি আর আসবে না, মাঝে মাঝে সেই পুরোনো ইমেলগুলোই খুলে পড়ি। 

    @মঃ থ্যাঙ্ক ইউ !হ্যাঁ, বাংলা হাতের লেখা-ই পালটে গেছে না লিখে লিখে। এখন বেশ স্লো। তাও তো আমি কাগজে-পেনে লিখি এখনো। আর সত্যি, কেউ যাক না যাক, কয়েকজন নিশ্চ্যই দুত্তেরি নিকুচি করেছে ব'লে সেই পনেরো পয়সার পোস্টকার্ডের দুনিয়ায় ফিরে যাবে। 

    @টিমঃ ওহোহো। আনফোর্সড এরর হয়ে গেলো। :D 

    সকলকে অজস্র ধন্যবাদ ! আর চলুন না, একটা চিঠি-ক্লাব শুরু করি, না হোক পোস্টকার্ডের ক্লাব? বলাই বাহুল্য, কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, দায়-ও নেই। 
  • কৌশিক ঘোষ | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০২:০৩498834
  • অনেক বছর পরে এই লেখাটাই আরেকবার পড়ে দেখবেন। বুঝবেন অনুভূতি মাখানো কি অসাধারণ একটা লেখা।
    পুনশ্চ অংশটা পছন্দ হলো না। বাকি অংশের সাথে খাপ খাচ্ছে না।
  • যদুবাবু | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০২:১৮498835
  • হ্যাঁ আমার ও তাই মনে হচ্ছে। শেষ লাইনের পরে একটা শব্দও লিখতে নেই। একটাও না। 
    ওইটা পড়ে মুছে ফেলবো।
     
    আর অনেক থ্যাংক ইউ আপনাকে, কৌশিকবাবু। 
  • যদুবাবু | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০২:১৮498836
  • পরে*
  • Ranjan Roy | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৬:০৭498870
  • কৌশিকবাবু গুণী মানুষ। নিজের পেশার বাইরে নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করেন।
    নবদ্বীপ কোলকাতা বিই কলেজ নিয়ে সত্তরের পটভূমিকায় চমৎক্যার উপন্যাস লিখেছেন। আমার ভাল লেগেছিল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন